#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins) #লেখনিতে_ফারিহা
পর্ব ২৬
মিলানের রাজকীয় সন্ধ্যায় শহরের সব নামী দামী ব্যক্তিত্বরা জড়ো হয়েছেন এক ছাদের নিচে। এটি কেবল একটি সাধারণ চ্যারিটি ফান্ডরেইজিং ইভেন্ট নয়, এটি ক্ষমতার এক নীরব প্রদর্শনী। হলের চারপাশ ক্রিস্টাল ঝাড়বাতি আর সাদা অর্কিডের সমারোহে জাঁকজমকভাবে সাজানো। মার্বেলের মেঝেতে আলোর প্রতিফলন আর মৃদু ধ্রুপদী সংগীত পরিবেশটাকে এক অনন্য আভিজাত্য দিয়েছে।
হলের ঠিক মাঝখানে সবার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মেহেরিন কারুসো। রিভেন কারুসোর মা হিসেবে তো বটেই, ইতালির ব্যবসায়িক মহলে তার নিজস্ব এক স্বতন্ত্র সত্ত্বা ও সম্মান রয়েছে তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বড় বড় ইভেন্টে অংশগ্রহণ করে। আজ তার পরনে একটি অফ-হোয়াইট কালারের ডিজাইনার জামদানি মোটিফের সিল্ক শাড়ি। শাড়ির পাড় জুড়ে রুপালি জরির সূক্ষ্ম কাজ, যা প্রতিটি পদক্ষেপে রাজকীয় দ্যুতি ছড়াচ্ছে। কাঁধের ওপর পিন করা আঁচলটা তার ব্যক্তিত্বকে আরও দৃঢ় করে তুলেছে। গলায় এক লহরী মুক্তার মালা আর কানে হীরের ছোট টপ অতিরিক্ত কোনো সাজ নেই অথচ তার এই পরিমিতিই তাকে ভিড়ের মাঝে অনন্য করে তুলেছে।
মেহেরিন কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলছেন। তার কথাগুলো মেপে মেপে বলা, মুখে এক চিলতে কৃত্রিম কিন্তু মার্জিত হাসি। একজন ব্যবসায়ী মাথা নিচু করে বললেন,
"ম্যাডাম কারুসো, আপনার উপস্থিতিতে এই ইভেন্টের মর্যাদা বেড়ে গেল।"
মেহেরিন কেবল সৌজন্যমূলক মাথা নেড়ে সায় দিলেন।
ঠিক তখনই মঞ্চে মাইক্রোফোনে ঘোষণা শুরু হলো। আজকের ইভেন্টে যারা সবচেয়ে বেশি অনুদান দিয়েছেন, তাদের নাম একে একে ডাকা হচ্ছে।ইতালিয়ান ভাষায় বলা হলো ,
"আমাদের আজকের তৃতীয় সর্বোচ্চ দাতা... মিস্টার রবার্তো মোরেত্তি"
করতালির শব্দে হল মুখরিত হলো। মেহেরিন শান্তভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
"এবং আজকের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দাতা মেহরিন কারুসো"
মেহেরিন ধীর পায়ে মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেলেন। তার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল দৃঢ়। মঞ্চে উঠে তিনি মাইক্রোফোন হাতে নিলেন। অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত কিন্তু শক্তিশালী একটি বক্তব্য দিলেন তিনি। তারপর তিনি যখন মঞ্চ থেকে নামতে শুরু করলেন, ঠিক তখনই স্পিকারে পরবর্তী ঘোষণাটি বাজল।
"এবং আজকের ইভেন্টে আমাদের শীর্ষ দাতা ,কারুসো এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার...মিস্টার ইভানো কারুসো "
মেহেরিন তখন মঞ্চের পাশের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলেন।ইভানো কারুসো নামটা কানে আসতেই তার পা থমকে গেল। ইভানো কারুসো সিঁড়ি দিয়ে মঞ্চে উঠছেন। মাঝপথে দুজনের দেখা হলো। ইভানো কালো থ্রি-পিস স্যুটে বরাবরের মতোই গম্ভীর আর ভয়ংকর প্রভাবশালী। দুজনের চোখাচোখি হলো। মেহেরিনের চোখে পুঞ্জীভূত ঘৃণা আর অবজ্ঞা, আর ইভানোর চোখে এক নিষ্ঠুর স্থিরতা। দুজনের কেউই এক সেকেন্ডের জন্য চোখের পলক ফেললেন না।মধ্যে প্রতিযোগিতাটা চিরকাল এমনই কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জমিও ছাড়তে রাজি নন।
ইভানো মেহেরিনকে পাশ কাটিয়ে মঞ্চে উঠে গেলেন। তার মুখে এক বিজয়ী হাসি। ইভানো মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে তার কর্কশ অথচ প্রভাবশালী কণ্ঠে স্টেটমেন্ট দিতে শুরু করলেন।
মেহেরিন নিচে নেমে সোজা হলের উল্টো দিকের একটি সোফায় গিয়ে বসলেন। ইভানোর কোনো কথা তার শোনার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। তিনি ইভানোর দিকে পেছন ফিরে বসে জানালার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার হাত দুটো শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ, কিন্তু মুখে এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য।
মঞ্চ থেকে ইভানো কারুসো যখন ধীর পায়ে নিচে নেমে এলেন, হলের ভেতর তখন উৎসবের আমেজ তুঙ্গে। ধ্রুপদী সংগীতের তালে তালে ওয়েটাররা দামী শ্যাম্পেন আর অ্যাপেটাইজার নিয়ে ঘুরছে। কিছু ব্যবসায়ী আর সমাজসেবী মেহেরিনের কাছে এগিয়ে এলেন।
“ম্যাডাম কারুসো, আপনার কন্ট্রিবিউশন সত্যিই প্রশংসনীয়”
একজন প্রবীণ ব্যবসায়ী মাথা নিচু করে অভিবাদন জানালেন।
মেহেরিন কেবল সংক্ষিপ্তভাবে মাথা নাড়লেন,
“ধন্যবাদ। সমাজসেবা আমাদের পারিবারিক কর্তব্যের অংশ।”
তখন ইভানো কারুসোও এগিয়ে এলেন। সাথে কথা বলতে থাকা ব্যবসায়ীরা এবার ইভানোর দিকে ফিরে তাকালেন।
“মিস্টার ইভানো কনগ্রাচুলেশনস। আজকের ইভেন্টে আপনিই টপ ডোনার। আপনার স্টেটমেন্টটা দারুণ ছিল,”
ব্যবসায়ীরা তাকেও অভিনন্দন জানাতে শুরু করলেন।
মেহেরিন এক মুহূর্তের জন্য ইভানোর দিকে তাকালেন। ইভানোর মুখে সেই পরিচিত বাঁকা হাসি, যা মেহেরিনের রক্তে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ইভানো শান্ত কণ্ঠে বললেন,
“ধন্যবাদ সবাইকে। তবে মেহেরিনও কিন্তু খুব একটা পিছিয়ে নেই। কারুসোদের মধ্যে প্রতিযোগিতার তেজ সবসময়ই একটু বেশি থাকে, তাই না?”
ইভানোর এই খোঁচা মেহেরিনের একদম সহ্য হলো না। অত্যন্ত মার্জিত কিন্তু শীতল কণ্ঠে তিনি বললেন,
“এক্সকিউজ মি”
মেহেরিন দ্রুত পায়ে হলের বিশাল কাঁচের দরজা ঠেলে বারান্দার দিকে বেরিয়ে গেলেন। বাইরের মিলান শহরটা রাতের আলোয় ঝলমল করছে। হালকা ঠান্ডা হাওয়া তার অফ-হোয়াইট শাড়ির আঁচলটা উড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ইভানোর সাথে এই মুখোমুখি হওয়ার খেলাটা তার কাছে এখন বড্ড ক্লান্তিকর।
কিছুক্ষণ পরই পেছন থেকে সেই পরিচিত লাইটারের ক্লিক শব্দ শোনা গেল। মেহেরিনকে না ফিরেই বুঝতে পারলেন কে এসেছে। ইভানো ধীর পায়ে এসে মেহেরিনের ঠিক পাশে দাঁড়ালেন। পকেট থেকে একটা দামী সিগারেট বের করে ধরালেন তিনি। ধোঁয়ার একটা কুণ্ডলী পাকিয়ে ইভানো আকাশের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন,
“রাতের মিলান শহরটা সবসময়ই সুন্দর কিন্তু প্রকৃতিটা ষড়যন্ত্রে ভরপুর”
মেহেরিন কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলেন।
ইভানো আবার বললেন,
“আমাদের সম্পর্কের সমীকরণটা অদ্ভুত। আমরা একে অপরকে সহ্য করতে পারি না, কিন্তু আমাদের পথ বারবার মিলে যায়। আজকের ইভেন্টেও তুমি দ্বিতীয় আর আমি প্রথম ঠিক আগেরবারের মতো ”
মেহেরিন এবার শীতল কণ্ঠে বললেন,
“তুমি এখানে জ্ঞান দিতে এসেছ নাকি নিজের জয় উদযাপন করতে? জয়টা যদি হয়ে থাকে, তবে সেটা উপভোগ করো। আমার পেছনে সময় নষ্ট করো না।”
ইভানো সিগারেটে একটা দীর্ঘ টান দিয়ে হঠাৎ তার গলার স্বর বদলে নিলেন। এবার তার কণ্ঠে কোনো বিদ্রূপ নেই, বরং এক ধরনের তীক্ষ্ণ কৌতূহল। তিনি মেহেরিনের চোখের দিকে তাকিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করলেন,
"রিভেন কোথায় ? আমার ছেলেকে গত কদিন ধরে মিলানের কোথাও দেখা যাচ্ছে না ।আমার ইনফরমাররা বলছে সে নাকি দেশ ছেড়েছে ।কোথায় ও?"
রিভেন নামটা শুনতেই মেহেরিনের ভেতরের মা সত্ত্বাটা সজাগ হয়ে উঠল।মেহেরিন হঠাৎ ইভানোর দিকে ফিরে তাকালেন। তার চোখে যেন আগুন জ্বলছে। তিনি দাঁত চেপে বললেন,
"রিভেন কোথায় আছে সেটা জানার অধিকার তুমি অনেক আগেই হারিয়েছ ,ইভানো কারুসো।রিভেন আমার ছেলে তার ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন করার সাহস যেন তোমার আর কোনোদিনও না হয় "
ইভানো একটা ক্রুর হাসি হাসলেন।
“এত রাগ কেন মেহেরিন? সে আমারও রক্ত।তুমি আর তোমার ছেলে যতোই আমাকে অস্বীকার করার নাটক করো না কেন মেহেরিন, সত্যটা কি তাতে বদলে যাব ? আমাদের ডিভোর্স হয়নি। অন পেপার, ইউ আর স্টিল মাই ওয়াইফ। তুমি এখনো মেহেরিন কারুসো আমার অর্ধাঙ্গিনী।”
মেহেরিন ঘৃণাভরা দৃষ্টিতে ইভানোর দিকে তাকালেন। ইভানোর এই নির্লজ্জ দাবি তার ভেতরের সুপ্ত আগ্নেয়গিরিকে জাগিয়ে তুলল। তিনি এক চুল পিছু হঠলেন না, বরং ইভানোর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলেন,
“ডিভোর্স দেইনি মানে এই ভেবো না যে আমার জীবনে তোমার বিন্দুমাত্র অধিকার অবশিষ্ট আছে। ওই এক টুকরো কাগজ দিয়ে তুমি কারুসো সাম্রাজ্য ধরে রাখতে পারো, কিন্তু আমার আত্মাকে নয়। তুমি একটি কাপুরুষ, ইভানো যে লোকটা নিজের পরিবারকে রক্ষা করতে পারে না,যার ভিতর কোনো লয়ালটি নেই ,যে কেবল ষড়যন্ত্র আর রক্ত নিয়ে খেলতে জানে, তার মুখে স্ত্রী শব্দটা মানায় না। আমাকে স্ত্রী ডাকার নূন্যতম অধিকারটুকুও তুমি অনেক আগেই হারিয়েছ"
ইভানো এক পা এগিয়ে এসে মেহেরিনের খুব কাছে দাঁড়ালেন। তার গলার স্বর এবার আরও গম্ভীর,
“রিভেন আমার রক্ত, মেহেরিন। আমার ধমনীতে যে আগুন বয়, তার ধমনীতেও সেই একই আগুন। তুমি তাকে আমার থেকে যতোই দূরে সরাও, শেষ পর্যন্ত তাকে আমার কাছেই ফিরে আসতে হবে। কারণ কারুসোদের ভাগ্য লেখা হয় রক্ত দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে নয়।”
মেহেরিন এক ঝটকায় নিজেকে সরিয়ে নিলেন। তার শাড়ির আঁচলটা বাতাসের ঝাপটায় উড়ছে, তিনি তর্জনী উঁচিয়ে শেষবারের মতো সতর্ক করলেন,
“খবরদার ইভানো! রিভেনের নামের পাশে নিজের নোংরা ছায়া ফেলার চেষ্টা করো না। সে তোমার রক্ত হতে পারে, কিন্তু সে তোমার মতো মানুষ নয়।আমার ছেলে ভালোবেসে ঘর বাঁধতে জানে, যেটা তুমি কোনোদিন শিখতে পারোনি। আর মনে রেখো, মেহেরিন কারুসো মরে গেলেও কোনোদিন তোমার কাছে নতি স্বীকার করবে না। যেদিন তুমি কাপুরুষের পরিচয় দিয়েছ সেদিন থেকেই তুমি আমার কাছে মৃত”
মেহেরিন আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালেন না। শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে নিয়ে তিনি হনহনিয়ে ভিতরে চলে গেলেন ।ইভানো একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলেন। সিগেরেটের শেষ অংশটুকু রেলিংয়ের ওপর ঘষে নিভিয়ে তিনি অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে এক পৈশাচিক হাসি হাসলেন।
_________
বিকেলের সোনালি রোদ জানলার পর্দা ভেদ করে রিভেন আর রোজেলিয়ার ঘরে এসে পড়ছে। রিভেন আজ বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে। সে বারবার রোজেলিয়াকে কোনো না কোনো বাহানায় টিজ করছে। কখনো তার চুল এলোমেলো করে দিচ্ছে, তো কখনো তার কানের কাছে ফিসফিস করে কোনো অদ্ভুত কথা বলে তাকে লজ্জায় লাল করে দিচ্ছে।
রোজেলিয়া বিরক্ত হওয়ার ভান করে বলল,
"রিভেন! একদম অসভ্যতা করবেন না তো। নানি দেখলে কী ভাববে?"
ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ল কেউ। রোজেলিয়া রিভেনের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দরজা খুলল। সামনে এনজোকে দেখে সে বেশ অবাক হলো।
"এনজো? তুমি এখানে? কিছু লাগবে তোমার?"
এনজোকে দেখে মনে হচ্ছে তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। সে বেশ নার্ভাস। এদিক ওদিক তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
"জি ম্যাম... আসলে... আপনার একটা হেল্প লাগত।"
রোজেলিয়া বেশ দয়ালু স্বরে বলল,
"হেল্প লাগবে? আচ্ছা বলো, কী হেল্প লাগবে? আমি অবশ্যই করব।"
এনজো এবার রিভেনের ঘরের ভেতরের দিকে একবার উঁকি দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"ম্যাম... আসলে... একটু বাইরে আসতে পারবেন? এখানে বলা যাবে না।"
রোজেলিয়া কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই ঘরের ভেতর থেকে রিভেনের বজ্রকণ্ঠ শোনা গেল।
"এনজো!"
এনজো যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো কেঁপে উঠল। রিভেন এতক্ষণ চুপচাপ সব শুনছিল। তারপর এনজোকে ধমক দিয়ে বলল,
"সাহস তো কম না তোমার! ও তোমার বসের বউ, মাফিয়া ওয়ার্ল্ডের ফার্স্ট লেডি। তার সাথে তোমার এমন কী গোপনীয় কথা যে তাকে বাইরে নিয়ে গিয়ে বলতে হবে? ভেতরে এসো দুজন!"
এনজো আর রোজেলিয়া ভেতরে ঢুকল। রিভেন এনজোর খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি এবার তীক্ষ্ণ।
"বলো! কীসের হেল্প চাইছিলে? যা বলার আমার সামনেই বলো। নাকি আমার আড়ালে কোনো নতুন ষড়যন্ত্র চলছে?"
রিভেনের ধমকানিতে এনজো প্রায় সিটিয়ে গেল। রোজেলিয়া রিভেনের হাতে হাত রেখে শান্ত করার চেষ্টা করল।
"রিভেন, শান্ত হোন। ওর বোধহয় খুব জরুরি কিছু বলার আছে। এনজো, তুমি বলো। ভয় পেয়ো না।"
এনজো ঢোক গিলে শুরু করল,
"ম্যাম... আসলে... আসলে হয়েছে কী... মানে..."
রিভেন বিরক্ত হয়ে ধমকে উঠল, "Stop shuttering,enzo what the hell is "মানে মানে " Speak up clearly before i lose my petiance "
এনজো আবার থতমত খেয়ে গেল। সে যতবারই মুখ খুলতে যায়, রিভেনের শক্ত চেহারা দেখে তার কথা গলার ভেতরেই আটকে যায়।সে অনেকবার চেষ্টা করেও বার বার বিফল হচ্ছিল রোজেলিয়া এবার একটা বুদ্ধি দিল,
"আচ্ছা এনজো, তুমি যখন রিভেনের চোখের দিকে তাকিয়ে বলতে পারছ না, তখন তুমি উল্টো দিকে ঘুরে দাঁড়াও।পিছন ফিরে বলো।"
এনজো যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। সে উল্টো দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে একটা লম্বা শ্বাস নিল। তারপর এক নিশ্বাসে বলতে শুরু করল,
"ম্যাম আসলে হয়েছে কী... আমি... মানে আমি কিছুদিন আগে সাইলাস আর মার্কোকে নিয়ে রাস্তায় হাঁটছিলাম। হঠাৎ কিছু কুকুর আমাদের তাড়া করে বসে। তাই আমরা ৩ জন দৌড় দিতে গিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। আমি একটা বাড়ির আঙিনায় গিয়ে লুকাই। তখন... তখন সেখানে একটা মেয়েকে দেখি। মেয়ে বললে কম হবে, যেন একটা পরী! অনেক সুন্দরী..."
এনজো থামল। তার কল্পনায় যেন সেই মায়াবী চেহারাটা আবার ভেসে উঠছে। সে নেশাতুর গলায় বলল,
"তখন থেকেই ম্যাম... তখন থেকেই আমি মেয়েটাকে ভুলতে পারছি না।"
রোজেলিয়া আর রিভেন একে অপরের দিকে তাকাল। রোজেলিয়ার মুখে এক চিলতে হাসি। সে বুঝল এনজো প্রেমে পড়েছে। রিভেনও প্রথমে একটু হাসতে গিয়েছিল, কিন্তু পরক্ষণেই নিজের ভাবমূর্তি ফিরে পেল। সে গম্ভীর হয়ে ধমক দিয়ে বলল,
"কী বললে? মেয়ে? এনজো, আমি কি তোমাদের বাংলাদেশে এই কাজের জন্য নিয়ে এসেছি? তুমি এখানে পরীর গল্প করছ?"
রোজেলিয়া রিভেনের হাত চেপে ধরল,
"আহ রিভেন! থামুন তো। ছেলেটার মনের অবস্থাটা বুঝুন।"
"সিরিয়াসলি এনজো? গ্রামে এসে কি তোমার বুদ্ধিশুদ্ধি সব লোপ পেয়েছে?"
রোজেলিয়া রিভেনের কাঁধে হাত দিয়ে ইশারায় তাকে শান্ত হতে বলল। সে এনজোর দিকে তাকিয়ে কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল,
"নাম কী মেয়েটার? কিছু কি জানো?"
এনজো মাথা নিচু করে বলল,
"না ম্যাম, নাম জানি না। কিন্তু মেয়েটা যে একটা পরী, সেইটা নিশ্চিত। আমি তার বাড়ির ঠিকানাও চিনে রেখেছি। তবে একটা বিষয় খুব অদ্ভুত... সে আমাকে দেখা মাত্রই ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল। তার মুখটা যেন আমি দেখতে না পাই সেজন্য সে খুব চেষ্টা করছিল। কেন এমন করল ম্যাম?"
রোজেলিয়া কিছুক্ষণ ভাবল, তারপর মুচকি হেসে বলল,
"আরে এনজো, তুমি এখনো বোঝোনি? এ দেশের মুসলিম মেয়েরা অপরিচিত পুরুষের সামনে পর্দার আড়ালে থাকতে পছন্দ করে। ওটা লজ্জার আর সম্মানের বিষয়।"
রিভেন এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে গর্জে উঠে বলল,
"কী সব আজেবাজে কথা! ইতালিতে এত এত সুন্দরী ক্রিশ্চিয়ান মেয়ে থাকতে, রোমের এত মডেলদের অফার ফিরিয়ে দিয়ে তুমি এখন এই বাংলাদেশের এক মুসলিম মেয়ের প্রেমে পড়েছ? তোমার মাথা কি সত্যিই ঠিক আছে?"
রিভেন যখন এনজোকে যাচ্ছেতাই বলে বকছিল,এনজো উল্টো দিকে মাথা নিচু করে রইলো ।সে রিভেনের বকার বাইরেও দরজার ওপাশে সাইলাস আর মার্কোর ফিসফিস আর হাসির শব্দ শুনতে পেলো এতে এনজো লজ্জা আর রাগে একটা গোপন বোমা ফাটিয়ে দিল। সে উত্তেজনায় বলে ফেলল,
"বস, আপনি শুধু আমার ওপর চড়া হচ্ছেন কেন? সাইলাসকে কিছু বলছেন না কেন? সে তো আপনার বাড়ির ওই মেইড নাইলার সাথে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করছে!"
রিভেনের চোখ দুটো কপালে উঠে গেল। সে স্তম্ভিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
"কী... কী বললে তুমি? সাইলাস কী করছে ?"
এনজো হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
"জি বস! সাইলাস আর নাই—"
এনজো কথা শেষ করার আগেই ঝড়ের বেগে সাইলাস ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল। এক সেকেন্ডের ব্যবধানে সে লাফ দিয়ে এসে এনজোর মুখটা নিজের শক্ত হাতে চেপে ধরল। তার পেছনেই মার্কো ঢুকল। আসলে সাইলাস আর মার্কো এতক্ষণ দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে আড়ি পেতে সব শুনছিল। যখনই দেখল এনজো সব হাঁড়ি ভেঙে দিচ্ছে, সাইলাস আর নিজেকে সামলাতে পারেনি।
সাইলাস দাঁত কিড়মিড় করে এনজোকে ফিসফিস করে বলল,
"একদম চুপ! আর একটা কথা বললে তোর জিভ টেনে বের করে ফেলব।"
রিভেন ভ্রু কুঁচকে সাইলাসের দিকে তাকাল। পুরো ঘরে তখন এক থমথমে নীরবতা। রিভেন খুব শান্ত কিন্তু ভয়ংকর গলায় বলল,
"Sylas...take your hand off his mouth .right .now"
সাইলাস খুব ধীরে ধীরে হাতটা সরিয়ে নিল, কিন্তু তার চোখেমুখে ধরা পড়ে যাওয়ার এক অদ্ভুত অস্বস্তি। রোজেলিয়া এক কোণে দাঁড়িয়ে মুখ চেপে হাসছে তার বিষয়টি বেশ মজাই লাগছে।
রিভেনের চোখের দৃষ্টি এখন লেজারের মতো তীক্ষ্ণ হয়ে সাইলাসের ওপর স্থির হয়েছে। সাইলাস সাধারণত খুব গম্ভীর আর আত্মবিশ্বাসী থাকে, কিন্তু এই মুহূর্তে সে মেঝেতে পড়ে থাকা কোণে চোখ স্থির রাখার জন্য জায়গা খুঁজতে ব্যস্ত। রিভেন ধীরপায়ে সাইলাসের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
"সাইলাস,"
"এনজো যা বলল তা কি সত্যি? তুমি আর নাইলা?"
সাইলাস একবার ঢোক গিলল। সে জানে রিভেনের কাছে মিথ্যা বলে পার পাওয়া অসম্ভব। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় বলল,
"বস, আপনি যা ভাবছেন ব্যাপারটা ঠিক তেমন নয়। আমরা আসলে... মানে..."
রিভেন তার কথা থামিয়ে দিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসল। তারপর দুই হাত ভাঁজ করে বলল,
"আমি কী ভাবছি সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, আমার নাকের ডগায় বসে আমার বডিগার্ডরা প্রেম করছে আর আমি জানতাম না? সব বলো। একদম শুরু থেকে।"
সাইলাস আমতা আমতা করে শুরু করল,
"বস, ও আমাকে সবসময় জ্বালিয়ে মারত। আমি শুধু ওকে একটু সোজা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কখন যে ঝগড়া করতে করতে..."
মারকো পাশ থেকে টিপ্পনি কাটল,
"বস, এরা তো একে অপরের শত্রু ছিল। কিন্তু ইদানীং দেখছি শত্রুতা সব উড়ে গেছে। কাল রাতেও তো ফোনে সে কী রোমান্টিক থ্রেট!"
রিভেন সাইলাসের দিকে তাকায়,
"ইতালিতে ফিরে গিয়ে যদি দেখি তোমার পারফরম্যান্সে কোনো ঘাটতি হয়েছে এই নাইলার চক্করে, তবে কিন্তু আমি নাইলাকেও রাখব না, তোমাকেও না। এখন বলো, সম্পর্কের কতদূর গড়িয়েছে? এনজো যা বলল, লুকাচ্ছ কেন?"
সাইলাস এবার বেশ বিব্রত হয়ে পড়ল। রোজেলিয়া পাশ থেকে মজা করে বলল,
"আহা রিভেন, আপনিও না! সাইলাস তো লজ্জায় কথা বলতেই পারছে না। সাইলাস, নাইলা কি জানে যে তুমি ওকে এত পছন্দ করো?"
সাইলাস কোনোমতে উত্তর দিল, "জানিনা ম্যাম,
সারাক্ষণ ঝগড়া ছাড়া তার কোনো আবেগই বুঝা যায় না "
রোজেলিয়া অবাক হয়ে বলে ,
"তোমাদের মুখেই এ কথা শুনছি ।নাইলাতো খুবই ভদ্র একটা মেয়ে আমার অনেক খেয়ালও রাখে "
সাইলাস নিজের সাথে ফিসফিস করে,
"ভদ্র মাই ফুট "
রিভেন গম্ভীর মুখে উঠে দাঁড়াল।
"এনজো আর সাইলাস তোমাদের দুজনেরই প্রেমকাহিনী আমি শুনলাম। কিন্তু মনে রেখো, আমাদের লাইফ স্টাইল সাধারণ মানুষের মতো নয়। কোনো মেয়েকে লাইফে জড়ানোর আগে ১০ বার ভাববে"
সাইলাস মাথা নিচু করে বলল,
"জি বস। আমি জানি।"
রিভেন এবার হাতের ইশারায় দরজার দিকে দেখিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
"এখন যাও এখান থেকে ।গেট আউট"
মারকো, এনজো আর সাইলাস—তিনজনই যেন এই আদেশের অপেক্ষায় ছিল। তারা আর এক মুহূর্ত দেরি না করে সুড়সুড় করে ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় মারকো ফিসফিস করে সাইলাসকে একটা খোঁচা দিতে চাইল, কিন্তু সাইলাসের রাগী চাহনি দেখে সে দ্রুত পা চালাল।
ঘরটা এখন শান্ত। রিভেন বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপচাপ বসে রইল।তার নিজের জীবনে রোজেলিয়া আসার পর অনেক কিছু বদলেছে ঠিকই, কিন্তু নিজের বডিগার্ডদের এমন মজনু রূপ দেখাটা তার জন্য বেশ হজম করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রোজেলিয়া ধীরে ধীরে রিভেনের পেছনে এসে দাঁড়াল। সে তার নরম হাত দুটো রিভেনের শক্ত কাঁধের ওপর রাখল ।রিভেনের শরীরের টানটান ভাবটাএকটু শিথিল হয়ে এল।
রোজেলিয়া নিচু স্বরে মুচকি হেসে বলল,
"আপনি অতটা সিরিয়াসলি নিচ্ছেন কেন রিভেন ? দেখুন না মানুষগুলো বাইরে থেকে যতটাই কঠিন হোক না কেন দিনশেষে তো সবারই একটা মনের মানুষ লাগে"
রিভেন কোনো কথা বলল না।
রোজেলিয়া আবার বলল,
"ওদের তো বয়স হচ্ছে তাই না ? আর কতটা বছর বেচারাগুলো এভাবে একা একা দিন কাটাবে ? আপনার মতো একজন জীবণসজ্ঞিনী তো সবারই দরকার "
রিভেন এবার রোজেলিয়ার দিকে তাকাল। সে রোজেলিয়ার হাতটা ধরে নিজের ঠোঁটের কাছে নিয়ে এল এবং আলতো করে চুমু খেল।
"আমি শুধু নিরাপত্তা নিয়ে ভাবছি রোজ"
রিভেন শান্ত গলায় বলল।
"আমাদের জগতে প্রেম মানেই দুর্বলতা ।আমাদের দুর্বলতাগুলো এভাবে শত্রুরা জানতে পারলে তারা সেটা ব্যবহার করতে এক মুহুর্তও দেরি করবে না"
রোজেলিয়া মলিন হাসে,
"ভালোবাসা যদি দুর্বলতা হয় ,তবে সেই ভালোবাসা আবার মানুষকে অসম্ভব সাহসীও করে তোলে রিভেন ।আপনি নিজেই তার প্রমাণ।
ওদেরকেও সুযোগ দিন ।হয়তো এই ভালোবাসা ওদের আরও বেশু শক্তিশালী করে তুলবে "
রিভেন হালকা হাসলো ,
"maybe you are right rose petal .i should give them a chance "
To be continue,,,,