ফন্ট সাইজ:
থিম:
Paradise of sins

২৭তম পর্ব

লেখক: Fariha

#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins) #লেখনিতে_ফারিহা

পর্ব ২৭

(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)

গ্রামের মেঠোপথ। দুপাশে সবুজ ধানখেত বিকেলের মিষ্টি রোদে ঝিলমিল করছে। বাতাসে কাঁচা মাটির ঘ্রাণ আর পাখির কিচিরমিচির। আরশ আজ বেশ ফুরফুরে মেজা‌জে আছে, তাই এনজো আর সাইলাসকে নিয়ে সে গ্রামের অলিগলি দেখাতে বেরিয়েছে।তাকেতো সাধারণ দেখায় যায় না কিন্তু আজকাল এনজো আর সাইলাসকে বেশ সময় দিচ্ছে ।মারকো আজ তাদের সাথে নেই। সে গত কয়েকদিন ধরে রোকসানার এমন সঙ্গ দিচ্ছে যে বাইরে বেরোনোর নামও নেয় না। আসার সময় তাকে অনেক ডাকাডাকি করা হলেও সে সাফ জানিয়ে দিয়েছে তার কুকুরের দৌড়ানি আর কাদায় গোসলের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তির দরকার নেই।

তারা তিনজন ধীরপায়ে হাঁটছিল। আরশ হাত নেড়ে নেড়ে গ্রামের কোন গাছটা কত পুরোনো আর কোন পুকুরে বড় মাছ আছে, তার এক লম্বা ফিরিস্তি দিচ্ছিল। এনজো মাঝেমধ্যে মাথা নেড়ে ‘ইয়েস’, ‘রাইট’ বলে সায় দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সাইলাস যেন এখানে থেকেও নেই। তার শরীরটা এই মেঠোপথে হাঁটলেও মনটা পড়ে আছে কয়েক রাত আগের সেই নির্জন মুহূর্তে।

সেদিন মাঝরাতে সাইলাস যখন একা উঠোনের এক কোণে বসে সিগারেট টানছিল ।যা তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস হঠাৎ নিঃশব্দে রিভেন এসে তার পাশে বসেছিল। সাইলাস অপ্রস্তুত হয়ে সিগারেটটা ফেলে দিতে চাইলে রিভেন ইশারায় তাকে থামিয়ে দেয়। রিভেন নিজেও একটা সিগারেট চাইলে সাইলাস নিজের প্যাকেট থেকে একটা ধরিয়ে দেয় তার বসকে।

বেশ কিছুক্ষণ দুজন নীরবে ধোঁয়া ছাড়ছিল। হঠাৎ রিভেন খুব নিচু আর গম্ভীর স্বরে বলেছিল,

"সাইলাস, নাইলাকে যদি সত্যিই পছন্দ করে থাকো তবে কনফেস করে দেওয়াই ভালো। মাফিয়া ওয়ার্ল্ডে আমাদের জীবন অনিশ্চিত, কাল কী হবে কেউ জানে না। তাই অন্তত নিজের অনুভূতির কাছে সৎ থাকাটা জরুরী"

রিভেনের মতো মানুষের মুখে এমন জীবনবোধের কথা শুনে সাইলাস সেদিন স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। সেই কথাগুলোই এখন তার মাথায় হাতুড়ি পেটাচ্ছে।

"ঐ সাইলাস ভাই, আপনারে কি ভূত ধরছে নাকি?"

আরশের চড়া গলার আওয়াজ আর এনজোর হাতের একটা জোরালো ধাক্কা সাইলাসের কাঁধে এসে পড়তেই তার ধ্যান ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে দেখল তারা একটা জরাজীর্ণ সাকোর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

এনজো হোহো করে হেসে ইংরেজিতে বলল,

"He is in a different world ,arosh!maybe he is dreaming about a certaain someone in italy "

আরশ তার দাঁত বের করে এক গাল হেসে সাইলাসের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলল,

"বুঝছি, সাইলাস ভাইজানের মনে মনে এখন ইতালি ইতালি গান বাজতাছে। তা ভাইজান, শরীরটা এখানে থাকলেও মনটা মনে হয় বিমানে উইড়া সাগর পাড়ি দিয়া সেই আপার কাছে চইলা গেছে, না? ওই যে কী জানি নাম নাইলা না কাইলা?"

সাইলাস বিরক্ত হওয়ার ভান করে বলল,

"ফালতু কথা বন্ধ কর আরশ। রাস্তা দেখা।"

আরশ এক পা এগিয়ে সাকোর ওপর দাঁড়িয়ে মজার ছলে বলল,

"আরে ভাইজান, শরম পাইয়েন না। ভালোবাসা তো আর অপরাধ না। তবে আপনার এই অবস্থা দেইখা আমার নিজের একটা কবিতার কথা মনে পইড়া গেল থাক কমু না । আসেন, আসেন, আর আকাশ-কুসুম ভাইবেন না, নাইলে এই সাকো থেইকা ধপাস কইরা কাদার ভেতরে পড়লে আর আপা আইসা তুলবো না!"

সাঁকোটার আরো সামনে এসে সাইলাস আর এনজো দুজনেই থমকে দাঁড়াল। দুই কঞ্চি বাঁশের ওপর দিয়ে খালের ওপারে যাওয়া যে সম্ভব, সেটা তাদের ইতালীয়ান মস্তিষ্কে আসছিল না।

আরশ হো হো করে হেসে উঠল।

"কী গো ভাইজানরা? বন্দুক ধইরা তো মানুষ সাবাড় করেন, এখন কি এই দুইখান বাঁশ দেইখা কলিজা শুকায়া গেল নাকি? আসেন, আমার হাত ধরেন।"

আরশ মাঝখানে দাঁড়িয়ে একদিকে সাইলাস আর অন্যদিকে এনজোর হাত শক্ত করে ধরল।সাঁকোর ওপর পা দিতেই সেটা মচমচ শব্দ করে দুলে উঠল। এনজো আঁতকে উঠে আরশের কাঁধ খামচে ধরল।

"হোয়াট ইজ দিস, আরশ? ইজ ইট সেফ?"

আরশ দাঁত বের করে বলল,

"আরে লোহালক্কড়ের ব্রিজের থেইকা এইডাতে ভিটামিন বেশি! এর নাম হইলো সাঁকো। বাংলার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক নম্বর নমুনা। পা টিইপা হাঁটেন, নাইলে নিচের কাদা তগোরে সেলাম জানাইবো।"

সাইলাস খুব কষ্টে নিজের ভারসাম্য বজায় রাখলো।সাঁকো পার হয়েই তারা আবার মাটির রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করল। সাইলাস এখনো চুপচাপ, কিন্তু আরশ আপন মনে বকবক করে যাচ্ছে। হঠাৎ এনজোর মনে হলো চারপাশটা খুব চেনা লাগছে।পথের পাশের বাড়িটা ওটা না সেদিন যে সে কুকুরের তাড়া খেয়ে লুকিয়েছিল।এনজো বলেছিলো তার বাড়িটার কথা মনে আছে কিন্তু কিছুদিন আগে সে সাইলাসকে নিয়ে এসে খুজে পায়নি উল্টো তারা পথ হারিয়ে আবারও বিপদে পড়েছিলো । এনজোর বুকটা একটু ধক করে উঠল।সে আনন্দ অনুভব করলো ।খুশিতে সে মাএ কিছু বলতে যাবে তখনি

হঠাৎ আরশ রাস্তার ধারের বাড়ির দিকে আঙুল তুলে দেখাল।

"ওই যে বাড়িটা দেখতাছেন না? ওইটা হইলো আমার ফিউচার শ্বশুরবাড়ি।"

এনজো থমকে দাঁড়াল। তার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। "হোয়াট? ফিউচার শ্বশুরবাড়ি মানে?"

আরশ মাথা চুলকিয়ে বলল,

"মানে এই বাড়ির মাইয়ার লগে আমার বিয়া ঠিক হইয়া আছে। মাইয়া এবার ইন্টার পরীক্ষা দিলেই আমাদের বিয়া ডান। আমার আম্মা আর আব্বা সব পাকাপাকি করে রাখছে।"

এনজোর গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। সে তোতলাতে তোতলাতে জিজ্ঞেস করল,

"এই... এই বাড়িতে কয়টা মেয়ে আছে আরশ?"

আরশ বুক ফুলিয়ে বলল,

"একটাই মাইয়া। একদম চাঁদের মতো সুন্দরী

যেমন সুন্দর চেহারা, তেমন শান্ত স্বভাব। তবে পর্দানশীন মাইয়া, বাইরের মাইনষের সামনে একদম আসে না।পাশের গ্রাম থেইকা সম্বন্ধ আইছিল, কিন্তু হের বাপ রাজি হয় নাই। আমার মতো সৎ আর চটপটে পোলারে কি আর হাতছাড়া করা যায়?"

এনজো স্তব্ধ হয়ে গেল। বাড়ির গেটের সেই কারুকাজ, ওই আঙিনা সব মিলে যাচ্ছে। এই সেই বাড়ি যেখানে সে লুকিয়েছিল, আর ওই যে ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলা মেয়েটা... সে তাহলে আরশের হবু স্ত্রী?

সাইলাস পাশ থেকে আরশের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল," Congratulation arosh"

আরশ হোহো করে হাসতে হাসতে সাইলাসের সাথে মজা করতে লাগল। কিন্তু এনজোর পায়ের তলার মাটি যেন সরে যাচ্ছে। সে যে মেয়েটাকে পরী ভেবে মনে মনে জায়গা দিয়েছিল, সে আসলে তাদের বসের শালার হবু বউ ।

এনজো একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকাল। সে কিছু বলল না। সাইলাস বা আরশ কেউই টের পেল না এনজোর হৃদয়ের এক কোণে এইমাত্র একটা ছোটখাটো ভূমিকম্প হয়ে গেছে। তার পরী এখন আর তার নেই, সে এখন আরশের হবু বউ।

আরশ এক গাল হেসে এনজোর কাঁধে হাত দিয়ে বলল, " ভাইজান, খাড়ায়া রইলেন ক্যান? চলেন, এক্কেরে বাড়ির ভেতরে ঢুইকা বসি। আমার হবু শ্বশুরবাড়ির মানুষগুলা কিন্তু মেলা ভালো। আমারে দেখলেই ওনারা খুশিতে বাকবাকুম হইয়া যায়।"

এনজো যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। যে বাড়ির মেয়ের প্রেমে সে কয়েকদিন ধরে হাবুডুবু খাচ্ছে, সেই বাড়ির ভেতরে গিয়ে এখন সে কীভাবে বসবে? তার ওপর সেই মেয়েটি আবার আরশের হবু বউ এনজোর ভেতরটা তখন ফেটে চৌচির হওয়ার দশা।

সে মাথা নেড়ে দ্রুত বলল,

"No ,no arosh .I'm not going in there. Absolutely not"

আরশ অবাক হয়ে বলল, "ক্যান ভাইজান? ডরান ক্যান?মাইয়াডারে দেখতে পাইবেন না ঠিকই, কারণ সে তো পর্দাশীল, কিন্তু মেহমানদারি তো পাইবেন। এই বাড়ির নারিকেলের পিঠা আর শরবত খাইলে এক্কেবারে কলিজা ঠান্ডা হইয়া যাইবো। চলেন না"

সাইলাস এবার একটু সন্দেহী চোখে এনজোর দিকে তাকাল। সে এনজোর অস্থিরতাটা টের পাচ্ছে, কিন্তু কারণটা বুঝতে পারছে না। সে মজা করে বলল,

"আরে চল না এনজো। আরশ যখন এত করে বলছে চল"

এনজো এবার বেশ রেগে গেল। তার মেজাজ এখন সপ্তমে। সে প্রায় চিৎকার করে বলল,

"I said no ! আমার এখন মাথাব্যথা করছে, বমি বমি লাগছে। আমি এই বাড়ির ধারের কাছেও যাব না।"

আরশ আর সাইলাস এনজোর এই বোমের মতো ফেটে পড়া দেখে চুপ করে তাকিয়ে রইল ।কিন্তু আরশ দমে যাওয়ার পাএ না। সে এনজোর হাত টেনে ধরে বলল,

"আরে চলেন তো! আমি থাকতে ডর নাই। আমি শ্বশুর মশাইরে কমু যে বিদেশি মেহমানগো মাথা ঘুরতাছে, ওনারা একটু জিরানি নিবো।নাইলে বমির ট্যাবলেট থাকলেও দিতে কমু চলেন..."

এনজো এবার আরশের হাতটা ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে দিল। তার চোখের চাউনি মুহূর্তেই বদলে গেল। সে বেশ কড়া সুরে বলল,

"আরশ, জাস্ট স্টপ ইট! এক কথা কতবার বলব? আমার ভালো লাগছে না। আমি এখনই বাড়ি ফিরে যাচ্ছি। তোমাদের ইচ্ছে হলে তোমরা ভেতরে যাও, আমাকে আর জ্বালিও না!"

সাইলাস এনজোর এই অস্বাভাবিক রুদ্রমূর্তি দেখে অবাক হলো। সে শান্ত গলায় বলল,

"ঠিক আছে যেতে হবে না। কিন্তু তুই এত রিয়্যাক্ট করছিস কেন?"

এনজো কোনো উত্তর দিল না। সে হনহন করে বাড়ির উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করল। তার পেছনে বিস্ময় নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল আরশ আর সাইলাস।

আরশ মাথায় হাত দিয়ে বিড়বিড় করে বলল,

"কী হইলো ভাইজানের? এই রোদের তাপে কি বিদেশিটার মগজ ঘুইড়া গেল নাকি?একবার একেকজনের মাথা ঘুইড়া যায় দেখি।মেহমানদারির কথা শুইন্যা কেউ এমন খেপনি খেপে আমি তো জীবনে দেখি নাই"

সাইলাস দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরশের কাঁধে হাত রাখল শান্ত গলায় বললো

"বাদ দে আরশ। ওর হয়তো শরীর খারাপ, চল আমরাও বাড়ি ফিরে যাই।ওর পিছু পিছু যাই, নাহলে একা গিয়ে আবার কোনো গর্তে পড়বে।"

"বিদেশিগো মেজাজ বুঝা বড় দায়! একটু আগেই হাসলো, আর এখন বাঘের মতো গর্জন দিল। হবু শ্বশুরবাড়ির নাস্তাটা মিস হইলো রে ভাইজান!"

পেছনে ফেলে আসা সেই গাছে ঘেরা বাড়িটার দিকে এনজো একবার আড়চোখে তাকাল। তার প্রথম প্রেমটা শুরু হওয়ার আগেই যেন এক বিশাল পাহাড়ের নিচে চাপা পড়ে গেল।

______

উঠোনের কোণে পাটি দিয়ে রোকসানার সাথে চাল ঝাড়তে বসেছে রোজেলিয়া আর মার্কো। রোজেলিয়া খুব মন দিয়ে চাল থেকে কাঁকর বাছছে, কিন্তু তার চোখের কোণে এক ধরণের বিষণ্ণতা। মেঠো বাতাসের সাথে সাথে তার লম্বা চুলগুলো উড়ছে, কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নেই। মার্কো পাশে বসে বারবার কুলা দিয়ে চাল ওড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে।

রোকসানা চালের কুলাটা মার্কোর হাতে ঠিক করে ধরিয়ে দিয়ে বললেন,

"শোনো নাতি, তোমার এই মাথার ঝুঁটি দেখলে আমার কার কথা মনে পড়ে জানো?"

রোকসানার গলার আওয়াজে মার্কো হাতের কাজ থামিয়ে ঘাড় ফেরাল। রোকসানা একগাল হেসে বললেন,

"আমাগো দেশে একজন গায়ক আছিল, নাম তার কী যেন...মনে পড়তাছে না। ঠিক তোমার মতো এমন লম্বা চুল রাখত আর মাথায় ঝুঁটি বাঁধত। আমি তো প্রথম দিন তোমারে দেইখা হের মতো মনে করছিলাম পড়ে আবার তোমার পুতুলের মতো রুপ দেইখা ভাবছিলাম কোনো মাইয়া মানুষ বুঝি জিপ গাড়ি থেইকা নামল!"

মার্কো ভ্রু কুঁচকে তাকালো। সে ভাঙা ভাঙা বাংলায় উত্তর দিল,

"মাই...য়া..মানুষ ?"

রোকসানা নাথা নাড়লো ,

"হ,মানে মেয়ে মানুষ "

"নানি, আই অ্যাম নট 'মেয়ে মানুষ'। ইতালিতে গার্লস... দে লাভ মাই হেয়ার স্টাইল। ইটস ফ্যাশন!"

রোকসানা খিলখিল করে হেসে উঠলেন। মার্কোর গাল টিপে দিয়ে বললেন,

"তগো দেশের ফ্যাশন তো বড়ই আজব! ব্যাটা মানুষের মাথায় ঝুঁটি আবার গায়ে কী জানি আকাআকি করা।"

"ওগুলোকে ট্যাটু বলে grandma "

"এগুলো ট্যাটু প্যাটু আমি বুজিনা "

রোকসানা এবার রোজেলিয়ার দিকে তাকালেন। রোজেলিয়া তখনো চুপচাপ আজ্ঞুল দিয়ে একটা ছোট পাথর সরাচ্ছে। নানি তার থুতনি ধরে মুখটা উঁচিয়ে ধরে বললেন,

"কিরে আমার ফুলের মতো নাতনিটা? তোর মুখখানা আজ এমন আমসত্ত্বের মতো হইয়া আছে ক্যান? কীছু হইছে বুজি?"

রোজেলিয়া একটু জোর করে হেসে বলল,

"কই নাতো কিছু হয় নাই। আমি ঠিক আছি।"

রোকসানা বিশ্বাস করলেন না। তিনি মাথা নেড়ে বললেন,

"আমারে ফাঁকি দিস না। সারা সকাল থেইকা দেখতাছি জামাইর লগে একটা কথাও কইলি না। আমার নাত জামাই বুঝি তরে বকা দিছে? খাড়া, আসুক ওরে আমি লাঠি দিয়া পিটামু!"

রোজেলিয়া লজ্জা পেয়ে নানিকে থামিয়ে দিল,

"আরে না নানু! রিভেন আমাকে বকবে কেন? আমার এমনিতেই একটু শরীরটা ভালো লাগছে না।"

মার্কো রোজেলিয়ার মলিন মুখ দেখে ইশারায় জিজ্ঞেস করল,

"আর ইউ ওকে, ম্যাম?"

রোজেলিয়া শুধু মাথা নেড়ে জানাল সে ঠিক আছে।

ঠিক তখনই আরশ সাইলাস আর এনজো হেঁটে উঠানের দিকে আসলো। তাদের দেখেই নানি চেঁচিয়ে উঠলেন,

"আইছে রে! আমাগো তিন মূর্তি আইছে। তোদের তো সারাদিন দেখাই যায় না। কই থাকোস তোরা?"

আরশ ঘাম মুছতে মুছতে হাসিমুখে বলল,

"আরে নানি, বিদেশি ভাইজানদের নিয়া একটু গ্রাম ঘুরতে গেছিলাম। বাংলার রূপ না দেখলে কি চলে?"

নানি এবার আরশের দিকে ফিরে বললেন,

"গ্রাম পরে দেখাস। আগে তোর এই বইনটারে দেখ। সারাদিন হইলো মাইয়াডার মুখখান শুকায়া রইছে।আমি জিজ্ঞাস করছি কিছু কয়না "

আরশ রোজেলিয়ার সামনে গিয়ে নলে , "নানি, ও এখন রোমের রানী তো, আমাদের এই গরিবের বাড়িতে কি ওনার মন টেকে? দেখছ নানি, মুখটা কেমন প্যাঁচার মতো বানায়া রাখছে!"

রোজেলিয়া আরশকে ধাক্কা দিয়ে বললো, "যা সর তো আরশ! একদম ফাজলামি করবি না।"

এরই মধ্যে মার্কো উঠে দাঁড়িয়ে এনজো আর সাইলাসকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকল। তার গলার স্বর হুট করেই গম্ভীর হয়ে গেল।

"রিভেন বস আমাদের খুঁজছে। ফোন নেসনি কেন তোরা? গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। জলদি চল"

রিভেনের নাম শোনামাত্র এনজো আর সাইলাসের মুখ থেকেও হাসির রেশ উধাও হয়ে গেল। তারা তিনজন দ্রুত পা চালিয়ে বাড়ির ভেতর রিভেনের ঘরের দিকে চলে গেল। উঠোনে এখন শুধু আরশ আর রোজেলিয়া। আরশ ধীরপায়ে এসে রোজেলিয়ার পাশে বসল।

আরশ রোজেলিয়ার দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল,

"সত্যি করে ক তো লিয়াবিইই , রিভেন ভাইজান কি আবার রাগারাগি করছে? জামাইর সাথে কিছু হইছে নাকি?"

রোজেলিয়া মাথা নিচু করে মাথা নেড়ে না করল, কিন্তু আরশ তো দমবার পাত্র নয়। সে রোজেলিয়ার চিবুক ধরে মুখটা ওপরে তুলে বলল,

"আরে বলবি তো! কী হইছে?"

রোজেলিয়া আর ধরে রাখতে পারল না। তার চোখের কোণে টলমল করতে থাকা জল এক ঝটকায় গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। সে খুব অস্ফুট স্বরে, কান্নাভেজা গলায় বলল,

" আমরা আজকে সন্ধ্যায় ইতালিতে ফিরে যাচ্ছি আরশ"

রোকসানা এক কোণে বসে চাল বাছছিলেন, কথাটি কানে যেতেই তার হাতের কুলাটা মাটিতে পড়ে গেল। তিনি থতমত খেয়ে চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে বললেন,

"কী কইলি রোজি? আইজকাই? আইজকাই চইলা যাবি?"

রোজেলিয়া এবার ডুকরে কেঁদে উঠল। সে নানির কোলের কাছে গিয়ে বসল,

"নানু, আমি ওনাকে কত রিকোয়েস্ট করলাম! বললাম আর দুইটা দিন থাকো, তোমার সাথে তো ঠিকমতো কথা পর্যন্ত বলতে পারলাম না। কিন্তু উনি... উনি একদম পাথরের মতো শক্ত। হুট করে এসে বললেন, আজকেই যেতে হবে মানে আজকেই। কোনো কথা শুনলেন না।"

নানিও এবার আঁচলে চোখ মুছতে শুরু করলেন। তিনি বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন,

"হায়রে কপাল ।আসলি আর গেলি ।এই বুড়িডারে দেখার কি আর কেউ থাকল না ।তুই এই জন্যই আজকা সারাদিন এমন মন খারাপ কইরা আসোস ।আগে কইলি না ক্যান আমারে "

"কী করে বলতাম বলো ,ভেবেছিলাম হয়তো রাজি হবে কিন্তু...আমার অনেক খারাপ লাগতেছে নানু "

রোকসানা আর রোজেলিয়া কান্না আরশ এতক্ষণ চুপচাপ দেখছিল।তার নিজের ও খুব খারাপ লাগছে কী বলবে বুঝতে পারছে না । পরিবেশটা কেমন গুমোট হয়ে যাচ্ছে দেখে সে হুট করে একটা হাসি দিয়ে রোজেলিয়ার পিঠে ধপাস করে একটা থাপ্পড় মারল।

"আরে থাম তোরা! বাড়িতে কি শোকসভা চলতাছে নাকি? যাচ্ছিস তো যাচ্ছিস, তোদের তো আর মঙ্গল গ্রহে পাঠায়া দিচ্ছি না। বিমানে উঠবি, ঘুম দিবি, আর ঘুম ভাঙলে দেখবি ইতালি।

নানি আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বিরক্তি নিয়ে বললেন,

"তুই থাম তো পালোয়ান! তোর তো আর কলিজায় মায়া-দয়া নাই। নাতনিডা কত আশা কইরা আইল, আর জামাই এক কথায় ওরে ধইরা নিয়া যাইতাছে।"

আরশ এবার নানির কাছে গিয়ে বসল, আদুরে গলায় বলল,

"নানি গো, বাঘের খাঁচায় থাকলে বাঘের হুকুম তো মানতেই হইবো! রিভেন ভাইজান হইলো রোমের রা.... না মানে কিছু না। লিয়াবিইই তো ওনার জানের টুকরা, ওরে ছাড়া ভাইজান কি এক সেকেন্ড থাকতে পারে? তাই তো লগে লগে নিয়া যাইতেছে।"

রোজেলিয়া কান্নামাখা চোখে আরশের দিকে তাকাল। আরশ তার মাথায় হাত রেখে একটু নরম স্বরে বলল,

"শোন কান্দিস না। ভাইজানের ব্যবসা তো আর আমাদের মতো ছোটখাটো না। নিশ্চয়ই ইতালিতে কোনো বড় ঝামেলা হইছে, নাইলে উনি এভাবে হুট কইরা যাইতেন না। তুই যা, সাবধানে থাকিস। আর পরে কখনো আসার সময় আমার লাইগা ইতালির একটা পারফিউম নিয়া আসিস তো, এই দেশি বডি স্প্রে দিয়া আর কাম হইতাছে না!"

রোজেলিয়া এবার হেসেই ফেলল। আরশের এই ফাজলামিগুলো না থাকলে এই বাড়িটা আজ সত্যিই শ্মশান হয়ে যেত।

_______

বিকেলের আলো ফুরিয়ে সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই পুরো বাড়িতে এক বিষণ্ণ নিস্তব্ধতা নেমে এল। উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে কালো রঙের বড় সেই গাড়িটা।

নানি দুপুর থেকেই চোখের পানি থামাতেই পারছেন না। অস্থির হয়ে এঘর-ওঘর করছেন আর বারবার আলমারি থেকে এটা-ওটা বের করে রোজেলিয়ার ব্যাগে গুঁজে দিচ্ছেন। আরশ একটু আগেই গিয়ে বাজার থেকে নানির ফরমায়েশ করা রুপোর নূপুর জোড়া নিয়ে এসেছে। নানি কয়েকদিন আগেই এটি গড়তে দিয়েছিলেন নাতনির জন্য আজ তার বিদায়বেলায় কাঁপাকাঁপা হাতে সেটা রোজেলিয়ার ব্যাগে ডুকিয়ে দিলেন।

গাড়িতে ওঠার সময় ঘনিয়ে আসতেই পরিবেশটা ভারি হয়ে উঠল। রোজেলিয়া এক এক করে সবাইকে জড়িয়ে ধরছিল, যেন এই ছোঁয়াটুকু সে স্মৃতিতে সারাজীবনের জন্য জমিয়ে রাখতে চায়। তার মামি খাদিজা ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন।

খাদিজা ডুকরে উঠে বললেন,

"আসলি আর চইলা গেলি ।তোর মামা সৌদি থেকে আসার টিকেট পর্যন্ত কাইটা ফেলছে সামনের সপ্তাহেই বাড়িত আইবো আর তুই এখন চইলা যাইতাছোস ।তোরে দেখার লাইগা মানুষটা পাগল হইয়া আছিল "

রোজেলিয়া মামির কথা শুনে আরও খারাপ লাগছে । রিভেনের দিকে সে একবার করুণ চোখে তাকাল, কিন্তু রিভেনের চোয়াল শক্ত।

নানি ডুকরে কেঁদে উঠে রোজেলিয়াকে আবার বুকের মধ্যে টেনে নিলেন। ঝাপসা চোখে নাতনির মুখটা আগলে ধরে বললেন,

"ওরে আমার কলিজার টুকরা নাতিটা, বেশিদিন থাকিস না ঐ দূরে। চোখের পলক ফেলতেই যেন আবার আমনে চইলা আসিস। এই বুড়িটা তোর পথ চাইয়া বইসা থাকবে।"

এরপর নানি রিভেনের দিকে তাকালেন। রিভেনের শক্ত চোয়াল আর গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বললেন,

"ও নাতজামাই, আমার নাতনিটারে লইয়া আবার আইসো"

রিভেন ধীরস্থিরভাবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। তার এই ছোট ইশারাই যেন নানির মনে কিছুটা সান্ত্বনা দিল।

কান্নাভেজা এই থমথমে পরিবেশের মাঝেই নানি হঠাৎ পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা মার্কোর দিকে ইশারা করলেন,

"পরেরবার আসার সময় এই ধলা পুতুলটারেও লগে কইরা নিয়া আসিস "

মুহূর্তের মধ্যেই পুরো উঠোনের বিষণ্ণতায় যেন হাসির ঢেউ খেলে গেল।

গাড়িতে উঠে বসার পর আরশ গাড়ির জানালার কাছে এগিয়ে এল। রোজেলিয়ার বিষণ্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে গভীর মমতায় তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল সে আর মৃদু স্বরে বলল,

"ভালো থাকিস লিয়া-বিই নিজের খেয়াল রাখিস।"

________

" Excuse me ,sir. Would you like some chocolates or anything else from the menu ?"

এয়ার হোস্টেস হাসিমুখে ট্রলি নিয়ে এগিয়ে এলেন। ট্রলিতে সাজানো হরেক রকমের চকোলেট, ড্রিঙ্কস আর স্ন্যাকস।

সাইলাস ঘাড় ফিরিয়ে ট্রলির দিকে একবার তাকাল।

"No ,thanks"

পাশের সিটেই বসা মার্কো। সে কোনো বাছবিচার না করে ট্রলি থেকে একটা ডার্ক চকোলেটের বার তুলে নিল। চকোলেটের মোড়কটা ছিঁড়তে ছিঁড়তে সে একটা লম্বা নিশ্বাস ফেলল।

কিন্তু তাদের উল্টো দিকের সিটে বসা এনজোর অবস্থা একদম ভিন্ন। সে সেই বিমানে ওঠার পর থেকেই পাথরের মতো চুপচাপ। তার চঞ্চল স্বভাবটা যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। সাইলাস অনেকক্ষণ ধরেই এনজোকে পর্যবেক্ষণ করছিল। সে এনজোর দিকে ঝুঁকে এসে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,

"কী হয়েছে এনজো ? শরীর খারাপ ?"

এনজো ভাবলো এবার বলা দরকার যেহেতু এখন এখানে রিভেন নেই সে জানলার বাইরে তাকানো অবস্থাতেই ফিসফিস করে বলল,

"সাইলাস...আরশ আজকে আমাদের যে বাড়িটা দেখিয়েছিল ,মনে আছে? ওটা আসলে কার বাড়ি ছিল জানিস ?"

সাইলাস ভ্রু কুঁচকে তাকাল। এনজো খুব করুণ স্বরে আবার বলল,

"ওটাই সেই বাড়ি সাইলাস ।ওই বাড়িতেই আমি সেই পরীর মতো মেয়েটাকে দেখেছিলাম ।যার প্রেমে আমি পাগল হয়ে গিয়েছিলাম "

সাইলাস সাধারণত খুব একটা বিচলিত হয় না। সে এনজোর কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার শান্ত চোখ দুটিতে এক ধরণের সমবেদনা ফুটে উঠল। সে জানত না এনজোর ভাগ্যের পরিহাসটা এতটা নিষ্ঠুর হবে। সাইলাস দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

"দুর্ভাগ্য এনজো ।কিছু জিনিস হয়তো পাওয়ার জন্য থাকে না থাক ।মেয়েটাতো এমনিতে মুসলিম তাকে ভুলে যাওয়াই তোর জন্য ভালো হবে ।"

মার্কো চকোলেটে একটা বড় কামড় দিয়ে চিবোতে চিবোতে মুখ বাড়াল।

" what happened bro ? তোরা দুইজনে কী নিয়ে এত সিরিয়াসলি ফিসফিস করছিস?"

সাইলাস মার্কোর দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায়

বললো,

"এনজো যে মেয়েটার কথা আমাদেরকে বলেছিল,সে আসলে আরশের হবু বউ ।তার সাথে আরশের বিয়ে ঠিক হয়ে আছে "

মার্কোর চকোলেট চিবানো হুট করে থেমে গেল। সে বড় বড় চোখ করে এনজোর দিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ডের স্তব্ধতার পর মার্কো অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,

"what? আরশের fiance ? এনজো ব্রো ,তুইতো বসের ফ্যামিলিতেই আগুন লাগিয়ে দিতি ।ভাগ্যিস বস এটা জানতে পারেনি ,নাহলে আমাদের সাথে তোকেও কার্গো হোলে পাঠিয়ে দিত "

এনজো কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু তার হেডফোনটা কানে লাগিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল।

To be continue,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন