#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins) #লেখনিতে_ফারিহা
পর্ব ২৮
(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)
"আমার ধৈর্যের প্রতিটি সেকেন্ডের দাম এক মিলিয়ন ইউরো, আর তোরা আমাকে গত ৮ ঘণ্টা ধরে স্রেফ একরাশ কুয়াশা উপহার দিচ্ছিস!"
রিভেনের গলার স্বর কোনো মানুষের নয়, যেন কোনো আদিম হিংস্র জন্তুর গর্জন। রোমের উপকূলে তার ব্যক্তিগত আস্তানার ভূগর্ভস্থ ট'র্চার সেলে বাতাসের প্রতিটি অণু তখন ভয়ের ভারে জমে বরফ হয়ে গেছে। চারদিকে ঝুলে থাকা লোহার শিকলগুলো একে অপরের গায়ে লেগে এক অদ্ভুত অশুভ শব্দ তুলছে। দেওয়ালে তেলের প্রদীপের আলোয় রিভেনের ছায়াটা কোনো দানবের মতো দীর্ঘকায় হয়ে কাঁপছে।
তার পরনের সাদা শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো, যার ওপর এখন ছোপ ছোপ টাটকা লাল র'ক্তের আলপনা। কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে, ঘামে ভেজা চুলগুলো চোখের ওপর এসে পড়ছে। সেই হ্যাজেল চোখের মণি দুটো এখন র'ক্তের মতো লাল উন্মত্ত আর দয়াহীন।
রিভেন এক মুহূর্ত থামল না। সামনে থাকা লোকটার চোয়াল লক্ষ্য করে সে পরপর তিনটি ঘু'ষি চালাল। প্রতিটি আঘাতে হাড় ভা'ঙার মড়মড় শব্দ ঘরের নিস্তব্ধতা চিরে দিচ্ছে। লোকটা আ'র্তনাদ করার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছে, তার মুখ থেকে গলগল করে র'ক্ত বেরিয়ে রিভেনের হাতে লেগে এক পিচ্ছিল আস্তরণ তৈরি করেছে।
"বল! ড্রা'গস আর অ'স্ত্রের ওই কন্টেইনারটা কোথায়? ওই জাহাজের ট্র্যাকার সিগন্যাল কেন গায়েব হলো? কার সাহস হয়েছে আমার মালে হাত দেওয়ার?"
রিভেন লোকটার কলার ধরে তাকে দেয়ালে আ'ছাড় মারল। তারপর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকজন বডিগার্ডের দিকে ঘুরে এক লা'থি মারলো। সে লোকটা ছিটকে গিয়ে লোহার টেবিলের ওপর পড়ল। শত কোটি টাকার সম্পদ ওই জাহাজে অ'স্ত্র, ড্রা'গস, আর দামি দামি সব জিনিস।
সাইলাস ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল। তার হাতে একটা ট্যাবলেট,
"বস, ট্র্যাকার সিগন্যাল পাওয়া গেছে। আমাদের জাহাজটি টাইরেনিয়ান সাগরের মাঝপথে স্থির হয়ে আছে। মনে হচ্ছে কেউ জ্যামার ব্যবহার করেছিল, কিন্তু আমাদের হ্যাকাররা তা ভেদ করতে পেরেছে।"
রিভেনের চোখে এক পা'শবিক বিদ্যুৎ খেলে গেল। সে তার র'ক্তাক্ত হাত দুটো একটা সাদা রুমাল দিয়ে মুছতে মুছতে পৈশাচিক হাসি হাসলো,
"ইয়ট রেডি কর। আমি নিজে যাব ওই অভিশপ্ত জাহাজে। যারা আমার সম্পদে ভাগ বসাতে চায়, তাদের র'ক্ত দিয়ে আজ সমুদ্রের জল লাল হবে।"
এক ঘণ্টা পর। সমুদ্রের বুক চিরে রিভেনের কালো রঙের সুপার ইয়টটি তীরের মতো এগিয়ে চলেছে। উত্তাল ঢেউগুলো যেন রিভেনের রাগের সাথে পাল্লা দিয়ে গর্জন করছে।
রিভেন যখন তার বিশাল মালবাহী জাহাজের ডেকের ওপর পা রাখল চারপাশ তখন স্তব্দ । তার বিশ্বস্ত কিন্তু ব্যর্থ কয়েকজন লোক সেখানে ভয়ে কুঁকড়ে আছে। ডেকজুড়ে বৃষ্টির পানি জমেছে। রিভেন শান্ত পায়ে এগিয়ে গেল। তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন মৃত্যুদূতের পদধ্বনি।
সে ড্রাকোর কলারটা মুঠোয় ধরে তাকে নিজের মুখের খুব কাছে নিয়ে এল। রিভেনের উত্তপ্ত নিঃশ্বাস ড্রাকোর কানে গরম সি'সার মতো বিঁধছে।
"তোকে এই জাহাজের পাহারায় রেখেছিলাম কারণ ভেবেছিলাম তুই কুকুর হিসেবে বিশ্বস্ত। কিন্তু তুই তো দেখছি নেকড়েদের সাথে মিলে আমার মাং'সই ছিঁ'ড়তে চেয়েছিস।"
রিভেন তার কোমরের হোলস্টার থেকে রুপালি রঙের রি'ভলভারটা বের করল। বন্দুকের নলের ঠান্ডা স্পর্শ ড্রাকোর কপালে লাগতেই সে থরথর করে কাঁপতে লাগল।রিভেনের চোখের মণি দুটো অন্ধকারের মাঝেও জ্বলছে ঠিক যেন এক ক্ষু'ধার্ত নেকড়ের দৃষ্টি।
"জানিস ড্রাকো, বিশ্বাসঘাতকতার স্বাদটা অনেকটা এই সমুদ্রের পানির মতো। শুরুতে নোনা, কিন্তু গিলতে গেলে ক'লিজা পু'ড়িয়ে দেয়।"
রিভেনের কণ্ঠস্বর ফিসফিসানি হলেও তা বাতাসের গর্জন ছাপিয়ে ড্রাকোর কানে গরম সি'সার মতো বিঁধল। ড্রাকো তখন থরথর করে কাঁপছে, তার গাল বেয়ে মিশে যাচ্ছে বৃষ্টি আর চোখের জল।
"ব... বস... আমার কথাটা একবার শুনুন ... আমি জানতাম না ওরা"
"চুপ!"
"সুযোগ মৃত'দেহদের দেওয়া হয় না। আর তুই তো আট ঘণ্টা আগেই ম'রে গেছিস, যখন আমার কন্টেইনারের সিগন্যাল গায়েব হয়েছিল।"
ঠিক তখনই জাহাজের অ্যালার্মটা কান ফাটানো শব্দে বেজে উঠল। সাইলাস ডেক দিয়ে দৌড়ে এল, তার হাতে একটা অটোমেটিক রা'ইফেল।
সে অন্ধকারের দিকে ইশারা করে চেঁচিয়ে বলল,
"বস! ঘড়িয়ালরা হানা দিয়েছে! দুই নটিক্যাল মাইল দূরে লিওর স্পিডবোট দেখা যাচ্ছে। ওরা জাহাজটা ঘিরে ফেলার চেষ্টা করছে"
রিভেনের ঠোঁটের কোণে এক পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠল। সে ড্রাকোর কপাল থেকে ব'ন্দুকটা সরাল না, বরং আরও জোরে চেপে ধরল।
"লিও? ওই ধূর্ত শিয়ালটা তবে গর্ত থেকে বের হয়েছে? ভালো... খুব ভালো। আজ সমুদ্রের মাছগুলো রাজভোগ পাবে"
হঠাৎ একটা জোরালো সার্চলাইটের আলো সরাসরি রিভেনের মুখে এসে পড়ল। সে চোখ না নামিয়ে ব'ন্দুকের ট্রি'গারটা টিপে দিল।
একটিমাত্র গু'লিতে ড্রাকোর নি'থর দেহটা ডেকের ওপর আছাড় খেয়ে পড়ল। রক্তের একটা গাঢ় স্রোত বৃষ্টির জলের সাথে মিশে সমুদ্রের অতল গহ্বরে নামতে শুরু করল। রিভেন নিস্পৃহভাবে তার বন্দুকের নল থেকে বের হওয়া ধোঁয়াটা দেখল, যেন সে মাত্র একটা মশা মেরেছে।
সে এবার সাইলাসের দিকে ঘুরে তাকাল। তার চোখের সেই লাল আভা এখন আরও গাঢ়।
"সাইলাস, সব কটা লাইট নিভিয়ে দাও। আমি চাই ওরা অন্ধকারেই আমাদের কাছে আসুক। বাঘ যখন শিকার করে, তখন সে শব্দ করে না। আমরা আজ ওদের স্বাগত জানাব কারুসো স্টাইলে।আর আমি এদিকটা দেখছি তোমরা পিছনের দিকে যাও ব্যাকআপ লাগলে তখন আসবে "
জাহাজের সব আলো একে একে নিভে গেল। পুরো টাইরেনিয়ান সাগর এখন এক আদিম অন্ধকার চাদরে ঢাকা। কেবল ঢেউয়ের আছাড় আর রিভেনের ভারী নিশ্বাসের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। রিভেন অন্ধকারের ভেতরেই তার কোমরের ছু'রিটা বের করল সে ডেকের এক কোণে, ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে।
তার পরনের সাদা শার্ট এখন ঘাম আর বৃষ্টির জলে ভেজা। সে অন্ধকারের সাথে কথা বলতে জানে। তার নিশ্বাস এতটাই ধীর যে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো মানুষের পক্ষেও বোঝা সম্ভব নয় যে সেখানে ইতালির সবথেকে ভয়ংকর দানবটি ওত পেতে আছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই জাহাজের পেছনের দিক থেকে হুক লাগানোর একটা ধাতব শব্দ হলো লিওর লোকেরা দড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করেছে। প্রথমজন যখনই ডেকের ওপর পা রাখল, অন্ধকার থেকে একজোড়া জ্ব'লজ্যান্ত লাল চোখ তার ওপর স্থির হলো। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই রিভেনের শান্ত হিমশীতল কণ্ঠস্বর তার কানের কাছে ফিসফিস করে উঠল,
"পিছনে তাকা ,মা'দারফা'কার "
পরক্ষণেই রিভেনের হাতের ছু'রিটা তার গলার শ্বা'সনালি চিরে একপাশে বেরিয়ে গেল। কোনো চিৎকার বেরোতে পারল না, শুধু একটা ঘড়ঘড়ে শব্দ আর উষ্ণ র'ক্তের ফিনকি রিভেনের মুখে এসে লাগল। রিভেন শার্টের হাতা দিয়ে সেই রক্ত মুছে ফেলল ।
"এক... আর বাকি আটজন।"
এরপর শুরু হলো এক তাণ্ডব। রিভেন অন্ধকারের ভেতর দিয়ে যেন কোনো অদৃশ্য ছায়া হয়ে আবির্ভূত হচ্ছে আর মিলিয়ে যাচ্ছে। এভাবে কয়েকজনের র'ক্তের বন্যা বসলো।হঠাৎ একটা টর্চের আলো রিভেনের অবস্থান শনাক্ত করল।
"There he is ! F'ire!"
মুহূর্তেই সাইরেনের মতো গুলির শব্দে কেঁপে উঠল পুরো জাহাজ। কন্টেইনারের গায়ে গু'লির ধাক্কায় আ'গুনের ফুলকি ঠিকরে বেরোচ্ছে। কিন্তু রিভেন সেখানে নেই। সে এক লাফে পাশের লোহার রেলিঙের আড়ালে চলে গেছে। কিন্তু লিওর লোকগুলো এবার এলোপাথাড়ি গু'লি চালানো শুরু করেছে। হঠাৎ একটি তপ্ত বু'লেট রিভেনের ডান হাতের বাহু চি'রে বে'রিয়ে গেল।
রিভেন দাঁত দিয়ে নিজের নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরল। উন্মাদের মতো এক তীব্র যন্ত্রণা তার স্নায়ুতে ছড়িয়ে পড়ল। ডান হাতটা মুহূর্তের জন্য অবশ হয়ে এল, হাতের ছুরিটা ঝনঝন করে মেঝের ওপর পড়ে গেল। কিন্তু রিভেনের চোখের মণি তখন ব্যথায় নয় বরং প্রতিহিংসায় আরও বেশি র'ক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে। সে তার বাম হাত দিয়ে দ্রুত ডান হাতের ক্ষ'তটা একবার চেপে ধরল ।উষ্ণ র'ক্ত আঙুলের ফাঁক দিয়ে চু'ইয়ে পড়ছে।
সে এক অ'মানুষিক আর্তনাদ চেপে রেখে বাঁ হাতেই তার বেল্টে গোঁজা অ'টোমেটিক গা'নটা বের করল। ব্যথা তাকে থামিয়ে দেয়নি বরং তাকে আরও হিংস্র করে তুলেছে। সে হুট করে জাহাজের ফ্লাডলাইট জ্বালিয়ে দিল। তীব্র আলোয় লিওর লোকরা চোখ ধাঁ'ধিয়ে থমকে দাঁড়াল। সেই মুহূর্তেই রিভেনের হাতের গা'নটা গর্জে উঠল।
র'ক্তে ভেজা শরীর আর বিদ্ধ বাহু নিয়েই সে একেকটা কন্টেইনারের আড়াল থেকে বের হচ্ছে আর নির্ভুল নিশানায় মা'থার খু'লি উ'ড়িয়ে দিচ্ছে।
"তোরা কী সত্যিই ভেবেছিলি রিভেন আরওয়াইনকে এক গু'লিতেই থামিয়ে দিবি? এই র'ক্তই তো আমার জ্বালানি।আজ আমি এই কন্টেইনারগুলো ব্যবহার করে তোদের লা'শ পো'ড়াবো "
সাইলাস ,এনজো ,লরেঞ্জো আর বাকি সবাই ম'রণখেলায় যোগ দিলো ।ভা'ঙা হাড়ের ম'ড়মড় শব্দ, মাং'স কাটার বি'শ্রী আওয়াজ আর ম'রণ চিৎকার মিলে এক না'রকীয় কনসার্ট চলছে। রিভেন একজনের ঘা'ড় মটকে দিয়ে তাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করল। বৃষ্টির মতো গু'লি এসে বিঁধছে সেই লা'শের পিঠে, আর রিভেন সেই লা'শের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে বাকিদের খু'লি উ'ড়িয়ে দিচ্ছে।
এর মাঝেই লিওর দেখা মিলল। সে কন্টেইনারের ওপাশে দাঁড়িয়ে কাঁপাকাঁপা হাতে রি'লোড করছিল। রিভেন ধীরপায়ে তার দিকে এগিয়ে গেল। আগুনের সেই র'ক্তিম আলোয় রিভেনকে দেখাচ্ছে কোনো উন্মাদ শিকারীর মতো।
"লিও... তোর সাহসের তারিফ করতে হয়। তোর জীবনের দাম এখন এক ইউরোও না। তুই জানিস আমার নীতি কী? আমি চোরকে সাজা দেই না তাকে ইতিহাস থেকে মুছে দেই।"
রিভেন লিওর হাত থেকে বন্দুকটা কেড়ে নিয়ে এক ঝটকায় দূরে ফেলে দিল তার বাম হাতের তীব্র ব্যথাকে উপেক্ষা করে সে লিওর পায়ের মাঝখানে স'জোরে লা'থি মারলো ।লিও ব্যথায় চিৎকার করে বসে গেল । রিভেন শান্তভাবে একটা স্নাই'পার রাই'ফেল তুলে নিল। সমুদ্রের দুলুনি, বাতাসের গতি সবকিছু তার নখদর্পণে।
" ইতালির জমিনের চেয়ে সমুদ্রের তলা তোকে বেশি মানাবে।"
রিভেনের ঠোঁটের কোণে এক পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠল। সে স্না'ইপার রাই'ফেলটা লিওর চিবুকের নিচে চেপে ধরল। রিভেনের ডান হাতের ক্ষত থেকে তখনো টপ টপ করে র'ক্ত ঝরছে, সাদা শার্টের হাতা লা'ল হয়ে ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। তীব্র যন্ত্রণায় তার স্নায়ুগুলো ছিঁড়ে যাচ্ছে, কিন্তু রিভেনের চোখে তখনো সেই হিমশীতল নির্লিপ্ততা।
"চিৎকার কর লিও! তোর এই গোঙানিটা আমার কানের কাছে চেইস অ্যাটলা'ন্টিকের গানের মতো লাগবে"
প্রথম বু'লেটটা লিওর ডান হাঁটু চি'রে বে'রিয়ে গেল। লিও য'ন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠে এক অ'মানুষিক চিৎকার দিল, যা সমুদ্রের বাতাসের গর্জনে হারিয়ে গেল। রিভেন থামল না। সে রাই'ফেলের নলটা এবার লিওর অন্য কাঁধে ঠেকাল।দ্বিতীয় বু'লেট। লিওর শরীরটা ডেকের ওপর আ'ছাড় খেয়ে পড়ল। রিভেনের নিজের হাতের ক্ষ'ত থেকেও এখন ফিনকি দিয়ে র'ক্ত বেরোচ্ছে। তার শরীর কাঁপছে, কিন্তু সেই কম্পন ভয়ের নয়, বরং এক উন্মত্ত উ'ত্তেজনার। সে রাই'ফেলের বাট দিয়ে লিওর থেঁত'লে যাওয়া মুখে সজোরে একটা আ'ঘাত করল।শেষ বু'লেটটা লিওর বুক চিরে ও'পাশে বে'রিয়ে গেল। লিওর দেহটা নি'থর হয়ে পড়ল।
রিভেন রাই'ফেলটা পাশে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হাঁপাতে লাগল। তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে, অতিরিক্ত র'ক্তক্ষ'রণে শরীরটা এবার হার মানতে চাইছে।
কয়েক মুহূর্তেই সাইলাস আর এনজো বাকি লোকগুলোকে খতম করে রিভেনের দিকে দৌড়ে এল। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে লিওর লোকেদের নিথর দেহ। মার্কো ডেকের ওপর দিয়ে হেঁটে আসতে আসতে নিজের ব'ন্দুকটা হোলস্টারে ভরল। সে দেখল দূরে লিওর ব্যাকআপ বোটগুলো দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে।
মার্কো রিভেনের কাছে আসতেই তার নজর পড়ল রিভেনের ডান হাতের দিকে। রিভেনের সাদা শার্টটা এখন প্রায় পুরোটাই র'ক্তে জবুথবু।
"বস! আপনার হাত!"
মার্কো আ'র্তনাদ করে উঠল। সে দ্রুত নিজের পকেট থেকে একটা কালো রুমাল বের করে রিভেনের বাহুতে শক্ত করে বাঁধতে গেল।
রিভেন দাঁতে দাঁত চেপে গালি দিয়ে উঠল,
"stop this f*cking drama।সামান্য বুলেটের আঁচড় মাএ ।জাহাজ ঘুরাতে বলো ।রোমে পৌঁছানোর আগে যেন এই আবর্জনাগুলো পরিষ্কার করা হয় । ক্ষু'ধার্ত হা'জ্ঞরদেকে আজ পেট ভরে খাবার দাও "
মার্কো শক্ত করে গিট দিতে দিতে বলল,
" ওকে বস করছি কিন্তু এটা সামান্য আঘাত না বস, প্রচুর ব্লি'ডিং হচ্ছে। এনজোকে বলছি মেডিকেল কিট নিয়ে আসতে। আপনি জাস্ট বসুন এখানে।"
রিভেন এক মুহূর্তের জন্য মার্কোর দিকে তাকাল। তার চোখ দুটো এখনো লাল, কিন্তু আগের মতো সেই উন্মাদনা নেই। সে নিজের অবশ হয়ে যাওয়া হাতটার দিকে তাকিয়ে একটা ম্লান কিন্তু ক্রূর হাসি হাসল।
এনজো দ্রুত ফাস্ট-এইড বক্স নিয়ে এল।এনজো যখন তার বাহুতে শক্ত করে ব্যান্ডেজ বাঁধছিল
রিভেন দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করল। আগুনের লে'লিহান শিখা তখনো জাহাজের এক প্রান্তে জ্বলছে, যার ছায়া সাগরের কালো জলে র'ক্তিম আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে।
______
মিলান শহরের বুক চিরে আজ অঝোরে বৃষ্টি নামছে। জানলার কাঁচের ওপাশে বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন এক একটা ছোট ছোট তীরের মতো আছাড় খাচ্ছে। রোজেলিয়া তার বিশাল শয়নকক্ষে অস্থিরভাবে পায়চারি করছে। বাংলাদেশ থেকে ফেরার সেই দীর্ঘ পথজুড়ে যে অভিমানের দেয়াল সে তুলেছিল, তা এখন তার নিজের বুকের ভেতরটাকেই ভারি করে তুলছে। পুরো বিমানে সে রিভেনের সাথে একটা কথাও বলেনি, এমনকি চোখের দিকেও তাকায়নি। সে ভেবেছিল রিভেন হয়তো তাকে মানানোর চেষ্টা করবে, কিন্তু সে যেন আরও এক ধাপ এগিয়ে।
সে রোজেলিয়াকে পাত্তা দেওয়া তো দূর, বরং নিজের কাজ আর ফোন কল নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিল যে রোজেলিয়ার অস্তিত্বই যেন তার কাছে গৌণ হয়ে গেছে।
রোজেলিয়ার বুক চি'রে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। সে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরের বাগানে পাইন গাছগুলো বৃষ্টির ঝাপটায় দুলছে। তার খুব ইচ্ছে করছিল ওই বৃষ্টিতে গিয়ে ভিজতে, কিন্তু শরীরটা সায় দিচ্ছে না। হালকা জ্বরের ভাব, সাথে সর্দি এই অবস্থায় বৃষ্টিতে ভেজা মানে নিজের বিপদ ডেকে আনা।
নিজের ওপরই তার প্রচণ্ড বিরক্তি লাগছে।
"কেন আমি ওনার জন্য অপেক্ষা করছি? ওনি তো দিব্যি আছে নিজেকে নিয়ে!"
সে বিড়বিড় করে বলল।
মনকে শান্ত করতে সে ম্যানশনের বিশাল লাইব্রেরিতে গেল। হাজার হাজার বইয়ের গন্ধ তাকে সবসময় টানে। কিন্তু আজ শেলফ থেকে একটা মোটা বই নামিয়ে কয়েক পাতা উল্টাতেই তার মনে হলো অক্ষরগুলো যেন ঝাপসা হয়ে আসছে। কোনো শব্দই তার মগজে ঢুকছে না। তার অবচেতন মন বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে ,কখন সেই চেনা শক্ত বুটের আওয়াজ শোনা যাবে? কখন সেই দামি পারফিউমের সাথে গন্ধটা নাকে আসবে?
আজ তিনটা দিন সে রিভেনকে দেখেনি আর এই তিনদিনে যেন একাকিত্ব তাকে চেপে ধরেছে ।রিভেনকে মিস করছে সে ।ভীষন মিস করছে ।
সে বইটা ধপ করে টেবিলের ওপর রাখল।তার আজ কিছুই ভালে লাগছে না।সে লাইব্রেরি থেকে ফিরে এসে একবার মেহেরিনের ঘরের দিকে উঁকি দিল। সেখানে স্তব্ধতা মেহেরিন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।নাইলা আর আভাসহ বাকিরাও কাজ শেষে চলে গেছে ।এই সময়টা সাধারণ আভা থাকতো কিন্তু তার আজ বিশেষ প্রয়োজনে সে কোথাও গিয়েছে ।তাই ম্যানশনের এই বিশালতা আজ তাকে গিলতে আসছে।
একাকীত্ব যখন অসহ্য হয়ে উঠল, সে ধীরপায়ে বেডরুমে ডুকে রিভেনের পার্সোনাল ড্রেসিং রুমে গিয়ে ঢুকল।একপাশে সব রিভেনের জিনিস রাখা আর আরেকপাশে রোজেলিয়ার ।
রিভেনের সেকশনটা একদম পরিপাটি। শেলফে সাজানো বিশ্বের দামী সব সুগন্ধি।Roja parfums এর সেই রাজকীয় বোতল,Clive christian No.1 আর creed aventusএর ভিড়ে রোজেলিয়ার হাতটা গিয়ে থামল রিভেনের সবথেকে প্রিয় সুগন্ধিটির ওপর Tom ford tuscan leather।
সে বোতলটা হাতে নিল। এই গন্ধটা রিভেনের ব্যক্তিত্বের মতোই উগ্র আর পুরুষালি। রোজেলিয়া আলতো করে নিজের কবজিতে সামান্য একটু স্প্রে করল। চোখ বন্ধ করে ঘ্রাণটা নিতেই তার মনে হলো রিভেন যেন ঠিক তার কাছেই দাঁড়িয়ে আছে। তার অবচেতন মন ড্রেসিং রুমের আয়নায় রিভেনের সেই তীক্ষ্ণ চাহনিটা খুঁজল, কিন্তু সেখানে কেবল তার নিজের ম্লান প্রতিচ্ছবি ছাড়া আর কেউ নেই।
সে আবার নিজের ঘরে ফিরে এলো আর জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। হঠাৎ নিচতলার প্রশস্ত আঙিনায় কয়েকটা গাড়ির হেডলাইটের আলো বৃষ্টির ঝাপটা চিরে তার চোখে পড়ল। জানলা দিয়ে নিচে তাকাতেই তার বুকটা ধক করে উঠল। কালো রঙের বিশাল ল্যান্ড রোভারটা গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকছে। বৃষ্টির শব্দের জন্য সে ইঞ্জিনের গর্জন শুনতে পায়নি।
রোজেলিয়ার হার্টবিট এক লাফে বেড়ে গেল। তিন দিন পর সেই মানুষটা ফিরছে, যার জন্য সে প্রতিটা মুহূর্ত অপেক্ষা করেছে। কিন্তু পরক্ষণেই তার অভিমান আবার জেগে উঠল। সে দ্রুত জানলা থেকে সরে এসে বিছানার মাঝখানে গিয়ে বসল।সাইড টেবিল থেকে একটা বই হাতে নিয়ে পড়ার ভান করল।
সে নিজেকে শাসন করল না, এবার সে একদমই সহজ হবে না। সে দেখাবে রিভেন আসুক বা না আসুক, তার কিছু যায় আসে না। কিন্তু তার হাত কাঁপছে, আর কান দুটো খাড়া হয়ে আছে সিঁড়িতে সেই চেনা শক্ত বুটের আওয়াজ শোনার জন্য।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সিঁড়িতে সেই পরিচিত ভারী বুটের আওয়াজ শোনা গেল, কিন্তু আজ শব্দটা কেমন যেন অনিয়মিত অদ্ভুত এক ক্লান্তিতে ঘষটে ঘষটে এগোচ্ছে। রোজেলিয়া বিছানায় বসে বইয়ের পাতায় চোখ নিবন্ধ রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, কিন্তু তার হৃৎপিণ্ডটা বুকের খাঁচায় যেন ড্রাম পেটাচ্ছে।দরজাটা খুব ধীরে খুলে গেল।
রোজেলিয়া মুখ তুলল না। সে স্থির করে রেখেছে রিভেন নিজে এসে কথা না বলা পর্যন্ত সে এক চুলও নড়বে না। কিন্তু ঘরজুড়ে হুট করেই এক তীব্র বিষণ্ণতা আর সেই চিরচেনা Tom ford tuscan leather এর সাথে থাকা অদ্ভুত কিছু গন্ধ আর ওষুধের কড়া গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল।
নীরবতা যখন অসহ্য হয়ে উঠল, রোজেলিয়া আড়চোখে দরজার দিকে তাকাল। আর তাকাতেই তার হাতের বইটা অজান্তেই মেঝেতে পড়ে গেল।
দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রিভেন ।
তার সেই দর্পিত অবয়ব আজ বিধ্বস্ত। ধবধবে সাদা শার্টটা এখন কুঁচকানো, সেখানে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের কালচে মানচিত্র। কিন্তু রোজেলিয়ার দৃষ্টি আটকে গেল তার ডান হাতের ওপর। কনুই থেকে কবজি পর্যন্ত পুরু সাদা ব্যান্ডেজে মোড়ানো, যার ভেতর থেকে র'ক্তিম আভা এখনো উঁকি দিচ্ছে ।রিভেনের মুখ কাগজের মতো ফ্যাকাশে, চোখের নিচে কালচে ছায়া।
রিভেন এক মুহূর্ত রোজেলিয়ার দিকে চেয়ে রইল। তার সেই তীক্ষ্ণ, আধিপত্য বিস্তারকারী চাহনি আজ একদম শান্ত, কেবল সীমাহীন ক্লান্তি সেখানে বাসা বেঁধেছে। সে কোনো কথা বলল না, শুধু একটা লম্বা নিশ্বাস ফেলে টলমল পায়ে হেঁটে ঘরের কোণে রাখা সোফাটার ওপর ধপাস করে বসে পড়ল। তার মাথাটা সোফার পেছনে হেলে পড়ল, চোখ দুটো বুজে এল ক্লান্তিতে।
রোজেলিয়ার এতক্ষণের জমানো সব অভিমান, সব রাগ যেন এক মুহূর্তের তুড়িতে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। তার বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠল। সে বিছানা থেকে নেমে দ্রুত পায়ে রিভেনের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
"রিভেন... আপনার হাত... কী হয়েছে.. কী করে হলো এসব?"
রোজেলিয়ার কণ্ঠস্বর কাঁপছে।রিভেন চোখ খুলল না। তার শুকনো ঠোঁট দুটো সামান্য নড়ল,
"কিছু না রোজ পেটাল। জাস্ট... জাস্ট অ্যা ব্যাড ডে অ্যাট দ্য সি। আমাকে একটু একা থাকতে দাও।"
রোজেলিয়া রিভেনের পাশে বসল। তার হাত দুটো দিয়ে খুব সাবধানে রিভেনের সেই ব্যান্ডেজ করা হাতটা স্পর্শ করল। রিভেন যন্ত্রণায় সামান্য কুঁকড়ে উঠলেও চোখ খুলল না।
রোজেলিয়া কাঁপা গলায় বলল,
"তিন দিন... তিন দিন ধরে আপনি কোথায় ছিলেন? আর এই অবস্থায় কেন ফিরেছেন? কেন আমাকে একবারও জানালেন না?"
রিভেন এবার ধীরে ধীরে চোখ খুলল। তার হ্যাজেল চোখের মণি দুটো রোজেলিয়ার মুখের ওপর স্থির হলো। সে তার বাঁ হাতটা বাড়িয়ে রোজেলিয়ার গালে খুব আলতো করে স্পর্শ করল। তার আঙুলগুলো বরফের মতো ঠান্ডা।
"অভিমান করেছিলে না?"
রিভেনের ঠোঁটে এক বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠল।
"পুরোটা পথ কথা বলোনি। আমি ভাবলাম, তোমার চোখের সামনে থেকে সরে গেলেই হয়তো তুমি শান্তিতে থাকবে। কিন্তু দেখো, শান্তি আমার কপালে নেই।"
রোজেলিয়া শিশুদের মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলো। তার কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো রিভেনের র'ক্তাক্ত ব্যান্ডেজটার ওপর দিয়ে মেঘের মতো ভেসে বেড়াতে চাইল, কিন্তু ছোঁয়ার সাহস পেল না। রিভেনের এই বি'ধ্বস্ত রূপ সে কখনো কল্পনাও করেনি যে মানুষটা ইতালির আন্ডারওয়ার্ল্ডের ভাগ্য নির্ধারণ করে, সে আজ নিজের ক্ষত নিয়ে তার সামনে ধুঁকছে।
রিভেন এক অ'মানুষিক যন্ত্রণাকে দাঁতে দাঁত চেপে গিলে ফেলল। তার হ্যাজেল চোখের মণি দুটো ক্লান্তিতে আধবোজা। রোজেলিয়ার কান্নার শব্দটা তার বুকের ভেতর কোনো ধারালো ছোরার চেয়েও বেশি ক্ষ'ত তৈরি করছে। সে তার সুস্থ বাম হাতটা কাঁপতে কাঁপতে বাড়িয়ে দিল এবং রোজেলিয়ার রেশমি চুলের ভেতরে আঙুল ডুবিয়ে তার মাথাটা নিজের চওড়া বুকের কাছে টেনে নিল।
"কাঁদছ কেন, রোজ পেটাল? কিছু হয়নি আমার আমি ঠিক আছি "
রোজেলিয়া তার মুখটা রিভেনের শার্টের ওপর গুঁজে দিল। শার্টের কাপড়ে লেগে থাকা শুকনো র'ক্তের ঘ্রাণ আর রিভেনের শরীরের উত্তাপ তাকে এক অদ্ভুত উন্মাদনায় আচ্ছন্ন করল। সে ডুকরে উঠে বলল,
" আপনি খুব খারাপ ।একবারও আমার কথা চিনতা করলেন না ? একবারও ভাবলেন না আপনাকে এই অবস্থায় দেখতে আমার কেমন লাগবে? কেন আমাকে এই যন্ত্রণা দিচ্ছেন ?"
রিভেন তার চিবুকটা রোজেলিয়ার মাথায় রাখল। শার্টের ভেতর দিয়ে রোজেলিয়ার উষ্ণ চোখের জল রিভেনের তপ্ত চামড়ায় গিয়ে বিঁধছে। রিভেনের মনে হলো, এই মুহূর্তের যন্ত্রণা তার বাহুর বুলেটের ক্ষতের চেয়েও অনেক বেশি তীব্র, অনেক বেশি সুন্দর । সে অন্ধকারের মাঝেও এক চিলতে নিষ্ঠুর হাসি হাসল।
"আমার জীবনটাতো যন্ত্রণায় নরক হয়ে গেছে, রোজ পেটাল । আর সেই নরকের একমাত্র প্রার্থনা ছিলে তুমি। সমুদ্রে যখন বুলেটের বৃষ্টি হচ্ছিল, যখন বৃষ্টির নোনা জল আর রক্ত এক হয়ে যাচ্ছিল, তখন আমার চোখের সামনে কেবল তোমার ওই অভিমানী মুখটা ভেসে উঠছিল।তোমার জন্যই ফিরে এসেছি ,আজ তুমি না থাকলে হয়তো সমুদ্রের জলে নিজেকে বিলীন করে দিতাম"
রোজেলিয়া আরও জোরে তাকে জড়িয়ে ধরল। রিভেনের শক্ত পেশিগুলো এখন ক্লান্তিতে শিথিল হয়ে আসছে, কিন্তু তার আলিঙ্গন যেন এক লোহার শেকল। রোজেলিয়া অনুভব করতে পারল রিভেনের হৃদপিণ্ডের ধকধকানি প্রতিটি স্পন্দন যেন বলছে সে কেবল রোজেলিয়ার ।
ঘরের কোণে রাখা ছায়াগুলো যেন দীর্ঘতর হচ্ছে। রিভেনের শরীরের ঘাম আর র'ক্তের গন্ধ রোজেলিয়ার অস্তিত্বকে গ্রাস করে নিচ্ছে। এই অন্ধকার ঘরে, বৃষ্টির গর্জনের মাঝে, তারা দুজন যেন এক ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা শেষ দুটি প্রাণী। ভয়, ভালোবাসা আর নিষ্ঠুরতার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণে তৈরি এই মুহূর্তটি রোজেলিয়ার মনে আজীবনের জন্য এক র'ক্তাক্ত ক্ষত হয়ে বসে গেল।রিভেন ফিসফিস করে বলল,
"মেরে ফেলো আমাকে তোমার এই মায়া দিয়ে, রোজ। লিওর বুলেট যা পারেনি, তোমার এই নীরব কান্না তা করে দিচ্ছে। আই অ্যাম ব্লিডিং... নট জাস্ট ফ্রম মাই আর্ম, বাট ফ্রম মাই সোল।"
রোজেলিয়া রিভেনের বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে কেবলই কাঁদতে থাকল, আর রিভেন তার র'ক্তাক্ত হাতটাকে দিয়ে রোজেলিয়াকে আঁকড়ে ধরে রইল।
________
দরজায় একেরপর এক টোকা পড়ছে আরো
কয়েকবার টোকা দিতেই ভেতর থেকে দরজাটা খুলে গেল। সামনে নাইলা তার পরনে ঘরোয়া পোশাক চুলগুলো হালকা এলোমেলো।
সাইলাস দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়াল। তার লেদার জ্যাকেটটা বৃষ্টিতে ভিজে চপচপে হয়ে আছে, চুল থেকে জল চুইয়ে পড়ছে গাল বেয়ে। সে খুব শান্ত কিন্তু গভীর চোখে নায়লার দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
"হাই।"
নাইলা নিজের এক জোড়া ভুরু কুঁচকে অদ্ভুতভাবে চোখ ঘোড়ালো,
"হাই ছাড়া কি আর কিছু পারো না তুমি? কত বড় মাফিয়া বডিগার্ড, অথচ একটা কথা শুরু করার মতো বুদ্ধিও মাথায় নেই। কী অদ্ভুত!"
সাইলাস এবার একটু হাসল। সেই ম্লান কিন্তু তৃপ্তির হাসি। সে ভেজা জ্যাকেটটা শরীর থেকে কিছুটা আলগা করে নাইলার দিকে এক পা এগিয়ে এল। সে নাইলার চোখের দিকে তাকিয়ে একদম ফিসফিস করে বলল,
"এতদিন পরে ফিরলাম। অন্তত একটা welcome home বা কেমন আছো এসব কি তোমার অভিধানে নেই? নাকি সেই জ্যাকের সাথে ছবি তোলার পর থেকে আমার জন্য সব মায়া একদম মুছে ফেলেছ?"
নাইলার বুকটা মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল। সাইলাসের গলার সেই ভেজা স্বরে এক ধরণের অধিকারবোধ ছিল, যা উপেক্ষা করা কঠিন। কিন্তু সে তো আর সহজে হার মানবে না। সে দরজার পাল্লাটা শক্ত করে ধরে বিদ্রূপের সুরে বলল,
"মায়া?তোমার মতো একজন সাইকো আর এসহোল এর জন্য মায়া দেখানোর সময় আমার নেই। আর জ্যাকের কথা তুলবে না তো! তুমি নিজেই তো বলেছিলে আমি একটা ঝগড়াটে মেশিন। তো, এই মেশিনের কাছে কীসের আপ্যায়ন আশা করছো?"
সাইলাস হঠাৎ নায়লার একদম কাছে এসে বলে,
"ঝগড়াটে মেশিন হও আর যাই হও এই ঝগড়া শোনার জন্যই বোধহয় মাঝসমুদ্রে বুলেটের শব্দের মাঝেও আমার কান দুটো নিশপিশ করছিল। এবার কি একটু ভেতরে আসতে দেবে, নাকি এই আমার নিউমোনিয়া হওয়া পর্যন্ত দরজায় দাড়িয়ে লেকচার দিবে?"
সাইলাস যখন ঘরের ভেতরে এক পা বাড়াল, নাইলা অমনি হাত দিয়ে বাধা দিয়ে রুখে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে কৃত্রিম বিরক্তির ছাপ। সে গাল ফুলিয়ে বলল,
"না, একদম না! তোমার কি নিজের ঘরবাড়ি নেই? এই ভিজে একাকার শরীর নিয়ে আমার ঘরে ঢুকে পড়ার মানে কী? যাও, নিজের ঘরে যাও"
সাইলাস স্তিরভাবে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকলো তারপর সে ধীরপায়ে এগোতে লাগল।
"আরেহ..কী..কী করছো?"
নাইলা অপ্রস্তুত হয়ে দু-পা পিছিয়ে গেল। সাইলাসের শরীর থেকে আসা বৃষ্টির ঠান্ডা আমেজ আর সেই কড়া পারফিউমের ঘ্রাণ নাইলার নিশ্বাস আটকে দিচ্ছে।নাইলা আরও পেছাতে গিয়ে একসময় দেয়ালের সাথে ঠেকে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে সাইলাস তার একটা ভেজা হাত নাইলার মাথার পাশে দেয়ালে রাখল। নাইলা এখন পুরোপুরি তার বাহুবন্দি। সাইলাসের গায়ের বৃষ্টির ফোঁটা টুপ করে নাইলার কাঁধে পড়ল, কিন্তু নাইলা নড়ার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে।
সাইলাস তার ভেজা কপালটা নাইলার খুব কাছে নিয়ে এল। নাইলা দেওয়ালের সাথে মিশে গিয়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। সাইলাসের শরীর থেকে চুইয়ে পড়া বৃষ্টির জল এখন নাইলার গলার খাঁজে গিয়ে পড়ছে, যা তাকে এক অদ্ভুত শিহরণ দিচ্ছে।
সাইলাস নাইলার কানের লতি ছুঁয়ে অতি মৃদু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
"Tranquila, mi pequeña fiera..."
শব্দগুলো যেন কোনো জাদুমন্ত্রের মতো নাইলার কানে বাজল।অজানা এক ভাষার সেই গম্ভীর আর গভীর টান শুনে নাইলার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। সে আমতা আমতা করে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,
"কী... কী বললে ওটা? কী ভাষা এটা?"
সাইলাস একটু সরে এসে নাইলার চোখের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে পৈশাচিক হাসি। সে তার ভিজে আঙুল দিয়ে নাইলার চিবুকটা সামান্য উঁচিয়ে ধরল।
নাইলা আবার অস্থির হয়ে প্রশ্ন করল,
"অই! মি পিকী যেন বললে? ওটার মানে কী? কোনো গা'লি দিলে নাকি আবার?"
সাইলাস একটা গভীর শ্বাস নিয়ে গম্ভীর হওয়ার ভান করল। সে তার সেই চিরচেনা রুক্ষ মেজাজটা ফিরিয়ে এনে বলল,
"গা'লিই তো। স্প্যানিশ ভাষায় ওটার মানে হলো 'এক আস্ত ঝগড়াটে মেশিন'। তোমার জন্য এর চেয়ে ভালো বিশেষণ আর মাথায় এল না।"
নাইলা রাগে ফুঁসে উঠল। সে সাইলাসের ভেজা বুকে এক ধাক্কা দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল।
"আমি জানতাম! তুমি একটা আস্ত অভদ্র! এত দিন পর ফিরে এসেও সেই অপমান? যাও, বেরিয়ে যাও আমার ঘর থেকে!"
সাইলাস কিন্তু নড়ল না। সে হালকা হেসে নাইলার রাগী মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল।সে আস্তে করে বললো,
"Mi pequeña fiera"এর প্রকৃত অর্থ হলো "আমার ছোট্ট বাঘিনী"
সাইলাসের কথা শুনে নাইলার গলার কাছে শব্দরা দলা পাকিয়ে গেল। 'আমার ছোট্ট বাঘিনী'এই সম্বোধনটা সাইলাসের রুক্ষ ঠোঁটে যেন এক নিষিদ্ধ কবিতার মতো শোনাল।
নাইলা নিজের হৃদস্পন্দন আড়াল করার চেষ্টা করে বিড়বিড় করে বলল,
"তুমি... তুমি কি ড্রাঙ্ক? নাকি সাগরে কোনো জলপরীর পাল্লায় পড়ে মাথাটা বিগড়ে গেছে?"
সাইলাস এবার আর দূরত্ব রাখল না। সে তার নিজের ভেজা কপালটা আলতো করে নাইলার কপালে ঠেকাল। বৃষ্টির শীতলতা আর দুজনের শরীরের উষ্ণতা মিলে এক অদ্ভুত বিদ্যুৎ বয়ে গেল নিস্তব্ধ ঘরটায়। সাইলাস চোখ বুজে খুব মৃদু স্বরে বলল,
"জলপরী দেখার সময় কোথায় নাইলা? আমার সামনেই তো এক আস্ত ঝগড়াটে পরি দাঁড়িয়ে আছে, যে গত এক সপ্তাহ ধরে আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছে।"
নাইলার নিশ্বাস ভারী হয়ে এল। সে কাঁপাকাঁপা হাতে সাইলাসের ভেজা জ্যাকেটটা খামচে ধরে অস্ফুট স্বরে বলল,
"পাগল হয়ে গেছো তুমি...পাগল লোক কোথাকার!"
সাইলাস এক মুহূর্ত থামল তারপর উম্মাদনা মেশানো গলায় বলল,
"পাগল তো করেই ছেড়েছ।এখন বলো, তোয়ালেটা কোথায়? নাকি এই ভেজা শরীরেই তোমাকে জাপটে ধরে শান্ত হব? "
নাইলা এবার সত্যিই ঘাবড়ে গেল। সাইলাসের এই অপ্রতিরোধ্য রূপ সে আগে কখনও দেখেনি। সে সাইলাসের বুকে একটা দুর্বল ধাক্কা দিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
"অসভ্য! একদম কাছে আসবে না! আমি... আমি তোয়ালে আনছি। খবরদার, এক ইঞ্চিও নড়বে না ওখান থেকে!"
নাইলা টালমাটাল পায়ে বাথরুমের দিকে প্রায় দৌড়ে পালাল। আয়নায় নিজের মুখটা দেখে সে চমকে উঠল লজ্জায় আর উত্তেজনায় তার গাল দুটো আপেলের মতো লাল হয়ে আছে। ওদিকে ঘরের দরজায় হেলান দিয়ে সাইলাস একটা তৃপ্তির হাসি দিল।
To be continue ,,,,,