#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins) #লেখনিতে_ফারিহা
পর্ব ২৯
(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)
"লিও অনেক আগে থেকেই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল মম। তাই আমি ওকে ওর প্রাপ্য জায়গায় পাঠিয়ে দিয়েছি"
মেহেরিন রিভেনের ব্যান্ডেজের দিকে একবার তাকিয়ে অত্যন্ত শীতল স্বরে বললেন,
"তাই বলে তুমি বাকিদের সরিয়ে দিয়ে একা লড়াই করবে? এই মিথ্যে বীরত্ব দেখানোর কোনো মানে হয় না রিভেন"
রিভেন একটু ঝুঁকে এসে তার মায়ের হাতে হাত রাখলো,
"Mom seriously i didn’t fight alone সাইলাসসহ বাকি সবাই সাথে ছিল-"
"আমি মার্কোর কাছ থেকে সব শুনেছি রিভেন। সে আমাকে সব বলেছে। আমার সামনে মিথ্যে বলার ধৃষ্টতা অন্তত কোরো না।"
রিভেনের চোয়াল এবার সত্যিই শক্ত হয়ে গেল। সে নিচের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
"ফাকিং মার্কো..."
"ওকে গালি দিয়ে লাভ নেই। আমার ছেলের শরীরের প্রতিটা ক্ষতের হিসাব রাখার অধিকার অন্তত আমার আছে। মার্কো অন্তত অন্যদের মতো না সে সবসময় সত্যিটা বলে"
রিভেন চুপ করে রইল। সে চোয়াল শক্ত করে জানলার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। মেহেরিন আবার বলে উঠলেন, তার স্বরে এবার মিশে আছে এক অদ্ভুত ভারী বিষণ্ণতা,
"আমার কথা না হয় নাই ভাবো, অন্তত এটা মাথায় রেখো তোমার এখন একটা ঘর আছে, একটা স্ত্রী আছে। আগের মতো পাগলামি সব বন্ধ করো রিভেন"
মেহেরিনের চোখের সামনে ভেসে উঠল রিভেনের সেই দিনগুলো। রিভেন চিরকালই এমন একগুঁয়ে, উদ্ধত আর মৃত্যুর সাথে জুয়া খেলতে অভ্যস্ত। ছোটবেলায় যখন সে একবার জেদ করে পাহাড়ের কিনারা দিয়ে বাইক চালিয়েছিল, সেদিন মেহেরিন তাকে কঠোরভাবে প্রমিজ করিয়েছিলেন এমন যেন কখনো আর না হয়। কিন্তু আজ এত মাস পর আবারও রিভেনকে এই রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে মেহেরিনের ভেতরের সেই মা সত্তাটা হাহাকার করে উঠল।
মেহেরিন যতই গম্ভীর হোন না কেন, রিভেন তো তার নাড়িছেঁড়া ধন। একজন মা কী করে তার সন্তানের শরীরের এই কাটাছেঁড়া আর রক্তের দাগ সহ্য করবে? মেহেরিনের চোখের সেই বরফ শীতল চাউনিটা হঠাৎ মুহূর্তেই গলে নরম হয়ে গেল। এক ফোঁটা অশ্রু তার চোখের কোণে টলমল করছে, যা তিনি পরম যত্নে আড়াল করার চেষ্টা করলেন।
তিনি খুব ধীরে রিভেনের সেই হাতটা নিজের দুই হাতের তুলে নিলেন। হাতের স্পর্শে রিভেন
একটু অপ্রস্তুত হয়ে উঠলল । সে মাথা নিচু করে মেহেরিনের দিকে তাকাল। মেহেরিনের গলার স্বর এবার একদম ভেঙে এল,
"তুমি ছাড়া আমার আর কে আছে রিভেন? তোমার জন্যই তো বেঁচে আছি। দুই সন্তানকে হারানোর পর, নিজের স্বামী আর পরিবার-পরিজন সব হারানোর পর আমি শুধু তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে নিজেকে পাথরের মতো শক্ত করেছি। আজ যদি তোমার কিছু হয়ে যায় বাবা, তবে এই অন্ধকার সাম্রাজ্য দিয়ে আমি কী করব? কার জন্য এই রক্তপাত? তুমি যদি এমন করে নিজেকে বিপদে ফেলো, তবে আমার কী হবে বলতে পারো?"
রিভেনের পাথরের মতো হৃদয়ে যেন কোনো বড় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত লাগল। সে দেখল তার মায়ের হাত দুটো কাঁপছে। মেহেরিনের সেই রাজকীয় অহংকার আজ এক চরম আর্তনাদে বিলীন হয়ে গেছে। রিভেন তার বাম হাত দিয়ে মায়ের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল।
সে খুব নিচু স্বরে বলল,
"আই অ্যাম সরি মম। আমি... আমি জাস্ট ডার্কনেসকে কন্ট্রোল করতে গিয়ে নিজেই তাতে ডুবে যাই।"
রুমের ভিতর এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
মেহেরিন এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন।তিনি রিভেনের হাতটা আলতো করে ছেড়ে দিয়ে শান্ত স্বরে বললেন,
"আর যেন এমন না হয় ,এখন ঘরে যাও "
রিভেন বিছানার পাশ থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। সে দরজার দিকে যাওয়ার সময় মেহেরিন আবার তাকে ডাকলো সে ফিরতেই ,
মেহেরিন খুব নিচু স্বরে বলে
"পরশু দিন ১১ই মার্চ ।প্রতিবার এই দিনটি কাছাকাছি আসলেই তুমি উন্মাদের মতো আচরণ করো"
রিভেন কোনো কথা বলল না, কেবল দ্রুত পা চালিয়ে করিডোর দিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। মেহেরিন সেদিকে তাকিয়ে রইলেন।
________
রিভেন ধীরপায়ে ঘরে ঢুকে বিছানার এক কোণে ধপ করে বসল। তার শরীরটা যেন আজ সীসার মতো ভারী হয়ে গেছে।
ঘরের অন্য প্রান্তে রোজেলিয়া ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে ভেজা চুল শুকোচ্ছিল। রিভেন চোখ বুজে একবার লম্বা নিশ্বাস নিয়ে খসখসে গলায় বলল,
"অসহ্য লাগছে। গোসল করব।"
"তো করুন গোসল, কে বাধা দিচ্ছে?"
রিভেন এবার চোখ খুলে সোজা রোজেলিয়ার দিকে তাকাল,
"কাছে আসো। শার্টটা খুলে দাও।"
রোজেলিয়া হেয়ার ড্রায়ারের সুইচ অফ করে সেটা ড্রয়ারের ওপর রাখল। ঘরটা হঠাৎ নিঝুম হয়ে গেল। সে ধীরপায়ে রিভেনের দিকে এগিয়ে এল। বিছানায় রিভেনের একদম গা ঘেঁষে বসল সে। রিভেনের শরীরের উত্তাপ রোজেলিয়ার ত্বকে আগুনের হলকার মতো লাগছে। সে মাথা নিচু করে খুব মনোযোগ দিয়ে রিভেনের শার্টের ওপরের বোতামটা খোলা শুরু করল।
রিভেনের দৃষ্টি তখন স্থির হয়ে আছে রোজেলিয়ার মুখের ওপর। সে যেন রোজেলিয়ার প্রতিটি চোখের পলক, তার ঠোঁটের সূক্ষ্ম কম্পন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। রোজেলিয়া অস্বস্তিতে কুঁকড়ে যাচ্ছিল, তার আঙুলগুলো শার্টের বোতামে আটকে যাচ্ছে বারবার। রিভেনের সেই তীব্র চাউনি যেন তাকে নগ্ন করে দিচ্ছে।
সে মুখ না তুলেই চাপা স্বরে বলল,
"আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকবেন না।"
রিভেন এক মুহূর্ত থামল না। সে আরও একটু ঝুঁকে এল রোজেলিয়ার দিকে। তার উত্তপ্ত নিশ্বাস রোজেলিয়ার গালে এসে বিঁধছে। রিভেনের বাম হাতটা আলতো করে রোজেলিয়ার চিবুক স্পর্শ করল, তার আঙুলগুলো রোজেলিয়ার নরম চামড়ায় এক শিহরণ জাগিয়ে তুলল।
"তাকাব না? নিজের সম্পত্তির দিকে তাকিয়ে থাকা কি এখন অপরাধ রোজ পেটাল?"
রোজেলিয়া মুহূর্তের জন্য রিভেনের চোখের দিকে তাকাল। তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল, নিশ্বাস আটকে এল। সে দ্রুত চোখ নামিয়ে আবার বোতাম খোলার কাজে মন দিল, যদিও তার আঙুলগুলো এখন থরথর করে কাঁপছে।
রিভেন পৈশাচিক হাসি দিল। সে রোজেলিয়ার কানের খুব কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"আমাকে এইভাবে সামনাসামনি দেখলে নিজেকে সামলানো সত্যিই কঠিন হয়ে যায়, তাই না? অবশ্য তোমায় দোষ দেব না। আমার এই 'হ'ট বডি' আর 'সি'ক্স প্যাক অ্যা'বস' দেখলে যেকোনো মেয়েরাই কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলতো তারপর আমাকে সিডস করার কী যে বৃথা চেষ্টা করতো"
রিভেনের কথায় রোজেলিয়ার আঙুলগুলো স্তব্ধ হয়ে গেল। তার ভেতরে হুট করে এক তীব্র ঈর্ষার ঢেউ খেলে গেল,
"কী বললেন? তার মানে আপনি মেয়েদের সামনে অমনি উলঙ্গ হয়ে হয়ে ঘুরতেন? ক্লাবের নাচনেওয়ালিদের সামনে এভাবেই নিজের শরীর প্রদর্শন করে বেড়াতেন বুঝি?"
রিভেন এবার আরও একটু এগিয়ে এল, তার ঠোঁটের কোণের সেই বাঁকা হাসিটা এখন আরও গভীর। সে রোজেলিয়ার কোমরে তার বাম হাতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের দিকে টেনে নিল।
"কেন? তোমার কি মনে হয় রিভেন আরওয়াইন সবার সামনে সস্তা প্রদর্শনী করে বেড়ায়?"
রিভেন তার নাকটা রোজেলিয়ার নাকের সাথে ঘষতে ঘষতে বলল, "আমার সবটুকু দেখার অধিকার আমি শুধু একজনকে দিয়েছি। কিন্তু সে তো দেখি বোতাম খুলতে গিয়েই ভয়ে নীল হয়ে যাচ্ছে। এখন বলো, হিংসায় কি কলিজা পুড়ে যাচ্ছে, নাকি আমি অন্য মেয়েদের নাম নিতে শুরু করব?"
রোজেলিয়া রাগে গজগজ করতে করতে রিভেনের বুকে এক ধাক্কা দিল, কিন্তু রিভেনের লোহার মতো শক্ত শরীর এক চুলও নড়ল না। সে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
"খবরদার! ওইসব সস্তা মেয়েদের নাম আমার সামনে নেবেন না"
রোজেলিয়া দ্রুত শার্টের শেষ বোতামটা খুলে রিভেনের পেশিবহুল কাঁধ থেকে শার্টটা আলতো করে নামিয়ে দিল। রিভেনের সুগঠিত প্রশস্ত বুক আর সেই সি'ক্স প্যাক অ্যা'বস এখন রোজেলিয়ার চোখের সামনে উন্মুক্ত।সে রিভেনের উদোম শরীর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে কিছুটা কঠোর স্বরে বলল,
"হয়ে গেছে। যান এখন গোসলে।"
রিভেন বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। তার দীর্ঘ শরীরটা রোজেলিয়ার একদম সামনে এক পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে। সে হঠাৎ রোজেলিয়ার কোমরে তার বাম হাতটা পেঁচিয়ে ধরে নিজের শরীরের সাথে লেপ্টে নিল। রিভেনের শরীরের উত্তাপ আর সেই কড়া পারফিউমের গন্ধ রোজেলিয়াকে প্রায় মাতাল করে দিচ্ছে। রিভেন চোখের ইশারায় বাথরুমের দরজাটা দেখিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
"হ্যাঁ, চলো যাওয়া যাক।"
রোজেলিয়া হকচকিয়ে গিয়ে রিভেনের বুকের ওপর হাত রেখে তাকে ঠেলতে চাইল। তার চোখ বড় বড় হয়ে গেল বিস্ময়ে। সে তোতলাতে তোতলাতে বলল,
"মা... মানে? চলো মানে কী? আমি কেন যাব?"
"কেন রোজ পেটাল? তোমার কি মনে হয় আমি এখন এই অবস্থায় একা একা গোসল করতে পারব?"
রোজেলিয়া নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার একটা দুর্বল চেষ্টা করে বলল,
"পারবেন না কেন? হাত পা তো খোলামেলাই আছে। তাছাড়া আমি এই একটু আগেই গোসল করে এসেছি। আমার আর ভেজার শখ নেই।"
রিভেন এবার তার আহত ডান হাতটা রোজেলিয়ার চোখের সামনে তুলে ধরল। সাদা ব্যান্ডেজটার উপর একটু লালচে হয়ে আছে, যা দেখে রোজেলিয়ার বুকের ভেতরটা মুহূর্তেই মোচড় দিয়ে উঠল। রিভেন তার সেই চিরচেনা গম্ভীর আর বিষণ্ণ গলায় বলল,
"রোজ পেটাল, আমার হাতের অবস্থা দেখেছ? এই জখম নিয়ে আমি একা সাবান ঘষব নাকি ব্যান্ডেজ বাঁচাব? তোমার কি একটুও মায়া হচ্ছে না আমার ওপর?"
রোজেলিয়া রিভেনের সেই করুণ কিন্তু ধূর্ত চোখের দিকে তাকিয়ে দমে গেল। কিন্তু সে-ও সহজে হার মানার পাত্রী নয়। সে অভিমানী স্বরে ঝংকার দিয়ে উঠল,
"মায়া দেখিয়েই তো আজ আমার এই দশা! কেন? আপনার ওই আলিশান বাথরুমে অত বড় ঝরনা আছে না? ঝরনার নিচে গিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবেন। পানি নিজ দায়িত্বে এসে আপনার শরীর পরিষ্কার করে দিয়ে যাবে।আপনার এত বড় সাম্রাজ্য, পানিও বোধহয় আপনার হুকুম তামিল করতে বাধ্য তো আমাকে নিয়ে টানাটানি করছেন কেন?"
রিভেন এবার শব্দ করে হোহো করে হেসে উঠল সেই হাসি যা এই কয়েক দিনের গুমোট পরিবেশটাকে এক নিমেষে ভেঙে দিল।
"পানি হয়তো হুকুম তামিল করবে, কিন্তু আমার শরীরের এই আগুন নেভানোর ক্ষমতা পানির নেই রোজ। ওটা করার অধিকার আর ক্ষমতা দুটোই কেবল তোমার।"
রোজেলিয়া লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সে রিভেনের বুকের ওপর রাখা হাত দিয়ে তাকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার বৃথা চেষ্টা করে বলল,
"অসভ্যতা করবেন না! আমি আসছি না আপনার সাথে। আপনার এই 'হট বডি'র যত্ন আপনি নিজেই নিন।"
সে যখন রিভেনের পাথরের মতো শক্ত বুকটাতে ধাক্কা দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইল, তখন অসাবধানতাবশত তার হাতের তালুটা রিভেনের ডান বাহুর ক্ষতের ওপর গিয়ে পড়ল। রিভেনের গলার ভেতর দিয়ে এক যন্ত্রণাদায়ক শব্দ বেরিয়ে এল, তার ভ্রু দুটো কুঁচকে গেল।
রোজেলিয়া মুহূর্তেই স্থির হয়ে গেল। তার রাগী চেহারাটা ভয়ে আর অপরাধবোধে সাদা হয়ে উঠল। সে কাঁপাকাঁপা গলায় আর্তনাদ করে উঠল,
"ওহ গড! সরি... আমি একদম ইচ্ছে করে করিনি! খুব কি লেগেছে? কোথায়... কোথায় ব্যথা লাগছে আপনার?"
রিভেন এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তার কপালে ব্যথার সূক্ষ্ম ভাঁজ থাকলেও চোখের দৃষ্টিতে এখন এক আদিম সম্মোহন। সে রোজেলিয়ার নরম হাতটা খপ করে ধরে ফেলল এবং নিজের বাহু থেকে সরিয়ে সেটা সরাসরি তার প্রশস্ত বুকের বাম পাশে ঠিক হৃদপিণ্ডের ওপর চেপে ধরল।
সে রোজেলিয়ার চোখের অতলে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল,
"ব্যথাটা বাহুতে নয় রোজ পেটাল... এখানে। ঠিক এখানটায় খুব ব্যথা করছে"
রোজেলিয়ার দুশ্চিন্তা মুহূর্তেই ফিকে হয়ে এল। সে রিভেনের বুকের ধকপকানি নিজের হাতের তালুতে অনুভব করতে পারল। রিভেনের ওই নাটকীয় ঢং দেখে সে ঠোঁট উল্টে দমে যাওয়ার ভান করে বলল,
"হ্যাঁ, জানি তো! ওখানকার ব্যথা সারানোর ওষুধ আমার কাছে নেই। ওটা বোধহয় আপনার ওই ইতালিয়ান ক্লাবগুলোর কোনো ললনার কাছে গচ্ছিত রাখা আছে, তাদের ডাকুন!"
রিভেন এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে রোজেলিয়ার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে ঝটকা দিয়ে নিজের শরীরের সাথে পিষে ফেলল। রোজেলিয়ার নরম শরীর রিভেনের পাথরের মতো শক্ত বুকের সাথে লেপ্টে গেল। বাতাসের প্রতিটি অণু এখন কেবল তাদের দুজনের উত্তপ্ত নিশ্বাসে ভারী হয়ে উঠছে। রিভেন রোজেলিয়ার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল, তার আঙুলের ডগা রোজেলিয়ার ঠোঁটের কিনারা ছুঁয়ে যাচ্ছে।
"ক্লাবের ললনারা কেবল শরীর চেনে রোজ পেটাল, কিন্তু এই হৃদপিণ্ডের হুকুম শোনার সাহস কেবল তোমার আছে,"
রিভেন ফিসফিস করে বলল। তার কণ্ঠস্বর এখন এক গভীর নেশার মতো রোজেলিয়ার কানে বাজছে। সে আরও একটু ঝুঁকে এল। তাদের ঠোঁটের দূরত্ব এখন সামান্য। রিভেনের মুখের গরম নিঃশ্বাস রোজেলিয়ার গালে লাগছে সে নিজের অজান্তেই চোখ বন্ধ করে ফেলল, তার দীর্ঘ চোখের পাপড়িগুলো কাঁপছে। রিভেনের ঠোঁট যখন রোজেলিয়ার ঠোঁট স্পর্শ করে তখন দুজনের দেহে শিহরণ অনুভুতি হয় ।কিন্তু
ঠিক সেই মুহূর্তেই এক বজ্রপাতের মতো দরজায় ভারী শব্দ হলো।
ইভানো কারুসো সরাসরি ঘরে ঢুকে পড়লেন। মিলানের অন্ধকার জগতের একসময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী এই সম্রাট আজ এক বাবার দুশ্চিন্তা নিয়ে ঘরে ঢুকে থমকে দাঁড়ালেন। তার সামনে উন্মুক্ত বক্ষে রিভেন, আর তার বাহুবন্দি অবস্থায় আধবোজা চোখে রোজেলিয়া।
বিস্ফোরক এক নিস্তব্ধতা নেমে এল ঘরে।
রোজেলিয়া তাকে দেখেই এক ঝটকায় রিভেনকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। তার গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে, হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে সে দ্রুত ঠোঁট মুছে নিজের ওড়নাটা ঠিক করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সে কোনো রকম দৌড়ে ইভানোর পাশ দিয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল।
রিভেনের মেজাজ মুহূর্তেই সপ্তমে চড়ে গেল। তার চোখের সেই রোমান্টিক আভা এখন হিংস্র অগ্নিপিণ্ডে পরিণত হয়েছে। সে ঝড়ের বেগে ঘুরে দাঁড়াল। তার পেশিবহুল শরীরটা রাগে কাঁপছে আর তার বাবাকে দেখে রাগ আরো বেড়ে গেল। সে দাঁতে দাঁত চেপে গর্জনের মতো নিচু স্বরে বলল,
"কারও বেডরুমে ঢোকার আগে যে নক করে ঢুকতে হয় ,সেই সামান্য শিষ্টাচারটুকুও কি তোমাট ওই বুড়ো মগজ থেকে ডিলিট হয়ে
গেছে ?
এভানো রিভেনের এই উদ্ধত ব্যবহার আর ছেলের এই অবস্থা দেখে এক মুহূর্তের জন্য থতমত খেলেন। যদিও রিভেনের সাথে তার সম্পর্কটা সাপে-নেউলে, কিন্তু রিভেনের আহতের খবর শুনে তিনি নিজের গাম্ভীর্য ধরে রাখতে পারেননি।
এভানো তার অস্বস্তিকে কর্কশ গলায় বললেন,
"Mind your tongue, Riven! আমি এখানে তোমার রোমান্টিক ডিনারে ডিস্টার্ব করতে আসিনি। শুনলাম আমার ছেলে আবার Silly Heroism দেখাতে গিয়ে নিজের রক্ত ঝরিয়েছে, তাই তোমার জখম দেখতে এলাম"
রিভেন তার বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে আগুন ঝরছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
"আমার জখম আমি বুঝে নেব। তোমাকে এখানে কে ডেকেছে? Get out of my room, right now!"
ইভানো এক বক্র হাসি হাসলেন। তিনি রিভেনের আহত বাহুটার দিকে ইশারা করে বললেন,
"Don't show me this attitude.নিজের হাতের অবস্থা দেখেছ? লিওকে শাস্তি দেয়া যেত কিন্তু মে'রে ফেলার কী দরকার ছিল? কাউন্সিলর অলরেডি এই নিয়ে শোরগোল শুরু করেছে। লিওর লোকগুলো হাই কোর্টে কাদা ছোড়াছুড়ি করছে। আমি নিজে পার্সোনালি বিষয়গুলো ম্যানেজ না করলে কাল সকালেই তোমাকে ইন্টারোগেশনের জন্য ডেকে পাঠাত।"
রিভেন এক পা এগিয়ে গেল। তার ঠোঁটের কোণে এক পাশবিক অবজ্ঞা। সে হিসহিস করে বলল,
"Ohh oh f'uck ,Am i afraid of them i mean কাউন্সিলর বা তার আদালত কী রিভেন আরওয়াইনের কিছু করতে পারবে? আমার বিচার আমি নিজেই করি। তোমার এই তথাকথিত ম্যানেজ করার দয়া আমার প্রয়োজন নেই। কথা শেষ হলে এবার বেরিয়ে যাও।"
"আমি তোমার বাবা রিভেন, তোমার শত্রু নই।"
রিভেন এবার হোহো করে এক অমানুষিক হাসি হাসল। সেই হাসিতে মিশে আছে তিক্ততা। সে তার বাবার একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অত্যন্ত শীতল স্বরে বলল,
"You better Get out before I lose my mind!Dad"
শেষের শব্দটা রিভেন ব্যজ্ঞ করে উচ্চারণ করলো
ইভানো আর একটি শব্দও উচ্চারণ না করে ঘুরে দাঁড়ালেন। তার গাম্ভীর্যপূর্ণ প্রস্থানটুকুও যেন এক দীর্ঘশ্বাসের মতো শোনাল।
__________
বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি হচ্ছিল । নাইলা আজ সারাদিন কাজের চাপে নিজের ভেতরে এক অদ্ভুত ক্লান্তি অনুভব করছিল।হালকা বৃষ্টিতে সে আনমনে মাথার ওপর ছাতাটা ধরে দ্রুতপায়ে গেট পেরিয়ে ভেতরের বাগানের দিকে আসছিল।
তার মনের ভেতর তখনো সাইলাসের সেই রাতের কণ্ঠস্বরটা প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল "Mi pequeña fiera"। সেই রাতের পর আজ ৪-৫ দিন হয়ে গেল, সাইলাসকে একবারও দেখা যায়নি।
নাইলা যখন গেটের লোহার ভারি পাল্লাটা পেরিয়ে মেইন ড্রাইভওয়ের বাঁকটা পার হচ্ছে, ঠিক তখনই তার কানের একদম কাছে একটা ভারী, খসখসে কণ্ঠস্বর গর্জে উঠল,
"বুউউ!"
নাইলা আচমকা আওয়াজ শুনে এক চিৎকার দিয়ে ছাতাটা হাত থেকে ফেলে দিল। ভয়ে তার কলিজা প্রায় মুখে চলে আসার উপক্রম। সে এক ঝটকায় পেছনে ঘুরে দেখলো সাইলাস দাড়িয়ে আছে। সেই চেনা চওড়া কাঁধ, দুর্ধর্ষ চাহনি আর ঠোঁটের কোণে ঝুলে থাকা সেই বাঁকা হাসি।
"ইউ... ইউ ব্লা'ডি স্টু'পিড!"
নাইলা হাপাতে হাপাতে চিৎকার করে উঠল।
"হা'র্ট অ্যা'টাক করিয়ে মা'রার প্ল্যান করছিলে? তোমার কি আক্কেল-জ্ঞান বলে কিছু নেই?"
সাইলাস কোনো উত্তর দিল না। সে গেটের পাথরের পিলারে হেলান দিয়ে হাত দুটো বুকের ওপর আড়াআড়ি করে রাখল। সে একদৃষ্টিতে নাইলার রাগী মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। ৪-৫ দিন পর এই মুখটা দেখার জন্য তার বুকের ভেতরটা যে কতটা ছটফট করছিল, তা সে কাউকে বুঝতে দিল না।
নাইলা নিজেকে সামলে নিয়ে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে এখন রাগের চেয়েও বেশি অভিমান। সে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
"আমি তো ভেবেছিলাম সেদিন রাতে তুমি বোধহয় নিউমোনিয়া হয়ে মা'রাই গেছ! আজ কয়েকদিন হলো কোনো খোঁজ নেই, ভেবেছিলাম যমদূত বুঝি তার কাজ সেরে ফেলেছে। কিন্তু দেখছি না, এখনো মরোনি।শয়তান কী আর এত সহজে মরে?"
সাইলাস এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরপায়ে নাইলার দিকে এগিয়ে এল। তার প্রতিটি পদক্ষেপ নাইলার হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দিচ্ছে। সে নাইলার একদম সামনে এসে থামল। বৃষ্টির কয়েকটা ফোঁটা সাইলাসের নাক বেয়ে টুপ করে নাইলার কপালে পড়ল।তারপর প্রায় ফিসফিস করে বলল,
"যমদূত তো দরজায় কড়া নেড়েই ছিল নাইলা। কিন্তু হঠাৎ কার যেন একটা কর্কশ গলার ঝগড়া মনে পড়ে গেল। ভাবলাম, আমি না থাকলে এই ঝগড়াটে মেয়েটার লেজ সামলাবে কে? তাই কোনোমতে নিজের প্রাণটা নিয়ে ফেরত আসলাম।"
নাইলা চিবুক উঁচিয়ে বলল,
"ঝগড়াটে মেশিনের মায়া বুঝি আর ছাড়তে পারলে না? তা ফিরে যখন এসেছই, যাও নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে থাকো। এখানে রাস্তার মাঝখানে ভূত সেজে দাঁড়িয়ে থাকার কী দরকার?"
সাইলাস এবার তার একটা হাত নাইলার গালের একদম কাছে নিয়ে এল, কিন্তু স্পর্শ করল না। সে খুব মায়াবী কিন্তু নেশাতুর চোখে তাকিয়ে বলল,
"সত্যি করে বলোতো নাইলা সেদিন আমি চলে যাওয়ার পর থেকে সারারাত বালিশে মুখ গুঁজে কেঁদেছিলে না?"
নাইলা খিলখিল করে হেসে উঠল,
"সিরিয়াসলি? আমি কাঁদব? তোমার জন্য? সাইলাস, তোমার আত্মবিশ্বাস তো দেখছি হিমালয় ছাড়িয়ে গেছে! আমি বরং শান্তিতে ঘুমিয়েছি কারণ ওই কয়েকটা দিন অন্তত তোমার ওই তিতকুটে কথাগুলো শুনতে হয়নি।"
সাইলাস এক পা এগিয়ে এল, তার দৃষ্টি এখন আরও নিবিড়,
"আবার মিথ্যে কথা! তোমার চোখের নিচের কালচে দাগ বলে দিচ্ছে গত কয়েক রাত তোমার চোখের পাতা এক হয়নি। কার থেকে লুকাতে চাইছ নাইলা?আমার নাকি নিজের হুম?"
নাইলা মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সাইলাসের এই তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা মাঝেমধ্যে তাকে ভয় পাইয়ে দেয়। সে সামলে নিয়ে মুখ ঘুরিয়ে বলল,
"ওটা কাজের চাপের জন্য, তোমার জন্য নয়। নিজেকে অতটা গুরুত্বপূর্ণ ভেবো না।"
সাইলাস এবার পকেট থেকে তার বাইকের চাবিটা বের করে আঙুলে ঘোরাতে লাগল। সে একটা পৈশাচিক হাসি দিয়ে বলল,
"তোমার পাপের পাল্লা দেখছি দিন দিন ভারি হচ্ছে নাইলা। এত মিথ্যে কথা বললে তো নরকেও জায়গা হবে না। চলো, আজ তোমার কনফেশন দরকার।"
নাইলা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
"কনফেশন? মানে কী?"
"চার্চে নিয়ে যাব। প্রিস্টের কাছে গিয়ে তোমার এই সব মিথ্যে আর পাপের স্বীকারোক্তি দিয়ে আসবে। অন্তত মনটা তো হালকা হবে,"
সাইলাস নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল ।নাইলা হাত নেড়ে বাধা দিয়ে চিৎকার করে উঠল,
"পাগল নাকি! আমি কোথাও যাচ্ছি না। আর আমার কোনো পাপ নেই যে আমাকে কনফেশন দিতে হবে"
কিন্তু সাইলাস শোনার পাত্র নয়। সে এক ঝটকায় নাইলার কবজিটা চেপে ধরল। তার হাতের সেই ইস্পাতের মতো শক্ত বাঁধন থেকে মুক্তি পাওয়া নাইলার পক্ষে অসম্ভব। সে একরকম টেনেই নাইলাকে তার কালো রঙের বাইকের কাছে নিয়ে গেল।
"সাইলাস! ছাড়ো বলছি নইলে খুব খারাপ হবে"
সাইলাস তার কথায় কোনো পাওা না দিয়ে তাকে পাঁজাকোলা করে বাইকের পেছনের সিটে বসিয়ে দিল। সে নিজে সামনের সিটে উঠে বসে হেলমেটটা পরে নিল। আয়নায় নাইলার রাগী মুখটা দেখে সে গম্ভীর গলায় বলল,
"শক্ত করে ধরো। পড়ে গেলে কিন্তু আমি দায়ী নই।"
নাইলা জেদ ধরে সিটের পেছনের রেলিংটা শক্ত করে ধরল। সে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
"আমি তোমাকে ধরব না! মরে গেলেও না!"
সাইলাস ঠোঁটের কোণে সেই পৈশাচিক হাসিটা হাসল। সে ইঞ্জিনে স্টার্ট দিল এক বিশাল গর্জনে চারপাশ কেঁপে উঠল। পরক্ষণেই সে ক্লাচ ছেড়ে সজোরে এক্সিলারেটর দিল। বাইকটা তীরের মতো সামনের দিকে ছিটকে বেরোতেই নাইলা ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল। ভয়ে তার কলিজা শুকিয়ে গেল। সে অজান্তেই এক চিৎকার দিয়ে সাইলাসের কোমরটা দুই হাতে জাপটে ধরল এবং তার পিঠের সাথে নিজের মুখটা গুঁজে দিল।
বাতাস ছিঁড়ে বাইকটা এগিয়ে চলেছে মিলানের বৃষ্টিভেজা রাস্তা দিয়ে। সাইলাস হেলমেটের ভেতর থেকে নিচু স্বরে বিড়বিড় করল,
"দেখলে তো? শেষ পর্যন্ত আমার আশ্রয়ই নিতে হলো"
নাইলা তখনো চোখ বন্ধ করে সাইলাসকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। তার হার্টবিট বাইকের ইঞ্জিনের গর্জনের চেয়েও জোরে ধকধক করছে। বৃষ্টির ছিটেফোঁটা তাদের গায়ে লাগছে, কিন্তু সাইলাসের শরীরের সেই উত্তাপ নাইলাকে এক অদ্ভুত নিরাপত্তা দিচ্ছে। সে মনে মনে গা'লি দিলেও সাইলাসের পিঠ থেকে হাত সরাল না।
প্রায় ২০ মিনিট পর তারা গির্জায় এসে পৌছালো।
ইঞ্জিনের গর্জন স্তব্ধ হতেই চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন আরও গাঢ় হয়ে এল। নাইলা তখনো সাইলাসের কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে, তার চোখ দুটো ভয়ে আর উত্তেজনায় বুঁজে আছে।
সাইলাস হেলমেটটা খুলে এক ঝটকায় মাথা ঝাড়ল। তার ভেজা চুলগুলো কপালে এসে পড়েছে। সে নিচু স্বরে বলল,
"নামো ঝগড়াটে মেশিন"
নাইলা চোখ খুলে দেখল সামনে বিশাল এক পাথুরে গির্জা। সে সাইলাসের পিঠে একটা কিল বসিয়ে দিয়ে নেমে দাঁড়াল। রাগে তার গাল দুটো আপেলের মতো লাল হয়ে আছে।
"তুমি কি সত্যিই পাগল হয়ে গেছো সাইলাস? এই অসময়ে চার্চে কেউ আসে?"
সাইলাস কোনো উত্তর দিল না। সে নাইলার কবজিটা শক্ত করে ধরে গির্জার ভারী কাঠের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। ভেতরের পরিবেশটা একদম অন্যরকম সুগন্ধি মোমবাতির ঘ্রাণ, চারদিকে যিশুর ক্রুশবিদ্ধ মূর্তির ছায়া আর এক গা ছমছমে নীরবতা।
গির্জার ভেতরে সাধারণত কনফেশন একা করতে হয়। একটি ছোট কাঠের ক্যাবিনেট বা 'কনফেশনাল বক্স'এর একপাশে পাপী বসে আর অন্যপাশে পর্দার আড়ালে প্রিস্ট থাকেন। কিন্তু সাইলাসের নিয়ম বরাবরই আলাদা। সে নাইলাকে টেনে নিয়ে একদম পেছনের দিকের একটা অন্ধকার কনফেশনাল বক্সের সামনে দাঁড় করাল।
সে নাইলার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"সাধারণত একসাথেই কনফেশন করা যায় না। কিন্তু আজ আমরা নিয়মের বাইরে যাব। তুমি ভেতরে গিয়ে বসবে, আর আমি পর্দার ওপাশে থাকব। মাঝখানের ওই কাঠের জাল দিয়ে তুমি তোমার সব মিথ্যে আর পাপের কথা বলবে।"
নাইলা ভ্রু কুঁচকে বলল,
"প্রিস্ট কোথায়? আর তুমি কেন ওপাশে থাকবে?"
সাইলাস এক পৈশাচিক হাসি দিয়ে নাইলাকে ধাক্কা দিয়ে ছোট কুঠুরিটার ভেতরে ঢুকিয়ে দিল।
"প্রিস্ট আজ ছুটিতে। আজ তোমার সব পাপের বিচার আমি করব। শুরু করো নাইলা....
...আমাকে কতটা মিস করেছো তা স্বীকার"
নায়লা কাঠের জালের ওপাশে সাইলাসের আবছা অবয়ব দেখে থতমত খেয়ে গেল। সে রেগে গিয়ে জালিতে হাত চাপড়ে বলল,
"বাসটার্ড, এটা চার্চ, এখানে ফাজলামি করো না। আর আমি তোমাকে বিন্দুমাত্র মিস করিনি!"
সাইলাসের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ওপাশ থেকে ভেসে এল, যেন কোনো দৈববাণী।
"মিথ্যে বললে কিন্তু এই পবিত্র ঘরের ছাদ ভেঙে তোমার মাথায় পড়বে"
সময় অতিবাহিত হলেও নাইলা চুপ করে বসে থাকলো ।সাইলাস এবার তার ধৈর্য হারাচ্ছে।
সে জালের ওপর নিজের লম্বা আঙুলগুলো রাখল।
"আজ যখন সব নিয়মই ভেঙেছি তবে এটাও আলাদা নাইলা। আজকের কনফেশনটা হবে আলাদা এখানে আমি তোমাকে প্রশ্ন করব, আর তুমি সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াবে। মনে রেখো, এই পবিত্র কাষ্ঠখণ্ডের সামনে দাঁড়িয়ে মিথ্যে বললে তোমার আত্মা আজীবন নরকের আগুনে পুড়বে।"
নাইলার হাত কাপঁতে থাকলো ।সে প্রথম থেকেই কেমন অসস্তি অনুভব করছে ।সে কাঁপাকাঁপা হাতে কাঠের জালিটা ধরল। সে চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু গলার ভেতর স্বর আটকে গেছে। সাইলাস আরও কাছে এগিয়ে এল, জালের একদম কাছে তার ঠোঁট নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"আমার জাস্ট একটা প্রশ্ন নাইলা।আমি প্যাঁচানো পছন্দ করি না তাই সরাসরি প্রশ্ন করছি.....
Do... Do you love me? তোমার ওই হৃদয়ে কি আমার জন্য কোনো স্পন্দন তৈরি হয়েছে? নাকি এই কয়েক দিনের দূরত্ব তোমাকে বিন্দুমাত্র পোড়ায়নি?"
নাইলার হৃদস্পন্দন যেন থেমে গেল ।সে চুপ করে রইল। তার চোখের পাতায় জল জমেছে, কিন্তু সে কিছুতেই তা পড়তে দেবে না। ওপাশ থেকে সাইলাসের ধৈর্য যেন ফুরিয়ে আসছে। সে হুট করে কাঠের জালিতে একটা সজোরে থাপ্পড় মারল।
"উত্তর দাও নাইলা! সাইলেন্স ইজ নট অ্যান অপশন টুডে! আমাকে অনেকভাবেই জ্বালিয়েছ, সবই মেনে নিয়েছি। কিন্তু এখন যদি চুপ থাকো, Then i promise i won’t let you go from this crunch until you speak up the truth . বলো"
সাইলাসের গলার সেই উন্মাদনা আর তীব্র অধিকারবোধ নাইলার ভেতরের সব প্রতিরোধ ভেঙে দিল। সে আর পারল না। তার দুশ্চিন্তা, অভিমান আর লুকিয়ে রাখা ভালোবাসা এক চরম বিস্ফোরণে ফেটে পড়ল। সে জালের ওপাশে সাইলাসের হাতের ওপর নিজের হাত রেখে ডুকরে কেঁদে উঠল।
"হ্যাঁ! হ্যাঁ, আমি তোমাকে ভালোবাসি, ইউ ব্লা'ডি সাইকো! খুশী তো এখন? সারাক্ষণ আমার মগজে তোমার ওই তিতকুটে কথাগুলো ঘোরে। তুমি যখন সামনে থাকো না, তখন আমার মনে হয় আমার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। জ্যাকের সাথে ওই ছবিটা শুধু তোমাকে জ্বালানোর জন্যই তুলেছিলাম, কারণ তুমি আমাকে পাত্তাই দিচ্ছিলে না! আমি প্রতিদিন চার্চে এসে প্রার্থনা করেছি যেন তুমি অক্ষত ফিরে আসো। আর কী শুনতে চাও?You bl'oody as'shole"
সাইলাস কয়েক সেকেন্ড পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। নাইলার প্রতিটি কথা যেন তার বুকের ভেতর তপ্ত সিসার মতো বিঁধেছে। সে কোনো উত্তর দিল না। হঠাৎ পর্দা সরানোর শব্দ হলো। নায়লা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সাইলাস ঝড়ের বেগে কনফেশনাল বক্সের ওপাশে এসে ঢুকল।
সেই ছোট্ট সংকীর্ণ জায়গা, যেখানে একজনের বসাই দায়, সেখানে সাইলাসের বিশাল দেহটা ঢুকতেই দমবন্ধ করা এক পরিবেশ তৈরি হলো। নাইলা দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, সাইলাস এক ঝটকায় তাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। তার দু-হাত নায়লার দু-পাশে রাখা, যেন এক দুর্ভেদ্য খাঁচায় সে নাইলাকে বন্দি করে ফেলেছে।
নায়লা হাপাতে হাপাতে উপরে তাকাল। সাইলাসের চোখ দুটো এখন আর সেই পৈশাচিক শান্তিতে নেই, সেখানে এক আদিম তৃষ্ণা আর উম্মাদনা খেলা করছে। সাইলাস খুব নিচু স্বরে বলল,
"say it again nyla। ওই শেষ গালিটা দেওয়ার আগে যা বললে, ওটা আরেকবার বলো। আমার এই পাথরের কানে ওই শব্দগুলো শুনতে খুব ইচ্ছে করছে।"
নাইলা রাগে আর কান্নায় ভেঙে পড়া গলায় বলল,
" আমি আর এক শব্দও বলব না। তুমি একটা স্বার্থপর, তুমি শুধু আমাকে জ্বালাতেই জানো"
সাইলাস এবার নাইলার ঠোঁটের ওপর নিজের একটা আঙুল রাখল। স্পর্শটা বরফের মতো ঠান্ডা হলেও নাইলার সারা শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। সাইলাস তার কপালটা নাইলার কপালে ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"স্বার্থপরই তো! তোমার ওই নরম মনের ভেতরে নিজের নামটা খোদাই করে দেওয়ার জন্য আমি নরক পর্যন্ত যেতে পারি।পুরোটা জীবণ কেমন যেনো কেটে গেলো...কিন্তু তুমি আসার পর সব উলটপালট হয়ে গেলো ।প্রতিটি মুহুর্ত আমার এই সার্থপর হৃদয় শুধু তোমার জন্য হাহাকার করতো , ইটস অলওয়েজ বিন ইউ, মাই লিটল ফিয়েরা।"
নায়লা এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে সাইলাসের ভেজা শার্টটা খামচে ধরে তার বুকে মুখ গুঁজে দিল। সাইলাস তাকে দুই হাতে পাঁজাকোলা করে জড়িয়ে ধরল। সেই ছোট্ট কুঠুরিতে জায়গার অভাব থাকলেও তাদের দুজনের মনের দূরত্ব এখন শূন্যের কোঠায়।
_________
ম্লান হলুদ আলোয় ঘরটা অনেকটা কবরের মতো নিস্তব্ধ। বাতাসের প্রতিটি অণুতে চ্যাপচপে কাদার গন্ধ। ঘরের চারদিকে ছড়ানো-ছিটানো অসংখ্য মা'নবমূর্তি—কোনোটার মা'থা নেই, কোনোটার হাত শ'রীর থেকে বি'চ্ছি'ন্ন হয়ে মেঝেতে লু'টোপুটি খাচ্ছে। বী'ভৎস মাটির টুকরোগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে আছে।
"পারফেক্ট... প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছি তোমায়।"
To be continue,,,,,,