#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins) #লেখনিতে_ফারিহা
পর্ব ৩০
(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)
ঘরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে ডেইগো মোরালেস। তার পরনের অ্যাপ্রনটা শুকনো পলিমার ক্লে আর ধূসর ধুলোয় মাখামাখি। তার সামনে একটি ঘূর্ণায়মান টেবিলের ওপর রাখা একটা অর্ধসমাপ্ত মূর্তির অবয়ব। একটি মেয়ের মুখ।
ডেইগো খুব ধীরপদে মূর্তির সামনে এগিয়ে এল। তার আঙুলগুলো কাঁপছে, কিন্তু চোখে এক আদিম শিকারির তীক্ষ্ণতা। সে অত্যন্ত যত্ন করে, মূর্তির ওপরের ঠোঁটে নিজের বুড়ো আঙুলটা ছোঁয়াল। স্পর্শটা এতটাই নরম, যেন সে কোনো পাথর নয় বরং কোনো মানবীকে স্পর্শ করছে। তার এই স্পর্শে এক ধরণের সাইকোপ্যাথিক আবেশ ছিল। সে ফিসফিস করে বলল,
"পারফেক্ট... প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছি তোমায়।ঠিক এই জায়গাটুকু... তোমার এই হাসির ভাঁজটুকু না ধরতে পারলে তোমায় বন্দি করা যাবে না, Doll "
সে তার আঙুল দিয়ে মূর্তির গালের হাড় থেকে চিবুক পর্যন্ত মসৃণ করে আনল। কিন্তু যেই সে এক পা পিছিয়ে গেল পূর্ণাঙ্গ রূপটা দেখার জন্য,কয়েক সেকেন্ডে তার মুখের সেই পৈশাচিক তৃপ্তি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। চোয়ালের হাড় শক্ত হয়ে উঠল, কপালে ফুটে উঠল রাগের নীল শিরা।
না। আবারও ভুল।মূর্তির চোখের কোণের সেই সূক্ষ্ম ভাঁজটা কি কিছুটা বেশি গভীর? নাকি নাকের ডগাটা সামান্য বাঁকা?
মুহূর্তের মধ্যে ডেইগোর সেই শান্ত আবেশ এক পৈ'শাচিক উ'ন্মাদনায় পরিণত হলো। তার কপালে রাগের নীল শিরাগুলো দপদপ করে ফুলে উঠল। সে দাঁতে দাঁত চেপে গর্জনের মতো চিৎকার করে উঠল,
"না! এটাও তুমি নও! ইটস নট পারফেক্ট!"
উন্মাদের মতো ডেইগো নিজের ডান হাতটা মুষ্টিবদ্ধ করে সজোরে একটা ঘু'ষি চালাল মূর্তির মুখের ঠিক মাঝখানে।পলিমার ক্লে সেই আ'ঘাত সইতে পারল না নিখুঁতভাবে গড়া সেই মুখমণ্ডল এক মুহূর্তে থু'বড়ে গেল। আ'ঘাতে মূর্তিটি স্ট্যান্ড থেকে ছিটকে মেঝেতে আ'ছাড় খেয়ে পড়ল।
নরম পলিমার ক্লের তালটা মেঝের ধুলোয় মিশে এক বী'ভৎস পি'ণ্ডে পরিণত হলো। ঘরের মেঝের প্রতিটি কোণায় এমন আরও ডজনখানেক ভা'ঙা মাটির হাত, পা আর বি'কৃত মা'থা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
ডেইগো দ্রুত নিশ্বাস ফেলছে, তার চোখ এখন র'ক্তব'র্ণ। সে হাহাকার করে নিজের চুল খা'মচে ধরল। তার পায়ের নিচে পড়ে আছে অসংখ্য ব্যর্থতার অবশেষ—হা'ত, পা', অর্ধেক গা'ল। সে চারদিকে তাকিয়ে রাগে গজগজ করতে করতে মেঝেতে রাখা অন্য একটি ভাঙা মূর্তির ওপর লা'থি মারল।
"why?"
সে টেবিলের ওপর রাখা ক্লে-র দলাটা নিজের নখ দিয়ে খুঁ'ড়তে শুরু করল। তার আঙুলের ফাঁক দিয়ে কাদাগুলো র'ক্তের মতো বেরিয়ে আসছে। সে উন্মাদের মতো হাসতে হাসতে বিড়বিড় করল,
"আবার শুরু করব। যতক্ষণ না তোমার ওই বিষণ্ণ চাহনিটা আমার আয়ত্তে আসছে, ততক্ষণ এই ন'রক থামবে না। তুমি কেবল আমার হাতেই জী'বন্ত হবে... কেবল আমার হাতে।"
পুরো ঘরটা এখন এক ধ্বং'সস্তূপ। কিন্তু সেই ধ্বং'সের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ডেইগো নতুন করে কাদা মাখাতে শুরু করল।
__________
রাত প্রায় ১ টা । জানলার বাইরে গহীন অন্ধকার । ঘরের ভেতরে টিমটিমে নীল নাইট ল্যাম্পের আলোয় রোজেলিয়া গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল। তার শান্ত মুখের ওপর অবাধ্য চুলগুলো ছড়িয়ে আছে ।
"রোজ...ওঠো "
রোজেলিয়া ঘুমের ঘোরে একটু নড়েচড়ে উঠল। সে ভাবল হয়তো স্বপ্ন দেখছে। রিভেন এবার একটু ঝুঁকে এসে রোজেলিয়ার কাঁধে হাত রাখল। তার হাতের সেই পরিচিত স্পর্শ আর গায়ের কড়া পারফিউমের ঘ্রাণ রোজেলিয়ার অবচেতন মনে আঘাত করল।
"রোজেলিয়া..."
রোজেলিয়া এবার ধড়ফড় করে উঠে বসল। চোখের পাতা কচলাতে কচলাতে সে রিভেনের দিকে তাকাল। রিভেন একদম পরিপাটি করে ড্রেসআপ করা। তার পরনে কুচকুচে কালো রঙের একটি সিল্কের শার্ট, যার ওপরের দুটো বোতাম খোলা। শার্টের হাতাগুলো কনুই পর্যন্ত গোটানো। রিভেনের চোখ দুটো হালকা লালচে হয়ে আছে। তার মুখমণ্ডল আজ অস্বাভাবিক গম্ভীর, যেন কোনো পাথর কেটে তৈরি করা মূর্তি।
রোজেলিয়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
"কী...হয়েছে ? আপনার মুখটা এতো মলিন লাগছে কেন ?"
রিভেন উওর দিলো না ।
"আপনি..আপনি কি কোথাও যাচ্ছেন ? এত রাতে কোথায় যাচ্ছেন আপনি ?"
রিভেন কোনো সরাসরি উত্তর দিল না। সে জানলার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল। তারপর রোজেলিয়ার চোখের গভীরে চোখ রেখে খুব ধীরস্থিরে বলল,
"যাবে তুমি ? আমার সাথে ?"
রোজেলিয়া আরও বেশি অবাক হলো। এই মাঝরাতে রিভেন তাকে নিয়ে কোথায় যেতে চায়? সে প্রশ্ন করল,
"কোথায় যাব আমরা ? এই অসময়ে ?"
রিভেন শুধু সংক্ষেপে বলল, "চলো "
রিভেনের সেই সংক্ষিপ্ত উত্তরে এক ধরণের অলঙ্ঘনীয় হুকুম ছিল। তার লালচে চোখ দুটোর ভেতরে রোজেলিয়া এক গভীর বিষাদ দেখতে পেল ।
রোজেলিয়ার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। এক অজানা আশঙ্কা আর চিন্তার মেঘ তার মনে ভিড় করল। সে আর কোনো প্রশ্ন না করে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল।
পিচঢালা কালো রাস্তা দিয়ে রিভেনের গাড়িটা যখন ছুটে চলছে, বাইরের জগতটা তখন কোনো এক মৃত নগরীর মতো নিস্তব্ধ। জানলার কাঁচের ওপাশে দ্রুত সরে যাওয়া ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো রিভেনের পাথুরে মুখে আলপনা এঁকে যাচ্ছে। রোজেলিয়া চুপচাপ বসে আছে, তার হৃদস্পন্দন ঘড়ির কাঁটার চেয়েও দ্রুত চলছে।
কিছুক্ষণ পর গাড়িটা শহরের কোলাহল ছেড়ে এক নির্জন এলাকায় এসে থামল।
গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াতেই রোজেলিয়ার শরীরে এক হিমশীতল বাতাসের ঝাপটা লাগল। চারপাশটা বড্ড বেশি নিরিবিলি,আর কেমন যেন গুমোট একটা পরিবেশ । রিভেন কোনো কথা না বলে রোজেলিয়ার নরম হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে নিল। তার হাতের তালু আজ অস্বাভাবিক ঠান্ডা। রিভেন তাকে নিয়ে একটি পুরনো লোহার কারুকাজ করা গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
গেটের ক্যাঁচক্যাঁচে শব্দটা নিস্তব্ধতা চিরে রোজেলিয়ার কানের পর্দায় বিঁধল। ভেতরে পা রাখতেই রোজেলিয়ার পা থমকে গেল। চাঁদের ফ্যাকাশে আলোয় সে দেখল সারিবদ্ধ শ্বেতপাথরের স'মাধি। রোজেলিয়ার বুকটা দপ-দপ করে উঠল। সে রিভেনের হাতের বাঁধন আরও শক্ত করে ধরল।
রিভেন তাকে নিয়ে একদম শেষ প্রান্তে, দুটি পাশাপাশি ক'বরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। রিভেন স্থির, একদম নিথর। তার চোখের লাল আভা এখন আরও গাঢ় হয়েছে, যেন আগ্নেয়গিরির লাভা উপচে পড়ার অপেক্ষায়।
রোজেলিয়া অত্যন্ত সাবধানে কবরের ওপরের ফলক দুটির দিকে তাকাল। শ্বেতপাথরের ওপর খোদাই করা সোনালি হরফে লেখা,
'Dominic Sebastian Caruso 'আর পাশেরটাতে লিখা 'Fiora Scarlet Caruso'
নামের শেষে 'কারুসো' পদবিটা দেখে রোজেলিয়ার মেরুদণ্ড দিয়ে এক হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। সে কাঁপাকাঁপা স্বরে রিভেনের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,
"এটা...কাদের ক'বর? আপনার পরিবারের কেউ?"
রিভেন একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। তার চোয়ালের হাড়গুলো শক্ত হয়ে ফুটে উঠেছে, ঘাড়ের রগগুলো রাগে আর য'ন্ত্রণায় কাঁপছে। কিছুক্ষণ পর সে তার বাম হাতের আঙুল দিয়ে অতি ধীরগতিতে কবরের ফলক দুটির দিকে ইশারা করল,
"ডমিনিক সেবাস্টিয়ান আমার বড় ভাই... আর ফিওরা স্কারলেট আমার ছোট বোন।"
রোজেলিয়া স্তব্ধ হয়ে গেল। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দও যেন এক মুহূর্তে থেমে গেল। সে অনুভব করল, তার পায়ের তলার মাটিটুকুও যেন থরথর করে কাঁপছে। কেনো জানি তার চোখে পানি জমে এলো সে তার ভেজা চোখের দৃষ্টি রিভেনের চোখের ওপর নিবদ্ধ করল। রিভেন একদৃষ্টে ডমিনিকের কবরের দিকে তাকিয়ে আছে তার চাউনি একদম স্থির । রোজেলিয়া তার কাঁপাকাঁপা আঙুলগুলো দিয়ে রিভেনের পাথরের মতো শক্ত হাতটা পরম মমতায় আঁকড়ে ধরল। তার কণ্ঠস্বর অবরুদ্ধ আবেগে প্রায় বুজে এসেছে।
সে অতি কষ্টে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,
"ওনারা... ওনারা কীভাবে মারা গেলেন? আ—আমাকে বলবেন?"
রিভেনের চোয়াল একবার শক্ত হয়ে ফুলে উঠল। কবরের চারপাশ জুড়ে থাকা নামহীন বুনো ফুলের গন্ধ আর হিমশীতল বাতাসের মাঝে রিভেনের নিশ্বাস তখন আগুনের মতো তপ্ত। সে কোনো ঝটপট উত্তর দিল না। কয়েক সেকেন্ডের এক অসহ্য নিস্তব্ধতা চারপাশকে আরও বেশি শ্বাসরুদ্ধকর করে তুলল।
অবশেষে রিভেন চোখ ফেরাল। সেই চোখের কোণে কেবল আছে এক আদিম দহন। সে অতি ধীর স্বরে শুধু বলল,
"হুম।"
রিভেন আলতো করে নিজের হাতটা রোজেলিয়ার মুঠো থেকে ছাড়িয়ে নিল। সে ধীর পায়ে পাশের একটি প্রকাণ্ড ওক গাছের দিকে হেঁটে গেল।তার প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে শুকনো পাতার মড়মড় শব্দ হচ্ছিল।রোজেলিয়া স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল না। সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেই অন্ধকারের বুক চিরে রিভেনকে অনুসরণ করল।
_______
সেদিন ম্যানশনের প্রতিটি কোণে উৎসবের আমেজ। ইভানো কারুসোর কোল আলো করে এক রাজকন্যা এসেছে। তার নাম রাখা হবে এই আনন্দেই মেতে ছিল পুরো পরিবার।
উৎসবের শেষভাগে মেহমানরা চলে যাওয়ার পর ম্যানশন জুড়ে এক পরম শান্তি নেমে এসেছে। ডমিনিক আর রিভেন দুই ভাইই তাদের পোশাক বদলে দ্রুত পায়ে নার্সারির দিকে ছুটল। সেখানে দোলনায় শুয়ে আছে ছোট্ট এক রাজকুমারী যার চোখের মণি দুটো আকাশের নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল।
ডমিনিক দোলনার পাশে দাঁড়িয়ে খুব গর্বের সাথে বলল,
" দেখেছিস রিভেন স্কারলেট নামটা আমি নিজে পছন্দ করেছি,ও যখন বড় হবে, এই নামের আভিজাত্য ওকে সবার থেকে আলাদা রাখবে।এটি ফ্লোরেন্সের সবথেকে সুন্দর নাম।"
রিভেন নাক সিঁটকে বড় ভাইয়ের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন স্পষ্ট ঈর্ষার ঝিলিক। সে ডমিনিকের পাশ কাটিয়ে দোলনার একদম কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলল,
" একদম না! 'স্কারলেট' নামটা একদম পচা, ওটা শুনতে কেমন যেন লাগে। আমি ওকে শুধু ফিওরা বলে ডাকব। আমার বোনের নাম কেবল আমার পছন্দেই হবে।"
ডমিনিক হোহো করে হেসে উঠল। সে রিভেনের ঘাড়ে হাত রেখে তাকে নিজের কাছে টেনে নিল।
"ফিওরা তো ডাকবিই, কিন্তু মাঝখানের নামটা তো আমার দেওয়া। সেটা তুই চাইলেও মুছতে পারবি না, হিংসুটে লিটেল ব্রাদার!"
রিভেন জেদ ধরে বসল।
"তুমি সবসময় এভাবে নিজের পছন্দ চাপিয়ে দাও। ও যখন বড় হবে, দেখবে ও শুধু আমার দেওয়া ওই 'ফিওরা' নামেই সাড়া দেবে। তোমার ওই স্কারলেট-ফারলেট ও শুনবেই না"
রিভেন দোলনার দিকে ঝুঁকে ফিওরার ছোট্ট হাতটা নিজের আঙুলে জড়িয়ে ধরল। ফিওরা তখন তার দুই ভাইয়ের খুনসুটি দেখছে। রিভেন নাক কুঁচকে বলল,
"দ্যাখো ভাইয়া, ফিওরা কিন্তু আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে! তার মানে ও আমার 'ফিওরা' ডাকটাই বেশি পছন্দ করেছে। তোমার ওই 'স্কারলেট' নাম শুনে ও বোধহয় বিরক্ত।"
ডমিনিক হাসতে হাসতে রিভেনের চুলে বিলি কেটে দিল।
"আচ্ছা তবে তাই হোক। ও বড় হলে আমরা ওকে নিয়ে সারা মিলান শহর ঘুরিয়ে দেখাব। আমি বন্দুক চালানো শিখিয়ে দিব যাতে কেউ আমার বোনকে বিরক্ত করার সাহস না পায়।"
রিভেন এক মুহূর্তের জন্য গম্ভীর হয়ে ভাবল, তারপর বলল,
"নাহ, ও আমার সাথে শুধু ছবি আঁকবে আর পিয়ানো বাজাবে। র'ক্তার'ক্তি আর ধুলোবালি থেকে ও দূরে থাকবে। ওকে আমরা কাঁচের ঘরে রাজকন্যার মতো আগলে রাখব, তাই না ভাইয়া?"
ডমিনিক দোলনার এক কোণে বসতে বসতে রিভেনের দিকে মায়াবী চোখে তাকাল।
"হ্যাঁ রে রিভেন। আমাদের এই ছোট্ট ফুলটাকে আমরা কোনোদিন শুকিয়ে যেতে দেব না। তুই আর আমি, দুজন মিলে ওর চারপাশে এক প্রাচীর হয়ে থাকব।"
দুজনে মিলে কত শত পরিকল্পনা।ফিওরাকে তারা কী কী শেখাবে ,তাকে কোথায় কোথায় ঘুতে নিয়ে যাবে ,ফিওরার প্রথম স্কুলে যাওয়া, তার জন্মদিনে কী উপহার দেওয়া হবে ,সব নিয়ে দুই ভাইয়ের মিষ্টি খুনসুটি তখন মাঝরাতের সেই নির্জন কক্ষটিকে জী'বন্ত করে তুলছিল। রিভেন জেদ করছিল ডমিনিককে বের করে দিয়ে ফিওরাকে তার ঘরে জায়গা দিবে আর ডমিনিক বলছিল সে বড় ভাই হিসেবে ফিওরার সব দায়িত্ব একা সামলাবে।
ঠিক সেই সময় কক্ষের ভারি দরজাটা খুলে গেল। ভেতরে প্রবেশ করলেন মেহেরিন আর ইভানো কারুসো। মেহেরিনের চোখে তখন এক সার্থক মায়ের তৃপ্তি, আর ইভানোর কঠিন মুখে এক বিরল প্রশান্তি।
মেহেরিন তার দুই ছেলেকে দোলনা ঘিরে থাকতে দেখে মুচকি হাসলেন।
"তোমাদের এই লড়াই কি আজ সারা রাত চলবে? ডমিনিক, রিভেন বোনকে ঘুমাতে দাও এবার।"
রিভেন মেহেরিনের দিকে তাকিয়ে অভিযোগের সুরে বলল, "মম, ড্যাড আমার তোমাদের সাথে অনেক জরুরী কথা আছে "
ইভানো আর মেহরিন একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন তাদের ছেলের এই জরুরি কথা কী হতে পারে তা তারা ভালো করেই জানেন।মেহেরিন বললো,
"কী জরুরি কথা ,বাবা ।বলো আমরা শুনছি"
" ভাইয়া ওর নাম স্কারলেট রেখেছে! তুমিই বলো, এটা কি কোনো নাম হলো?".
মেহেরিন রিভেনের কাছে এগিয়ে এলেন। তিনি রিভেনের গালটা আলতো করে টেনে দিয়ে ডমিনিকের দিকে তাকালেন। ডমিনিক তখন বিজয়ী হাসি হাসছে, যা রিভেনের জেদকে আরও উসকে দিচ্ছিল।
মেহেরিন খুব নরম গলায় বললেন,
"ডমিনিক যেহেতু ওকে নাম দিয়েছে, তবে তুমি না হয় ওকে ভালোবাসা দিও রিভেন। একটা নাম দিয়ে কী যায় আসে? ও তো তোমাদেরই ছোট্ট বোন।"
রিভেন মুখটা আরও ভারি করে ইভানো কারুসোর দিকে তাকাল। তার ড্যাড সবসময়ই ন্যায়বিচার করেন, অন্তত রিভেনের তাই মনে হয়। সে ইভানোর সিল্কের রোবটা টেনে ধরে বলল,
"ড্যাড, তুমিই বলো! স্কারলেট নামটা কি খুব বেশি গম্ভীর না? ও তো কত ছোট, কত নরম! ওকে ফিওরা ডাকলে কি সুন্দর শোনায় না? তুমি প্লিজ ভাইয়াকে বলো ও যেন নিজের নামটা উইথড্র করে।"
ইভানো কারুসো, যার একটি ইশারায় পুরো ইতালির মাফিয়া জগত থরথর করে কাঁপে, তিনি আজ নিজের ছোট্ট ছেলের এই ছেলেমানুষি আবদারের সামনে একদম নিরুপায় হয়ে পড়লেন। তিনি নিচু হয়ে রিভেনের সমান হলেন, তারপর তার চওড়া হাতটা রিভেনের মাথায় রেখে গম্ভীর কিন্তু স্নেহমাখা স্বরে বললেন,
"রিভেন, শোনো। ডমিনিক ওর নাম রেখেছে 'স্কারলেট'যার অর্থ হলো গাঢ় লাল, সাহসের প্রতীক। আর তুমি নাম দিয়েছ 'ফিওরা'যার অর্থ হলো ফুল। আমাদের এই কারুসো সাম্রাজ্যে টিকে থাকতে হলে ওকে ফুলের মতো সুন্দর হতে হবে ঠিকই, কিন্তু সেই ফুলের রঙ হতে হবে আগুনের মতো লাল, যাতে কেউ তাকে স্পর্শ করার আগে একশবার ভাবে। তাই ওর দুটো নামই থাকবে। ও হবে আমাদের 'ফিওরা স্কারলেট কারুসো'।"
রিভেন এবার আর দ্বিমত করতে পারল না। ড্যাডের যুক্তির কাছে তার জেদ কিছুটা ফিকে হয়ে এল। সে আবার দোলনার দিকে ফিরল। ফিওরা তখন তার ছোট ছোট হাতগুলো দিয়ে রিভেনের আঙুলটা ধরার চেষ্টা করছিল। রিভেন ফিওরার কপালে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলল,
"আচ্ছা ঠিক আছে, স্কারলেট নামটাও থাকল। কিন্তু ডমিনিক ভাইয়া, মনে রেখো—আমি যখন ওকে ফিওরা বলে ডাকব, ও যদি আগে আমার দিকে তাকায়, তবে কিন্তু আমিই জিতব!"
ডমিনিক হাসতে হাসতে রিভেনকে জাপটে ধরল।
"ডিল! দেখা যাবে কার নাম আগে ওর কানে পৌঁছায়।"
___
রিভেন তখন তার ঘরের নরম বিছানায় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ছোট বোন ফিওরার জন্মের রেশ কাটেনি, সারা শরীর জুড়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। কিন্তু সেই প্রশান্তি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল মাঝরাতের এক আ'র্তনাদে।
হঠাৎ ঘরের দরজা খোলার শব্দে রিভেনের ঘুমটা ভেঙে গেল। সে চোখ কচলাতে কচলাতে দেখল তাদের বডিগার্ড ভিতো দাঁড়িয়ে আছে। ভিতোর ফর্সা মুখটা তখন ছাইয়ের মতো ফ্যাকাশে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সে কাঁপাকাঁপা গলায় শুধু বলল,
"ইয়ং মাস্টার... নিচে আসুন। জলদি।"
রিভেন ঠিকমতো কিছু বুঝে উঠতে পারল না। তন্দ্রাচ্ছন্ন পায়ে সে ভিতোর পিছু পিছু ঘর থেকে বের হলো। করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় সে দেখল ম্যানশনের প্রতিটি কোণে এক অশুভ স্তব্ধতা। কোনো আলো নেই।
সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার সময় রিভেনের নাকে এক উৎকট অদ্ভুত এক গন্ধ এল । ড্রয়িং রুমের মাঝখানে পা রাখতেই তার পায়ের তলার পৃথিবীটা যেন হঠাৎ করে ধ'সে পড়ল।
মেঝের ওপর শুইয়ে রাখা হয়েছে দুটি নি'থর দে'হ।
একপাশে ডমিনিক। তার পরনের শার্টটা জলে ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। তার শরীরটা ফু'লে উ'ঠেছে, মু'খটা নী'লচে হয়ে গেছে ঠিক যেমনটা হয় জ'লে ডু'বে থাকা মানুষের।
ডমিনিকের সেই সুন্দর চুলগুলো এখন কাদায় মাখামাখি। রিভেনের মনে পড়ল, মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই ডমিনিক তাকে বলেছিল কাল স্কুল
থেকে ফিরে তারা একটা নতুন গেম খেলবে ।
ডমিনিকের ঠিক পাশেই স্কারলেট। ওইটুকু ছোট শরীর, অথচ তার সাদা ফ্রকটা এখন গাঢ় লা'ল র'ক্তে ভিজে একাকার। যেন কেউ কোনো এক শিল্পী খুব যত্নে তার পবিত্রতায় র'ক্তের আলপনা এঁকে দিয়েছে। স্কারলেটের সেই নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল চোখ দুটো এখন আ'ধবো'জা, যেন সে কোনো এক অসমাপ্ত ঘুমের দেশে হারিয়ে গেছে।
রিভেন পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। সে দেখল একটু দূরে মেহেরিন কারুসো মেঝের ওপর বসে আছেন। তিনি ডমিনিকের হিমশীতল হাতটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে নিঃশব্দে কাঁ'দছেন সেই কান্নায় কোনো শব্দ নেই, আছে কেবল এক বুকচেরা হা'হাকার।
রিভেন ধীরপায়ে ডমিনিকের লা'শের কাছে এগিয়ে গেল। সে ডমিনিকের গায়ের সেই লোনা জল আর পচে যাওয়া শৈবালের গ'ন্ধে ব'মি চেপে ধরল। সে তার ভাইয়ের পাং'শুটে মুখে হাত রেখে অস্ফুট স্বরে ডাকল,
"ডমিনিক ভাইয়া?"
কোনো উত্তর এল না।
রিভেন এবার স্কারলেটের দিকে তাকাল। সেই ছোট্ট বোনটি, যার নাম নিয়ে তিন দিন আগেই তারা খুনসুটি করছিল। আজ সেই নামের সার্থকতা রিভেন দেখতে পাচ্ছে স্কারলেট সত্যিই র'ক্তিম হয়ে গেছে।
ভিতো রিভেনের কাঁধে হাত রাখল, কিন্তু রিভেন এক ঝটকায় তাকে সরিয়ে দিল। তার ভেতরের সেই নিষ্পাপ কিশোরটি ওই মুহূর্তেই ম'রে গেল। সেই ড্রয়িং রুমের আবছা আলোয় ডমিনিকের ভিজে যাওয়া শরীর আর স্কারলেটের র'ক্তা'ক্ত ফ্রক দেখে রিভেনের চোখ দুটো ধীরে ধীরে লাল হতে শুরু করল।
________
মিলান শহরের নিস্তব্ধতা চিরে রিভেনের বাইকের তীব্র গর্জন যখন কারুসো ম্যানশনের আঙিনায় প্রতিধ্বনিত হলো, তখন ঘড়ির কাঁটা শেষ রাতের দিকে। বাইকটা সজোরে থামিয়ে রিভেন যখন নামল, তার হেলমেটের কাঁচের ওপাশে চোখ দুটো তখনো লাল। পাহারায় থাকা গার্ডরা রিভেনের সেই রণমূর্তি দেখে নিঃশব্দে সরে দাঁড়াল।
রোজেলিয়াকে রিভেন তার মেনশনে রেখে এসেছে, কারণ আজকের এই দহন কেবল রিভেনের একার।
সে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরের তলায় উঠে এল। করিডোরের একদম শেষ প্রান্তে একটি ভারী ওক কাঠের দরজা যা খুলে রিভেন ভিতরে ডুকলো।
এটি সেই ঘর, যেখানে ডমিনিক আর স্কারলেটের প্রতিটি স্মৃতি—তাদের খেলনা, ডমিনিকের স্কেচবুক, স্কারলেটের সেই ছোট ছোট ফ্রকগুলো আজও সময়ের গহ্বরে স্থির হয়ে আছে।
এতক্ষণ রিভেনের মুখ ছিল পাথরের মতো শক্ত, কিন্তু ঘরের মাঝখানে পা রাখতেই তার সেই সম্রাটোচিত আভিজাত্য তা'সের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। সে ধপ করে ডমিনিকের পুরনো বিছানাটার ওপর বসে পড়ল।এই বিছানায় দুই ভাই একসাথে ঘুমাতো ।অন্ধকার ঘরে কেবল জানলা দিয়ে আসা চাঁদের ফ্যাকাশে আলোয় ডমিনিকের একটা আধো সমাপ্ত ছবি দেখা যাচ্ছে।
রিভেন দুই হাতে নিজের মুখ ঢাকল। এতদিনের জমে থাকা পাথর চাপা কান্নাগুলো আজ বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মতো বেরিয়ে এল। অন্ধকার ঘরের নিস্তব্ধতা চিরে রিভেনের বুকফাটা আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। সে ডমিনিকের একটা ছবি নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
"কেন চলে গেলে ভাইয়া? কেন আমাকে একা এই নরকের সিংহাসনে বসিয়ে রেখে গেলে? তুমি বলেছিলে না আমরা ফ্লোরেন্স ঘুরতে যাব? তুমি বলেছিলে না ফিওরাকে আগলে রাখবে?"
সে এবার স্কারলেটের ছোট একটা পিয়ানোর সামনে গিয়ে বসল। পিয়ানোটা রিভেন স্কারলেটকে উপহার দিয়েছিল কিন্তু ফিওরা এতো ছোট ছিল যে সে পিয়ানোটা একবার বাজাতেও পারেনি।পিয়ানোর কি-বোর্ডে আঙুল ছোঁয়াতেই একটা কর্কশ সুর বেজে উঠল। রিভেনের চোখ থেকে তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল মেঝের ওপর। সে দেয়ালে ডমিনিকের ছবির দিকে তাকিয়ে উন্মাদের মতো বলতে লাগল,
"ভাইয়া, আমি আজ অনেক শক্তিশালী। সারা ইতালির মানুষ রিভেন আরওয়াইনের নামে কাঁপে। কিন্তু এই শক্তি দিয়ে আমি কী করব? আমি তো তোমাদের ফিরিয়ে আনতে পারলাম না!"
সে মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে ডমিনিকের অগোছালো বইগুলোর ওপর মাথা রাখল। তার কণ্ঠস্বর এখন যন্ত্রণায় নীল হয়ে গেছে।
"আমি আর কাউকে হারাবো না ভাইয়া... আর কাউকে না। তোমাকে হারিয়েছি,ফিওরাকে হারিয়েছি। আমার চারপাশের সব আলো এক এক করে নিভে গেছে। কিন্তু শপথ করছি ভাই, এবার আমি আমার ভালোবাসার মানুষকে এই অন্ধকারের হাত থেকে ছিনিয়ে আনব"
রিভেন একটু থামে,
"তোমাকে হারিয়েছি, ফিওরাকে হারিয়েছি। আমার জীবনের আকাশটা আজ নিকষ কালো। কিন্তু রোজেলিয়া... সে আমার এই অন্ধকার গহ্বরের একমাত্র ধ্রুবতারা। আমি তাকে এই আগুনে পুড়তে দেব না ভাই। তোমাদের হারানো শোককে আমি আমার বর্মে রূপান্তর করেছি। এবার যদি কেউ আমার ভালোবাসার দিকে হাত বাড়ায়, তবে সেই হাত আমি শরীর থেকে ছিঁ'ড়ে আলাদা করে দেব! যে সম্রাট তার ঘর সামলাতে পারে না, তার সিংহাসন সাজে না আমি এবার আর হারতে শিখিনি।"
রিভেন উঠে দাঁড়াল। তার চোখের জল এখন শুকিয়ে এক ভ'য়ংকর কাঠিন্যে রূপ নিয়েছে। সে ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ডমিনিকের স্কেচবুকটা শক্ত করে মুঠোয় চেপে ধরল। তার কণ্ঠস্বর এখন বজ্রের মতো গম্ভীর, যা পাথুরে দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে,
"তোমাদের মৃ'ত্যুর জন্য যারা দায়ী ভাইয়া, সেই ছায়াগুলো আজও অন্ধকারের ওপাশে লুকিয়ে আছে। আমি এখনো তাদের সবার পরিচয় খুঁজে পাইনি ঠিকই, কিন্তু শপথ করছি ভাইয়া—খুব শীঘ্রই আমি তাদের গর্ত থেকে টেনে বের করব। তাদের শেষ আ'র্তনাদ শোনার জন্য যম'দূতও আজ তৃ'ষ্ণার্ত।"
সে ডমিনিকের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে নিজের বাম হাতটা বুকের ওপর রাখল, যেন এক অলিখিত চুক্তিতে আবদ্ধ হচ্ছে। তার ঠোঁটের কোণে এক পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠল,
"আমি তাদের শুধু মা'রব না... আমি তাদের ৯৯টি ভিন্ন উপায়ে তি'ল তি'ল করে শেষ করব। প্রতিটি বু'লেটের শব্দে তোমার নাম থাকবে, আর প্রতিটি মাং'সে বিঁ'ধতে থাকা ছু'রির ফ'লায় ফিওরার সেই কা'ন্না প্রতি'ধ্বনিত হবে। তাদের র'ক্ত দিয়ে আমি এই কারুসো ম্যানশনের কল'ঙ্ক ধুয়ে সাফ করব। মৃ'ত্যু তাদের জন্য সহজ হবে না ভাইয়া, আমি তাদের জন্য মৃ'ত্যুকেও এক দুঃ'স্বপ্ন বানিয়ে দেব!"
To be continue,,,,