ফন্ট সাইজ:
থিম:
Paradise of sins

৩১তম পর্ব

লেখক: Fariha

#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins) #লেখনিতে_ফারিহা

পর্ব ৩১

(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)

মিলান শহরের এক অভিজাত অ্যাপার্টমেন্ট। বাইরে বৃষ্টির দাপট এখন কমে এলেও জানলার কাঁচে বিন্দু বিন্দু জল জমে আছে। এনজো তার বিশাল সোফাটায় অনেকক্ষণ ধরে নিথর হয়ে শুয়ে ছিল।

সোফা থেকে উঠে সে অলস পায়ে তার ছোট বোন এরিকার পড়ার টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। এরিকা খুব মনোযোগ দিয়ে তার মোটা একটা টেক্সটবুক পড়ছে,তার চোখ দুটো ক্লান্ত কিন্তু স্থির। এনজো হুট করে ঝুকে পড়ে এরিকার হাত থেকে বইটা এক ঝটকায় ছিনিয়ে নিল।

"এত পড়ে কী করবি শুনি? মগজটা কি একদম দই বানিয়ে ফেলবি?"

এরিকা চমকে উঠে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। সে হাত বাড়িয়ে বইটা ধরার চেষ্টা করতে করতে চিৎকার করে উঠল,

"ভাইয়া! বই ফেরত দাও বলছি! আর মাত্র দু-টো চ্যাপ্টার বাকি, কাল আমার টেস্ট!"

এনজো বইটা সোফায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে এরিকার দুই কাঁধ ধরে নাড়িয়ে দিল।

"রাখ তোর চ্যাপ্টার।চল, বাইক নিয়ে বের হই। তোকে আইসক্রিম খাইয়ে নিয়ে আসি, চল!"

"পাগল হয়েছো? কালকের পরীক্ষাটা আমার জন্য কতটা ইম্পর্টেন্ট তুমি জানো? এই টেস্ট এ ফেল করলে আমি স্কলারশিপ পাওয়া থেকে একধাপ পিছিয়ে যাবো তখন আমার সব পরিশ্রম বৃথা যাবে। আমি তোমার মতো রাস্তায় টো টো করে ঘুরে বেড়াতে পারব না।"

এনজো এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে টেবিলের ওপর বসল,

"সিরিয়াসলি এরিকা? সামান্য একটা স্কলারশিপের জন্য তুই নিজের ঘুম হারাম করছিস? তোর কি মনে হয় তোর বড় ভাইয়ের পকেটে এতই টান পড়েছে যে তুই একটা স্কলারশিপ না পেলে পড়াশোনা করতে পারবি না?"

সে এরিকার চিবুকটা আলতো করে নেড়ে দিয়ে দর্পভরে বলল,

"এই এনজো ভ্যালেন্টিনো তোর মতো ১০টা এরিকাকে বিশ্বের দামী প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলোতে পড়ানোর সামর্থ্য রাখে। টাকার পাহাড় দিয়ে তোর রাস্তা ঢেকে দেব আমি, শুধু বল কোথায় পড়তে চাস?"

এরিকা এবার শান্ত হলো। সে এনজোর চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থিরে বলল,

"আমি জানি তোমার কত ক্ষমতা, ভাইয়া। কিন্তু আমি তোমার টাকার পাহাড় চাই না। আমি চাই নিজের যোগ্যতায় কিছু করতে। তোমার ওই অ'ন্ধকার জ'গতের উপার্জিত টাকায় আমি আমার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে চাই না। আমি চাই তুমিও একদিন আমার অর্জিত সম্মানের ওপর গর্ব করো ।"

এনজোর হাসিমুখটা মুহূর্তেই ম্লান হয়ে গেল। এরিকার এই সহজ কথাগুলো তার মাফিয়া সত্তার ভেতরে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করল। সে কিছু না বলে বইটা আবার এরিকার সামনে গুছিয়ে রাখল।কিছুক্ষণ স্তব্ধ থেকে সে আবার তার স্বাভাবিক রুপে ফিরে এলো।

এনজো সোফার ওপর হাত-পা ছড়িয়ে দিয়ে ধপ করে শুয়ে পড়ল। তার চোখেমুখে এখন একাকীত্ব আর বিরক্তি। সে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে নিজের মনেই গজগজ করতে লাগল,

"ধুর! সবকটা পাগল হয়ে গেছে। তুই আছিস তোর এই মরা বইপত্র নিয়ে ব্যস্ত। ওদিকে লরেঞ্জো তো তার ফ্যামিলি ছাড়া আর কিছু বোঝেই না। জ্যাকের কথা তো বাদই দিলাম, সদ্য বিয়ে করা বউয়ের আঁচল ধরে দিনরাত পড়ে থাকে। মারকো তো তার ক্লাবের ওই ললনাদের নিয়ে নরক গুলজার করছে। আর সাইলাস..."

এনজো একটু থামল, তারপর একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বিড়বিড় করল,

"সে-ও তো তার গন্তব্য পেয়ে গেছে। ওই নাইলা মেয়েটা তার হাড় মাস সব এক করে দিচ্ছে, আর সে কিনা ওটাতেই শান্তি খুঁজে পাচ্ছে! আজব সব পাবলিক!"

এনজো নিচু স্বরে কথাগুলো বললেও এরিকার কান এড়াতে পারল না। 'সাইলাস' নামটা কানে আসতেই এরিকা চেয়ার ঘুরিয়ে পেছনে ফিরল। তার হাতের কলমটা মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। সে একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

"সাইলাস? মানে সাইলাস ভাইয়া? সে কাকে পেয়ে গেছে? তুমি কার কথা বলছো ভাইয়া?"

এনজো সোফায় শুয়ে থেকেই এরিকার দিকে আড়চোখে তাকাল। সে একদম হালকা মেজাজে বলল,

"নাইলা নামের একটা মেয়ে। বসের বাসার পরিচালিকা । সারাক্ষণ সাইলাসের সাথে টম অ্যান্ড জেরি খেলে।আর কোল্ড ব্লাডেড কিলারটাকে দেখি ওই মেয়েটার সামনে গিয়ে বিড়াল হয়ে যেতে। সাইলাস এখন ডিউটি শেষ করেই ওর পিছু পিছু ছোটে। মনে হয় ছেলেটা এবার সত্যিই ফেঁসে গেছে।"

এনজো নিজের মনেই হাসতে হাসতে কথাগুলো বলে যাচ্ছিল, কিন্তু সে খেয়াল করল না ওপাশে কী ঘটে গেছে। এনজোর প্রতিটি শব্দ এরিকার কানে যেন তপ্ত সিসার মতো বিঁধছিল।

এরিকার হাত থেকে কলমটা অজান্তেই মেঝের ওপর পড়ে গেল। তার ফর্সা মুখটা মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে হয়ে পাংশুটে বর্ণ ধারণ করল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন খালি হয়ে আসছে তার। সাইলাস ভাইয়া যার প্রতি এক অদ্ভুত, অব্যক্ত ভালোলাগা সে অনেকদিন ধরে মনের কোনো এক গোপন কোণে সযত্নে লালন করছিল, সেই মানুষটা অন্য কারোর হয়ে গেছে?

এনজো তখনো চোখ বুজে সাইলাস আর নাইলার খুনসুটির গল্প ভাবছিল, তাই সে দেখতে পেল না এরিকার চোখে জমে ওঠা সেই সূক্ষ্ম অশ্রুবিন্দু। এরিকা দ্রুত নিজের চোখের কোণের জলটা মুছে নিল। তার মনের ভেতর এখন এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব। একদিকে সাইলাসের অ'পরাধ জগতের সাথে যুক্ত থাকায় তার ভালোলাগাকে সবসময় দমিয়ে রাখার চেষ্টা , আবার অন্যদিকে তাকে হারানোর য'ন্ত্রণাটাও স'হ্য হচ্ছে না। এক তীব্র Bitter-Sweet অনুভূতি তাকে গ্রাস করছে। সে মনে মনে ভাবল, 'ভালোই হলো, সাইলাস ভাইয়া অন্তত কাউকে পেল।আমার এই একতরফা মায়া তো কোনোদিন পূর্ণতা পেত না।'

এরিকা কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার গলার স্বরটা ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে সে নিচু স্বরে বলল,

"ভাইয়া, আমার... আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। আমি শুতে যাচ্ছি। লাইটটা নিভিয়ে দিও।"

এনজো তখনো আচ্ছন্ন হয়ে ছিল, একটা অবহেলার সুরে "হুম" বলে পাশ ফিরল। কিন্তু সেকেন্ড দুয়েকের মধ্যেই তার মস্তিষ্ক সজাগ হয়ে উঠল। সে এক ঝটকায় সোফায় সোজা হয়ে বসল।

" কী বললি? ঘুম পাচ্ছে মানে?"

এনজো চোখ কপালে তুলে এরিকা দিকে তাকাল।

"এই তো পাঁচ মিনিট আগে টেস্ট আর স্কলারশিপের দোহাই দিয়ে আমাকে লাথি মেরে বের করে দিচ্ছিলি! এখন হঠাৎ করে ঘুমের পরী নামল কোত্থেকে? কাল যে টেস্ট, ওটা কি এখন ভূতে দেবে?"

এরিকা দরজার দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে আমতা আমতা করে বলল,

"না... আসলে মাথাটা একটু ঘুরছে। সকালে উঠে পড়ে নেব।"

এনজো চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে এরিকার সামনে গিয়ে পথ আগলে দাঁড়াল। সে এরিকার কপালে হাত দিয়ে তাপমাত্রা চেক করার ভান করল।

" কপালে তো আগুন জ্বলছে না, কিন্তু মুখটা এমন দেখাচ্ছে যেন পুরো মিলানের ট্যাক্স তোর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই যে এরিকা ভ্যালেন্টিনো, আমার চোখে ধুলো দেওয়া কি এতই সহজ? দুই মিনিট আগে যে মেয়েটা স্কলারশিপের জন্য জী'বন দিতে রাজি ছিল, সে এখন টেস্টের মায়া ত্যাগ করে ঘুমের রাজ্যে যাচ্ছে? ব্যাপারটা হজম হচ্ছে না।"

সে এরিকার চিবুকটা আলতো করে ধরে একটু নাড়িয়ে দিল, তারপর কৌতুকের সুরে বলল,

"নাকি আবার কোনো অদৃশ্য ভূতের প্রেমে পড়লি? যার বিরহে এখন পড়াশোনা মাথায় উঠেছে? দেখিস, প্রেমে পড়লে কিন্তু মগজ আর দই হবে না, ওটা সরাসরি পনির হয়ে যাবে!"

এরিকা জোর করে একটা হাসি ফুটিয়ে তুলল, যদিও তার বু'কের ভেতরটা তখনো চি'রে যাচ্ছিল। সে এনজোর হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলল,

"উফ ভাইয়া! তোমার ওই আজেবাজে জোকস আর সিনেমার স্ক্রিপ্ট বন্ধ করো। আমি জাস্ট ক্লান্ত। সারাদিন লাইব্রেরিতে ছিলাম, তাই হয়তো শরীরটা সায় দিচ্ছে না।"

এনজো এবার একটু গম্ভীর হলো। সে এরিকার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে নরম স্বরে বলল,

"আচ্ছা যা। তুই তো আবার জেদি মেয়ে, যা বুঝিস তাই করিস। আচ্ছা শোন তোর জন্য একটা ভালো খবর আছে। পরশুদিন রাতে আমি একটা মিশনে যাচ্চি, তুই চাইলে তোর প্রিয় ইতালিয়ান রেস্টুরেন্ট থেকে যা খুশি অর্ডার করতে পারিস। আমার ক্রেডিট কার্ডটা আজ টেবিল ড্রয়ারে রেখে যাব। মন খারাপ করে থাকিস না, তোর এই গম্ভীর মুখটা দেখলে আমার ব'ন্দুকের নি'শানা নড়ে যায়।"

এনজো নিজের রুমের দিকে চলে গেল।এরিকা জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে বৃষ্টি এখন থেমে গেছে, কিন্তু আকাশের মেঘগুলো এখনো সরেনি। এরিকা বিড়বিড় করে বলল,

"পা'গল ভাইয়া আমার... তুমি টাকার পাহাড় দিয়ে আমার পথ ঢাকতে চাও, অথচ জানো না মনের ভেতরের এই শূন্যতা কোনো পাহাড় দিয়েই ভরাট করা যায় না"

__________

নাইলা অত্যন্ত সতর্ক পায়ে লাইব্রেরির দীর্ঘ করিডোর ধরে এগিয়ে আসছিল। মিনিট দশেক আগে সাইলাস তাকে মেসেজে লিখেছিল ~লাইব্রেরিতে আসো। খুব জরুরি কথা আছে।

সে লাইব্রেরির ভারী ওক কাঠের দরজাটা সামান্য ঠেলে ভেতরে পা বাড়াল। ভেতরের পরিবেশটা নিস্তব্ধ শুধু ল্যাভেন্ডারের হালকা সুগন্ধে ম ম করছে। নাইলা চারপাশে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেল না। সে বিড়বিড় করে বলল,

"পা'গ'লটা কোথায় গেল? ডেকে এনে এখন নিজেই গায়েব?"

সে যখন ঘরের মাঝখানে যাওয়ার জন্য এক পা বাড়াল, ঠিক তখনই বাতাসের বেগে একটা ছায়া তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। নাইলা কিছু বুঝে ওঠার আগেই কেউ একজন তার কোমর জড়িয়ে ধরে এক ঝটকায় তাকে দরজার পাল্লার সাথে চেপে ধরল।

নাইলার গলার কাছে একটা আ'র্তনাদ আটকে গেল, কিন্তু সামনের চেনা ঘ্রাণটা পেতেই সে স্থির হয়ে গেল।

সাইলাসের দুই হাত নাইলার মাথার দু-পাশে দরজার ওপর শক্ত করে রাখা। তার পরনের কালো শার্টের হাতাগুলো গোটানো, আর কপালে ঝুলে থাকা অবাধ্য চুলগুলো আজ আরও বেশি বন্য দেখাচ্ছে। সাইলাসের নিশ্বাস নাইলার কপালে আগুনের হলকার মতো লাগছে।

নায়লা হাপাতে হাপাতে নিচু স্বরে বলল, "ইউ... ইউ ফা'কিং সা'ই'কো! হা'র্ট অ্যা'টা'ক করিয়ে মা'রার এত শখ কেন তোমার? আর এই কি তোমার 'জরুরি কথা' বলার ঢং?"

সাইলাস কোনো উত্তর দিল না। সে আরও একটু ঝুঁকে এল নাইলার দিকে। তাদের মাঝখানে এখন এক চিলতে বাতাস ঢোকারও জায়গা নেই। সাইলাস তার একটা হাত সরিয়ে নাইলার গালের ওপর রাখা কয়েকটা এলোমেলো চুল কানের পেছনে গুঁজে দিল। তার আঙুলের শীতল স্পর্শে নাইলার সারা শরীরে এক শিহরণ বয়ে গেল.

"জরুরি কথা তো অনেক আছে। গত দুই ঘণ্টা ধরে তোমাকে না দেখতে পেয়ে আমার প্রতিটি সেকেন্ড মনে হচ্ছিল এক একটা যুগ।"

নাইলা নিজের হৃৎপিণ্ডের ধকধকানি আড়াল করার জন্য মুখটা বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,

"Drama king ,এখন কী বলার জন্য ডেকেছিলে সেটা বলে ফেলো তো? হাতে অনেক কাজ আছে।"

সাইলাস হঠাৎ এক চিলতে পৈশাচিক হাসি হাসল। সে নাইলার কানের লতিটা দাঁত দিয়ে আলতো করে ছুঁয়ে খুব নিচু স্বরে প্রশ্ন করল,

" Do you want KFC, Nyla?"

নাইলা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ভ্রু কুঁচকে সে সাইলাসের চোখের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,

"সিরিয়াসলি? জরুরী কথা বলবে ডেকে তুমি এখন আমাকে চিকেন ফ্রাই অফার করছ? আমার খিদে নেই সাইলাস। ছাড়ো আমাকে!"

সাইলাস হাসল।

"আমি ওই KFC-র কথা বলছি না নাইলা। আমার ডিকশনারিতে এটার মানে একটু আলাদা..."

সে নাইলার ঠোঁটের খুব কাছে নিজের ঠোঁট নিয়ে ফিসফিস করল,

"KFC i mean... K'iss, F*k and Cu'ddle."

নাইলার চোখ দুটো মুহূর্তের মধ্যে বিস্ময়ে আর লজ্জায় ঠিকরে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। তার গাল দুটো টকটকে লাল হয়ে উঠল, যেন কেউ সেখানে রক্তের আলপনা এঁকে দিয়েছে। সে রাগে আর অপমানে সাইলাসের বুকে এক ধাক্কা দিয়ে চিৎকার করে উঠল,

"ইউ ডা'র্টি মাই'ন্ডে'ড সা'ইকো! তুমি... তুমি ওইদিন আমাকে চার্চে নিয়ে গিয়েছিলে কনফেশনের জন্য? রিয়েলি? তোমার মুখে এসব কথা শোনার পর আমার কান দুটো অপবিত্র হয়ে গেছে। এখনই হোবি ওয়াটার দিয়ে কান ধোয়া দরকার আমার! দাঁড়াও, আমি এখনই বসের কাছে যাচ্ছি। বসকে গিয়ে সব বলছি যে তার বডিগার্ডের মাথায় এখন ডা'র্ক রো'মাঞ্চ ঘোরে। আজ তোমার একদিন কি আমার একদিন!"

সাইলাস নাইলাকে আটকালো সে এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, যা নাইলার গলার খাঁজে উষ্ণ এক শিহরণ হয়ে আছড়ে পড়ল। সে তার বাম হাতটা দরজার ওপর থেকে সরিয়ে নিয়ে নাইলার কোমরের একদম কাছে এনে থামাল,

"okay okay. I was jocking now Cut the crap, Nyla. আমি ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলতে জানি না। So, tell me, ডেটে যাবে আমার সাথে ?Will you going out with me?"

নাইলা এক মুহূর্তের জন্য মনে করল তার কান ভুল শুনেছে। সে চোখ বড় বড় করে হা হয়ে তাকিয়ে রইল। পরক্ষণেই সে চিৎকার করে ওঠার ভঙ্গিতে বলল,

"What the f*ck? ডেট মানে? তোমার মাথাটা কী আজকে পুরোপুরি বিগড়ে গেছে সাইলাস? কী সব আজেবাজে বকছো ? আর আমাদের সম্পর্কের গ্রাফটা এখনো 'হ্যাঁ' পর্যন্ত পৌঁছায়নি। আর তুমি ডিরেক্ট ডেট এর প্ল্যান করে বসে আছো? ইউ আর লিটারালি ক্রে'জি!"

"Are you sure ? আমাদের সম্পর্কের গ্রাফটা এখনো 'হ্যাঁ' পর্যন্ত পৌঁছায়নি ?

"হ্যাঁ ,sure "

সাইলাস খুব ধীরস্থিরে নিজের পকেট থেকে ফোনটা বের করল। নাইলা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে, কিছুই বুঝতে পারছে না। হঠাৎ নীরবতা চিরে স্পিকার থেকে ভেসে এল একটা ভাঙা কণ্ঠস্বর,

"হ্যাঁ! হ্যাঁ, আমি তোমাকে ভালোবাসি, ইউ ব্লা'ডি সা'ইকো! খুশী তো এখন?... তুমি যখন সামনে থাকো না, তখন আমার মনে হয় আমার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে-।"

নাইলার মুখটা মুহূর্তের মধ্যে টকটকে লাল আপেলের মতো হয়ে গেল। লজ্জায়, অপমানে আর বিস্ময়ে সে পাথর হয়ে গেল। পরক্ষণেই সে উ'ন্মাদের মতো সাইলাসকে ধা'ক্কা দিতে শুরু করল।

"ইউ বা'স্টা'র্ড! এটা রেকর্ড করেছ তুমি? হাউ ড্যে'য়ার ইউ! ডিলিট করো ওটা এখনই! ওটা... ওটা আমি আবেগের বশে বলেছিলাম, ডিলিট ইট!"

নাইলা দু-হাতে সাইলাসের বুক চাপড়াতে লাগল, কিন্তু সাইলাসের পাথরের মতো শক্ত শরীর এক চুলও নড়ল না।

সাইলাস এক ঝটকায় নাইলার দুটো কবজি ধরে মাথার ওপর দরজার সাথে চেপে ধরল। নাইলার সব ছটফটানি মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল। সাইলাসের মুখ এখন নাইলার একদম কাছে, তার তপ্ত নিশ্বাস নাইলার ঠোঁট স্পর্শ করছে। সাইলাসের চোখে এক ভয়ংকর গাম্ভীর্য নেমে এল, যেন এক মরণপণ যুদ্ধের আগে সেনাপতির চোখ।

সে খুব নিচু আর গাঢ় স্বরে বলল,

"অনেক নাটক করেছ নাইলা, আর না।বস আমাকে বিজনেস ডিলের জন্য আবারও লন্ডন পাঠাচ্ছেন"

সাইলাস একটু থামল। তার হাতের বাঁধন আরও শক্ত হলো, যেন সে নাইলার ধমনীর স্পন্দন অনুভব করতে চাইছে। তার চোখের লালচে আভা এখন এক অস্থিরতায় কাঁপছে।

"আমার যাওয়া আর না যাওয়া সবকিছু এখন এই ঘরে, এই মুহূর্তে তোমার ওপর নির্ভর করছে। আমি তোমাকে একটা অপশন দিচ্ছি। স্রেফ 'হ্যাঁ' অথবা 'না'। ডন্ট ট্রাই টু বি স্মার্ট দিস টাইম।"

সাইলাস তার ললাট নাইলার কপালে ঠেকিয়ে প্রশ্ন করল,

"Do you love me, Nyla? Do you really want me to stay? যদি তুমি বলো 'না', তবে আমি আজই এই শহর ছেড়ে চলে যাব, আর কোনোদিন ফিরে আসব না তোমার ওই তিতকুটে ঝগড়া শুনতে। কিন্তু যদি তোমার উত্তর হয় 'হ্যাঁ'... তবে পৃথিবীর কোনো শক্তি আমাকে এই মুহূর্তে তোমার কাছ থেকে এক ইঞ্চি দূরে সরাতে পারবে না। so tell me"

নাইলার স্থির হয়ে দাড়িয়ে রইলো।তার

চোখে জল টলমল করছে এক তীব্র অসহায়ত্বে। সাইলাসের সেই তপ্ত ললাটের স্পর্শে তার মস্তিষ্কের সব যুক্তি আজ অচল।

নাইলা তার কাঁপাকাঁপা ঠোঁট জোড়া কোনোমতে ফাঁক করে অস্ফুট স্বরে বলল,

"কেন এমন শুরু করেছ আমার সাথে, হ্যাঁ? কতবার আমার মুখ থেকে এ কথা বলিয়ে নিবে ?এক প্রকার ব্ল্যাকমেইল করছ তুমি আমাকে।লন্ডন যাওয়ার দোহাই দিয়ে তুমি আসলে আমার হৃদ'পিণ্ডটা বের করে নিতে চাও সাইলাস। ইউ আর আ ম'নস্টার!"

সাইলাস হঠাৎ স্থির হয়ে গেল। তার চোখের মণি দুটো যেন কোনো অন্ধকার সাগরের অতল গহ্বর, যেখানে কেবল হাহাকার খেলা করে। সে তার কপালটা নাইলার কপাল থেকে সরাল না, বরং আরও গভীরভাবে চেপে ধরল। তার কণ্ঠস্বর এখন এক ভাঙা সেতারের মতো শোনাল বিষণ্ণ, কিন্তু তীক্ষ্ণ,

"ব্ল্যাকমেইল? হয়তো তাই। কারণ ভালোবাসা জিনিসটা আমার ডিকশনারিতে কোনোদিন ছিল না। কিন্তু যেদিন থেকে তুমি এই ম্যানশনে পা রেখেছ, মাই হোল ওয়ার্ল্ড বিকাম মিজারেবল! ড্যাম ইট, নাইলা!এখন আমি চোখ বন্ধ করলেই শুধু তোমাকে দেখি ।"

সাইলাস এক মুহূর্ত থামল। তার নিশ্বাস এখন নাইলার গলার খাঁজে এক তপ্ত ঝড়ের মতো আছড়ে পড়ছে। সে আরও গাঢ় স্বরে বলতে লাগল,

"আই ক্যান্ট ইভেন ব্রেদ উইদাউট ইউ। তুমি ছাড়া আমি আজ এক অন্ধকারের পথিক যার কোনো গন্তব্য নেই। সো ডোন্ট কিপ মি ইন দিস টর্চার। জাস্ট সে ইট... ডু ইউ ওয়ান্ট মি টু স্টে?"

নাইলা এবার ডুকরে কেঁদে উঠল। তার চোখের তপ্ত জল সাইলাসের শার্টের কলার ভিজিয়ে দিচ্ছে। সে সাইলাসের বুকের সেই হাড়কাঁপানো ধকপকানি অনুভব করতে পারছে।

"অসভ্য... স্টু'পিড সা'ই'কো।থাকো! চলে যেতে বলেছি তোমাকে? এক পাও নড়বে না এই শহর থেকে ।ভালোবেসে ফেলেছি তোমাকে, ইউ ব্লা'ডি সা'ইকো! খুশী তো এখন? তোমার এই নিষ্ঠুর খেলায় আমি বার বার হেরে যাচ্ছি "

নাইলা আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। তার বুকের ভেতরটা তখন ঝোড়ো হাওয়ার মতো কাঁপছে, আর গাল দুটো লজ্জায় আগুনের পি'ণ্ডের মতো জ্ব'লছে। সে এক ঝটকায় সাইলাসের লোহার মতো শক্ত বাঁধন থেকে নিজের কবজি দুটো ছাড়িয়ে নিল। সাইলাস তখনও স্তব্ধ, তার চোখে এক বিজয়ী কিন্তু গভীর তৃপ্তির আভা। নাইলা তাকে সজোরে এক ধাক্কা দিয়ে দরজার পাল্লা খুলে করিডোর দিয়ে উ'ন্মাদের মতো দৌড়ে পালাল।

সাইলাস দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার ওষ্ঠাধরে সেই চিরচেনা পৈশাচিক কিন্তু মায়াবী হাসিটা আবার ফিরে এল।

________

রিভেন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে খুব মনযোগ দিয়ে তার কবজিতে প্ল্যাটিনামের ঘড়িটা পরছিল। তার পরনে নেভি ব্লু রঙের একটি থ্রি-পিস স্যুট, যা তার পেশিবহুল শরীরকে এক রাজকীয় আভিজাত্য দিয়েছে।

রোজেলিয়া ড্রেসিংরুমে ঢুকে খুব ধীরপায়ে রিভেনের দিকে এগিয়ে এল। তার ঠোঁটে আজ এক চিলতে হাসি। সে রিভেনের একদম পাশে গিয়ে আলতো করে আলমারির পাল্লায় হেলান দিয়ে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি রিভেনের প্রতিটি নড়াচড়ার ওপর নিবদ্ধ।

রিভেন আয়নার প্রতিবিম্বে রোজেলিয়াকে দেখল। সে ঘড়ির স্ট্র্যাপটা ঠিক করতে করতে গম্ভীর গলায় বলল,

"ওভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেন রোজ পেটাল? কিছু বলবে?"

রোজেলিয়া কিছু বলল না। সে শুধু তার সেই মায়াবী হাসিটা বজায় রেখে রিভেনের চোখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার মনে মনে একরাশ উ'ত্তেজনা আজ তার জন্মদিন, অথচ এই লোকটা সকাল থেকে একবারও তাকে উইশ করেনি।তার বাবা মা ফোনে উইশ না করলেতো সে ভুলেই যেত ।

রিভেন আয়না থেকে চোখ সরিয়ে রোজেলিয়ার দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকাল। তার ভ্রু সামান্য কুঁচকে এল। সে পকেটে হাত দিয়ে রোজেলিয়ার খুব কাছে এগিয়ে এল।

"কী হয়েছে? ওভাবে হাসছো কেন? কিছু বলবে"

রোজেলিয়া এবার মাথা নেড়ে নিচু স্বরে বলল,

"নাহ, কিছু না। এমনিই।"

"এমনিই কেউ ওভাবে হাসে না। শরীর খারাপ লাগছে?"

রিভেন খুব নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে প্রশ্নগুলো করল, যেন সে সত্যিই পৃথিবীর সবথেকে বেখবর মানুষ।

রোজেলিয়ার ভেতরের আনন্দটা এবার একটু দমে গেল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিভেনের স্যুটটা ঠিক করে দেওয়ার ছলে তার বুকের খুব কাছে মুখ নিয়ে এল। সে আশা করছিল রিভেন অন্তত এখন তার কপালে একটা চু'মু খে'য়ে বলবে'হ্যাপি বার্থডে'। কিন্তু রিভেন তখন তার ফোন বের করে ফোনের মেসেজ চেক করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।

রোজেলিয়া অভিমানী স্বরে বলল, "আপনার কি আজ বিশেষ কোনো কিছুর কথা মনে পড়ে?"

রিভেন ফোন থেকে চোখ না তুলেই বলল,

"হ্যাঁ, আজ লন্ডনের ক্লায়েন্টের সাথে মিটিং আছে, এনজো আর সাইলাসকে নিয়ে বের হতে হবে। হাতে একদম সময় নেই। কেন, আর বিশেষ কী আছে?"

রোজেলিয়ার গাল দুটো অপমানে আর অভিমানে ফুলে উঠল। সে একটা শুকনো হাসি দিয়ে বলল,

"না, কিছুই না। আপনি আপনার মিটিং নিয়েই থাকুন। আমি নিচে যাচ্ছি।"

সে দ্রুত ড্রেসিংরুম থেকে বেরিয়ে এল। রিভেন একবারও পেছন থেকে তাকে ডাকল না। করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,

"পা'গল আমি! ভেবেছিলাম উনি বোধহয় আমার গল্পের বইয়ের হিরোদের মতো হবেন। মাঝরাতে কেক কেটে চমকে দেবেন, কপালে চুমু খেয়ে বলবেন আমিই তাঁর পৃথিবী! অথচ এই লোকটা আমার জন্মদিনের তারিখটাই মনে রাখেনি। জাস্ট আ হা'র্টলে'স মাফিয়া!"

সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় তার চোখের ঝাপসা দৃষ্টিতে কেবল তার বাবার মুখটা ভেসে উঠল।তার

বাবার কথা মনে পড়ছে খুব।আফসার সবসময়ই তাকে ঘুম থেকে তুলে কপালে চুমু খেয়ে বলতেন'শুভ জন্মদিন আমার রাজকুমারী'। আজ ম্যানশনের এই আভিজাত্যের মাঝে সেই রাজকুমারী আজ বড় বেশি একা।

নিচে নেমে সে দেখল আভা মেহেরিন কারুসোর জন্য চা ঢালছে। রোজেলিয়া আভার কাছ থেকে ট্রেটা নিলো,

"আমাকে দাও আভা। আমি নিয়ে যাচ্ছি।"

আভা মায়াবী হেসে বলল,

"ওকে "

রোজেলিয়া কোনো উত্তর দিল না। সে ট্রে হাতে নিয়ে মেহেরিন কারুসোর রুমের দিকে এগিয়ে গেল।ঘরে ঢুকে ঘরটা খালি দেখে সে একটু অবাক হলো, তারপর দেখল মেহেরিন বারান্দায় একটা চেয়ারে বসে বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন।

রোজেলিয়া ধীরপায়ে বারান্দায় গিয়ে টেবিলের ওপর ট্রে-টা রাখল। রোজেলিয়া চায়ের কাপটা এগিয়ে দিতেই মেহেরিন তার দিকে ফিরলেন। তার তীক্ষ্ণ চোখের মণি দুটো রোজেলিয়ার মুখের ওপর স্থির হলো।

মেহেরিন অত্যন্ত শান্ত স্বরে বললেন,

"চায়ের কাপটা রাখো রোজেলিয়া। আর আমার পাশে এসে বসো।"

রোজেলিয়া মেহেরিনের পাশের খালি চেয়ারটায় গিয়ে বসল। মেহেরিনের দৃষ্টি তখনো দূরের ওই ধূসর দিগন্তে।

"কিছু বলবেন মম?"

মেহেরিন তার দিকে না ফিরেই শান্ত স্বরে বললেন,

"এমনিই। তা তোমার বাংলাদেশে দিনকাল কেমন কাটলো?"

রোজেলিয়া একটু ম্লান হেসে বলল,

"ভালোই। অনেক দিন পর নিজের দেশে গিয়ে বেশ ভালো লেগেছে।"

"সেখানে আর কে কে আছে তোমার?"

মেহেরিন এবার রোজেলিয়ার চোখের দিকে তাকালেন।

"নানু, মামারা সবাই ওখানেই। দাদা-দাদি মারা গেছেন অনেক বছর হলো, তবে চাচারা আছেন। চাচাদের সাথে দেখা করা হয়নি ।নানু আজ এতো বছর পর আমাকে দেখে অনেক খুশি ছিলেন "

মেহেরিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

"আমারও অনেক বছর হলো বাংলাদেশ যাওয়া হয়নি। ডমিনিক আর রিভেন খুব ছোট থাকতে একবার গিয়েছিল। ডমিনিকের আবার বাংলাদেশ খুব পছন্দ ছিল। ওর মৃ'ত্যুর পর আর কখনো যাওয়া হয়নি"

ডমিনিকের কথা উঠতেই রোজেলিয়ার সেই রাতের কবরস্থানের দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। সে কিছুটা ইতস্তত করে শুকনো ঢোক গিলে বলল,

"আচ্ছ-আচ্ছা মম, একটা কথা জিজ্ঞাসা করব?"

মেহেরিন একটু স্থির হলেন, তারপর ধীরলয়ে মাথা নাড়লেন।

"হ্যাঁ, করো।"

রোজেলিয়া হাতের আঙুলগুলো মোচড়াতে মোচড়াতে বলল,

"আসলে... সেদিন রিভেন আমাকে ডমিনিক ভাইয়া আর ওনার ছোট বোনের ক'বরের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বললেন যে ডমিনিক ভাইয়া নাকি পা'নিতে ডু'বে মা'রা গেছেন আর ফিওরার গায়ে র'ক্ত ছিল। সেদিন আসলে ঠিক কী হয়েছিল মম? কীভাবে এমন একটা দু'র্ঘটনা ঘটল?"

মেহেরিন মুহূর্তের জন্য পাথর হয়ে গেলেন। তার সেই তীক্ষ্ণ চোখে এক লহমার জন্য এক গভীর যন্ত্রণা খেলে গেল। তিনি একটা অত্যন্ত দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিলেন,

"সেদিন..." মেহেরিনের গলার স্বর কিছুটা ভেঙে এল, কিন্তু তিনি তার চিরচেনা গাম্ভীর্য বজায় রাখার চেষ্টা করলেন।

"আসলে, ফিওরা যখন জন্ম নেয়, জন্ম থেকেই ওর 'সিস্টিক ফা'ইব্রোসিস' ছিল। ইভানো ওর জন্মে এতই খুশি ছিল যে বিষয়টাকে খুব একটা পাত্তা দেয়নি। আমরা যখন ওকে বাসায় নিয়ে এলাম, ও সুস্থই ছিল। কিন্তু একদিন..."

মেহেরিন একটু থামলেন।

"আগের দিন ইভানোকে ব্যবসায়িক কাজে ইতালির বাইরে যেতে হলো। মাঝরাতে হঠাৎ ফিওরার প্রচণ্ড শ্বা'সকষ্ট আর জ্ব'র শুরু হলো। আমি একদম দিশেহারা হয়ে পড়লাম। আমাদের প্রাইভেট ডাক্তারকে বারবার কল দিলাম, কিন্তু তিনি কল ধরলেন না। আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। এদিকে আমাদের বিশ্বস্ত গার্ড ভিতো বাসায় ছিল। রিভেন আর ডমিনিক ঘুমে ছিল। কিন্তু আমি একা ভরসা পাচ্ছিলাম না বলে ডমিনিককে ডেকে আমার সাথে নিয়ে নিলাম।"

মেহেরিনের চোখ দুটো এখন শূন্যে স্থির। তিনি যেন সেই অ'ভিশ'প্ত রাতটা আবার দেখতে পাচ্ছেন।

"গাড়িতে আমরা যখন মেডিকেলে যাচ্ছিলাম, মধ্যরাত হওয়ায় রাস্তা ফাঁকা ছিল। কিন্তু হঠাৎ একটা গাড়ি আমাদের ফলো করা শুরু করে। প্রথমে আমরা কেউ বুঝতে পারিনি, কিন্তু ভিতো যখন খেয়াল করল তখন সে খুব স্পিডে গাড়ি চালানো শুরু করে। গাড়িটি বারবার আমাদের গাড়িকে ধা'ক্কা দে'য়ার চেষ্টা করছিল। একসময় ভিতো মেইন রোড ছেড়ে বনের ভেতরের একটা সরু রাস্তায় ঢুকে পড়ে। রাতের অন্ধকারে ভিতো গাড়িটি ফুল স্পিডে নিয়ে যাচ্ছিল। এদিকে ডমিনিক ভ'য়ে কুঁ'কড়ে যাচ্ছিল, আর স্কারলেটের অবস্থা তখন খুবই খারাপ।"

রোজেলিয়ার নিঃশ্বাস আটকে এল। মেহেরিন বলতে থাকলেন,

"আসলে সেদিন কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাদের গাড়িটা একটা ব্রিজ থেকে ছিটকে নিচের নদীতে পড়ে যায়। আমরা অনেক কষ্টে গাড়ি থেকে বের হই। ডমিনিক সাঁতার জানত না আর তার 'অ্যা'কুয়াফো'বিয়া' ছিল তাই পানিতে প্যা'নিক আ্যা'টাক হতো। ভিতো ডমিনিককে নিয়ে সাঁতার কাটতে শুরু করল, আমিও ফিওরাকে বুকে চেপে ধরে তীরের দিকে এগোতে লাগলাম। কিন্তু হঠাৎ... কয়েকটা গু'লির শব্দ হলো।"

মেহেরিনের গলার স্বর এবার একদম কাঁপতে শুরু করল।

"আমরা আতঙ্কে কী করব বুঝতে পারছিলাম না। ঠিক তখনই একটা বু'লেট এসে সরাসরি আমার কোলের ফিওরার গায়ে লাগল। ওদিকে গু'লির শব্দে ভিতো চমকে উঠলে হঠাৎ ওর হাত থেকে ডমিনিক ছুটে যায়। অন্ধকারে ডমিনিক পানির অতলে ডুবতে থাকে। আমি ফিওরাকে নিয়ে কোনো রকমে পাড়ে উঠে আসি। হাত দিয়ে অনুভব করি ফিওরার শরীর থেকে গরম র'ক্ত ঝ'রছে। ভিতো পা'গ'লের মতো ডমিনিককে খুঁজতে থাকে। একসময় ও ডমিনিককে পেয়েও যায়।"

মেহেরিনের দু-চোখ বেয়ে এবার কয়েক ফোঁটা তপ্ত অ'শ্রু ঝরে পড়ল।

"পাড়ে উঠিয়ে দেখি আমার ডমিনিক আর নেই। ওর ফু'সফু'স জ'লে ভরে গিয়েছিল। তখনো পেছন থেকে গু'লি থামছিল না। আমরা ডমিনিকের নি'থর দেহ আর র'ক্তা'ক্ত ফিওরাকে নিয়ে এক প্রকার দৌড়াতে থাকি বনের ভেতরে। একসময় ইভানোর লোকেরা এসে আমাদের উদ্ধার করে।"

"ইভানো আমাকে অনেকবার নিষেধ করেছিল। আমাদের শ'ত্রুর অভাব নেই, তাই পর্যাপ্ত প্রটেকশন ছাড়া যেন বের না হই। কিন্তু আমি কী করব? ফিওরার ওই য'ন্ত্রণা'কাতর ছ'টফটা'নি দেখে কি কোনো মা শান্ত থাকতে পারে? আমি শুধু আমার সন্তানকে বাঁ'চাতে চেয়েছিলাম।সেদিন থেকে ইভানো, রিভেন আর আমার সম্পর্কটা কেমন যেন হয়ে গেল। ইভানো আমার থেকে দূরত্ব তৈরি করল, আর রিভেন... আমার সেই হাসিখুশি ছেলেটা পাথর হয়ে গেল।"

রোজেলিয়া তার চোখের পানি মুছে মেহেরিনের দিকে তাকাল। তার মনে আরেকটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল। সে দ্বিধাজড়িত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

"এটাই... এটাই কি আপনার আর ওনার আলাদা থাকার কারণ? ওই দুর্ঘ'টনা?"

মেহেরিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। এক অদ্ভুত নীরবতা বারান্দায় নেমে এল, শুধু দূরে বাতাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। তিনি চোখ মুছলেন।

"না।"

দীর্ঘ নীরবতার পর তিনি আবার বললেন,

"সেদিনের পর আমাদের দূরত্ব বেড়ে গিয়েছিল ঠিকই, কারণ আমরা দুজনেই প্রচণ্ড কষ্টে ছিলাম। কিন্তু অনেক মাস পর আমরা স্বাভাবিক হতে শুরু করি। ইভানোর সবসময়ই ডমিনিককে নিয়ে অনেক প্রত্যাশা ছিল, তাই ও মা'রা যাওয়ার পর ইভানো রিভেনের ওপর প্রচণ্ড কঠোর হতে থাকে। আমি চেয়েছিলাম রিভেনকে আগলে রাখতে, কিন্তু ভাইয়ের মৃ'ত্যুতে সেও তখন প্র'তিশো'ধের আ'গুনে জ্ব'ল'ছিল।"

মেহেরিন একটা তিক্ত হাসি হাসলেন।

"আমরা স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছিলাম, যদিও আগের মতো হওয়া সম্ভব ছিল না। কিন্তু ইভানো হঠাৎ বদলে যেতে শুরু করল। সে রিভেনের ওপর হুটহাট প্রচ'ণ্ড রে'গে যেত, রাতে অনেক দেরি করে ফিরত, ড্রি'ঙ্ক করা শুরু করল। প্রায়ই মাঝরাতে সে উঠে কোথায় যেন চলে যেত। আমার কেমন যেন স'ন্দেহ হতে শুরু করল।"

"একদিন আমি ভিতোকে নিয়ে ইভানোকে ফলো করি। ওর হাতের ঘড়ির ভিতরে আমি একটা ট্র্যা'কার লাগিয়ে নিয়েছিলাম। সেই ট্র্যা'কার ধরে এগোতে এগোতে দেখলাম ইভানো একটা ক্লা'বে আছে। আমি ভেতরে ঢুকে অনেক খোঁজাখুঁজির পর ওকে পেলাম। কিন্তু সে একা ছিল না। সেখানে একটা মিটিং চলছিল আর তার ঠিক পাশেই একটা মেয়ে তাকে এক প্রকার জ'ড়িয়ে ধরে বসে আছে। আমি যখন সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, ইভানো অনুশোচনার বদলে উল্টো আমাকে তাচ্ছিল্য করে বলল ,সে একজন মাফিয়া সম্রাট, আর মাফিয়ারা কখনো একটা নারীতে আ'সক্ত থাকে না।"

মেহেরিনের গলায় এখন এক চরম ঘৃ'ণা ফুটে উঠল।

"ভিতোকে নিয়ে আমি আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াইনি। ইভানো এটা চালিয়ে যেতে থাকল। রিভেনও ধীরে ধীরে ইভানোর এই অ'ন্ধকার দিকটার কথা জানতে পারলো। আমাদের ঝগড়াগুলো রিভেন আড়াল থেকে শুনত। ও ওর বাবাকে ঘৃ'ণা করতে শুরু করল। একসময় আমি রিভেনকে নিয়ে আমার বাবার দিয়ে যাওয়া বাড়িতে চলে আসি। আমি ইভানোকে ডি'ভোর্স পে'পার পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু সে সাইন করেনি। কো'র্ট রায় দিল, রিভেন কিছুদিন আমার সাথে আর কিছুদিন ওর বাবার সাথে থাকবে । রিভেন যখন একটু-"

দরজার ওপাশ থেকে নাইলার চটপটে কণ্ঠস্বর ভেসে এল,

"ম্যাম? একটু আসবেন? আপনার নামে কিছু পার্সেল এসেছে।"

রোজেলিয়া মেহেরিনের দিকে তাকাল। মেহেরিন তখনো সেই শূন্য দৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছেন, কিন্তু তিনি খুব শান্তভাবে মাথা নেড়ে রোজেলিয়াকে যাওয়ার অনুমতি দিলেন।

রোজেলিয়া ধীর পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে এল।

___________

রোজেলিয়া আয়নার সামনে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে রিভেনের পাঠানো কালো গাউন, যা তার গায়ের উজ্জ্বল রঙের ওপর যেন এক রহস্যময় আভিজাত্য লেপে দিয়েছে। রিভেন সব সময়ই তার জন্য কালো রঙ পছন্দ করে তাই ধারণা করা যায় কালো রিভেনের পছন্দের রং।

মেহেরিনের সাথে কথা বলার পর থেকে রোজেলিয়ার বুকের ভেতরটা যেন এক বিশাল পাথরের ভারে চাপা পড়ে আছে। সকালের সেই তুচ্ছ অভিমান, জন্মদিনের শুভেচ্ছা না পাওয়ার আক্ষেপ সবই এখন খুব অর্থহীন মনে হচ্ছে। কারুসো পরিবারের এই বি'ভীষি'কাময় অতীত জানার পর রিভেনের প্রতি তার অভিযোগগুলো করুণায় রূপ নিয়েছে। সে ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

বাইরে একটি কালো মাসেরাতো দাঁড়িয়ে আছে। রোজেলিয়া পেছনের সিটে গিয়ে বসলে গাড়ি চলতে শুরু করল। এনজো সামনের সিটে বসে আছে।

গাড়িটি যখন মিলানের রাস্তা ধরে চলছে।

হুট করেই গাড়ি থেমে গেল। চারপাশ থেকে তিনটি কালো এসইউভি তাদের গাড়িকে ঘিরে ধরল। রোজেলিয়া চমকে উঠে এনজোকে জিজ্ঞেস করল,

"এনজো, কী হচ্ছে এসব? ওরা কারা?"

এনজো পেছনের দিকে না তাকিয়েই কর্কশ গলায় বলল,

"ড্রাইভার ব্রেক করো!"

গাড়ি থামতেই এনজো আর ড্রাইভার দ্রুত নিচে নেমে এল। বাইরে অচেনা সব মানুষের ভারী গলার আওয়াজ আর ধ'স্তাধ'স্তির শব্দ শোনা যাচ্ছে। রোজেলিয়া গাড়ির ভেতরে ভয়ে সিটিয়ে রইল। তার হৃদ'পি'ণ্ডটা যেন গলার কাছে এসে ধকধক করছে। রিভেনের দেওয়া নিরাপত্তা কি তবে ভেঙে পড়ল?

ঠিক সেই মুহূর্তে রোজেলিয়ার পাশের দরজাটা এক হ্যাঁচকা টানে খুলে গেল। সে চি'ৎকার করতে চাইল, কিন্তু তার আগেই এক বিশালদেহী মাস্ক পরা লোক ভেতরে ঢুকে পড়ল।

রোজেলিয়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোকটা তার মুখে একটা কা'পড় চে'পে ধরল। রোজেলিয়া সব শক্তি হারিয়ে সিটের ওপর ঢ'লে পড়ল।

To be continue,,,,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন