ফন্ট সাইজ:
থিম:
Paradise of sins

৩৫তম পর্ব

লেখক: Fariha

#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins) #লেখনিতে_ফারিহা

পর্ব ৩৫

(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)

ম্যানশনের সকালটা আজ অন্যরকম। গতরাতের সেই প্রলয়ংকরী ঘটনার রেশ এখনো বাতাসে বা'রু'দের গন্ধ আর চাপা উ'ত্তেজনার মতো লেগে আছে। সকাল ৮টা বাজতেই মেইডরা তাদের প্রতিদিনের অভ্যস্ত কাজে লেগে পড়েছে, কিন্তু তাদের প্রত্যেকের চোখেমুখে এক অবর্ণনীয় ক্লান্তি। সারা রাত কারো দু চোখের পাতা এক হয়নি। কেউ কফি দানা গুড়ো করছে, কেউ পাত্রগুলো ঘষে পরিষ্কার করছে কিন্তু সবার নড়াচড়াতেই আলস্য।

নাইলা ডাইনিং হলের এক কোণায় দাঁড়িয়ে খুব সাবধানে টেবিল ক্লথ ঠিক করছিল। তার মুখটা একদম শান্ত। করিডোর দিয়ে সাইলাসকে আসতে দেখা গেল। সাইলাসের পরনে একটা সাদা শার্ট, যার ওপরের দুটো বোতাম খোলা। তার চোখের নিচে হালকা কালি পড়লেও চাউনিটা এখনো ঈগলের মতো তীক্ষ্ণ।

সাইলাস ধীর পায়ে নাইলার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। ডাইনিং হলের এই কোণটা এখন একদম জনশূন্য। সাইলাস নিচু স্বরে খুব গভীর এক ভঙ্গিতে নাইলার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করল,

"সারারাত তো খুব ধকল গেল, তাই না? তোমার এই চোখদুটো আজ বড্ড ক্লান্ত দেখাচ্ছে, লিটল ফিয়েরা।"

নাইলা একটু চমকে ওঠার ভান করে পেছনে ফিরল। তার ঠোঁটে সেই চেনা চটপটে হাসি। সে ভ্রু নাচিয়ে বলল,

"হুম একটু ক্লান্ত কিন্তু তোমার সাথে ঝগড়া করার এনার্জি আছে "

সাইলাস হাসল। তবে সেই হাসিতে আজ কোনো উষ্ণতা ছিল না, ছিল এক জমাটবদ্ধ শীতলতা। সে নাইলার একটা অবাধ্য চুল কানের পেছনে গুঁজে দেওয়ার ছলে তার চিবুকটা আলতো করে ধরল। তার আঙুলের স্পর্শে নাইলার শরীরে এক সূক্ষ্ম কম্পন বয়ে গেল। সাইলাস খুব মায়াবী স্বরে বলতে লাগল,

"তোমার এই ঝগড়াটে স্বভাবটায় তোমার পরিচিতি নাইলা রিচি।আমাদের প্রথম দেখাও ঝগড়া দিয়ে শুরু । কিন্তু এই কয়েকমাসের পরিচিতির পরেও মাঝে মাঝে তোমাকে খুব অপরিচিত লাগে"

নাইলা একটু আড়ষ্ট হয়ে বলল,

"এসব কী ধরনের কাব্যি শুরু করলে সকাল সকাল? কাজ করতে দাও আমাকে।"

সাইলাস নাইলার চিবুকটা আর একটু শক্ত করে ধরল। তার চোখের ধূসর মণি দুটো এখন বরফের মতো স্বচ্ছ। সে খুব ধীরস্থিরে, প্রতিটি শব্দ ওজন দিয়ে উচ্চারণ করে বলল,

"তুমি ঠিকই বলেছো। কাজের কথায় আসা যাক।নাইলা আশফোর্ড?"

'অ্যাশফোর্ড' নামটা শোনার সাথে সাথে নাইলার শরীরের র'ক্ত যেন এক মুহূর্তের জন্য জ'মাট বেঁ'ধে গেল। তার পায়ের ত'লার মা'টিটা সরে যাচ্ছে বলে মনে হলো।

নাইলার হাতটা কাপঁতে শুরু করলো। সে নিজের অজান্তেই কয়েক কদম পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু সাইলাসের পাথুরে দৃষ্টি তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। সাইলাসের ঠোঁটের কোণে এখন সেই পৈ'শাচিক বাঁকা হাসিটা ফুটে উঠেছে।

সে আরও এক পা এগিয়ে এসে নাইলার একদম চোখের ভেতর তাকিয়ে শীতল স্বরে বিড়বিড় করল,

"কী হলো? নামটা চেনা চেনা লাগছে? না কি ভুল করে আমি তোমার ক'ফিনে রাখা নেমপ্লেটটা আগেভাগেই পড়ে ফেললাম?"

নাইলার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। সাইলাস এবার নাইলার একদম কাছাকাছি ঝুঁকে এল। তার উত্তপ্ত নিশ্বাস নাইলার কান স্পর্শ করল, কিন্তু কণ্ঠস্বরটা ছিল তুষারের মতো ঠান্ডা। সে ফিসফিস করে বলল,

"তুমি রিকা অ্যাশফোর্ড এর বোন, নাইলা অ্যাশফোর্ড..."

__________

রিভেনের সেই সুবিশাল বেডরুমটা আজ এক নিচ্ছিদ্র অন্ধকারের স'মা'ধি।ভারী পর্দা টানানোর কারণে বাইরের সূর্য্যের আলো রুমের ভেতর প্রবেশ করতে পারছে না।রুমটা পুরোপুরি অন্ধকার । রিভেন মেঝেতে বসে পিঠ ঠেকিয়ে খাটের সাথে হেলান দিয়ে বসে আছে। তার চারপাশে ভ'দকা আর হু'ই'স্কির কয়েকটা শূন্য বো'তল গড়াগড়ি খাচ্ছে। ইতালির প্রতিটি আনাচে কানাচে, প্রতিটি এয়ারপোর্ট হ্যাঙ্গার, এমনকি আন্ডারগ্রাউন্ডের অন্ধকার গলিগুলোও তার লোকেরা চ'ষে ফেলেছে কিন্তু তার রোজ পেটাল এর কোনো চিহ্ন নেই।

রিভেন হাতের বো'তলটা থেকে এক চু'মুক দিল। তার চোখ দুটো এখন টকটকে লাল, ঠিক যেন ফু'টন্ত লা'ভা। বুকের ভেতরটা কেমন হাহাকার করছে, এক অসহ্য শূন্যতা তাকে তিলে তিলে গ্রা'স করছে। সে অলস ভঙ্গিতে মাথাটা খাটের গদিতে এলিয়ে দিল। তার অন্য হাত রূপালি নূপুর জোড়া যা পরিয়ে দেয়ার জন্য কাল সন্ধ্যায় তার প্রেয়সী চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করছিল।

নূপুরের ছোট ছোট ঘুঙুরগুলো থেকে হালকা হালকা আওয়াজ আসছিল যা রিভেনের হৃদয়ের দ'হনকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে । রিভেনের পাথুরে চোখের কোণ থেকে এক ফোঁটা ত'প্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে খুব ক্ষীণ ধরা গলায় বিড়বিড় করে উঠল,

"রোজ পেটাল...."

"হোয়্যার আর ইউ লাভ?"

রিভেন চোখ বন্ধ করল। মনে হচ্ছে তার পাঁজরের ভেতরটা কেউ জী'বন্ত পু'ড়িয়ে দিচ্ছে।

এনজো হালকা করে দরজাটা খুলে ভেতরে পা রাখল। রিভেনকে এভাবে ভেঙে পড়তে সে কখনো দেখেনি। এনজো শুধু রিভেনের ছায়াসঙ্গী নয় বয়সে কিছুটা বড় হওয়ায় রিভেনের কাছে সে বড় ভাইয়ের মতো। রিভেনের এই মৌন দ'হন দেখে এনজোর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

সে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে রিভেনের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। রিভেন চোখ না খুলেই এনজোর উপস্থিতি টের পেল। সে পাথরচাপা স্বরে জিজ্ঞেস করল,

"এনি নিউজ?"

এনজো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। গত কয়েক ঘণ্টা ধরে সে রিভেনকে কেবল একরাশ হতাশা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারছে না। এনজোর মনে হলো, যদি অন্তত একটা ভালো খবর তার কাছে থাকত। সে নিচু স্বরে বলল,

"শহরের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটা রাস্তার সিসিটিভি ফুটেজ কেউ খুব নিখুঁতভাবে ডিলিট করে দিয়েছে বস। আন্ডারগ্রাউন্ডের কোনো ইনফর্মারও ম্যাডামকে কোথাও দেখেনি। মনে হচ্ছে মাটি ফুঁড়ে কেউ ওনাকে নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেছে।"

রিভেন চোখ না খুলেই এক চিলতে হাসি হাসল। সে টলমলে হাতে ম'দের বো'তলটা আবার মুখে তুলতে গেল, কিন্তু এনজো ঝট করে রিভেনের হাতটা ধরে ফেলল।

"এভাবে ড্রি'স্ক করতে থাকলে আপনি অসুস্থ হয়ে পড়বেন বস ।নিজেকে সামলান "

রিভেন এবার তার র'ক্তাভ চোখ দুটো মেলল। এনজোর সতর্কবার্তাকে পাত্তা না দিয়ে সে এক ঝটকায় হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বো'তলে বড় একটা চুমুক দিল। তার কণ্ঠস্বর এখন বরফের মতো শীতল আর ধারালো,

"আই ওয়ান্ট টু গেট ড্রাঙ্ক, এনজো"

রিভেনের একটা বিশেষত্ব হলো, সে যতই পা'ন করুক না কেন, তার স্নায়ুগুলো সবসময় সজাগ থাকে। এতদিন রিভেন নিজের এই ক্ষমতা নিয়ে গর্ব বোধ করত, কিন্তু আজ তার নিজের ওপরই চরম বিরক্তি লাগছে। যদি সে মা'তাল হতে পারত, যদি এই অ্যা'লকো'হল তার ম'স্তি'ষ্ককে অ'সাড় করে দিত তবে হয়তো হৃ'দয়ের এই দ'হনটুকু অন্তত কিছুক্ষণের জন্য কমত।

রিভেন বো'তলে শেষ চুমুক দিয়েই বো'তলটা মেঝেতে স'জোরে আ'ছাড় মারল। কাঁচের টু'ক'রোগুলো ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে, ঠিক যেমন রিভেনের সাজানো পৃথিবীটা আজ চু'রমার হয়ে গেছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

"যে আমার বুক থেকে আমার ক'লি'জাটা ছি'নিয়ে নিয়েছে, সে যদি ন'রকের অতলেও লুকিয়ে থাকে কোনো একদিন আমি তাকে টে'নে বের করব।তাকে আমি এমন মৃ'ত্যু দেব যে শ'কুনরাও তাকে দেখে ভয় পাবে"

বেডরুমের দরজাটা আবার এক প্রচণ্ড শব্দে খুলে গেল। বাইরে থেকে আসা সামান্য আলোর রেখায় দেখা গেল আফসার চৌধুরী আর শারমিন চৌধুরীকে। তাঁদের চোখেমুখে এক চরম হাহাকার আর ক্রো'ধের দাবানল। আফসার চৌধুরীর গলার স্বর কান্নায় ভে'ঙে পড়লেও তাতে এক অদ্ভুত কাঠিন্য মিশে ছিল।

"রিভেন! আমার মেয়ে কোথায়?"

আফসার চৌধুরী হড়বড় করে রুমের ভেতরে ঢুকে পড়লেন। মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা ম'দের বো'তল আর রিভেনের এই বিদ্ধস্ত অবস্থা দেখে শারমিন চৌধুরী ডুকরে কেঁদে উঠলেন। এনজো তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়িয়ে তাঁদের শান্ত করার চেষ্টা করল।

"আঙ্কেল, প্লিজ শান্ত হোন। বস নিজেই খুব ভেঙে পড়েছেন। আমরা আমাদের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করছি ম্যাডামকে খুঁজে বের করতে।"

"শান্ত হবো?" আফসার চৌধুরী পাগলের মতো চিৎকার করে উঠলেন। "আমার মেয়েটাকে এই আ'গুনের কু'ণ্ডলী'তে ঠেলে দিয়ে এখন বলছ শান্ত হতে? আমার মেয়ে কোথায় আমার মেয়েকে পাওয়া যাচ্ছে না কেন"

রিভেন কোনো কথা বলল না। সে ট'লতে ট'লতে দেয়াল ধরে উঠে দাঁড়াল। তার পরনের শার্টে ম'দের দাগ, অবিন্যস্ত চুল সব মিলিয়ে তাকে এক আ'হত সিংহের মতো দেখাচ্ছ।তার হাতে থাকা নুপুর জোড়াকে সে আরো শক্ত করে ধরলো

আফসার চৌধুরী রিভেনের একদম সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর দু-চোখ বেয়ে তখন পানি গড়িয়ে পড়ছে। তিনি রিভেনের কলারটা খামচে ধরে হাহাকার করে বললেন,

"আমার মেয়েটাকে ফিরিয়ে আনো ।আমার একটা মাএ রাজকন্যা ।আমার মেয়েটা অন্ধকার খুব ভয় পায় ।জানিনা কোথায় আছে ,কেমন আছে সে"

অন্ধকারের কথা শুনে রিভেনের বুকের ভেতরটা আরো জ্বলে ওঠে ।রোজেলিয়া অন্ধকারকে ভয় পায়।আফসার রিভেনের কলার ছেড়ে হাত দুটো মুখের ওপর দিয়ে কেঁদে উঠেন।আফসার আবার রিভেনের দিকে তাকান আর চিৎকার করে বলেন,

"সবকিছুর জন্য তোমার বাবা দায়ী রিভেন! ইভানো কারুসো দায়ী! এই অ'ভিশ'প্ত মাফিয়া জগত আজ আমার নির্দোষ মেয়েটার জীবন বি'পন্ন করেছে। আমার মেয়ের যদি কিছু হয়, আমি ইভানোকে ছাড়ব না"

রিভেন এবার তার র'ক্তাভ চোখ দুটো তুলে আফসার চৌধুরীর দিকে তাকাল। 'ইভানো' নামটা শুনতেই তার ম'স্তি'ষ্কের শি'রাগুলো আবার দপ করে উঠল। সে খুব ধীরস্থিরে আফসারের দিকে এক পা এগিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,

"কেন ড্যাডকে দায়ী করছেন ? এসবের সাথে তাঁর সম্পর্ক কী?"

আফসার চৌধুরী এক তিক্ত হাসি হাসলেন, যে হাসিতে কেবল বি'ষাদ মাখানো। তিনি রিভেনের চোখের দিকে তাকিয়ে সরাসরি বললেন,

"জানি না রিভেন, আমি কিছুই জানি না। কিন্তু ইভানো প্রথম থেকেই আমার মেয়েটাকে তোমার পাশে সহ্য করতে পারত না। সে প্রায়ই আমাকে বলত রোজেলিয়া তোমার দু'র্বলতা রিভেন, আর মাফিয়াদের জীবনে দু'র্বলতার কোনো স্থান নেই"

আফসার চৌধুরীর কথাগুলো রিভেনের কানে যেন ত'প্ত সি'সার মতো বিঁ'ধল। দু'র্বলতা এই একটি শব্দ রিভেনের ভেতরের দীর্ঘদিনের জমাট বাঁধা সন্দেহকে এক ম'রণঘা'তী নিশ্চিতায় রূপ দিল। তার চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গেল, চোয়ালের হা'ড়গুলো অ'মানু'ষিক চাপে কাঁপতে লাগল। সে কোনো কথা না বলে, আফসার চৌধুরীর দিক থেকে চোখ সরিয়ে হাত থেকে নূপুরটা রেখে ড্রয়ার থেকে ব'ন্ধুক নিয়ে ঝ'ড়ের বেগে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

"রিভেন! শোনো! কোথায় যাচ্ছ তুমি?"

এনজোর চিৎকার করিডোরে প্রতিধ্বনিত হলো, কিন্তু রিভেন তখন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

রিভেন সিঁড়ি দিয়ে নেমে সোজা ড্রাইভওয়ের দিকে দৌড়ে গেল। গ্যারেজে রাখা তার ডুকাতি প্যানিগাল এর ওপর সে এক লাফে চড়ে বসল। ইঞ্জিনের গর্জন যেন রিভেনের ভেতরের হাহাকারকেই কণ্ঠে রূপ দিল। টায়ারের ঘর্ষণে পিচঢালা রাস্তা থেকে আ'গুনের ফু'লকি ছুটিয়ে সে মেইন গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল। এনজো এক মুহূর্ত দেরি না করে একটি মার্সিডিজে উঠে রিভেনের পিছু নিল, কিন্তু রিভেনের বাইক তখন খুব জোরে ঝ'ড়ের গতিতে চলছে।

অল্প সময়ের মধ্যেই সে কারুসো ম্যানশনের বিশাল লোহার ফটকের সামনে এসে পৌঁছাল। বাইকটা এক ঝটকায় থামিয়ে সে নামলো। তার চোখ দিয়ে তখন যেন ত'প্ত লা'ভার স্রোত নামছে। গার্ডরা তাকে বাধা দেওয়ার সাহস পেল না।

সে ম্যানশনের ভেতরে ঢুকেই তার গম্ভীর আর উ'ন্মাদ কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল,

"ইভানো কারুসো!"

তার ডাক ম্যানশনের প্রতিটি দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল। রিভেন আবার চিৎকার করল,

"ইভানো কারুসো! বাইরে বেরিয়ে এসো!"

ম্যানশনের দোতলার সেই হোম অফিসের ভারী মেহগনি দরজাটা খুলে গেল। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন ইভানো কারুসো। তার পরনে সিল্কের ড্রেসিং গাউন, হাতে একটি জ্বলন্ত চু'রুট। তার চেহারায় এক অবিচল আভিজাত্য আর পাথুরে নিস্পৃহতা। তার পেছনে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে তার বিশ্বস্ত অ্যাসিস্ট্যান্ট।

ইভানো সিঁড়ির রেলিংয়ে হাত রেখে খুব শান্ত চোখে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা তার উ'ন্মাদ ছেলের দিকে তাকালেন। রিভেনের বুক তখন হাপরের মতো ওঠানামা করছে।

"একজন কারুসো কখনো নিজের বাবার নাম ধরে চিৎকার করে না রিভেন। তোমার রক্তে কি মাফিয়াদের সেই শৃঙ্খলাটুকুও অবশিষ্ট নেই? না কি ওই সাধারণ মেয়েটার প্রেমে পড়ে তুমি তোমার বংশ পরিচয়টাও হারিয়ে ফেলেছ?"

রিভেন সিঁড়ির এক ধাপ ওপরে উঠে এল, তার হাত তখন কোমরে থাকা বা'রাটা পি'স্তলটির বাঁ'টে শক্ত হয়ে বসেছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

"বংশ পরিচয়ের কথা তুমি আমাকে শেখাবে না! আমার রোজ পেটাল কোথায়? আমি জানি এই নিখুঁত অপহরণের নাটকের পরিচালক তুমি। বলো, কোথায় লুকিয়ে রেখেছ আমার তাকে?"

ইভানো এক মুখ ধোঁ'য়া ছেড়ে একটু হাসলেন এক বিষাক্ত, নিষ্ঠুর হাসি। "দুর্বলতা আগলে রাখা ভালো রিভেন, কিন্তু সেই দুর্বলতাকে নিজের অস্তিত্বের ওপর স্থান দেওয়াটা আত্মঘাতী।"

রিভেনের ক্ষি'প্রতায় সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এল। ইভানো কারুসোর ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে সে তার বা'রা'টা পি'স্ত'লটির শীতল ন'ল ঠে'কিয়ে দিল ইভানোর কপাল বরাবর। পুরো করিডোরে এক থমথমে নিস্তব্ধতা নেমে এল।গার্ডরা অ'স্ত্র বের করতে গিয়েও রিভেনের চোখের সেই প্র'লয়ংকরী আ'গুন দেখে থমকে গেল।

রিভেনের কণ্ঠস্বর এখন অস্বাভাবিক শান্ত,

"আমার ওয়াইফ কোথায়?"

ইভানো তার চু'রুটে শেষ টান দিয়ে ধোঁ'য়াটা রিভেনের মুখের ওপর ছাড়লেন। তিনি খুব শীতল গলায় বললেন,

"আমি এই ব্যাপারে কিছুই জানি না রিভেন। তোমার বউয়ের পাহারাদারিতে তুমি ব্যর্থ হয়েছ, তার দায়ভার আমার ওপর চাপিও না।"

রিভেন এবার এক উ'ন্মাদ প'শুর মতো অট্টহাসি দিয়ে উঠল। সে পি'স্তলের ন'লটা ইভানোর চা'মড়ায় আরও জোরে চেপে ধরে চিৎকার করে উঠল,

"মিথ্যে বলছ তুমি! এই সূক্ষ্ম জাল বোনার ক্ষমতা এই ইতালিতে তোমার ছাড়া আর কারো নেই। তুমি চেয়েছিলে আমার জীবন থেকে একমাত্র আলোটুকু কেড়ে নিতে, যাতে আমি তোমার মতো এক হিং'স্র প'শুতে রুপান্তরিত হয়। কিন্তু শুনে রাখো ইভানো কারুসো ,রোজেলিয়াকে ছাড়া আমি ধ্বং'স'স্তূপে পরিণত হবো, আর সেই ধ্বং'সস্তূ'পের নিচে প্রথম চা'পা প'ড়বে তুমি"

ইভানো নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন, "একজন মাফিয়া সম্রাটের চোখে জল আর প্রেম মানায় না রিভেন। আমি যা করেছি, তোমার ভালোর জন্যই"

"থামো" রিভেন গ'র্জনে তাকে থামিয়ে দিল। তার চোখ দিয়ে তখন টপ টপ করে জল পড়ছে, কিন্তু হাতের পি'স্ত'লটা পাথরের মতো স্থির।

"ভালোর কথা তোমার মুখে মানায় না। ইভানো কারুসো।

তুমি একজন স্বামী হিসেবে ব্যর্থ হয়েছ, মম এর জীবনটা তুমি বি'ষিয়ে দিয়েছ। আর আজ... আজ তুমি একজন বাবা হিসেবেও ব্যর্থ। তোমাকে ড্যাড ডাকা পুরোপুরি ছেড়ে দেয়নি ।মাঝে মাঝে ডাকতাম। কিন্তু আজ থেকে তুমি সেই ডাক শোনার অধিকারটুকুও হারিয়ে ফেলেছ।"

রিভেন পি'স্ত'লটা সরিয়ে নিল, কিন্তু তার দৃষ্টিতে এখন ঘৃ'ণার এক নীল বি'ষ। সে ইভানোর চোখের দিকে তাকিয়ে প্রতিটি শব্দ বি'ষের মতো ঢালতে লাগল,

"এখন থেকে তুমি আমার কেউ নও। আমাদের র'ক্তের সব সম্পর্ক আমি এই মুহূর্তে ছিঁ'ড়ে ফেললাম। মিস্টার ইভানো কারুসো, তোমাকে আমি আ'জন্ম ঘৃ'ণা করি। তুমি এই পৃথিবীর সবচাইতে নি'কৃষ্ট জীব ।গ্রান্ডফাদার আলফি কারুসোও অন্তত তোমার মতো এতো নি'কৃষ্ট ছিল না ।আমি তোমাকে ঘৃণা করি ইভানো কারুসো"

রিভেন ঘুরে দাঁড়াল। সে আর একবারও পেছনে তাকাল না। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন এক একটি অভিশাপ।

সে ম্যানশনের বড় হলরুমে এসে তার হাতের পি'স্ত'ল দিয়ে আকাশের দিকে এক রা'উন্ড গু'লি ছু'ড়ল আর চিৎকার করে বলল,

"আজ থেকে এই ম্যানশন আর ওই লোকটার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই"

__________

রাত তখন প্রায় ১১টা। এরিকা দরজা খুলতেই এনজো ঘরে ঢুকল। হাতে রেস্টুরেন্ট থেকে আনা কিছু খাবারের প্যাকেট। এনজো প্যাকেটগুলো ডাইনিং টেবিলে রেখেই অবসন্ন শরীরে লিভিং রুমের সোফাটায় ধপাস করে বসে পড়ল। সারাদিনের হা'ড়ভা'ঙা খাটুনি আর মা'ন'সিক দু'শ্চিন্তায় শরীরটা আর সায় দিচ্ছে না।

এরিকা ধীর পায়ে এগিয়ে এসে এনজোর পাশে বসল। ভাইয়ের এমন বি'ধ্বস্ত অবস্থা দেখে তার মনটা খারাপ হয়ে গেল। এনজো শত ক্লান্তির মাঝেও বোনের দিকে তাকিয়ে একটা ম্লান হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করল। সে এরিকার মাথায় হাত বুলিয়ে পরম স্নেহে বলল,

"কীরে... পড়াশোনা শেষ? এই যে তোর প্রিয় পিৎজা নিয়ে এসেছি। খেয়ে নে চটপট।"

এরিকা পিৎজার প্যাকেটের দিকে একবার তাকালও না। তার চোখেমুখে উদ্বেগ। সে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,

"ভাইয়া? কোনো খবর এল? রোজেলিয়া ম্যামের কি কোনো খোঁজ পাওয়া গেছে?"

এনজো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফার গদিতে মাথাটা এলিয়ে দিল। তার দৃষ্টি সিলিংয়ের দিকে স্থির।

"নারে। কোনো ইঙ্গিত পর্যন্ত খুঁজে পাচ্ছি না। সবকিছুর পেছনে এত নিখুঁত কৌশল আর পরিকল্পনা কাজ করেছে যে কোনো সূত্রই মিলছে না।"

সে নিজের কপালে হাত দিয়ে ঘষতে ঘষতে বলতে লাগল,

"চারিদিকে শুধু ষ'ড়য'ন্ত্রের গন্ধ এরিকা। বস পুরো ভেঙে পড়েছেন। ম্যামকে যে তিনি কতটা ভালোবাসতেন, সেটা আজ তাঁর এই অবস্থা না দেখলে বুঝতি না।"

এরিকা কোনো কথা না বলে শুধু মাথা নাড়ল। সে জানে, রিভেন আরওয়াইন কারুসোর মতো মানুষকে ভেঙে পড়তে দেখা মানে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ।

এনজো এবার সোজা হয়ে বসে এরিকার দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তার চোখে এক গভীর আশঙ্কা।

"দেখ এরিকা, ম্যামকে এত প্রোটেকশনের মাঝেও যেভাবে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো, সেটা আমাকে খুব ভাবাচ্ছে। বসের মতো ক্ষমতাধর মানুষও কূলকিনারা পাচ্ছে না।" এনজো একটু থেমে এরিকার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল,

"এসব বিষয় আমাকে বড্ড বেশি ভাবাচ্ছে রে। আমাদের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। তুই আমার কথা শোন তুই কানাডা চলে-।"

এরিকা এনজোকে থামিয়ে দিয়ে দৃঢ় গলায় বলল,

"ভাইয়া, আবার ওই টপিক শুরু কোরো না। আমি তোমাকে এই বি'পদের মুখে একা রেখে কোথাও যাচ্ছি না।"

এনজো আবারও বোঝানোর চেষ্টা করল,

"এরিকা, বোন আমার কথা শোন। প্রয়োজনে তুই এখন যা, আমি কথা দিচ্ছি কয়েক বছরের মধ্যে নিজের সব গুছিয়ে তোর কাছে চলে আসব। এখন তো বসকে এই অবস্থায় ফেলে যাওয়া অসম্ভব। তুই বুঝছিস না কেন?"

এরিকা আবারও জেদের স্বরে বলল,

"একই কথা, আমি কোথাও যাচ্ছি না। ইটস ফাইনাল। আমি এখানেই থাকব তোমার সাথে।"

এনজো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এরিকা তার একমাত্র বোন, তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। এনজো রিভেনের সবচাইতে কাছের লোক হওয়ার কারণে রিভেনের শত্রুরা খুব সহজেই এরিকাকে টা'র্গেট করতে পারে এই ভয়টা তাকে সারাক্ষণ কু'রে কু'রে খায়। যদিও বাড়িতে হাই সিকিউরিটি সিস্টেম বসানো আছে, এমনকি কোনো জরুরি অবস্থায় লুকানোর জন্য মাটির নিচে আন্ডারগ্রাউন্ডের ব্যবস্থাও সে করে রেখেছে, তবুও এরিকার নিরাপত্তা নিয়ে তার দুশ্চিন্তা এক মুহূর্তের জন্যও কমে না।

অন্ধকার করিডোরের ওপাশে জানলার কাঁচ ভেদ করে রাতের মিলানকে আজ বড্ড বেশি নিষ্ঠুর মনে হচ্ছে এনজোর কাছে। সে এরিকার হাতটা আর একটু জোরে চেপে ধরল।

__________

অন্ধকারের চাদরে মোড়ানো বেজমেন্টটা যেন ন'রকের এক শান্ত প্রবেশদ্বার। নিস্তব্ধ করিডোরের প্রতিটি ধূলিকণায় লেগে আছে আর্তনাদের ইতিহাস।বেজমেন্টটা অনেক বড় সামনের দিকে আছে ট'র্চার সে'ল আর পিছনের দিকে পরপর তিনটি রুম যা জে'ল খা'নার থেকে কোনো অংশে কম নয় ।নাইলাকে প্রথম রুমে রাখা হয়েছে।

সে দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে এক কোণায় কুঁকড়ে বসে আছে। মিটিমিটি জ্বলতে থাকা সামনের টিমটিমে হলুদ আলোটা দুলছে।

সকাল থেকে এই সে'লে ব'ন্দি নাইলা। সন্ধ্যায় একজন গার্ড অবজ্ঞাভরে এক বোতল পানি দিয়ে গিয়েছিল, সেইটুকুই এখন তার পা'কস্থ'লীর দ'হন মেটানোর একমাত্র অবলম্বন। পেটের তী'ব্র ক্ষুধা তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে কয়েকটা স্মৃতি। রিকার মৃত্যুর পর ঠিক এভাবেই রাতের পর রাত সে না খেয়ে কাটিয়েছে। গার্ডরা তাকে সেলে ঢোকানোর সময় তাচ্ছিল্য করে বলে গিয়েছিল রিকা অ্যাশফোর্ডকেও ঠিক এই রুমেই রাখা হয়েছিল।

নাইলার বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। ভাগ্যের কী নি'ষ্ঠুর পরিহাস। যে ঘরের চার দেয়ালের মাঝে তার বোন একদিন নিঃস'ঙ্গ মৃ'ত্যু বা য'ন্ত্র'ণার প্রহর গুনেছে, আজ সেও সেই একই ঘরে বন্দি। তার আভার কথা মনে পড়তেই খুব খারাপ লাগছে, আভার মায়াভরা মুখটা বারবার মনে পড়ছে।নাইলা ঝ'গড়াটে হওয়ায় বাকি মেইডের সাথে তেমন তার ভালো সম্পর্ক ছিল না কিন্তু আভা তাকে খুব আদর করতো। এই ম্যানশনে একমাত্র আভাই ছিল যে নাইলাকে আগলে রাখত। আর কেউ কি আছে?

সাইলাস ?

নামটা মনে আসতেই নাইলার বুকের ভেতরটা মো'চড় দিয়ে উঠল। শেষবার যখন ডাইনিং হলে সাইলাসের চোখের দিকে তাকিয়েছিল, সেখানে কেবল জমাটবদ্ধ ঘৃ'ণা আর তুষারশীতল কাঠিন্য দেখেছিল সে। নাইলার মনে প্রশ্ন জাগল 'তবে কি সব ভালোবাসা এক নিমেষেই ঘৃণা হয়ে গেল? আচ্ছা সাইলাস কি সত্যিই কখনো তাকে ভালোবেসেছিল? নাইলা তাকে বহুবার নিজের অনুভূতির কথা জানিয়েছে, কিন্তু সাইলাস... সে তো কোনোদিন সরাসরি ভালোবাসার কথা স্বীকার করেনি। তবে কি সবটাই ছিল মরীচিকা?

নাইলা একটু নড়েচড়ে বসল। তার ভাবনার সুতো ছিঁ'ড়ে গেল বেজমেন্টের ভারী লোহার দরজাটা খোলার কর্কশ শব্দে। বুটের ভারী আওয়াজ করিডোরের দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুলছে, আর সেই শব্দটা স্পষ্টভাবেই নাইলার সেলের দিকে এগিয়ে আসছে।

সেলে লাগানো মরচে ধরা দরজার লকটা এক ঝটকায় খুলে গেল। দরজার পাল্লাটা ধীরে ধীরে সরে যেতেই ভেতরে এক দীর্ঘ ছায়া প্রবেশ করল। নাইলা চোখ পিটপিট করে দেখার চেষ্টা করল আগন্তুককে।

To be continue,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন