#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins) #লেখনিতে_ফারিহা
পর্ব ৩৬
(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)
বেজমেন্টের সেই গুমোট অন্ধকারে বাতাসের প্রতিটি কণা যেন বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। মরচে ধরা লোহার শিকল আর স্যাঁতসেঁতে দেয়ালের গা বেয়ে এক অসহ্য হাহাকার চুইয়ে পড়ছে। নাইলা যখন দেখল আগন্তুক আর কেউ নয় স্বয়ং সাইলাস, তখন তার বুকের পাঁজরের ভেতর যেন এক সহস্র বজ্র'পাত একসাথে ঘটল। ক্ষণিকের জন্য তার নিশ্বাস থেমে গেল।
সাইলাস ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করল। তার অবয়বে সেই চেনা গাম্বীর্য্য থাকলেও চাউনিটা এখন এক নি'ষ্ঠুর অরণ্যের মতো দু'র্ভেদ্য। সে কোনো কথা না বলে হাতের খাবারের প্যাকেটগুলো অবজ্ঞাভরে নাইলার সামনে রাখল। নাইলা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সাইলাসের দিকে। কী দেখছে সে? তার কি চোখের ভুল? যে চোখে একদা সিক্ত মমতা ছিল, সেখানে আজ কেবল জমাটবদ্ধ তুষার আর এক সমুদ্র ঘৃণা।
সাইলাস নাইলার চোখের জল কিংবা তার সেই বি'ধ্বস্ত রূপের দিকে একটিবারও তাকাল না। সে যেন কোনো জড়বস্তুকে খাবার দিয়ে নিজের কর্তব্য সম্পাদন করল। সে যেই মাত্র ঘুরে দরজার দিকে পা বাড়াতে চাইল, নাইলার ভেতরটা যেন সহস্র কাঁচের টু'করোয় ভে'ঙে চুরমার হয়ে গেল। সে রুদ্ধকণ্ঠে অস্ফুট স্বরে ডেকে উঠল,
"সাইলাস..."
শব্দটা সেলের নিস্তব্ধতাকে চিরে এক প্রলয়ংকরী আর্তনাদের মতো প্রতিধ্বনিত হলো। সাইলাস থমকে দাঁড়াল। সে ফিরল না, তার পিঠ তখনো নাইলার দিকে। নাইলার শরীরে বিন্দুমাত্র শক্তি অবশিষ্ট নেই। ক্ষুধার দহন আর অনুশোচনার বিষ তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। সে দেয়ালে হেলান দিয়েই বসে রইল, কিন্তু তার দৃষ্টি সাইলাসের প্রশস্ত পিঠের ওপর বিঁধে রইল।
দীর্ঘ কয়েক সেকেন্ডের এক অসহ্য নীরবতা। মনে হলো সময় থমকে দাঁড়িয়েছে এই নি'ষিদ্ধ অ'ন্ধকূপে। অবশেষে সাইলাস ধীরে ধীরে নাইলার দিকে ফিরল। তার ধূসর মণি দুটো মেঝের দিকে স্থির ছিল, সেখান থেকে অতি ধীরলয়ে তা উঠে এসে নাইলার চোখের ওপর আ'ছড়ে পড়ল। তার দৃষ্টিতে আজ কোনো আবেগ নেই, কোনো দহন নেই আছে কেবল এক শূন্য মরুভূমি।
সাইলাসের চোয়াল পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। সে অত্যন্ত গম্ভীর আর পাথুরে স্বরে প্রশ্ন করল,
"কেন করলে এমন ?"
প্রশ্নটা শুনতেই নাইলার ভেতরটা যেন হু হু করে উঠল। সে কোনো উত্তর খুঁজে পেল না। তার ঠোঁট দুটো কাঁপছে, কিন্তু শব্দরা আজ তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। সাইলাস তার চোখের স্থিরতা সহ্য করতে না পেরে আবারও দৃষ্টি সরিয়ে নিল। তার কণ্ঠস্বর এখন এক ক্ষুরধার ছু'রির মতো নাইলার হৃৎপিণ্ডকে বি'দ্ধ করতে লাগল,
"আমিও তোমার এই র'ক্তমা'খা দাবার ছকের ঘুঁটি তাইনা? তোমার বলা...সবকিছুই মিথ্যে ? আমাকে তুমি তোমার দাবার ঘুটি হিসেবে ব্যবহার করেছ ।ভালোবাসার নাটক করেছ তুমি"
নাইলা আর নিজেকে সংবরণ করতে পারল না। তার চোখের বাঁধ ভেঙে লোনা জলের প্লাবন নেমে এল। সে ডুকরে কেঁদে উঠল। এই কান্নায় কেবল এক সর্বনাশা সত্যের স্বীকারোক্তি আছে। কিন্তু সে কী বলবে? সে তো সাইলাসের সেই দুর্ভেদ্য বিশ্বাসকে ভেঙে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।
বেজমেন্টের সেই হলুদ টিমটিমে আলোয় সাইলাসের ছায়াটা দেয়ালে এক দানবীয় রূপ নিল। সে নাইলার এই বিলাপের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে অত্যন্ত নিষ্ঠুর শীতলতায় বলল,
"প্র'তিশোধের আ'গুনে তুমি শুধু নিজেকে পো'ড়াও'নি তুমি আমার বিশ্বাস আর ভালোবাসাকে পু'ড়িয়ে ছা'ই করেছ যা আমি কোনোদিন কাউকে দেওয়ার সাহস পাইনি। তোমার এই চোখের জল আজ আমার কাছে কেবল একটি পা'পি'ষ্ঠা নারীর অভিনয় ছাড়া আর কিছুই নয়।"
নাইলার কান্নার শব্দ সেই সেলের প্রতিটি কোণায় আছড়ে পড়তে লাগল, কিন্তু সাইলাসের সেই পাথুরে হৃদয়ে তা একটুও কম্পন সৃষ্টি করতে পারল না।
নাইলা কাঁপতে কাঁপতে কোনোমতে জানুর ওপর ভর দিয়ে একটু সোজা হওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু শরীরের চরম ক্লান্তি তাকে আবারও সেই ধূলিকণাময় মেঝের দিকে টেনে নিল। তার চোখের তপ্ত জল গাল বেয়ে পড়ছে,
"প্রতিশোধ নিতে এসেছিলাম সাইলাস... রিকার মৃ'ত্যুর র'ক্তঋ'ণ শোধ করতে এসেছিলাম।"
নাইলার গলায় এক হাহাকার ফুটে উঠল। সে আর্তনাদ করে বলল,
"এই পা'ষাণপু'রীতে পা রাখার পর থেকে প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল আমার এক একটি ছক। কিন্তু বিশ্বাস করো, তোমাকে আমি কোনোভাবেই এতে জড়াতে চাইনি। তোমাকে ভালোবাসতে চাইনি আমি। কিন্তু এই নিষ্ঠুর খেলার মাঝে আমি নিজেই নিজের জালে ফেঁ'সে গেছি"
নাইলার চোখ দিয়ে আরো কয়েক ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো।
"সব মিথ্যে হতে পারে সাইলাস, আমার পরিচয় থেকে শুরু করে সবই মিথ্যে ,সব।কিন্তু....কিন্তু তোমার প্রতি আমার এই সর্বনাশা ভালোবাসা বিন্দুমাত্র মিথ্যে নয়"
সাইলাস স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সাইলাসের মুখাবয়ব এখন কোনো প্রাচীন রোমান ভাস্কর্যের মতো শীতল আর নি'র্দয় দেখাচ্ছে।
সে এক পা এগিয়ে এল নাইলার দিকে। বুটের সেই কর্কশ শব্দে নাইলার হৃ'ৎপি'ণ্ডটা যেন থমকে গেল। সাইলাস নিচু হয়ে নাইলার চোখের ঠিক কয়েক ইঞ্চি দূরে নিজের মুখ নিয়ে এল। সে নাইলার চিবুকটা তার ইস্পাতকঠিন আঙুলে এমনভাবে চে'পে ধরল যে নাইলার মনে হলো তার চোয়ালের হা'ড়গু'লো এখনই চু'রমা'র হয়ে যাবে। সাইলাসের ধূসর চোখের মণি দুটো এখন আ'গ্নেয়গি'রির লাভার মতো ফুটছে,
"ভালোবাসা?"
" তোমার মুখে এই পবিত্র শব্দটা এক চরম অপবিত্রতার মতো শোনায় নাইলা। যে নারী প্রতিশোধের আ'গুনে জ্ব'লতে পারে, তার র'ক্তে ভালোবাসার স্পন্দন থাকে না"
সাইলাস তাকে আরো কাছে নিয়ে এলো ।এবার তার কন্ঠের পরিবর্তন হলো,
"কিন্তু এই অন্ধকারে পচে মরার আগে শেষ সুযোগ দিচ্ছি তোমাকে।আমাকে সব খুলে বলো। রোজেলিয়া ম্যাম এখন কোথায়? কার নির্দেশে তুমি এসব করেছ"
সাইলাস নাইলার চোখের গভীরে এক অ'ব্যক্ত যন্ত্রণার ছাপ দেখেও অবিচল রইল। সে তার কণ্ঠস্বরে কিছুটা নমনীয়তা মিশিয়ে বললো,
"সব যদি সত্যি করে খুলে বলো... কে তোমার এই খেলার পেছনের কারিগর, তবে হয়তো এই জমাটবদ্ধ ঘৃ'ণার পাহাড়টা সামান্য হলেও গলতে পারে। হয়তো আমার হৃদয়ে তোমার জন্য যে ঘৃণার অনল জ্বলছে, তার তীব্রতা আমি একটু কমাতে পারি"
"তাই শুরু থেকে সব খুলে বলো ।একদম প্রথম থেকে সব"
নাইলার পাংশুটে মুখে তখন সত্য আর মিথ্যের এক চরম লড়াই।সাইলাস তার চিবুক ছেড়ে দিয়ে এক মুহূর্ত অপলক চেয়ে রইল। তারপর সে নাইলার থেকে সামান্য দূরে মেঝের ওপরই বসে পড়ল যেন এক ক্লান্ত শি'কারি তার শেষ শি'কারের অন্তিম স্বীকারোক্তি শোনার জন্য প্রস্তুত।
নাইলা তার ফাটা ঠোঁট দুটো জিভ দিয়ে একবার ভিজিয়ে নিল।সে ভাবলো সবকিছু বলে দেয়ায় শ্রেয় ।সাইলাসের চোখের এই ঘৃণা সে নিতে পারছে না ।তার কণ্ঠস্বর এখন কোনো ভাঙা বাদ্যযন্ত্রের মতো অস্ফুট।
"আমার জন্মের সময় আমাকে জন্ম দিতে গিয়ে মা মা'রা যান। বাবা মাকে খুব ভালোবাসতেন, তাই এই বিচ্ছেদ তিনি মেনে নিতে পারেননি। নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন মা'দক আর অ্যা'লকো'হলের অতল সাগরে। একদিন ওভার ডোজের কারণে তিনিও মা'রা যান। বাবার মৃত্যুর পর আমাদের সাজানো পৃথিবীটা মুহূর্তেই এক মরুভূমি হয়ে গেল। দিনের পর দিন অনাহারে কেটেছে আমাদের জীবন, প্রতিবেশীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি একমুঠো খাবারের জন্য, কিন্তু কেউ এই অনাথ বোন দুটোর দিকে করুণার হাত বাড়িয়ে দেয়নি।"
নাইলা একটু থামল। তার গলার কাছে দলা পাকানো বি'ষাদটা সে গিলে নিল। সাইলাসের চোখের মণি তখনো স্থির,
"রিকার বয়স তখন উনিশ। সে বাইরে কাজ খুঁজতে শুরু করল। একদিন সে জানাল, সে খুব ভালো একটা কাজ পেয়েছে। কিন্তু সেই কাজের কথা আমাকে কিছুই জানায়নি। মাঝেমধ্যে তার ব্যাগে পি'স্তল দেখে শিউরে উঠতাম, জিজ্ঞেস করলে সে রহস্যময় হাসি দিয়ে এড়িয়ে যেত। দীর্ঘ কয়েক বছর পর জানতে পারলাম, সে এক দু'র্ধর্ষ মাফিয়া ডনের প্রাসাদে পরিচারিকার কাজ নিয়েছে। রিকা আর আমার দিনগুলো ভালোই কাটছিল, যদিও সে সবসময় ব্যস্ত থাকত। মাঝে মাঝে সে তার সেই অদ্ভুত সুন্দর বসের গল্প করত। বলত, এমন সুপুরুষ সে আগে কখনো দেখেনি। তার সেই মুগ্ধ বর্ণনায় বুঝতে পারলাম সে তার বসকে ভালোবেসে ফেলেছে "
নাইলার কণ্ঠস্বর এবার কান্নায় বুজে এল। তার চোখের মণি দুটো আতঙ্কে সংকুচিত হয়ে গেল, যেন সেই বী'ভৎ'স দৃশ্যটা আবার তার চোখের সামনে জী'বন্ত হয়ে উঠেছে।
"সবকিছুই স্বপ্নের মতো কাটছিল, কিন্তু হঠাৎ করেই রিকা আর বাড়ি ফেরে না। তার অ'নুপস্থি'তি আমার বুকের ভেতর এক অজানা আশঙ্কার জন্ম দিল। আমি জানতাম ওর কর্মস্থলের ঠিকানা। একদিন কয়েকটা অচেনা লোক রিকার নি'থর দে'হটা নিয়ে হাজির হলো। তারা জানাল, একটি পরি'ত্য'ক্ত জঙ্গলের নির্জনতায় তার লা'শ পাওয়া গেছে। আমার মাথায় যেন স'হস্র বজ্র'পাত হলো। তার ফর্সা শরীরে তখন অসংখ্য আঘাতের নীল দাগ, মাং'সে'র প'চন ধরা উ'ৎকট গ'ন্ধ বি'চ্ছুরিত হচ্ছিল।আমি যখন প্রচন্ড কান্নায় ভেঙে পড়লাম একজন জানালো রিকাকে তার বসই মে'রেছে "
বেজমেন্টের সেই টিমটিমে হলুদ আলোটা নাইলার পাংশুটে মুখে এক বীভৎস ছায়া তৈরি করল। তার গলার স্বর কান্নায় বুজে আসছিল। সে ফিসফিস করে বলল,
"আমি শুধু এটুকু জানতে পেরেছিলাম সাইলাস,
যে রিকার মৃ'ত্যুর কারণ রোজেলিয়া।তার জন্য আমার বোনের প্রা'ণ হা'রাতে হয়েছে"
সাইলাস এক মুহূর্ত পাথরের মতো নিথর হয়ে রইল। তারপর সে এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। সে নাইলার চোখের দিকে তাকিয়ে পাথুরে স্বরে বলতে শুরু করল,
"ভ্রান্ত ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে তুমি যে বিষবৃক্ষ রোপণ করেছ নাইলা, তার শিকড় যে কতটা পচা তা তুমি জানো না। রিকার মৃত্যুর কারণ রোজেলিয়া ম্যাম নন। শোনো তবে সত্যটা।তোমার বোন রিকা আসলে বসের প্রধান শত্রু পক্ষের পাঠানো একজন গুপ্তচর ছিল। সে এই ম্যানশনে এসেছিল বসের গতিবিধি আর গোপন তথ্যাবলি পাচার করতে।পরবর্তীতে নাকি বসের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে।বসকে পেতে সে এক বিকৃত নেশায় মত্ত হয়ে উঠেছিল"
সাইলাস থামল না,
"আমাদের পুরনো মেইড হিলদা আন্টি,তিনি মেহেরিন ম্যাম আর বসের সবচেয়ে কাছের একজন ছিলেন, তিনি একদিন রিকার এই ষড়যন্ত্র ধরে ফেলেছিলেন। আর তাই তোমার বোন অত্যন্ত নৃ'শং'সভাবে হিলদা আন্টিকে হ'ত্যা করে। শুধু তাই নয়, বসের প্রতি রিকার সেই অসুস্থ আসক্তি এতটাই চরমে পৌঁছেছিল যে সে রোজেলিয়া ম্যামের খাবারে সেদিন বিষ ও মিশিয়েছিল। যেদিন ম্যাম পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, সেই পথটা রিকাই পরিষ্কার করে দিয়েছিল যাতে ম্যাম কোনো বিপদে পড়েন বা মা'রা যান। বস যখন হিলদা আন্টির খুনের সত্যটা জানতে পারলেন এবং সিসিটিভি ফুটেজে রিকার এই ঘৃণ্য চেহারার প্রমাণ পেলেন, তখন তাকে এই ট'র্চার সে'লে আনা হয়েছিল।"
সাইলাসের স্বরে এবার এক আদিম জিঘাংসা ফুটে উঠল,
"রিকা প্রথমে অস্বীকার করলেও ট'র্চার সে'লে তিলে তিলে তার অপরাধের স্বীকারোক্তি দিয়েছিল। সে স্বীকার করেছিল হিলদা আন্টিকে সেই মেরেছে এমনকি তার বসকে সে মেহরিন ম্যামের ব্যাপারেও সব তথা প্রদান করতো। সে যে গ্যাংয়ের স্পাই ছিল, তাদের কোনো তথ্যই দিতে সে ব্যর্থ হয়। হিলদা আন্টির মতো পবিত্র একজন মানুষকে হত্যার দায়ে বস তাকে ছাড়েননি। তাকে এই অন্ধকার কুটুরিতে রেখে তিলে তিলে য'ন্ত্রণা'র স্বাদ দেওয়া হয়েছিল।"
নাইলার চোখ দিয়ে টপ টপ করে তপ্ত অশ্রু ঝরে পড়তে লাগল। তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। সে দেয়ালে কপাল ঠেকিয়ে হাহাকার করে উঠল,
"আমি... আমি এসব কিছুই জানতাম না। কিন্তু সাইলাস, একজন মানুষকে এভাবে প'শুর মতো মা'রা কি কোনো বিচার? আপনজন হারানোর ব্যথা তুমি বুঝবে না ।এই কষ্ট যে হারায় সেই বুঝে ।রিকা ছাড়া আমার পরিবার বলতে কেউ ছিল না"
"তাই এই প্র'তিশো'ধের খেলায় নেমেছি। রিকার মৃ'ত্যুর পর সেই লোকগুলো আমাকে সাহায্য করবে বললো। আমি আমার নাম পরিবর্তন করে এখানে ঢুকলাম প্র'তিশো'ধ নিতে। প্রথমে ভেবেছিলাম রোজেলিয়াকে তিলে তিলে মারব। তার ডালিমের জুসের সাথে দীর্ঘ সময় ড্রা'গস মিশিয়েছি আমি। কিন্তু হঠাৎ অন্য এক গ্যাং আমার সাথে যোগাযোগ করে। তারা রোজেলিয়াকে অ'পহরণ করতে চেয়েছিল, আর আমি তাদের সাহায্য করতে রাজি হলাম।"
সাইলাস হঠাৎ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। সে নাইলার চিবুক আবার চেপে ধরে জিজ্ঞেস করল,
"কোন গ্যাং? কে তাদের লিডার?"
নাইলা মাথা নাড়ল, তার চোখে এখন এক দিশেহারা শূন্যতা।
"আমি তাদের লিডারকে চিনি না সাইলাস। সে সবসময় একটি কালো মাস্ক পরে থাকে। আমি কোনোদিন তার চেহারা দেখিনি। সে কেবল ইনস্ট্রাকশন পাঠাতো আর আমি তা পালন করতাম। তাদের কোনো নির্দিষ্ট আস্তানা বা লোকেশনের কথা আমাকে জানানো হয়নি।"
'মাস্ক' শব্দটা কানে আসতেই সাইলাসের মস্তিষ্কের কোনো এক অন্ধকার কোণ আলোকিত হয়ে উঠল। তার কিছু একটা মনে পড়তেই সে বিড়বিড় করে বলল,
"একবার ম্যানশনে আক্রমণের সময় যে দুজনকে আমরা ধরেছিলাম, তারাও ওই মাস্ক পরা লোকের কথাই বলেছিল।"
নাইলা কাঁপা গলায় যোগ করল,
"হ্যাঁ, সেদিন তারা আমার সাথে কোনো কথা না বলেই রোজেলিয়াকে নিতে আক্রমণ করেছিল। ইভানো কারুসোর সাথেও যোগাযোগ না করে তা-"
"ইভানো কারুসোও কি এর সাথে জড়িত?"
নাইলা নিঃশব্দে মাথা নাড়ল।সাইলাস অবাক হয়ে গেল।
"রিকার লা'শ যারা এনেছিল তারা ইভানো কারুসোর লোক?"
নাইলা আবার মাথা নাড়লো ।সাইলাসের এবার মনে হলো তার মেরুদণ্ড দিয়ে এক হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল।
___________
"প্রথম থেকে সব কিছু খুলে বলবেন, একটা কথাও লুকানোর চেষ্টা করবেন না"
রিভেনের রক্তাভ চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে আছে আফসার চৌধুরীর ওপর।আফসার চৌধুরী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকু গড়িয়ে পড়ল তার কাঁপতে থাকা হাতের ওপর। তিনি বলতে শুরু করলেন,
"রোজেলিয়ার মা যখন যখন অসুস্থ ছিল, রোজ তখন দিনরাত হাসপাতালের করিডোরে কাটিয়ে দিত।আমি ঘটনার কিছুই জানতাম না কিন্তু শারমিন থেকে শুনলাম যে একদিন রোজেলিয়া তার মাকে নিয়ে কেবিনের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। তখন নাকি যাওয়ার পথে ছেলে এক নার্সের গলা টিপে ধরে দেয়ালের সাথে আ'ছা'ড় মা'র'ছিল কারণ তার বাবার চিকিৎসায় অবহেলা করা হয়েছিল।ছেলেটি নার্সকে রোজের সামনে এমন করছিল দেখে রোজেলিয়ার তাকে থামাতে সে স'জোরে এক চ'ড় বসিয়ে দিল তার গালে। ব'কাঝ'কাও করেছিল "
আফসার চৌধুরী একটু থামলেন,
"ঘটনাটা সেখানেই শেষ হতে পারত। ছেলেটি রোজকে তখন কিছুই বলেনি। আমি যখন জানলাম, রোজকে ব'কাঝ'কা করেছিলাম অচেনা মানুষের ঝগড়ায় জড়ানোটা ঠিক হয়নি। আমরা ভেবেছিলাম সে সাধারণ কোনো বখাটে। শারমিন সুস্থ হতে শুরু করল, কিন্তু আমাদের শান্তি আর ফিরল না। একদিন এক অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন এল।লোকটা জানালো, তার ছেলে ওইদিন হাসপাতালের ঘটনার পর থেকেই রোজের জন্য উ'ন্মাদ হয়ে গেছে। সে আমাকে সাথে একটি ডিল করতে চাইলো, রোজের সাথে তার ছেলের বিয়ে দিলে সে আমাদের সব ঋণ শোধ করে দেবে, আমাদেরকে অনেক অর্থ সম্পদ দিবে"
রিভেনের চোয়াল এখন পাথরের মতো শক্ত। তার চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে। আফসার চৌধুরী রিভেনের সেই প্রলয়ংকরী রূপ দেখে একটু থমকে গিয়ে আবার কম্পিত স্বরে বলতে লাগলেন,
"আমি বুঝতে পারলাম তারা সাধারণ কেউ নয়। আমি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করলাম। কিন্তু তারপর থেকেই শুরু হলো অশান্তি । তারা প্রথমে ভালো কথা বললেও পরে সরাসরি হু'মকি দিতে শুরু করল যে রোজকে তারা তু'লে নিয়ে যাবে। আমি আমার ক'লিজা'র টুক'রোটাকে আগলে রাখতে পা'গলের মতো চেষ্টা করেছি।আগেও মাঝে মাঝে নানান সমস্যায় মেয়েটাকে পড়তে হতো তাই তাকে ভার্সিটি যেতে দিতাম না, সে ঘরের বসে অনলাইন ক্লাস করত। নিজের সবটুকু দিয়ে মেয়েটাকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছি ।অন্যদিকে তোমার থেকে ঋণ নেয়া টাকার বোঝা।একদিন তুমি এসে মেয়েটাকে তুলে নিয়ে গেলে"
আফসার চৌধুরী রিভেনের চোখের দিকে সরাসরি তাকালেন। তার চোখে আছে এক চরম আ'র্তি।
"সত্যি বলতে সেদিন আমি আরও ভে'ঙে পড়েছিলাম। ভেবেছিলাম বাবা হিসেবে আমি ব্যর্থ।ভেবেছিলাম তুমিও তোমার বাবার মতো
কিন্তু সময়ের সাথে সাথে আমি যখন দেখলাম তুমি আমার মেয়েটাকে কতটা আগলে রেখেছ, তাকে ক'ষ্ট দিচ্ছ না বরং ভালোবাসায় মুড়িয়ে রাখছ আমার সব দুশ্চিন্তা চলে গেল"
আফসার চৌধুরী এবার রিভেনের দুটো হাত শক্ত করে ধরলেন। তার কণ্ঠস্বর কান্নায় বুজে এল,
"আমার মেয়েটাকে খুঁজে নিয়ে আসো রিভেন। আমি তোমার কাছে ভিক্ষা চাইছি। এই মাফিয়া জগতের সম্রাট তুমি। আমার বুকটা খালি হয়ে যাচ্ছে রিভেন...আমার মেয়েটাকে বাচাঁও"
রিভেন কোনো কথা বললো না ।সে স্থির হয়ে বসে আছে ।চোখদুটো অ'গ্নিশি'খার মতো লাল।
এনজো পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে এল। সে পরম আফসার চৌধুরীর কাঁধে হাত রেখে নিচু স্বরে বলল,
"দুশ্চিন্তা করবেন না আঙ্কেল। আমাদের ওপর ভরসা রাখুন। ইতালির আকাশে আজ যে ঝড়ের আভাস দেখছেন তা ম্যামকে ফিরিয়ে আনার জন্যই। আমরা আমাদের শেষ র'ক্তবি'ন্দু দিয়ে হলেও ম্যামকে ফিরিয়ে আনব।"
রিভেন এবার কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা সাইলাসের দিকে তাকাল। সাইলাস এতক্ষণ মূ'র্তির মতো দাঁড়িয়ে সব কথা শুনছিল। সাইলাস এক পা এগিয়ে এসে রিভেনের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
"লোকটা আ'ন্ডারগ্রা'উন্ডের বস ।নাইলাও তার চেহারা কখনো দেখেনি ।সবসময় মাস্ক পড়ে থাকে ।লোকেশন ও ক্লিয়ার না "
রিভেন সাইলাসের দিকে না তাকিয়েই বরফশীতল স্বরে হুকুম দিল,
"মেয়েটার মুখ থেকে কথা বের করো সাইলাস। যদি সহজে না বলতে চায়, তবে ট'র্চার সে'লে নিয়ে গিয়ে ন'রক দ'র্শন করাও। তোমার সব পদ্ধতিকে আমি অনুমোদন দিচ্ছি"
সাইলাস কেবল একবার মাথা নোয়াল রিভেন তাকে নাইলার পুরো দায়িত্ব দিয়েছে।সাইলাসের চোখের সেই চেনা ঘা'তক রূ'পটা মুহূর্তেই ফুটে উঠল।
ঠিক সেই মুহূর্তে এনজোর পকেটে থাকা ফোনটা সশব্দে বেজে উঠল। একটা মেসেজ টোন। এনজো দ্রুত ফোনটা বের করে স্ক্রিনে চোখ বুলাতেই তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে রিভেনের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
"বস,ভ্যালেরিয়া মরিওিকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। সে তার আস্তানা ছেড়ে পালিয়েছে।"
রিভেনের ভেতরে থাকা দা'নবটা এবার স'জাগ হয়ে উঠল। সে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে তার বা'রাটা পি'স্ত'লটা হো'লস্টারে ভ'রতে ভ'রতে জা'ন্তব স্বরে গর্জে উঠল,
"পালাবে কোথায়? মরিওির বাড়িটা এখনই ডি'নামা'ইট দিয়ে উড়িয়ে দাও। আমি চাই না তার কোনো চিহ্ন এই শহরে অবশিষ্ট থাকুক। আর জ্যাকেলের বাড়ির লোকেশন যত দ্রুত সম্ভব ট্র্যাক করো"
এনজো দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিল,
"ইয়েস বস। আমাদের নেটওয়ার্ক এখন পুরো ইউরোপে সক্রিয়। সব দেশের ইনফর্মারদের কাছে ম্যাডামের ছবি পৌঁছে গেছে।"
____________
রাত তখন প্রহর গুনছে, ঘড়ির কাঁটা বারোটার ঘর ছুঁইছুঁই। আফসার চৌধুরী নিজের গাড়িটি যখন বাড়ির গেটের সামনে এনে থামালেন। রিভেনের কাছে মনের ভেতরের সেই দ'হনটুকু উগড়ে দিয়ে আজ তাঁর নিজেকে কিছুটা ভারমুক্ত মনে হচ্ছে। রোজেলিয়াকে নিয়ে হাসপাতালের স্মৃতিটা এতদিন তার মনে পড়েনি আজ সকালে মনে পড়তেই দেরী না করে রিভেনকে সব জানিয়ে দিয়েছেন। রিভেনের সেই র'ক্তা'ক্ত চোখ আর ভাঙা হৃদয়ের আর্তনাদ দেখে আফসার বুঝেছেন পৃথিবীর সমস্ত অন্ধকার একদিকে আর তাঁর মেয়ের প্রতি ওই ছেলেটার ভালোবাসা অন্যদিকে।
শারমিনের কথা মনে পড়তেই আফসারের কপালে চিন্তার ভাঁজ গভীর হলো।সে এখনো পুরোপুরি সুস্থ নয় অসুস্থ শরীর নিয়ে শারমিন কেবল প্রতিটি মুহূর্ত মেয়ের ফেরার প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে। প্রতিটি সন্ধ্যা নামে আর শারমিনের সেই এক করুণ প্রশ্ন "আমার রোজির কোনো খবর পেয়েছে?"
আফসার কোনো উত্তর দিতে পারেন না। রোজেলিয়া ছাড়া এই বাড়িটা খুব ফাঁকা লাগে আর আজ তাকে ছাড়া পুরো শহরটায় ফাঁকা হয়ে গেছে।একটা মাএ মেয়ে তার ছোট বেলা থেকে কত আদর যত্নে বড় করেছেন কত আগলে রেখেছেন আর আজ তার চোখের মণির কোনো খোঁজই পাওয়া যাচ্ছে না ।কাকে দোষ দিবে ? রিভেন তার সব চেষ্টায় করে যাচ্ছে ।কখনো নিজেকে শক্ত করে সিংহের মত গ'র্জে উঠছে আবার কখনোবা ভেঙে পড়ছে ।
গাড়িটা একপাশে রেখে আফসার চৌধুরী ধীর পায়ে বাড়ির সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। রাতের হিমেল হাওয়া তাঁর শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল। কলিং বেল টিপতে গিয়ে তাঁর আঙুল থমকে গেল। তিনি দেখলেন, সদর দরজাটি পুরোপুরি বন্ধ নয় হালকা খোলা। এক অদ্ভুত অ'স্থিরতা তাঁর শি'রদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল।
তিনি দরজাটি ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন। ড্রয়িংরুমের ভেতরটা অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ। চারদিকের নিকষ অন্ধকার ।আফসার চৌধুরী টলমলে পায়ে ড্রয়িংরুমের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর হৃ'দপিণ্ড তখন এক অশান্ত ঘোড়ার মতো পাঁ'জরে'র দে'ওয়ালে আ'ছড়ে পড়ছে। সুইচবোর্ডে হাত দিয়ে আলোটা জ্বালতেই তিনি যা দেখলেন তাতে মনে হলো পৃ'থিবীটা যেন তাঁর পা'য়ের নিচ থেকে এক ল'হমায় সরে গেল।
To be continue,,,,