#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins) #লেখনিতে_ফারিহা
পর্ব ৩৭
(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)
বিকেলের সূর্য আজ তেজ হারিয়েছে অনেক আগেই। দিগন্তজুড়ে মেঘের ঘনঘটা যেন কোনো এক বিষণ্ণ শোকাতুর কবির কলম থেকে ঝরে পড়া কালির আঁচড়। আকাশটা আজ এক বিশাল স্লেট পাথরের মতো কালো হয়ে আছে, গুমোট আবহাওয়ায় বাতাসের প্রতিটি কণা ভারী হয়ে উঠেছে। আজ প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেল। রিভেনের লোকেরা নানান দেশে খুজঁছে, কিন্তু রোজেলিয়ার কোনো চিহ্ন নেই। জাদুকরী কোনো জালের মতো সে যেন শূন্যে মিলিয়ে গেছে।
এমনকি আফসার ও শারমিন চৌধুরীর নি'থর দেহ যখন তাঁদের বাসায় পাওয়া গেল, সেখানেও খু'নি কোনো স্বাক্ষর রেখে যায়নি। সবকিছুই এক গোলকধাঁধা, এক সুনিপুণ ম'রণফাঁ'দ।
রিভেন ব্রিজের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে আকাশের ওই জমাটবদ্ধ অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে। তার ঠোঁটের কোণে জ্বলন্ত সিগারেট থেকে নির্গত ধোঁয়াগুলো কুন্ডলী পাকিয়ে শূন্যে বিলীন হচ্ছে। রিভেনের চোখ দুটো বরাবরের মতোই টকটকে লাল। চোখের নিচের কালচে রেখাগুলো দেখে বোঝাই যাচ্ছে গত কয়েকদিন সে এক মুহূর্তের জন্যও ঘুমের দেশে পাড়ি জমায়নি।
সে তার হাতে থাকা রূপালি নূপুর জোড়ার দিকে তাকাল। নূপুরের ঘুঙুরগুলো আজ নিস্তব্ধ, যেন তারাও তাদের মালকিনের বিরহে শোক পালন করছে। রিভেনের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে এখন তার আরেকটা বাড়িতে থাকতে শুরু করেছে কেননা সে মনে মনে সংকল্প করেছে যে তার রোজ পেটালকে নিয়েই সে তার মূল বাড়িতে ফিরবে।তার রোজ পেটাল এর স্মৃতি সে বাড়ির প্রতিটি কোণায় কোণায় মিশে আছে।
মোটরসাইকেলের চাকার ঘর্ষণে রাস্তায় এক কর্কশ শব্দ হলো। সাইলাস তার বাইক থেকে নেমে ধীর পায়ে রিভেনের সামনে এসে দাঁড়াল। রিভেন সি'গারেটে এক দীর্ঘ টা'ন দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে শীতল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
"মুখ খুলেছে?"
সাইলাস একটি দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করল। তার অবয়বেও এক ক্লান্তির ছায়া। সে নিচু স্বরে বলল,
"না বস। নাইলা বারবার একটি কথাই বলছে সে তার মুখ কোনোদিন দেখেনি। শুধু একবার এক পলকের জন্য চোখ দুটো দেখেছিল, যা ছিল বাদামী বর্ণের।"
রিভেন আবার সি'গারেটে টান দিল। চারপাশে এক অসহ্য, নিথর নীরবতা। গত কয়েক দিন নাইলার ওপর দিয়ে যে পৈ'শাচি'ক নি'র্যা'তন চলেছে, তাতে অন্য কেউ হলে হয়তো ম'রেই যেত। রিভেন নাইলার শা'স্তির সম্পূর্ণ ভার সাইলাসের ওপর অর্পণ করেছিল, কারণ এই বি'শ্বাসঘা'তকতার মূল সূত্র ছিল নাইলা।
"সাইলাস।"
সাইলাস সোজা হয়ে দাঁড়াল। "ইয়েস বস।"
রিভেন আকাশের দিকে মুখ তুলে একরাশ ধোঁয়া ছাড়ল। তার শূন্য চোখ দুটো আজ ভাবলেশহীন, যেন কোনো পাথরের মূর্তির অবয়ব। সে ধীর স্বরে প্রশ্ন করল,
"যদি তোমাকে আমি দুটো অপশন দিই ,ভালোবাসা না কি আনুগত্য. তবে তুমি কোনটি বেছে নেবে?"
এমন অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে সাইলাস এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। কিন্তু তার উত্তর দিতে এক সেকেন্ডও দেরি হলো না। সে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বলল,
"আনুগত্য বস।"
রিভেন তার দৃষ্টি সাইলাসের দিকে ফিরিয়ে আনল।
"আর যদি বাছাই করতে হয় তার আর আমার মধ্যে "
সাইলাসের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে জানত 'তার' বলতে রিভেন কাকে বোঝাচ্ছে। সাইলাস কোনো দ্বিধা ছাড়াই উত্তর দিল,
"অবশ্যই আপনি বস।"
রিভেন আর কোনো উত্তর দিল না। সাইলাস এবার একটু এগিয়ে গিয়ে খুব নিচু কণ্ঠে বলল,
"যদি প্রশ্নের অপশনে আপনি থাকেন বস, তবে দুনিয়ার যেই থাকুক না কেন, আমি আপনাকে বেছে নেব। আপনার সাথে কাজ শুরু করার দিনেই আমি শপথ নিয়েছিলাম আমি আপনার প্রতি আজীবন অনুগত থাকব। আপনার জন্য নিজের শেষ র'ক্তবি'ন্দু বিসর্জন দিতেও আমার হাত কাঁপবে না।"
সাইলাস জীবনে এই প্রথম রিভেনের সামনে নিজের অনুভূতির কথা এত স্পষ্টভাবে বলল। তার হৃ'দস্প'ন্দন তখন এক তপ্ত ড্রামের মতো বাজছে। এক অদ্ভুত অসহায়ত্ব তাকে গ্রাস করছে, যার কোনো ব্যাখ্যা তার কাছে নেই।
"বস..."
রিভেন আবার মুখ খুলল।
"আমাদের মাফিয়া জগতের একটিই চিরন্তন নিয়ম সাইলাস। সিসিলিয়ান মাফিয়ারা যুগ যুগ ধরে বি'শ্বাসঘা'তকদের একটিই শা'স্তি দিয়ে আসছে। এই নিয়মের কোডকেই আমরা বলি ও'মের্তা। বি'শ্বাসঘা'তকতার একমাত্র মূল্য হলো মৃ'ত্যু।"
সাইলাসের বুকের খাঁচায় হৃৎপিণ্ডটা যেন পিঞ্জরাবদ্ধ পাখির মতো ছটফট করতে লাগল। চারপাশের পরিবেশটা আজ বড্ড নিস্তব্ধ, বড্ড নিষ্ঠুর।
"সাইলাস,"
রিভেনের চোয়াল পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। "আমি নাইলার শা'স্তির ভার তোমার ওপরেই ছেড়ে দিলাম। তুমি ছাড়া অন্য কেউ তাকে শাস্তি দিতে পারবে না। আমার রোজ পেটালকে যারা ছি'নিয়ে নিয়েছে তাদেরকে নিজে হাতে শাস্তি দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু নাইলা... নাইলার বি'চার তুমি করবে।"
সাইলাস স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার হাত দুটো নিজের অজান্তেই মু'ষ্টিব'দ্ধ হয়ে গেল। এর আগেও সে রিভেনের নির্দেশে বহু মানুষকে শা'স্তি দিয়েছে, কিন্তু আজ কেন তার এমন লাগছে?নাইলার সাথে তার পরিচয় মাত্র কয়েক মাসের?, অথচ এই স্বল্প সময়ে নাইলার সেই মায়াবী চোখ আর হাসি তার হৃদয়ের কোনো এক অন্ধকার কোণে এক অদ্ভুত মায়ার জাল বুনেছে। সে জানে না এই অনুভূতির নাম কী, কারণ সে কখনো কাউকে ভালোবাসার সুযোগ পায়নি।
কিন্তু আজ তার বস তাকে এক চরম পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আনুগত্য আর মায়ার এই দ্বন্দ্বে সাইলাস কি পারবে তার লিটল ফিয়েরার র'ক্তে নিজের হাত রা'ঙাতে?
____________
বেজমেন্টের সেই স্যাঁতসেঁতে অন্ধকূপের ভেতর নাইলার প্রতিটি নিশ্বাস যেন এক একটি ভারী পাথরের মতো বুকের ওপর চেপে বসছে। সে থরথর করে কাঁপতে থাকা হাতে কয়েক ঢোক পানি খেল, কিন্তু তার শুষ্ক গলাটা যেন মরুভূমির বালির মতো তপ্ত তৃষ্ণা কিছুতেই মিটছে না। শরীরটা চরম অবসাদে ভেঙে আসছে। রিভেনের গার্ডরা যখন তাকে ট'র্চার সে'লে নিয়ে গিয়ে পা'শ'বিক কা'য়দায় মুখ থেকে কথা বের করার চেষ্টা করছিল, সেই প্রতিটি আ'ঘাত নাইলার শরীরে নয়, বরং তার আত্মায় গিয়ে বিঁধেছিল। কেবল সাইলাস ঘরে ঢুকলে তারা তাকে নিষ্কৃতি দেয়।
নাইলার ঝাপসা হয়ে আসা চোখের সামনে আজ তার ফেলে আসা জীবনের ছিন্নভিন্ন ছবিগুলো ভেসে উঠছে। অন্ধকার ঘরের কোণায় কুঁকড়ে বসে সে ভাবছিল ,তার জীবনটা কি আর একটু সুন্দর হতে পারত না? হাই স্কুলের সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ল, যখন এক চিলতে রোদ্দুরের মতো তার জীবনে প্রেম এসেছিল। সেই তরুণী বয়সে সে তার সবটুকু আবেগ দিয়ে একটি ছেলেকে ভালোবেসেছিল। কিন্তু বিনিময়ে সে কী পেয়েছিল? কেবল প্রবঞ্চনা আর জনসমক্ষে হওয়া এক দুঃসহ অ'পমান। সেই দিন থেকেই নাইলা তার হৃদয়ের দরজায় মস্ত বড় এক তালা ঝুলিয়ে দিয়েছিল। সে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল এই পৃথিবীতে ভালোবাসা বলে কিছু নেই।
কিন্তু সাইলাস?
লোহার দরজার সেই পরিচিত কর্কশ শব্দ হলো। সাইলাস ভেতরে প্রবেশ করল। নাইলা অপ্রস্তুত হয়ে তড়িঘড়ি করে নিজেকে সামলে নিয়ে একটু নড়েচড়ে বসল। সাইলাস কোনো কথা না বলে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে নাইলার পাশের দেয়ালটায় হেলান দিয়ে মেঝের ওপর বসে পড়ল। তাদের মাঝখানে কেবল কয়েক ইঞ্চির দূরত্ব, কিন্তু সেই দূরত্বে বয়ে যাচ্ছে সহস্র ভো'ল্টের এক নীরব দ'হন।
নাইলা তার মুখটা সাইলাসের দিকে ফিরিয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। এই নিচ্ছিদ্র অন্ধকারের মাঝে সাইলাসের ওই রুক্ষ ও কঠোর মুখচ্ছবিটাই আজ নাইলার কাছে একমাত্র প্রশান্তি। সে এর আগে কখনো কোনো পুরুষের দিকে এভাবে তাকায়নি কিন্তু আজকাল সে যেন এক অ'তৃপ্ত তৃ'ষ্ণা নিয়ে সাইলাসকে দেখছে।
নাইলার এহেন ব্যবহারে সাইলাস কী ভাবছে তাতে তার কিছুই আসে যায় না।সে নির্লজ্জের মতো সাইলাসের প্রতিটি রেখা, তার চোখের কাঠিন্য আর তার নিশ্বাসের শব্দ অনুভব করতে লাগল। নাইলা মনে মনে হাসল এক বিষাদমাখা হাসি। যে নারী প্র'তিশো'ধের নে'শায় এই প্রাসাদে পা রেখেছিল, সে আজ নিজের চরম শ'ত্রুর ছায়াসঙ্গীর প্রেমে বিদ্ধ।
সেলে জমে থাকা জমাটবদ্ধ নীরবতা চিরে সাইলাসের কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো।
"বস... তোমার শাস্তির দায়িত্ব আমাকে দিয়েছেন।"
সাইলাসের কথা শুনে নাইলা দমল না, বরং তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান ও বিষাদমাখা হাসি ফুটে উঠল। সে সাইলাসের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল না বরং তার সেই মোহাবিষ্ট দৃষ্টি দিয়ে সাইলাসকে আরও নিবিড়ভাবে বিদ্ধ করল। সাইলাস এবার সরাসরি নাইলার চোখের দিকে তাকাল। নাইলার এই বিধ্বস্ত রূপের মাঝেও এক অলৌকিক লাবণ্য যেন চুঁইয়ে পড়ছে। টিমটিমে হলদে আলোয় তার অ্যাম্বার রঙের চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। অবিন্যস্ত ঢেউ খেলানো চুলগুলো তার পাংশুটে মুখের ওপর এক মায়াবী জালের মতো ছড়িয়ে আছে। নাইলার চোখের দীর্ঘ আর ঘন পাপড়িগুলো চোখের কোণে এক অদ্ভুত গভীরতা তৈরি করেছে।
সাইলাস স্তব্ধ হয়ে ভাবল এত মায়াবী এক চেহারার আড়ালে এত বি'ষাক্ত চ'ক্রান্ত কীভাবে লুকিয়ে থাকতে পারে? তার মন চাইল এই মুখচ্ছবির দিকে অনন্তকাল তাকিয়ে থাকতে কিন্তু তার ভেতরের মাফিয়া সত্তা তাকে বারবার সতর্ক করে দিচ্ছিল।
নাইলা এবার খুব শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল,
"কী শাস্তি দেবে আমাকে?"
সাইলাস তার দৃষ্টির কাঠিন্য বজায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে পাল্টা প্রশ্ন করল,
"কী শাস্তি তোমার প্রাপ্য বলে তুমি মনে করো?"
নাইলা আবার হাসল আর ধীরলয়ে বলল,
"অপরাধীরা কখনো নিজের শাস্তি নির্ধারণ করতে পারে না সাইলাস। কারণ তারা সবাই অবচেতন মনে ভাবে যে তারা নির্দোষ, তারা কেবল পরিস্থিতির শিকার।"
নাইলার এই অকাট্য যুক্তিতে সাইলাসের ঠোঁটের কোণেও এক বাঁকা হাসির রেখা ফুটে উঠল। এই অন্ধকার প্রকোষ্ঠে এক ঘাতক আর এক বিশ্বাসঘাতক নারীর মাঝে এক অদ্ভুত বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই শুরু হয়েছে।
সাইলাস তার হাত দিয়ে নাইলার চিবুকটা স্পর্শ করল। নাইলা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল তার হৃ'ৎপিণ্ডটা যেন বুকের পাঁ'জরে সজোরে আছড়ে পড়ল। কতদিন পর সাইলাসের এই পরিচিত স্পর্শ সে অনুভব করছে।
সাইলাস নাইলার চোখের মণি দুটোর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করল,
"উইল ইউ ম্যারি মি, নাইলা?"
নাইলা ধমকে গেল ।সে যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না। পুরো কক্ষের নিস্তব্ধতা তাকে ব্যঙ্গ করতে শুরু করল। সে বিস্ফোরিত চোখে সাইলাসের দিকে তাকিয়ে রইল।সাইলাস কী এটা কোনো জোকস করছে ?
সাইলাস আবারও প্রতিটি শব্দে জোর দিয়ে বলল,
"উইল ইউ ম্যারি মি?"
নাইলা বিস্ময়ে তোতলানো স্বরে অস্ফুটভাবে বলল,
"কী... কী বলছ তুমি?"
সাইলাসের চেহারায় কোনো কৌতুক ছিল না, ছিল এক পাথুরে দৃঢ়তা। সে নিচু স্বরে বলল,
"আমি সিরিয়াস। উত্তর দাও"
নাইলা পাথর হয়ে বসে রইল। তার ম'স্তিষ্ক যেন এই তথ্যের ভার নিতে পারছে না। সাইলাস তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছে? এই ন'রককু'ণ্ডে, যেখানে তার মৃ'ত্যু প'রোয়া'না জারী হওয়ার কথা, সেখানে বিয়ের কথা কীভাবে আসে? এটা কি নতুন কোনো ফাঁ'দ?
কিন্তু পরক্ষণেই নাইলার মনে হলো তার হারাবার তো আর কিছুই নেই। সাইলাসই তার শেষ আশ্রয়, তার একমাত্র জগত। এই বিপদের খেলায় সাইলাসের হাত ধরা মানে মৃত্যুর কিনারে দাঁড়িয়ে জীবনকে আর একবার বাজি ধরা।
নাইলা তার শুষ্ক ঠোঁট কা'মড়ে ধরে অতিকষ্টে উত্তর দিল,
"আই... আই উইল।"
কথাটা শেষ হতেই সাইলাস এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার ভেতরের কোনো এক বিশাল দ'হন যেন এক লহমায় শান্ত হলো। সে কোনো কথা না বলে নাইলার চিবুক থেকে হাত সরিয়ে নিল এবং এক মুহূর্ত দেরি না করে উঠে দাঁড়াল। নাইলাকে সেই অন্ধকারের মাঝে ফেলে রেখে সে দ্রুত পায়ে সেলের বাইরে বেরিয়ে গেল। লোহা আর পাথরের ঘর্ষণে দরজার সেই কর্কশ শব্দটা নাইলার কানে বেজে উঠল।
নাইলা সেই গুমোট অন্ধকারে একাকী বসে রইল ।তার মনে হাজারো প্রশ্ন এসে কমা হতে লাগলো।
__________
অন্ধকার আজ এক নিরেট পাথরের মতো এই চার দেয়ালের মাঝে জমাট বেঁধে আছে। জানলার ভারী পর্দার একটি সরু ফাঁক গলে দুপুরপর রোদের আলোর একটি ক্ষীণ রেখা তীরের মতো এসে ঘরের মেঝেতে পড়ছে। বিছানায় শুয়ে থাকা মেয়েটি অত্যন্ত যন্ত্রণায় একবার উঠে বসার চেষ্টা করল, কিন্তু শরীরের হা'ড়গুলো যেন আজ কাঁচের মতো ভ'ঙ্গুর এক লহমায় সে আবার সেই সাদা চাদরের ওপর আ'ছড়ে পড়ল।
তার প্রতিটি নিশ্বাস এক একটি দীর্ঘশ্বাসের মতো ভারী। সে অস্ফুট স্বরে, শুষ্ক ও ফাটা ঠোঁট দুটো অতি কষ্টে নাড়িয়ে বিড়বিড় করে উঠল,
"পানি... একটু পানি..."
আবারও সেই অসহ্য নিস্তব্ধতা। তার চারপাশের জগতটা যেন এক আদিম গোলকধাঁধা। মাথার ভেতরটা কোনো এক অদৃশ্য হা'তুড়ি'র ঘা'য়ে চু'রমা'র হয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে সব ঝাপসা যেন চারপাশের আসবাবপত্র সব দুলছে। সে থরথর করে কাঁপতে থাকা হাতটি বাড়িয়ে খাটের পাশের সাইড টেবিলে কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করল, কিন্তু তার স্নায়ুগুলো আজ তার নিজেরই অবাধ্য।এক তীব্র পিপাসা তার কণ্ঠনালীকে মরুভূমির মতো তপ্ত করে তুলছে।
তখনই ভারী দরজার লক খোলার একটি তীক্ষ্ণ শব্দ হলো। একজন নার্স ধীর পায়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল। মেয়েটির এই ছ'টফটা'নি দেখে সে দেয়ালের সুইচে চাপ দিতেই পুরো ঘরটা আলোয় ভেসে উঠল। নার্সটি দক্ষতার সাথে মেয়েটিকে ধরে একটু উঠিয়ে বসাল এবং গ্লাসে করে পানি এগিয়ে দিল। মেয়েটি যেন এক তৃষ্ণার্ত চাতক পাখির মতো সেই তরলটুকু পান করল, কিন্তু তার চোখের সেই শূন্যতা কাটল না।
নার্স গ্লাসটি যথাস্থানে রেখে মেয়েটিকে আবার শুইয়ে দিল। তার কপালে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে সে এক অদ্ভুত মমতায় চেয়ে রইল। মেয়েটি যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে ধরা গলায় বলল,
"মাথায়... প্রচণ্ড... ব্যথা... যেন ফেটে যাচ্ছে সব..."
নার্সটি তার কপালে আঙুল বোলাতে বোলাতে ফিসফিস করে বলল,
"খুব শীঘ্রই এই সব ব্যথা ভস্ম হয়ে যাবে। এখন ঘুমিয়ে পড়ো।"
ঘরের নিস্তব্ধতা চিরে আবার দরজাটা খুলে গেল। ভেতরে এক দীর্ঘদেহী ছায়াময় অবয়ব প্রবেশ করলো । সে নার্সের দিকে না তাকিয়েই গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করল,
"প্রোগ্রেস কতদূর?"
নার্সটি বিনীতভাবে মাথা নত করে উত্তর দিল,
"আর কিছুদিনের মধ্যেই ডো'জ কমপ্লিট হবে। তার ম'স্তিষ্কের নি'উর'নগুলো এখন আমাদের নিয়ন্ত্রণে। পুরনো স্মৃ'তিগুলো একে একে ধূ'সর কু'য়াশায় ঢেকে যাচ্ছে।"
লোকটি তৃপ্তির হাসি হাসল। সে ধীরে ধীরে বিছানার পাশে এসে দাঁড়াল। তার ঠান্ডা হাতটি দিয়ে সে মেয়েটির কপালে আলতো করে হাত বুলাতে লাগল। মেয়েটির চোখের পাতা তখন আচ্ছন্নতায় বুজে আসছে।
লোকটি অত্যন্ত নিচু, প্রায় অশরীরের মতো স্বরে নির্দেশ দিল,
"Fall asleep..."
তারপর সে মেয়েটির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো ,
"রোজেলিয়া..."
To be continue,,,