ফন্ট সাইজ:
থিম:
Paradise of sins

৪১তম পর্ব

লেখক: Fariha

#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins) #লেখনিতে_ফারিহা

পর্ব ৪১

(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)

সূর্যকিরণের প্রখর ছটা আজ স্পেনের সেই নিভৃত প্রাসাদের অন্দরে প্রবেশ করেছে, কিন্তু সেই আলোতেও যেন এক ধরণের বিষাদমাখা শীতলতা মিশে আছে। সুইমিং পুলের স্ফটিক স্বচ্ছ নীল জলরাশির নিচে আজ সেই দা'নবীয় কুমিরটিকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বিশাল আকৃতির সেই সরীসৃপটি খাঁচার ভেতর স্থির হয়ে আছে, তার গায়ের কর্কশ আর পিচ্ছিল টেক্সচার দেখে যে কারও শিরায় হিমেল স্রোত বয়ে যাবে।

রোজেলিয়া পুলের একেবারে কিনারে বসে আছে। তার রেশমি চুলগুলো ভোরের বাতাসে হালকা দুলছে। সে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সেই দানবীয় প্রাণীটির দিকে তাকিয়ে আছে। ডেইগোর এই অদ্ভুত শখ রোজেলিয়ার কাছে বরাবরই এক বড় রহস্য। শখের বশে মানুষ কত কী পালে, কিন্তু এমন এক ঘা'তক জলচর প্রাণী?কুমিরের ওই অদ্ভুত দ'র্শন চামড়া আর নির্লিপ্ত চোখ দুটো দেখলে রোজেলিয়ার গা ঘি'নঘিন করে ওঠে, তবুও সে এক অদ্ভুত সম্মোহনে ওদিকেই তাকিয়ে থাকে।

তার মাথার ভেতর একটা তীব্র যন্ত্রণার ঢেউ খেলে গেল । গত কয়েকদিন ধরেই এই splitting headache রোজেলিয়াকে ছাড়ছে না। মাঝে মাঝে সব ঝাপসা হয়ে আসে, যেন মস্তিষ্কের ভেতর কেউ হা'তু'ড়ি দিয়ে আ'ঘা'ত করছে। ললাটের দুই পাশে যেন সহস্র ত'প্ত সুঁ'চ একসাথে বিঁ'ধছে। মাথাটা বনবন করে ঘু'রছে তার।নিনা বলেছে এগুলো নাকি স্বাভাবিক।তার দু'র্ঘটনার পর স্মৃ'তিলোপ পাওয়া আর তার জন্য ব্যবহৃত কড়া ডো'জের ওষুধের এই পা'র্শ্বপ্র'তিক্রিয়া নাকি খুব শীঘ্রই কে'টে যাবে। কিন্তু রোজেলিয়ার মনে হয়, এই ওষুধগুলো যেন তার ম'গজে এক ঘন কুয়াশা তৈরি করে রেখেছে।

রোজেলিয়ার বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ে খুব। সে শেষ কবে তাদের মুখ দেখেছিল? স্মৃতিগুলো ধোঁয়াশার মতো ঝা'পসা, যেন কুয়াশাচ্ছন্ন কোনো আয়না। ডেইগো বলেছে,

অ্যা'মনে'সিয়া'র কারণে সে তার এক বছরেরও বেশি সময়ের স্মৃ'তি হারিয়ে ফেলেছে।

রাতের নিস্তব্ধতায় রোজেলিয়া ঘুমোতে পারে না। এক অজানিত শূন্যতা আর হাহাকার তার বু'ক চি'রে বে'রিয়ে আসতে চায়। কোনো কারণ ছাড়াই মাঝরাতে তার দু-চোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ে। কেন কাঁদছে সে? তার বু'কের ভেতরটা তার বাবা মায়ের জন্য হাহাকার করে কিন্তু আরেকটা শূন্যতাও তাকে সবসময় গ্রাস করে।সবকিছুই তার কাছে বড্ড এলোমেলো লাগে।

ডেইগো তাকে যথেষ্ঠ প্রমাণ দেখিয়েছে। ভিডিও ফুটেজ, যেখানে আফসার চৌধুরী ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে বলছেন যে রিভেন নামের এক দা'নব তাঁর মেয়েকে তুলে নিয়ে গেছে। ডেইগো বলেছে, রিভেনই তার মা-বাবাকে খুন করেছে কেবল তাকে পাওয়ার নে'শায়। এক বছর ধরে রিভেন তাকে অ'ক'থ্য নি'র্যা'তন করে বন্দি করে রেখেছিল, আর সেখান থেকেই ডেইগো তাকে উদ্ধার করে এনেছে।

সবই তো সত্যের মতো সাজানো, সব প্রমাণই তো রিভেনের বিরুদ্ধে। ডেইগো তাকে গত কয়েকদিনে দক্ষ শিক্ষকের মতো মার্শাল আর্ট আর ব'ন্দু'ক চালানো শিখিয়েছে। তবে সেদিন কেন সে রিভেনকে মা'র'তে পা'রল না? কেন ট্রি'গা'র চা'পা'র মুহূর্তে তার আঙুলগুলো অ'বশ হয়ে গিয়েছিল?

রিভেনের আ'র্তনা'দ ভরা কণ্ঠস্বর তার কানে আজও প্রতিধ্বনিত হয়।এমনকি সে রিভেনের চোখে কোনো ভয় দেখেনি, দেখেছিল এক অমোঘ সমর্পণ।রিভেন তার হাতে ম'র'তেও রাজি ছিল। কেন? কেন একজন খু'নি তার শি'কা'রের হাতে প্রা'ণ দিতে চাইবে এমন মগ্নতায়?

রোজেলিয়ার মাথায় য'ন্ত্রণা'র মাত্রাটা এবার অস'হনী'য় পর্যায়ে পৌঁছে গেল। সে যখনই খুব গভীরে কিছু চিন্তা করার চেষ্টা করে, ওই ক'ড়া ও'ষু'ধগুলোর প্র'ভাবে তার ম'স্তি'ষ্ক অ'ব'শ হয়ে আসে। অতিরিক্ত চিন্তা করলেই মাথার ভেতরের সেই দ'হন যেন বহুগুণ বে'ড়ে যায়, তাকে বাধ্য করে আবার সেই অন্ধকার বি'স্মৃ'তির অতলে তলিয়ে যেতে।

রোজেলিয়া দু-হাতে নিজের মা'থা চে'পে ধরল।

"রোজেলিয়া, ডাইনিং টেবিলে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। স্যার উঠে গেছেন।"

নিনা তার পাশে এসে দাড়িয়েছে ।রোজেলিয়া চমকে উঠল। সে খেয়ালই করেনি সময়ের কাঁটা কখন এক বৃত্ত পেরিয়ে গেছে। এই বাড়ির প্রতিটি ধূলিকণাও যেন একটি অদৃশ্য ঘড়ির কাঁটায় বাঁধা।ডেইগো নিয়মের প্রশ্নে এক নি'ষ্ঠু'র সম্রাট। এই অট্টালিকার প্রতিটি ভৃত্য, প্রতিটি ঘা'তক, এমনকি খোদ রোজেলিয়াকেও রুটিন মেনে চলতে হয়। ডেইগোর সাম্রাজ্যে সময়ের হেরফের হওয়া মানেই হলো অবধারিত শা'স্তি।

রোজেলিয়ার জীবনটাও যেন ডেইগোর আঁকা এক স্থিরচিত্র ।প্রতিদিন একই ধরণের চুলের বিন্যাস, একই রঙের পোশাক, ঠিক যেন ডেইগোর ব্যক্তিগত গ্যালারির এক নি'ষ্প্রাণ পুতুল ।

রোজেলিয়া তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াতে গেলে নিনা তার হাতটা আলতো করে স্পর্শ করল।

"ব্যস্ত হয়ো না রোজ, এখনো দশ মিনিট সময় আছে।"

রোজেলিয়া এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল। নিনা তার মুখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, "মাথা ব্যথাটা কি কমেছে?"

"সামান্য," রোজেলিয়া ম্লান স্বরে উত্তর দিল। তার দৃষ্টিতে তখনো সেই অ'ব'শ করা য'ন্ত্র'ণার রেশ।

নিনা একবার সন্তর্পণে চারপাশটা দেখে নিল। অদূরে কালো পোশাকে আবৃত গার্ডরা রোবটের মতো দাঁড়িয়ে আছে। যদিও তারা কিছুটা দূরত্বে, কিন্তু নিনা জানে এই বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে বসানো প্রতিটি সিসিটিভি ক্যামেরা তৃতীয় চক্ষু হয়ে তাদের প্রতিটি নিশ্বাস পর্যবেক্ষণ করছে। নিনা আরও একটু ঝুঁকে এল, তার কণ্ঠস্বর এখন ভয়ের চাদরে মোড়ানো।

"রোজ, তোমাকে একটা অনুরোধ করছি... স্যারের সামনে কোনো অযৌক্তিক প্রশ্ন কোরো না, প্লিজ!"

রোজেলিয়া ভ্রু কুঁচকে তাকাল। তার ক্লান্ত ম'স্তিষ্কে নিনার এই অদ্ভুত সতর্কবার্তা ঠিকমতো প্রবেশ করল না।

"কী বলতে চাইছ নিনা? আমি তোমার কথা বুঝতে পারছি না।"

নিনা কাঁপা ঠোঁটে উত্তর দিল,

"না মানে, স্যারের সামনে ভুলেও কখনো ওই রিভেন নামের লোকটার কথা—"

ঠিক তখনই নিনার পকেটে থাকা ফোনটি একটি তীক্ষ্ণ শব্দে বেজে উঠল। নিনার মুখটা মুহূর্তেই ফ্যা'কা'শে হয়ে গেল। সে দ্রুত হাত সরিয়ে নিয়ে আ'ত'ঙ্কিত স্বরে বলল,

"তুমি যাও! এখনই যাও!"

রোজেলিয়া আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল না। সে দ্রুত পায়ে ডাইনিং হলের দিকে দৌড়ে গেল। তার সেই লম্বা চুলের জলপ্রপাত পিঠের ওপর আছড়ে পড়ছে।

__________

বিশাল ওক কাঠের ডাইনিং টেবিলটি যেন এক নিস্তব্ধ র'ণ'ক্ষেত্র। রুপালি পাত্র আর দামী ক্রিস্টালের বাসনগুলো সকালের আলোয় ঝকমক করলেও পরিবেশটা এক হা'ড়কাঁ'পানো গথিক শীতলতায় আচ্ছন্ন। রোজেলিয়া তার নির্দিষ্ট চেয়ারে এসে বসলো।

কিছুক্ষণের মধ্যেই হলরুমের ওপাশ থেকে শোনা গেল বুটের সেই কর্কশ শব্দ।ডেইগো ভেতরে প্রবেশ করল। তার পরনে আজ একটি স্লেট রঙের ফিটেড স্যুট, যা তার পেশীবহুল অবয়বকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।

ডেইগোর মুখে সেই চিরাচরিত ম্লান কিন্তু নিষ্ঠুর হাসি। সে এসে রোজেলিয়ার ঠিক উল্টো দিকের চেয়ারটিতে বসল।

ডেইগোর সেই গাঢ় পিঙ্গল চোখ দুটো রোজেলিয়ার মুখের ওপর স্থির হলো। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো সে রোজেলিয়ার প্রতিটি স্নায়ুর স্প'ন্দন মেপে নিচ্ছে।

ডেইগো অত্যন্ত নিচু আর মোহনীয় স্বরে বলল,

"গুড মর্নিং, মাই বিউটিফুল ডল। সময়মতো টেবিলে এসেছ দেখে খুশি হলাম।"

রোজেলিয়া মাথা নিচু করে রইল। ডেইগোর এই অতিরিক্ত প্রশংসা তাকে সবসময় এক অদৃশ্য শিকলে বাঁধার মতো অনুভূতি দেয়। ডেইগো নিজের কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে আবার বলল,

"নিনা বলছিল তোমার নাকি মাথা ব্যথা করছিল? এখন কেমন আছ? আমার ডল এর শরীর খারাপ থাকলে এই পুরো বাড়িটা কিন্তু শ্ম'শা'নের মতো নি'স্ত'ব্ধ হয়ে যায়।"

ডেইগো তার কফির কাপটি টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল।

"বাই দ্যা ওয়ে আজ বিকেলে ড্যাড তোমার সাথে দেখা করতে আসছে । তিনি বলছিলেন তোমাকে নাকি খুব মিস করছেন।"

ফ্র্যাঙ্ক মোরালেসের নামটা শোনামাত্রই রোজেলিয়ার বু'কের ভে'তরটা যেন এক নিমিষে হি'ম হয়ে গেল। তার হাত থেকে ধরা কাঁটাচামচটা প্লেটের ওপর সামান্য কেঁ'পে উঠল। এই লোকটাকে সে অবচেতনভাবেই ঘৃণা করে। ডেইগোর বাবা যেন এক পাথুরে শিলাখণ্ড যার ভেতরে কোনো প্রা'ণের স্প'ন্দন নেই। ডেইগো অন্তত মখমলের আবরণে তার নিষ্ঠুরতাকে ঢেকে রাখে, কিন্তু ফ্র্যাঙ্ক? তার প্রতিটি কথা যেন চা'বু'কের একেকটি আ'ঘা'ত, যাতে কোনো আভিজাত্য নেই, আছে কেবল আদিম হিং'স্র'তা।রোজেলিয়া জোর করে তার মুখচ্ছবি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল। সে একটি মেকি হাসি ঠোঁটে ফুটিয়ে তুলে অত্যন্ত ম্লান স্বরে বলল,

"ভালোই তো। আঙ্কেলকে আমিও অনেক মিস করছিলাম। অনেক দিন তিনি আসেননি এ বাড়িতে।"

ডেইগো কোনো উত্তর দিল না। সে কেবল তার ঠোঁটের কোণে হাসির রেখাটি ধরে রাখল। রোজেলিয়ার এই মিস করা যে কতটা অন্তঃসারশূন্য তা ডেইগোর মতো ঘা'ত'কের বুঝতে বাকি নেই। তবুও সে এই অভিনয়টুকু উপভোগ করে। সে নি'র্লিপ্ত ভঙ্গিতে আবার তার খাবারে মনোযোগ দিল।

_____________

"5 million boss "

রিভেনের ঠোঁটের কোণে এক পৈ'শা'চিক, হি'মশী'তল হাসি ফুটে উঠল। ৫ মিলিয়ন ডলার এক দালালের আনুগত্য কেনার জন্য এই অঙ্কটা নেহাত কম নয়। ডেইগোর একজন বিশ্বস্ত গার্ড এই বিপুল অর্থের প্রলোভন সামলাতে পারেনি। সে এখন রিভেনের অদৃশ্য চা'বু'কের নিচের এক ক্রীতদাস।

জ্যাক রিভেনের দিকে একটি ফাইল বাড়িয়ে দিল।

"বস, এই ডেইগো মোরালেস কেবল একজন মাফিয়া নয় সে এক অদ্ভুত দ্বৈত সত্তার অধিকারী। ল্যুভর বা মেট মিউজিয়ামের মতো জায়গায় তার তৈরি ভাস্কর্য ঠাঁই পায়। শিল্পের জগতে সে এক রহস্যময় নাম কিন্তু কেউ জানে না ওই আঙুলগুলো যেমন মাটি দিয়ে প্রা'ণ তৈরি করে তেমনি অবলীলায় মানুষের প্রা'ণও নিতে পারে। সে আগাগোড়াই একজন আস্ত সা'ইকো'প্যা'থ।"

রিভেন ভ্রু কুঁচকে তাকাল। জ্যাক বলতে লাগল,

"ফ্র্যাঙ্ক মোরালেস ছোটবেলা থেকেই বুঝতে পেরেছিল তার ছেলের ম'স্তি'ষ্কের গঠন স্বা'ভাবিক নয়। তাই তাকে কোনো স্কুলে পাঠানো হয়নি। ঘরে বন্দি রেখে হোম টিউটর দিয়ে তাকে শিক্ষিত করা হয়েছে। সেই নির্জনতায় থাকতে থাকতেই তার ভেতরের শৈল্পিক দক্ষতা আর পৈ'শা'চিক বি'কৃ'তি দুটোই চ'র'ম সীমায় পৌঁছেছে।"

মার্কো পাশ থেকে ইশারা করতেই জ্যাক গলা পরিষ্কার করে বলতে লাগলো,

"সেদিন ফ্র্যাঙ্ক মোরালেস মোরোনা সিন্ডিকেট এর সাথে এক ডা'র্ক ডি'লে'র প্রয়োজনে ইতালিতে এসেছিল। হঠাৎ তার হা'র্ট অ্যা'টা'ক হলে পরিচয় গোপন রাখতে তাকে একটি সাধারণ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। খবর পেয়ে ডেইগো পা'গ'লে'র মতো সেখানে ছুটে যায়। বাবার ওই অবস্থা দেখে সে হাসপাতালের এক নার্সের ওপর হিং'স্র'ভাবে চড়াও হয়, তাকে মা'রধ'র শুরু করে। ঠিক তখনই..."

জ্যাক একটু থামল, রিভেনের রক্তিম চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

"ম্যাম সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি ডেইগোর ওই অস'ভ্য'তা সহ্য করতে না পেরে সবার সামনে তাকে একটি প্রচণ্ড চ'ড় মারেন। ওই যে বলে না Obsession at first sting সেই চ'ড়'টাই ছিল কাল। ওইদিন থেকেই সেই হা'রা'মি'টা ম্যামের ওপর অবসেসড হয়ে পড়ে।"

রিভেনের চোয়ালের হাড়গুলো অ'মানু'ষি'ক চাপে ফুটে উঠল।সবসময়ের মতোই তার হাতের ক্রিস্টাল গ্লাসটা প্রচণ্ড শব্দে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। কাঁচের টুকরোগুলো তার হাতের তালু চিরে র'ক্ত ঝ'রি'য়ে দিল, কিন্তু রিভেনের মুখে য'ন্ত্রণা'র কোনো চি'হ্ন নেই। তার চোখ দুটো এখন এক আদিম প্র'ল'য়ের নে'শায় কাঁপছে।

"একটি চড়..." রিভেন ফিসফিস করে বলল, তার স্বরে এক ভ'য়ঙ্ক'র ঠান্ডা উ'ত্তেজ'না।

"আমার রোজ পেটাল তাকে শাসন করেছিল, আর সেই প'শু'টা সেটাকেই অধিকার মনে করে বসল?"

রুমের সেই থমথমে গথিক গাম্ভীর্যের মাঝে বাইরে থেকে এক অদ্ভুত উচ্চস্বরে চিল্লাচিল্লির শব্দ ভেসে এল। রিভেনের ধ্যানভঙ্গ হলো। সে ভ্রু কুঁচকে দরজার দিকে তাকাল।

মিনিট খানেকের মধ্যেই দরজার ওপাশে এলাহি কারবার শুরু হয়ে গেল।গার্ডরা দুটো মেয়েকে ধরে ভেতরে নিয়ে আসলো।

একটি দীর্ঘাঙ্গী স্পেনের মেয়ে দৌড়ে মার্কোর কলার ধরে চিৎকার করে বলছে,

"মার্সেলো! তুমি আমাকে বলেছিলে তোমার হা'র্ট শুধুমাত্র আমার জন্য স্পন্দিত হয়! তাহলে এই কা'লনা'গি'নীটা তোমার সাথে ওইদিন কী করছিল?"

অন্যজন এক জাঁকজমকপূর্ণ চশমা পরা ফরাসি মেয়ে মার্কোর টাই ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে ভাঙা ভাঙা গালি দিচ্ছে,

"হা'র্ট? ও তো একটা পাবলিক ট্রান্সপোর্ট! তুমি শুধু আমার তাই না মার্কো। শাট আপ ইউ চিট"

মার্কো দুই হাত তুলে আত্মসমর্পণ করার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। তার সিল্কের শার্টের অর্ধেক বোতাম ছিঁড়ে গেছে। সে করুণ সুরে বলল,

"আরে সোনামানিরা, তোমরা ভুল বুঝছ! ও তো আমার... দূর সম্পর্কের কাজিন"

"কাজিন তোমার গুষ্টির! আমি সব দেখেছি"

প্রথম জন এক প্রচণ্ড চিৎকার দিয়ে মার্কোর চু'লে টা'ন দিল।

রিভেনের ডেস্কে থাকা ভারী কাঁচের পেপারওয়েটটা রিভেন স'জোরে মা'টিতে ছু'ড়ে মা'রল। সেই প্রচণ্ড শব্দে পুরো করিডোর মুহূর্তে শ্ম'শা'নের মতো নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মার্কো আর সেই দুই নারী থতমত খেয়ে রিভেনের দিকে তাকাল। রিভেনের চোখ দুটো তখন হ্যাজেল থেকে র'ক্তব'র্ণ হয়ে আছে, তার হাত থেকে র'ক্ত চুঁ'ই'য়ে পড়ছে কার্পেটে।

রিভেন অত্যন্ত নিচু আর হিমশীতল স্বরে বলল,

"গেট দেম আউট। বিফোর আই ব্লো দেয়ার ব্রে'ইন আ'উট।"

মার্কো এক সেকেন্ডও দেরি করল না। সে দুই নারীকে দুই বগলে জাপটে ধরে প্রায় পাঁজাকোলা করে দরজার দিকে দৌড় দিল। যাওয়ার সময় বিড়বিড় করে বলল,

"সরি বস! মেয়েদের সেন্টিমেন্ট যে কেন এত হাই থাকে আজকালে! আই সোয়েয়ার, কাল থেকে আমি ব্যাচেলর"

এনজো আর সাইলাস একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসল, যদিও রিভেনের সেই বিধ্বংসী চেহারার সামনে হাসা বে'মানা'ন দেখায়।

__________

ফ্র্যাঙ্ক মোরালেস বিশাল আন্টিক সোফায় বসে তাঁর পা'ইপ থেকে ধোঁ'য়া ছাড়ছিলেন। তাঁর প্রতিটি নিশ্বাস যেন এই ঘরের অক্সিজেন শুষে নিচ্ছিল।রোজেলিয়া পাশের একটি সোফায় নি'থ'র হয়ে বসে আছে। তার দু-হাত কোলের ওপর জড়ো করা ।কিছুক্ষণের জন্য একটু ঘুমিয়েছিল কিন্তু মেইডরা এসে ডেকে দিল ।তার চোখে একটু ঘুমের রেশ। ফ্র্যাঙ্ক এক মুহূর্ত রোজেলিয়ার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকালেন, তারপর দৃষ্টি ফেরালেন ডেইগোর ওপর।

"অনেক তো হলো ডেইগো,"

ফ্র্যাঙ্ক মোরালেসের খসখসে গম্ভীর কণ্ঠস্বর নিস্তব্ধতা ভেঙে দিল।

"আর কতদিন এই পুতুল নিয়ে খেলা করবে? এবার খেলাটাকে এক স্থায়ী রূপ দেওয়া প্রয়োজন।"

ডেইগো তার মদ্য'প গ্লাসটি হাতে নিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সে শান্ত চোখে তার বাবার দিকে তাকাল। ফ্র্যাঙ্ক পা'ই'পের ধোঁ'য়া ছেড়ে সোজা হয়ে বসে বললেন,

"আমার মতে আগামী সপ্তাহেই তোমাদের বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন উচিত ।মেয়েটাতো এখন পুরোপুরি সুস্থ । আর সে এখন আমাদের আমানত, আর সেই আমানতকে সিন্দুকবন্দি করার এটাই সঠিক সময়।"

কথাটা শোনামাত্রই রোজেলিয়ার বুকের ভেতরটা যেন এক নিমিষে ধ'সে পড়ল। তার মে'রুদ'ণ্ড দিয়ে এক হি'মশী'তল স্রো'ত বয়ে গেল। সে বড় বড় চোখ করে ডেইগোর দিকে তাকাল। বিয়ে? এই মানুষটার সাথে সারাজীবন? যার ভালোবাসা কেবল তাকে একটি ডল হিসেবে সা'জিয়ে রাখার মাঝে সীমাবদ্ধ?

ডেইগো কোনো উত্তর দিল না। সে তার গ্লাসের লা'ল পা'নীয়র দিকে তাকিয়ে এক রহস্যময় হাসি হাসল। ফ্র্যাঙ্ক আবার বলে,

"রিভেন আরওয়াইন এখন রোজেলিয়াকে যেকোনো উপায়েই নিয়ে যাওয়ার উপায় খুঁজছে। ওকে চিরতরে স্তব্ধ করার একটাই উপায় রোজেলিয়াকে আইনত আর সামাজিকভাবে মোরালেস পরিবারের অংশ বানিয়ে ফেলা। যখন সে জানবে রোজেলিয়া স্বেচ্ছায় তোমার ঘরনি হয়েছে, তখন ওর ওই অহংকার ধুলোয় মিশে যাবে।"

রোজেলিয়া অনুভব করল তার শ্বা'স ব'ন্ধ হয়ে আসছে। সে আড়ষ্ট স্বরে অস্ফুটভাবে বলল,

"আঙ্কেল... আমার স্মৃতি... আমি তো এখনো সব মনে করতে পারিনি—"

ফ্র্যাঙ্ক মোরালেস হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন। তাঁর সেই নিষ্ঠুর চোখে কোনো মমতা নেই। তিনি বরফশীতল স্বরে বললেন,

"অতীত মনে রাখার প্রয়োজন নেই মেয়ে। তোমার ভবিষ্যৎ আমরা লিখে ফেলেছি। ডেইগো তোমাকে উদ্ধার করেছে, সেই এখন তোমার রক্ষক। আর রক্ষাকের হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়াই তো তোমার কৃতজ্ঞতা হওয়া উচিত, তাই না?"

ডেইগো এবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রোজেলিয়ার দিকে এগিয়ে এল। সে তার দীর্ঘ আঙুল দিয়ে রোজেলিয়ার চিবুকটা উঁচিয়ে ধরল। ডেইগোর চোখে আজ এক জয়ীর উল্লাস। সে ফিসফিস করে বলল,

"ড্যাডের কথার বাইরে যাওয়ার সাহস আমার নেই ডল।তাছাড়া আমিই তোমাকে বাচিঁয়েছি আর আমরা একে অপরকে ভালোবাসি। তাহলে এই বাঁধনটা সারাজীবনের জন্য হয়ে গেলে ক্ষতি কী?"

রোজেলিয়া কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার গলার কাছে কান্নাটা দলা পাকিয়ে আটকে রইল।

to be continue,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন