ফন্ট সাইজ:
থিম:
Paradise of sins

৪২তম পর্ব

লেখক: Fariha

#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins) #লেখনিতে_ফারিহা

পর্ব ৪২

(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)

"প্রা'ণহীন মৃ'ত্তিকা কি কখনো র'ক্ত-মাং'সের ঐশ্বর্যের সমকক্ষ হতে পারে? নেভার ডল"

ডেইগোর কণ্ঠস্বর বিশালাকার স্টুডিওর নির্জনতায় কোনো গূঢ় মন্ত্রের মতো প্রতিধ্বনিত হলো। কক্ষের মাঝখানে সাদা কাপড়ের আবরণ সরিয়ে উন্মোচিত হয়েছে রোজেলিয়ার এক পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য। আজ ক্লেমডেলটি পূর্ণতা পেয়েছে। মূর্তির প্রতিটি ভাঁজ,জামার কুঞ্চন, এমনকি রোজেলিয়ার সেই বিষাদমাখা চোখের পল্লবগুলোও খুবই বা'স্তব লাগছে। কিন্তু ডেইগোর চোখে আজ তৃপ্তি নেই, বরং এক অদ্ভুত দ'হন।

সে ধীরপায়ে মূর্তির চারপাশ দিয়ে ঘুরছে। তার হাতে ধরা একটি তীক্ষ্ণ স্কাল্পটিং টুল। মূর্তির ঠোঁটের কোণে নিখুঁত বাঁক দেখে যে কেউ একে জী'বন্ত বলে মনে করবে কিন্তু ডেইগো হঠাৎ থেমে গেল। তার দৃষ্টি স্থির হলো পাশে বসে থাকা আসল রোজেলিয়ার ওপর।

রোজেলিয়া মূর্তির মতোই নিথর হয়ে বসে আছে। বিকেলের ম্লান আলো তার গায়ের পোশাকে পড়ে এক অপার্থিব আভা তৈরি করেছে। তার ললাটে ঘামের বিন্দু ।এই প্রাণস্পন্দন ডেইগো শত চেষ্টা করেও তার মাটির মূর্তিতে সঞ্চার করতে পারেনি।

ডেইগো হঠাৎ উন্মাদের মতো হাতের সেই ধাতব যন্ত্রটি দিয়ে অন্যপাশে থাকা আরেকটি মুর্তির কা'ধেঁ আ'ঘা'ত করল। একটা গভীর ক্ষ'ত তৈরি হলো সেই শ্রমে গড়া ভাস্কর্যে। রোজেলিয়া ভয়ে শিউরে উঠলেও নড়ল না।

ডেইগো এগিয়ে এল রোজেলিয়ার দিকে। তার চোখে তখন এক আদিম লোলুপতা আর অধিকারবোধের সংঘাত। সে রোজেলিয়ার গালের ওপর নিজের কর্কশ তালুটা রাখল।

"এই মাটির পুতুলটা আমার দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রম ডল, আমার শ্রেষ্ঠ শিল্প। কিন্তু তুমি..."

ডেইগো তার ঠোঁট রোজেলিয়ার কানের কাছে নিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল,

"তুমি হলে আমার অস্তিত্বের দহন, যাকে আমি নিজের হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।এই মূর্তির কোনো হৃদয় নেই যা আমার হাতের চা'পে চূ'র্ণ হবে, কিন্তু তোমার আছে। এই মাটির দে'হে র'ক্ত নেই যা আমার ভয়ে হি'ম হয়ে যাবে, কিন্তু তোমার ধ'মনী'তে তা আছে। আমার কাছে এই শিল্পের চেয়ে আমার এই জী'বন্ত ডল অনেক বেশি প্রায়োরিটি পায়।

রোজেলিয়া অনুভব করল ডেইগোর আঙুলগুলো তার গলার কাছে চেপে বসছে। ডেইগোর কাছে সে যেন কোনো মানুষ নয় বরং এক শ্রেষ্ঠ মাস্টারপিস যাকে সে তার নিজের অন্ধকারের রঙ দিয়ে রাঙাতে চায়।

ডেইগো মূর্তির দিকে আর একবারও ফিরে তাকাল। তারপর তার সমস্ত মনোযোগ গেল রোজেলিয়ার চোখের গভীরে লুকানো ভয়ের দিকে। সে এক পৈ'শা'চি'ক তৃপ্তি নিয়ে দেখছে, কীভাবে তার ছায়ায় রোজেলিয়া প্রতিদিন একটু একটু করে নিঃ'শেষ হয়ে যাচ্ছে।

ডেইগোর দৃষ্টি তখন রোজেলিয়ার চোখের মণি দুটোকে ব্য'বচ্ছেদ করছিল। কক্ষের গুমোট বাতাসে ক্লেমডেলের স্যাঁতসেঁতে গন্ধ আর ল্যাভেন্ডারের সুবাস মিলেমিশে এক অদ্ভুত গন্ধ তৈরি করেছে। ডেইগো আরও খানিকটা ঝুঁকে এল তাদের দুজনের দূরত্ব এখন নামমাত্র।

"কী নিখুঁত তুমি ডল"

ডেইগোর কণ্ঠস্বরে মখমলের কোমলতা থাকলেও তা যেন ধা'রা'লো কোনো ক্ষু'র। সে রোজেলিয়ার গায়ের ওপর দিয়ে তার তর্জনী বুলিয়ে নিতে নিতে শান্ত স্বরে বলল,

"তুমি কি ভয় পাচ্ছ ডল? তোমার বুকের ওই ধকপকানিটা আমি আমার হাতের তালুতে অনুভব করতে পারছি। এই ভয়টা ধরে রাখো। এটাকে হারাতে দিয়ো না। কারণ ভয়ার্ত চোখের চেয়ে সুন্দর আর কোনো লেন্স আমার জানা নেই"

রোজেলিয়া নিঃশব্দে সব সয়ে যাচ্ছিল। তার প্রতিটি লোমকূপ তখন ডেইগোর উপস্থিতিতে সংকুচিত হয়ে আসছে। ডেইগো হঠাৎ কিছুটা সরে দাঁড়াল, তার শান্ত ভাবটা নিমেষেই উবে গিয়ে এক ধরণের অস্থিরতা ফুটে উঠল চেহারায়।

"তুমি আজ বড় বেশি নিস্তব্ধ ডল। আগে তো কত কথা বলতে। আমাকে প্রশ্ন করতে, আমার শিল্পের প্রশংসা করতে... ইদানীং তুমি বড় অফ হয়ে গেছ। কেন?"

রোজেলিয়া কোনোমতে অস্ফুট স্বরে বলল,

"না ডেইগো... আসলে মাথাটা বড় বেশি ভার হয়ে আছে"

"মিথ্যে বলবে না "

ডেইগোর গর্জন কক্ষের গথিক খিলানগুলোতে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল। পরক্ষণেই সে রোজেলিয়ার চিবুক আর চোয়াল নিজের 'শক্ত মু'ঠোর ভেতর পি'ষে ধরল। আঙুলের চাপে রোজেলিয়ার ফর্সা চামড়ায় র'ক্তি'ম আভা ফুটে উঠল। যন্ত্রণায় রোজেলিয়ার ঠোঁটজোড়া কুঁ'কড়ে গেলেও সে চিৎকার করতে পারল না।

"লুক অ্যাট মি, বেবি!" ডেইগো তার চোয়াল আরও স'জোরে চে'পে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

"আমি জানি তোমার ওই জরাজীর্ণ মগজে ফালতু স্মৃতিগুলো ডানা ঝাপটাচ্ছে। আমি কি যথেষ্ট নই? আমি কি তোমাকে আগলে রাখিনি? তোমার এই অবাধ্যতা কিন্তু আমার শিল্প সত্তার জন্য অপমানজনক"

ডেইগো তাকে ছেড়ে দিয়ে রুমাল দিয়ে হাত মুছতে মুছতে নিজের সেই দা'নবীয় মূ'র্তির দিকে এক আড়চোখে তাকাল। তার কণ্ঠে এখন এক হাড়কাঁপানো আভিজাত্য মেশানো চরম আদেশ।

"ঠিক ত্রিশ মিনিট ডল। ঠিক ত্রিশ মিনিট পর আমি তোমাকে পেছনের বাগানবিলাসের কুঞ্জটিতে দেখতে চাই।তখন তোমার মুখে কোনো ফ্যাকাশে বিষণ্ণতা যেন না দেখি"

ডেইগো একটু এগিয়ে এসে রোজেলিয়ার কপালে নিজের শীতল ঠোঁটজোড়া ছুঁইয়ে দিল।রোজেলিয়া বিরক্তিতে মুখ কুচকালো ।কেন জানি তার ডেইগোর কোনো স্পর্শই ভালো লাগে না ।সে একটু সরে গেল ।

"যদি তোমার ম্লান মুখচ্ছবি আমার বিকেলের কফির স্বাদ নষ্ট করে তবে এর পরিণাম কিন্তু তোমার নার্স নিনার জন্য খুব একটা সুখকর হবে না। সো, বি অ্যা গুড গার্ল... এন্ড স্মাইল।"

কথাটি শেষ করেই ডেইগো তার স্টুডিওর দরজাটি সজোরে টেনে বেরিয়ে গেল।

____________

সন্ধ্যার ম্লান আলোয় বাগানের প্রাচীন স্থাপত্য আর লতাগুল্মগুলো এক রহস্যময় রূপ নিয়েছে। চারদিকের ঝোপঝাড়ের আড়ালে কালো পোশাকে আবৃত গার্ডরা রোবটের মতো দাঁড়িয়ে আছে। মার্বেলের গোল টেবিলটার ওপর রাখা রুপালি টি-সেট থেকে চায়ের ধোঁয়া আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে।

ফ্র্যাঙ্ক মোরালেস তাঁর হাতে থাকা ভারী পানীয়র গ্লাসটি টেবিলে রাখলেন। বরফের টুকরোগুলোর ঠুংঠাম শব্দ নিস্তব্ধ বাগানটিতে অদ্ভুত শোনাল।

তিনি সোজা হয়ে বসে রোজেলিয়ার দিকে তাকালেন। তাঁর সেই ঠাণ্ডা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রোজেলিয়ার অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিল।

"তোমাকে ডেইগো কিছু জানিয়েছে?"

ফ্র্যাঙ্কের কণ্ঠস্বর গম্ভীর।

রোজেলিয়া মাথা নিচু করে ছোট করে উত্তর দিল,

"না আঙ্কেল, বিশেষ কিছু না।"

ফ্র্যাঙ্ক এক মুহূর্ত থামলেন, তারপর সরাসরি মূল কথায় এলেন।

"আমি চাই আগামী সপ্তাহেই তোমাদের বিয়েটা হয়ে যাক। প্রস্তুতির জন্য খুব বেশি সময় নেই।"

রোজেলিয়ার বুকটা ধক করে উঠল। সে জানত এমন কিছু হতে যাচ্ছে, কিন্তু সরাসরি শুনতে পাওয়ার ধাক্কাটা সে সামলাতে পারল না। "আগামী সপ্তাহে? কিন্তু আঙ্কেল, এত তাড়াতাড়ি"

"তাড়াতাড়িই ভালো,"

ফ্র্যাঙ্ক তাকে কথা শেষ করতে দিলেন না। "বাইরের পরিস্থিতি ভালো নয়। রিভেন এখনো শান্ত হয়নি। তোমাকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য আমাদের পরিবারের স্থায়ী সদস্য হওয়াটা জরুরি।"

ডেইগো একটু দূরে দাঁড়িয়ে একটা গোলাপের পাপড়ি ছিঁড়ছিল। সে এগিয়ে এসে রোজেলিয়ার ঠিক পেছনে দাঁড়াল। তার এক হাত রোজেলিয়ার কাঁধে রাখল। সেই স্পর্শে রোজেলিয়া শিউরে উঠলেও নড়ল না।

ডেইগো নিচু স্বরে বলল,

"ড্যাড ঠিকই বলেছেন ডল। আমি চাই না তোমার ওপর আর কোনো আঁচ আসুক। বিয়ের পর আমরা এখান থেকে অনেক দূরে চলে যাব, যেখানে কেউ আমাদের বিরক্ত করবে না।"

রোজেলিয়া অসহায় চোখে ফ্র্যাঙ্কের দিকে তাকাল।

"কিন্তু আমার তো স্মৃতি ফিরছে না আঙ্কেল। আমি কিছুই মনে করতে পারছি না। এমন অবস্থায়"

"স্মৃতি দিয়ে কী হবে?" ফ্র্যাঙ্ক রুক্ষ স্বরে বললেন।

"অতীত সবসময় যন্ত্রণাদায়ক হয়। তুমি শুধু মনে রেখো আমরা তোমাকে জীবন দিয়েছি। আর ডেইগো তোমাকে ভালোবাসে। ব্যাস, এটুকুই যথেষ্ট।"

ফ্র্যাঙ্ক উঠে দাঁড়ালেন। যাওয়ার আগে শেষবারের মতো বলে গেলেন,

"কাল থেকে বিয়ের কেনাকাটা শুরু হবে। নিনা তোমাকে সব বুঝিয়ে দেবে। ডেইগো, ওকে বেশিক্ষণ বাইরে রেখো না, কুয়াশা বাড়ছে।"

ফ্র্যাঙ্ক মোরালেস গাম্ভীর্যের সাথে ভেতরে চলে গেলেন। বাগানের সেই ঝাউগাছের ফাঁক দিয়ে আসা বাতাসটা এখন আরও ঠান্ডা লাগছে। রোজেলিয়া অনুভব করল, তার কাঁধের ওপর ডেইগোর হাতের চাপটা আরও বেড়ে গেছে।

ডেইগো তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,

"শুনলে তো ডল? আগামী সপ্তাহে তুমি পুরোপুরিভাবে আমার হয়ে যাচ্ছো"

____________

রোজেলিয়া বিছানায় লুটিয়ে পড়ল। তার কান্নার শব্দগুলো সেই সিল্কের বালিশে চাপা পড়ে এক গোঙানিতে পরিণত হয়েছে। জানালার বাইরে স্পেনের আকাশটা আজ অমাবস্যার অন্ধকারের মতো কালো আর ভেতরে রোজেলিয়ার বুকের ভেতর বইছে এক প্র'লয়ং'করী ঘূ'র্ণিঝড়।

প্রতিটি কান্নার হেঁচকির সাথে সাথে তার ললাটের দুই পাশে যেন সহস্র তপ্ত সুঁই বিঁধছে। ও'ষুধের তী'ব্র প্র'ভাব আর এই মা'নসিক দ'হন মিলে তার ম'স্তিষ্ককে এক র'ণক্ষেত্রে পরিণত করেছে।

নার্স নিনা বিছানার এক পাশে বসে অত্যন্ত সন্তর্পণে রোজেলিয়ার পিঠে হাত রাখল। নিনার চোখেও আজ এক চাপা আতঙ্ক,

"রোজ... শান্ত হও। এভাবে কাঁদলে তোমার র'ক্তচা'প বেড়ে যাবে,"

নিনা ফিসফিস করে বলল।

রোজেলিয়া হঠাৎ উঠে বসল। তার দু-চোখ আজ র'ক্তব'র্ণ চুলগুলো উশকোখুশকো। সে নিনার হাত দুটো জাপটে ধরে আ'র্তনা'দ করে উঠল,

" আমার এমন কেন লাগছে নিনা ? কেন আমার হৃ'দপি'ণ্ডটা ছিঁ'ড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে? ডেইগো বলেছে ওই লোকটা আমার মা-বাবাকে মে'রেছে, আমাকে পৈ'শা'চিক নি'র্যা'তন করেছে। ডেইগো আমাকে ওই ন'র'ক থেকে বাঁচিয়ে এনেছে... তবে কেন আজ ডেইগোর সাথে আমার বিয়ের কথা শুনে আমি খুশি হতে পারছি না?"

রোজেলিয়া দম নেওয়ার জন্য থামল। তার গ'লার শি'রাগুলো ফুলে উঠেছে। সে উন্মাদের মতো বলতে লাগল,

"আমার তো উচিত ছিল উৎসবে মেতে ওঠা যে লোকটা আমার জীবন বাঁচাল, তাকে স্বামী হিসেবে পাওয়া তো ভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু নিনা... যখনই আমি চোখ বন্ধ করি, সেই ওই মানুষটার মুখ কেন ভেসে ওঠে? কেন তার সেই আর্তনাদ আমার কানে বি'ষ ঢা'লে? সব কিছু কেন এত এলোমেলো? কী হচ্ছে এসব আমার সাথে?"

রোজেলিয়ার গলার স্বর এবার ভেঙে এল। সে তার নিজের মাথায় সজোরে আঘাত করতে চাইল। নিনা দ্রুত তাকে জড়িয়ে ধরে আটকাল।

"থামো রোজ! প্লিজ মাথা ঠান্ডা করো। এগুলো তোমার অসুস্থতার লক্ষণ,"

নিনা তাকে শান্ত করার চেষ্টা করল, কিন্তু নিনার নিজের কণ্ঠস্বর কাঁপছে। সে জানে এই বিস্মৃতি কোনো অসুখ নয়।

রোজেলিয়া নিনার কাঁধে মুখ গুঁজে অঝোরে কাঁদতে লাগল। কক্ষের সেই গথিক আভিজাত্য আজ তাকে ব্যঙ্গ করছে। দেওয়ালের প্রতিটি কারুকাজ যেন ডেইগোর শ'কুনি দৃষ্টি হয়ে তাকে বিঁধছে।

নিনা রোজেলিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বিড়বিড় করল,

"নিশ্বাস নাও রোজেলিয়া। স্যার যদি তোমার এই অবস্থা দেখেন, তবে কারো রক্ষা নেই। তুমি শুধু এটুকুই মনে রাখো যে তুমি এখন নিরাপদ"

হঠাৎ করিডোরে ভারী পায়ের শব্দ শুনে নিনা আর রোজেলিয়া থমকে গেল।ঘরের দরজাটা এক ঘ্যাড়ঘ্যাড়ে শব্দে খুলে গিয়ে ডেইগো ভিতরে প্রবেশ করতেই নিনা দ্রুত উঠে দাঁড়াল, তার বুকের ভেতরটা যেন কাঁ'পছে।ডেইগো কিছুক্ষণ

চুপ করে রোজেলিয়াকে পর্যবেক্ষণ করলো,

"যাও নিনা। আমার ডল আজ বড্ড অস্থির। আজ তাকে আমি নিজেই ঘুম পাড়িয়ে দেব।"

ডেইগোর কণ্ঠস্বরে এমন এক আধিপত্য ছিল যে নিনা আর এক মুহূর্তও দাঁড়ানোর সাহস পেল না। সে দ্রুত মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা রোজেলিয়ার কানে কোনো বাজতে লাগলো।

ডেইগো বিছানার কাছে এগিয়ে এল। রোজেলিয়া মুখ নিচু করে বসে আছে, তার চুলগুলো অবিন্যস্তভাবে মুখের ওপর পড়ে আছে। ডেইগো খাটের কিনারে বসে তার বরফশীতল আঙুল দিয়ে রোজেলিয়ার চোখের জল মুছে দিল।

"কাঁদছ কেন বেবি ডল? ওই স্বচ্ছ চোখে এক ফোঁটা জলও আমার বুকে অ্যা'সি'ডের মতো লাগে। আমি কি তোমাকে কষ্ট পেতে দিতে পারি?"

রোজেলিয়া কাঁপতে কাঁপতে অস্ফুট স্বরে বলল, "আসলে..মা..মাথাটা বড্ড যন্ত্রণা করছে ডেইগো... মনে হচ্ছে ফে'টে যাবে।"

ডেইগো শান্তভাবে রোজেলিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। তার আঙুলগুলো যখন রোজেলিয়ার চুলের ভেতর দিয়ে বিলি কাটছিল, রোজেলিয়া অনুভব করল তার স্না'য়ুগু'লো যেন জ'মে যাচ্ছে।

আস্তে আস্তে ডেইগো আরও কাছে ঘেঁষে এল। তার উষ্ণ নিশ্বাস এখন রোজেলিয়ার ঘাড়ের কাছে অনুভূত হচ্ছে। ডেইগোর চোখ দুটোয় এক নি'ষি'দ্ধ তৃ'ষ্ণা জেগে উঠল। সে যখন রোজেলিয়াকে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করার জন্য আরও একটু ঝুঁকে এল, রোজেলিয়া হঠাৎ ছিটকে সরে গেল।

"না ডেইগো! প্লিজ..."

রোজেলিয়ার কণ্ঠে ভয়ের সাথে মিশে আছে এক তী'ব্র ঘৃ'ণা, যা সে নিজেও বুঝতে পারছে না।

ডেইগো থমকে গেল। তার হাত দুটো শূন্যে ঝুলে রইল। সে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। রোজেলিয়া কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

"প্লিজ আমাকে ছোঁবে না "

মুহূর্তের মধ্যে ডেইগোর চেহারার সেই মখমলে আবরণ ছিঁ'ড়ে গেল। তার চোয়াল পাথরের মতো শক্ত হয়ে উঠল, ক'পালে একটা নী'ল শি'রা ধকধক করে কাঁপছে। সে এক ঝটকায় রোজেলিয়ার দুই কাঁধ খা'ম'চে ধ'রল। তার ন'খগুলো রোজেলিয়ার চা'মড়া'য় ব'সে যাচ্ছে।

"বিয়ে হয়নি বলে আমি তোমাকে ছুঁতে পারব না?" ডেইগো দাঁতে দাঁত চেপে গ'র্জে উঠল। তার কণ্ঠস্বরে এখন এক জা'ন্তব রা'গ।

"আমি তোমাকে ন'রক থেকে উদ্ধার করেছি, তোমার প্রতিটি নিশ্বাস আমার দয়ায় চলে আর তুমি আমাকে নিয়মের কথা শোনাচ্ছ?"

রোজেলিয়া য'ন্ত্র'ণায় কোঁ'কানি দিলেও ডেইগো তাকে ছাড়ল না। তার চোখের হ্যাজেল রঙ এখন এক আ'গ্নেয়'গি'রির মতো রা'গে টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। সে রোজেলিয়ার মুখের খুব কাছে মুখ নিয়ে এসে হিসহিসিয়ে বলল,

" তুমি আমার তৈরি এক মাস্টারপিস ডল। আর একজন শিল্পী তার শিল্পের সাথে যা খুশি করার অধিকার রাখে। আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়ো না, কারণ আমার রাগের পরিণাম কিন্তু তোমার ওই ছোট্ট মাথায় সইবার মতো শক্তি নেই।"

ডেইগো এক ধা'ক্কায় রোজেলিয়াকে বিছানায় ফেলে দিল। রোজেলিয়া নি'থর হয়ে পড়ে রইল, তার হৃদপিণ্ড তখন পাঁ'জ'রের দেয়ালে আ'ছড়ে পড়ছে। ডেইগো এক পৈ'শা'চিক শান্তিতে তার অবাধ্য চুলগুলো ঠিক করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

ঘরের গুমোট ভাবটা কাটার আগেই আবার সেই দরজাটা এক বিকট শব্দে আ'ছ'ড়ে পড়ল দেয়ালে। রোজেলিয়া বিছানায় কুঁকড়ে বসে ছিল, তার হৃ'দপিণ্ড তখনো স্বা'ভাবিক হয়নি। ডেইগো আবার ফিরে এসেছে। তার এক হাতে একটি দামী রে'ড ওয়া'ইনের বোতল অন্য হাতে একটি রুপালি ক'র্কস্ক্রু। তার চোখের মণি দুটো এখন এক পৈ'শা'চিক উ'ন্মা'দনায় টলমল করছে।

সে কোনো কথা বলল না। ধীর পায়ে এগিয়ে এল রোজেলিয়ার দিকে। রোজেলিয়া ভয়ে বিছানার কোণে সরে যেতে চাইল, কিন্তু ডেইগো এক ঝ'টকায় তার পা ধরে নিজের দিকে টেনে আনল।

"তুমি আমার শিল্পের অমর্যাদা করেছ ডল। আমার স্পর্শকে তুমি অপবিত্র মনে করেছ?"

ডেইগোর কণ্ঠস্বর এখন নিচু কিন্তু তাতে এক ধরণের বি'ষা'ক্ত ধা'র আছে।সে দাঁত দিয়ে বোতলের কর্কটা খুলে ফেলল। তারপর এক পৈ'শা'চিক শান্তিতে বোতলটা উ'পুড় করে ধরল রোজেলিয়ার মাথার ঠিক ওপরে।

গাঢ় লাল রঙের সেই তীব্র গন্ধযুক্ত ও'য়া'ইনগুলো ঝরনার মতো ঝরতে শুরু করল রোজেলিয়ার চুলের ওপর দিয়ে। তরলটুকু তার কপাল বেয়ে চোখের কোণে, গালে এবং ঘাড়ের ওপর দিয়ে গড়িয়ে তার ধবধবে সাদা ক্রিম রঙের ড্রেসটাকে ভিজিয়ে দিচ্ছিল। রোজেলিয়া শিউরে উঠে চোখ বন্ধ করে ফেলল। সেই ঠান্ডা তরল তার পিঠ বেয়ে যখন নামছিল, তার মনে হচ্ছিল এক পৈ'শা'চিক দ'হ'ন তাকে গ্রাস করছে।

রোজেলিয়া চিৎকার করল না কাঁদলোও না। সে কেবল পাথরের মতো নি'থ'র হয়ে রইল। তার ফর্সা চামড়ায় লাল ওয়াইনগুলো দেখতে অবিকল টাটকা র'ক্তে'র মতো লাগছে। তার সাদা ড্রেসটা এখন এক বীভৎস ক্যানভাসে পরিণত হয়েছে ।যেন ডেইগো তার প্রিয় পুতুলকে আজ নিজের হাতে র'ক্তে রাঙিয়েছে।

"দেখো তোমাকে কত সুন্দর লাগছে,মাই বিউটিফুল ডল"

ডেইগো ফিসফিস করে বলল। সে খালি বোতলটা কার্পেটে ছু'ড়ে মা'রল। বোতলটা ভাঙল না কিন্তু এক গুরুগম্ভীর শব্দে গড়িয়ে গেল ঘরের কোণে। ডেইগো তার ভেজা আঙুল দিয়ে রোজেলিয়ার গাল থেকে এক ফোঁটা ওয়াইন তুলে নিল।

"রেড ইজ ইওর কালার, ডল। এই র'ক্তিম আভা তোমাকে এক অ'পা'র্থিব শ্রী দিচ্ছে।"

রোজেলিয়ার সারা শরীর কাঁ'প'ছে। ল্যাভেন্ডারের স্নিগ্ধ ঘ্রাণ এখন ঢাকা পড়ে গেছে ও'য়া'ইনের ক'টু আর ঝাঁ'ঝালো গন্ধে। ডেইগোর এই পৈ'শা'চিক বি'কৃ'তি রোজেলিয়ার কাছে নতুন কিছু নয়। প্রায়ই এমন ঘটে কখনও ওয়াইন, কখনও বা গোলাপের পাপড়ি ছিঁড়ে তার সারা গায়ে ছড়িয়ে দেওয়া। ডেইগো তাকে মা'নুষ মনে করে না সে মনে করে রোজেলিয়া তার ব্যক্তিগত এক পরাধীন ভাস্কর্য, যাকে সে নিজের ইচ্ছেমতো সাজাতে বা নোংরা করতে পারে।

ডেইগো এবার হরহর করে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল।ডেইগোর সেই উন্মত্ত প্রস্থান কক্ষের ভারী বাতাসে এক অ'সহ্য স্ত'ব্ধতা রেখে গেল। তার যাওয়ার পথে কার্পেটের ওপর রে'ড ওয়া'ইনের ছো'পগুলো যেন একেকটি টাটকা ক্ষ'ত।

রোজেলিয়া বিছানায় স্তব্ধ হয়ে বসে রইল, তার সারা শরীর থেকে তখনো চুঁইয়ে পড়ছে সেই র'ক্তব'র্ণ তরল। তার ক্রিম রঙের ড্রেসটা এখন ভিজে গায়ের সাথে সেঁটে আছে আর তার কপাল বেয়ে নেমে আসা ওয়াইনগুলো ঠোঁটের কোণে নোনতা এবং তেতো এক স্বাদ দিয়ে যাচ্ছে।

রোজেলিয়া মুখ কুচকালো ।

মিনিট খানেক পর, যখন সিঁড়ি দিয়ে ডেইগোর বুটের আওয়াজ মিলিয়ে গেল রোজেলিয়া বিছানা থেকে নামল। তার শরীর কাঁপছে প্রতিটি রো'মকূপ তখন ডেইগোর সেই পৈ'শা'চিক লা'লসা'র ছোঁ'য়া'য় কুঁ'ক'ড়ে আছে। মেঝের ওপর গড়িয়ে যাওয়া খালি বোতলটার ওপর দিয়ে হেঁটে সে ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

সে দরজার কাছে পৌঁছে তার কম্পিত হাত বাড়িয়ে দরজাটা বন্ধ করে সে ভেতর থেকে লক করে দিল। এই একটি শব্দে যেন সে এক মুহূর্তের জন্য বাইরের সেই দা'নবী'য় পৃথিবী থেকে নিজেকে বি'চ্ছি'ন্ন করে ফেলল। দরজার সাথে পিঠ ঠেকিয়ে সে ধীরে ধীরে মেঝের ওপর ধসে পড়ল।

রোজেলিয়া তার দুই হাত দিয়ে নিজের ভিজে যাওয়া চুলগুলো খামচে ধরল। তার নাক দিয়ে এখন কেবল ওয়াইনের সেই ঝাঁ'ঝা'লো গ'ন্ধ ঢুকছে যা তার পাকস্থলীতে এক ধরণের বি'তৃ'ষ্ণা জাগিয়ে তুলছে। সে আয়নার দিকে তাকাল না কারণ সে জানে আয়নার ওপাশে এখন আর কোনো স'জী'ব প্রাণ নেই সেখানে কেবল ডেইগোর হাতে লা'ঞ্ছি'ত এক মৃ'তপ্রা'য় পুতুল বসে আছে।

আচমকা তার ম'স্তি'ষ্কের গভীরে এক তী'ব্র দ'হ'ন অনুভূত হলো। সেই হ্যাজেল চোখের আবছা অবয়বটা আবার ফিরে আসছে। কিন্তু এবার সেই স্মৃতিতে কোনো ভয় নেই, আছে এক অমোঘ আশ্রয়।কী আছে এতে ? কেন সে ওই সুন্দর চোখজোড়া ভুলতে পারছে না ।এগুলো কী ডেইগোর চোখ ? কী হচ্ছে তার সাথে এসব ? সে কিছুই মেলাতে পারছে না কিছুই বুঝতে পারছে না সে ।ডেইগোর হঠাৎ হঠাৎ এমন পৈ'শা'চিক রুপ দেখা যায় আবার সকালে সব ঠিক ।

রোজেলিয়া তার দুই হাঁটু বুকের কাছে টেনে নিয়ে নিজের মুখ লুকাল। অন্ধকারে ঘেরা এই বিশাল বাড়িটা আজ তার কাছে এক ক'সা'ইখানা মনে হচ্ছে যেখানে প্রতিদিন তাকে একটু একটু করে ব্য'বচ্ছে'দ করা হয়।

সে অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করল, "রিভেন..."

নামটা উচ্চারিত হতেই এক অদ্ভুত শিহরণ তার মেরুদণ্ড দিয়ে বয়ে গেল।

To be continue,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন