ফন্ট সাইজ:
থিম:
Paradise of sins

৪৩তম পর্ব

লেখক: Fariha

#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins) #লেখনিতে_ফারিহা

পর্ব ৪৩

(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)

"তুমি বলেছিলে, ডাস্ট কভারের রঙটা হবে 'বার্নট আম্বার', কিন্তু এটা তো দেখছি স্রেফ 'রাস্ট' "

ডেইগোর কণ্ঠস্বর ভোরের কুয়াশার মতো শীতল এবং তীক্ষ্ণ। সে তার সিল্কের শার্টের হাতা নিখুঁতভাবে গুটিয়ে পুলের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। তার পায়ের কাছে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে আছে এক মধ্যবয়সী শিল্পী যার প্রতিটি লোমকূপ দিয়ে ভ'য়ের স্রোত বইছে। লোকটির নাক থেকে গড়িয়ে পড়া তা'জা র'ক্ত পুলের মার্বেল মেঝেতে এক বীভৎস আলপনা এঁকেছে।

"স্যার... আমি দুঃখিত... রঙের সামান্য পার্থক্যে—"

লোকটির কথা শেষ হওয়ার অবকাশ পেল না। ডেইগোর পালিশ করা বুট জোড়া এক প্রচণ্ড গ'তিতে লোকটির চো'য়ালে আ'ছড়ে পড়ল। এক বী'ভৎস শব্দে লোকটির চোয়ালের হা'ড় যেম ভে'ঙে গেল। সে ছি'ট'কে গিয়ে পুলের উঁচু দেয়ালের সাথে ধাক্কা খেয়ে কুঁ'ক'ড়ে পড়ে রইল। ডেইগোর চোখে কোনো ক্রোধ নেই, আছে এক বিজাতীয় ঘৃণা।

"সামান্য পার্থক্য? শিল্পের ব্যাকরণে সামান্য বলে কোনো শব্দ নেই। নিখুঁত হওয়ার সামর্থ্য না থাকলে এই পৃথিবীতে নিশ্বাস নেওয়ার অধিকার তোমার নেই।"

ডেইগো তার দিকে এগিয়ে গেল। লোকটির অবি'ন্যস্ত চুলগুলো মু'ঠো করে ধরে সে তাকে হিড়হিড় করে টেনে আনল পুলের কিনারায়। লোকটির গলায় তখন এক অবরুদ্ধ আ'র্তনা'দ। ডেইগো এক পৈ'শা'চি'ক শক্তিতে লোকটিকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল সেই গভীর নীল জলরাশির অতল গহ্বরে।

পানির নিচে লোকটির হাত-পা ছোঁ'ড়ার শব্দ নিস্তব্ধ ভোরের স্তব্ধতা ভেঙে দিল। পুলের কিনারার মার্বেলগুলো ডেইগো আগেই পিচ্ছিল করে রেখেছিল।লোকটি বারবার কিনারায় হাত রাখার চেষ্টা করেও পিছলে অতলে তলিয়ে যাচ্ছিল। তার বাঁচার শেষ আকুতি ডেইগোর কানে কোনো মধুর সঙ্গীতের মতো বাজছিল।

ডেইগো পকেট থেকে একটা সাদা রুমাল বের করে হাত মুছতে মুছতে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লুইসের দিকে তাকাল।

"লুইস... নিচের খাঁচাটা খুলে দে। আমার বেবীবয় অনেকদিন হলো কোনো তা'জা প্রোটিন পায়নি। আজ তাকে ভালো এক ব্রেকফাস্ট করার সুযোগ দে। মুক্ত করে দে তাকে।"

লুইস নিঃশব্দে নির্দেশ পালন করল। পুলের তলদেশে সেই বিশাল লোহার খাঁচার দরজাটা এক যান্ত্রিক শব্দে খুলে গেল। পানির নিচে এক প্রলয়ংকরী আলোড়ন শুরু হলো। সেই বিশালকার কুমিরটি তার জলজ আস্তানা থেকে বেরিয়ে এল। লোকটির চোখ তখন আ'তঙ্কে ঠি'ক'রে বে'রিয়ে আসতে চাইছে। সে দেখল, পানির নিচ দিয়ে এক কালান্তক যমদূত তার দিকে এগিয়ে আসছে।

ডেইগো পুলের কিনারায় দাঁড়িয়ে পকেটে হাত দিয়ে এই দৃশ্যটি উপভোগ করতে লাগল।পুলের নীল জলরাশি তখন যেন এক ন'র'ককু'ণ্ডে পরিণত হয়েছে। লোকটি দুই হাত বাড়িয়ে উ'ন্মত্তের মতো পানির ওপর আছড়াচ্ছে। তার প্রতিটি আঙুল পুলের সেই পিচ্ছিল মার্বেল কামড়ে ধরার চেষ্টা করছে, কিন্তু ডেইগোর নির্দেশে আগে থেকেই ঢেলে রাখা লু'ব্রি'কে'ন্টের কারণে সে বারবার গর্তে পড়ে যাওয়া পশুর মতো অতলে তলিয়ে যাচ্ছে।

"প্লিজ স্যার! দয়া করুন! আমার পরিবার আছে... আমি আর কখনো ভুল করব না!"

লোকটির আ'র্ত'নাদ ডেইগোর কানের পাশ দিয়ে শীতল বাতাসের মতো বয়ে গেল। ডেইগো কোনো উত্তর দিল না, শুধু পকেটে হাত দিয়ে এক পৈ'শা'চিক তৃপ্তি নিয়ে দৃশ্যটি দেখতে লাগল।

ঠিক তখনই পানির নিচে সেই বিশাল বিভীষিকা তার গতি বাড়াল। কুমিরটি যখন লোকটির একেবারে কাছে পৌঁছাল তখন পানির ওপর এক প্রলয়ংকরী আলোড়ন সৃষ্টি হলো। হঠাৎ একটি হা'ড়কাঁ'পানো ম'টম'ট শব্দ নিস্তব্ধ ভোরের বুক চি'রে দিল। কুমিরটি তার বিশাল চোয়াল দিয়ে লোকটির একটি পা কবজি থেকে কা'ম'ড়ে ধরল। লোকটির গ'গনবিদারী চিৎ'কা'রে পাশের ঝাউগাছ থেকে পাখিরা ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে পালাল।

কুমিরটি লোকটিকে নিয়ে পানির নিচে ঘুরপাক খেতে শুরু করল। পানির রঙ নীল থেকে গাঢ় লা'ল হয়ে উঠল। লোকটির শরীরটা যেন কোনো ছেঁ'ড়া ন্যা'ক'ড়ার মতো এদিক-সেদিক আ'ছড়ে পড়ছে। কুমিরের ধা'রা'লো দাঁতগুলো লোকটির পাঁ'জ'রের হা'ড় গুঁ'ড়ি'য়ে মাং'সে'র ভে'তরে ঢু'কে গেল। পানির ওপর কেবল উঠে আসছে র'ক্তে'র বু'দবুদ আর মাঝে মাঝে লোকটির বাঁ'চার শেষ আকুতিভরা গোঙানি। কুমিরটি এক এক করে লোকটির শরীরের অং'শ'গুলো বি'চ্ছি'ন্ন করে ফে'লছিল, আর পুরো পুলটি তখন এক বিভীষিকাময় ক'সাইখা'নায় পরিণত হয়েছে।

ডেইগো হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে ভ্রু কুঁচকে ফিসফিস করে বলে উঠল, "ওহ! ওপস্!"

লুইস পাশে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল। ডেইগোর এই আকস্মিক অভিব্যক্তিতে সে আরও তটস্থ হয়ে বিনম্র স্বরে জিজ্ঞেস করল,

"বস... কিছু হয়েছে? কোনো সমস্যা?"

ডেইগো তার সেই শীতল চোখে পুলের র'ক্ত'মাখা জলের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসল।

"হুম, সমস্যা তো বটেই। আমি ওর হা'র্ট টাই রাখতে ভুলে গিয়েছিলাম। আমার ওটা লাগত লুইস। সেদিন রাগের মাথায় স্টুডিওর ফরমালিন বক্সটা ভেঙে ফেলেছি, পুরনোটা ন'ষ্ট হয়ে গেছে।"

লুইস ঢোক গিলে অত্যন্ত ভয়ে ভয়ে প্রস্তাব দিল,

"বস... ওই যে... আমাদের শহরের 'মর্গ' থেকে কি একটা ব্যবস্থা করে আনব? ওখানে তো অনেক তা'জা ব'ডি থাকে—"

ডেইগোর চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই বদলে গেল। সে লুইসের দিকে এমনভাবে তাকাল যেন লুইস এখন সেই পুলের লোকটার চেয়েও বড় কোনো ভুল করে ফেলেছে। ডেইগো তার শার্টের হাতা ঠিক করতে করতে অত্যন্ত ধীর অথচ ভারী স্বরে বলল,

"না। আমার প্রয়োজনীয় জিনিস আমি নিজের হাত দিয়েই বের করে নিতে পছন্দ করি। অন্য কারো ছোঁয়া আমার শিল্পকে অপবিত্র করে দেয়।"

ডেইগো এবার পুলের কিনারায় জমে থাকা র'ক্তে'র দিকে এক অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকাল। কুমিরটি তখন লোকটির বাকি অং'শটু'কু গি'লে ফেলছে। ডেইগো লুইসের দিকে ফিরে অত্যন্ত পেশাদার ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল,

" আমার লিস্টে কি আর কোনো ঘা'ত'ক বাকি আছে? "

লুইস ফাইলটা খুলে কাঁপাকাঁপা আঙুলে পাতা উল্টাতে লাগল। ডেইগোর এই শৈল্পিক খু'নের নে'শা আর শিল্পের জন্য মা'নবদেহের অ'ঙ্গ সং'গ্র'হের এই উ'ন্মা'দনা পুরো ঘরটিকে এক অসহ্য গুমোট আতঙ্কে ভরিয়ে দিল।লুইস কাপাঁ কাপাঁ কন্ঠে বললো,

"বস ।আ..আর কেউ নেই"

ডেইগো এবার তার কবজিতে থাকা প্ল্যাটিনাম ঘড়িটার দিকে তাকাল। সময়ের নিখুঁত হিসাব তার সহজাত প্রবৃত্তির অংশ। কুমিরটি তখনো জলের নিচে তার শেষ শি'কা'রের অ'বশি'ষ্টাং'শ নিয়ে খেলায় মত্ত।

ডেইগো অত্যন্ত নিস্পৃহভাবে লুইসের দিকে তাকিয়ে আদেশ দিল,

"এই পুরো মেস যেন আগামী আধা ঘণ্টার ভেতর পরিষ্কার করা হয়। আমি চাই না পুলের এক ফোঁটা পানিও গোলাপী দেখাক।"

ডেইগো একটু থামল। তার দৃষ্টি চলে গেল বাড়ির দোতলার বন্ধ জানালার দিকে, যেখানে তার প্রিয় ডল এখন ঘুমিয়ে আছে। সে তার ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে ফিসফিস করে বলল,

"আমার ডল যেকোনো সময় জেগে উঠতে পারে। তার দিনটা আমি র'ক্তে'র গ'ন্ধ দিয়ে শুরু করতে চাই না। ও ল্যাভেন্ডার পছন্দ করে সো ক্লিন ইট।"

লুইস দ্রুত মাথা নোয়াল।

"জ্বি বস, আমি এখনই লোক পাঠাচ্ছি। সব আগের মতো ঝকঝকে হয়ে যাবে।"

ডেইগো তার সিল্কের শার্টের হাতা নামাতে নামাতে ধীরপায়ে ভেতরে যাওয়ার জন্য ঘুরল। পুলের কিনারে পড়ে থাকা সেই র'ক্তা'ক্ত জুতোটার দিকে সে একবার ঘৃ'ণা'ভরে তাকাল, তারপর পাশ কাটিয়ে চলে গেল।ডেইগো করিডোরের অন্ধকার বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গেল। লুইস তখন কাঁপতে কাঁপতে তার সাঙ্গোপাঙ্গদের ডাকতে শুরু করল।

__________

সকালের সোনালী রৌদ্রচ্ছটা ডাইনিং হলের বিশাল জানালার কাঁচ চিরে ভেতরে প্রবেশ করেছে। হলের ভেতর ধূপের সুবাস আর কফির কটু ঘ্রাণ মিলেমিশে এক ভারী আভিজাত্য তৈরি করেছে। টেবিলের ওপর রুপালি পাত্রগুলো দর্পণের মতো চকচক করছে।

রোজেলিয়া আজ সময়ের কাঁটায় কাঁটা মিলিয়ে ডাইনিং টেবিলে এসে বসেছে। তার পরনে তুষারশুভ্র একটি সিল্কের গাউন চুলে সেই চিরচেনা নিখুঁত বিন্যাস। তার ফ্যাকাশে মুখে ভোরের আলো আছড়ে পড়লেও চোখের কোণে এক অজানা ক্লান্তির ছায়া।

"গুড মর্নিং, বেবি ডল।"

ডেইগোর কণ্ঠস্বর ভায়োলিনের শেষ সুরের মতো মোহনীয়। রোজেলিয়া তার চোখের গভীরে কোনো এক কালান্তক শূন্যতা দেখতে পেল, কিন্তু সে অভ্যস্ত ভঙ্গিতে উত্তর দিল,

"গুড মর্নিং, ডেইগো।"

মেইডরা নিঃশব্দে প্লেটে খাবার সাজিয়ে দিল। ডেইগো খুব আয়েশ করে তার অমলেট আর টোস্ট কাটতে শুরু করল। খাবার খেতে খেতে সে খুব সাধারণ বিষয়ে কথা বলতে লাগল বাগানের নতুন ফুটে ওঠা অর্কিড, স্পেনের আগামী সপ্তাহের আবহাওয়া আর শিল্পের নতুন কোনো প্রদর্শনী। দেখে মনেই হবে না, এই হাতের আঙুলগুলো আধঘণ্টা আগে কারোর পৈ'শা'চিক মৃ'ত্যুর প'রো'য়ানা লিখেছে।

কথার ফাঁকেই রোজেলিয়া তার প্রিয় স্মোকড স্যামন আর ক্রিমি সস মুখে তুলল। কিন্তু প্রথম গ্রাসটি গলায় নামতেই তার পাকস্থলী এক বিজাতীয় বি'তৃষ্ণায় সংকুচিত হয়ে এল। খাবারের স্বাদ যেন আজ ছাইয়ের মতো বি'স্বাদ। সে দ্বিতীয়বার আর চামচ তুলতে পারল না। অবচেতনভাবেই সে প্লেটটি তার থেকে কয়েক ইঞ্চি দূরে সরিয়ে রাখল।

ডেইগোর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মুহূর্তেই স্থির হলো সেই সরিয়ে রাখা প্লেটের ওপর। তার হাতের ছু'রি কাঁ'টা থেমে গেল। হলের নীরবতা হঠাৎ হাড়কাঁপানো শীতলতায় পর্যবসিত হলো।

"এটা তো তোমার ফেভারিট ছিল, ডল। আজ প্লেটটা সরিয়ে দিলে যে? এমন তো হওয়ার কথা ছিল না।"

ডেইগোর স্বর এখন নিচু, কিন্তু তাতে এক ধরণের অশুভ টানটান উ'ত্তে'জনা। রোজেলিয়া কিছুটা থতমত খেয়ে বলল,

"না ডেইগো, আসলে আজ ঠিক ইচ্ছা করছে না... স্বাদটা কেমন যেন"

ডেইগো তার তর্জনী ঠোঁটে চেপে তাকে থামিয়ে দিল। "স্বাদ খারাপ? আমার ডাইনাস্টিতে কোনো কিছু খারাপ হওয়ার কথা না।"

ডেইগো এক পৈ'শা'চিক শান্তিতে হাত তালি দিল। মুহূর্তের মধ্যে হেড শেফ, যার সারা কপালে ভয়ের ঘাম জমেছে, কম্পিত পায়ে এসে দাঁড়াল। ডেইগো কোনো কথা না বলে উঠে দাঁড়াল। সে অত্যন্ত ধীর পায়ে শেফের সামনে গিয়ে দাঁড়াল এবং নিজের হাতে সেই মাছের টুকরো ভরা প্লেটটি তুলে শেফের মুখের সামনে ধরল।

"টেস্ট ইট," ডেইগো হিসহিসিয়ে বলল।

"আমার ডল বলছে আজ স্বাদ অন্যরকম। খুঁজে বের করো অন্যদিনের চেয়ে আজ কোথায় বিচ্যুতি ঘটেছে"

শেফ থ'রথ'র করে কাঁ'পতে কাঁ'পতে এক চামচ খাবার মুখে তুলল। ডেইগো তার চোখের মণির দিকে তাকিয়ে রইল, যেন সে শেফের ম'স্তি'ষ্কের প্রতিটি নি'উরন থেকে ভ'য়ের র'সদ সংগ্রহ করছে। শেফের চোখের মণি আতঙ্কে ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে, তার চোয়াল কাঁপছে।

শেফ ভয়ের কারণে গিলতে পারছিল না, আবার উগরে দেওয়ার সাহসও তার নেই। ডেইগোর শান্ত অথচ প্রলয়ংকরী দৃষ্টি শেফের গলার প্রতিটি পেশির ন'ড়নচড় পর্যবেক্ষণ করছিল।

"বলো,"

ডেইগো ফিসফিস করে বলল, তার স্বর মখমলের মতো মোলায়েম কিন্তু তাতে এক শা'ণিত ছু'রির ধার।

"কোথায় সেই বিচ্যুতি?"

শেফ কোনোমতে অস্ফুট স্বরে গোঙাতে লাগল,

"স্যার... সব... সবকিছু তো নিখুঁত... আমি নিজ হাতে—"

"নিখুঁত?" ডেইগো হঠাৎ এক পৈশাচিক ক্ষিপ্রতায় শেফের ক'লার চে'পে ধরল। প্লেটটি মেঝেতে এক বি'কট শব্দে আ'ছড়ে পড়ল।

"যদি নিখুঁত হয়, তবে আমার ডল কেন তা প্রত্যাখ্যান করল? এর অর্থ হয় তুমি মিথ্যে বলছ, নয়তো তোমার হাতের শৈল্পিক সত্তা আজ প'চে গেছে।"

রোজেলিয়া স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। তার চোখের সামনে ডেইগোর সেই পরিচিত রূপান্তর সভ্যতার মুখোশ ছিঁ'ড়ে বে'রিয়ে আসা এক আদিম হিং'স্র'তা। সে দেখল ডেইগো টেবিলের ওপর রাখা সেই তী'ক্ষ্ণ ডি'নার না'ইফটি তুলে নিল। ছু'রি'র ফ'লা'য় সকালের রোদের একটি বিচ্ছুরণ ঠিকরে পড়ে রোজেলিয়ার চোখে বিঁধল।

ডেইগো শেফের কানে মুখ নিয়ে এক হাড়কাঁপানো গথিক সুরে বলল,

"জিহ্বা যদি স্বাদের অমর্যাদা করে, তবে তার প্রয়োজন কী? লুইসকে বলে দাও, আজ রাতের মেনুতে যেন আর কোনো বিচ্যুতি না থাকে। আর এই শেফকে... একে আমার সেই বেবীবয়এর কাছে নিয়ে যাও। পানির নিচে হয়তো সে তার হারানো ম্যা'জি'ক খুঁ'জে পাবে।"

শেফ আর্তনাদ করে ওঠার আগেই গার্ডরা তাকে কু'কু'রের মতো টে'নে-হিঁ'চড়ে হলরুমের বাইরে নিয়ে গেল। সেই করিডোর দিয়ে শেফের নখের আঁ'চ'ড় আর মেঝের ঘর্ষণের শব্দটুকু রোজেলিয়ার কানে এক বিভীষিকার মতো বাজতে লাগল।

ডেইগো আবার তার আসনে ফিরে এল। সে খুব সাবধানে তার রুমাল দিয়ে নিজের আঙুলগুলো মুছল, যেন সামান্য ধূলিকণাও তার আভিজাত্যকে ক'লঙ্কি'ত না করে। তারপর সে রোজেলিয়ার দিকে তাকিয়ে এক স্বর্গীয় হাসি হাসল।

"সরি ডল, আমাদের সকালে একটু বিঘ্ন ঘটল। কাল থেকে তোমার ব্রেকফাস্টে কোনো ত্রুটি থাকবে না। এখন কি তুমি একটু কফি খাবে?"

রোজেলিয়া উত্তর দিতে পারল না। তার বুক চি'ড়ে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।

"আমি কিছু জিজ্ঞেস করছি, ডল"

ডেইগোর সেই শীতল এবং রাজকীয় স্বরে এক অ'দৃ'শ্য চা'বু'কের আঘাত ছিল। রোজেলিয়া অনুভব করল তার কণ্ঠনালী শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। ভয়ের এক হিমশীতল স্রোত তার মেরুদণ্ড দিয়ে নেমে গেল। সে জানে, এই মুহূর্তে মৌনতা মানেই ডেইগোর সেই উ'ন্মাদ'নাকে আরও উসকে দেওয়া। সে কাঁপতে কাঁপতে, প্রায় অস্ফুট স্বরে উত্তর দিল,

"আহ... কফি.. কফি খাবো, ডেইগো।"

রোজেলিয়ার এই আ'র্ত'নাদ মেশানো বাধ্যতা ডেইগোর কানে কোনো জয়ধ্বনির মতো শোনাল। ডেইগোর ঠোঁটের কোণে সেই নিষ্ঠুর কিন্তু মোহনীয় হাসিটি আরও চওড়া হলো। সে পরম তৃপ্তিতে চেয়ারে হেলান দিল।

"গুড।"

ডেইগো অত্যন্ত সংক্ষেপে শব্দটি উচ্চারণ করল, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক বিশাল অন্ধকারের তৃপ্তি। সে ইশারায় নতুন এক মেইডকে নতুন করে কফি আনার আদেশ দিল।

_________

মার্কো হাঁটু গেড়ে বসে আছে।গায়ে শুধু একটা টি-শার্ট পড়া যা ঘামে লেপ্টে আছে। গত রাতে ক্লাবে কাজের জন্য গিয়ে সে মেয়েদের ফাঁদে পড়ে ডজন খানের শ্যা'ম্পে'নের বোতল ভে'ঙে এক প্রলয় ঘটিয়েছিল আর তাকে দেওয়া মিশনও কমপ্লিট করতে না পারায় তার মাশুল এখন তাকে কড়ায়-গণ্ডায় বুঝিয়ে দিচ্ছে রিভেন।

রিভেনের আদেশ ছিল 'গ্যারেজের সবগুলো গাড়ির টায়ার মার্কো পরিবর্তন করবে এটা তার শাস্তি ।'

তিন ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। মার্কোর সুবিন্যস্ত চুলে এখন গ্রিজের ছোঁয়া, কপালে ঘামের নোনা জল। সে একটা বিশাল জ্যাক দিয়ে একটি আর্মার্ড এসইউভিকে ওপরে তোলার চেষ্টা করছে। তার পেশিগুলো য'ন্ত্র'ণায় চিৎকার করছে, কিন্তু রিভেনের আদেশ অমান্য করার সাহস তার নেই।

"এক শ্যাম্পেনের বোতলের এত দাম হবে জানলে কাল রাতে ম'দের বদলে লেবুর শরবত খেতাম!"

মার্কো বিড়বিড় করল।জ্যাক পাশে দাঁড়িয়ে ঘড়ি দেখছিল।সে অত্যন্ত নির্লিপ্ত স্বরে বলল,

"এখনো বারোটা গাড়ি বাকি মার্কো। হাত চালা। বস আধঘণ্টা পর গাড়ি নিয়ে বের হবেন।"

"বারোটা গাড়ি?"

মার্কো প্রায় আ'র্তনা'দ করে উঠল। তার হাতে ধরা রেঞ্চটা মাটিতে আছ'ড়ে পড়ে এক ধাতব শব্দ তুলল।

"জ্যাক, আমার হাতগুলো কি লোহার তৈরি মনে হয়? আমি একজন লভার, মেকানিক নই"

জ্যাক তার কথার কোনো উওর দিলো না সে মুখ ফিরিয়ে নিল।মার্কো একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে আবারও নিজের কাজে মন দিলো।

মার্কোর দীর্ঘ বাবরি চুলগুলো যা সে সবসময় অত্যন্ত যত্নে পেছনে ঝুঁটি করে বেঁধে রাখে, তা এখন ঘাম আর ধুলোর ভারে লটপটে হয়ে ঝুলে পড়েছে। ঝুঁটির কয়েকটা অবাধ্য গোছা তার চোখের সামনে এসে পড়ছে, আর প্রতিবার গ্রিজমাখা হাতে সেগুলো সরাতে গিয়ে তার কপালে তেলের কালো তিলক পড়ছে।

মার্কো একটা বিশাল টায়ার সজোরে মেঝেতে আছড়ে ফেলে জ্যাকের দিকে তাকিয়ে করুণ সুরে বলল,

“জ্যাক, আমার এই রেশমি চুলগুলোর দিকে তাকিয়ে একবার কি তোর দয়া হয় না? ইতালির সেরা স্টাইলিস্ট আমার এই চুলের যত্ন নেয়, আর আজ আমি এগুলোকে মেকানিকের তেলের কড়াই বানাচ্ছি! আমার ফ্যান-ফলোয়াররা দেখলে ল্যুভর মিউজিয়ামে শোকসভা ডাকবে।”

জ্যাক আবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্তভাবে বলল,

“চুল নিয়ে চিন্তা করিস না মার্কো, বস রাগলে তোর মাথার স্ক্যা'ল্প'টাই থাকবে না, তখন ঝুঁটিটা পকেটে নিয়ে ঘুরতে হবে।”

গ্যারেজের দিকে এনজোও ধীর পায়ে এগিয়ে এলো । এনজোর পরনে কালো স্যুট। তাকে দেখে মার্কোর চোখে যেন অমাবস্যার রাতে এক ফালি চাঁদ উঁকি দিল।মার্কো হাত থেকে রেঞ্চটা ফে'লে দিয়ে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে এনজোর পায়ের কাছে গিয়ে ধপাস করে বসে পড়ল।

“ব্রো! ওহ মাই গড, এনজো! তুই এসেছিস? প্লিজ ব্রো, আমাকে এই ন'র'ক থেকে বাঁচা। বসকে বল আমি ম'রে গেছি, বা আমাকে কেউ কিডন্যাপ করেছে যেকোনো একটা গল্প বানিয়ে দে”

এনজো একটা দীর্ঘ নিশাস ফেলে বললো,

“বসের লিস্টে তোর নামটা মেকানিক হিসেবে এন্ট্রি হয়ে গেছে মার্কো। এখন আর কোনো গল্প কাজে দেবে না। তুই বরং হাত চালা, কারণ আধঘণ্টা পর বস যখন আসবে, তখন একটা বোল্ট ঢিলে থাকলেও তোর বাকি জীবনটা হুইলচেয়ারেই কাটবে।”

মার্কোর মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে এনজোর স্যুটের প্যান্টের পা দুটো শক্ত করে ধরে আ'র্ত'নাদ করে উঠল,

“বিশ্বাস কর এনজো, আমি তওবা করছি! আমি শপথ নিচ্ছি, আজকের পর থেকে আমি কোনো নারী তো দূর, আমার ফোনের ওই Siriর সাথেও আর কোনো কথা বলব না। এমনকি জিপিএস এর মেয়েটার আওয়াজ শুনলেও কান বন্ধ করে রাখব। জাস্ট আজকের জন্য আমাকে বাঁচা দেখ আমি একা এতোগুলো কাজ করছি ”

এনজো অত্যন্ত নিস্পৃহভাবে তার পা ছাড়িয়ে নিয়ে জ্যাকের দিকে তাকিয়ে বলল,

“জ্যাক, ওকে দিয়ে স্পেয়ার টায়ারগুলোও পালিশ করিয়ে নিস। ওর এনার্জি এখনো বেশি আছে দেখছি।”

মার্কো এবার একদম উপুড় হয়ে গ্যারেজের মেঝেতে শুয়ে পড়ল।

"ওহ গড, সিরিকেও ডিভোর্স দিয়ে দিলাম, তাও এদের মন গলল না।"

দূরে কোথাও রিভেনের গম্ভীর গলার আওয়াজ শোনা গেল, যা শুনে মার্কো এক ঝটকায় লাফিয়ে উঠে চাকার নাট টাইট দিতে শুরু করল।জ্যাক আর এনজো মুখ টিপেটিপে হাসলো।

____________

গভীর নিশীথিনী। স্পেনের সেই গথিক অট্টালিকা এখন এক নিস্তব্ধ সমাধিক্ষেত্র। করিডোরের প্রাচীন ঝাড়বাতিগুলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে কেবল জানালার ফাঁক দিয়ে চুইয়ে পড়া চাঁদের ম্লান আলো মেঝের ওপর দীর্ঘ ও বীভৎস কিছু ছায়া তৈরি করেছে।

রোজেলিয়ার ঘুম ভেঙে গেল এক তীব্র দহনে। তার কণ্ঠনালী মরুভূমির বালুকারাশির মতো শুষ্ক বুক চিরে এক তৃষ্ণার আ'র্ত'নাদ বেরিয়ে আসতে চাইছে। ওষুধের অতিরিক্ত মাত্রার কারণে মাঝে মাঝেই তার এমন হয়,শরীরের প্রতিটি কোষ যেন এক ফোঁটা জলের জন্য হাহাকার করে ওঠে।

সে বিছানার পাশে রাখা পানির জগটা উপুড় করল কিন্তু কেবল কয়েক ফোঁটা পানি তার শূন্যতার হাহাকার বাড়িয়ে দিল। অগত্যা সে স্থির করল নিচে যাবে। সিল্কের আলখাল্লাটা গায়ে জড়িয়ে রোজেলিয়া অতি সন্তর্পণে কক্ষের বাইরে এল।

করিডোরটা এখন বড় বেশি অন্ধকার। দেওয়ালের গথিক কারুকাজগুলো যেন অন্ধকারে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। নগ্ন পাথরের শীতলতা রোজেলিয়ার খালি পায়ের পাতায় বিঁধছে।

কিচেনে গিয়ে তৃষ্ণা মিটিয়ে যখন সে আবার দোতলায় নিজের ঘরের দিকে ফিরছিল, হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। স্টাডি রুমের দরজার আড়াল থেকে ভেসে আসছে তীব্র চিৎকারের শব্দ। ডেইগোর কণ্ঠস্বর। এত রাতে ডেইগো কার ওপর এমন হিং'স্র'ভাবে গ'র্জে উঠছে? ভালো করে কান পাততেই সে ফ্র্যাঙ্ক মোরালেসের খসখসে স্বর চিনতে পারল। রোজেলিয়ার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল। ডেইগো সাধারণত তার বাবার সামনে অত্যন্ত সংযত থাকে, কিন্তু আজ তার কণ্ঠে কোনো লাগাম নেই।

রোজেলিয়া ভয় পেয়ে গেল। এই অবেলায় তাকে এখানে দেখলে ডেইগো হয়তো উন্মাদ হয়ে উঠবে, আর পানি শেষ হওয়ার অপরাধে নিনার ওপর নেমে আসবে অবর্ণনীয় লাঞ্ছনা। সে পা টিপে টিপে চলে যেতে চাইল কিন্তু ঠিক তখনই নিজের নাম শুনে তার পা দুটো যেন মেঝেতে গেঁথে গেল। এক অমোঘ কৌতূহল আর অজানার ভয় তাকে দরজার একদম কাছে টেনে নিয়ে গেল।

"যথেষ্ট হয়েছে ড্যাড" ডেইগোর কণ্ঠস্বর এক উন্মত্ত পশুর মতো গর্জে উঠল।

"তুমি আমাকে বারবার রিভেন আরওয়াইনের ভয় দেখিও না। রিভেনের সাধ্য নেই আমার এই দুর্গ ভেদ করার"

ফ্র্যাঙ্ক মোরালেস শীতল স্বরে উত্তর দিলেন,

"তুচ্ছ মনে করো না ডেইগো। রিভেন যখন জানবে তুমি তার স্ত্রীকে ড্রা'গ দিয়ে প'ঙ্গু করে রেখেছ তখন কী হতে পারে তোমার কোনো ধারণা আছে । তুমি এই কয়েক মাস ধরে মেয়েটার স্মৃতি নিয়ে যা খেলেছ তা ধরা পড়লে "

রোজেলিয়ার হৃদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। স্ত্রী? কার স্ত্রী?

ডেইগো হঠাৎ অট্টহাসি দিয়ে উঠল

এক বি'কৃত, পৈ'শা'চিক হাসি।

"স্ত্রী? রোজেলিয়া এখন আমার । রিভেনের হাত থেকে ওকে ছিনিয়ে আনতে আমাকে কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। ওর স্মৃ'তিশ'ক্তি আমি এমনি এমনি মুছিনি ড্যাড। ক'ড়া ও'ষুধের ডো'জে ওর ম'স্তি'ষ্ক এখন আমার হাতের কাদা। ওর চোখে রিভেন এখন এক ধ'র্ষ'ক,এক খু'নি"

রোজেলিয়ার চোখের সামনে অন্ধকার ঘনিয়ে এল। তার দু-হাত দিয়ে সে নিজের মুখ চেপে ধরল যাতে চিৎকার বেরিয়ে না আসে।

"ডু ইউ থিংক রিভেনকে ও কোনোদিন ক্ষমা করবে? রিভেনের ওপর ঘৃণা জন্মানোর জন্য আমি ওর বাবা-মাকেও স্যা'ক্রি'ফা'ইস করেছি! আমি নিজের হাতে ওদেরকে মে'রে রিভেনের ওপর দোষ চাপিয়েছি। এখন রোজেলিয়া নিজেই রিভেনের র'ক্ত চায়। এর চেয়ে নিখুঁত শিল্প আর কী হতে পারে ড্যাড?"

রোজেলিয়ার কানে শব্দগুলো একেকটি ত'প্ত সি'সা'র মতো বিঁ'ধছে। তার পৃথিবীটা এক নিমিষে ওলটপালট হয়ে গেল। যে মানুষটাকে সে নিজের উদ্ধারকর্তা ভেবেছিল যে ডেইগোর কাছে সে আশ্রয় খুঁজেছিল সেই আসলে তার মা-বাবার র'ক্তে হাত রা'ঙা'নো এক শ'য়'তা'ন?ডেইগোই আসলে তার জীবনের প্রকৃত ধ্বং'সকা'রী। এক প্র'চণ্ড মা'থা ব্য'থা তার ম'গজকে বি'দীর্ণ করে দিল।

To be continue,,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন