#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins) #লেখনিতে_ফারিহা
পর্ব ৪৪
(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)
স্পেনের বিশাল বাড়িটির চূড়ায় যখন ভোরের প্রথম আলো এসে আছড়ে পড়ল, চারদিকের কুয়াশাচ্ছন্ন উপত্যকাটি যেন এক বিষণ্ন ক্যানভাসের মতো জেগে উঠল।বাড়ির বিশালাকার লোহার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডদের নিস্পৃহ মুখগুলো ভোরের হিমশীতল আলোয় আরও পাথুরে দেখাচ্ছে। তাদের কালো ইউনিফর্ম আর হাতের উদ্যত স্বয়ংক্রিয় অ'স্ত্র'গুলো এই আভিজাত্যের আড়ালে এক সুপ্ত আ'গ্নে'য়গি'রির সংকেত দেয়। বাগানের ঝাউগাছগুলোর পাতায় জমে থাকা শিশির বিন্দুগুলো টুপটুপ করে ঝরছে।
রোজেলিয়া বিছানায় জানালার দিকে মুখ করে শুয়ে আছে। তার চোখের নিচে হালকা কালচে ছায়া। ডেইগোর সেই পৈ'শা'চি'ক সত্য শোনার পর থেকে তার রাতের ঘুম স্রেফ হারিয়ে যায়নি বরং এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন ভোরে যখন সে চোখ খোলে, মনে হয় তার মস্তিষ্কের ভেতর হাজারো ত'প্ত কাঁ'টা বিঁ'ধ'ছে। মাথাটা এক ম'র'ণভারী পাথরের মতো হয়ে আছে, যা সে বয়ে বেড়াতে পারছে না।
বিগত কয়েকদিন ধরে ডেইগোর সেই সুপরিকল্পিত রুটিন সে ওলটপালট করে দিচ্ছে। সে ঠিকমতো ডাইনিং টেবিলে যাচ্ছে না সময়ের জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে। ডেইগো হয়তো ভেবেছে সে শারীরিকভাবে অসুস্থ, তাই এই কদিন কোনো জো'র খাটায়নি। কিন্তু রোজেলিয়া জানে, এই অসুস্থতা তার শরীরের নয় তার আত্মার।
রোজেলিয়া অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নিনার দেওয়া ওষুধের ডো'জগুলো এড়িয়ে যাচ্ছে। যখনই নিনা বা অন্য কেউ আসে, সে ওষুধের ব'ড়িগুলো জিভের তলায় লুকিয়ে রাখে এবং পরে তা ফেলে দেয়। আজ তার মাথা ব্য'থার প্রতিটি স্পন্দন তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে এই যন্ত্রণার জন্য দায় ডেইগো মোরালেস। সে নিজেকেই প্রশ্ন করে, ডেইগো কী করে পারল? সে কী করে তার মা-বাবার র'ক্তে নিজের হা'ত রা'ঙাল?
রোজেলিয়ার আ্যমনেশিয়ার কারণে তার জীবনের এক বছরের স্মৃতি সম্পূর্ণ মুছে গেছে। সে তার মা-বাবাকে চেনে, তার শৈশব চেনে, কিন্তু ওই একটি বছর যেন এক কুয়াশাচ্ছন্ন গর্ত। ডেইগো তাকে শিখিয়েছিল রিভেন তাকে অপহরণ করে নি'র্যা'তন করেছে। ডেইগো তাকে তার বাবার এক কৃত্রিম ভিডিও বার্তা দেখিয়েছিল। কত নিখুঁত সেই জাল প্রমান। অথচ আজ ডেইগোর নিজের মুখের সেই পৈ'শা'চিক স্বীকারোক্তি সব মিথ্যের দেয়াল ভে'ঙে চু'রমা'র করে দিয়েছে।
রোজেলিয়া বিছানায় বসে এক অস্ফুট হাসি হাসল একটি তিক্ত য'ন্ত্র'ণাদা'য়ক হাসি। আজ যদি সে নিজের কানে স্টাডি রুমের আড়ালে দাঁড়িয়ে সত্যটা না শুনত তবে হয়তো আ'মৃ'ত্যু সে এই পি'শা'চটাকেই নিজের রক্ষাকর্তা মনে করতো।
তার মস্তিষ্কের কোণে একটা সন্দেহ বি'ষা'ক্ত সা'পে'র মতো ফ'ণা তুলল। নিনা? সে কি তবে এই ম'হা'পাপের অংশীদার? নিনা কি জানত যে সে রোজেলিয়াকে সুস্থ করার বদলে তিলে তিলে বি'ষ দিয়ে তার ম'স্তি'ষ্ককে প'ঙ্গু করে দিচ্ছে?
রোজেলিয়া কাঁপতে কাঁপতে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়াল। আয়নায় প্রতিফলিত সেই ফ্যাকাশে মেয়েটাকে আজ তার অচেনা মনে হচ্ছে। সে তার গায়ের ক্রিম রঙের রেশমি ড্রেসটার দিকে তাকাল যেটা ডেইগোর পছন্দ। হঠাৎ তার মনে হলো এটা ড্রেস নয়, সে আসলে এক ক'ফি'নের কা'প'ড়ে মোড়া হয়ে আছে। ল্যাভেন্ডারের সুবাস এখন তার কাছে প'চা লা'শে'র গ'ন্ধের চেয়েও ভয়ানক লাগছে।
রোজেলিয়া তার নিজের চুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ করে টানতে লাগল যেন এই শা'রী'রিক য'ন্ত্র'ণা তার ম'স্তি'ষ্কের ভেতরকার সেই প্র'ল'য়ংক'রী ঝ'ড়কে থামিয়ে দিতে পারবে। আয়নার প্রতিবিম্বে নিজের দিকে তাকিয়ে সে এক আদিম আ'ত'ঙ্ক অনুভব করল। ডেইগোর প্রতিটি স্পর্শ, 'বেবি ডল' সম্বোধন এখন তার কাছে বি'ষা'ক্ত সা'পের ছো'ব'লের মতো মনে হচ্ছে। যে মানুষটাকে সে পরম আশ্রয়ে জড়িয়ে ধরেছিল, সেই আসলে তার মা-বাবার খু'নি । তার সত্তা এক নিমিষে চু'রমা'র হয়ে গেছে।
"কী করে পারলে তোমরা? কীভাবে?"
সে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল।
বিগত একটি বছরের স্মৃতি তার কাছে এক অন্ধকার গহ্বর। সে যতোই সেই গর্তে উঁকি দিতে চাইছে, ততোই তার মাথা য'ন্ত্র'ণায় ফেটে যাচ্ছে। কিন্তু ডেইগো আর ফ্র্যাঙ্কের গোপন কথোপকথন তার চেতনার দরজায় কু'ঠা'রাঘা'ত করেছে। ফ্র্যাঙ্ক বলেছিলো সে রিভেনের ওয়াইফ। কথাটি মনে পড়তেই
রোজেলিয়ার সারা শরীর এক অজানা শিহরণে কেঁপে উঠল।
সে আবার আয়নার দিকে তাকালো। তার ফ্যাকাশে ঠোঁট দুটো প্রকম্পিত হচ্ছে। সে খুব সন্তর্পণে, প্রায় ফিসফিস করে উচ্চারণ করল,
"রিভেন..."
নামটি উচ্চারণের সাথে সাথেই তার হৃদপিণ্ডের গতি এক অদ্ভুত ছন্দে বেড়ে গেল। এই নামটির মধ্যে কোনো এক নি'ষি'দ্ধ মা'ধু'র্য আর অ'মোঘ টান লুকিয়ে আছে। সেদিন মানুষটির সেই হাহাকার মাখা চাহনি... তার সেই আ'র্তনা'দ সবই তবে সত্য ছিল? ডেইগো তাকে পৈ'শা'চিক গল্প শুনিয়ে রিভেনের প্রতি ঘৃণা বি'ষে'র মতো গেঁ'থে দিয়েছিল। কিন্তু আজ সত্যের আলোয় সেই বি'ষ যেন প্র'তিষেধক হয়ে উঠছে।
রোজেলিয়া পাথরের মতো স্থির হয়ে ভাবতে লাগল। যদি সে রিভেনের স্ত্রী হয়। তবেমকেমন ছিলো তাদের সম্পর্ক? ইশ একটু কিছু যদি সে মনে করতে পারতো। ডেইগো তো নিজেই স্বীকার করেছে যে সে রা'সা'য়নি'ক ড্রা'গ দিয়ে রোজেলিয়ার স্মৃ'তি মু'ছে দিয়েছে। তার মানে রিভেন কোনো পি'শা'চ নয় বরং রিভেনের কাছ থেকে তাকে ছিনিয়ে আনতেই ডেইগো এই বী'ভৎস দাবার চাল চেলেছে।
রোজেলিয়ার চোখের কোণে এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে বুঝতে পারল, তার এই যে মাথার য'ন্ত্র'ণা এই যে অ'ব'শ ভাব এসবই ডেইগোর দেওয়া সেই বি'ষা'ক্ত ও'ষুধের ফল, যাতে সে কোনোদিন সত্যের মুখোমুখি হতে না পারে। ডেইগো তাকে এক কৃত্রিম ঘোরের মাঝে বন্দি করে রেখেছে।
আগামীকাল তাদের বিয়ে। ডেইগো তাকে এই দেশ থেকে অনেক দূরে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। রোজেলিয়ার দু-হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠল। না, এটা হতে দেওয়া যায় না। সে কোনোভাবেই সেই ঘাতককে বিয়ে করবে না।
___________________
কক্ষের নিস্তব্ধতা ভেঙে নিনা ঘরে ঢুকল, তার হাতে ট্রেতে রাখা কাপ আর পরিচিত নীল রঙের ওষুধের বড়ি। নিনা অত্যন্ত ধীর পায়ে এগিয়ে এল,
"রোজ, তোমার ওষুধের সময় হয়েছে। লক্ষ্মী মেয়ের মতো খেয়ে নাও,"
নিনা মোলায়েম স্বরে বলল।
রোজেলিয়া বিছানায় পিঠ ঠেকিয়ে স্থির হয়ে বসে ছিল। সে নিনার চোখের দিকে তাকাল যে চোখে সে এতদিন আশ্রয় খুঁজেছিল সেখানে আজ সে কেবল বিশ্বাসঘাতকতার ছায়া দেখতে পাচ্ছে। সে অত্যন্ত ধীর হাতে বড়িগুলো হাতে নিল, কিন্তু এবার সরাসরি গিলে না ফেলে নিনার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অত্যন্ত শান্ত স্বরে প্রশ্ন করল,
"আচ্ছা নিনা, এত ওষুধ খেয়েও আমার মাথা ব্যথা কেন ঠিক হচ্ছে না? বরং যত দিন যাচ্ছে, এই য'ন্ত্র'ণা যেন আমার মগজটাকে ছিঁ'ড়ে ফে'লতে চাইছে।"
নিনা মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তার হাতের ট্রে টা সামান্য কেঁপে উঠল, কিন্তু সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে এক ম্লান হাসি হাসল।
"এগুলো তো তোমার স্মৃতির জ'ট খোলার ও'ষু'ধ রোজ। তোমার ম'স্তি'ষ্ক অনেক বড় ধা'ক্কা খেয়েছে, তাই সেরে উঠতে একটু সময় লাগছে।"
"সময়?"
রোজেলিয়া এবার নিনার আরও কাছে এগিয়ে এল। তার কণ্ঠস্বরে এক ধরণের হিমশীতল কৌতূহল।
"কদিন আগে ডেইগো বলেছিল আমি খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছি। কিন্তু নিনা, আমার স্মৃতি কেন ফিরছে না ।এমনোতো হতে পারে যে এই ঔষধগুলো আসলে আমার সুস্থ হওয়ার জন্য নয় কারণ প্রতিদিনই এগুলো খাওয়ার পর আমার মাথা যেন ভারী হয়ে উঠে মাথা ব্যথাও বেড়ে যায়"
নিনার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করল। সে রোজেলিয়ার এই তীক্ষ্ণ এবং যৌক্তিক প্রশ্নে অভ্যস্ত নয়। এতদিন রোজেলিয়া ছিল এক অবুঝ শিশুর মতো যে কেবল নিনার আদেশ পালন করত। কিন্তু আজ তার চোখের সেই গভীর চাউনি নিনার ভেতরটা কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
"ওসব কিছু না রোজ,"
নিনা তোতলাতে তোতলাতে বলল।
" স্যার তোমার জন্য পৃথিবীর সেরা চিকিৎসকদের পরামর্শ নিচ্ছেন। তুমি জাস্ট ওষুধটা খেয়ে নাও, দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।"
রোজেলিয়া ঔষধটা নিলো না বরং হাতেই ধরে রাখলো।সে হঠাৎ নিনার হাতটা ধরল। তার স্পর্শে আজ এক অদ্ভুত কাতরতা যা নিনাকে অপ্রস্তুত করে দিল।
"নিনা... তুমি তো আমার বড় বোনের মতো। এই কয়েক মাস ধরে তুমিই তো আমার সবচেয়ে কাছে ছিলে। আমার খাওয়া, আমার ঘুম, আমার শরীর সবকিছুর খেয়াল তো তুমিই রাখলে। আমি কি তোমার কেউ নই?"
নিনা কিছুটা হকচকিয়ে গেল। রোজেলিয়ার চোখের কোণে টলমল করছে জল। নিনা নিচু স্বরে বলল,
"অবশ্যই রোজ, আমি তো তোমার ভালোর জন্যই সব করি।"
"তবে কেন আমি প্রতি রাতে স্বপ্নে দেখি একজোড়া হ্যাজেল চোখ আমাকে খুঁজছে, আর আমি আ'গু'নের ভে'তর দাঁড়িয়ে আ'র্ত'নাদ করছি? জানো নিনা, যখন আমি আয়নায় তাকাই, আমি নিজের মুখটা চিনতে পারি না। মনে হয় আমার ভেতরকার মেয়েটাকে কেউ শ্বা'স'রো'ধ করে মে'রে ফেলছে। তুমি কি পারো না আমাকে এই অন্ধকার থেকে বের করতে?"
নিনা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ল। সে রোজেলিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
"শান্ত হও রোজ। স্যার তোমাকে খুব ভালোবাসেন, তিনি কখনোই তোমার খারাপ—"
"ডেইগো?" রোজেলিয়া হঠাৎ নিনার হাতটা ছেড়ে দিয়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। তার চেহারার সেই কোমলতা এক নিমেষে মিলিয়ে গিয়ে সেখানে ফুটে উঠল এক প্র'ল'য়ংক'রী কাঠিন্য। সে জানালার দিকে পিঠ দিয়ে নিনার দিকে ঘুরল। তার কণ্ঠস্বর এখন তুষারশীতল।
"নিনা, আর কত অভিনয় করবে? ডেইগো কী ভালোবাসে তা আমি খুব ভালো করেই জানি। ডেইগো তার পুতুল'কে ভালোবাসে, আমাকে নয়।"
নিনা চমকে উঠল।
"রোজ, তুমি এসব কী বলছ?"
রোজেলিয়া এক পা দু-পা করে নিনার দিকে এগিয়ে এল। তার চোখের মণি এখন এক ধিকিধিকি জ্ব'ল'তে থাকা আ'গু'নের মতো। সে ফিসফিস করে বলল,
"সেদিন মাঝরাতে স্টাডি রুমের দরজার আড়ালে আমি সব শুনেছি নিনা। ডেইগো আর ফ্র্যাঙ্ক মোরালেসের প্রতিটি শব্দ আমার কানে সি'সা'র ম'তো বিঁ'ধেছে। আমি জানি রিভেন কে। আমি জানি রিভেন কোনো খু'নি নয় বরং সেই আমার স্বামী। আর আমার মা-বাবা? ডেইগো তাদের নিজের হাতে খু'ন করে সেই দো'ষ রিভেনের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে।"
নিনার হাতের সেই ট্রে-টা ঝনঝন করে মেঝেতে পড়ে গেল। তার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, যেন সে জী'ব'ন্ত কোনো প্রে'তা'ত্মা দেখছে।
"রোজ... তুমি... তুমি ভুল শুনছ..."
নিনা কাঁপতে কাঁপতে পিছু হটল।
"না নিনা! আমি ভুল শুনিনি। ডেইগো নিজেই স্বীকার করেছে সে আমাকে ড্রা'গ দিয়ে আমার স্মৃ'তি মু'ছে দিয়েছে। আর তুমি? তুমি তো তার সবচেয়ে বড় অ'স্ত্র ছিলে তাইনা। তুমি আমাকে সুস্থ করার নাম করে প্রতিদিন বি'ষ দিয়ে যাচ্ছ যাতে আমি কোনোদিন ওই সত্যটা মনে করতে না পারি। বলো নিনা এই কয়েক মাস ধরে আমাকে এই মিথ্যা আশ্রয়ে বন্দি রাখতে তোমার বুকটা একবারও কাঁ'পল না?"
রোজেলিয়া নিনার কবজিটা আরো শক্ত করে ধরলো। তার নখগুলো নিনার নরম চামড়ায় বসে যাচ্ছে, কিন্তু সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। তার কণ্ঠস্বরে এখন এক আহত বাঘিনীর আর্তনাদ।
"কী করে পারলে তোমরা আমার সাথে এমন করতে? কী করে, নিনা? তোমার এই মায়াবী চেহারার আড়ালে এত বড় অভিনয় করতে কি একবারও বুক কাঁপল না? আমার মা-বাবাকে যারা কেড়ে নিল, তাদের সাথে মিশে তুমি আমায় প্রতিদিন তিলে তিলে বি'ষ দিচ্ছিলে?"
নিনা শিউরে উঠল। সে আতঙ্কিত চোখে বারবার বন্ধ দরজার দিকে তাকাচ্ছে। সে জানে, এই বাড়ির দেয়ালেও কান আছে। ডেইগোর কোনো অনুচর যদি একবারও রোজেলিয়ার এই রু'দ্র'রূপ দেখে ফেলে, তবে র'ক্তগ'ঙ্গা বয়ে যাবে। নিনা নিজেকে কিছুটা শান্ত করে কম্পিত স্বরে বলল,
"বিশ্বাস করো রোজ, আমি নিরুপায় ছিলাম। আমি তোমাকে অনেকবার সতর্ক করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমি... আমি নিরুপায়!"
নিনা তার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে দ্রুত পা বাড়িয়ে দরজাটা আরও ভালো করে চেক করে এসে রোজেলিয়ার পাশে বিছানায় বসল। তার চোখে এখন অপরাধবোধের অশ্রু। সে ফিসফিস করে বলতে শুরু করল,
"তুমি যা শুনেছ, তার প্রতিটি বর্ণ সত্য, রোজ। এই দীর্ঘ কয়েকমাস তোমাকে উ'চ্চমা'ত্রার ড্রা'গ'স দিয়ে আচ্ছন্ন করে রাখা হয়েছিল যাতে তোমার স্মৃতিশক্তি চি'রতরে মু'ছে যায়। ডেইগো... ডেইগো এক চরম লেভেলের সা'ই'কোপ্যা'থ। ছোটবেলা থেকেই ওর ট্রিটমেন্ট চলছে, কিন্তু ওর ভেতরের জা'ন্ত'ব সত্তা কোনোদিন সুস্থ হয়নি। সে একবার যার ওপর লক্ষ্য স্থির করে, তাকে তার চাই-ই চাই।"
নিনা একটু থামল, তার গলার স্বর ভারী হয়ে এল।
"ডেইগোর আগের গার্লফ্রেন্ডও ওর এই নৃ'শং'সতা স'হ্য করতে না পেরে মারা গেছে।তাকেও সে ডল ডাকতো । এরপর একদিন ইতালিতে মেডিকেলে সে তোমাকে দেখেছিল। কোনো এক নার্সের সাথে খারাপ ব্যবহার করায় তুমি তাকে থা'প্প'ড় মেরেছিলে ।তোমার তেজ আর রুদ্ররূপ দেখে সে পা'গ'ল হয়ে যায়। তখন থেকেই সে তোমার ওপর অবসেসড।"
রোজেলিয়া পাথরের মতো বসে রইল। নিনা আবার বলতে লাগল,
"আমি রিভেনের ব্যাপারে খুব বেশি জানি না, তবে এটুকু বুঝেছি তুমি রিভেনকে পা'গ'লের মতো ভালোবাসতে। ড্রা'গ'স দেওয়ার প্রথম দিকে তুমি প্র'লা'পের ঘোরে শুধু রিভেনের নাম নিতে। বারবার ওই নামটা তোমার মুখে শুনে ডেইগো আরও উ'ন্মা'দ হয়ে যেত। রিভেনের প্রতি তোমার ওই ভালোবাসা ওকে হিং'সায় জ্বা'লি'য়ে দিয়েছিল, তাই সে আরও নিষ্ঠুর হয়ে তোমার স্মৃ'তি মু'ছতে উঠেপড়ে লাগল।"
নিনা হঠাৎ রোজেলিয়ার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলো। তার চোখে এখন মিনতি।
"দেখো রোজ আমাকে ঘৃণা করার আগে শুধু একটা কথা শোনো। আমারও একটা সাত বছরের ছোট্ট মেয়ে আছে, রিতা। ডেইগো আমার মেয়েকে অ'প'হরণ করে নিজের কাছে আটকে রেখেছে। সে আমাকে ব্ল্যা'ক'মে'ইল করে এসব করাচ্ছে। আমি একজন ডাক্তার হয়েও আজ এক খু'নি সা'ই'কো'প্যা'থের দাসে পরিণত হয়েছি।"
নিনা রোজেলিয়ার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল।
"আমি তোমাকে অনেকবার আকারে ইঙ্গিতে সতর্ক করেছি যাতে রিভেনের ব্যাপারে ডেইগোকে কিছু না বলো। ডেইগো বার বার ডো'জ বাড়াতে বলেছিল, কিন্তু সেটা ছিল তোমার জন্য প্রা'ণঘা'তী। আমি ডোজ না বাড়িয়ে ওকে মিথ্যে বলেছি আর তোমাকে সতর্ক করেছি। বিশ্বাস করো রোজ, গত কয়েকদিন আমি তোমাকে কোনো ড্রা'গ'স দেইনি। আমি শুধু হালকা সি'ডেটি'ভ দিচ্ছিলাম যাতে তোমার দুশ্চিন্তা একটু কম থাকে।"
রোজেলিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল যেন সময়ের চাকাটা থমকে গেছে। জানালার বাইরে কুয়াশার চাদর সরিয়ে সূর্যের কিরণটা শাণিত খড়গের মতো কার্পেটের ওপর আছড়ে পড়ল, রোজেলিয়া নিনার দিকে তাকাল। তার চোখের সেই হাহাকার এখন এক স্থির সংকল্পে রূপ নিয়েছে।
সে নিনার হাত দুটো শক্ত করে ধরে অস্ফুট স্বরে আ'র্তনা'দ করে উঠল,
"আমি এখন কী করব নিনা? ওই পি'শা'চটাকে আমি কাল বিয়ে করতে পারব না। যার হাতে আমার মা-বাবার র'ক্ত লেগে আছে তাকে স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়ার আগে আমার মৃ'ত্যু ভালো। আমায় সাহায্য করো নিনা, প্লিজ! এখান থেকে বের হওয়ার কোনো একটা পথ আমায় দেখাও।"
নিনা চমকে উঠে রোজেলিয়ার হাত সরিয়ে দিল। তার মুখটা মুহূর্তেই ফ্যা'কাসে হয়ে গেল। সে দ্রুত গিয়ে দরজার লকে কান পাতল, কেউ আড়ি পাতছে কি না নিশ্চিত হয়ে আবার রোজেলিয়ার কাছে ফিরে এল।
"আমি নিরুপায় রোজ! আমি কিচ্ছু করতে পারব না,"
নিনা ফিসফিস করে বলল, তার কণ্ঠে এক চরম অসহায়ত্বের ছাপ।
"ডেইগো মা'নু'ষ নয় ও একটা জা'নো'য়ার। আমি যদি তোমাকে পালানোর সামান্যতম সাহায্যও করি, তবে ডেইগো আমার রিতাকে মে'রে ফেলবে। ও আমাকে পরিষ্কার বলে দিয়েছে তোমার স্মৃ'তি ফিরলে বা তুমি পালিয়ে গেলে আমার মেয়ের লা'শ'টাও আমি পাব না।"
নিনা বিছানায় ধ'সে পড়ল, তার দু-হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কান্না চেপে সে বলতে লাগল,
"ডেইগো তোমাকে 'ডল' বলে ডাকে কারণ ও চায় তুমি শুধু ওর দিকে তাকিয়ে থাকো, ওর কথা শোনো। কিন্তু রিতা... ও তো ছোট। আমি ওর জীবন নিয়ে খেলা করতে পারি না।"
রোজেলিয়া অনুভব করল তার পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছে। সে বুঝতে পারল, ডেইগো কেবল তাকেই ড্রা'গ দিয়ে ব'ন্দি করেনি, বরং তার চারপাশের প্রতিটি মানুষকে এক একটি অদৃশ্য শিকল দিয়ে বেঁ'ধে রেখেছে। নিনার এই মাতৃত্বের দুর্বলতাকে ডেইগো কত নিষ্ঠুরভাবে ব্যবহার করছে।
রোজেলিয়া জানালার ওপাশে ধূসর উপত্যকাটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো এই বাড়ির দেয়ালগুলো ও যেন ডেইগোর পৈ'শা'চি'কতায় হাসছে। সে ধীরে ধীরে নিনার কাঁধে হাত রাখল। তার স্পর্শে এখন এক অদ্ভুত শীতলতা।
"তাহলে কালকের বিয়েটাই কি আমার শেষ গ'ন্ত'ব্য নিনা? আমি কি তবে ওই খু'নি'টার হাতে নিজেকে তুলে দেব?"
নিনা উত্তর দিল না, শুধু মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। বাড়ির সেই প্রকাণ্ড ঘরে এখন কেবল এক মায়ের অসহায়ত্ব আর এক মেয়ের ধ্বং'স হয়ে যাওয়া পৃথিবীর দীর্ঘশ্বাস প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
________***____
স্পেনের বিশাল অট্টালিকার চূড়ায় আজ উৎসবের রঙ লেগেছে, কিন্তু সেই রঙে মিশে আছে এক বিভীষিকাময় র'ক্তি'ম আভা। আজ রোজেলিয়া আর ডেইগোর বিয়ে। ডেইগো সকাল থেকেই এক অদ্ভুত উন্মাদনায় আচ্ছন্ন।
তার উ'ন্মাদনা আজ শিখরে তার আজন্ম ডল আজ আইনিভাবে তার হবে।
বাড়ির চারধারে সশস্ত্র গার্ডদের সংখ্যা আজ দ্বিগুণ, প্রতিটি কোণে সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো অতন্দ্র প্রহরীর মতো তাকিয়ে আছে যার ভেতরে লুকানো মাইক্রোফোনগুলো বাতাসের ফিসফিসানিও রেকর্ড করে নিচ্ছে।
রোজেলিয়া আয়নার সামনে বসে আছে, তার চোখে এক মৃ'ত হরিণীর চাউনি। ডেইগো তার জন্য দুটি পোশাক পাঠিয়েছে। বিয়ের জন্য একটি র'ক্তব'র্ণ বেনারসি শাড়ি এবং রাতের উৎসবের জন্য একটি বিশাল সাদা গাউন। পার্লারের মেয়েরা তাকে সাজাতে ব্যস্ত। শাড়ির সেই গাঢ় লাল রঙটা দেখে রোজেলিয়ার মনে হলো, এটি কোনো উৎসবের পোশাক নয় বরং ডেইগোর হাতে খু'ন হওয়া মানুষদের র'ক্তে রা'ঙানো একটি কাফন।
নিনা পাশেই দাঁড়িয়ে আছে, তার চোখের ফোলা ভাব আর কাঁপতে থাকা হাতগুলো রোজেলিয়ার কাছে এক অ'ব্যক্ত য'ন্ত্রণার দলিল। সে রোজেলিয়ার দিকে তাকাতে পারছে না। নিনার সেই কথাগুলো রোজেলিয়ার মাথায় বারবার বাজছে। রোজেলিয়া জানে, সে পালালে নিনা বিপদে পড়বে, রিতার ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু এই পি'শা'চে'র সাথে জীবন কাটানোর চেয়ে মৃ'ত্যুও তার কাছে অনেক বেশি কাম্য।
রোজেলিয়া বুজতে পারলো, ডেইগোর এই দুর্ভেদ্য দুর্গে সাধারণ বুদ্ধিতে কোনো কাজ হবে না। তাকে হতে হবে এক ছায়া, এক বিভ্রম তাইতো কাল রাতে ডেইগোর সাথে গল্প করার ছলে সে বাইরে হেঁটেছে তার সাথে আর চারিদিক পর্যবেক্ষণ করে নিয়েছে ।
সাজগোজ যখন প্রায় শেষ পর্যায়ে রোজেলিয়া তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি কাজে লাগাতে শুরু করল। সে লক্ষ্য করল, সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো করিডোর এবং ঘরের প্রতিটি কোণ কভার করলেও ড্রেসিং রুমের পেছনের ছোট স্টোর রুমটির ভেন্টিলেটর অংশটি ক্যামেরার নাগালের বাইরে। সে খুব সাবধানে ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা পার্লারের মেয়েদের ব্যবহৃত হেয়ার স্প্রে ,হেয়ার ক্লিপ এবং একটি কাঁচের পারফিউম বোতল নিজের আঁচলের তলায় লুকিয়ে ফেলল।
সাজ শেষ হওয়ার পর রোজেলিয়া হঠাৎ খুব অসুস্থ হওয়ার ভান করল। সে তার গলা চেপে ধরে বমির অভিনয় করতে করতে বাথরুমের দিকে দৌড়ে গেল। নিনা এবং পার্লারের মেয়েরা আতঙ্কিত হয়ে পিছু নিতে চাইল, কিন্তু রোজেলিয়া এক তীব্র আর্তনাদ করে বলল,
"কাউকে আসতে হবে না!" সে ভেতরে ঢুকেই ভেতর থেকে দরজাটি লক করে দিল।
বাথরুমের ভেতরে প্রবেশ করেই রোজেলিয়ার সত্তা বদলে গেল। হেয়ার স্প্রের ক্যানটি সে হাতে নিল। গিজারের ইলেকট্রিক প্যানেলটি ছিল দরজার ঠিক ওপরে। সে মেকআপ কিট থেকে বের করা ক্লিপ দিয়ে শর্ট সার্কিট ঘটাল
যা সে একবার মুভিতে দেখেছিল এরপর হেয়ার স্প্রের দা'হ্য গ্যাস সেখানে ছিটিয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে এক নী'লচে শিখা আর কুচকুচে কালো ধোঁ'য়ায় বাথরুম ভরে গেল। দাহ্য গ্যাসের গন্ধে বাতাস বি'ষা'ক্ত হয়ে। রোজেলিয়া কাশতে শুরু করলো তারপরও কোনো রকমে আচল দিয়ে নাক মুখ চেপে ধরে রাখলো। ফায়ার অ্যালার্মের তীক্ষ্ণ চিৎকার পুরো বাড়ির নিস্তব্ধতা চিরে দিল।
স্মার্ট হোমের সিকিউরিটি প্রোটোকল অনুযায়ী, আ'গু'নের সংকেত পাওয়া মাত্রই সব ইলেকট্রনিক লক স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে গেল। সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো ধোঁয়ার আস্তরণে অন্ধ হয়ে গেল। ডেইগোর কন্ট্রোল রুমে তখন কেবল সাইরেন আর লাল আলোর তাণ্ডব।
রোজেলিয়া জানত, বাথরুম থেকে বের হলেই বেডরুম, যেখানে পার্লারের মেয়েরা আর নিনা ওত পেতে আছে। সে বাথরুমের জানালার কাঁচটি ভারী পারফিউম বোতল দিয়ে কিছুক্ষণ চেষ্টা করে নিঃশব্দে গুঁড়িয়ে দিল যাতে গার্ডরা ভাবে সে জানালা দিয়ে পালিয়েছে। কিন্তু সে বেরোলো না। সে বাথরুমের লন্ড্রি বাস্কেট থেকে একটি বড় কালো প্লাস্টিকের ব্যাগ আর পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের ফেলে যাওয়া একটি ধুলোমাখা অ্যাপ্রন নিজের শাড়ির ওপর দ্রুত জড়িয়ে নিল ভাগ্যবসত সে এটা কালকে নিচতলার বাথরুমে পেয়েছিল। গয়নাগুলো সে ব্যাগের ভেতর ভরে বার্থটাবের পেছনে রাখলো এবং মাথায় একটি ময়লা কাপড় বেঁধে নিজের মুখ ঢেকে নিল।
ধোঁয়া বেডরুমে ছড়িয়ে পড়ায়, নিনা আর মেয়েরা কাশতে কাশতে দিশেহারা হয়ে পড়ল। রোজেলিয়া দরজা খুলে ধোঁয়ার মেঘের ভেতর দিয়ে টলতে টলতে বেরিয়ে এল। সে তার গলার স্বর একটু বদলে আর্তনাদ করতে লাগল,
"আগুন! ম্যাডাম ভেতরে আটকা পড়েছেন! বাঁচান!"
গার্ডরা উন্মত্তের মতো বেডরুমের ভেতর দিয়ে বাথরুমের দিকে ছুটছে, রোজেলিয়া তখন তাদের পাশ কাটিয়ে করিডোর দিয়ে হাঁটতে লাগল। ধোঁয়ার কারণে কারো দেখার সাধ্য নেই যে ওই অ্যাপ্রনের নিচে এক কনে লুকিয়ে আছে। সে দেয়াল ঘেঁষে অত্যন্ত নিপুণভাবে এগিয়ে চলল সেই কাঙ্ক্ষিত ভেন্টিলেটরের দিকে।
করিডোরের শেষ প্রান্তে সেই ছোট স্টোর রুম। রোজেলিয়া ভেতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল। সে জানে এদিকটায় সিসিটিভি নেই। সে অ্যাপ্রনটা ছুড়ে ফেলে দিল। ভেন্টিলেটরটি ছোট, কিন্তু তার শরীর এখন জেদে হা'ড়ে'র মতো শক্ত। সে সংকীর্ণ পথ দিয়ে নিজেকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিল। তার পিঠের চামড়া সেই লোহার গ্রিলে ঘ'ষা লেগে ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলো, কিন্তু শরীরের সেই তী'ব্র য'ন্ত্রণা তার মস্তিষ্কের অ্যাড্রেনালিনকে আরও উসকে দিচ্ছে। নিচে পড়েই সে নিজেকে আবিষ্কার করল বিশাল মেকানিক্যাল জেনারেটর রুমে ।
সকালের কড়া রোদ জানালার শার্সি দিয়ে এসে লোহার মেশিনের ওপর পড়ছে। এখানে বিশাল বিশাল এসির কম্প্রেসর আর জেনারেটরের গগনবিদারী শব্দ হচ্ছে, যার ফলে ওপরের ডেইগোর চিৎকারের প্রতিধ্বনি এখানে পৌঁছাচ্ছে না।
রোজেলিয়া জানে, ডেইগোর লোকেরা এখন বাড়ির মূল ফটক আর বাগান ঘিরে ফেলবে। সে সরাসরি বাগান দিয়ে বের হওয়ার ঝুঁকি নিল না। সে জেনারেটর রুমের পেছনের দিক দিয়ে সেই সুড়ঙ্গপথ অনুসরণ করল, যা সরাসরি
আন্ডারগ্রাউন্ডের গ্যারেজে গিয়ে মিশেছে। এই পথে সাধারণত কেবল টেকনিশিয়ানরা যাতায়াত করে।কাল রাতে রোজেলিয়া বুদ্ধি করে উদযাপন করার কথা বলে ডেইগোকে এতো পরিমাণে ড্রিংক করিয়েছিল যে এসব তথ্য বের করতে তার একটুও কষ্ট হয়নি।
সে গ্যারেজে পৌঁছালো। তখনই সে দেখল সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে ডেইগোর কালো গাড়িগুলো। সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো সচল থাকলেও সেখানে ধুলো আর আবছা আলো। রোজেলিয়া তার লাল শাড়িটার আঁচল কোমরে শক্ত করে বাঁধল। সে গ্যারেজের এক কোণে রাখা আবর্জনার বড় ড্রামটি চাকার সাহায্যে ঠেলে পেছনের গেটের দিকে নিয়ে যেতে লাগল। এই গেটটি সাধারণ ময়লা পরিষ্কারের ট্রাকের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে খোলা হয় যা সে আগে একবার দেখেছিল।
হঠাৎ গেটের কাছে গার্ডদের বুটের শব্দ শোনা গেল। রোজেলিয়া এক মুহূর্ত দেরি না করে গ্যারেজের একটি পার্ক করা গাড়ির নিচে শুয়ে পড়ল। গাড়ির সাইলেন্সার পাইপের তপ্ত তাপে তার পিঠ পুড়ে যাচ্ছে, কিন্তু সে পাথর হয়ে পড়ে রইল। গার্ডরা ওপর তলায় ডেইগোর উ'ন্মা'দনা শুনে আ'ত'ঙ্কিত হয়ে ছু'টোছুটি করছে।
গ্যারেজের পেছনের দিক দিয়ে একটি সরু ড্রেনেজ লাইন বা নর্দমার প্যাসেজ চলে গেছে পাহাড়ের ঢাল বেজে। রোজেলিয়া সেই কর্দমাক্ত পথ দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে চলল। লাল শাড়িটা এখন কাদা আর ঘামে এক বীভৎস ন্যাকড়ায় পরিণত হয়েছে। প্রাচীরের শেষ প্রান্তে এক বিশাল ঝোপঝাড়ের আড়ালে সে পৌঁছাল। সেখানে একটি তারের জালি ছিল যা আগে থেকেই কিছুটা আলগা। সে তার সর্বশক্তি দিয়ে সেই জালিটি টেনে ফাঁ'ক করল এতে তার হাতেও অনেক ব্যথা পেল হাত একদম লাল হয়ে গেছে কিন্তু তার সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। সে সেই সংকীর্ণ পথ দিয়ে পার হয়ে গেল ।
অবশেষে সে বাড়ির সীমানা প্রাচীর পার হয়ে হাইওয়ের পাশের ঝোপঝাড়ে এসে পড়ল। সকালের রোদ এখন তার চোখে বিঁধছে। তার পায়ে জুতো নেই, পায়ের তলা ফে'টে র'ক্ত ঝরছে আর মুখে মেকআপের উপরে ধুলো আর কাদার প্রলেপ।
দূরে শোনা যাচ্ছে ডেইগোর সাইরেনের আওয়াজ। সে বুঝতে পারল ডেইগো তার ব্যক্তিগত হেলিকপ্টার বের করছে। রোজেলিয়া দৌড়াতে শুরু করল। বনের ভেতর দিয়ে সে হাইওয়ের দিকে এগিয়ে গেল। হঠাৎ সে দেখল রাস্তার মোড়ে একটি পুরনো লরি দাঁড়িয়ে আছে। লরির চালক পাশে বসে পানি খাচ্ছে।
রোজেলিয়া জানে না এই লরি তাকে কোথায় নিয়ে যাবে কিন্তু সে জানে ডেইগোর সেই সোনার খাঁচার চেয়ে এই অনিশ্চিত পথ অনেক বেশি নিরাপদ। সে লরির পেছনের ত্রিপলের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে ফেলল।
লরির ত্রিপলের নিচ থেকে উঁকি দিয়ে রোজেলিয়া যখন হাইওয়ের ধূসর পিচঢালা রাস্তার দিকে তাকাল, তখন তার মস্তিষ্ক এক তীক্ষ্ণ রণকৌশল সাজিয়ে নিল। সে জানত, ডেইগো তার গাড়িগুলো বের করলে মূল ফটক দিয়ে বের করবে, যেখানে কড়া পাহারা। এই বনের পাশের সরু হাইওয়েতে ডেইগোর লোক আসার সম্ভাবনা কম, কিন্তু একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
রাস্তার একপাশে কয়েকটা কালো গাড়ি সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। ইঞ্জিনগুলো চালু, এক ধরণের নিচু যান্ত্রিক গোঙানি ভেসে আসছে। রোজেলিয়া আড়ালে পাথরের মতো স্থির হয়ে রইল। তার হৃ'দপি'ণ্ড পাঁ'জ'রের হা'ড় চি'রে বে'রিয়ে আসতে চাইছে।
ঠিক তখনই পাহাড়ের ওপর থেকে ডেইগোর উন্মত্ত সাইরেন আর কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দ বাতাসের তরঙ্গে আছড়ে পড়ল। গার্ডরা হয়তো পাহাড়ের ঢালে তার পায়ের ছাপ খুঁজে পেয়েছে।
"ওরা আসছে!" রোজেলিয়ার র'ক্ত হিম হয়ে এল।
সে আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। জীবন আর মরণকে হাতের মুঠোয় নিয়ে সে লরি থেকে বিদ্যুৎবেগে দৌড়ে বের হলো। রাস্তার মাঝের গাড়িগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কাছের কালো এসইউভি গাড়িটার পেছনের দরজা এক ঝটকায় খুলে সে ভেতরে ঢুকে পড়ল। বাইরে তখন কু'কু'রের চি'ৎকার আরও কাছে এগিয়ে আসছে।
গাড়ির ভেতরে এসির প্রচণ্ড শীতলতা আর লেদারের সুবাস রোজেলিয়ার নাকে ঝাপটা দিল। সে হাঁপাচ্ছে, তার সারা শরীর কাদা আর র'ক্তে মাখামাখি। মাথা নিচু করে সে ফিসফিস করে নিজেকেই বলল,
"প্লিজ, স্টার্ট দাও... প্লিজ চলে যাও এখান থেকে!"
গাড়িটা এক চুলও নড়ল না। এক পৈ'শা'চিক নীরবতা গ্রাস করল ভেতরটা। রোজেলিয়ায় হঠাৎ করেই ভয় হতে লাগলো সে ধীরে ধীরে তার মাথা তুলল। ড্রাইভিং সিটের পাশের প্যাসেঞ্জার সিটে কেউ একজন বসে আছে। জানালার বাইরের সকালের তীব্র রোদ সেই লোকটার মুখের একপাশ আলোকিত করে রেখেছে।
রোজেলিয়ার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এল। সেই চওড়া কাঁধ, সাদা শার্টের হাতা গুটানো হাত, আর হ্যাজেল চোখ। লোকটা রোজেলিয়ার দিকে অবিশ্বাসী চোখে তাকিয়ে আছে।
"রিভেন..." রোজেলিয়ার কণ্ঠ দিয়ে কেবল এক অস্ফুট গোঙানি বেরিয়ে এল।
রিভেন আরওয়াইন স্তব্ধ হয়ে রোজেলিয়ার সেই বিধ্বস্ত রূপের দিকে তাকিয়ে রইল। তার লাল শাড়ি আজ ছিঁ'ড়ে ফালি ফালি, কপাল থেকে গড়িয়ে পড়া র'ক্ত গালে শুকিয়ে কালচে হয়ে গেছে।
To be continue,,,,,