#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins) #লেখনিতে_ফারিহা
পর্ব ৪৫
(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)
কালো এসইউভি গাড়িটা স্পেনের জনশূন্য হাইওয়ে চিরে বাতাসের বেগে ছুটে চলেছে। জানালার বাইরে ধূসর পাহাড় আর গাছপালাগুলো এক একটি ঝাপসা স্মৃতির মতো পেছনে মিলিয়ে যাচ্ছে। গাড়ির ভেতরে এসির হিমশীতল নীরবতা, যার মাঝে কেবল চাকার তীব্র ঘর্ষণ আর ইঞ্জিনের নিচু গর্জন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। বহুদূরে আকাশের কোণে ডেইগোর হেলিকপ্টারের শব্দটা একটু একটু শোনা যাচ্ছে, কিন্তু এই গাড়ির ভেতরটা যেন বাইরের সেই প্রলয় থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক শান্ত দ্বীপ।
রোজেলিয়ার মাথা রিভেনের চওড়া বুকের ওপর। তার র'ক্তমা'খা, ছিঁ'ড়ে যাওয়া লাল শাড়ির আঁচলটা রিভেনের ধবধবে সাদা শার্টের ওপর লেপ্টে আছে। রিভেন তাকে এক অবর্ণনীয় উ'ন্মাদ'নায়, প্রায় হা'ড় গুঁ'ড়ি'য়ে দেওয়ার মতো শক্তিতে নিজের দুই বাহুর মাঝে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। তার এক হাত রোজেলিয়ার ধুলোমাখা চুলের ভেতর, যেন সে নিশ্চিত হতে চাইছে এই ছোঁয়া বাস্তব। রিভেনের শরীরের প্রতিটি পেশি কাঁপছে। এতোদিনের সঞ্চিত হাহাকার, ক্রো'ধ আর হারানোর ভয় আজ এক তীব্র আলিঙ্গনে রূপ নিয়েছে।
রোজেলিয়া নিস্পন্দ, পাথরের মতো স্থির হয়ে আছে রিভেনের বুকে। তার চোখের কোণ বেয়ে টপ টপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে, যা রিভেনের শার্টের কাপড় ভিজিয়ে যেন চামড়ায় গিয়ে বিঁ'ধছে ত'প্ত সি'সার মতো। তার মস্তিষ্ক এখনো এক কুয়াশাচ্ছন্ন গোলকধাঁধা সে কিছুই মনে করতে পারছে না। এই চওড়া কাঁধ, এই সুতীব্র পুরুষালী ঘ্রাণ, কিংবা এই বুকের ধকধকানি তার স্মৃতির খাতার কোনো পাতাতেই এদের নাম লেখা নেই।
কিন্তু এক অদ্ভুত অলৌকিকতা তার শরীরের প্রতিটি কোষে খেলা করছে। রোজেলিয়া অবাক হয়ে ভাবছে, কেন তার একটুও অস্বস্তি হচ্ছে না? ডেইগো যখনই তাকে স্পর্শ করার চেষ্টা করতো, তার পুরো শরীর এক বিজাতীয় ঘৃণায় আর ভয়ে সংকুচিত হয়ে যেত। কিন্তু এই সম্পূর্ণ অচেনা, হ্যাজেল চোখের মানুষটার বুকের ভেতর সে এক আদিম, পরম নিরাপত্তা খুঁজে পাচ্ছে। তার হৃ'দপি'ণ্ড যেন পাঁজরের দেয়াল ভে'ঙে রিভেনের হৃদপিণ্ডের সাথে এক অদ্ভুত, উন্মত্ত ছন্দে নাচছে।
স্মৃ'তিশ'ক্তি হয়তো ডেইগোর রা'সায়'নিক বি'ষে মুছে গেছে, কিন্তু আত্মার ভেতরের সেই টানকে তো কোনো ড্রা'গ ছুঁতে পারেনি। ফ্র্যাঙ্ক মোরালেসের সেই কথাটি তার মগজের ভিতর বাজল “সে রিভেনের স্ত্রী।”
রোজেলিয়া চোখ বন্ধ করে রিভেনের বুকের উষ্ণতা অনুভব করার চেষ্টা করল। হ্যাঁ, এটাই তবে সত্য। এই মানুষটার বুকেই ছিল তার আদি বাসস্থান। একেই হয়তো সে তার জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসত, আর সেই ভালোবাসার টানেই আজ সে ন'রকে'র দ্বারপ্রান্ত থেকে এক ঝটকায় এই বুকে এসে আ'ছড়ে পড়েছে।
রিভেন রোজেলিয়ার কপালে তার ওষ্ঠাধর চেপে ধরল। তার ঠোঁটের কাঁপন আর বন্ধ চোখের পাতা বেয়ে নেমে আসা এক ফোঁটা অশ্রু রোজেলিয়ার গালে এসে মিশে গেল। তারা কোনো কথা বলল না। এই তীব্র গতিতে ছুটে চলা গাড়ির ভেতর, মাথার ওপর ঘুরতে থাকা মৃ'ত্যুর সা'ইরে'নের নিচে দাঁড়িয়ে, দুটি র'ক্তা'ক্ত আত্মা যেন এক দীর্ঘ নির্বাসন শেষে আবার একে অপরের মাঝে বিলীন হয়ে গেল।
_______________
ডেইগোর সাইরেনের আর্তনাদকে বহুদূরে ফেলে রিভেনের এই বিলাসবহুল বিমানটি এখন মেঘের বুক চিরে আকাশের নীল সীমানায় ডানা মেলেছে। রিভেন এক মুহূর্তের জন্যও স্পেনে থাকার ঝুঁকি নেয়নি। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে, স্পেনের মাটিতে মোরালেসদের শিকড় অনেক গভীরে, সেখানে রিভেনের কোনো নিজস্ব নেটওয়ার্ক বা কানেকশন নেই। শত্রুর ঘাঁটিতে থেকে যুদ্ধ জেতা যায় না, তাই তার প্রথম লক্ষ্যই ছিল তার রোজকে নিয়ে নিজের দেশে ফিরে যাওয়া।
"বাথরুমে স্ট্যান্ড-আপ শাওয়ারের ব্যবস্থা আছে রোজ। তুমি ওখানে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিতে পারো। তোমার জন্য নতুন পোশাকও রাখা আছে।"
রোজেলিয়া কোনো কথা বলল না। সে শুধু একবার তার ফ্যাকাশে মুখটা তুলে রিভেনের চোখ দুটোর দিকে তাকাল। সে আলতো করে মাথা নেড়ে বাথরুমের ভেতরে প্রবেশ করল এবং দরজাটি নিঃশব্দে আটকে দিল।
ভিতরে মেঝেতে এসে দাঁড়াতেই রোজেলিয়ার চোখ দুটো আবার জলে ভরে উঠল। সে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আয়নার কাঁচ একদম স্বচ্ছ। সে দেখল তার গায়ের সেই তথাকথিত বিয়ের লাল শাড়ি যা কাদা, গ্রিজ আর তার নিজের র'ক্তে মাখামাখি হয়ে এক বী'ভৎ'স রূপ নিয়েছে।
সে কাঁপতে কাঁপতে শাড়ির প্রতিটি ভাঁজ শ'রী'র থেকে খ'সিয়ে দিল। শাওয়ারের নিচে গিয়ে দাঁড়াতেই পানির ফোয়ারা তার মাথায় এসে আ'ছড়ে পড়ল। পানির প্রতিটি ফোঁটা যখন তার কপাল, গাল আর ঘাড় বেয়ে নামছিল, রোজেলিয়া তার চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে নিল। সে শাওয়ারের কাঁচের দেয়ালে কপাল ঠেকিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। সে কিছুই মনে করতে পারছে না, কিন্তু এই যে সে এখন ডেইগোর খাঁচা থেকে মুক্ত, এই যে সে এখন রিভেনের ডানার নিচে নিরাপদ এই অনুভূতিটাই তার অ'ব'শ হয়ে যাওয়া হৃ'দপিণ্ডে আবার প্রাণের স্পন্দন ফিরিয়ে দিচ্ছে।
বাথরুমের কাউন্টারে রাখা আছে এক জোড়া সুতি ও রেশমের মিশ্রণে তৈরি নরম, আরামদায়ক ডার্ক ব্লু রঙের পোশাক।কোনো জমকালো সাজ নেই। এটি কেবলই একজন ক্লান্ত মানুষের বিশ্রামের পোশাক।
বাইরে, জেটের ককপিটে বসে রিভেন তখন মেঘের ওপর দিয়ে আকাশপথের দিকে চেয়ে আছে। তার হাতের মুঠি এখনো শক্ত।রোজেলিয়াকে তার বুকের মাঝে ফিরে পাওয়ার পর রিভেনের ভেতরের সেই ঘুমন্ত সিংহ এখন পুরোপুরি জা'গ্রত।
রোজেলিয়া যখন বাথরুমের দরজাটা খুলে লাউঞ্জে পা বাড়াল, তখন মেঘের ওপর দিয়ে ছুটে চলা জেটের মৃদু কম্পন ছাড়া আর কোনো শব্দ ছিল না। তার গায়ের নেভি ব্লু পোশাকটির হাতা কিছুটা গোটানো।লোহার গ্রিলের আঁ'চ'ড় আর কপালে শুকিয়ে যাওয়া ক্ষ'তগুলো এখন আরও স্পষ্ট আরও কাঁচা দেখাচ্ছে।
রিভেন রোজেলিয়াকে বের হতে দেখেই সে এক পা এগিয়ে এসে ওখানেই স্থবির হয়ে গেল। তার চোখের সেই অপলক দৃষ্টি রোজেলিয়ার ফ্যাকাশে অবয়বের ওপর থমকে রইল। তার বুকটা এক তীব্র য'ন্ত্রণা'য় মু'চড়ে উঠল।
ধীর কিন্তু সুদৃঢ় পায়ে সে রোজেলিয়ার একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। তার উষ্ণ নিঃশ্বাস রোজেলিয়ার কপালে এসে লাগল। রিভেন খুব আলতো করে তার দু-হাত বাড়িয়ে রোজেলিয়ার ফ্যাকাশে মুখখানা নিজের হাতের মুঠোয় নিল, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে দামী আর ভঙ্গুর কোনো কাঁচের পুতুলকে সে ছুঁয়ে দেখছে। তারপর সে অত্যন্ত পরম মমতায়, এক পবিত্র প্রণতির মতো রোজেলিয়ার কপালের সেই র'ক্তা'ক্ত ক্ষ'তটার ওপর নিজের ওষ্ঠাধর চেপে ধরল।
"এখন একটু ভালো লাগছে ?"
রিভেনের কণ্ঠস্বর এক তীব্র অনুতাপে কাঁপছিল।
রোজেলিয়া আলতো করে মাথা নাড়ল। এই মানুষের স্পর্শে আছে এক অদ্ভুত আরোগ্যকারী টান। সে রিভেনের চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে চাইল। কিন্তু রিভেন তার ঠোঁটে একটা আঙুল রেখে আলতো করে তাকে থামিয়ে দিল।
"আমি সব জানি, রোজ। সব জানি,"
রিভেনের গলার স্বর বুজে এল।সে রোজেলিয়ার হাতটা নিজের হাতের ভেতর নিল। তার বুড়ো আঙুলটি দিয়ে সে রোজেলিয়ার হাতের তালু আর আঙুলের পিঠে খুব ধীরলয়ে ঘষতে লাগল। এই চেনা স্পর্শ যেন রোজেলিয়ার অ'ব'শ শিরা-উপশিরায় এক মৃদু কারেন্টের মতো অনুভূতি জাগিয়ে তুলছিল।
রিভেন জানালার ওপাশে অনন্ত মেঘমালার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলতে লাগল,
"ডেইগোর বাড়ির লোকেশন ট্র্যাক করা আমাদের জন্য এক প্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পুরো স্পেনের নেটওয়ার্ক মোরালেসদের হাতের মুঠোয়। তাই আজ সকালে আমি কোনো ঝুঁকি নেইনি। দুটো টিম ভাগ করে দিয়েছিলাম ।এক দল গেছে মূল ফটকের দিকে ডেইগোর গার্ডদের বিভ্রান্ত করতে, আর আমি অন্য টিম নিয়ে বনের ধারের হাইওয়েতে ওত পেতেছিলাম। কিন্তু... তোমাকে যে এইভাবে পেয়ে যাবো ভাবতেও পারিনি।"
বলতে বলতে রিভেন রোজেলিয়ার হাতটা টেনে নিয়ে নিজের ঠোঁটের কাছে ঠেকাল। তার বন্ধ চোখের পাতা ছুঁয়ে রোজেলিয়ার আঙুলের ডগায় এক ফোঁটা জল এসে লাগল। কিন্তু ঠিক তখনই রিভেনের কিছু একটা মনে পড়লো ।
রিভেনের চাউনিতে হঠাৎ এক তীব্র বি'ভ্রান্তি উঁকি দিল। সে যেন এক অপরাধীর মতো খুব ধীর গতিতে রোজেলিয়ার হাতটা নিজের মুঠো থেকে ছেড়ে দিয়ে এক পা পিছিয়ে গেল। তার চওড়া কাঁধটা কুঁকড়ে গেল এক অদ্ভুত হীনম্মন্যতায়।সে নিচু স্বরে বলল,
"আমাকে ঘৃণা করো, তা—"
"আমি সব জানি, রি-রিভেন..."
রোজেলিয়া রিভেনের কথাটি শেষ হতে দিল না। নামটা উচ্চারণ করতে গিয়ে তার ঠোঁট দুটো সামান্য কাঁপল, কিন্তু তার চোখে ছিল এক ধ্রুব স্থিরতা। সে রিভেনের আরও কাছে এগিয়ে এসে তার শার্টের হাতাটা খামচে ধরল।
"ডেইগো আমাকে মিথ্যে বলে ম্যানিপুলেট করেছিল। সে আমাকে ড্রা'গ দিয়ে বন্দি রেখেছিল। আমি... আমি ডেইগো আর ফ্র্যাঙ্কের সব কথা নিজের কানে শুনেছি।হয়তো সেদিন সবকিছু তাদের মুখ থেকে না শুনলে তোমাকে কখনো বিশ্বাস করতাম না ।আমি জানি আমার বাবা-মার খু'নি কে ।রিভেন"
রিভেন স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখ দুটোতে বিস্ময়ে আর অবিশ্বাস ফুটে উঠলো কিন্তু পরক্ষনেই সে সস্তির নিশ্বাস ফেললো। তার বুকের ভেতর থেকে এক বিশাল পাথরের ভার নেমে গেল।
কিন্তু সে লক্ষ্য করল, কথাগুলো বলতে গিয়ে রোজেলিয়ার কণ্ঠস্বর কতটা দুর্বল শোনাল। তার চোখের পাতাগুলো ক্লান্তিতে বুজে আসছে, শরীরের কাঁপুনি এখনো থামেনি। ধোঁয়া, কাদা আর তীব্র মানসিক ধ'কল তার শরীরটাকে ভেতরের দিক থেকে শু'ষে নিয়েছে।
রিভেন আর কোনো প্রশ্ন করল না। সে রোজেলিয়ার কাঁধে হাত রেখে পরম নির্ভরতায় তাকে আগলে ধরল।
"ভেতরের বেডরুমে গিয়ে বিশ্রাম নাও, রোজ। ক্লান্ত দেখাচ্ছে তোমায় "
রোজেলিয়া রিভেনের চোখের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে এক প্রশান্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভেতরের নরম বিছানার দিকে পা বাড়াল।
_____________
সুইমিং পুলের নীল জল এখন আর নীল নেই তা ধারণ করেছে এক গাঢ়, জমাটবদ্ধ কালচে র'ক্তি'ম আভা।পুলের ভেতর ডেইগোর পোষা বিশালাকার কুমিরটি এক ভয়ংকর হিং'স্র'তায় ছটফট করছে। তার ধা'রা'লো চোয়ালের নিচে পি'ষে যাচ্ছে মানুষের মাং'সের একেকটি টু'ক'রো।
পানির ওপর ভাসছে ডেইগোরই কয়েকজন বিশ্বস্ত গার্ডদের ক্ষ'তবি'ক্ষ'ত লা'শ যাদের অপরাধ ছিল, তারা রোজেলিয়াকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাইওয়ে পর্যন্ত পালিয়ে যাওয়া থেকে আটকাতে পারেনি। কুমিরটি যখনই পানির ওপর আ'ছ'ড়ে পড়ছে, র'ক্তে'র লা'ল ছ'টা এসে লাগছে পুলের ধবধবে সাদা মার্বেল পাথরের মেঝেতে। পুরো চত্বর থেকে ভেসে আসছে কাঁ'চা মাং'স আর র'ক্তে'র এক ব'মি উ'দ্বে'লিত ক'টু গন্ধ।
এদিকে ড্রয়িংরুমে চলছে আরেক অমানসিক তাণ্ডব।কাঁচের বিশাল স্লাইডিং ডোরের ওপাশে দাঁড়িয়ে ডেইগো মোরালেস এক উ'ন্মা'দ পশুর মতো গর্জে উঠছে। তার পরনের বরের স্যুট এখন ধুলো আর ঘামে লণ্ডভণ্ড। সে ড্রয়িংরুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তার বাবা ফ্র্যাঙ্ক মোরালেসের ওপর বার বার চড়াও হচ্ছে। তার চোখের মণি দুটো হিং'স্র'তায় লাল হয়ে গেছে,
"তুমি! তোমার জন্য আজ আমার ডল আমার হাতছাড়া হয়েছে!"
ডেইগো একটা ভারী ক্রিস্টালের ফুলদানি সজোরে ফ্র্যাঙ্কের পায়ের কাছে আ'ছ'ড়ে ফেলল। কাঁচের টু'ক'রোগুলো ছি'টকে গিয়ে ফ্র্যাঙ্কের দামি বুটে আ'ঘা'ত করল।
"সেদিন মাঝরাতে স্টাডি রুমে তুমি আমার মেজাজ চড়ে দেয়ার ফলেই এসব হয়েছে। আমি তোমাকে বারণ করেছিলাম না ড্যাড? আমার ডল সব জেনে যাবে। ও জেনে গেছে ও কার স্ত্রী ছিল। গড!"
ফ্র্যাঙ্ক সোফায় স্থির হয়ে বসে আছেন। তার মুখে এক অবর্ণনীয় ক্লান্তি আর হতাশা, কিন্তু ছেলের এই রুদ্ররূপে তার নিজের মেরুদণ্ডও আজ কাঁপছে। সে নিচু স্বরে বলল,
"ডেইগো, শান্ত হও। রিভেনের টিম পুরো হাইওয়ে ব্লক করে রেখেছিল। এটা আগে থেকেই প্ল্যান করা ছিল—"
"শাট আপ! জাস্ট শাট আপ!"
ডেইগো নিজের চুল টেনে ধরে ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পায়চারি করতে লাগল। তার গলার স্বর চিরে এক পৈ'শা'চিক চিৎকার বেরিয়ে এল।
"রিভেন আরওয়াইন আমার ডলকে ছুঁয়েছে? আমি সব পু'ড়ি'য়ে ছা'রখা'র করে দেব! আমি ওর বুক চি'রে ওর হৃ'দপি'ণ্ডটা খু'ব'লে বের করব!"
ড্রয়িংরুমের ঠিক এক কোণে, মেঝের ওপর অসহায়ভাবে গুটিসুটি মেরে বসে আছে নিনা। তার সাদা ইউনিফর্মের কলার টেনে ডেইগো তাকে একটু আগে দেওয়ালে আ'ছ'ড়ে ফেলেছিল। নিনার কপাল ফে'টে টপ টপ করে তা'জা র'ক্ত গড়িয়ে পড়ছে তার গালে। সেই র'ক্ত তার ঠোঁ'টের কোণ বেয়ে মেঝেতে ফোঁটায় ফোঁটায় জমছে। তার শরীরটা ভয়ের তীব্র কাঁপুনিতে যেন অ'ব'শ হয়ে গেছে।
ডেইগো নিনার দিকে ঘুরে এক পা বাড়াল। তার বুটের শব্দ শুনে নিনা দুই হাত দিয়ে নিজের মাথাটা চেপে ধরে দেওয়ালের সাথে আরও সেঁটে গেল।
"আর তুই—"
ডেইগো নিনার চুলের মুঠি ধরে এক ঝটকায় তার মুখটা ওপরে তুলল। নিনা যন্ত্রণায় অস্ফুট আ'র্ত'নাদ করে উঠল। ডেইগো তার ফ্যাকাশে ঠোঁটের খুব কাছে নিজের মুখ এনে হিসহিসিয়ে বলল,
"তুই তো ডাক্তার ছিলি, তাই না? ও যে ঔষধ খাচ্ছে না এটা তুই কেন বুঝতে পারিসনি? কেন আমাকে জানাসনি যে ওর ম'স্তি'ষ্ক আবার কাজ করা শুরু করেছে? বল !"
"বি-বিশ্বাস করুন স্যার... আমি... আমি বুঝতে পারিনি..."
নিনা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে তার সাত বছরের রিতার নিষ্পাপ মুখটা।
"রোজেলিয়া খুব স্বাভাবিক অভিনয় করছিল..."
ডেইগো নিনাকে মেঝেতে ছু'ড়ে ফে'লে দিয়ে নিজের পকেট থেকে ফোনটা বের করল। তার চোখে এখন এক ঠান্ডা, খু'নে চাউনি। সে ফোনের স্ক্রিনে হাত বোলাতে বোলাতে বলল,
"তোর মেয়ে রিতা... রিতা নাম না? ওর চুলগুলো বড্ড সুন্দর নিনা। ঠিক আমার ডলের মতো।আমার ডলকে যদি না পাই তবে কাল সকালে তোর মেয়ের একটা একটা করে আ'ঙু'ল আমি আমার পোষা কুমিরটার মুখে ছু'ড়ে দেব। জাস্ট ওয়ান বাই ওয়ান!"
নিনা এক তীব্র চিৎকারে ডেইগোর পা জড়িয়ে ধরল,
"না স্যার! প্লিজ আমার রিতাকে ছেড়ে দিন! আমি যা বলবেন করব, প্লিজ!"
নিনার তীব্র আর্তনাদকে ডেইগো উপেক্ষা করে তার মুখে তী'ব্র এক লা'থি দিয়ে তাকে সরিয়ে দিলো ।
"দূরে সর অপবিত্র নর্দমার কীট!"
নিনা ছিটকে গিয়ে মেঝের মার্বেলে আ'ছড়ে পড়ল, তার ঠোঁট আরেকটু ফে'টে র'ক্ত চুইয়ে পড়তে লাগল মেঝের ওপর। সে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেল, কিন্তু ডেইগোর সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে আবার ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বাঘের মতো পায়চারি করতে শুরু করল। তার চোখের মণি দুটো যেন কো'ট'র থেকে বে'রি'য়ে আসতে চাইছে।
হঠাৎ সে থমকে দাঁড়াল। তার নিজের বুকের ভেতর একটা সন্দেহ খা'ম'চে ধরল। সে দুই হাত দিয়ে নিজের চুলগুলো মুঠো করে ধরে টানতে টানতে বিড়বিড় করতে লাগল,
"কিন্তু... কিন্তু আমার ডল এই কাজ একা কী করে করল? হাউ? এত বুদ্ধি ওর মাথায় কোথা থেকে এল, গড! ও তো আমার সাজানো খাঁচায় এক অবুঝ পুতুল হয়ে ছিল! জেনারেটর রুমের শ'র্ট সা'র্কিট... ফা'য়ার অ্যা'লার্ম... লন্ড্রি অ্যাপ্রনের ছদ্মবেশ... এত নিখুঁত নিখুঁত প্ল্যান! না, আমার শান্ত, নিষ্পাপ ডল তো এত চালবাজি চেনে না! ওর পেছনে নিশ্চয়ই অন্য কেউ ছিল"
বলতে বলতে ডেইগোর গলার শি'রা'গুলো নীল হয়ে ফুলে উঠল। তার ভেতরের সাইকোপ্যাথিক উ'ন্মা'দনা এবার বাঁধ ভে'ঙে এক ভ'য়ং'কর বি'স্ফো'রণে রূপ নিল। সে ড্রয়িংরুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দুই হাত আকাশে ছুঁড়ে এক পৈশাচিক চিৎকারে ফেটে পড়ল,
"আমার ডলকে আমার চাই-ই চাই! ও আমার শুধুই আমার! ও আমার ক্যা'নভা'সের রঙ! ও অন্য কারোর বুকে মাথা রাখতে পারে না! আই উইল কি'ল এভরিওয়ান! আই জাস্ট ওয়ান্ট মাই ডল ব্যাক!"
তার সেই চিৎকারে ড্রয়িংরুমের বিশাল ক্রিস্টালের ঝাড়বাতিটা যেন মৃদু কেঁপে উঠল। নিনা মেঝের র'ক্তে নিজের মুখ লেপ্টে ভয়ে চোখ বন্ধ করে রইল।ডেইগো ঘুরে সোফায় বসে থাকা ফ্র্যাঙ্কের দিকে এগোল। সে তার বাবার সামনে গিয়ে দুই হাঁটু গেড়ে বসল, কিন্তু তার বসার মধ্যে কোনো বিনয় ছিল না ছিল এক অবাধ্য জেদ। সে ফ্র্যাঙ্কের দুই হাঁটু খা'ম'চে ধরে এক উ'ন্মাদ শিশুর মতো মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে চিৎকার করে বলতে লাগল,
"ড্যাড! ওকে আমার চাই, ড্যাড! তুমি তোমার সব কানেকশন ব্যবহার করো! আকাশ, বাতাস, সমুদ্র সব ওলটপালট করে দাও ড্যাড!আমি আমার ডলকে আরেকবার ও ওই ফা'কা'রের কাছে হারিয়েছি ।ড্যাড প্লিজ ।আমার ডলকে আমার কোলের মধ্যে এনে দাও! ও যদি আমার না হয়, তবে আমি সব ত'ছ'নছ করে দেব ড্যাড "
ডেইগোর চোখের সেই শূন্য, ফ্যাকাশে চাহনি আর ঠোঁটের কোণের লালা প্রমাণ করে দিচ্ছিল যে সে এখন বাস্তবের সমস্ত সীমানা পেরিয়ে এক চরম মা'ন'সিক বি'কৃ'তির অতল গহ্বরে তলিয়ে গেছে। ফ্র্যাঙ্ক মোরালেস তার নিজের ছেলের এই বী'ভৎস রূপ দেখে স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলেন।
_______________
কালো গাড়ির দীর্ঘ বহর যখন এসে বাড়ির সামনে থামল। আজ কয়েকমাস পর এই বাড়িতে প্রাণের স্পন্দন যেন ফিরে এসেছে। যেদিন রোজেলিয়া হারিয়ে গিয়েছিল, সেই দিনের পর থেকে রিভেন আর এক মুহূর্তের জন্যও এই বাড়ির চৌকাঠ মাড়ায়নি। সে তার অন্য এক বাড়িতে কাটিয়েছে এই বিভীষিকাময় মাসগুলো ।যেখানে দিন-রাত এক করে সে শুধু তার হারিয়ে যাওয়া রোজ পেটালকে খুঁজে বেড়ানোর ছক কষেছে। আজ, সে তার সেই হারিয়ে যাওয়া বসন্তকে আবার নিজের বুকে আগলে নিয়ে নিজের চেনা বাড়িতে ফিরে এসেছে।
বিমানের সেই বিলাসবহুল বিছানা থেকে শুরু করে ল্যান্ডিং, তারপর আবার গাড়ির লেদার সিট পুরো যাত্রাপথে রোজেলিয়া এক গভীর, অ'ব'শ ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল। ডেইগোর দেওয়া সি'ডেটি'ভের প্রভাব আর দীর্ঘদিনের মা'ন'সিক ক্লান্তিতে তার শরীর যেন এক অনন্ত বিশ্রামের খোঁজে তলিয়ে গিয়েছিল। বিমান যখন সীমানা ছুঁয়েছিল, রিভেন তখনো রোজেলিয়ার ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায়নি। অত্যন্ত সাবধানে, পরম মমতায় সে তার রোজ পেটালকে নিজের দুই বাহুর মাঝে তুলে নিয়ে গাড়ির সিটে বসিয়ে দিয়েছিল। পুরোটা পথ, একটিবারের জন্যও রিভেনের চোখের পলক পড়েনি। সে শুধু নিষ্পলক চোখে চেয়ে চেয়ে দেখেছে তার বুকের মাঝে শুয়ে থাকা সেই ফ্যাকাশে মুখখানিকে যেন কতদিনের এই মুখশ্রী দেখার তৃষ্ণা সে এই কয়েক ঘণ্টায় মিটিয়ে নিতে চাইছে।
রিভেন পরম নির্ভরতায় তার হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে হাটঁছে। রোজেলিয়া বিস্ময়ভরা চোখে চারদিক তাকাতে লাগল। ডেইগোর গথিক বাড়িটার কথা তার মনে পড়ল সেখানে আভিজাত্যের আড়ালে কেমন যেন একটা থমথমে, বৈরী আর দমবন্ধ করা পরিবেশ ছিল। প্রতিটি দেয়াল যেন ওত পেতে থাকত এক সাই'কো'প্যাথের বি'কৃ'ত লা'ল'সা নিয়ে। কিন্তু রিভেনের এই বাড়িটা কত সজীব, কত জীবন্ত। সকালের স্নিগ্ধ হাওয়া আর পাখির কুজন যেন
মেহেরিন কারুসো ছেলের দিকে আসলেন।
তিলমাত্র আভিজাত্য কমেনি তার অবয়বে সবসময় এক গম্ভীর, রাজকীয় গাম্ভীর্য আর আভিজাত্য ঘিরে রাখে তাকে। কিন্তু আজ, দরজার সামনে নিজের ছেলেকে অক্ষত দাঁড়িয়ে থাকতে তার সমস্ত আভিজাত্য উড়ে গেল। বিগত কয়েকমাস ধরে ছেলের চিন্তায় তাঁর রাতের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল। মেহেরিন দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে রিভেনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। কোনো কথা বের হলো না তাঁর মুখ থেকে শুধু এক মায়ের দীর্ঘশ্বাসে বাতাস ভারী হয়ে উঠল।
ছেলের বুক থেকে মাথা তুলে মেহেরিনের চোখ দুটো গিয়ে থমকে দাঁড়াল পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রোজেলিয়ার ওপর। রোজেলিয়ার কপালের কাঁচা ক্ষ'ত আর চোখের নিচের ক্লান্তির কালো ছায়া মেহেরিনের ভেতরের সমস্ত কঠোরতাকে এক নিমেষে গ'লিয়ে দিল।
তিনি এক অদ্ভুত, অপার্থিব মমতায় এক পা এগিয়ে এলেন। তাঁর কাঁপা কাঁপা হাতটি আলতো করে রোজেলিয়ার ধুলোমাখা, উসকোখুসকো মাথার চুলের ওপর বুলিয়ে দিলেন। তাঁর এই হাতের ছোঁয়ায় ছিল এক মায়ের বুকে আশ্রয় দেওয়ার ব্যাকুলতা।
মেহেরিন রোজেলিয়ার ফ্যাকাশে ঠোঁটের কোণের কাঁপুনি দেখে রিভেনের দিকে তাকালেন। তাঁর কণ্ঠস্বর গম্ভীর হলেও তাতে আজ এক পরম স্নেহের সুর মিশে ছিল। তিনি ফিসফিস করে বললেন,
"ঘরে যা তোরা। অনেক ধকল গেছে তোদের ওপর দিয়ে।"
রিভেন মাথা নেড়ে রোজেলিয়াকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরের তলায় চলে গেল। মেহেরিন কারুসো নিচে দাঁড়িয়ে তাদের প্রস্থান দেখছিলেন। রোজেলিয়ার ক্লান্ত, টালমাটাল পদক্ষেপ আর রিভেনের সেই আগলে রাখার তীব্র ব্যাকুলতা।সবই তাঁর চোখ এড়ায়নি।
মেহেরিন ঘুরে দাঁড়িয়ে মার্কোকে উদ্দেশ্য করে হাত ইশারায় ডাকলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর এখন বরফশীতল আর ভারী।
"মার্কো, আমার সাথে এসো।"
মার্কো কোনো কথা না বলে মেহেরিনের সেই আভিজাত্যপূর্ণ ছায়ার পিছু পিছু হেঁটে তাঁর ব্যক্তিগত স্টাডি রুমের দিকে এগিয়ে গেল।
To be continue,,,,,