#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins) #লেখনিতে_ফারিহা
পর্ব ৪৬
(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)
"বস, দুইটা ক'ফি'ন মেইন গেটের সামনে পাওয়া গেছে।"
রিভেনের হাতের কলমটা মাঝপথেই থেমে গেল। তার হ্যাজেল চোখ দুটো এক মুহূর্তের জন্য পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে গেল। সে অত্যন্ত নিচু স্বরে প্রশ্ন করল,
"কারা রেখে গেছে?"
গার্ড মাথা নিচু করে উত্তর দিল,
"এক লরি চালক এসে নামিয়ে দিয়ে গেছে। তাকে নাকি প্রচুর অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে এক ব্যক্তি এই ঠিকানায় পাঠিয়েছে। আমরা ড্রাইভওয়েতে সেগুলো চেক করেছি বস। কোনো বো'মা বা ট্র্যা'কা'র নেই। একদম পরিষ্কার।"
রিভেন এক মুহূর্ত ভাবল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
"ভেতরে নিয়ে এসো।"
কিছুক্ষণের মধ্যেই এনজো আর মার্কো ঘরে ঢুকল। তাদের পেছনে চারজন গার্ড দুটো ক'ফি'ন বয়ে এনে মেঝের ওপর রাখল। ক'ফি'ন দুটো দেখতে যেমন সাধারণ, তার ভেতর থেকে ভেসে আসা গন্ধটা ততটাই পৈ'শা'চিক। এক তীব্র প'চা লা'শে'র ক'টু গন্ধ আর প'চ'নশীল মাং'সের বি'কট ঘ্রাণ মুহূর্তেই সেই পরিপাটি অফিস ঘরটিতে ছড়িয়ে পড়লো ।
রিভেনের ইশারায় ক'ফি'নের ঢাকনাগুলো সরিয়ে ফেলা হলো। রিভেন, এনজো আর মার্কো তিনজনই স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।প্রথম ক'ফি'নের ভেতর এক নারীর ক্ষ'তবি'ক্ষত দে'হ। তার পরনের সাদা অ্যাপ্রন জানান দিচ্ছিল সে একজন চিকিৎসক। তার শরীরে পৈ'শা'চিক নি'র্যা'তনের চিহ্নগুলো এতটাই প্র'কট যে চেনা দায়। দ্বিতীয় ক'ফি'নটি আরও ছোট, আরও বী'ভৎস। সেখানে শুয়ে আছে একটি ছোট্ট ফুটফুটে মেয়ে, যার কোমল শ'রী'রে নীল ছো'পগুলো এক অকালপ্রলয়ের সাক্ষী দিচ্ছে।হাতের কয়েকটি আ'জ্ঞু'ল নে'ই।
রিভেন এক গভীর বিভ্রান্তির অতলে তলিয়ে গেল। সে চিনতে পারল না এই দুর্ভাগা নারী আর শিশুটি কে। কেন ডেইগো এগুলো এখানে পাঠাল? দরজাটা ধীর গতিতে খুলে গেল। রোজেলিয়া ভেতরে ঢুকল। তার চোখ দুটো ঘুমে আচ্ছন্ন, এলোমেলো চুলে তখনো স্বপ্নের রেশ লেগে আছে। কিন্তু ঘরে পা রাখামাত্রই সেই তীব্র প'চা গ'ন্ধ আর গার্ডদের গম্ভীর উপস্থিতি তাকে সজাগ করে তুলল। রিভেন চমকে উঠে তাকে আটকাতে চাইল, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
রোজেলিয়া ধীরে ধীরে ক'ফিন দুটোর দিকে এগিয়ে গেল। ড্রা'গে'র উচ্চমাত্রার কারণে তার ম'স্তিষ্ক এখনো ধীরগতিতে কাজ করে, চোখের সামনের দৃশ্যগুলো যেন এক কুয়াশাচ্ছন্ন বিভ্রম। সে এক পা, দু-পা করে ক'ফি'নগুলোর একদম কিনারে এসে দাঁড়াল।
বাতাসে ভাসা সেই বী'ভৎস প'চা গ'ন্ধ আর লা'শে'র বি'কৃ'ত দ'শা দেখে সে থমকে গেল। সে নিচু হয়ে মৃ'ত মহিলার সেই ক্ষ'তবি'ক্ষ'ত মুখের দিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ডের এক অসহ্য নীরবতা। তারপর হঠাৎ তার মস্তিষ্কের সেই অবরুদ্ধ স্মৃতি যেন ফে'টে পড়ল।
"নি-নিনা"
রোজেলিয়ার কণ্ঠ চিরে এক গগনবিদারী চি'ৎকার বেরিয়ে এল। সে কাঁপতে কাঁপতে মেঝের ওপর ধ'সে পড়ল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই মমতাময়ী মুখটা যে নিরুপায় হয়ে ডেইগোর দাসত্ব করেছিল শুধু তার সন্তানের জন্য। সে পাশের ক'ফি'নটির দিকে তাকাল। সেই ছোট্ট মেয়েটি নিশ্চয়ই নিনার প্রাণের স্পন্দন রিতা।
"রিতা! না! এটা হতে পারে না!"
রোজেলিয়া যন্ত্রণায় দুই হাতে নিজের মাথা চে'পে ধরল। তার বুকের ভেতর থেকে এক আদিম হা'হাকার বেরিয়ে এল। তার চোখের জল এখন আর নোনা জল নেই, তা যেন গ'লিত লা'ভার মতো তার গা'ল পু'ড়িয়ে দিচ্ছে। সে ডুকরে কেঁদে উঠল, তার সেই কান্নার শব্দে অফিসের প্রতিটি দেয়াল যেন আ'র্ত'নাদ করে উঠল। নিনা তাকে বাঁচাতে চেয়েছিল, তাকে মুক্ত করার জন্য নিজের জীবন বাজি রেখেছিল আর তার প্রতিদান হিসেবে ডেইগো এই পৈ'শা'চিক উপহার পাঠিয়েছে।
রিভেন আর এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসল। সে তার লোহা কঠিন দু-বাহু দিয়ে রোজেলিয়াকে নিজের বুকের ভেতর টেনে নিল। রোজেলিয়ার সারা শরীর তখন কম্পনে কাঁপছে, যেন কেউ তার আ'ত্মা'কে ছিঁ'ড়ে খুঁ'ড়ে খাচ্ছে। রিভেন তার এক হাত রোজেলিয়ার মাথায় চেপে ধরে তার চুলে নিজের ওষ্ঠাধর রাখল, তার পুরুষালী কণ্ঠস্বর এক গভীর আকুলতায় চিরে গেল,
"শান্ত হও রোজ, শান্ত হও... আমি আছি। তাকাও আমার দিকে"
কিন্তু রোজেলিয়া তখন বাস্তবের কোনো সীমানায় নেই। সে রিভেনের বুকের সেই সুদৃঢ় বেষ্টনী থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য এক অন্ধ উ'ন্মা'দনায় ছটফট করতে লাগল। তার অবিন্যস্ত চুলগুলো তার অশ্রুসিক্ত মুখের ওপর লেপ্টে গেছে। সে দুই হাতে রিভেনের শার্টের কলার খা'ম'চে ধরে সজোরে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল।
ক'ফি'নের তীব্র, দমবন্ধ করা প'চ'নশীল মাং'সের গ'ন্ধ তার নাসিকারন্ধ্রে বি'ষা'ক্ত বাষ্পের মতো বিঁধছিল। সে কফিনের ভেতরকার রিতার ছোট্ট দে'হটার দিকে চেয়ে ডুকরে উঠল।
"আমার জন্য... সব আমার জন্য হয়েছে, রিভেন!"
রোজেলিয়ার কণ্ঠস্বর এবার চি'রে গিয়ে এক অদ্ভুত কর্কশতায় রূপ নিল। দীর্ঘ চিৎকারে তার ফুসফুসের সমস্ত বাতাস যেন ফুরিয়ে আসছিল, তার কণ্ঠনালী অবরুদ্ধ হয়ে আসছিল যন্ত্রণায়।
"আমি কতটা স্বার্থপর! আমি কেবল নিজের কথা ভেবেছি, ওখান থেকে পালিয়ে এসেছি! কিন্তু আমি একবারও... একটিবারের জন্যও নিনার কথা ভাবিনি!"
সে নিজের বুকের ওপর দু-হাত দিয়ে আ'ঘা'ত করতে করতে উন্মত্তের মতো বলতে লাগল,
"নিনা আমাকে বলেছিল... ডেইগো ওর মেয়েকে জিম্মি করে রেখেছে। ও নিরুপায় ছিল রিভেন! তবুও... তবুও সে শেষ মুহূর্তে আমাকে বাঁচানোর জন্য ওই বি'ষা'ক্ত ওষুধের ডো'জ কমিয়ে দিয়েছিল। আর আমি? আমি শুধু নিজের প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এলাম! আমি নিনার ওই ছোট্ট কোল খালি করে দিলাম! আমি খু'নি, রিভেন! আমি ওদের মৃত্যুর জন্য দায়ী!"
বলতে বলতে রোজেলিয়ার চোখের কোণ দিয়ে তপ্ত অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়তে লাগল। তীব্র মা'ন'সিক অ'ভিঘা'তে আর কান্নার ক্লান্তিতে তার শরীরটা এবার ধীরে ধীরে অ'ব'শ হয়ে আসতে লাগল। তার মস্তিষ্কে ডেইগোর সেই উ'চ্চমা'ত্রার ড্রা'গে'র অবশিষ্টাংশ আর এই আকস্মিক ট্র'মা একসাথে থাবা বসিয়েছে। তার চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে এল, ঠোঁট দুটো কাপঁতে লাগলো।
সে আর চিৎকার করতে পারল না।তার মাথাটা যেন ঘুরছে শ'রী'রটা দূর্বল লাগছে মাথা ভার হয়ে গেছে । তার মাথাটা এক চরম ক্লান্তিতে, এক সীমাহীন অপরাধবোধের বোঝা নিয়ে রিভেনের চওড়া বুকের ওপর হেলে পড়ল। তার নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়া শরীরটা রিভেনের বাহুর মাঝে এক নির্জীব পুতুলের মতো ঝুলে রইল, শুধু তার চোখের কোণ থেকে তখনও ফোঁটায় ফোঁটায় অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে ।রোজেলিয়া অস্ফুটোভাবে বললো ,
"আমার..আমার খুব খারাপ লাগছে রিভেন ।নিজেকে কী করে ক্ষমা করবো ।ওদের মৃ'ত্যু'র জন্য আমি দায় শুধু আমি ।আমি খু'নি"
সে আবার ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো।রিভেন রোজেলিয়ার সেই নিস্পন্দ, অবশ প্রায় দেহটাকে নিজের ইস্পাতকঠিন বুকের মাঝে আরও তীব্র উন্মাদনায় জড়িয়ে ধরল। তার এক হাত রোজেলিয়ার পিঠের ওপর এক অবর্ণনীয় ব্যাকুলতায় সান্ত্বনার ছন্দে আবর্তিত হতে লাগল।
"নিজেকে দোষ দিও না, রোজ! খো'দার ক'সম, তুমি নিজেকে আর একটা বারও খু'নি বলবে না! যা হওয়ার তা হয়ে গেছে... এই ধ্বংসের খেলায় তোমার কোনো হাত ছিল না। তুমি কোনো পাপ করোনি। তুমি নিষ্পাপ... আমার রোজ পেটাল একদম নিষ্পাপ, সে কোনো খু'নি নয়!"
রিভেনের ভেতরের সেই চিরপরিচিত শীতল, নিষ্ঠুর আভিজাত্য আজ এক লহমায় চূ'র্ণ-বি'চূর্ণ হয়ে গেছে। সে এক চরম উ'ন্মা'দনায় রোজেলিয়ার ফ্যাকাশে, অশ্রুসিক্ত গাল দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তার চোখ দুটো আজ যেন এক অবাধ্য স্রোতে ভাসছে। সে কোনোকিছুর তোয়াক্কা না করে রোজেলিয়ার কপালে, গালে, বন্ধ চোখের পাতায় একের পর এক ওষ্ঠাধর চেপে ধরতে লাগল।
সে নিজের আঙুল দিয়ে পরম মমতায় রোজেলিয়ার চোখের জল মুছে দিল এবং আবার তাকে এক পরম আশ্রয়ের মতো নিজের বুকের অতল গহ্বরে টেনে নিল।হোম অফিসের ভেতর এক অভূতপূর্ব স্তব্ধতা নেমে এল।
ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা এনজো, মার্কো এবং বাকি সশস্ত্র দেহরক্ষীরা বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে চেয়ে রইল। তারা বছরের পর বছর ধরে এই মানুষটার অধীনে কাজ করছে। তারা চেনে সেই রিভেন আরওয়াইনকে যার একটা চোখের ইশারায় আন্ডারওয়ার্ল্ডের বড় বড় মাফিয়ারা কাঁপত, যার শিরায় র'ক্তে'র বদলে বইত বরফশীতল নিষ্ঠুরতা।
সেই পাথরের মতো কঠিন, অনুভূতিহীন বস আজ এক নারীর যন্ত্রণায় এভাবে ভে'ঙে চু'রমার হয়ে যাচ্ছে, এক সাধারণ প্রেমিকের মতো মেঝের ধুলোয় বসে তার প্রিয়তমকে সান্ত্বনা দিচ্ছে তার এই রূপ তারা কোনোদিন স্বপ্নেও কল্পনা করেনি। তাদের কাছে রিভেনের এই তীব্র আবেগ যেন এক অন্ধকার সৌন্দর্যের পরাকাষ্ঠা তৈরি করল।
ক'ফি'নের সেই দু'র্গন্ধ আর রোজেলিয়ার নিস্তেজ শরীরের ভার রিভেনের বুকে এক নতুন প্রতিজ্ঞার জন্ম দিল। সে রোজেলিয়াকে বাহুবন্দি করেই ধীর মাথায় চোখ তুলল মার্কো আর এনজোর দিকে।সে দাঁতে দাঁত চেপে অত্যন্ত নিচু, হিসহিসিয়ে ওঠা স্বরে হুকুম দিল,
"ক'ফি'ন দুটো সসম্মানে সরিয়ে নিয়ে যাও"
____________
আজ দুদিন হলো রোজেলিয়া এই বাড়িতে ফিরেছে। কিন্তু এই দুদিনের একটি মুহূর্তও শান্তিতে কাটেনি। ডেইগোর সেই কুৎসিত স্মৃতি আর আজ সকালের সেই বীভৎস ক'ফি'নের ট্র'মা রোজেলিয়ার মনস্তত্ত্বকে এক ছিন্নভিন্ন কাগজের মতো দু'মড়ে-মু'চড়ে দিয়েছে। সে এক তীব্র প্যারানয়ায় ভুগছে। আসার পর থেকেই সে কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না, চোখের পলক পড়লেই তার মনে হচ্ছে ডেইগোর গার্ডরা বা সেই পোষা হিং'স্র কুমিরটা তাকে গি'লে খে'তে আসছে। একা থাকার ভয়ে সে প্রতিনিয়ত কুঁকড়ে যাচ্ছে, সামান্য বুটের শব্দেও তার শরীর আ'তঙ্কে পাথর হয়ে উঠছে।আর আজ সকালের ঘটনার পর থেকে তার ভয় আরো বেড়ে গেছে।
রিভেনের পার্সোনাল ডক্টর একটু আগেই রোজেলিয়াকে ইনজেকশন দিয়ে কড়া চেক আপ শেষে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছেন। রোজেলিয়া এখন বিছানার সাদা চাদরের মাঝে এক অবশ কায়ার মতো ঘুমিয়ে আছে। বিগত দুদিন ধরে রিভেন এই বিছানার পাশ থেকে এক চুলও নড়েনি। তার চোখের নিচে হালকা কালচে কালির পুরু দাগ। টানা দুদিন তার চোখে এক ফোঁটা ঘুম নেই। একদিকে তার বুকের ভেতর ঘুমিয়ে থাকা এই মা'নসিকভাবে ক্ষ'তবি'ক্ষ'ত রোজ পেটালকে আগলে রাখার আদিম আকুলতা, অন্যদিকে ডেইগো মোরালেসের পরবর্তী চাল কী হতে পারে সেই চিন্তা। সে কোনো ঝুঁকি নেয়নি বাড়ির চারধারে সশস্ত্র গার্ডের সংখ্যা আজ দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ করে দিয়েছে।
রোজেলিয়ার এই ঘরোয়া চিকিৎসা এক নতুন যন্ত্রণার জন্ম দিয়েছে। ডেইগোর দেওয়া উ'চ্চমা'ত্রার ড্রা'গের বি'ষ শ'রী'র থেকে বের করার জন্য ডাক্তার যে কড়া অ্যান্টিডোট আর মানসিক প্রশান্তির ওষুধ দিচ্ছেন, তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় রোজেলিয়ার মাথা সারাক্ষণ এক অসহ্য য'ন্ত্র'ণায় ছিঁ'ড়ে যাচ্ছে। এক ঘোর-ঘোর ভাব, এক অদ্ভুত বিভ্রমের জগত তার মস্তিষ্ককে গ্রা'স করে রেখেছে যা কিছুতেই কমছে না। প্রথমে তো রোজেলিয়া এই ওষুধের ঘোরে তীব্র চিৎ'কার করে বাড়ি মাথায় তুলেছিল। সে উ'ন্মাদি'নীর মতো রিভেনকে বলছিলো যে এই ডাক্তারও হয়তো ডেইগোর লোক হয়তো তাকে ঔষধের নাম করে বি'ষ দিচ্ছে ।
ডাক্তার তখন অনেক কষ্ট করে রোজেলিয়াকে বুঝিয়েছিলেন যে, এই তী'ব্র মা'নসিক ও স্নায়ুবিক ওষুধের এমন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হওয়াই স্বাভাবিক। রিভেনের সেই আকুল আর্তি আর বিশ্বাসের ছোঁয়ায় অবশেষে রোজেলিয়া শান্ত হয়েছে।
এখন রোজেলিয়ার পাশে আভা বসে আছে ।
সারাক্ষণ তার পাশে কখনো রিভেন কখনো আভা আবার মেহেরিন ও এসে মাঝে মাঝে দেখে যান ।প্রথমে রোজেলিয়া আভাকেও ডেইগোর কোনো চর ভেবে তীব্র অনীহা আর ভয় দেখিয়েছিল, তার আনা পানির গ্লা'স ছুঁ'ড়ে ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু পরে রিভেন যখন রোজেলিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে আভার বিশ্বস্ততার কথা,আর তার সাথে আভার আগের সম্পর্কের কথা খুলে বলেছিল, তখন রোজেলিয়ার চোখের ভয়টা কিছুটা কমেছিল। এখন আভার প্রতি তার এক ধরণের অবুঝ নির্ভরতা তৈরি হয়েছে।
আভা রোজেলিয়াকে মাঝে মধ্যেই অতীতের কিছু কথা মনে করিয়ে দেয় ।ডাক্তার বলেছে তার স্মৃতি পুরোপুরি ফিরবে না কারণ রোজেলিয়ার মস্তিষ্কের অনেক নি'উ'রনের বিশেষ ক্ষ'তি হয়েছে কিন্তু আগের কয়েকটা জিনিস সে মনে করতে পারবে ।
_______________
এরিকার ফাইনাল এক্সাম শেষ হয়েছে মাত্র কদিন হলো। সারাটা দিন তার এখন কাটে ঘরের চার দেওয়ালে বইয়ের পাতা আর আলসেমির মাঝে। এনজোর সমস্ত দুর্বলতা এই একটিমাত্র বোনকে ঘিরে। কিন্তু সে ইতালিতে ফিরলেও এরিকাকে একটুও সময় দিতে পারেনি। আজ অনেকদিন পর এনজো একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরেছে। তার পরনের কালো ওভারকোটটা সোফায় ছুঁড়ে ফেললো।
সাধারণত এনজো বাড়ি ফেরার আগেই এরিকা টুকটাক রান্নাবান্না গুছিয়ে রাখে। কিন্তু আজ এনজো রান্নাঘরে ঢুকে দেখল পুরো সিংকিং এরিয়া একদম ফাঁকা। এরিকা তখনো লিভিং রুমের কার্পেটে বসে কানে হেডফোন গুঁজে গান শুনছে আর ম্যাথ করছে ।সে সারাক্ষণই পড়াশোনায় মগ্ন থাকে ।পড়ার প্রতি মেয়েটার এতো টান।
এনজোর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে তার হাত দুটোকে ধুয়ে পরম সুখে আপন মনে রান্না করতে লেগে গেল। বোনকে চমকে দেওয়ার জন্য সে তার প্রিয় সিফুড বয়েল, রামেন আর ক্রিস্পি গার্লিক পাস্তা রাঁধতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মাঝেই চিংড়ি, কাঁকড়া আর মাখনের সেই মন মাতানো সুবাস পুরো ডাইনিং স্পেসকে এক উৎসবের আমেজে ভরিয়ে তুলল।
টেবিলের ওপর ধোঁয়া ওঠা খাবারগুলো সাজিয়ে এনজো হাক ছাড়ল,
"এই যে আমাদের বাড়ির অলস রানী! চোখ দুটো বই থেকে সরিয়ে এদিকে আন"
এরিকা রান্নাঘরে ঢুকেই টেবিলে তার প্রিয় খাবারগুলো দেখে খুশিতে চিৎকার করে উঠল। দুই ভাই-বোন মিলে আজ অনেকদিন পর এক টেবিলে হাসিমুখে খেতে বসল। মসলাদার সিফুডের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে এনজো এরিকার দিকে তাকাল। তার চোখে তখন এক চিলতে ভাই সুলভ উদ্বেগ।খেতে খেতেই এনজো প্রসঙ্গটা তুলল,
" অনেক তো হলো এরিকা।তোর পরীক্ষাও শেষ ভার্সিটি ইতালিতে ভর্তি না হয়ে কানাডায় যা। এবার আমার কথাটা শোন। ওখানে তোর হায়ার স্টাডিজের সব ব্যবস্থা আমি করে রেখেছি। আর... সেখানে তোর জন্য একটা বিশেষ সারপ্রাইজও অপেক্ষা করছে।"
এরিকা রামেনের বাটি থেকে মুখ তুলে এক চোখ সরু করে তাকাল,
"সারপ্রাইজ? কী সারপ্রাইজ? তুমি যাচ্ছো আমার সাথে?"
এনজো এবার একটু ঢং করার সুযোগ হাতছাড়া করল না। সে টেবিল থেকে একটা আস্ত কাঁকড়ার পা তুলে নিয়ে সেটাকে মাইকের মতো নিজের মুখের সামনে ধরল। তারপর একদম কোনো বড় প্রেস কনফারেন্সের মতো গম্ভীর গলায় ইতালিয়ান টোনে বলল,
"লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান! ব্রেকিং নিউজ! মিস এরিকা যদি আগামী মাসের মধ্যে কানাডার ফ্লাইটে পা না রাখেন, তবে তিনি তার জীবনের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে আকর্ষণীয় আর সবচেয়ে রোমাঞ্চকর সারপ্রাইজটি চিরতরে মিস করতে চলেছেন! এই অফার সীমিত সময়ের জন্য!"
এনজোর এই রসিকতা দেখে এরিকা আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে পাস্তার বাটিটা এনজোর দিকে এগিয়ে দিয়ে হাসতে হাসতে বলল,
"আহা রে আমার রিপোর্টার ভাই! কাঁকড়ার পা দিয়ে ইন্টারভিউ নেওয়া বন্ধ করো তো!"
কিন্তু হাসির শেষ রেশটুকু মুছে যেতেই এরিকার চোখে এক গভীর একাকীত্ব আর মায়া দানা বেঁধে উঠল। সে চামচটা প্লেটে রেখে এনজোর হাতটা ছুঁল।
" তুমি ছাড়া আমার আর কে আছে ভাইয়া? তুমি ছাড়া আমার দুনিয়াটাই তো ফাঁকা।আমার ডিসিশন সবসময়ই একই আমি তোমাকে এখানে রেখে কোথাও যাচ্ছি না"
এনজো এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। সে এরিকার মাথায় আলতো করে একটা টোকা দিয়ে বলল,
"আরে পা'গ'লী,কানাডায় তুই একা কিভাবে কতো কতো নতুন নতুন বান্ধবী বানাবি তুই? কানাডায় গেলে তুই প্রতিদিন আমার অ্যাকাউন্ট থেকে যত খুশি শপিং করতে পারবি। কোনো লিমিট থাকবে না। ভাবতো একবার ব্ল্যাক ফ্রাইডে সেলে তুই একাই পুরো মল কিনে নিচ্ছিস, আর বিল দিচ্ছে এই এনজো!"
এরিকা নাক কুঁচকে বলল,
"ওহ! তাই নাকি?But i am not interested ।আচ্ছা এখন বলো সারপ্রাইজটা কী?"
এনজো চোখ টিপে বলল,
"সেটা তো ওখানেই গিয়ে দেখবি। তবে হ্যাঁ, সেখানে গেলে তুই বড় বড় চকোলেট ফ্যাক্টরি আর স্নো-বোর্ডিংয়ের লাইসেন্সও পেয়ে যেতে পারিস।"
"থাক, তোমার চকোলেটের লোভ আমাকে দেখাতে হবে না। তুমি নিজে রান্না করেছো এটাই আমার জন্য সবচেয়ে বড় সারপ্রাইজ,"
এরিকা আবার একটা চিংড়ি মুখে পুরে তৃপ্তির হাসি হাসল।এনজোর ফোনটা এবার রিং হলো
সে ভ্রু কুঁচকে প্যান্টের পকেট থেকে ফোনটা বের করল। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে ইতালিরই একটা লোকাল ল্যান্ডলাইন নম্বর। সে এরিকাকে ইশারায় চুপ করতে বলে ফোনটা কানে তুলল।
"হ্যালো?"
ওপাশ থেকে এক প্রবীণ, কাঁপতে থাকা কণ্ঠস্বর ভেসে এল। গলাটা এনজোর খুব চেনা তাদের পৈত্রিক বাগানের বুড়ো কেয়ারটেকার আন্তোনিও।সে ইতালিয়ান ভাষায় বলতে লাগলো।
"এ-এনজো?... তুমি কি ইতালিতে আছো?"
আন্তোনিও প্রায় ফিসফিস করে কাঁদছে, তার চারপাশে কেমন যেন এক থমথমে নীরবতা।
"তোমার বাবার ঘরটা... আজ দুপুরে একদল লোক এসে পুরো ঘর ভা'ঙচু'র করেছে। তারা সব উলটপালট করে দিয়েছে । তুমি জলদি একটু ভিল্টোরে গ্রামে এসো... আমার বড্ড ভয় করছে।"
এনজোর হাতের মুঠিটা মুহূর্তের মধ্যে পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। তার শিরায় শিরায় ক্রো'ধে'র এক তপ্ত লা'ভা ছুটে গেল।
"আমি আসছি আন্তোনিও। তুমি ওখানেই থাকো,"
এনজো দাঁতে দাঁত চেপে ফোনটা কে'টে দিল।
সে সোফা থেকে তার কালো ওভারকোটটা তুলে নিতে নিতে এরিকার দিকে তাকাল। এরিকার মুখের সেই নিষ্পাপ হাসি ততক্ষণে মিলিয়ে গেছে তার চোখে এক অজানা আশঙ্কা।
"কী হয়েছে ভাইয়া? কার ফোন?"
এরিকা টেবিল থেকে উঠে দাঁড়াল।
"কিছু না রে। ভিল্টোরে গ্রামের আমাদের পুরনো বাড়িটার কেয়ারটেকার আন্তোনিও ফোন করেছিল। কিছু একটা ঝামেলা হয়েছে, আমাকে এখনই একবার যেতে হবে,"
এনজো তার কোটের ভেতরের পকেটে সাইলেন্সার লাগানো পি'স্ত'লটা চেক করে নিতে নিতে বলল।
"কিন্তু ভাইয়া... এই রাতে? বাইরে কুয়াশা বাড়ছে,"
"আমি খুব দ্রুত ফিরব, এরিকা। তুই দরজাটা ভালো করে লক করে ভেতরে থাক। আর কোনো অপরিচিত মানুষের জন্য দরজা খুলবি না,"
এনজো এরিকার কপালে একটা আলতো চু'মু খেয়ে আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
বাইরে ইতালির রাতের হিমশীতল হাওয়া আর পাহাড়ি কুয়াশা তখন পুরো হাইওয়েকে গ্রা'স করে নিয়েছে। এনজো তার স্পোর্টস কারটা স্টার্ট দিয়ে তীব্র গতিতে ভিল্টোরে গ্রামের সেই নির্জন, অন্ধকার আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তার দিকে ছুটে চলল।
_______________
ঘড়ির কাঁটায় সকাল ৬টা। বাইরের কুয়াশাচ্ছন্ন বাগানে পাখিদের জাগরণ ঘটলেও বাড়ির ভেতর তখনো এক থমথমে নীরবতা। রোজেলিয়ার য'ন্ত্র'ণাকা'তর শ'রী'রটাকে নিজের বুকের মাঝে আগলে রেখে রিভেনের চোখ দুটো ঘন্টাখানেক হলো একটু বুজে এসেছিল ।বিগত দুদিনের মাঝে এই প্রথম কয়েক ঘন্টার এক প্রশান্তি।ঠিক তখনই দরজায় এক তীব্র, অবিরাম করাঘাত।
সেই শব্দে রিভেনের তন্দ্রা এক ঝটকায় ভেঙে গেল। তার চোখ দুটো মুহূর্তের মধ্যে হিং'স্র বা'ঘের মতো জ্ব'লে উঠল। সে অত্যন্ত সাবধানে যেন রোজেলিয়ার ঘুমে বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত না ঘটে, তার কোমর থেকে নিজের হাতটি সরিয়ে নিল। বিছানা থেকে উঠে রোজেলিয়ার গায়ের চাদরটা আলতো করে টেনে দিয়ে সে দ্রুত পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। রিভেনের পুরো অবয়বে তখন চরম বি'র'ক্তি আর সুপ্ত ক্রো'ধের কালো ছায়া।
সে এক ঝটকায় দরজাটি খুলে সামনে দাঁড়াল। সামনে দাঁড়িয়ে মার্কো। রিভেনের সেই খু'নে চাউনি দেখে মার্কো এক কদম পিছিয়ে গেল, তার কপাল বেয়ে এক ফোঁ'টা ঘাম নেমে এল। সে শুকনো ঢোক গিলে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল।
"কী হয়েছে মার্কো? এই ভোরে কোন য'মদূ'ত এসেছে যে তোমাকে আমার দরজায় ধাক্কা দিতে হলো?"
মার্কো একটু তোতলামো করে নিজের জ্যাকেটের কলারটা ঠিক করল,
"বস... আসলে... আমি... আমি একটু ক্লাবে গিয়েছিলাম।"
রিভেনের চোখ দুটো এবার আরও ছোট হয়ে এল। ডেইগো মোরালেসের মতো এক সা'ইকো'প্যাথ যখন মাথার ওপর চক্কর কাটছে, তখন তার গার্ড ক্লাবে গিয়ে আমোদ প্রমোদ করছে! রিভেনের ভেতরের র'ক্ত তখন ট'গবগ করে ফু'টছে।
মার্কো বেগতিক দেখে দ্রুত হাত নেড়ে বলল, "ইয়ে মানে বস... অনেকদিন পর একটু পা বাড়িয়েছিলাম। মাঝে মাঝে মেন্টালি একটু রিলিজ দরকার হয়, আপনি তো জানেনই আন্ডারওয়ার্ল্ডের যা প্রেসার..."
"মার্কো!"
রিভেনের গলার নিচু স্বরটাই এক একটা বুলেটের মতো শোনাল।
"বস,খোদার কসম! আমি এক ফোঁ'টা ম'দও খাইনি আজ, পুরা সোবার ছিলাম!"
মার্কো পকেট থেকে একটা মেটালিক পেনড্রাইভ বের করে রিভেনের চোখের সামনে ধরল।
"আমি যখন ক্লাবের ভিআইপি জোনে বসা, তখন ড্যান্স স্টেজ থেকে একটা মেয়ে হন্তদন্ত হয়ে আমার কাছে আসে। সে বলল, এক অচেনা লোক তাকে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে এই পেনড্রাইভটা আমার হাতে পৌঁছে দিতে বলেছে। ওটা পাওয়া মাত্রই আমি সোজা এখানে ছুটে এসেছি।"
রিভেন এক মুহূর্তের জন্য পেনড্রাইভটার দিকে তাকাল। তার ভেতরের শি'কা'রী মন বলে উঠল শয়তানটা তার নতুন চাল চেলেছে। সে এক ঝটকায় মার্কোর হাত থেকে পেনড্রাইভটা ছিনিয়ে নিয়ে বলল,
"নিচে এসো।"
তারা দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচের প্রকাণ্ড ড্রয়িংরুমে নেমে এল। ততক্ষণে সেখানে সাইলাসও এসে হাজির হয়েছে। এনজো অনুপস্থিত। সাইলাস জানাল, সে এনজোকে কয়েকবার ফোন করেছে, কিন্তু সে ফোন ধরছে না হয়তো ঘুমে। লরেঞ্জোও ঘরের এক কোণে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে রইল।
ড্রয়িংরুমের বিশাল ৮০ ইঞ্চির ফোর-কে স্ক্রিনের নিচে থাকা কনসোলে পেনড্রাইভটি প্লাগ-ইন করা হলো। মার্কো আর সাইলাস দ্রুত রিমোট আর কিবোর্ড নিয়ে একের পর এক ফাইল ওপেন করতে লাগল। কিন্তু প্রথম তিন-চারটি ফোল্ডারে ক্লিক করতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল,Empty Folder.
রিভেন একটা সোফার হাতলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
"ডেইগো মোরালেস হয়তো আমাদের সাথে কোনো সস্তা খেলা খেলছে। আমাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা।"
মার্কো আর সাইলাসও হতাশ হয়ে মাথা নাড়ল। কিন্তু দমে না গিয়ে সাইলাস একদম শেষপ্রান্তে থাকা একটা নামহীন ফাইলে ক্লিক করল। সেখানে কোনো ভিডিও বা ছবি ছিল না, কেবল একটা অদ্ভুত এনক্রিপ্টেড ওয়েব লিংক লেখা ছিল। মার্কো আর সাইলাস একে অপরের দিকে তাকালো। তারপর সাইলাস লিংকে ক্লিক করতেই স্ক্রিনটা কালো হয়ে গেল এবং একটা লাইভ ভিডিও স্ট্রিমিং অন হলো।
প্রথম কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনটা একদম হিজি-বিজি হয়ে রইল, বিকট একটা স্ট্যাটিক শব্দে ড্রয়িংরুমের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল। তারপর হঠাৎ করেই লেন্সের ফোকাসটা একদম ক্লিয়ার হয়ে গেল।
পর্দার ওপর ভেসে উঠল এক বীভৎস অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে ঘর। ঘরের ছাদ থেকে একটা মাত্র হলুদ আলো এসে পড়েছে মাঝখানে রাখা চেয়ারের ওপর। আর সেই চেয়ারে দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা রয়েছে এক র'ক্তা'ক্ত মানুষের কায়া। ক্যামেরাটা একদম তার মুখের সামনে স্থির করকিন্তু তারপরও কিছু স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে না ।সাইলাসসহ সবাই একটু বিভ্রান্তির মাঝে পড়ে গেল ।ডেইগো কাকে এভাবে বেঁধে রেখেছে।
হঠাৎ করেই স্ক্রিনের বাইরে থেকে একটা লোহার র'ড এসে সজোরে সেই লোকটার পেটের ভেতর আ'ঘা'ত করল।
“আহহহ... উফফ...”
লোহার আ'ঘা'তে লোকটার বুক চিরে এক সুগভীর, য'ন্ত্র'ণাদার্থ গো'ঙা'নি প্রতিধ্বনিত হলো স্পিকারের মাধ্যমে। সেই গোঙানির মৃদু সুরটা শোনা মাএই মার্কোর শ'রী'রটা বরফ হয়ে গেল। তার চেনা এই গোঙানির টোনটা ! সে এক লাফে স্ক্রিনের আরও কাছে এগিয়ে গেল।
"সাইলাস... এই আওয়াজটা... এটা কি এনজোর মতো লাগছে না?"
মার্কোর গলার স্বর ভয়ে কাঁপছে।তারা সবাই এবার তীব্র আশঙ্কায় স্ক্রিনের দিকে চাতকের মতো চেয়ে রইল। ক্যামেরাটা লোকটার মুখের আরও কাছে গেল। লোকটার মাথাটা বুকের ওপর ঝুঁকে ছিল, সারা মুখ র'ক্তে ল'ণ্ডভ'ণ্ড, ঠোঁটের কোণ ফে'টে র'ক্ত পড়ছে। কিন্তু তার সেই চওড়া চোয়াল আর কপালটা স্পষ্ট হয়ে উঠতেই সাইলাসসহ সবাই ধমকে গেল।
"ওহ গড... এটা তো এনজো!"
সাইলাস চিৎকার করে উঠল।
"আমি ওকে কাল রাত থেকে কল করছি বস! ও পৈত্রিক ভিলায় গিয়েছিল... ও ডেইগোর হাতে ধ'রা পড়েছে!"
সাইলাস যখন কাঁপতে কাঁপতে এনজোর ইতালির হোমে আবার কল দেওয়ার জন্য ফোনটা হাতে নিল, আর রিভেন স্ক্রিনের সামনে এগিয়ে এলো তার চোখগুলো লাল হয়ে উঠছে । তখনই স্ক্রিনের ওপাশে ক্যামেরাটা ঘুরে এক পৈ'শা'চিক অবয়বের দিকে তাক হলো। লোকটার মুখটা ছায়ার আড়ালে থাকলেও তার সেই ক্রুর, বিকৃ'ত হাসি আর চোখের ভেতরের সাইকোপ্যাথিক উ'ন্মা'দনা চিনতে রিভেনের এক সেকেন্ডও লাগল না। ডেইগো মোরালেস।
"দেখ তো রিভেন মা'দারফা'কার কারুসো! এই কু'ত্তা'টাকে চিনিস নাকি?"
ডেইগো ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে এক পৈ'শাচিক অট্টহাসিতে ফে'টে পড়ল। সে এক পা পিছিয়ে গিয়ে এনজোর ঝুলন্ত চুলগুলো মুঠো করে ধরল।
"দেখ! তোর ডান হাতকে আমি কীভাবে কে'টে নিজের খাঁচায় নিয়ে এসেছি"
ডেইগোর কণ্ঠস্বরে তখন এক আদিম, নরকীয় উল্লাস। সে ক্যামেরার লেন্সের ওপর আঙুল ঠেকিয়ে এক উ'ন্মা'দের মতো স্ক্রিনের এপাশে থাকা রিভেনকে যেন ছুঁ'তে চাইল।
"জানিস রিভেন? একে আমি গত এক ঘণ্টা ধরে মন ভরে ট'র্চার করেছি। ওর ন'খগুলো উ'প'ড়ে ফে'লেছি, ওর পেটে লোহার রড দিয়ে আ'ঘা'ত করেছি... তবুও আমার মন ভরছে না রে! আমার ভেতরের আ'গু'ন শান্ত হচ্ছে না!"
ডেইগো হঠাৎ এক ঝটকায় ক্যামেরার দিকে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলল, কিন্তু তার সেই ফিসফিসানি ড্রয়িংরুমের স্পিকারে বজ্রপাতের মতো বাজল,
"শোন! আমার ডলকে আমার বুকে ফিরিয়ে দে! আমার ক্যানভাসের রঙ আমাকে ফেরত দিয়ে দে, আমি তোর এই কু'ত্তা'টাকে জ্যা'ন্ত ছেড়ে দেব। কাল তো অলরেডি দুটো ম'রা লা'শে'র সুন্দর উপহার পাঠিয়েছিলাম তোর ঠিকানায়, নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছিস ডেইগো মোরালেস কতটা সিরিয়াস? সো... তোর কাছে আজ রাত পর্যন্ত সময় আছে। আমার পুতুল আমার বিছানায় আসবে, আর তোর এই ডান হাত তোর পায়ে গিয়ে পড়বে।"
কথাটা শেষ করেই ডেইগো এক চরম আ'ক্রো'শে এনজোর র'ক্তা'ক্ত চুলগুলো পেছন দিকে টেনে ধরল। এনজোর ক্ষ'তবি'ক্ষ'ত মাথাটা পেছনের দিকে হেলে গেল, তার বন্ধ চোখের পাতা বেয়ে র'ক্তে'র অ'শ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে এক অন্তিম যন্ত্রণায় কোনোরকম আ'র্তনা'দ করে উঠল,
“বস... আ-আসবেন না... এটা ফাঁ...”
ডেইগো তার মুখের ওপর সজোরে এক লা'থি মেরে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে পৈ'শা'চিক ভঙ্গিতে হাসতে হাসতে লাইভ স্ট্রিমিংটা কাট করে দিল। স্ক্রিনটা আবার এক ঝটকায় অন্ধকার হয়ে গেল।
ড্রয়িংরুমের ভেতর তখন কেবল ভোরের সেই ম্লান আলো আর চার জোড়া চোখের ভেতরের এক বি'ধ্বং'সী ম'হাশ্ম'শানের আগুন। রিভেনের হাতের মুঠিটা এতটাই শক্ত হয়ে উঠেছিল যে তার আঙুলের হা'ড়'গুলো ম'টমট করে শব্দ করে উঠল।
To be continue,,,,,