#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins) #লেখনিতে_ফারিহা
পর্ব ৪৮
(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)
ইতালির সেই নিরিবিলি ভিলার মাটির নিচে যে এমন এক সুগভীর, অভেদ্য বাঙ্কার লুকিয়ে আছে, তা বাইরের কেউ কোনোদিন কল্পনাও করতে পারবে না। আন্ডারগ্রাউন্ডের এই সারভাইভাল সিস্টেমটা একদম স্টেট অফ দ্য আর্ট প্রযুক্তিতে তৈরি। ভারী ইস্পাতের তৈরি ব্লাস্ট ডোর, যা যেকোনো আধুনিক বো'মা'র আ'ঘা'ত সইতে পারে। বাঙ্কারের ভেতরে রয়েছে নিজস্ব এয়ার-ফিল্ট্রেশন আর ভেন্টিলেশন সিস্টেম, যা বাইরের বি'ষা'ক্ত গ্যাস বা ধোঁয়াকে আটকে দেয়।
দেয়ালে সারিবদ্ধভাবে সাজানো বেশ কয়েকটি মনিটর, যেখানে ভিলার চারপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার লাইভ ফিড অবিরত চলছে। এক কোণে কয়েক মাসের রেশন, জরুরি মেডিকেল কিট আর পানির ব্যবস্থা করা আছে ।যাতে যেকোনো জরুরি অবস্থায় বছরের পর বছর এখানে অনায়াসে বেঁচে থাকা যায়।
সাইলাস সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে মেটালিক দরজাটির সামনে এসে দাঁড়াল। তার বুকের ভেতরটা এক অজানা আ'শ'ঙ্কায় কাঁপছে। সে ধীর পায়ে এগিয়ে দরজায় মৃদু টোকা দিল।
কিছুক্ষণ কোনো শব্দ মিলল না। তারপর ভেতর থেকে ভারী হাইড্রোলিক লকের শব্দ হলো এবং দরজাটা ধীর গতিতে খুলে গেল।দরজার ওপাশে এসে দাঁড়াল এরিকা। সাইলাস এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে এরিকার দিকে তাকিয়ে রইল। আজ কত বছর পর মেয়েটাকে এত কাছ থেকে দেখছে সে। ছোটবেলায় এনজোর সাথে মাঝেমধ্যেই আন্ডারওয়ার্ল্ডের নানাবিধ রিসেপশনে আসত এই ছোট্ট মেয়েটি। কিন্তু একটু বড় হওয়ার পর থেকেই এনজো নিরাপত্তার খাতিরে এরিকাকে আর কোথাও নিয়ে যেত না।
এনজো যখনই কোনো বড় মিশনে যেত, এরিকাকে আরওয়াইন ম্যানশনে রেখে যেত। তখন আভার সাথে ম্যানশনের বাগানে ঘুরে বেড়াত এরিকা। তার বয়স যখন আর একটু বাড়ল, এরিকা সাইলাসকে দেখলেই এক অদ্ভুত লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠত, মাথা নিচু করে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করত।
আজ প্রায় ৩-৪ বছর পর সেই এরিকাকে দেখছে সাইলাস। একই শহরে থাকে অথচ কাজের চক্করে আর এনজোর কড়া পাহাড়ায় দেখাই হয়নি এতকাল। শেষবার যখন দেখা হয়েছিল, এনজো একটা জরুরি কাজে ব্যস্ত থাকায় সাইলাস নিজে গাড়ি নিয়ে এরিকাকে স্কুল থেকে বাসায় পৌঁছে দিয়েছিল। সেই ছোট্ট মেয়েটা আজ কত বড় হয়ে গেছে। তার চেহারার গড়নে এনজোর মতোই এক মায়াবী, নিষ্পাপ আভিজাত্য।
সাইলাসকে এভাবে পাথরের মতো চুপ করে তাকিয়ে থাকতে দেখে এরিকা একটু অস্বস্তিতে পড়ল। সে মৃদু গলা পরিষ্কার করে ধীর স্বরে বলল,
"কিছু বলবেন ভাইয়া? এনজো ভাইয়া কি ফিরেছে?"
এরিকার কণ্ঠস্বরে সাইলাসের ঘোর ভাঙল। কিন্তু তার নিজের মুখটা আজ বড্ড মলিন। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে অত্যন্ত নিচু স্বরে বলল,
"তোমাকে এখনই একটু বসের বাসায় যেতে হবে... মানে আরওয়াইন ম্যানশনে।"
"কেন? কিছু হয়েছে?"
সাইলাস কেমন যেন থতমত খেয়ে গেল, তার চেনা মাফিয়া গাম্ভীর্য আজ বিলীন। সে একটু তোতলামো করে বলল,
"কি-কিছু হয়নি। এমনি একটু যেতে হবে। সবাই আছে ওখানে। তোমার... তোমার ভাইও এসেছে... একটু বিজি তাই... তাই আমাকে নিয়ে যেতে বলেছে তোমাকে।"
এরিকার কেমন যেন খটকা লাগল। সাইলাসের এই অস্বাভাবিক আচরণ, চোখের ভাষা ,সবকিছু মিলে তার বুকের ভেতর ওকারণে এক তীব্র ভয়ের কাঁপন তুলে দিল। আরওয়াইন ম্যানশনে সে লাস্ট কবে গিয়েছিল তা আজ মনেও নেই। খুব বড় কোনো প্রয়োজন ছাড়া সাধারণত সেখানে তার যাওয়াও পড়ত না। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
"ওকে, একটু অপেক্ষা করুন আমি আসছি... আপনি, ভিতরে এসে বসুন।"
"না, ঠিক আছে, তুমি যাও। আমি এখানেই আছি,"
সাইলাস দরজার বাইরেই দাঁড়িয়ে রইল।
এরিকা ভেতরের ঘরের দিকে চলে গেল। সে চোখের আড়াল হতেই সাইলাস দেয়ালের ওপর কপাল ঠেকিয়ে খুব জোরে জোরে কয়েকটা শ্বাস ফেলল। তার গলার মধ্যে জমে থাকা কান্নার শক্ত দলাটা সে অনেক কষ্টে গি'লে ফেলল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই এরিকা বেড়িয়ে এলো । সাইলাস আর এরিকা মিলে ভিলার পেছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। রাতের কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কাটেনি, ভোরের আলোতে চারদিকটা কেমন যেন রহস্যময় দেখাচ্ছে।
তারা যখন মার্সিডিজ গাড়িটায় গিয়ে বসল, এরিকা খেয়াল করল গাড়ির ব্যাক সিটে আরও দুজন সশস্ত্র গার্ড গম্ভীর মুখে বসে আছে। চারপাশের এই অতিরিক্ত সিক্রেসি আর গার্ডদের উপস্থিতি দেখে এরিকার বুকের ভেতরটা আরও জোরে ধক করে উঠল। সে কোনো কথা না বাড়িয়ে ড্রাইভিং সিটের পাশে সাইলাসের ঠিক পাশের সিটটায় গিয়ে বসল।
____________
মার্সিডিজ গাড়িটা আরওয়াইন ম্যানশনের সেই বিশাল, দুর্ভেদ্য লোহার গেট পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। প্রধান ফটকের সামনে এসে গাড়িটা থামতেই এরিকা ধীরপায়ে নিচে নেমে দাঁড়াল। শেষবার যখন সে এই বাড়িতে এসেছিল, তারপর থেকে আজ পর্যন্ত ম্যানশনের অনেক কিছুই বদলে গেছে। বাগানটা এখন আরও বেশি আদিম গথিক রূপ নিয়েছে।
এরিকা বুকে এক অজানা আ'শঙ্কার পাথর চেপে আস্তে আস্তে ভেতরে ঢুকতে লাগল। তার ঠিক পিছন পিছন আসছিল সাইলাস।ড্রয়িংরুমে পা রাখামাত্রই এরিকার ভেতরের সেই অবুঝ ভয়টা এক প্রল'য়ং'করী রূপ নিল। যত সে ভেতরের দিকে এগোচ্ছিল, তার বুকের ভেতরের ধকধকানি যেন কান ফা'টা'নো শব্দে আ'ছ'ড়ে পড়ছিল ।সোফার এক পাশে মেহরিন কারুসো বসে আছেন। তাঁর সেই চিরপরিচিত গম্ভীর মুখটা আজ বড্ড মলিন, চোখ দুটো পাথরের মতো স্থির। পাশে দাঁড়িয়ে আছেন লরেঞ্জো আর জ্যাক তাদের চওড়া কাঁধ দুটো আজ যেন এক অবর্ণনীয় পরাজয়ের গ্লানিতে ঝুঁ'কে পড়েছে।
সোফার আরও কাছে আসতেই এরিকার চোখ গেল রিভেন আর তার পাশে বসা এক নারীর দিকে। মেয়েটার মাথাটা রিভেনের চওড়া কাঁধের ওপর ভেঙে পড়েছে, ফ্যাকাশে গাল বেয়ে অনবরত অশ্রুধারা ঝরছে। এরিকা বুঝতে পারলো এটা রোজেলিয়া ।
সবার এই স্তব্ধতা, এই মলিনতা এরিকার মস্তিষ্কে এক তী'ব্র হাহাকার তৈরি করল। তার মগজের প্রতিটি শি'রা চিৎকার করে বলতে লাগল এখানে কিছু একটা চরম বি'পর্য'য় ঘটে গেছে। কিন্তু তার ভাই কোথায়? এনজো তো এখানে থাকার কথা ছিল।
আরেকটু সামনে এগিয়ে আসতেই তার চোখ গেল ঘরের মাঝখানে রাখা একটি কালো ক'ফি'নের দিকে। আর সেই কফিনের সামনে মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে উ'ন্মা'দের মতো ফুঁপিয়ে ডুকরে কাঁদছে মার্কো! মার্কোর মতো এক দুর্ধর্ষ মাফিয়া কি'লা'রকে এভাবে মেঝেতে বসে কাঁদতে দেখে এরিকার পায়ের তলার মা'টি যেন এক নি'মেষে সরে গেল। তার হৃ'দপিণ্ডটা এক অজানা, বীভৎস আশঙ্কায় চূ'র্ণ-বি'চূর্ণ হয়ে যেতে চাইল।
সে অত্যন্ত ধীর, ওস্ফুট এবং কাঁপতে থাকা সুরে জিজ্ঞেস করল,
"আমার... আমার ভাইয়া কোথায়?"
তার নিঃশ্বাস দ্রুত থেকে দ্রুততর হয়ে আসছিল। মাথার ভেতরটা কেমন যেন শূন্য, অ'ব'শ হয়ে যাচ্ছিল। কেউ তার প্রশ্নের উত্তর দিল না। পুরো ড্রয়িংরুমে কেবল মার্কোর সেই বু'কচে'রা কান্নার শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
আর এক মুহূর্তও সহ্য করতে না পেরে এরিকা এক অন্ধ উ'ন্মা'দনায় দৌড়ে গেল সেই ক'ফি'নটার সামনে। তার চোখ দুটো আতঙ্কে ও বিস্ময়ে কো'ট'র থেকে বেরিয়ে আসতে চাইল। সে এক ঝটকায় মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল ক'ফি'নটার পাশে।
ক'ফি'নের ভেতরের দৃশ্যটা দেখামাত্রই এরিকার নিজের চোখ দুটোকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার মনে হচ্ছিল তার বুকের পাঁ'জ'রটা চি'রে হৃ'দপি'ণ্ডটা এখনই বাইরে ছি'টকে বেরিয়ে আসবে।কফিনের ভেতর শুয়ে আছে এনজো। আজ পুরো একটা দিন পর ডেইগোর লোকেরা এনজোর এই মৃ'তদে'হটা আরওয়াইনদের ঠিকানায় ফেরত পাঠিয়েছে। এনজোর সেই একসময়ের হাসিমাখা মুখটা আজ চিরতরে নিস্পন্দ। তার কপালে, ঠিক দুই ভ্রুর মাঝখানে স্পষ্ট হয়ে আছে একটা কালচে, বীভৎস বু'লে'টের গ'র্ত ।যেখান থেকে তার শেষ জীবনের তাজা র'ক্ত ঝরেছিল। তার পুরো মুখে টর্চারের নৃ'শং'স ক্ষ'তচিহ্নগুলো দগদগে হয়ে ফুঠে আছে।একটা চোখের চারপাশে কালো হয়ে ফু'লে আছে । চা'ম'ড়া ফে'টে কালো হয়ে আছে।
"ভা... ভাইয়া..."
এরিকার কণ্ঠস্বর জড়িয়ে গেল। সে এক অবাস্তব ঘোরের মাঝে তার কাঁপতে থাকা ফ্যাকাশে হাতটা বাড়িয়ে দিল এনজোর বরফশীতল মুখের ওপর। তার আঙুলগুলো যখন এনজোর কপালের সেই বু'লে'টের ক্ষ'তে'র চারপাশের জ'মা'ট বাঁধা র'ক্ত আর ক্ষ'তবিক্ষ'ত গালটা স্পর্শ করল, তখন তার ভেতরের সমস্ত অবদমিত জগত এক নিমেষে ওলটপালট হয়ে গেল। এই তো সেই ভাইয়া, যে কয়েকদিন আগেও তাকে নিজের হাতে সিফুড রেঁধে খাইয়েছে,ছোট বেলা থেকে বোনের সব আবদার পূরণ করেছে ।বোনকে সব বিপদ থেকে আগলে রেখেছে। সেই ভাই আজ এভাবে র'ক্তে ল'ণ্ডভ'ণ্ড হয়ে কাঠের বাক্সে শু'য়ে আছে?
ঠিক পরের মুহূর্তেই এরিকার ভেতরের সেই স্তব্ধতা এক প্র'ল'য়ংকরী কালবৈশাখীর মতো ফে'টে পড়ল। সে নিজের দুই হাত দিয়ে নিজের চুল খামচে ধরে এক পৈ'শা'চি'ক, গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে উঠল,
"আহহহহহহহ! ভাইয়াআআআ! চোখ খোলো! খোলো চোখ!"
সে এক উ'ন্মা'দের মতো এনজোর নি'থর দেহটাকে ঝাঁ'কা'তে লাগল। তার সেই বু'কচে'রা চিৎকারে ম্যানশনের দেওয়ালগুলো যেন কেঁপে উঠল।
" আমার ভাইয়া ম'রতে পারে না! ও আমাকে একা ফেলে কোথাও যেতে পারে না! ভাইয়া... ও ভাইয়া... একটা বার কথা বলো! আমাকে বকো, তাও একটা বার তাকাও আমার দিকে!"
সে পা'গ'লের মতো কফিনের কাঠে নিজের মাথা ঠুকতে লাগল। তার চোখ দিয়ে অনবরত অশ্রু ঝরছে। ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা সাইলাস আর লরেঞ্জো নিজেদের চোখ বন্ধ করে নিলো, মার্কো এরিকার এই উ'ন্মা'দনা দেখে তাকে টেনে নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে আরও জোরে ডুকরে কেঁদে উঠল। কিন্তু এরিকা তখন কোনো সান্ত্বনার সীমানায় নেই।সে ছটফট করতে করতে চিৎকার করে যাচ্ছিল।সে মার্কোর কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়।
এরিকা এবার আরো চরম উ'ন্মা'দনায় কফিনের ভেতর হাত ঢুকিয়ে এনজোর র'ক্তমা'খা শার্টের কলারটা খা'ম'চে ধরল। তার নিজের ফ্যাকাশে আঙুলগুলো এনজোর কপালের সেই বু'লে'টের ক্ষ'তে'র ওপর লেপ্টে যাচ্ছিল, কিন্তু সেদিকে তার কোনো হুঁশ নেই। সে নিজের মাথাটা এনজোর বরফশীতল বুকের ওপর আ'ছ'ড়ে ফেলে চিৎকারে বলতে লাগল,
"তুমি না আমাকে সারপ্রাইজ দেবে বলেছিলে, ভাইয়া? এই তোমার সারপ্রাইজ? এই কাঠের বাক্সে শুয়ে থাকা তোমার সারপ্রাইজ?! ওঠো... তুমি ওঠো বলছি! আমি যাব কানাডায়, তুমি যেভাবে বলবে আমি সেভাবেই থাকব, আমি আর কোনোদিন জেদ করব না! ভাইয়া... একটা বার কথা বলো... ও ভাইয়া!"
এরিকার এই অবর্ণনীয়, জীবন্ত ন'র'ককু'ণ্ডের মতো য'ন্ত্রণা দেখে ঘরের জ্যাকের মতো পাথরের মতো শক্ত মাফিয়ার বুকের ভেতরটাও যেন এক নিমেষে ফে'টে চৌ'চির হয়ে গেল। জ্যাক আন্ডারওয়ার্ল্ডের বহু নৃ'শং'সতা দেখেছে, নিজের হাতে বহু মা'নু'ষের প্রা'ণ নিয়েছে, কিন্তু এনজোর এই নিষ্পাপ বোনটার এমন পা'গলা'মি তার ভেতরের সমস্ত পুরুষালি গাম্ভীর্যকে এক লহমায় চূ'র্ণ করে দিল। সে দুই কদম পিছিয়ে গিয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকাল, তার চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ল।
সাইলাসের অবস্থা আরও করুণ। সে সোফার হাতলটা এমনভাবে চেপে ধরেছিল যে তার হাতের নখগুলো কাঠের ভেতর বসে যাচ্ছিল। এই এরিকাকে সে ছোটবেলা থেকে চেনে,এনজোর প্রাণ এই মেয়েটা । আজ সেই মেয়েটা তার নিজের চোখের সামনে এভাবে এক জ্যা'ন্ত লা'শে পরিণত হচ্ছে। সাইলাসের মনে হচ্ছিল তার নিজের ফুসফুসের বাতাস কেউ কে'ড়ে নিয়েছে। সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। এক হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরে সে ডাইনিং স্পেসের অন্ধকারের দিকে চলে গেল, যাতে তার নিজের কান্নার বি'কট শব্দ এরিকার কান পর্যন্ত না পৌঁছায়।
কিন্তু এরিকার চিৎকার থামার কোনো লক্ষণই ছিল না। সে এবার এক উ'ন্মা'দের মতো ক'ফি'নের পাশ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের দুই হাত দিয়ে নিজের গালের চা'ম'ড়া খা'ম'চে ধরতে লাগল, তার ন'খে'র আ'ঘা'তে তার নিজের সুন্দর মুখে র'ক্তে'র দাগ ফুটে উঠল।তার বীভৎস, আ'ত্মঘাতী উ'ন্মাদনা দেখে সোফায় বসে থাকা রোজেলিয়া আর এক মুহূর্তও স্থির থাকতে পারল না। তার নিজের অ'বশ, ওষুধের ঘোরে থাকা শ'রী'রটা সে রিভেনের লোহার মতো শক্ত বাঁধন থেকে ছাড়িয়ে নিজের সমস্ত শারীরিক দু'র্বলতা দূরে ঠেলে একছুটে গিয়ে এরিকাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল।
রোজেলিয়া তার দুই হাত দিয়ে এরিকার সেই র'ক্তমা'খা, হিং'স্র হাত দুটোকে শক্ত করে চেপে ধরে নিজের বুকের সাথে পি'ষে ফেলল। এরিকার নখের আঘাতে ততক্ষণে তার নিজের গাল বেয়ে র'ক্তে'র সুতো নেমে এসেছে, ঠিক যেমনটা এনজোর মুখে ছিল।
"ছেড়ে দাও আমাকে! ও ভাইয়া... আমাকে নিয়ে যাও তোমার সাথে!"
এরিকা এক পৈ'শা'চিক শক্তিতে রোজেলিয়ার বাঁধন থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগল।রোজেলিয়া এরিকাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের অশ্রুসিক্ত মুখটা এরিকার কাঁধে ঠেকাল। সে ডুকরে কেঁদে উঠে চিৎকার করে বলল,
"এরিকা! শান্ত হও প্লিজ শান্ত হও! নিজেকে এভাবে শে'ষ করো না"
রোজেলিয়ার এই আ'র্ত'নাদ, তার নিজের শরীরের সেই পরিচিত তীব্র ট্রমার ছোঁয়া যেন এরিকার ভেতরের সেই অন্ধ উন্মাদনাকে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিল। রোজেলিয়া তো নিজেই এই ন'র'ককুণ্ড পার করে এসেছে, সে জানে এই য'ন্ত্র'ণার গ'ভী'রতা কতটা। সে পরম মমতায় এরিকার র'ক্ত'মাখা হাত দুটো নিজের মুখের কাছে নিয়ে এসে চুমু খেতে লাগল।
"আমি জানি এরিকা... আমি জানি এই ক্ষ'ত কতটা গভীর।কিন্তু নিজেকে শেষ করলে তো ওই খু'নি'রা জিতে যাবে! তোমার ভাইয়া কোনোদিন চাননি তাঁর এরিকার গায়ে একটা আঁ'চ'ড় লাগুক। ওনার ভালোবাসার অপমান করো না.. প্লিজ শান্ত হও"
রোজেলিয়ার সেই কান্না আর আকুল আর্তি অবশেষে এরিকাকে শান্ত করলো। এক জ্যা'ন্ত লা'শে'র মতো এ'রি'কার শ'রী'রটা সম্পূর্ণ অবশ হয়ে মেঝের মার্বেলে ভে'ঙে পড়তে চাইল। রোজেলিয়া তাকে ধরে ফেললো তার নিজের শ'রীরও খুব দূর্বল । এরিকা আর চিৎকার করল না, তার সেই চোখ দুটো ছাদের দিকে স্থির হয়ে রইল, আর তার ঠোঁটের কোণ থেকে কেবল এক ফিসফিসানি বেরিয়ে এল,
"আমার সারপ্রাইজ..."
রোজেলিয়া ডুকরে কেঁদে উঠে তাকিয়ে রিভেনের দিকে চাইল। তার সেই সিক্ত চোখের ভাষা যেন রিভেনের হৃদয়ে এক তীব্র চা'বু'ক মারল।
রিভেন সামনে এগিয়ে এলো। তার চোখ দুটোতে জ্বলছে এক খাঁটি অ'গ্নিয়গি'রি ।
"ওকে আভার কাছে নিয়ে যাও, রোজ। আভা ওকে শান্ত করার ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেবে। এই মেয়েটার চোখের জল আজ ডেইগো মোরালেসের পুরো বংশের র'ক্তে'র নদী দিয়েও শোধ হবে না।"
রিভেনের সেই শান্ত কিন্তু মেরুমজ্জা কাঁপানো কণ্ঠস্বর শুনে ঘরের কোণে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জ্যাক এক ঝটকায় সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার চোখের কোণের সেই অশ্রু ততক্ষণে শুকিয়ে এক হিংস্র প্র'তি'জ্ঞায় রূপ নিয়েছে। ডাইনিং স্পেসের অন্ধকার থেকে সাইলাসও বেরিয়ে এল। তার মুখটা ফ্যাকাশে, কিন্তু চোয়াল দুটো এতটাই শক্ত যে মনে হচ্ছিল দাঁতগুলো এখনই ভে:ঙে যাবে।
আভা আর রোজেলিয়া মিলে অনেক কষ্টে এরিকাকে ধীরে ধীরে ভেতরের কক্ষের দিকে নিয়ে গেল।মেহেরিন কারুসোও উঠে চলে গেলেন ।
এবার ড্রয়িংরুমে নেমে এল এক স্তব্ধতা। ক'ফি'নের সামনে এখনো মেঝের ধুলোয় বসে থাকা মার্কো হঠাৎ তার কান্নার বেগ থামাল। সে ক'ফিনের কাঠটা ধরে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল।
রিভেন ক'ফিনের দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। তার চিরবিশ্বস্ত রক্ষী আজ কাঠের বাক্সে বন্দি। রিভেনের চোয়াল শক্ত হতে হতে হাড়ের রেখাগুলো চা'ম'ড়া চি'রে যেনবেরিয়ে আসতে চাইল।সে ঘরের স্তব্ধতা ভেঙে অত্যন্ত নিচু, মখমলের মতো মসৃণ অথচ বজ্রপাতের মতো ভারী স্বরে হুকুম দিল,
"লরেঞ্জো, জ্যাক... আমাদের আরওয়াইন আর কারুসো রাজত্বের যতগুলো ব্ল্যাক ফ্ল্যাগ আছে, আজ দুপুরের মধ্যে আমাদের প্রতিটি টেরিটরির চূড়ায় সেগুলো উড়িয়ে দাও। আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রতিটি মাফিয়া ফ্যামিলি, প্রতিটি কি'লা'র গি'ল্ড যেন আজ সূর্যাস্তের আগেই জানতে পারে কারুসো বংশের এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ আজ বিদায় নিয়েছে। পুরো তিন দিন এই সাম্রাজ্য এক সুগভীর শোক পালন করবে।"
রিভেনের এই আদেশের প্রতিটি শব্দে যেন এক একটা জ্ব'ল'ন্ত সি'সা'র টু'ক'রো ঝরে পড়ল। সে এক মুহূর্ত থামল, তারপর তার চোখ দুটো মার্কোর দিকে ফেরাল।
"কিন্তু মনে রেখো..." রিভেনের কণ্ঠস্বর এবার হিমাঙ্কের আরও নিচে নেমে গেল,
"এই শোক কেবলই আমাদের অন্দরের। বাইরের পৃথিবীর জন্য আজ থেকে কারুসোদের কোনো দয়া, কোনো আইন বা কোনো নিয়মের অস্তিত্ব থাকবে না। আমরা শোক পালন করব র'ক্ত দিয়ে।"
রিভেন ইশারা করতেই ড্রয়িংরুমের ভেতরে প্রবেশ করল দুজন সশস্ত্র গার্ড। তাদের হাতের ওপর অত্যন্ত সসম্মানে ভাঁজ করে রাখা আছে এক বিশালাকার কালো চাদর। চাদরের ঠিক মাঝখানে সোনালী অক্ষরে নিখুঁতভাবে খোদাই করা আছে কারুসো মাফিয়া বংশের সেই শতাব্দী প্রাচীন রাজকীয় সিল ।কারুসো নামের নিচে ক্রশ চিহ্নে রাখা দুটি তলোয়ার। এই চাদর কেবল এই সাম্রাজ্যের সেইসব যোদ্ধাদের ভাগ্যেই জোটে, যারা নিজেদের শেষ র'ক্তবি'ন্দু দিয়ে বংশের গৌরব রক্ষা করে গেছে।
গার্ড দুজন অত্যন্ত ধীর, গম্ভীর কদমে ক'ফি'নের দুই পাশে এসে দাঁড়াল। তারা এক পরম শ্রদ্ধায়, নিঃশব্দে সেই রাজকীয় সিল মারা কালো চাদরটি এনজোর ক্ষ'তবি'ক্ষ'ত, র'ক্তা'ক্ত লা'শের ওপর বিছিয়ে দিল। কপালে থাকা সেই বী'ভৎস বু'লে'টের গ'র্ত আর ডেইগোর দেওয়া ট'র্চা'রের প্রতিটি দাগ সেই চাদরের নিচে ঢাকা পড়ে গেল, কেবল চাদরের ওপর জ্ব'লজ্ব'ল করতে লাগল কারুসো বংশের সেই সিলমোহর।
এনজোর লা'শে'র ওপর চাদরটি জড়িয়ে যাওয়া মাত্রই মার্কো আবার এক তীব্র আ'ক্রো'শে দাঁতে দাঁত চাপল। তার চোখ দিয়ে আর জল পড়ছিল না, সেখানে তখন কেবলই ডেইগো মোরালেসের মাং'স খুবলে নেওয়ার আদিম ক্ষু'ধা।
রিভেন ক'ফি'নের ওপর বিছানো সেই সি'লমো'হরের দিকে তাকিয়ে ডান হাতটা তুলল। সে তার বুড়ো আঙুল দিয়ে নিজের ঠোঁটের কোণটা সজোরে চেপে ধরে অত্যন্ত শান্ত, গলায় বলল,
"এনজোকে তার পৈত্রিক কবরস্থানে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করো। ও যেখানেই শুয়ে থাকবে, সেখান থেকে যেন ও শুনতে পায় যে ওর খু'নি'রা এই মাটিতে কীভাবে জ্যা'ন্ত পু'ড়'ছে।"
___________
রাত তখন গভীর। আরওয়াইন ম্যানশনের করিডোরগুলো যেন এক একটি অন্ধকার সুড়ঙ্গ, যার শেষ মাথায় কোনো আলো নেই। রিভেন সোজা নিজের শয়নকক্ষে এসে ঢুকল। পুরো ঘরটা একদম নিঝুম, ফাঁকা। সকালের পর থেকে সে তার হোম অফিস থেকে এক পাও বের করেনি। সারাদিন নিজেকে ওই চার দেওয়ালে বন্দি করে রেখেছিল। তার হ্যাজেল চোখ দুটো এখন অতিরিক্ত র'ক্তা'ধি'ক্যে তীব্র লাল হয়ে আছে, যেন চোখের ভেতর কেউ এক মুঠো জ্ব'ল'ন্ত ক'য়'লা গুঁ'জে দিয়েছে।
রোজেলিয়া হয়তো নিচে এরিকার পাশে আছে। রিভেন ঘরে কারোর উপস্থিতি চাইল না। সে ধীর কদমে ঘরের বিশাল কাঁচের স্লাইডিং দরজাটা ঠেলে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল।বাইরের রাতের হিমশীতল হাওয়া তার মুখে এসে আ'ছ'ড়ে পড়ল, কিন্তু তার ভেতরের জ্ব'ল'ন্ত চি'তা তাতে একটুও শান্ত হলো না। তার চোখের চাউনি আজ অন্যরকম।সেখানে কোনো রাজকীয় অহংকার নেই, কোনো স্থিরতা নেই আছে এক অদ্ভুত শূন্যতা আর তীব্র হাহাকার। সে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছিল না। মাঝে মাঝেই তার মুখটা হাঁ হয়ে যাচ্ছিল, খুব কষ্ট করে বুক ভরে বাতাস নেওয়ার চেষ্টা করছিল সে। প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে তার ছাতিটা কা'ম'ড়ে ধরছিল, যেন বুকের ভেতর এক বিশাল পাথর বসে আছে।
চোখ বন্ধ করলেই, এমনকি চোখের পলক ফেললেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে এনজোর সেই দগদগে, ক্ষ'তবি'ক্ষ'ত শ'রী'রের ছবি। ডেইগোর র'ডে'র আ'ঘা'তে ফেটে যাওয়া পিঠের চা'ম'ড়া, উ'প'ড়ে ফেলা ন'খগুলোর সেই মাং'সল লা'ল গর্ত, ভে'ঙে যাওয়া পাঁ'জ'রের হা'ড়, বুজে যাওয়া সেই র'ক্তা'ক্ত চোখ আর পেটের ভেতরের সেই পৈ'শা'চিক ক্ষ'ত।
রিভেন আরওয়াইন আজ এটা নিতে পারছে না।
তার মতো এক লৌহমানব, আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডেভিল আজ এই যন্ত্রণার তীব্রতায় ভে'ঙে পড়তে চাইছে। সে এক তীব্র আক্রোশে বারান্দার দেওয়ালে নিজের ডান হাতের শক্ত মুঠি দিয়ে সজোরে একটা ঘু'ষি মা'রল।
ফলে তার নিজের আঙুলের গাঁট ফে'টে র'ক্ত চুইয়ে পড়তে লাগল, কিন্তু সেই শারীরিক ব্যথা তার বুকের ভেতরের ব্যথার কাছে কিছুই না। আজ তার হৃদপিণ্ডটা কেমন যেন করছে এক অনিয়মিত, তীব্র ক'ম্প'ন তার পুরো শ'রী'রকে অ'ব'শ করে দিচ্ছে।
এনজো... ও তো কেবল একজন গার্ড ছিল না। ও রিভেনের জীবনের একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল। কত বছর ধরে যে এনজো তার ছায়ার মতো আছে, রিভেনের আজ সঠিক বয়সটাও মনে নেই। শুধু মনে পড়ে, ইভানো কারুসো যখন প্রথম এনজোকে এনে রিভেনের পার্সোনাল গার্ড হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন, তখন রিভেন তাকে বিন্দুমাত্র পছন্দ করেনি, বিশ্বাস করা তো দূরের কথা। সে এনজোকে সবসময় এড়িয়ে চলত, এক তীব্র অ'বজ্ঞা আর সন্দেহ নিয়ে দেখত।
কিন্তু এনজো দমে যায়নি। এক অদ্ভুত পাহাড়সম ধৈর্য আর অবিচল আনুগত্য নিয়ে সে বছরের পর বছর রিভেনের পাশে দাঁড়িয়ে থেকেছে। ডিলের মাঝখানে বু'লে'টের বৃ'ষ্টি হোক কিংবা শ'ত্রুর ডে'রায় আ'ত্মঘাতী মিশন ,রিভেন চোখ বন্ধ করে যার ওপর ভরসা করতে পারত, সে এনজো। যেকোনো বিপদে, যেকোনো প্রয়োজনে রিভেনের মুখ থেকে সবার আগে যে নামটা বের হতো, তা এনজো। পুরো মাফিয়া স্কোয়াডের মধ্যে ওই ছিল সবচেয়ে বিচক্ষণ, শান্ত আর তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন। আজ সে আর নেই।
রিভেনের কেমন যেন এক দমবন্ধ করা অনুভূতি হতে লাগল। সে বারান্দার রেলিংটা দুই হাতে শক্ত করে চেপে ধরল। তার এই অদ্ভুত হৃদয়ের খেলা সে নিজেই আজ বুঝতে পারছে না। কী অদ্ভুত এই মন। যা মাঝেমধ্যে এক লহমায় তা'সের ঘরের মতো নরম হয়ে ভে'ঙে পড়ে, আবার পরের মুহূর্তেই এক পৈ'শা'চি'ক পি'শা'চে'র মতো ইস্পাতের চেয়েও কঠিন হয়ে যায়।
রেলিংয়ে ভর দিয়ে থাকতে থাকতেই রিভেনের লাল হয়ে থাকা চোখের কোণ ঘেঁ'ষে এক ফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল। তারপর আর সে নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। তার বাঁধ যেন এক নিমেষে ভে'ঙে চু'র'মার হয়ে গেল। অন্ধকারে একা দাঁড়িয়ে থাকা মাফিয়া সাম্রাজ্যের কিং এর চোখ দিয়ে আজ ঝরঝর করে জল পড়তে লাগল। তার নিঃশব্দ কান্নার প্রতিটি কাঁপুনি যেন ভোরের সেই মহাপ্রলয়ের আগে প্রকৃতির এক চূড়ান্ত থমথমে রূপ।
_______________
"হেই! আরও এক বোতল নিয়ে আয়! জাস্ট ব্রিং মি অ্যানাদার বোতল, ইউ বাস্টার্ডস!"
"স্যার, অনেক হয়েছে। আপনার বিলটা আগে মেটান!"
ক্লাবের একজন বাউন্সার আর দুজন স্টাফ এসে সাইলাসের কলার চেপে ধরল।সাইলাস মা'তাল অবস্থায় তাদের হাতটা চিটকে দেওয়ার চেষ্টা করতেই এক স্টাফ রাগের মাথায় সাইলাসের গা'লে সজোরে এক চ'ড় বসিয়ে দিল। সাইলাস কাউন্টার থেকে ছি'টকে সোফায় গিয়ে পড়ল।
"বিল চাইলে বলেন মানিব্যাগ বাসায়! ফালতু মাতাল কোথাকার!"
স্টাফটা ইতালিয়ান বাসায় বললো ।স্টাফরা যখন তাকে টেনে হিঁ'চ'ড়ে ক্লাব থেকে বের করতে যাবে, ঠিক তখনই ভেতরে ঢুকল মার্কো।সে সাইলাসের ফোন ট্র্যাক করেই এখানে পৌঁছেছে। মার্কোকে দেখামাত্রই ক্লাবের ম্যানেজার আর স্টাফদের মুখের রঙ বদলে গেল। মার্কো এই ক্লাবের নিয়মিত কাস্টমার, আন্ডারওয়ার্ল্ডে তার নামের দাপট তারা ভালো করেই জানে।
"হাত সরাও ওর ওপর থেকে!"
মার্কোর গলার বরফশীতল স্বর শুনে বাউন্সাররা এক কদম পিছিয়ে গেল।
ম্যানেজার তোতলামো করে বলল,
"স্যার... আসলে এই লোকটা সকাল থেকে এখানে এসে শুধু দামী দামী ম'দ গি'লে যাচ্ছে। কোনো বিল দিচ্ছে না।আবার বলছিল মানিব্যাগ নাকি বাসায় রেখে এসেছে..."
মার্কো সাইলাসের ফ্যাকাশে, চ'ড় খাওয়া মুখটার দিকে তাকিয়ে রা'গে কাঁ'পতে লাগল। সে স্টাফদের দিকে তাকাতেই তার চোখ দিয়ে যেন আ'গু'ন ছি'টকে বের হলো। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
"বিল দিচ্ছে না? এই লোকের যদি এখন হুঁশ থাকত না... তবে ওর গায়ে হাত তোলা তো দূরের কথা, ওর দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহসও তোদের এই পুরো ক্লাবের কারও হতো না! ও কে জানিস তোরা?"
মার্কো আর কোনো কথা না বাড়িয়ে নিজের পকেট থেকে ব্ল্যাক ক্রেডিট কার্ডটা বের করে ম্যানেজারের মুখের ওপর ছুঁ'ড়ে মা'রল।
"পুরো ক্লাবের বিল কে'টে রাখ! আর আই ড্যাম শিওর, কাল সকালের মধ্যে যে ওর গায়ে হাত তুলেছে, তার ওই হাতটা আমি কে'টে কু'কু'রকে খা'ও'য়াব।"
স্টাফরা ভয়ে পাথর হয়ে গেল। মার্কো সোফায় আধা সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়ে থাকা সাইলাসকে টেনে তুলল। সাইলাসকে এই ক্লাবের কেউ চেনে না, কারণ সে কোনোদিন এসবক পা রাখেনি। মার্কো সাইলাসের একটা হাত নিজের কাঁধের ওপর ফেলে প্রায় পাঁজকোলা করে তাকে ক্লাব থেকে বের করে নিয়ে এল।
বাইরের রাতের ঠাণ্ডা বাতাস আর কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশেও সাইলাসের মাতলামি থামছিল না। সে মার্কোর কলার ধরে বলতে লাগল,
"মার্কো... দেখ... এনজোর নাম্বারটা ডিলিট হয়ে গেছে আমার ফোন থেকে... ও আর ফোন ধরছে না রে..."
মার্কো আর সহ্য করতে পারল না। ক্লাবের পার্কিং লটের পাশে একটা নির্জন কাঠের বেঞ্চ ছিল। সে সাইলাসকে সজোরে সেই বেঞ্চের ওপর বসিয়ে দিল। তারপর এক তীব্র ধ'মক দিয়ে কড়া গলায় বকে উঠল,
"হুঁশ আছে তোর, সাইলাস?! এই সময়ে আমাদের নিরাপত্তা কতটা জরুরি তুই জানিস না? ডেইগোর কি'লা'ররা চারদিকে ঘুরছে! এনজোকে হারিয়েছি... এবার কি তুইও ম'র'তে চাস? তোর এই অবস্থায় একা বাইরে বের হওয়া ঠিক হয়েছে?"
সাইলাস কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু শূন্য চোখে চেয়ে রইল, তার মাথাটা একপাশে হেলে পড়ল। মার্কো বুঝল, সাইলাস পুরোপুরি আউট, এখন কোনো বকাঝকা তার মগজে ঢুকবে না।
মার্কো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের জ্যাকেটের ভেতরের পকেট থেকে একটা ছোট সি'লভা'রের ফ্ল্যা'স্ক বের করল। এটি একটা বিশেষ সো'বা'রিং শট , যা অতি দ্রুত অ্যা'লকো'হলের ঘোর কাটাতে সাহায্য করে। মার্কো সাইলাসের চিবুকটা শক্ত করে ধরে তার মুখের ভেতর সেই ত'রলের কয়েক ফোঁটা জোর করে ঢে'লে দিল।
সেই তীব্র তেতো স্বাদে সাইলাস কাশতে শুরু করল, তার চোখ দুটো য'ন্ত্র'ণায় বন্ধ হয়ে গেল।সো'বারিং শটের তীব্র ঝাঁঝালো তরলটা মগজে পৌঁছাতেই সাইলাসের চোখের মণি দুটো স্থির হতে শুরু করল। পুরোপুরি হুঁশ না ফিরলেও, ম'দের ঘোরটা কিছুটা কেটে গেছে।
সে বেঞ্চের কাঠে দুই হাত দিয়ে ভর দিয়ে বসল, তার মাথাটা এখনো এক তীব্র য'ন্ত্রণায় দুলছে।
মার্কো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেঞ্চের অন্য পাশে বসল। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
"এইভাবে নিজেকে শে'ষ করছিস কেন ? আমাকে দেখ, শান্ত হয়ে গেছি আমি। বুকে পাথর চেপে রেখেছি। এনজোর মৃ'ত্যুর প্র'তি'শোধ যেদিন নিজের হাতে নেব,সেদিন আবার শোক করবো। তোরা কী শুরু করলি বল তো? একদিকে তুই, অন্যদিকে এরিকা! মেয়েটার ঘুম ভাঙার পর আরও পা'গ'লা'মি করছে। বারবার বাড়ি ফিরে যেতে চাচ্ছে... বলছে তার ভাই নাকি সেখানে অপেক্ষা করছে। ও বিশ্বাসই করতে চাচ্ছে না যে এনজো আর নেই। শুধু বলছে ওটা একটা দুঃস্বপ্ন ছিল।"
মার্কো একটা শুকনো ঢোক গিলল, তার গলার কাছে যেন এনজোর নামটা আবার আটকে যাচ্ছিল।সাইলাস কোনো কথা বলল না। সে শুধু মাথা নিচু করে মার্কোর কথাগুলো শুনে গেল। তার ধূসর চোখ দুটোতে তখন রাতের কুয়াশার চেয়েও ঘন অন্ধকার। সে অত্যন্ত ভাঙা, খসখসে গলায় বলল,
"সব কষ্ট যেন আজ এক হয়ে উদয় হয়েছে, মার্কো। নিজেকে কোনোভাবেই শান্ত রাখতে পারছি না। প্রথমে নাইলা..."
সাইলাস একটু থামল। নাইলা নামটা উচ্চারণ করতেই তার বুকের ভেতরটা যেন আবার দু'মড়ে মু'চড়ে গেল। অতীত আর বর্তমানের দুটো বিশাল ক্ষ'ত একসঙ্গে তার ম'গজে হা'তুড়ি পিটছে। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে যোগ করল,
"তারপরে এনজো।"
মার্কো একদম নিশ্চুপ হয়ে গেল।নাইলাকে হারানোর পর সাইলাস মাঝে মাঝে এমন ভে'ঙে পড়তো । আর আজ এনজোর এই চলে যাওয়া সাইলাসকে পুরো দু'মড়ে দিয়ে গেছে। পার্কিং লটের সেই ম্লান হলুদ আলোয় দুই মাফিয়া কি'লা'র একদম চুপচাপ বসে রইল কিছুক্ষণ।
হঠাৎ করেই সাইলাসের ঠোঁটের কোণে একটা ম্লান, মলিন হাসির রেখা ফুটে উঠল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল কেবল এক বুক হাহাকার আর পুরোনো স্মৃতির রোমন্থন। সে মেঝের বালির দিকে তাকিয়ে ধীর স্বরে বলল,
"তোর মনে আছে মার্কো? প্রথম যখন বস আমাদের নিয়ে আসে কাজ শেখানোর জন্য... তখন এনজো কতটা রুড ছিল?...আর একসময় ও আমাদের টিমের প্রাণ হয়ে উঠে "
মার্কো একটু হাসল,
"আসলেই ... আচ্ছা ওর পাস্তা বানানোর মিশনটার কথা মনে আছে তোর? তখন আমরা লস অ্যাঞ্জেলেসের একটা সেফ হাউসে আস্তানা গেড়েছিলাম।"
"মনে থাকবে না মানে?"
সাইলাস এবার পুরোপুরি সোজা হয়ে বসল, স্মৃতির ভেলায় চেপে সে যেন কিছুক্ষণের জন্য এই পৈ'শা'চিক বর্তমান থেকে দূরে চলে গেল,
"বস তখন একটা বড় ডিলের জন্য অন্য সিটিতে। এনজো হঠাৎ করে ঘোষণা দিল, আজ ও আমাদের খাঁটি ইতালিয়ান স্টাইলের পাস্তা বানিয়ে খাওয়াবে। রান্না মুখে নিয়ে দেখি সে লবণ দিতেই ভুলে গিয়েছিল! আমি আর তুই মুখে দিতেই ব'মি আসার অবস্থা।"
"আর আমরা যখন বললাম যে লবণ হয়নি," মার্কো কথা কেড়ে নিয়ে বলল,
"ও বলেছিল ‘কারুসোদের জিভে নুনের স্বাদ কম থাকতে হয়, ব্লা'ড প্রেশার কন্ট্রোলে রাখা মাফিয়াদের প্রথম রুল"
দুই বন্ধু কুয়াশাচ্ছন্ন পার্কিং লটের সেই নিঝুম বেঞ্চে বসে একসাথে মৃদু হেসে উঠল। কিন্তু সেই হাসির প্রতিধ্বনিতে আনন্দের চেয়ে বি'ষাদই বেশি ছিল।
"ও প্রচণ্ড প্রাণোচ্ছ্বল একটা মানুষ ছিল রে..."
মার্কোর কণ্ঠস্বর আবার ভারী হয়ে এল।
"সবাই ভাবত ও বুঝি এক নি'র্ম'ম কি'লা'র, কিন্তু আমাদের এই চারজনের আসল রিদমটাই তো ছিল এনজো। যখনই মিশন শেষে আমরা ক্লান্ত হয়ে ফিরে আসতাম, ও কোনো না কোনো জোকস শুনিয়ে আমাদের হাসাত। আজ... আজ সেই হাসিমুখটা একটা কাঠের বাক্সে সিল মা'রা চাদরের নিচে ঘুমিয়ে আছে।"
কথাটা শেষ হতেই হাসির সেই হালকা অবয়বটা উড়ে গেল। আবার ফিরে এল সেই অন্ধকার, সেই দমবন্ধ করা রাতের নিস্তব্ধতা। সাইলাসের ঠোঁটের কোণের মলিন হাসিটা মিলিয়ে গিয়ে সেখানে জ'মাট বাঁধল এক নতুন জ'খম।
সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পকেট থেকে গাড়ির চাবিটা বের করল। অ্যা'ন্টিডো'টের প্রভাবে তার শরীরের ভেতরের অ্যা'লকো'হল ততক্ষণে পুরোপুরি নি'উট্রালা'ইজড হয়ে গেছে। সে উঠে দাঁড়িয়ে মার্কোর কাঁধে হাত রাখল।
"স্মৃতিগুলো বড্ড সুন্দর ছিল, মার্কো,"
"আর সেই কারণেই ডেইগো মোরালেসের ম'র'ণটা অনেক বেশি কু'ৎসিত হবে। চল, ম্যানশনে ফিরি। এরিকাকে আমাদের সামলাতে হবে। এনজো ওপর থেকে দেখছে, ও বেঁচে থাকতে আমাদের যেভাবে আগলে রাখত, আজ আমাদের ওর বোনকে সেভাবে আগলে রাখতে হবে।"
To be continue,,,,