#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins)
#লেখনিতে_ফারিহা
পর্ব ৫৪
(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)
সময় আসলে কোনো ক্ষ'ত নিরাময় করে না, সময় কেবল মানুষকে অভ্যস্ত করে তোলে। একটা সুগভীর, দমবন্ধ করা শূন্যতাকে বুকের পাঁজরের নিচে লুকিয়ে রেখে কীভাবে বাইরে পাথরের মতো শান্ত থাকতে হয়, সময় শুধু সেই নিষ্ঠুর অভিনয়টাই শিখিয়ে দেয়। মানুষ চলে যায়, কিন্তু তার ফেলে যাওয়া শেষ চিহ্নগুলো জীবন্ত মানুষদের স্মৃতিতে এক একটি ধা'রা'লো ত'লোয়ারের মতো বিঁধে থাকে।
রিভেন তার বাবার রেখে যাওয়া খামটা টেবিলের ওপর রাখল। তার আঙুলগুলো খামের ওপর আলতো করে স্পর্শ করল। খামটা ভারী, আর কারুসো রাজবংশের সেই চিরচেনা রাজকীয় সিলমোহরটা যেন আজ তাকে উপহাস করছে। রিভেন খামটা হাতে তুলে নিল। একবার, দুবার... বারবার সে খামটা হাতের মুঠোয় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগল।
তার মনের ভেতর তখন তীব্র ঝড়। এই খামটা খোলার মানে হলো ইভানোর মুখোমুখি হওয়া। সে খামটা খুলবে, নাকি এখনই ছিঁ'ড়ে টু'করো টুকরো করে বাতাসে উড়িয়ে দেবে?
রিভেন এক দীর্ঘ, তপ্ত আর ভারী শ্বাস ফেলল। ভেতরের সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্বকে একপাশে সরিয়ে, তার শক্ত চোয়াল জোড়া আরও দৃঢ় হলো। সে চরম সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেলল। খামটা এক ঝটকায় ছিঁ'ড়ে, ভেতরের লিনেন পেপারের চিঠিটা বের করল সে। চাঁদের ম্লান আলোয় কাগজের ওপর ইভানোর সেই চেনা, রাজকীয় হাতের লেখাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠল।রিভেন এক পরম নিস্পন্দতায় চিঠিটার ওপর চোখ বুলাতে শুরু করল।
চিঠিতে লেখা ছিল,
আমি জানি, কারুসো আর আরওয়াইনদের এই কুৎসিত আভিজাত্যের লড়াইয়ে তুই কোনোদিন আমাকে তোর 'বাবা' বলে মেনে নিতে পারিসনি, আর সেই অধিকার হয়তো আমি বহু আগেই হারিয়েছি। কিন্তু আজ সম্রাটের মুখোশটা সরিয়ে, মেহেরিনের লা'শের ওপর দাঁড়িয়ে আমি তোকে একটা সত্য বলতে এসেছি যে সত্যটা স্বীকার করতে আজ আমার মাফিয়া অহংকার চূ'র্ণ-বি'চূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।
তুই সেদিন হসপিটালের করিডোরে দাঁড়িয়ে ঠিকই বলেছিলি, রিভেন। মেহেরিনের মৃত্যুর জন্য আজ অন্য কেউ নয়, আমি দায়ী। আমার এই কুৎসিত, নোংরা আভিজাত্য আর মাফিয়া অহংকারের বলির পাঁঠা হতে হলো আমার মেহেরিনকে। চলে গেল ও আমাকে এই বিশাল পৃথিবীতে একা ফেলে। মেহেরিনকে আমি জীবনে বড্ড বেশি কষ্ট দিয়েছি, রিভেন। ওর বিশ্বাস, ওর পবিত্র ভালোবাসা সবকিছুর অবমাননা করেছি আমি নিজের এই দুই হাত দিয়ে।
কথাগুলো আসলে তোকে অনেক আগেই বলা উচিত ছিল। একবার নিজের বুক চি'রে তোকে সব বলতেও চেয়েছিলাম, কিন্তু বিশ্বাস কর রিভেন, আমার হাত বাঁধা ছিল। বাইরের দুনিয়া ভাবে আমরা যারা আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষে বসি, আমরা বোধহয় সর্বশক্তিমান, আমরা যা চাই তাই করতে পারি। কিন্তু আসল সত্যিটা হলো, আমরা আসলে এক অদৃশ্য শিকলে বাঁধা ক্রীতদাস ছাড়া আর কিছুই নই। আমরা সবকিছু করার ক্ষমতা রাখি না, রিভেন... একদমই রাখি না।
তোর কি মনে আছে রিভেন? ছোটবেলায় তুই সারাক্ষণ আমার চারপাশেই ঘুরঘুর করতি। তোর বড় ভাই ডমিনিক ছোটবেলা থেকেই ছিল অসম্ভব রকমের ইন্টেলিজেন্ট, শান্ত আর দূরদর্শী। তাই আমার একটা সুপ্ত ইচ্ছা ছিল, আমার অবসরের পর ডমিনিককেই আমার গদিতে বসাবো, 'কারুসো এন্টারপ্রাইজ'এর অফিশিয়াল সিইও বানাবো। আসলে এই পৃথিবীর প্রতিটা মা-বাবাই তো দিনশেষে র'ক্ত জল করে সম্পত্তি গড়ে তোলে তাদের সন্তানদের একটা সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ দেওয়ার জন্য। আমার চিন্তাভাবনাও তার বাইরে ছিল না। তুই ছোটবেলা থেকেই ছিলি বড্ড বেশি জেদি, একগুঁয়ে আর একপ্রকার অবাধ্য।
কোনো নিয়ম বা শৃঙ্খলার মধ্যে তোকে আটকে রাখা যেত না। আর ঠিক সেই কারণেই ডমিনিকের ওপর আমার এক্সপেক্টেশন আর নির্ভরতাটা একটু বেশি ছিল। কিন্তু তোদের দুই ভাইয়ের মধ্যকার সেই অটুট বন্ডিং, সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দেখে মেহেরিন আর আমার বুকটা এক পরম শান্তিতে ভরে উঠত। মেহেরিন সবসময় তোদের দুজনকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলত, 'তোরা দুই ভাই যেন সারাজীবন এভাবে এক আত্মা হয়ে মিলেমিশে থাকিস। কোনো ক্ষমতা যেন তোদের আলাদা করতে না পারে।'
স্কারলেটের জন্মের আগে তুই ই ছিলি আমাদের কোলজুড়ে আসা সবচেয়ে ছোট, সবচেয়ে আদরের সন্তান। যদিও তুই সবসময় ডমিনিকের রাজকীয় দায়িত্ব দেখে রেগে গিয়ে বলতি যে আমরা ডমিনিককে বেশি আদর করি, কিন্তু বিশ্বাস কর রিভেন আমার চোখে তোদের দুজনের প্রতি ভালোবাসাটাই সমান ছিল।
জানিস রিভেন? তোর মা আর আমার বিয়েটা কিন্তু কোনো পারিবারিক চুক্তি ছিল না।মেহেরিনকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম আমি। আসলে আমাদের বিয়ের সেই কাহিনী তুই কতটুকু জানিস বা কতটুকু তোর মনে আছে, আমি জানি না। তোর দাদা আলফি কারুসো প্রথমে এই বিয়েটা কোনোভাবেই মেনে নেননি। আভিজাত্যের চরম অহংকারে অন্ধ হয়ে তিনি কারুসো বংশের সমস্ত সম্পত্তি, উত্তরাধিকার আর রাজকীয় ক্ষমতার অধিকার থেকে আমাকে বঞ্চিত করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন। তখন মেহেরিন আর আমি একে অপরের হাত ধরে এক চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার মাঝে নিজেদের দিন পার করা শুরু করি। কোটি ডলারের রাজপ্রাসাদ ছেড়ে তখন একটা ভাঙা ছাদের নিচে আমাদের সংসার শুরু হয়েছিল।
আসলে সেই কঠিন, অভাবের দিনগুলোর কথা আজ এই বুড়ো বয়সে নতুন করে বলতে ইচ্ছে করছে না... তবে একটা কথা তোকে বলব তোর মা মেহেরিন কারুসো সেই চরম দুর্দিনেও, এক ফোঁটা সুখের নিশ্চয়তা না পেয়েও আমার হাতটা কোনোদিন ছেড়ে দেয়নি।তার সমস্ত বিলাসিতা সে আমার ভালোবাসার টানে এক সেকেন্ডে পায়ে ঠেলে দিয়েছিল। একসময় আমাদের জীবনে ডমিনিকের জন্ম হলো। ডমিনিকের জন্মের কিছুদিন পর কাকতালীয়ভাবেই তোর দাদার সাথে আমাদের হঠাৎ দেখা হয়ে যায়। তোর দাদা আলফি কারুসো বাইরে থেকে দেখতে ছিলেন বড্ড গম্ভীর, নিষ্ঠুর আর পাথরের মতো শক্ত... কিন্তু সেই রুক্ষ খোলসের পেছনেও অনেক কিছু লুকিয়ে ছিল। ডমিনিকের মুখ দেখে বাবার ভেতরের র'ক্তের টান জেগে উঠেছিল। এক অলৌকিক উপায়ে তিনি আমাদের বিয়েটা অফিশিয়ালি মেনে নেন। আমাকে কারুসো এন্টারপ্রাইজের সম্পূর্ণ দায়িত্ব আর সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি আন্ডারগ্রাউন্ডের পরবর্তী সম্রাট হিসেবেও আমার নাম ঘোষণা করেন।
তুই আমাকে তোর জীবনের সবচেয়ে বড় যে কারণে ঘৃণা করিস, তা হলো আমি মেহেরিনের সাথে অতীতে একবার চরম বেইমানি করেছিলাম, ওর সাথে চিট করেছিলাম। হ্যাঁ, আমি অপরাধী। যখন স্কারলেট আর ডমিনিকের সেই আকস্মিক, বী'ভৎস মৃ'ত্যুর পর আমরা দুজনেই ভেতরে ভেতরে জ্যা'ন্ত লা'শ হয়ে গিয়েছিলাম, যখন আমরা আস্তে আস্তে সেই শোক কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আপ্রাণ চেষ্টা করছি... ঠিক তখনই আমি বেইমানিটা করে বসি। আজ আমার জীবনের শেষপ্রান্তে এসে তোকে সেই অন্ধকারের সবটুকু সত্যি বলে দিতে ইচ্ছে করছে, রিভেন...
আজকে সব সত্যি তোকে আমি খুলে বলব রিভেন, কারণ এই পাপের তী'ব্র কষ্টগুলো আর আমার পিছু ছাড়ছে না। এই হৃদয়ের দ'হন আজ আমার জন্য অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
মেহেরিনের সাথে আমার প্রথম পরিচয়টা হয়েছিল ইউনিভার্সিটিতে। তুই তো জানিস, আমাদের পরিবারে যতই মাফিয়া ব্লা'ড থাকুক না কেন, উচ্চশিক্ষা নেওয়াটা আমাদের আভিজাত্যের একটা অত্যাবশ্যকীয় অংশ ছিল। কলেজ লাইফে আমার সাথে মরোনা সিন্ডিকেটের খুব ভালো বন্ধুত্ব ছিল। আমরা একই সাথে চলতাম। একটা সময় আমার জীবনে মেহেরিন এল। মেহেরিন আর আমার পরিচয় হওয়ার পর, হঠাৎ করেই আমাদের সম্পর্কের মাঝে মরোনা এক বি'ষা'ক্ত কাল হয়ে দাঁড়াল। বাইরে থেকে সে আমার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখলেও, মেহেরিনের প্রতি তার ভেতরে এক আদিম, কুৎ'সিত লা'লসা লুকিয়ে ছিল। সে কোনোভাবেই মেহেরিন আর আমাকে একসাথে সহ্য করতে পারত না। মেহেরিন আর আমার বিয়ের ডিসিশনটা খুব সাডেন ছিল, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আপাতত কাউকেই এটা জানতে দেবো না। কিন্তু মরোনা আমাদের সম্পর্কের মাঝে প্রায়ই কোনো না কোনো ঝামেলা লাগানোর চেষ্টা করত। তাকে চিনতে আমার বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছিল, রিভেন। বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছিল।
একটা সময় মরোনা গোপনে মেহেরিনের কাছে গিয়ে আমার নামে নানারকম কুৎসিত বদনাম করতে শুরু করে, সে চাইত আমাদের আলাদা করতে। মেহেরিনকে সে আড়ালে হ্যা'রা'স করারও চেষ্টা করত। এরপর যখন মরোনা আমাদের গোপনে বিয়ে করার খবরটা জানতে পারে, সে পুরোপুরি ক্ষি'প্ত হয়ে যায়। মেহেরিনের প্রতি তার সেই নোং'রা ফিলিংসটা তখন আমার সামনে একদম স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং এই নিয়ে মরোনার সাথে আমার এক বিরাট ঝামেলা আর মা'রামা'রি হয়। তখন মরোনা এক চরম চাল চালল। সে ইতালির অত্যন্ত উচ্চপদস্থ এক পলিটিশিয়ানের ছেলের সাথে হাত মেলাল। তাকে নিজের বন্ধু বানিয়ে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে মেহেরিনকে এক রাতে কি'ডন্যা'প করল তারা।
একটা গভীর জঙ্গলের ভেতরের এক পরিত্যক্ত কেবিনে আটকে রেখে মেহেরিনের সাথে এক চরম নোং'রা, বী'ভৎস কিছু করার উদ্দেশ্যে তারা এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মেহেরিন তো সাধারণ কোনো মেয়ে ছিল না, সে ছিল এক বা'ঘি'নী। সে সেখান থেকে কোনোভাবে পালানোর চেষ্টা করতেই সেই উচ্চপদস্থ ক্ষমতাশালীর ছেলেটা তাকে মাঝপথে আটকে ফেলে। নিজের সম্ভ্রম আর জীবন বাঁচাতে মেহেরিন তখন বাধ্য হয়ে সেই ন'রপ'শুকে নিজের হাতে মা'র্ডা'র করে!
এই ঘটনার পর মরোনার সাথে আমার আর খুব একটা দেখা হয়নি। আমরা গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করলাম। তারপর তোকে তো আগেই বললাম, তোর দাদা আলফি কারুসোকে যখন বিয়ের ব্যাপারটা জানালাম, তিনি রেগে গিয়ে আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দিলেন।
সবকিছু ঠিকঠাক হওয়ার পর, আমাদের জীবনে একে একে অনেকগুলো বছর কেটে গেল। এর মধ্যে মরোনা সিন্ডিকেটের সাথে আমার আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। তাকে আমি এই শহরে দেখতেও পাইনি। একটা সময় জানতে পারলাম, মরোনা আন্ডারগ্রাউন্ডে আর পলিটিক্যাল লাইনে এক বিশাল, অপরাজিত ক্ষমতার মালিক হয়ে উঠেছে। সে বিয়েও করেছিল, কিন্তু একটা রহস্যময় অ্যাক্সিডেন্টে তার স্ত্রী আর সন্তান একসাথে মা'রা যায়। আর এই ঘটনার পর থেকেই মরোনা সিন্ডিকেট আরও বেশি হিং'স্র, র'ক্তপি'পাসু আর ম'রণঘা'তী হয়ে ওঠে।
ওদিকে আমাদের দিনকাল তখন বড্ড সুখে কাটছিল। ঠিক তখনই আমাদের সেই সাজানো সুখের বুকে পা'রমা'ণবিক বো'মার মতো আ'ছড়ে পড়ল ডমিনিক আর স্কারলেটের সেই মৃ'ত্যুটা।
আজ তোকে বলছি রিভেন তোর ভাই আর তোর আদরের বোনের সেদিনের এক্সিডেন্টটা মূলত এই মরোনা সিন্ডিকেট করিয়েছিল। কারণ মরোনা আমাদের এই সুখ, এই আভিজাত্য কোনোদিন সহ্য করতে পারেনি। তার ভেতরের পুরোনো হিং'সা আর আ'ক্রো'শ তাকে এক জ্যা'ন্ত শ'য়তানে রূপ দিয়েছিল। হ্যাঁ রিভেন, তুই এতদিন ধরে তোর ভাই আর বোনের খু'নিকে যে খুঁজে বেড়াচ্ছিস সেই আসল খু'নি হলো মরোনা সিন্ডিকেট। তুই হয়তো এখন এই চিঠি পড়তে পড়তে আ'ক্রো'শে ফে'টে পড়ে পড়বি যে তবে সব জানার পরও আমি তখন তাকে মে'রে ফেললাম না কেন? কেন ইভানো কারুসো নিজের ছেলের খুনিকে জ্যা'ন্ত ছেড়ে রাখল?’
রিভেন? সবসময়, সবকিছু আমরা চাইলেই করতে পারি না। বিশ্বাস কর, তখন আমার হাত-পা চারদিক থেকে অদৃশ্য শি'কলে বাঁধা ছিল। আমার শত্রুর কোনো অভাব ছিল না আন্ডারগ্রাউন্ডে, আর মরোনা আমার সেই সমস্ত পুরোনো শত্রুদের একসাথে এক ছাদের নিচে এনে আমার এই কারুসো সাম্রাজ্যকে এক লহমায় ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার চুক্তি করেছিল। ডমিনিক আর স্কারলেট মা'রা যাওয়ার পর, কিছুদিন পর যখন মেহেরিন আর আমি তীব্র শোক কাটিয়ে কোনো রকমে নরমাল লাইফে ফেরার চেষ্টা করছি... ঠিক তখনই একদিন মরোনা অফিসে এসে সরাসরি আমাকে ব্ল্যা'কমে'ইল করল, এক চূড়ান্ত হু'মকি দিল। সে বলল মেহেরিনের সাথে আমার এই সাজানো ফ্যামিলি সে কোনোভাবেই সহ্য করতে পারছে না। আমি যদি মেহেরিনের থেকে দূরত্ব বজায় না রাখি, তবে বহু বছর আগে মেহেরিন স'ম্ভ্রম বাঁচাতে যে উচ্চপদস্থ ক্ষমতাশালীর ছেলেকে মা'র্ডা'র করেছিল, সেই মা'র্ডা'রের সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ আর অকাট্য প্রমাণ সে গ্লোবাল মিডিয়া আর ল-ইনফোর্সমেন্টের কাছে লি'ক করে দেবে। আজ এতগুলো বছর ধরে সেই ক্ষমতাশালী পলিটিশিয়ান তার নিজের ছেলের খু'নি'কে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে, রিভেন।
ওই সিসিটিভি ফুটেজ আর প্রমাণগুলো যদি একবার লি'ক হয়ে যেত, তবে মেহেরিনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা তার চেয়েও ভ'য়ানক কোনো রাষ্ট্রীয় শাস্তি হতে পারত। আমি কোনোভাবেই আমার চোখের সামনে মেহেরিনকে কোনো অন্ধকার সে'লে প'চে ম'রতে দেখতে পারতাম না। তাই আমি বাধ্য হয়ে মেহেরিনের থেকে দূরত্ব বজায় রাখা শুরু করি। ওদিকে আড়ালে আমি অনবরত চেষ্টা করছিলাম মরোনার কাছ থেকে ওই প্রমাণগুলো কোনোভাবে চুরি করে ধ্বং'স করে দেওয়ার। তোর মাকে বাঁচানোর জন্যই আজ আমাকে এত বড় এক পৈ'শা'চিক অভিনয়ের আশ্রয় নিতে হয়েছিল, রিভেন।
মেহেরিনকে আমার থেকে দূরে সরাতে, তাকে সুরক্ষিত রাখতে আমি অন্য এক নারীর সাথে চিটিংয়ের নাটক করি কারণ তোর মা সবকিছু জানলে কোনোদিন ও আমাকে দূরে যেতে দিতো না তাই আমি এই নাটকটা সাজায়। তোর মা আমার সাজানো রূপ দেখে আমাকে চরম ঘৃ'ণা করতে শুরু করে, আর সেটাই আমি চেয়েছিলাম। ডমিনিকের মৃ'ত্যুর পর তোর সুরক্ষার কথা ভেবে তোর ওপরও আমি বড্ড বেশি কঠোর হয়ে গিয়েছিলাম, যার ফলে আমাদের মধ্যকার বাবা-ছেলের সম্পর্কটাও চিরতরে ন'ষ্ট হয়ে যায়।
তোর মা শেষপর্যন্ত আমার সেই ছাদ ছেড়ে তোকে নিয়ে অন্য এক বাড়িতে আলাদা থাকতে শুরু করে। আমি দূর থেকে শুধু তোদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে গিয়েছি, কিন্তু মেহেরিনের মনের ভেতরের সেই বিশ্বাস আর ভালোবাসা আমি নিজের হাতে ভে'ঙে গুঁ'ড়ো করে দিয়েছি।
এরপর ফ্রাঙ্ক মোরালেসের সাথেও আমার এক গোপন চুক্তি হয়েছিল, যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল মরোনার হাত থেকে মেহেরিনের সেই খু'নে'র প্রমাণগুলো উদ্ধার করা। ডেইগো অনেক আগে থেকেই রোজেলিয়াকে পাওয়ার জন্য পা'গ'ল ছিল। ওদিকে আফসার চৌধুরীর সাথেও আমার পুরোনো ব্যবসায়িক সুবাদে ভালো পরিচয় ছিল। ফ্রাঙ্ক তার ছেলের এই উ'ন্মা'দনা দেখে আমার কাছে এক প্রস্তাব নিয়ে আসে। সে বলে, আমি আফসার চৌধুরীকে এই ব্যাপারে রাজি করাতে পারি তবে বিনিময়ে সে মরোনা সিন্ডিকেটের লকার থেকে মেহেরিনের সেই সমস্ত প্রমাণ চুরি করে আমার হাতে তুলে দেবে।
সাথে আমাদের বড় কিছু ব্যবসায়িক চুক্তিও ছিল। এর মাঝেই আমি যখন স্পেনে ছিলাম, তখন হঠাৎ জানতে পারি তুই রোজেলিয়াকে তুলে নিয়ে গিয়েছিস এবং তাকে বিয়ে করেছিস। প্রথমে ভেবেছিলাম আমি আর এই নোংরা খেলায় জড়াবো না। কিন্তু তোর মায়ের এই ঘৃ'ণাও আমি নিতে পারছিলাম না ।তার থেকে এই দূরত্ব আমাকে ভিতরে ভিতরে পু'ড়ি'য়ে দিচ্ছিল তখন তোর মায়ের অ'ন্ধ মোহে আমি আবার সেই পা'পে পা দিতে বাধ্য হলাম।
আমি নিজেই ফ্রাঙ্ককে রোজেলিয়াকে কি'ডন্যা'প করার জন্য সাহায্য করেছিলাম। কিন্তু এখানে এসে ফ্রাঙ্ক মোরালেস আমার সাথে এক চরম বেইমানি আর ধোঁকাবাজি করল। মূলত, মরোনা সিন্ডিকেট ফ্রাঙ্কের এই চালের কথা গোপনে ধরে ফেলেছিল, তাই ফ্রাঙ্ক নিজের পিঠ বাঁচাতে শেষমুহূর্তে মরোনার সাথেই হাত মেলায়। তারা আরওয়াইন ম্যানশনের ভেতর নাইলা নামের এক স্পাই মেইডকে পাঠায়। কিন্তু রোজেলিয়া যেদিন আসলে কি'ডন্যা'প হয়, সেই নির্দিষ্ট দিনের কথা আমি প্রথমে জানতামই না। কথা ছিল, আমি নিজে রোজেলিয়াকে কৌশলে তাদের হাতে তুলে দেবো আর তারা আমাকে মেহেরিনের সেই প্রমাণগুলো দেবে। কিন্তু ফ্রাঙ্ক আমার আড়ালে উল্টো চাল চেলে দিল। সেই রাতের পর থেকে ফ্রাঙ্কের সাথে আমার আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।
তুই একবার আমাকে বলেছিলি, স্বামী আর বাবা হিসেবে আমি নাকি এই পৃথিবীর সবচেয়ে নি'কৃ'ষ্ট আর ব্যর্থ একটা চরিত্র। হ্যাঁ, তুই একদম ঠিক বলেছিলি, রিভেন। আমি আসলেই একজন চূড়ান্ত ব্যর্থ বাবা এবং এক জ'ঘন্য ব্যর্থ স্বামী। আসলে আমি বড্ড বেশি স্বা'র্থপরের মতো নিজের ভালোবাসাকে, মেহেরিনের জীবনকে বাকি সবকিছুর আগে প্রায়োরিটি দিয়ে ফেলেছিলাম। মেহেরিনকে বাঁচানোর জন্য আমি এতটাই অ'ন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম যে, তোর আর রোজেলিয়ার মধ্যকার সেই খাঁটি ভালোবাসার গভীরতা আমি চোখ থাকতেও দেখতে পাইনি। আমিও যেমন আমার স্ত্রীকে বাঁচানোর জন্য আন্ডারওয়ার্ল্ডের সমস্ত ন'রক এক করতে চেয়েছিলাম, তুইও ঠিক একইভাবে তোর স্ত্রীকে বাঁচানোর জন্য নিজের সর্বস্ব বা'জি ধরেছিলি। মেহেরিনকে বাঁচাতে গিয়ে দিনশেষে আমি নিজের ছেলের জীবনের সবচেয়ে বড় ভিলেন হয়ে দাঁড়ালাম।
আমি তোকে কোনোদিনও বলব না আমাকে ক্ষমা করে দিতে, কারণ আমি খুব ভালো করেই জানি যে আমি ক্ষমার অযোগ্য। মেহেরিনই আমার পুরো পৃথিবী ছিল, রিভেন। আজ সেই নেই।ভেবেছিলাম সব প্রমাণ নষ্ট করে মেহেরিনকে সব বলে দিয়ে বাকি জীবনটা একসাথে কাটাবো ।মেহেরিনকে ছাড়া আমার এই বেঁচে থাকা এখন এক জী'ব'ন্ত লা'শের চেয়েও কুৎসিত। আজ নিজেকে বড্ড ছোট, বড্ড নিঃস্ব আবিষ্কার করছি। আমি শুধু আশা করি, তুই অন্তত একজন গ্রেট বাবা হবি, আমার মতো এমন ব্যর্থ আর অ'ন্ধ হবি না। আমাকে তোর যত ইচ্ছে ঘৃ'ণা কর, রিভেন... তোর এই ঘৃণাই আমার প্রাপ্য। সুখে থাকিস, মাই সান।
আমি তোদের জীবন থেকে অনেক অনেক দূরে চলে যাচ্ছি। অনেক তো হলো এই র'ক্তে'র ব্যবসা, ক্ষমতার আভিজাত্য। আজ মেহেরিনের সাথে সাথে আমিও আমার এই সাম্রাজ্য, এই কারুসো এন্টারপ্রাইজের পদ থেকে অফিশিয়ালি অবসর নিচ্ছি। অল দ্য বিজনেস ইজ ইওরস নাও।
~আমার পৃথিবীটা আজ মেহেরিনের সাথেই চিরতরে নিভে গেছে, রিভেন । এখন শুধু তোর ঘৃ'ণার আ'গু'নে আমার এই অবশিষ্টাংশটুকু দগ্ধ হতে দে।
আমি অ'ন্ধ ছিলাম আভিজাত্যের মোহে, আজ সব ধুলো হয়ে যাওয়ার পর দেখি পৃথিবীর সবচেয়ে দামি সম্পদ ছিল তোর মায়ের ওই অবহেলা করা হাসিটুকু~
রিভেন চিঠির শেষ অংশটুকু পড়ার সময় তার হাতের আঙুলগুলো কাঁ'পছিল, যেন কাগজের প্রতিটি অক্ষর একেকটি জী'ব'ন্ত বি'ষা'ক্ত কাঁ'টা হয়ে তার হৃদপিণ্ডের স্পন্দনকে অ'বশ করে দিচ্ছে। প্রতিটি লাইনে ইভানোর সেই অমোঘ অনুতাপ আর ব্যর্থতার করুণ সুর এমন এক বি'ষাদময় আবহ তৈরি করল। এক অদ্ভুত, ম্লান এবং বি'ষাদাতুর স্তব্ধতা ঘরের প্রতিটি কোণে যেন পাথরের মতো জমে গেল। ইভানোর এই দীর্ঘ, র'ক্তিম স্বীকারোক্তি যেন এক দগদগে ক্ষ'ত, যা এতকাল পর সামনে এসে রিভেনের ভেতরের সমস্ত জমে থাকা আ'ক্রো'শ আর ঘৃ'ণাগুলোকে এক লহমায় ত'ছন'ছ করে দিয়ে তাকে এক গভীর শূন্যতার অতলান্তে ঠে'লে দিল।
চিঠির খামটার ভেতর থেকে একটা জরাজীর্ণ, হালকা হলদেটে রঙ ধরা গ্রিটিংস কার্ড মেঝেতে খসে পড়ল। রিভেন নিস্পৃহ ভঙ্গিতে কার্ডটা তুলে নিল।একটি বিবর্ণ হয়ে আসা গ্রিটিংস কার্ড যার কোণগুলো সময়ের চাপে কিছুটা নুইয়ে পড়েছে।কার্ডটা খোলার সাথে সাথে ভেতরে রিভেনের নিজের হাতের সেই অপরিণত, আটপৌরে কাঁচাহাতের লেখাটা ভেসে উঠল
'I love you, Dad. You are my superhero.'
নিচে তার নিজের নাম, রিভেন।
স্মৃতির অতল গহ্বর থেকে এক ঝটকায় ভেসে এল শৈশবের সেই অস্পষ্ট স্মৃতি।সে একবার
বিশ্ব বাবা দিবসে তার ড্যাডকে এই কার্ডটা দিয়েছিলো। তার চোখের সামনে সব দৃশ্যগুলো যেন একটা ফ্ল্যাশব্যাকে ভেসে উঠল। ইভানোর সেই রুক্ষ মেজাজ, তার কঠোরতা, তার অ'মা'নুষিক শাসনের আড়ালে এই কার্ডটা ছিল এক নি'ষিদ্ধ আ'বেগের রাজপ্রাসাদ, যা তিনি কোনোদিনও জনসমক্ষে প্রকাশিত হতে দেননি।
রিভেনের অনুভূতিগুলো এখন এক তীব্র ডাইকটমির দ্বন্দ্বে চূ'র্ণ-বি'চূর্ণ। একদিকে মেহেরিনের প্রতি ইভানোর সেই বেইমানি আর মিথ্যে অভিনয়ের গ্লানি, আর অন্যদিকে সেই মিথ্যেচারের আড়ালে লুকানো এক বাবার নীরব, অকথিত ত্যা'গের বী'ভৎস আখ্যান। সে অনুভব করতে পারল, এই দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে তার বাবা একাই যে আ'গুনের ওপর দিয়ে হেঁ'টেছেন, সেই আ'গুনের উ'ত্তাপ আজ তার নিজের শ'রী'রের ভেতরেও ত'প্ত সি'সার মতো ছড়িয়ে পড়ছে।
ক্ষমতার আভিজাত্যে মোড়ানো সেই শক্তপোক্ত খোলসের নিচে ইভানো কারুসো আসলে একজন চিরস্থায়ী, পরাজিত আর নিঃসঙ্গ পিতা ছাড়া আর কিছুই ছিলেন না। সে বুঝতে পারল, ইভানো কোনোদিন নিজের ইমোশন বা সংবেদনশীলতা প্রকাশের কোনো সুযোগ খুঁজে পাননি, কারণ যে সিংহাসনে তিনি বসেছিলেন, সেখানে দুর্বলতার কোনো পজিশন ছিল না।
রিভেন দীর্ঘদেহী অবয়বে ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর দিকে ঘুরে দাঁড়াল, রাতের অন্ধকার আর ম্লান জোৎস্নার নীলচে আভা তার হ্যাজেল চোখ দুটোতে এক রহস্যময় দ্যোতনা তৈরি করেছে। তার মনে হলো, ইভানো শুধু মেহেরিনকেই হারায়নি, বরং নিজের অস্তিত্বের প্রতিটি পরত হারিয়ে সে আজ এক শূ'ন্যতায় বিলীন হতে চলেছে। রিভেনের মনে হলো, সময়ের স্রোতে বয়ে যাওয়া প্রতিটি মুহূর্ত আজ তার বাবার ব্যর্থতাকে এক মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডিতে রূপান্তর করেছে। ঘরের স্তব্ধতায় কেবল তার নিজের হৃ'দপিণ্ডের ধুকপুক শব্দ আর বাইরে থেকে ভেসে আসা হালকা শব্দ শোনা যাচ্ছে।
সে নিজের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা অনুভব করল যা তাকে ক্রো'ধ থেকে করুণার দিকে, আর ঘৃণা থেকে এক অবর্ণনীয় বি'ষাদের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।বাবার রেখে যাওয়া অফিশিয়াল লিগ্যাসি, এই কারুসো এম্পায়ারের সমস্ত দায়ভার আজ রিভেনের স্কন্ধে এসে চেপেছে, অথচ তার প্রতিটি স্নায়ু যেন এই মুহূর্তে এক তীব্র, বি'ষা'ক্ত দ'হনে পু'ড়ে ছা'ই হয়ে যাচ্ছে। রিভেনের চোখের সামনের সবকিছুই যেন মিলেমিশে এক চূড়ান্ত গথিক নিস্তব্ধতার সৃষ্টি করল, যেখানে আর কোনো শব্দের অবকাশ নেই, আছে শুধু এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন, যার উত্তর খুঁজতে গিয়ে রিভেন আজ তার নিজের স'ত্ত্বাকেই যেন এক অচেনা দিগন্তে হারিয়ে ফেলছে।
________________
আরওয়াইন ম্যানশনের মাটির গভীরতম স্তরে অবস্থিত টর্চার সেলটির পরিবেশ এখন এক স্থবির, বী'ভৎস এবং গথিক বি'ভীষি'কার আধার। ঘরের বাতাসটা ভারী হয়ে আছে পে'ট্রো'লের এক বি'দঘুটে গন্ধে, যা নিঃশ্বাসের সাথে নিতে গেলে ফুসফুসের গভীরে এক তীব্র জ্বা'লাপো'ড়ার সৃষ্টি করে। ছাদের অনেক ওপরে দেয়ালে সেই প্র'ল'য়ংকরী অ'গ্নিকা'ণ্ডের ফলে সৃষ্ট বিশালাকার কালো ধোঁয়ার দাগগুলো যেন এক আদিম ড্রা'গনের নিঃশ্বাসের ছাপ, যা এই কক্ষের প্রতিটি ইঞ্চি জুড়ে এক অবর্ণনীয় অন্ধকার লেপ্টে রেখেছে। ঘরের এক কোণে ফ্রাঙ্ক মোরালেসকে বেধে রাখা চেয়ারটা এখন অর্ধভ'স্মীভূ'ত এক ক'ঙ্কা'লের মতো পড়ে আছে।
পাশেই ডেইগো মোরালেসের শি'ক'লবদ্ধ শ'রী'রটা এক বী'ভৎস পরিণতির সাক্ষ্য বহন করছে তার কাঁধ থেকে পিঠ পর্যন্ত সাইলাস এবং মার্কোর নি'ষ্ঠু'র হা'তের নি'খুঁত নকশায় করা গভীর ক্ষ'তগুলো এখন নীলচে-কালো বর্ণের হয়ে ফুলে উঠেছে, যেখানে জমে থাকা জমাট র'ক্ত আর কা'টা চা'ম'ড়ার ভাঁ'জে বাসা বেঁধেছে এক জ্যা'ন্ত প'চন। ডেইগো নিজের য'ন্ত্র'ণায় মাঝে মাঝে হিসহিস করে উঠছে, তার চোখের মণি তখনো এক অ'মা'নবিক আ'ক্রো'শে উ'ত্ত'প্ত, যেন প্রতিটা সেকেন্ড তাকে এক নতুন ন'রক দর্শনের অভিজ্ঞতায় দগ্ধ করছে।
এই অস্বস্তিকর, পৈশাচিক পরিবেশে লোহার দরজাটা কিড়মিড় শব্দে খুলে গেল। বাইরের করিডোর থেকে একচিলতে ম্লান আলো ভেতরে এসে আছড়ে পড়ল, আর সেই আলোর রেখায় ছায়ার মতো প্রবেশ করল রোজেলিয়া। সে আগে কোনোদিন এই অন্ধকার গোলকধাঁধায় পা রাখেনি। তার চপল, কোমল পদচারণায় মেঝের ওপর পড়ে থাকা র'ক্তর'ঞ্জিত ধুলোবালি এক অদ্ভুত ছন্দে যেন কেঁপে উঠল। রোজেলিয়ার গায়ের রেশমি কাপড়ের মৃদু ঘ্রাণ এই বি'ষা'ক্ত পরিবেশের সাথে এক বিপরীতধর্মী বৈপরীত্য তৈরি করল তার চোখের তারায় তখন ভীতির এক সূক্ষ্ম মিশ্রণ, সে যেন এক ধবল শুভ্র রাজহাঁস যা ভুলক্রমে কোনো এক শ্বা'পদসং'কুল অন্ধকার বনের গভীরে এসে পড়েছে। সে নিজের স্নিগ্ধ চোখের দৃষ্টি দিয়ে সারা ঘরটা একবার নিরীক্ষণ করল, যেখানে রিভেনের হাতের নি'ষ্ঠু'র ছাপ প্রতিটা দেয়ালে, প্রতিটা শিক'লে স্পষ্ট হয়ে খো'দাই করা আছে।
বাইরে রিভেনের সেই দীর্ঘদেহী, ইস্পাতকঠিন অবয়বটা ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে, তার হাতের সি'গারেটের ধোঁ'য়া কুয়াশার মতো করিডোরে ভাসছে। সে রোজেলিয়াকে একা ভেতরে পাঠাতে মোটেও রাজি ছিল না, তার ভেতরের ডমিনেটিং ডে'ভিল স'ত্ত্বা রোজেলিয়ার কোমল অস্তিত্বকে এই ন'র'কের বী'ভ'ৎসতা থেকে দূরে রাখতে চায়, কিন্তু রোজেলিয়ার চোখের সেই আকুতিমাখা জেদের কাছে রিভেনের পাথরসম শীতলতা অবশেষে এক প্রবল ক'ম্পনে ভে'ঙে গিয়েছিল।
ডেইগো মোরালেস যার আ'ক্রো'শে একদা আ'গু'ন ঝরতো, আজ সে কেবল এক জ্যা'ন্ত ক'ঙ্কা'ল। তার ভালো চোখটা রোজেলিয়ার পায়ের শব্দের সাথে সাথে ধীরে ধীরে খুলে গেল। সিলিংয়ের ম্লান আলোয় ডেইগোর মুখাবয়বটা তখন এক বী'ভৎস মা'স্কের মতো দেখাচ্ছে, ঠোঁটের কোণে শুকিয়ে যাওয়া র'ক্তে'র কালচে দা'গ আর চোখের কোটরে জমে থাকা সেই চিরচেনা হিংস্রতা। সে রোজেলিয়াকে দেখা মাত্রই তার ধ'ম'নীতে প্রবাহিত র'ক্ত যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। তার নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল, বুকটা হাঁপড়ানোর মতো ওঠানামা করছিল, আর প্রতিটি নিশ্বাসের সাথে সাথে তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছিল এক অস্ফুট গো'ঙা'নি।তার দৃষ্টিতে ছিল এক আদিম, তৃ'ষ্ণার্ত ব্যা'কুলতা ঠিক যেন এক দীর্ঘ মরুবাসীর চোখে তৃ'ষ্ণার জল দেখার আনন্দ। তাদের মাঝে তখন এক ভারী, নিস্তব্ধতার প্রাচীর, যেন পৃথিবীর সমস্ত শব্দ থমকে গিয়ে কেবল হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানিকে এক অমোঘ বাস্তবতায় রূপ দিয়েছে।
ডেইগোর কণ্ঠস্বর বেরিয়ে এল এক ভাঙা, কর্কশ সুরের অনুরণনে, যা মরুভূমির শুকনো পাতার খসখস শব্দের মতো বিমর্ষ,
"ডল...।"
রোজেলিয়ার চোখের মণি দুটো তৎ'ক্ষ'ণাৎ এক তীব্র দ্রো'হে চিড়বিড় করে উঠল। তার ভেতরের সমস্ত সংবেদনশীলতা এক লহমায় যেন পা'রদ চড়ার মতো উ'ত্তপ্ত হয়ে উঠল। সে এক শীতল কিন্তু ধা'রা'লো স্বরে জিজ্ঞেস করল,
"কেন করলে এমন, ডেইগো? আমার মা-বাবা কি কোনোদিন তোমার কোনো অনিষ্ট করেছিলেন? কোন অধিকারে তুমি এই নিরপরাধ মানুষগুলোর জীবন নিলে? তাদেরকে হত্যার সেই পৈ'শা'চিক দৃশ্যপট কি একবারও তোমাদের অনুশোচনার সাগরে নিমজ্জিত করেনি? আমাকে দিনের পর দিন ড্রা'গ'স দিয়ে যে অ'বশ করে রেখেছিলে, আমার স্মৃ'তিশক্তিকে যেভাবে মুছে দিয়েছিলে , তোমার ওই অন্ধকার বাড়ির চার দেয়ালের ভেতর দিনের পর দিন আমি নিজেকে শুধুই একটি পুতুল মনে করতাম। এক বিমূর্ত, অনুভূতিহীন পুতুল, যার নিজের কোনো সত্তা ছিল না, কোনো অস্তিত্ব ছিল না, কেবল ছিল এক অন্ধকার শূন্যতা।"
রোজেলিয়ার কণ্ঠস্বর কাঁপছে না, বরং তাতে মিশে আছে এক ধিক্কৃত আ'গ্নে'য়গি'রির অ'গ্ন্যু'ৎপাত। সে ডেইগোর র'ক্তমা'খা চোখের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন কোনো দর্পণে সে নিজের অতীতের সমস্ত ক্ষ'তগুলোকে আজ নতুন করে পাঠ করতে চাইছে। ডেইগো স্তব্ধ, তার চাউনি তখনো রোজেলিয়ার অবয়বে স্থির, যেন এক চিরন্তন অপরাধী তার সাজা পাওয়ার অপেক্ষায় মৃ'ত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে।
রোজেলিয়া এগিয়ে এল আরও কিছুটা কাছে, তার চোখের বাদামী আভা তখন ঝড়ের রাতের আকাশের মতোই ধূসর ও মেঘাচ্ছন্ন। সে মৃদু কিন্তু তীক্ষ্ণ স্বরে আবার বলে উঠলো,
"এই যে আভিজাত্য আর ক্ষমতার দম্ভে তোমরা যে মাফিয়া সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলে, তা কি কখনো ভেবে দেখেছিলে এর নিচে কতগুলো নি'ষ্পা'প প্রা'ণের হাহাকার চাপা পড়ে আছে? তোমরা কেবল ধ্বং'স করতে জানো, ডেইগো"
ডেইগো তার শিকলবদ্ধ হাত দুটো নাড়ানোর নিষ্ফল চেষ্টা করে এক গভীর, বি'ষা'দগ্রস্ত কন্ঠস্বরে ফিসফিসিয়ে উঠল, যেন কোনো এক হারানো সুরের আর্তনাদ,
"সব... সব শুধু তোমাকে পাওয়ার জন্য করেছি, ডল। এই ন'রক, এই র'ক্ত, এই নিষ্ঠুরতা সবটাই কেবল তোমায় নিজের করে পাওয়ার এক উ'ন্মাদ বাসনা ছাড়া আর কিছুই ছিল না।"
রোজেলিয়ার বুকটা এক অমোঘ ভারী য'ন্ত্রণায় দুমড়ে-মুচড়ে উঠল। তার মনে হলো, ডেইগোর এই পৈ'শা'চিক প্রেমের স্বীকারোক্তি যেন এক ধা'রা'লো ছু'রির মতো তার হৃদপিণ্ডের গভীরে প্রবেশ করে আবেগগুলোকে ক্ষ'তবি'ক্ষ'ত করে দিচ্ছে। বাইরের দরজার ওপাশে থাকা রিভেনের চোয়াল তখন রাগে ও অপমানে শক্ত হয়ে উঠেছে, যেন এক ক্ষু'ধা'র্ত বাঘিনীকে তার শি'কারে আ'ঘাত করতে দেখে তার ভেতরের ডেভিল সত্ত্বা আজ আর কোনো বিধি-নিষেধের তোয়াক্কা করছে না।
রোজেলিয়ার কণ্ঠস্বর এখন এক স্থির সমুদ্রের মতো গাম্ভীর্যে পূর্ণ, যা ডেইগোর সেই উ'ন্মা'দনার দাউদাউ আ'গু'নের ওপর এক শীতল জলধারা হয়ে বর্ষিত হলো। তার চোখের মণি দুটো এখন এক অনমনীয় ইস্পাতের মতো চকচক করছে, যেখানে কোনো মায়া বা করুণার লে'শমাত্র নেই।
"তোমার এই লিপ্সা আর অধিকারবোধকে তুমি যদি ভালোবাসা বলো, তবে তুমি জীবনের সবচেয়ে বড় ভ্রান্তির মাঝে বন্দি হয়ে আছ, ডেইগো। তোমার এই তথাকথিত উ'ন্মা'দনা আমাকে কোনোদিনও স্পর্শ করতে পারেনি, বরং প্রতিটা মুহূর্তে তোমাকে এক অ'মা'নুষিক দা'নব হিসেবেই দেখেছি। আর আমার হৃদয়? সে অনেক আগেই কারো জন্য সমর্পণ করা হয়েছে। সেই মানুষটি রিভেন, যার ভালোবাসা তোমার মতো কোনো হিং'স্র জা'নো'য়ারের বোঝার ক্ষমতা নেই।"
রোজেলিয়ার এই স্পষ্টভাবে উচ্চারিত সত্য বাক্যগুলো ডেইগোর ম'স্তি'ষ্কের কোষে কোষে এক বি'ষা'ক্ত বি'দ্যু'তের মতো আ'ছড়ে পড়ল। তার শ'রী'রটা শিকলের চাপে যন্ত্রণায় কুঁ'কড়ে গেল, চোয়ালের হাড়গুলো আ'ক্রো'শে ফে'টে পড়ার উপক্রম হলো। ডেইগো নিজের র'ক্তমা'খা দাঁতগুলো কিড়মিড় করে এক পৈ'শা'চি'ক অট্টহাসি দিয়ে উঠল, যা টর্চার সেলের স্যাঁতসেঁতে দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে এক ভু'তু'ড়ে বি'ভী'ষি'কা তৈরি করল। সে তার অবশিষ্ট চোখটি দিয়ে রোজেলিয়ার দিকে তাকিয়ে ঘৃণা আর ঈর্ষার এক জঘন্য মিশ্রণে গর্জে উঠল,
"তুমি তোমার হৃদয় সমর্পণ করেছ রিভেনকে?! রিভেনের অনেক আগেই নিয়তি তোমাকে আমার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছিল? সেই ভাগ্যবিধাতা তোমাকেই আমার জন্য নির্দিষ্ট করেছিল, আর ওই রিভেন আরওয়াইন... সে এক চোর! আমার সাজানো বাগান থেকে আমারই গোলাপকে সে রাতের অন্ধকারে চুরি করে নিয়ে গেছে! তুমি কি অস্বীকার করতে পারবে? প্রথমবার আমাদের সেই দেখা হওয়াটা ছিল মহাজাগতিক এক সংকেত?"
রোজেলিয়া ডেইগোর এই বিকৃত যুক্তিতে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল না তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক তাচ্ছিল্যের মৃদু রেখা। সে অবজ্ঞার সাথে বলল,
" নিয়তি শব্দটা তোমাদের মতো খু'নিদের মুখে খুব বেমানান, ডেইগো। ভাগ্য আমাকে তোমার সামনে এনেছিল ঠিকই, কিন্তু তোমার শৃঙ্খল পড়ার জন্য নয়, বরং তোমার ন'রকের স্বরূপ দেখার জন্য। আর রিভেন কোনো চোর নয়, সে আমার র'ক্ষক। আমি কোনো পুতুল নই যে কেউ এসে আমাকে চুরি করবে। আমি একজন মানবী, আর আমার প্রতিটি সিদ্ধান্তের মালিকানা কেবল আমার নিজের। রিভেনের সাথে আমার মিলনের কোনো মহাজাগতিক সংকেত ছিল না, ছিল কেবল এক অবিনাশী আ'ত্মিক টান, যা তোমার মতো কোনো অন্ধকার সত্ত্বার বোধগম্য হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।"
রোজেলিয়ার কথাগুলো ছিল যেন ত'প্ত সি'সার মতো ধা'রা'লো, যা ডেইগোর প্রতিটি অহংকারে আ'ঘা'ত হানছিল। দরজার ওপাশে থাকা রিভেনের মুষ্টিবদ্ধ হাতগুলো রি'ভলভা'রের হাতলে এমনভাবে চেপে বসল যে তার চা'মড়া সাদা হয়ে গেল। ডেইগো য'ন্ত্রণায় আর ক্রো'ধে ছটফট করতে করতে আর্তনাদ করে উঠল,
"মিথ্যে! সব মিথ্যে! তুমি শুধু ওর ক্ষমতার আর ওর ওই অন্ধকার আভিজাত্যের মোহে পড়ে আছ! তুমি আমার, রোজেলিয়া! তুমি আমারই হওয়ার কথা ছিল!"
রোজেলিয়া এক মুহূর্তের জন্য নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তারপর শান্ত অথচ অমোঘ স্বরে উচ্চারণ করল,
"আমি তোমার না ডেইগো কখনো তোমার হবোও না । তুমি আমাকে পাওয়ার জন্য আমার অস্তিত্বকে মিটিয়ে দিতে চেয়েছিলে, আর রিভেন আমাকে পাওয়ার জন্য নিজের অস্তিত্ব বিলিয়ে দিয়েছিল। তোমার আর তার পার্থক্যটা ঠিক এই জায়গাতেই, ডেইগো। আজ তুমি তোমার এই অন্ধকার কুঠুরিতে শিকলে বন্দি, আর আমি রিভেনের হৃদয়ের সেই সিংহাসনে যেখানে তোমার মতো প'শুর কোনোদিনও প্রবেশের অধিকার ছিল না।"
ডেইগোর মুখটা আ'ক্রো'শে কুঁকড়ে গেল। তার সেই একটাই চোখ, আ'গু'নের মতো লা'ল হয়ে উঠল। শিকলে টান পড়ল সজোরে। মেঝের র'ক্তে ভেজা ধুলো উড়ে উঠল বাতাসে।
সে ফিসফিস করে বলল,
"আমার হৃদয়টা শুধু তোমার জন্যই কাঁদে শুধু তোমাকে ভালোবাসে।"
তার গলার স্বর অদ্ভুত শোনাচ্ছিল। যেন ভাঙা কাচের আ'র্ত'নাদ।
"এই হৃদপিণ্ড, রোজেলিয়া...That shit only beat for you ।"
রোজেলিয়া এক কদম পিছিয়ে এল। তার চোখে ঘৃ'ণা আর গ্লানি। সে শীতল গলায় বলল। "এটা ভালোবাসা নই এটা কেবলই তোমার অসুস্থ দখলদারি ।"
ডেইগো গর্জে উঠল,
"ভালোবাসা আর দখলদারির মধ্যে খুব সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে।" সে হাঁপাতে লাগল। "আমি তোমাকে আমার করে পেতে চেয়েছিলাম, সব উপায়ে।খুব করে পেতে চেয়েছিলাম তোমাকে"
ডেইগোর ক'র্কশ, আ'র্তনাদমাখা স্বীকারোক্তিগুলো ঘরের গুমোট বাতাসে এক বি'ষা'ক্ত ঢেউয়ের মতো আ'ছড়ে পড়ছে, কিন্তু রোজেলিয়ার চেতনার গভীরে তার কোনো প্রতিধ্বনিই নেই। সে তার চোখের পলক না ফেলে ডেইগোর র'ক্তা'ক্ত, বি'কৃ'ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন কোনো এক প'চনশীল ক্ষ'তের গভীরতা মাপছে সে।রোজেলিয়া অত্যন্ত ধীর, অথচ তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,
"পার্থক্যটা সূক্ষ্ম নয়, আকাশ আর পাতালের ব্যবধান। ভালোবাসা মানে হলো প্রিয়জন যখন মুক্ত বিহঙ্গ হয়ে আকাশ ছোঁয়, তখন তার ডানা হয়ে পাশে থাকা আর দখলদারি মানে হলো খাঁচায় বন্দি করে সেই ডানাগুলো ছেঁ'টে দেওয়া। তুমি আমাকে পেতে চেয়েছিলে ঠিকই, কিন্তু সেই পাওয়ার নেশায় তুমি আমার অস্তিত্বের সমস্ত রঙ মুছে দিয়েছিলে। তুমি আমাকে আমার ছায়া থেকেও আলাদা করতে চেয়েছিলে, আর সেটাকে তুমি নাম দিচ্ছ ভালোবাসা?"
ঘরজুড়ে তখন এক শ্ম'শা'নতুল্য স্তব্ধতা, কেবল মাঝেমধ্যে লোহার শিকলে ডেইগোর শ'রী'রের ঘ'র্ষণে এক ঝনঝন শব্দ শোনা যাচ্ছে।অনেকক্ষণ নিস্তব্ধতার পর সে তার অবনত মস্তকটি আস্তে আস্তে ওপরে তুলল তার সেই র'ক্তা'ভ অ'ক্ষিগোলক এখন এক অদ্ভূত শূন্যতায় ভরা, যেন কোনো এক পরিত্যক্ত শিল্পকলা গ্যালারির ক্যানভাস।
সে এক ধীর, মন্থর কণ্ঠে শুরু করল, তার প্রতিটি শব্দ যেন পুরনো কোনো গ্রামোফোনের কাটা রেকর্ডের মতো খসখসে,
"যাও তোমার কথায় মেনে নিলাম, রোজেলিয়া। এই ডেইগো মোরালেসের অভিধানে ভালোবাসা শব্দটির কোনো ব্যাকরণই নেই। আমি শৈশব থেকেই সাধারণ শিশুদের মতো হইনি। আমার চারপাশ ছিল কেবল অন্ধকারের দেয়াল দিয়ে ঘেরা। ড্যাড আমাকে ঘরেই বন্দি করে রাখতেন কারণ সাধারণ বাচ্চাদের মতো আমি সবার সাথে মিশতে পারতাম না।বাইরের কোনো বাচ্চা ও আমার সাথে মিশতো না এমনকি কাজিনদের মধ্যেও শুধু রাউল ছাড়া সবাই আমাকে অবজ্ঞা করতো । বাইরের উ'ন্মু'ক্ত আকাশের নিচে যাওয়ার কোনো অনুমতি ছিল না আমার। স্কুল, কলেজ, খেলাধুলা সবকিছুই আমার জন্য ছিল এক নি'ষিদ্ধ জগতের হাতছানি। আমার একাকীত্বের একমাত্র সঙ্গী ছিল আমার শিল্প। ক্লে-মডেলিং, পেস্টেল আর্ট এই জগতটাই ছিল আমার নিঃশ্বাসের সমতুল্য। আমি যখন মনের মাধুরী মিশিয়ে রঙের খেলায় মগ্ন থাকতাম, তখন নিজেকে এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ বলে মনে হতো। আমার আঁকা চিত্রকর্মগুলো যখন আর্ট গ্যালারিতে প্রদর্শিত হতো, তখন পৃথিবী আমাকে এক মহান শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি দিত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় কী জানো? সেই গ্যালারির ভিড়ে আমি কোনোদিনও নিজেকে উপস্থিত রাখতে পারিনি। ডেইগো মোরালেসকে শিল্পী হিসেবে সবাই চিনেছে, কিন্তু মানুষ হিসেবে কেউ কোনোদিনও আমাকে দেখার সুযোগ পায়নি"
সে কিছুটা বিরতি নিয়ে রোজেলিয়ার দিকে এক অদ্ভুত, ম্লান চাউনিতে তাকাল। তার মুখে এখন এক ম'রীচি'কার মতো হাসি। সে আবার বলতে লাগল,
"জানো ডল, আমার জীবনে একজন ছিল, নাতাশা। সে চুরি করতে এসেছিল আমাদের আস্তানায়, আর আমি তাকে হা'তেনাতে ধরে ফেলেছিলাম। আমার পরিচয় জেনে ফেলার অপরাধে ড্যাড তাকে হ'ত্যা'র আদেশ দিয়েছিলেন, আমিই তাকে সেদিন মৃ'ত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছিলাম।ড্যাডকে অনুরোধ করে তাকে নিজের কাছে বন্দী করে রাখি নিজের হ্রদয়ে জায়গা দেয় ।সে ছিল আমার প্রথম আশ্রয়। কিন্তু নিয়তি তাকেও আমার পাশে থাকতে দিল না। ঠিক তার অনেক বছর পর, হঠাৎ একদিন তোমাকে দেখলাম। সেই প্রথম দেখায়, নার্সের গায়ে হাত তোলার অ'পরাধে তুমি আমার গালে এক প্রচণ্ড চ'ড় বসিয়ে দিলে। ইতিহাসে খুব কম মানুষেরা এই ডেইগো মোরালেসের গায়ে হাত তোলার ধৃ'ষ্টতা দেখিয়েছে আমার কাজিন জেইডান ছাড়া আমার ড্যাডও কোনোদিন আমার গায়ে হাত তোলেনি। আমি ভেবেছিলাম তোমার সেই হাতের হা'ড়গুলো আমি গুঁ'ড়ি'য়ে দেবো। কিন্তু... আমি থেমে গেলাম।"
ডেইগোর হাসির রেখাটি আরও গাঢ় হলো, তবে তাতে কোনো উষ্ণতা নেই, আছে কেবল এক হিমশীতল বি'কৃতি। সে ফিসফিস করে উঠল,
"তোমার সেই মায়াবী, অপার্থিব সৌন্দর্য আমার মগজে এক নে'শার মতো গেঁথে গেল। কোনো শিল্পীর তুলিতেও বোধহয় তোমার ওই চাহনির গভীরতা ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়। তখন থেকেই তোমাকে কেবল আমারই করে পেতে চেয়েছিলাম। আমি দেখেছি তুমি রিভেনকে ভালোবা..., তাই আমি বাধ্য হয়েছিলাম তোমাকে ড্রা'গ'স দিয়ে আমার কবজায় রাখতে। তোমাকে আমার নিজস্ব একটা আর্টপিস বানাতে চেয়েছিলাম, যেখানে কেবল আমারই আধিপত্য থাকবে।"
রোজেলিয়া পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার হৃদপিণ্ড তখন এক অদ্ভুত দোলাচলে দুলছে একদিকে ঘৃণা, অন্যদিকে এই বি'কৃত, শৈ'ল্পিক মানসিকতার এক চরম বিজাতীয় অনুভূতি।ডেইগোর কণ্ঠস্বর এবার এক ক্ষয়িষ্ণু মোমবাতির শিখার মতো কাঁপছে। তার সেই রক্তাভ চোখের মণি দুটোয় ঘৃ'ণা আর পৈ'শা'চি'কতার পাশাপাশি আজ প্রথমবারের মতো এক অদ্ভুত, করুণ আত্মলীনতা ফুটে উঠেছে।
সে তার শিকলবদ্ধ হাত দুটো রোজেলিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিতে চাইল, যদিও লোহার কড়াকড়ি তাকে এক ইঞ্চির বেশি এগোতে দিল না।
ডেইগোর স্বর এখন ফিসফিসানি,
"তুমি যখন বাস না পেয়ে অফিস থেকে হেঁটে হেঁটে বাড়ি যেতে রোজেলিয়া, আমি আড়াল থেকে তোমাকে দেখতাম। তোমার হাঁটার ছন্দ... থেকে শুরু করে সব যেন আমার আঁকা কোনো অসম্পূর্ণ ক্যানভাসের নিখুঁত পূর্ণতা। আমি চেয়েছিলাম তোমাকে আলাদা করে আমার নিজের আলয়ে সাজিয়ে রাখতে। আমি জানি, আমি ভুল... ভীষণ ভুল ছিলাম। তোমার ওই চ'ড়টা আমার ভেতরের সেই প'চ'নশীল শিল্পীসত্তাকে প্রথমবার জাগিয়ে তুলেছিল। বিশ্বাস করো... আমার এই শেষ সময়ে এসে কেবল তোমার চ'ড় মা'রা হাতটার উষ্ণতাই আমার মনে পড়ছে, ওটা ছাড়া আমার আর কোনো স্মৃতি নেই যা আমাকে মানুষ বলে মনে করিয়ে দেয়।"
ডেইগোর চোখের কোণ চিরে এক ফোঁটা লোনা জল গড়িয়ে পড়ল, যা তার গালে লেগে থাকা শু'কনো র'ক্ত আর ধুলোর সাথে মিশে এক অদ্ভুত দাগ তৈরি করল। সে রোজেলিয়ার দিকে এক চরম কাতর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, যেন এক তৃ'ষ্ণার্ত চাতক মেঘের দিকে তাকিয়ে আছে,
"আমাকে ঘৃণা করো, আমার অস্তিত্বকে পু'ড়ি'য়ে ছা'ই করে দাও... কিন্তু একবারের জন্য হলেও ওইদিনকার মতো আমার চোখের দিকে তাকিয়ে অন্তত ঘৃ'ণাটা প্রকাশ করো। আমার ওই অ'ভিশ'প্ত চোখে আর কিছু দেখার বাকি নেই।"
রোজেলিয়া স্তব্ধ। ডেইগোর এই অভাবিত, কোমল ও শৈল্পিক স্বীকারোক্তি যেন তার সমস্ত ঘৃণা আর ক্ষোভের দেয়ালে ফা'টল ধরাতে শুরু করেছে। তার নখগুলো নিজের হাতের তালুর চা'ম'ড়ায় বিঁধে রইল।
ঠিক সেই মুহূর্তে।এক প্রলয়ংকরী শব্দে ট'র্চার সে'লের লোহার দরজাটা আ'ছড়ে খুলে পড়ল দেওয়ালের গায়ে। রিভেনের প্রতিটি পেশি তখন এক বিস্ফোরিত আগ্নেয়গিরির মতো টানটান হয়ে আছে, সে এক বিদ্যুৎগতিতে ঘরের ভেতরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার হ্যাজেল চোখ দুটো থেকে যেন আ'গু'নের ফু'লকি ঝরছে। রোজেলিয়ার দিকে ডেইগোর সেই কাতর চাউনি আর তাদের মধ্যকার ওই অদ্ভুত নিস্তব্ধতা রিভেনের ভেতরের ডে'ভিলকে চূড়ান্ত মাত্রায় পা'গল করে তুলেছিল।
রিভেন এক মুহূর্তের জন্য থামল না। তার হাতে থাকা নাইন এমএম সেমি অ'টোমেটিক পি'স্ত'লটি তৎক্ষণাৎ ডেইগোর কপালের ঠিক মাঝখানে তা'ক হলো। ডেইগোর সেই বাঁচার শেষ আর্তিটুকু তার ঠোঁট পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই রিভেন গর্জে উঠল,
"তোর ওই নোং'রা মুখ আর আমার স্ত্রীর দিকে তোর ওই কুৎ'সিত দৃষ্টি... আজ এসব আমি চিরতরে বন্ধ করে দেব"
ট'র্চার সেলের স্তব্ধতাকে চু'রমার করে একযোগে চারটি গু'লি'র শব্দ গর্জে উঠল। প্রথম দুটো গুলি ডেইগোর কাঁধের হা'ড় চুরমার করে দিল, আর বাকি দুটো গু'লি তার মাথার খু'লি ভে'দ করে পেছনের দেওয়ালে র'ক্ত আর ম'গ'জের ছি'টেফোঁ'টা এঁকে দিল। ডেইগোর সেই উ'ন্মা'দ, শিল্পীসুলভ চাউনিটা এক লহমায় নিভে গিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
রোজেলিয়া শিউরে উঠে চি'ৎকার দিয়ে নিজের দুই হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে মেঝের ওপর বসে পড়ার উপক্রম হতেই রিভেন চিতার ক্ষি'প্রতায় তার দিকে এগিয়ে গেল। এক প্রবল টানে সে রোজেলিয়াকে নিজের ইস্পাতকঠিন বক্ষপটের সাথে লেপ্টে নিল, যেন তাকে এই জগতের সমস্ত বী'ভৎ'সতা থেকে আড়াল করে নিজের ভেতরেই বিলীন করে দিতে চায়। রিভেনের চওড়া পিঠের পেশিগুলো রোজেলিয়ার শরীরের ওপর এক রক্ষাকবচের মতো আস্তরণ তৈরি করে রাখল।
ঘরের টিমটিমে হলুদ আলোর নিচে ডেইগো মোরালেসের নি'থর দে'হটি এখন এক বী'ভৎস ভাস্কর্য। তার মা'থার খু'লির পেছনের অংশটি আংশিক ছি'ন্নভি'ন্ন হয়ে যাওয়ায় মেঝের ধুলো আর র'ক্ত মিশে এক গাঢ় লাল কাদার আ'স্তরণ তৈরি করেছে। তার সেই অবশিষ্ট হ্যাজেল চোখটি তখনো আধখোলা, যেন মৃ'তু্যর ঠিক আগের সেই কাতর চাহনিটি কোনো এক অদৃশ্য ক্যানভাসে চিরস্থায়ীভাবে এঁকে দিয়ে গেছে। গু'লি'র আ'ঘা'তে তার শ'রী'রের হা'ড়গুলো এমনভাবে বেঁকে গেছে যে, তাকে দেখে মনে হচ্ছে কোনো এক উন্মাদের হাতে ভা'ঙা কোনো বি'কৃত ক্লে-মডেল।
রিভেন তার থুতনিটা রোজেলিয়ার চুলের ওপর রেখে, তার কম্পমান শরীরটাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার বুকের ভেতরকার ধুকপুকানি রোজেলিয়ার কাঁধে এক ছন্দের মতো আ'ঘা'ত করছে, যা এই মুহূর্তের সমস্ত পৈ'শা'চি'কতাকে যেন কিছুটা ম্লান করে দিচ্ছে।
রিভেন এক রুদ্ধ কণ্ঠস্বরে, রোজেলিয়ার কানের কাছে ফিসফিস করে উঠল,
"আমি আছি রোজ... আমি আছি। আর কোনো ভয় নেই।"
কিন্তু রোজেলিয়ার সারা শরীর তখনও ঝড়ের কবলে পড়া পাল তোলার মতো থরথর করে কাঁপছে। তার চোখের পাতায় লেগে থাকা অশ্রুগুলো রিভেনের শার্টে বিন্দু বিন্দু করে ঝরে পড়ছে। সে রিভেনের জামাটা নিজের মুঠোয় শক্ত করে আঁ'কড়ে ধরে আছে, যেন এই মানুষটির উপস্থিতিই তাকে এই ন'রক থেকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে নেওয়ার একমাত্র সেতুবন্ধন।
To be continue,,,,
[রিচেক করা হয়নি ,ভুলত্রুতি ক্ষমা করবেন ]