#প্যারাডাইস_অফ_সিন্স ( paradise of sins) #লেখনিতে_ফারিহা
পর্ব ৫৫
(কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ ❌)
সাইলাস করিডোর দিয়ে হেঁটে আসার সময় শেষ প্রান্তের বাঁকটা নিতেই তার মুখোমুখি হলো আভা। তার চোখের কোণে জমে থাকা ক্লান্তি আর দূরত্ব সাইলাসের নজর এড়ালো না। আভা কোনো কথা বলল না, এক পরম নিস্পৃহতায় সাইলাসকে পাশ কাটিয়ে করিডোরের অন্য প্রান্তে মিলিয়ে গেল। সাইলাস এক মুহূর্তের জন্য তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের গন্তব্যের দিকে পা বাড়াল।
সে এসে এরিকার ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দরজার পাল্লার সূক্ষ্ম ফাঁক গলে ঘরের ভেতরের দিকে তাকালো। খাটের ঠিক মাঝখানটায় একদম গুটিসুটি মেরে বসে আছে এরিকা। দুই হাঁটুর ওপর নিজের ফ্যাকাশে মুখটা গুঁজে দিয়ে সে এক অতলান্তিক, গভীর চিন্তায় মগ্ন। ঘরের জানালার পর্দাগুলো টেনে দেওয়া, যার ফলে বিকেলের ম্লান আলোটুকুও ঘরের ভেতর প্রবেশ করতে পারছে না। চারপাশের এই কৃত্রিম অন্ধকার যেন এরিকার ভেতরের অবরুদ্ধ শোকের পরিধিটাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এরিকাকে এভাবে দেখে সাইলাসের হৃদপিণ্ডের পা'রদে এক তীব্র অপরাধবোধ আর খারাপ লাগা আছড়ে পড়ল। আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই রুদ্ধশ্বাস কাজের চাপে বিগত কয়েকটা দিন এই নিষ্পাপ মেয়েটার দিকে একটিবারের জন্যও ফিরে তাকানো হয়নি তার।
এনজো মা'রা যাওয়ার পর থেকে যে যার মতো আ'ক্রো'শে আর ব্যস্ততায় মগ্ন হয়ে আছে, অথচ এই বিশাল প্রাসাদের এক কোণে একটা জীবন্ত প্রাণ যে প্রতিদিন তিলে তিলে শেষ হয়ে যাচ্ছে, সেই খোঁজ নেওয়ার ফুসরত কারোরই ছিল না। মেয়েটা সারাদিন এই একাকীত্বের ন'রকে মনমরা হয়ে বসে থাকে, কোনো এক বিবর্ণ পুতুলের মতো।
সাইলাস আজ খুব গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারল, এরিকার জীবনে তার ভাইয়ের গুরুত্ব ঠিক কতখানি ছিল। এনজো বেঁচে থাকতে শত ব্যস্ততার মাঝেও সে কোনোদিন তার এই আদরের বোনের খোঁজ নিতে ভুলত না। মাফিয়া দুনিয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক মিশনে থাকার সময়ও এনজো কোনো না কোনো বাহানায় এরিকাকে ফোন করত, তার সেই চেনা রসিকতা দিয়ে মেয়েটার মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তবেই ফোন ছাড়ত। এনজো তার বোনের চারপাশটা এক অদৃশ্য, সুরক্ষামূলক প্রাচীর দিয়ে ঘিরে রেখেছিল যাতে আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক ফোঁটা কালো ছায়াও এরিকাকে স্পর্শ করতে না পারে।
কিন্তু আজ... আজ সেই ভাই নেই বলেই মেয়েটার জীবনে এত বড় একাকীত্বের পাহাড় এসে চেপে বসেছে। এনজোর এই অকালপ্রয়াণ আসলে শুধু এরিকাকেই নিঃস্ব করেনি, বরং সাইলাস, লরেঞ্জো, মার্কো তাদের পুরো স্কোয়াডের ক'লিজার জল শুকিয়ে দিয়েছে। প্রতিটি গার্ডের বুকের ভেতরে আজও এনজোকে হারানোর ক্ষ'তটা দগদগে হয়ে পু'ড়ছে।
সাইলাস দরজার সেই সামান্য ফাঁকটুকু হাত দিয়ে আর একটু প্রশস্ত করে অত্যন্ত ধীর পায়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল। মেঝের ওপর তার বুটের অতি মৃদু শব্দটা ঘরের নিস্তব্ধতাকে আলতো করে ছুঁয়ে গেল।দরজা খোলার আর কারো পায়ের আওয়াজ কানে আসতেই এরিকা তার হাঁটুর ওপর থেকে মুখটা আস্তে আস্তে ওপরে তুলল। তার সেই মায়াবী চোখ দুটো কান্নায় ফুলে লাল হয়ে আছে, আর চোখের নিচে লেপ্টে আছে এক অন্তহীন ক্লান্তি। সে এক নিষ্প্রাণ, নিস্পন্দ চাউনি নিয়ে দরজার দিকে তাকাল। সাইলাসকে নিজের ঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার ফ্যাকাশে ঠোঁট দুটো অবাধ্য অভিমানে সামান্য কেঁপে উঠল, যেন এই একাকীত্বের সাগরে সে এতক্ষণে কোনো এক চেনা কূলের সন্ধান পেয়েছে।
সাইলাস দ্বিধা না করে ধীর কদমে খাটের পাশে এগিয়ে এল। তার প্রতিটি পদক্ষেপে জড়িয়ে ছিল এক পরম সান্ত্বনা আর বি'ষাদ। সে খাটের একদম কিনারায়, এরিকার ঠিক মুখোমুখি হয়ে বসল। খাটের গদিতে সাইলাসের চওড়া শরীরের ভার পড়তেই এরিকা সামান্য নড়েচড়ে বসল।
সাইলাস বেশ কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না । আজ এই একলা মেয়েটার অবাধ্য শোকের সামনে এসে তার সমস্ত শব্দ যেন কোন এক অজানা অতলে হারিয়ে গেছে। সে এরিকার দিকে তাকাল মেয়েটার ফ্যাকাশে চোখের মণি দুটো তখনো এক বুক অভিমান আর শূন্যতা নিয়ে তার ওপর স্থির হয়ে আছে। সাইলাস একটা তপ্ত শ্বাস ফেলে নিজের লোহার মতো শক্ত চওড়া হাতটা বাড়িয়ে দিল এরিকার ওই ছোট, বরফশীতল হাত দুটোর ওপর। এক পরম, আদিম বড় ভাইয়ের মমতায় সে এরিকার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিল।
সাইলাস সবসময়ই গম্ভীর, আন্ডারগ্রাউন্ডের অন্ধকার দুনিয়ায় সে কথা বলার চেয়ে নিজের অস্ত্রের ব্যবহার করতেই বেশি অভ্যস্ত। কোনো বিষাদগ্রস্ত মানুষকে কীভাবে সান্ত্বনা দিতে হয়, কোন শব্দবিন্যাসে মনের ক্ষ'ত উপশম করা যায় এইসব চটুল লৌকিকতা তার জানা নেই। সে বেশ কয়েক প্রহর কেবল এরিকার ফ্যাকাশে, জলভারাক্রান্ত মুখের দিকে চেয়ে রইল।
অবশেষে সে তার অবশ হয়ে আসা জিভটা নাড়াল। খুব ছোট, নিচু আর খসখসে স্বরে সে কথপোকথন শুরু করল,
"কেমন আছো, এরিকা?"
প্রশ্নটা করেই সাইলাসের নিজের ভেতরেই এক তীব্র অপরাধবোধ চিড়বিড় করে উঠল। এই কুৎসিত পরিস্থিতিতে মেয়েটা যে মোটেও ভালো নেই, তা এই ঘরের চার দেয়ালের অন্ধকারই সাক্ষ্য দিচ্ছে।
এরিকা কোনো উত্তর দিল না, কেবল তার ক্লান্ত চোখের মণি দুটো সাইলাসের চোখের ওপর নিবদ্ধ রেখে এক দীর্ঘ, তপ্ত শ্বাস ত্যাগ করল। সাইলাস তার হাতের মুঠোটা আর একটু শক্ত করে, নিজের গম্ভীর কণ্ঠস্বরকে যতটা সম্ভব নরম করে আবার বলল,
"খাবার খেয়েছো কিছু? লুইস বলছিল... তুমি নাকি সকাল থেকে এক ফোঁটা পানিও মুখে দাওনি।"
এরিকা তার মাথাটা সামান্য ডানে-বামে নাড়িয়ে এক পরম অবজ্ঞায় অস্বীকৃতি জানাল। তার এই মৌনতা সাইলাসের বুকের ভেতর এক অদৃশ্য পাথরের মতো চেপে বসল। সে তো এনজো নয় যে অনর্গল গল্প করে, নানা রকম হাস্যরসের ছলে এরিকাকে এক নিমেষে হাসিয়ে তুলবে। সাইলাস নিজের মনের ভেতরের এই ব্যর্থতায় কিছুটা কুঁকড়ে গেল। সে খাটের চাদরের ওপর নিজের দৃষ্টিটা নামিয়ে এনে অত্যন্ত ভাঙা গলায় বলল,
"নিজেকে এভাবে পু'ড়িয়ে দিও না, এরিকা। অনেক দিন তো হয়ে গেল, যেটা চলে গেছে... তা কোনোদিন আর ফিরে আসবে না। নিজেকে এভাবে শেষ করে দিলে এনজো ওপারে ভালো থাকবে না।"
সাইলাসের কণ্ঠস্বরে এক অদ্ভুত খসখসে আর্দ্রতা, যা এই প্রথম কোনো অপরাধীর সামনে নয়, বরং এক পরম আদরের বোনের শোকে আর্দ্র হয়ে উঠেছে।এরিকা এতক্ষণে তার পাথুরে মৌনতা ভাঙল। সাইলাসের হাতের শক্ত মুঠো থেকে নিজের হাত দুটো টেনে নিতে চাইল, কিন্তু সাইলাস অবাধ্য এক মায়ায় তা আরও শক্ত করে আগলে রাখল। এরিকার চোখের কোণ চিরে এবার এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল, তার ফ্যাকাশে ঠোঁট দুটো কান্নার তীব্র বেগে কাঁপতে কাঁপতে অবশেষে এক চরম হাহাকারে ফে'টে পড়ল,
"কী করে ভুলব আমি, ভাইয়া? কী করে কাটাব এই শোক? আজ কতগুলো দিন পার হয়ে গেল, অথচ এই বুকের ভেতরের দ'হনটা এক চুলও কমছে না আমি কিছুতেই ভুলতে পারছি না। রাতে যখনই একটু চোখের পাতা এক করতে যাই, বারবার ভাইয়ার সেই র'ক্তে ভেজা, নি'থর দে'হটা আমার স্বপ্নের ভেতর জী'বন্ত হয়ে ফিরে আসে। সেদিন... সেদিন নিজের সমস্ত সীমা ভেঙে ট'র্চার সে'লে এই দুই হাত দিয়ে ভাইয়ার খু'নিকে আমি উন্মাদের মতো মেরেছি। আজ আমার ভাইয়ার খু'নিরাও বেঁচে নেই। কিন্তু তাদের সেই পৈ'শা'চিক আর নৃ'শংস মৃ'ত্যু দেখেও আমি নিজের ভেতরের এই ক্ষ'তটাকে শান্ত করতে পারছি না। আমার ভেতরটা কেবলই এক শূন্য মরুভূমি হয়ে যাচ্ছে।"
সাইলাস এরিকার চোখের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল তার ধূসর চোখের মণি দুটো বি'ষাদে সরু হয়ে এল। সে মেয়েটার অবয়বে এখনও এক তীব্র, লে'লি'হান প্র'তিশো'ধের আ'গুনের অবশিষ্টাংশ দেখতে পাচ্ছিল, যা এরিকার মতো এক সুকোমল মেয়ের চরিত্রের সাথে কোনোভাবেই মেলে না। কী অদ্ভুত নিয়তির খেলা। যে মেয়েটা আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই নোংরা জগতটাকে মনে প্রাণে ঘৃণা করত, যে কোনোদিন র'ক্তার'ক্তি বা খু'নের পক্ষে ছিল না, আজ নিজের একমাত্র ভাইয়ের অ'কালমৃ'ত্যুর সুগভীর শোকে সে নিজেই কেমন যেন এক হিং'স্র, অচেনা সত্ত্বায় রূপান্তরিত হয়ে গেছে। শোক মানুষকে কতটা অবাধ্য করে তুলতে পারে, এরিকা আজ তার জী'বন্ত উদাহরণ।
এরিকা খাটের চাদরের ওপর নিজের শূন্য দৃষ্টিটা মেলে ধরল, তার ফ্যাকাশে ঠোঁটের কোণে এক ম্লান, দার্শনিক তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। সে সাইলাসের হাত থেকে নিজের হাতটা আলতো করে সরিয়ে নিয়ে নিজের হাঁটুর ওপর চিবুকটা রাখল, তারপর এক অতলান্তিক গভীরতায় বলতে লাগল,
"আচ্ছা সাইলাস ভাইয়া, মানুষ তো কত শত রঙিন স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকে, তাই না? প্রতিটা মানুষের জীবনের পেছনেই তো কোনো না কোনো উদ্দেশ্য, কোনো না কোনো পারপাস থাকে। জানো, আমরা যখন খুব ছোট ছিলাম, মা-বাবা হঠাৎ মা'রা যাওয়ার পর আমরা এক চরম অভাব আর অনটনের অতলে তলিয়ে গিয়েছিলাম। সেই ছোট বয়সে, ভাঙা ছাদের নিচে শুয়ে আমি খালি চিন্তা করতাম আমি বড় হব, অনেক পড়াশোনা করব আর আমাদের এই সমস্ত অপূর্ণ ইচ্ছেগুলো আমি নিজের হাতে পূরণ করব। সেই ইচ্ছে পূরণের তীব্র তাড়না ছিল বলেই হয়তো, অত অভাব অনটনের মাঝেও আমি নিজেকে সবসময় শান্ত রাখতে পেরেছিলাম, কোনোদিন ভে'ঙে পড়িনি। তারপর... এনজো ভাইয়া যখন আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই অন্ধকার দুনিয়ায় কাজ করা শুরু করল, আমাদের জীবনের সেই কুৎসিত অভাবটা এক নিমেষে কে'টে গেল। যখন আমাদের জীবনটা খুব সুন্দরভাবে গুছিয়ে গেল, তখন আমার মনের ভেতর কেবল একটা বড় স্বপ্নই বাসা বেঁধেছিল আমি পড়াশোনা করে নিজেকে যোগ্য করে তুলব এবং ভাইয়াকে এই অ'পরাধের জগত থেকে টেনে বের করে এক নিটোল, সুন্দর ও শান্ত জীবন উপহার দেবো। আমরা আন্ডারগ্রাউন্ডের এই র'ক্তে'র ব্যবসা ছেড়ে অনেক দূরে কোথাও গিয়ে সাধারণ মানুষের মতো বাঁচব।
জানো ভাইয়া? আমার জীবনের প্রতিটি স্বপ্ন কেবল ওই একটা মানুষকে ঘিরেই আবর্তিত হতো। ভাইয়া এই ক্রাইম ওয়ার্ল্ডে কাজ করার পর থেকে প্রতিটা সেকেন্ড আমার বুকের ভেতর এক তীব্র ভয় কাজ করত এই বুঝি কোনো খারাপ খবর আসে, এই বুঝি ভাইয়া আর ফিরবে না! আজ... আজ সেই ভাইটাই আমার পৃথিবী শূন্য করে চলে গেল। আমার বেঁচে থাকার সেই শেষ ইচ্ছেটুকুও যেন ভাইয়ার লা'শের সাথেই কবরে চলে গেছে। আমি এখন বাঁচব কীসের টানে? আমার এই বিবর্ণ জীবনের তো আর কোনো পারপাস নেই, কোনো উদ্দেশ্য নেই। আমার সবকিছু... সব শেষ হয়ে গেছে।"
এরিকার এই দীর্ঘ স্বীকারোক্তি আর তার চোখের কোণ বেয়ে টপটপ করে ঝরে পড়া অশ্রুর ফোঁটাগুলো আরওয়াইন ম্যানশনের সেই অন্ধকার ঘরটাকে এক নিঝুম নীরবতায় মুড়ে দিল। সাইলাস খাটের ওপর বসে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক টা'নাপো'ড়েনে পি'ষ্ট হতে লাগল ।
সাইলাস কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে এবার এরিকার সেই ফ্যাকাশে, অশ্রুসিক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের চওড়া কাঁধ দুটোকে সামান্য সোজা করল। তার কণ্ঠস্বরের গম্ভীরতা ঘরের গুমোট অন্ধকারে এক অমোঘ, পাথুরে প্রাচীরের মতো প্রতিধ্বনিত হয়ে বলল,
"কে বলেছে তোমার জীবনে আর কোনো পারপাস নেই, এরিকা? এভাবে নিজের অস্তিত্বকে এক নিমেষে তু'চ্ছ করে দেওয়ার অধিকার তোমাকে কে দিল, হুম? এরিকা, একটু তাকিয়ে দেখো নিজের দিকে। তুমি যেমন তোমার জীবনের প্রতিটি প্রহর, প্রতিটি স্বপ্ন দিয়ে চাইতে এনজোকে এই ন'রক থেকে বের করে একটা শান্ত জীবন দিতে, এনজোও কিন্তু তার জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এর ব্যতিক্রম কিছু চায়নি।এতোকিছুর মাঝেও এনজোর পুরো পৃথিবী জুড়ে ছিল শুধু একটা নাম ,এরিকা।
তুমি তো ভালো করেই জানো, এনজোর সাথে আমাদের স্কোয়াডের বন্ডিং কতটা গভীর ছিল, আমরা একে অপরের জন্য কতটা বিশ্বস্ত ছিলাম। কিন্তু একটা গোপন সত্যি জানো? এনজো আমাদের মতো এত কাছের বন্ধুদের থেকেও তোমাকে সবসময় বড্ড বেশি দূরে, এক পরম পবিত্র চাদরে আগলে রাখতে চাইত। এই যে মার্কো যার সামনে আন্ডারওয়ার্ল্ডের বড় বড় মাফিয়ারা কাঁপতে বাধ্য হয় সেই মার্কোও কিন্তু তোমার সামনে আসতে এক অদ্ভুত ইনসিকিউরিটি বা দ্বিধাবোধে ভুগত। কারণ, মাঝেমধ্যেই আড্ডার ছলে মার্কো যখন এনজোকে খেপানোর জন্য তোমার প্রসঙ্গ তুলত, তখন এনজো অন্য সব সাধারণ জোক্স হেসেই উড়িয়ে দিলেও, তোমার ক্ষেত্রে তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠত। মার্কো যেহেতু কিছুটা প্লে-বয় স্বভাবের, তাই এনজো সবসময়ই বলতো ' এরিকার দিকে যেন আন্ডারগ্রাউন্ডের কারো একটি কুৎসিত চোখও না পড়ে। আমার বোন একটা পবিত্র ফুল, ওর গায়ে যেন এই অপরাধের দুনিয়ার এক ফোঁটা কালো ছায়াও না লাগে।'
এনজো তোমাকে নিয়ে কতটা পজেসিভ আর প্রোটেক্টিভ ছিল, তা কি তুমি আজও বুঝতে পারোনি?"
সাইলাস কিছুটা থামল। ঘরের টিমটিমে আলোর নিচে এরিকার ফ্যাকাশে ঠোঁট দুটো বিস্ময়ে সামান্য আলগা হয়ে গেল, তার চোখের অশ্রুর প্রবাহ যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছে। সাইলাস এরিকার সেই বরফশীতল হাতের ওপর নিজের হাতের মুঠোটা আরেকটু দৃঢ় করে, এক সুগভীর আবেগে জড়িয়ে আবার বলতে শুরু করল,
"তুমি যখন আস্তে আস্তে বড় হচ্ছিলে, এরিকা, ওদিকে আমাদের এনজোর ভেতরের চিন্তার পা'রদও প্রতিদিন একটু একটু করে বাড়ছিল। ওর নিজের মৃ'ত্যুর চেয়েও বেশি ভয় কাজ করত তোমায় নিয়ে যে ওর কিছু হলে তোমার কী হবে। উচ্চশিক্ষার জন্য কানাডা যে পৃথিবীর বুকে অন্যতম এক নামকরা এবং নিরাপদ দেশ, তা এনজো খুব ভালো করেই জানত। তাই সে মনে প্রাণে চাইত, তুমি যেন সেখানে গিয়ে নিজের পড়াশোনা সম্পূর্ণ করো। তোমার সুরক্ষিত ভবিষ্যতের জন্য প্রতিটি ব্যবস্থা সে নিজের হাতে নিখুঁতভাবে করে দিয়ে গেছে, এরিকা। কানাডার ইউনিভার্সিটির অ্যাডমিশন থেকে শুরু করে তোমার থাকার সব ব্যবস্থায় সে করে গেছে।"
সাইলাস এক দীর্ঘ তপ্ত শ্বাস ফেলে এরিকার চোখের গভীরে নিজের শান্ত দৃষ্টিটা গেঁথে দিল। তার ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক দৃঢ়তা মেয়েটার অবাধ্য শোকের দেয়ালে এক নতুন আশার আলো হয়ে দেখা দিল,
"এনজো আজ সশরীরে আমাদের মাঝে নেই ঠিকই, কিন্তু কানাডায় গিয়ে তার সাজিয়ে যাওয়া সেই স্বপ্নগুলোকে পূর্ণ করাই তো এখন তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় পারপাস, এরিকা। তুমি যদি আজ এভাবে ভেঙে পড়ে নিজের বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাই মে'রে ফেলো, তবে ওপারে থাকা এনজোর আত্মা কি কোনোদিন শান্তি পাবে? সে কি তার এত বছরের কষ্টের এই পরিণতি দেখতে চেয়েছিল? এনজোর দেওয়া সেই শেষ উপহারকে সম্মান জানাতে হলেও তোমাকে বাঁচতে হবে, এরিকা। তোমাকে কানাডায় যেতেই হবে।"
এরিকার ফ্যাকাশে ঠোঁট দুটো অবাধ্য অভিমানে ভেঙে গেল, সে তার ভেতরের জমে থাকা কান্নাটাকে আর কোনোভাবেই আটকে রাখতে পারল না। সাইলাসের হাতটা খা'মচে ধরে সে এক পরম, আদিম হাহাকারে ফিসফিসিয়ে উঠল,
"ভেবেছিলাম... ভেবেছিলাম ভাইয়াসহ একসঙ্গে সেখানে যাবো। আজ আমি একা ওই অচেনা দেশে কীভাবে..."
"ধরে নাও তোমার ভাইয়াও সেখানে তোমার সাথেই যাচ্ছে, এরিকা!"
সাইলাস মাঝপথেই এরিকার কথাটাকে আলতো করে থামিয়ে দিল, তার গম্ভীর কণ্ঠস্বরে তখন এক প্রগাঢ়, পাথুরে নিশ্চয়তা। সে এরিকার চোখের দিকে চেয়ে অত্যন্ত গভীর ও মখমলি স্বরে বলতে লাগল,
"শারীরিক অবয়বটাই কি একটা মানুষের শেষ পরিচয়, এরিকা? এই যে এনজোর রেখে যাওয়া এত এত স্মৃতি, তোমার জন্য তার এই বুকচাপা ভালোবাসা এগুলো কি তোমার পথ চলার জন্য যথেষ্ট নয়? একটু শান্ত হয়ে ভাবো তো... আমাদের এনজো এখন এই আন্ডারওয়ার্ল্ডের সমস্ত নোংরা জঞ্জাল আর মৃত্যুর নির্মম আতঙ্ক থেকে চিরতরে মুক্ত। তাকে আর কোনোদিন কোনো বু'লেটের মুখোমুখি হতে হবে না, তাকে আর কেউ—"
বলতে বলতে হঠাৎ করেই সাইলাসের সেই বজ্রকঠিন কণ্ঠস্বরটা মাঝপথে থমকে গেল। আন্ডারগ্রাউন্ডের যে কুখ্যাত মাফিয়া কোনোদিন শত্রুর বু'লেটের সামনেও পলক ফেলে না, আজ এই নিষ্পাপ মেয়েটার শিয়রে বসে তার ভেতরের সমস্ত পুরুষালি অহংকার এক লহমায় ধ'সে পড়ল। ঘরের টিমটিমে হলুদ আলোয় দেখা গেল, সাইলাসের চোখ দুটো আকস্মিক জলভারে টইটম্বুর হয়ে উঠেছে এবং চোখের কোণ চিরে টপটপ করে কয়েক ফোঁটা অশ্রু পড়ল। তার মুখের পেশিগুলো কান্নার তীব্র চাপে ভারী হয়ে আসছিল, কন্ঠনালীটা যেন এক অদৃশ্য হাত চেপে ধরেছে।
সে ঝটপট নিজের মুখটা একপাশে ফিরিয়ে একটা দীর্ঘ, তপ্ত শ্বাস নিয়ে নিজেকে একটু সামলে নিল। মাফিয়া দুনিয়ার এই ডমিনেটিং সত্ত্বাটি নিজের দুর্বলতা এভাবে প্রকাশ করতে অভ্যস্ত নয়। সে আবার এরিকার দিকে ফিরে চাইল, তবে এবার তার চোখে কেবলই এক বড় ভাইয়ের অটুট দায়িত্ববোধ। সে অত্যন্ত নরম সুরে বলল,
"কানাডায় তোমার থাকার জন্য যে সুন্দর বাড়িটা তোমার ভাই কিনেছে, ওটা এনজোর ভালোবাসার এক জীবন্ত স্মারক। তুমি যখনই সেখানে একাকীত্ব অনুভব করবে, ওই বাড়ির দেয়ালগুলো তোমাকে এনজোর কথা মনে করিয়ে দেবে। আর শোনো, কানাডায় পড়াশোনার মাঝে যখনই তোমার মন খারাপ করবে, কিংবা ছুটি পাবে তুমি ইতালিতে চলে আসবে। এখানে তোমার কোনো সমস্যা হবে না, তোমার সুরক্ষায় পুরো আরওয়াইন সাম্রাজ্য প্রহর গুনবে। আর... তুমি হয়তো শুনেছ, এনজো কানাডায় তোমার জন্য একটা অমূল্য উপহার রেখে গেছে। অন্তত... অন্তত তোমার সেই আদরের ভাইয়ের শেষ ইচ্ছেটার মান রাখতে, সেই বিশেষ উপহারটা নিজের চোখে দেখার জন্যও তোমাকে কানাডায় যেতে হবে এরিকা"
এরিকার বুকের ভেতরের অবরুদ্ধ বরফটাকে আস্তে আস্তে গলাতে শুরু করল। সে এক দীর্ঘ, তপ্ত শ্বাস ফেলে নিজের ফ্যাকাশে চোখের পাতা দুটো বুজল। তার মনে হলো, এনজোর আত্মাকে শান্তিতে ঘুমাতে দিতে হলেও তাকে এই কানাডা যাত্রাটায় পা বাড়াতে হবে। সে অত্যন্ত ধীর লয়ে মাথা নেড়ে, সাইলাসের হাতের ওপর নিজের আঙুলের চাপ বাড়িয়ে ফিসফিসিয়ে উঠল,
"ঠিক আছে আমি... আমি যাবো। ভাইয়ার সেই শেষ ইচ্ছেটা আমি নিজের হাতে পূর্ণ করব।"
এরিকার মুখে এই সম্মতিটুকু শুনে সাইলাসের বুকের ভেতর থেকে যেন এক বিশাল পাথরের ভার নেমে গেল। ঘরের গুমোট অন্ধকারে এক চিলতে স্বস্তির আমেজ ছড়িয়ে দিতে, সাইলাস এবার তার গম্ভীর ঠোঁটের কোণে এক ম্লান, স্মৃতিকাতর হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলল। এরিকার মনটাকে এই গভীর শোকের বৃত্ত থেকে একটু হালকা করার উদ্দেশ্যে সে এক পুরোনো, অদ্ভুত প্রসংগ টেনে বলল,
"জানো এরিকা? আমাদের এই অপরাজেয়, ডমিনেটিং এনজোর মিষ্টি সিক্রেট আজ তোমায় বলি। আমরা যখন বাংলাদেশে গিয়েছিলাম তখন একদিন কু'কুরের তা'ড়া খেয়ে আমরা একজন একদিকে ছিটকে যায় ।এনজো এক বাড়ির আজ্ঞিনায় গেলে সে এক মেয়ের উপর ক্রাশ খায় । আমাদের ওই মাফিয়া ভাইয়ের হৃ'দপিণ্ডের পা'রদে এমন আন্দোলন সৃষ্টি করেছিল যে, ও আমাদের কাছে সেই মেয়েটার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতো। অথচ আশ্চর্যের বিষয় কী জানো? সে মেয়েটা ছিলো ম্যামের কাজিন আরশের বাগদওা আর এনজো মেয়েটার নামটাও কোনোদিন জানতে পারেনি।"
এরিকা তার জলভারাক্রান্ত চোখ দুটো সামান্য মেলে ধরল, তার ফ্যাকাশে মুখে এক তীব্র কৌতুহল আর বিস্ময়ের ছোঁয়া লাগল। এনজো কোনো মেয়ের প্রেমে পড়েছিল এটা শুনে তার ভালো লাগছিল।সাইলাস খাটের চাদরের ওপর নিজের দৃষ্টিটা নামিয়ে এনে এক পরম, বি'ষাদময় সুরে আবার বলতে লাগল,
"এনজো মা'রা যাওয়ার কিছুদিন আগে আরশের মাধ্যমে আমি মেয়েটার নাম জানতে পারি ।ভেবেছিলাম তাকে জানাবো কিন্তু... নিয়তি আমাদের সেই সুযোগটাই দিল না, এরিকা।তার সেই মন হরণ করা বাংলাদেশি মেয়েটার নাম ছিল মাহরুহা। মেয়েটা জানেই না, ইতালির আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক মোস্ট এলিভেটেড গার্ড তাকে দেখে কতটা ব্যাকুল হয়ে থাকত।"
এনজোর জীবনের এই অসম্পূর্ণ, প্রেমের উপাখ্যানটি এরিকার হৃদয়ের গভীরে এক অদ্ভুত, মখমলি অনুভূতির সৃষ্টি করল যেখানে শোকের সেই কালচে মেঘের আড়ালে তার ভাইয়ের এক টুকরো রঙিন স্মৃতির ছটা এই গথিক অন্ধকার ঘরটাকে এক পরম, তীব্র আবেগে ভরিয়ে দিল।
_______________
রাত তখন প্রায় নটা। আকাশের বুক চিরে নামল অঝোর ধারার বর্ষণ। বৃষ্টির বেগ প্রচণ্ড, কিন্তু বজ্রপাতের গর্জন নেই চারপাশটা এক নিঝুম, ছন্দময় জলতরঙ্গে ডুবে আছে। রিভেন ঘরে ঢুকে দেখল ঘরটা ফাঁকা। তার সারা শরীরে এক ক্লান্তির ছাপ আর মা'নসিক অস্থিরতায় সে নিজের পরনের সাদা শার্টের সামনের বোতামগুলো খুলে ফেলল। ঘরের গুমোট ভাব থেকে মুক্তি পেতে সে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল বিশাল ফ্রেঞ্চ জানালার বাইরের বারান্দায়।
বারান্দার অন্ধকারে কুয়াশা আর বৃষ্টির ঝাপটা এসে রিভেনের উত্তপ্ত শরীরে আছড়ে পড়ছে। সে দেখল, রোজেলিয়া বারান্দার একদম কিনারায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টির অঝোর ধারার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। বৃষ্টির ছাঁটে তার পরনের রেশমি পোশাকটা কিছুটা ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে আছে, বাইরে থেকে আসা হালকা আলোয় তাকে কোনো এক বি'ষাদগ্রস্ত জলপরীর মতো দেখাচ্ছে।
রিভেন নিঃশব্দে তার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। তার ভেতরের সমস্ত আক্রোশ আর শোক সব যেন এই মুহূর্তে এই শান্ত বৃষ্টিতে ধুয়ে মুছে যাচ্ছে। সে খুব আলতো করে নিজের বলিষ্ঠ হাত দুটো বাড়িয়ে রোজেলিয়ার কোমরে জড়িয়ে ধরল, তারপর নিজের মাথাটা রোজেলিয়ার কাঁধের কাছে এনে ঠেকাল। বৃষ্টির অবিরাম শব্দের মাঝেও তাদের দুজনের মাঝের নিস্তব্ধতাটা এক পরম আবেগের ভাষায় কথা বলে উঠল। রিভেনের গরম নিঃশ্বাস রোজেলিয়ার ঘাড়ের কাছে এসে স্পর্শ করতেই সে শিউরে উঠল, কিন্তু নিজেকে সরিয়ে নিল না।
রিভেনের শরীরের উত্তাপ রোজেলিয়ার পিঠে এক চাদরের মতো জড়িয়ে থাকলেও তার হৃদস্পন্দনের মাঝে এক গভীর বি'ষণ্ণতার ছায়া স্পষ্ট টের পাওয়া যাচ্ছে। রোজেলিয়া পাথরপ্রতিম হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার চোখের তারায় বৃষ্টির ঝাপটা এসে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে, যেন সে নিজের ভেতরের সমস্ত অশ্রুকে এই অঝোর ধারায় বিলীন করে দিতে চাইছে। ইদানীং রোজেলিয়া খুব বেশি চুপচাপ হয়ে গেছে। তার চাউনিগুলো যেন সবসময় কোনো এক অজানা গহ্বরের দিকে তাকিয়ে থাকে। রিভেনের মনে হচ্ছে, তাদের মাঝের দূরত্বটা দিনে দিনে প্রকট হচ্ছে, রোজেলিয়ার মনের গহীন কোণে লুকিয়ে থাকা সেই ক্ষ'তগুলোকে সে যেন ঠিকঠাক ছুঁতে পারছে না।
রিভেন তার দীর্ঘশ্বাসটুকু বৃষ্টির শব্দে মিলিয়ে দিল। সে আলতো করে রোজেলিয়ার রেশমি চুলের ভিজে গুচ্ছগুলো সরিয়ে তার শুভ্র ঘাড়ের ওপর এক মুহূর্তের জন্য নিজের উষ্ণ ঠোঁটের স্পর্শ রাখল। সেই কোমল চু'ম্বনে রোজেলিয়ার শরীরের কাঁপুনিটা আরও তীব্র হলো, যেন কোনো এক সুপ্ত আবেগ তার বুকের গভীরে গিয়ে আ'ঘা'ত করল। রিভেন তার মুখটা সামান্য তুলে, রোজেলিয়ার কানে ফিসফিস করে অত্যন্ত মায়াময় অথচ ধীর কণ্ঠে বলল,
"বৃষ্টিতে ভিজবে, রোজ? চলো আমিও ভিজবো ।আজকে এই শ্রাবণের ধারায় আমরা দুজন মিলে আমাদের সমস্ত শো'ক আর বি'ষাদ বি'সর্জন দিবো"
রিভেনের এই অপ্রত্যাশিত প্রস্তাবে রোজেলিয়া ধীর লয়ে তার মাথাটা ফিরিয়ে রিভেনের দিকে তাকাল। বৃষ্টির ঝাপটায় তার মুখাবয়ব এখন এক অপার্থিব সৌন্দর্যে উজ্জ্বল, তার চোখের বাদামী আভা বৃষ্টির জলে এক অদ্ভুত মায়া তৈরি করেছে। সে রিভেনের চোখের দিকে তাকিয়ে কোনো শব্দ করল না, কেবল তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিষণ্ণ কিন্তু মায়াবী হাসির রেখা ফুটে উঠল। রিভেন বুঝতে পারল, রোজেলিয়া ভেতরে ভেতরে এক প্রচণ্ড যুদ্ধের সম্মুখীন, কিন্তু এই মুহূর্তে সে তার চেনা মানুষটির উষ্ণ আশ্রয়ে কিছুটা হলেও নিশ্চিন্ত।
রিভেন রোজেলিয়ার হাতটি নিজের মুঠোয় শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। বারান্দার সেই নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে তারা দুজনে নামল নিচে বিশাল বাগানে। আকাশ থেকে ঝরছে অঝোর ধারার শ্রাবণ, বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন এক একটা মুক্তোর দানার মতো তাদের শরীরে ঝরে পড়ছে। ঘাসের ওপর পা রাখতেই ভেজা মাটির এক তীব্র, মাদকতাময় সোঁদা গন্ধ রিভেনের নাকে এসে আছড়ে পড়ল।
বাগানের মাঝখানে এসে রিভেন হঠাৎ থেমে দাঁড়াল। সে রোজেলিয়ার দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমির এক ছোঁয়া নিয়ে বলল,
"খুব ভদ্রভাবে ভিজছ তুমি, রোজ পেটাল"
রোজেলিয়া কিঞ্চিৎ অবাক হয়ে রিভেনের দিকে তাকাল। তার চোখের পলকগুলো বৃষ্টির জলে ভিজে ভারী হয়ে আছে। সে মৃদু হেসে পাল্টা জবাব দিল,
"তাহলে তুমিই বলো, কীভাবে ভিজবো রিভেন?"
রিভেনের চোয়ালের হাড়টা একটু শক্ত হয়ে আবার আলগা হলো, তার হ্যাজেল চোখ দুটোয় এক অদ্ভুত আনন্দের ঝিলিক খেলে গেল। সে আচমকা রোজেলিয়ার কোমরে হাত দিয়ে তাকে নিজের দিকে টেনে নিল এবং বাগানের অন্ধকার কোণে যেখানে ফোয়ারাটা বৃষ্টির জলে একাকার হয়ে গেছে সেখানে দুজনে গোল হয়ে ঘুরতে শুরু করল। রোজেলিয়া হেসে উঠল সেই হাসির শব্দ বৃষ্টির ছন্দে এক অদ্ভুত সুরের মূর্চনা তুলল।
"রিভেন! ছাড়ো আমাকে! তুমি কি পা'গল হয়ে গেছ?"
রোজেলিয়া খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলল।
রিভেন তাকে ছাড়ার পাত্র নয়। সে রোজেলিয়াকে এক ঝটকায় নিজের বুকের কাছে এনে তার কপালে নিজের কপাল ঠেকাল। বৃষ্টির ঝাপটায় তাদের দুজনেই এখন সম্পূর্ণ সিক্ত। রিভেন তার হাতের আঙুল দিয়ে রোজেলিয়ার কপাল থেকে ভিজে চুলগুলো সরিয়ে দিতে দিতে নিচু স্বরে বলল,
"তুমি কি জানো, এই বৃষ্টির চেয়েও সুন্দর কিছু আছে?"
রোজেলিয়া ভ্রু কুঁচকে হাসল, তার চোখের কোণে লেগে থাকা বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে।
"কী সেটা? শুনি?"
রিভেন এক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল। তারপর তার হাতের আঙুল রোজেলিয়ার ভেজা চিবুক ছুঁয়ে বলল,
"তোমার এই হাসিটা। যেটা গত কয়েকটা মাস আমি খুব মিস করছিলাম।"
রোজেলিয়া লজ্জা আর ভালোবাসার এক অদ্ভুত দোলাচলে কিছুটা আড়ষ্ট হয়ে পড়ল। রিভেনের চোখের তীব্রতায় বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা তার জন্য আজ বড্ড কঠিন মনে হচ্ছে ।সে রিভেনের বুকের ওপর হাত রেখে আলতো ধাক্কা দিয়ে হাসতে হাসতে বলল,
"তুমি না... সব কিছুতে এমন রোমান্টিক হতে হবে? আমার চুলগুলো বৃষ্টির ছাঁটে একদম জট পাকিয়ে গেছে, একদম অগোছালো দেখাচ্ছে আমাকে"
রিভেন তার কথাকে মোটেও গুরুত্ব দিল না, বরং সে আচমকা রোজেলিয়ার সেই অগোছালো, ভিজে চুলের গোছা ধরে তাকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের কাছে টেনে নিল। তার কণ্ঠস্বর এখন বৃষ্টির শব্দের চেয়েও গাঢ় আর নিভৃত,
"জট পাকুক, রোজ পেটাল। আমার কাছে তো তোমার এই বিশৃঙ্খল রূপটাই বেশী ভালো লাগে। গুছিয়ে নেওয়া তো সবাই পারে, কিন্তু এই অগোছালো রূপটা শুধু আমার জন্য সংরক্ষিত।"
রিভেনের সেই মখমলি অথচ দৃঢ় উচ্চারণের রেশ কাটতে না কাটতেই রোজেলিয়ার চপল হাতের এক জাদুকরী স্পর্শ রিভেনের কপাল আর গালে আছড়ে পড়ল। রিভেন কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখল, রোজেলিয়া মাটি থেকে একমুঠো ভিজে ঘাসসহ কাদা তুলে তার মুখে সজোরে ছুঁ'ড়ে দিয়েছে। রিভেনের হ্যাজেল চোখ দুটো মুহূর্তের জন্য কাদার আস্তরণে ঝাপসা হয়ে গেল, আর রোজেলিয়া সেই সুযোগে এক অনাবিল হাসি ছড়িয়ে বিদ্যুতের গতিতে দৌড় দিল।
রিভেনের মুখে তখন এক বিস্ময়মাখা হাসি, সে চোখ থেকে কাদা সরানোর আগেই এক চিতার ক্ষিপ্রতায় রোজেলিয়ার পিছু ধাওয়া করল। বৃষ্টির ধারায় ভেজা বাগানের পথ তখন পিচ্ছিল, পায়ের নিচে ঘাস আর কাদার এক পিচ্ছিল সাম্রাজ্য। রোজেলিয়া দৌড়াচ্ছে আর তার খিলখিল হাসির শব্দ বৃষ্টির ছন্দে এক অদ্ভুত সুরের মূর্চনা তুলছে। সে কিছুটা দূরে গিয়েই বৃষ্টির ঝাপটায় এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে রিভেনকে দেখে চোখ টিপল, কিন্তু তার কপাল খারাপ। ঠিক সেই ক্ষণেই পিচ্ছিল ঘাসে তার পায়ের পাতা ফসকে গেল। কিন্তু রিভেনের লোহার মতো শক্ত হাত দুটো ঠিক সময়ে তাকে জা'পটে ধরে ভারসাম্য রক্ষা করল।
কিন্তু পরক্ষনেই দুজনে ভারসাম্য হারিয়ে আবার পড়ে গেল ।কিছুটা কাদা রিভেনের শার্টে আর রোজেলিয়ার পরনের জামায় লেগে গেছে। রিভেন তার কপালে জমে থাকা বৃষ্টির জল মুছে রোজেলিয়ার মুখের দিকে তাকাল, রোজেলিয়ার তার কাদা লেগে থাকা হাত দিয়ে চুল সরাতে গিয়ে কিছুটা তার মুখে লেগে গেছে। রিভেন সেটা দেখেই হেসে উঠল।
"কী হয়েছে?"
রোজেলিয়া ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইল।
রিভেন নিজেকে সামলাতে না পেরে হা হা করে হেসে ফেলল,
"তোমাকে এখন একটা কিউট কাদার পুতুলের মতো দেখাচ্ছে।"
রোজেলিয়া তৎক্ষণাৎ মাটি থেকে একমুঠো ভিজে ঘাস আর কাদা তুলে রিভেনের গালে লাগিয়ে দিল।
"এই নাও তোমার কাদার পুতুল!"
রিভেন হতবাক। সে তো ভাবেনি রোজেলিয়া এমনটা করবে। সে তার গালে হাত দিয়ে রোজেলিয়ার দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমিভরা চোখে বলল,
"ওহ! সো ইউ ওয়ান্ট আ ওয়ার, ডার্লিং?"
রোজেলিয়া দৌড় দেওয়ার আগেই রিভেন তাকে জাপটে ধরল, দুজনে বাগানের ঘাসের ওপর গড়াগড়ি খেতে শুরু করল ।রিভেন রোজেলিয়াকে ঘাসের ওপর চিত করে শুইয়ে দিয়ে দুহাত দিয়ে তাকে ঘিরে ধরল।তারপর রোজেলিয়ার ভেজা কপাল থেকে চুল সরিয়ে তার নাকের ডগায় একটা আলতো টোকা দিয়ে নিচু স্বরে বলল,
"আমাকে কাদা মাখিয়ে পালিয়ে যাবে ভেবেছিলে, রোজ পেটাল? এই যে এখন ধরা পড়ে গেলে, এবার কী শাস্তি দেব বলো তো?"
রোজেলিয়া রিভেনের বুকের ওপর হাত রেখে দুষ্টুমিভরা চোখে তাকিয়ে পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল,
"শাস্তি? শাস্তি দেওয়ার হিম্মত আছে তোমার?
"অবশ্যই আছে ।দেখতে চাও ?"
বলেই রিভেন রোজেলিয়ার দিকে একটা বাকা হাসি দিয়ে এগিয়ে আসতে লাগলো ।রোজেলিয়া রিভেনের বুকে ধাক্কা দিয়ে তাকে সরানোর চেষ্টা করলো।
"এখন বলো, পরাজয় স্বীকার করছ কি না? নাকি এবার কাদা দিয়ে গোসল করিয়ে দেবো?"
রোজেলিয়া চোখ পিটপিট করে হাসল, তার বৃষ্টির জলে ভেজা চোখের পাতাগুলো রিভেনের চিবুক ছুঁয়ে যাচ্ছিল। সে ফিসফিস করে বলল,
"কখনোই না! বরং তুমিই তোমার চিন্তা করো ।তোমার গার্ডরা যদি তাদের বসকে বাগানে এভাবে বাচ্চাদের মতো গড়াগড়ি করতে দেখে তখন তাদের বসের ইমেজের তেরোটা বেজে যাবে"
"আমার ইমেজ নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই, মিসেস আরওয়াইন। বরং নিজের চিন্তা করো, বৃষ্টির জলে তোমার এই মেকআপহীন মুখটা কিন্তু আমায় পুরোপুরি পা'গল করে দিচ্ছে।সো কখন কী হয়ে যায় বলা যায় না"
রোজেলিয়া কিছু বলতে গিয়েও হেসে ফেলল। সে হঠাৎ রিভেনের শার্টের বোতাম ধরে টান দিয়ে বলল,
"অসভ্য লোক ।তোমার এতো পা'গল হতে হবে না এবার ভেতরে চলো, নয়তো কাল সকালে আমাদের দুজনকেই আইসিইউতে থাকতে হবে।"
রিভেন তাকে ছাড়ল না, বরং তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,
"এক শর্তে যাবো। যদি তুমি আমায় একটা গান গেয়ে শোনাও"
রোজেলিয়া হতভম্ব হয়ে গেল।
"এই বৃষ্টিতে? রিভেন, তুমি কি সত্যি পা'গল হয়ে গেছ? আমার গলা দিয়ে তো এখন শুধুই ব্যাঙের ডাক বের হবে!"
রিভেন তার নাকের ওপর নাক ঘষে বলল,
"তাতেই হবে। আমি তোমার ব্যাঙের ডাক শোনার জন্যই আজ বাগানে কাদা মাখলাম।"
রিভেনের এমন বায়না শুনে রোজেলিয়া রীতিমতো চোখ বড় বড় করে তাকাল। বৃষ্টির ঝাপটা তখনো তাদের দুজনকে অঝোরে ভিজিয়ে দিচ্ছে, আর কাদার পিচ্ছিল ঘাসের ওপর তারা যেন কোনো এক রূপকথার জগতে বন্দী।
রোজেলিয়া কৃত্রিম রাগে ভ্রু কুঁচকে বলল,
"তুমি কি সত্যি আন্ডারওয়ার্ল্ডের বস? নাকি বৃষ্টির জলে তোমার মস্তিষ্কের নিউরনগুলো সব শর্ট-সার্কিট হয়ে গেছে? একটা গান গাইতে হবে সেটাও আবার এই দুর্যোগের ভেতর?"
রিভেন এক মুহূর্তের জন্য রোজেলিয়ার চিবুকটা আলতো করে ধরে তার ভেজা চোখের দিকে তাকাল। তার হ্যাজেল চোখ দুটোয় এখন এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতা, যা আন্ডারওয়ার্ল্ডের কোনো রত্নের চেয়েও দামী।
" জানোই তো রিভেন আরওয়াইন যা চায়, তা আদায় করে নিতে জানে। গান গাইবে না কি আমিই শুরু করব? আমার গান শুনলে কিন্তু এই আরওয়াইন ম্যানশনের সব গার্ডরা চাকরি ছেড়ে দৌড় দেবে!"
রোজেলিয়া খিলখিল করে হেসে উঠল,
"না থাক! তোমার গান শোনার চেয়ে ব্যাঙের ডাক শোনা অনেক নিরাপদ!"
সে খানিকটা সময় নিয়ে বৃষ্টির ছন্দের সাথে তাল মিলিয়ে একটা অদ্ভুত সুরে গান ধরল, যেটা আসলে কোনো গানই নয় একটা ছোটবেলার ছড়া। তার গলায় সুরের মাধুর্য আর বৃষ্টির শব্দের সেই মিশ্রণ রিভেনের বুকের ভেতর এক পরম প্রশান্তির লহর তুলে দিল। রিভেন মুগ্ধ হয়ে শুনছিল, তার সমস্ত ক্লান্তি যেন এই তুচ্ছ মুহূর্তের কাছে নতজানু হয়ে গেল।
গান শেষ হতেই রোজেলিয়া রিভেনের বুকের ওপর হাত রেখে হাসি দিয়ে বলল,
"হলো? এবার তো মুক্তি দাও! খুব শীত লাগছে আমার।"
রিভেন তাকে ছাড়ল না, বরং আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে বলল,
"মুক্তি শব্দটা আমার অভিধানে নেই। কিন্তু... একটা জিনিস দিতে পারি।"
"কী?"
রিভেন ঝটপট নিচু হয়ে রোজেলিয়ার গালে একটা গাঢ় চুম্বন এঁকে দিল এবং মুখ ঘষে তার মুখের কাদাও হালকা রোজেলিয়ার গালে লাগিয়ে দিলো। রোজেলিয়া চিৎকার দিয়ে উঠল,
"উফ! রিভেন! আমার গালে এখন কাদার স্বাদ"
রিভেন গম্ভীর মুখে অভিনয় করে বলল,
"এটা কাদা নয়, ডার্লিং। এটা হলো আরওয়াইন ব্র্যান্ডের স্পেশাল ফেইসপ্যাক। এটা লাগালে নাকি সৌন্দর্য বেড়ে যায়, তাই তোমায় উপহার দিলাম।"
রোজেলিয়া রিভেনের কাঁধে একটা হালকা কি'ল বসিয়ে দিয়ে বলল,
"অসভ্য! আমার কোনো ফেইসপ্যাক লাগবে না"
ঠিক তখনই বাড়ির বারান্দা থেকে লুইসের গম্ভীর গলা শোনা গেল,
"স্যার? আপনারা কি এখনো বাগানে? বৃষ্টিতে অনেকক্ষণ ভিজেছেন, এবার ভেতরে না এলে আপনাদের দুজনকেই হয়তো কাল সকালে ডাক্তারদের ই'নজেকশন গিলতে হবে!"
রিভেন লুইসের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে বলল,
"আমাদের ডিস্টার্ব করো না! আমরা এখন একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক গবেষণা করছি বৃষ্টিতে কাদা মাখলে মানুষের হ'রমোন কতটা আনন্দ পায়"
লুইস কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করতে করতে ভেতরে চলে গেল। রোজেলিয়া রিভেনের বুকে মুখ লুকিয়ে হাসতে হাসতে বলল,
"তুমি আসলেই এক নম্বর পাগল!"
রিভেন তাকে জা'পটে ধরে বৃষ্টির মধ্যেই এক চক্কর ঘুরিয়ে বলল,
"পাগল তোমার জন্যই, মিসেস আরওয়াইন।প্রেয়সীর প্রেমে পাগল হওয়ার সৌভাগ্য কজন আর পায়? এখন চলো, ভেতরে যাই। তবে আমার কাদার পুতুলটাকে কিন্তু আমিই গোসল করিয়ে দেবো!"
রোজেলিয়া চোখ বড় বড় করে বলল,
"রিভেন আরওয়াইন! একদম না!"
রিভেন তাকে কোলে তুলে নিয়ে ভেতরের দিকে হাটা শুরু করল, বৃষ্টির শব্দে তাদের হাসির রোল তখন ম্যানশনের প্রতিটি দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুলছিল। আজকের এই বৃষ্টিভেজা রাতে, সমস্ত প্রতিহিংসা আর র'ক্তে'র জগতকে পেছনে ফেলে তারা যেন আবার সেই শৈশবে ফিরে গিয়েছিল, যেখানে কেবল ছিল ভালোবাসা আর এক চিমটি দুষ্টুমির উষ্ণতা।
To be continue,,,,