ফন্ট সাইজ:
থিম:
আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ

৭৭তম পর্ব

লেখক: অরাত্রিকা রহমান

#আত্মার_অঙ্গীকারে_অভিমোহ #Soul_bound_obsession

#Oratrika_Rahman_অরাত্রিকা_রহমান

#Part_77 (১ম)

(কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ)

(প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত)

সোরায়ার দীঘল নেত্র মাহিরের অপলক দৃষ্টিতে লজ্জায় নত হলো। মাহির মুচকি হেঁসে স্টেজ থেকে নামার ছোট ছোট পদক্ষেপ গুলো পার করে সোরায়ার সম্মুখে এগিয়ে এলো। জুঁই সাইড থেকে চেঁচিয়ে উঠলো-

"গো জিজু..!"

সোরায়া ঠোঁট টিপে হাসলো। মাহির ঠিক সামনে এসে দাঁড়ালে সোরায়া পিটপিট করে চোখ তুলে চাইলো তার দিকে। মাহির ঘাড় কাত করে মায়াবী নজরে তাকিয়ে আনমনে বলল-

"মাশাআল্লাহ।"

সোরায়া প্রশ্নাত্মক চাহুনিতে তাকালো-"জি?"

মাহির সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের বুকের বাঁ পাশটায় হাত ডলতে ডলতে বলল- "মারাত্মক লাগছে। ঠিক প্রথম দিনের মতো।"

সোরায়ার গাল দুটো লজ্জায় লাল বর্ণ ধারণ করলো। মাহির সেই লাজুক মুখের দিকে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করলো-

"এই যে মিস ৪৫ কেজি। আজ যদি নিজ ইচ্ছায় সকলের সামনে আপনাকে কোল তুলতে চাই আপনার কি তাতে আপত্তি আছে? বিশ্বাস করুন আমার একটুও কষ্ট হবে না।"

সোরায়া মাহিরের কথায় অবাক হলো। কলেজের সেই শুরুর দিনের কথাগুলো মাহির আজ অব্দি মনে রেখেছে- বিষয়টা তার ভীষণ পছন্দ হলো। সে মুখ উঠিয়ে মাথা ডানে বামে নাসূচক নেড়ে অমত প্রকাশ করে শান্ত কণ্ঠে বলল-

"বর্তমানে ৪৫ কেজির তো লেহেঙ্গাই পড়ে আছি।"

সোরায়ার কথায় মাহির তুচ্ছার্থে হেঁসে ফট করে তাকে কোলে তুলে নিল। আকস্মিকতায় সোরায়া চোখ বন্ধ করে নিয়ে মাহিরের গলা জড়িয়ে ধরলো। উপস্থিত সকলে একসাথে তালি দিয়ে উঠলো। বর পক্ষের সকলে মাহিরের জন্য চিয়ার করতে শুরু করলো-

"মাহির, মাহির, মাহির...!"

সোরায়া মাহিরের চোখে চোখ রাখলে মাহির তার দিকে চোখ টিপে ইশারা করতেই সোরায়া লজ্জায় মাহিরের গলা জড়িয়ে তার বুকে মুখ লুকালো। মাহির সোরায়াকে নিয়ে স্টেজের উপর উঠতেই রায়ান,মিরা, রিমি, রুদ্র ঝুড়ি ঝুড়ি গোলাপের পাপড়ি শূন্যে উড়িয়ে দিল তাদের উপর। রোকেয়া বেগম শফিক রহমানের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছলছল চোখে মাহির আর সোরায়ার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন- "কি সুন্দর মানিয়েছে দুজনকে তাই না বলুন? আমাদের ছোট্ট বুড়ি আজকে বিয়ে যুগ্যি হয়ে গেল। সময় এতো তাড়াতাড়ি কিভাবে বয়ে গেল!"

শফিক রহমান রোকেয়া বেগমের কাঁধে হাত রেখে আশ্বাস দিয়ে বললেন-

"অবশেষে আমাদের দায়িত্ব শেষ হলো। ভাইয়া ভাবির আমানত আমরা সহি সালামত তাদের আসল হকদার দের হাতে তুলে দিতে সক্ষম হয়েছি। জীবনে আর কোনো আক্ষেপ থাকলো না আমাদের রোকেয়া।"

রোকেয়া বেগম শফিক রহমানের দিকে তাকিয়ে তার হাতে হাত রাখলেন। উভয়ের মধ্যকার সুপ্ত পিতৃ ও মাতৃ সত্তা আজ যতটা শূন্য অনুভব করছে ঠিক ততটাই পূর্ণ হয়ে আছে দুই মেয়ে সুখী জীবনের আশায়। মাহির সোরায়া কে নিয়ে স্টেজে উঠে গিয়ে চিৎকার করে বলল-

"Everyone... This is my love of my life.. little Mrs. Khan for you all.."

বলেই মাহির সোরায়াকে কোলে নিয়ে গোল গোল ঘুরলো। লাজুকতা আজ হয়তো সোরায়ার মুখ থেকেই সরতে নারাজ। মেয়েটার হাসি যেন থামছেই না। মিরা তার সন্তানসম বোনের হাস্যোজ্জ্বল মুখটা দেখে তৃপ্তি নিয়ে হাসলো। রায়ান মিরার ছলছল চোখ দেখে তাকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলল-

"এখন কাঁদলে মেকআপ খারাপ হয়ে যাবে হৃদপাখি। কনে কে সবে মাত্র নিয়ে এলে। আমাদের এখনো অনেক ছবি তুলতে হবে।"

মিরা রায়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো চাহনি রেখেই ফিক করে হেঁসে উঠলো। রায়ান মিরাকে আরো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে বলল-

"সোরা কে দেখো, ও কত হ্যাপি! আর আমার হাবলা বন্ধুটাকে দেখ, বউ পেয়ে ও কতটা হ্যাপি! প্রে করো যেন সারাজীবন একসাথে এমন ভাবেই হ্যাপি থাকে ওরা।"

মিরা আবেশে মাথা উপর নিচ নাড়ালো। সে অশ্রু সিক্ত চোখে আকাশ পানে তাকিয়ে মনে মনে আওড়ালো-

"তোমার কাছে হাজার হাজার শুকরিয়া খোদা। আমার বোনকে তুমি সুখী করো।"

মিরা রায়ানের দিকে তাকিয়ে আনমনে প্রশ্ন করলো-

"আজ আব্বু আম্মু অনেক খুশি হবে তাই না?"

রায়ান মিরার কপালে স্নেহের পরশ এঁকে দিয়ে সম্মতি দিয়ে বলল-

"হুম, অনেক খুশি হবে।"

মিরা মুচকি হেঁসে পুনরায় মাহির আর সোরায়ার দিকে মন দিল। মাহির সোরায়া কে কোলে থেকে নামিয়ে দিল। এরপর সকলে গিয়ে ভীর করলো তাদের চারপাশে। আর সেই থেকে শুরু হলো ছবি তোলার ধুম। একের পর এক সবাই স্টেজে উঠে বরং কনের সাথে ছবি তুলতে শুরু করলো। প্রথম দিকে মাহির আর সোরায়ার মুখের হাঁসি প্রকৃতির থাকলেও সময়ের ব্যপ্তি বাড়তেই তাদের হাঁসি কৃত্রিম হয়ে এলো। একজনের পর একজন লেগেই আছে যেন। সামান্য ভীর কমলে সোরায়া নিজের চোয়াল চেপে একটু টিপলো- হাসতে হাসতে যেন চাপা ব্যাথা হয়ে গেছে। মিরা রিমি দূর থেকে সোরায়ার এমন করুন অবস্থা দেখে মুখ টিপে হাসছে। মাহির সোরায়া কে দেখে চিন্তিত হয়ে সোরায়ার দুই গালে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো-

"গাল ব্যাথা করছে, জান বাচ্চা?"

সোরায়া মাথা নিচু করে অস্বীকার করলো-"উঁহু, ঠিক আছি।"

মাহির নিজের থেকেই বুঝে নিল সবটা। সে তৎক্ষণাৎ রায়ান ও রুদ্র কে মেসেজ করে বলল- আপাতত অতিথিদেরকে খাওয়ার জায়গায় নিয়ে গিয়ে তাদের একটু শান্তির নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দিতে। রায়ান আর রুদ্র ও মাহিরের কথা মতোই কাজ করলো। আমন্ত্রিত সকলে খাওয়ার জায়গায় গেলে সোরায়া পড়িহিত ভারী লেহেঙ্গা টা দুই দিক থেকে উঁচু করে ধাপ করে বসে পড়লো সোফায়। মুখটা মলিন ক্লান্ত স্রান্ত হয়ে গেছে কয়েক ঘন্টায়। মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোরায়ার পাশে গিয়ে বোসতেই সোরায়া বিরক্ত মুখে মাহির কে জিজ্ঞেস করলো-

"আচ্ছা, বিয়ে শেষ হতে আর কতক্ষন লাগবে?"

মাহির ভ্র কুঁচকে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে চিন্তিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো-

"কেন জান বাচ্চা? কি হয়েছে? কোনো সমস্যা?"

সোরায়া আর দুচোখ পিটপিট করে খুলে মাহিরের দিকে তাকিয়ে বলল-

"ঘুম পাচ্ছে আমার। বাকি বিয়ে টুকু কালকে করি?"

সোরায়ার প্রস্তাব শুনে মাহির হকচকিয়ে বলে উঠলো-

"এমন বলে না জান, অনেক মুশকিলে পেয়েছি তোমায়। চোখে ঘুম ধরে রাখো একটু।"

সোরায়া মাহির উৎকণ্ঠা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে গেল। মাথা নিচু করে নখ খুঁটতে খুঁটতে মনে মনে কি যেন বিড়বিড় করলো। মিরা রিমি স্টেজে উঠে সোরায়া আর মাহিরের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

"কি হে, নতুন বর কনে? কেমন লাগছে বিয়ের টেস্ট?"

সোরায়া মুখ উঠিয়ে কেবল তাকালো কিছু বলল না। বেচারি ভেবেছিল শুধু সাজবে কবুল বলবে আর বিয়ে হয়ে যাবে ঠিক যেমন মিরার বেলায় হয়েছে। কিন্তু পারিবারিক ভাবে বিয়েটা যে এতোটা পরিশ্রমের হবে তার জানা ছিল না। মাহির সোরায়ার মলিন মুখটার দিকে দেখে মিরার উদ্দেশ্যে বলল-

"ভাবি, সোরার খিদে পেয়েছে হয়তো। কিছু খাওয়ার ব্যবস্থা করা যায়?"

সোরায়া মাহিরের দিকে তাকালো, সে বুঝলো না মাহির কি করে বুঝলো যে তার খিদে পেয়েছে। মিরা সোরায়ার মুখের দিকে এক নজর দেখে বলল-

"সবার খাওয়া দাওয়া শেষ হলে কাজী সাহেব বিয়ে পড়াবেন। আর বিয়ে শেষ হলে বর কনে খেতে বসবে। আপাতত স্টাটারের শুকনো ভাজা খাবার খেয়ে পানি খেয়ে থাকতে হবে। কিছু করার নেই।"

সোরায়া মুখটা সামান্য ভার করে নিল। সে মাথা নিচু রেখেই বলল-

"এখন কিছু খেলে খিদে মরে যাবে। থাক পরে খাবো। বিয়ে শেষ হোক।"

মাহির মিরাকে তাড়া দিয়ে বলল-

"ভাবি, কোনো ভাবে বিয়ে টা তাড়াতাড়ি সম্পন্ন করা যায় না? কাজী কে বলুন না এখনি বিয়ে পড়াতে।"

মিরা মাহিরের কথায় কিছু টা লজ্জায় পড়ে গেল। এমন কথার উত্তরে কি বলবে কিছু বুঝে উঠতে পারলো না সে। মাথা ঝুঁকিয়ে রিমি কে ইশারা করতেই রিমি অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। তারও একই অবস্থা। মাহির নিজের কথায় রিমি আর মিরাকে লজ্জায় ফেলে দিয়েছে বুঝে নিজেকে মনে মনে বেশ শাসন করলো। তবে মনে যা চলছে সে তাই বলেছে। সোরায়ার সেই দিকে খেয়াল নেই, পেটে খিদে, চোখে ঘুম, আর অন্তরে মনের মানুষ কে কবুল করার এক রাশ ইচ্ছে তার ব্রেইন দখল করে রেখেছে।

ঘণ্টা খানেক পর, খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ হলে অতিথিরা পুনরায় স্টেজের কাছে ফিরে এলো। রায়ান রুদ্র এতোক্ষণ খাওয়ার জায়গাতেই ছিল। কনের ভাই বা দুলাভাই হিসেবে কাজের তো আর শেষ নেই। তারাও ফিরে এলো। অতঃপর কাজী সাহেব গিয়ে বসলেন স্টেজের মাঝের সোফায়। বর কনের বসার জায়গা মুখোমুখি করা হলো হলো, আর মাঝে দেওয়া হলো ফুল দ্বারা প্রস্তুতকৃত দেয়াল। ঝুলন্ত ফুলের মালার ফাঁকা দিয়ে মাহির সোরায়ার একে অপর কে দেখার চেষ্টা চালাচ্ছে। মিরা এগিয়ে এসে সোরায়ার মুখ ঢেকে দিল লম্বা ঘোমটায় আর কানে কানে বলল-

"জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত আনন্দময় একটা অনুভুতি অনুভব করবি এখন। আফসোসের কোনো জায়গা রাখিস না। এনজয় এভরি সিঙ্গেল মোমেন্ট।"

মিরার কথা টা সোরায়ার মনে কঠোরভাবে বিধলো। কয়েক সেকেন্ডে তার চারপাশের পরিবেশ টা কেমন যেন মায়াবী হয়ে উঠলো। গলা হঠাৎ করেই শুকিয়ে এলো যেন কথা বলার ক্ষমতা লোপ পাচ্ছে। নিঃশ্বাস অস্থির হয়ে আসছে, নখে নখে ক্রিয়ার গতি বাড়লো। নার্ভাসনেস এর সীমা পার করছে। সোরায়ার মাথায় মাহিরের চিন্তা আসতেই তার মনে প্রশ্ন জন্মালো -

"আচ্ছা, আমার যা হচ্ছে তা কি ওনারও হচ্ছে? হলে উনি কিভাবে সামলাচ্ছেন নিজেকে? এমনটা কেন হচ্ছে হঠাৎ?"

মাহিরের পুরুষ মানুষ, স্বাভাবিক ভাবেই নিজের মনের অশান্ত ভাব প্রকাশ করার তেমন সুযোগ নেই। মাহির কে দুই হাত মুষ্ঠিমেয় করে রাখতে দেখে রায়ান মাহির পাশে এসে তার কাঁধে হাত রাখলো। মাহির রায়ানের দিকে তাকিয়ে একটু স্বস্তি যে হাসলো, হয়তো বানোয়াট। রায়ান এক গাল হেসে ছেলেটার মনে সাহস যুগিয়ে বলল-

"আমি যেদিন তোর জায়গায় ছিলাম, মনে হয়েছিল হৃৎপিণ্ড টা খুশিতে এই বুঝি লাফ দিয়ে হাত চলে এলো।"

-"পরে কি করে সামাল দিয়ে ছিলি?"

মাহির আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করলো। হয়তো তারও একই অবস্থা। রায়ান মুচকি হেঁসে বলল-

"পরে আর কি, যে মানুষ টাকে নিয়ে গোটা জীবনের কল্পনা করে রেখেছি তাকে সারাজীবনের জন্য নিজের করে নেওয়াটা অসম্ভব শান্তির। বউ নিয়ে একটা মিষ্টি ভবিষ্যতের কল্পনা করতেই মন শান্ত হয়ে গেছিল। একবার চিন্তা কর, তোর এতো গুলো বছরের অপেক্ষার পর আজ ওই মেয়েটাকে নিজের সঙ্গীনির রূপে পাচ্ছিস যাকে তুই মন থেকে চেয়েছিস। আজকের পর প্রতিটা সকালের শুরু তার কেবল তোর সঙ্গে হবে। জীবনের পূর্ণতার প্রথম ধাপে এতো বড় শান্তির জন্য আজকের এই সময়টায় বুকে তৈরি হওয়া অশান্ত ঝড় টুকু কি কাম্য নয়?"

মাহিরের মন হঠাৎ শান্ত হয়ে এলো। রায়ানের কথায় সে কয়েক মিনিটে মনে হলো সোরায়াকে নিয়ে নিজের সম্পূর্ণ জীবন সাজিয়ে ফেলেছে। রায়ান মাহিরের কাঁধে চাপড়ে বলল-

"কাম অন, আমার বাঘের বাচ্চা। গো ফর ইট।"

মাহিরের বুক সাহসে ফুলে উঠলো। রায়ান মিরার কাছে গিয়ে দাঁড়াবে তখনি খেয়াল করলো মিরা মাহির আর সোরায়ার ছবি তুলছে। তার ঠোঁটের কোণে একটা প্রশান্তির হাসি। রায়ান ও মিরার হাস্যোজ্জ্বল মুখে দেখে নিজের ফোনটা বের করে মিরা ছবি তুললো। মিরার কিছু টা আন্দাজ হতেই সে রায়ানের দিকে তাকালো। রায়ান ওভাবেই বেশ কয়েকটা ছবি তুলে নিল। মিরা নিজের ফোন নামিয়ে রায়ান দিকে দ্রুত পায়ে হেঁটে গিয়ে রায়ানের হাত থেকে তার ফোনটা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু তার আগের রায়ান নিজের হাত সরিয়ে ফোনটা নিজের পকেটে ঢুকিয়ে নিল। রায়ানের চোখে দুষ্টুমির ছাপ দেখে মিরা মুখ ফুলিয়ে বলল-

"কিসব আবল তাবল ছবি তুললেন আপনি? ডিলিট করুন এখনি। তোলার হলো ভালো ছবি তুলুন।"

রায়ান মিরার পাশে কাটিয়ে চলে যেতে যেতে বলল-

"আমার জন্য ওইগুলোই ভালো ছবি। আমি ডিলিট করবো না।"

মিরা পিছিয়ে রায়ান সামনে এসে তার পথ আটকে কোমরে হাত রেখে বিরক্ত কণ্ঠে বলল-

"এখানে আরো অনেক সুন্দরী মেয়ে আছে। প্রয়োজনে তাদের ছবি তুলুন গিয়ে।"

রায়ান মিরার দিকে ঝুঁকে গিয়ে দ্বিতীয় বার মিরা কথায় জোর দিয়ে জিজ্ঞেস করলো -

"সত্যি যেতে বলছো?"

মিরা চোখ পাকিয়ে রায়ানের দিকে তাকালে রায়ান নিজের নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে মিরার কোমরে হাত রেখে মেয়েটাকে হেঁচকা টানে নিজের কাছে নিয়ে এলো। মিরা হকচকিয়ে চারপাশে নজর ঘুরিয়ে বলল-

"কি করছেন টা কি? সবাই দেখছে.. ছাড়ুন। অসভ্য লোক।"

রায়ান মিরার কানের কাছে ঝুঁকে হাস্কি কণ্ঠে বলল-

"আমার ফোনের গ্যালারিতে তুমি ছাড়া আর কারো অধিকার নেই হৃদপাখি। বাকি রইল তোমার থেকেও সুন্দরী মেয়েদের কথা..(তুচ্ছার্থে হেঁসে) let me tell you this loud and clear.. there will always be a girl way more prettier than you, but they are not you.. Now all you need is a man who doesn't care about them and trust me I don't care.."

কথা টা বলে রায়ান মিরাকে মুক্ত করে দিল। মিরা সঙ্গে সঙ্গে রায়ানের সাথে আলাদা হয়ে যেতেই সে বাস্তবে ফিরলো। রায়ান মিরার পাশে কাটিয়ে চলে গেলে মিরা মুচকি হেঁসে রায়ানের পিছু পিছু গিয়ে রায়ান বাহু আঁকড়ে ধরল অধিকার দেখিয়ে। রায়ান একনজর মিরার দিকে দেখলো। মেয়েটা বেশ খুশি তে তার বাহু জড়িয়ে মাথা ঠেকিয়ে রেখেছে। রায়ান মিরার মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে চুমু দিল মেয়েটার মাথায় আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বিড়বিড় করলো-

"কেউ বলবে এই মেয়ের কিছু দিন পর বাচ্চা হবে? বাইক চালাবে হিরো দের মতো, আমি আশেপাশে না থাকলে ম্যাচিউরিটি তার শিরায় শিরায় দৌড়ায়। আর আমার কাছে এলেই সেসব বিচুক্ষণতা তার আকাশ। মনে হয় যেন নবজাতক শিশু। আমি যে কিভাবে সামলাবো দুটো বাচ্চা কে খোদা জানে। আল্লাহ আমাকে ধৈর্য দিক।"

গুরুজনদের উপস্থিতিতে কাজী সাহেব বিয়ে পড়ানো শুরু করলেন। কাজী সাহেব চশমাটা ঠিক করে সামনে রাখা নিকাহনামা হাতে তুলে নিলেন।

-"বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন, ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসূলিহিল কারিম। সম্মানিত উপস্থিত অতিথিবৃন্দ, আজ আমরা মহান আল্লাহ তাআলার নামে এই পবিত্র নিকাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার জন্য এখানে সমবেত হয়েছি। আল্লাহ তাআলা বিবাহকে মানবজীবনের জন্য শান্তি, ভালোবাসা ও পারস্পরিক দায়িত্বের বন্ধন হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। উপস্থিত সাক্ষীগণের সম্মুখে এবং উভয় পরিবারের সম্মতিতে আমরা এখন নিকাহর কার্যক্রম শুরু করছি।"

তিনি নথির দিকে চোখ বুলিয়ে বলতে শুরু করলেন—

"পাত্র— স্নিগ্ধ খান মাহির। পিতা— মাহিদ খান। মাতা— সীমা খান।

পাত্রী— জান্নাতুল রহমান সোরায়া। পিতা— মিরাজ রহমান (মরহুম)। মাতা— মেহেরুন্নেসা বেগম। (মরহুম)"

এরপর তিনি দেনমোহরের অংশ পড়লেন—

"এই বিবাহের দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়েছে নগদ ৩০ লক্ষ টাকা। পরিশোধিত দেনমোহরের পরিমাণ সম্পূর্ণ ৩০ লক্ষ টাকা এবং অপরিশোধিত বা বাকি দেনমোহরের পরিমাণ শূন্য টাকা। এতে দু'পক্ষের কোনো বাড়তি মতামত থাকলে বলার সুযোগ আছে। নিজেদের দাবি রাখতে পারেন।"

শফিক রহমান অমায়িক কণ্ঠে বললেন-

"সব ঠিক আছে কাজী সাহেব। আপনি আগান।"

-"আমার কিছু বলার আছে।"

মাহির নিম্ন কণ্ঠে নিজের মতামত রাখার প্রস্তাব রাখলে সকলে অবাক ও চিন্তিত হয়ে মাহিরের দিকে নজর ঘুরালো। শফিক রহমান চিন্তিত কণ্ঠে মাহিরকে প্রশ্ন করলেন-"কোনো সমস্যা বাবা?"

কাজী সাহেব-"জী বাবাজি, বলুন। কি বলতে চাইছেন?"

সীমা খান মাহিদ খানের কোর্টের নিম্নাংশ টেনে অবাক ও ভয়ার্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন-

"আপনার ছেলে কি করতে চাইছে? সব তো ঠিকই আছে। সবাই কেমন গম্ভীর হয়ে গেছে দেখছেন? ওকে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন তো সমস্যা কি ওর।"

স্ত্রীর কথায় মাহির খান ছেলের দিকে এগিয়ে গেলেন। সোরায়ার বুক ধকধক করছে অজানা ভয়ে মিরা সোরায়ার ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে তারা কাঁধে হাত রাখলো যেন তার একা অনুভব না হয়। মিরা তার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা রায়ানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ইশারায় জানতে চাইলো কি হচ্ছে এসব। রায়ান ও এবিষয়ে কিছু জানে তাই সেও একই রকম অবাক। মাহিদ খান মাহিরকে কিছু বলার আগেই মাহির মিষ্টি হেসে জিজ্ঞেস করলো-

"আমি দেন মোহর স্বরুপ আমার স্ত্রীর পছন্দের একটা জিনিস যুক্ত করতে চাই‌। সেটা কি সম্ভব?"

সকলেই অবাক হলো। সোরায়া মাথা উঠিয়ে মাহিরের দিকে সোজাসুজি চাইলো। মাহির খান ও শফিক রহমান উভয়ই পিছিয়ে এলেন। চিন্তার কারণ হয়তো কমলো। কিন্তু সোরায়া বুঝে পাচ্ছে না তার পছন্দের এমন কি আছে যা তাকে মাহির দিতে চাইছে।

-"জী অবশ্যই দিতে পারবেন। বলুন কি দিতে চান।"

মাহির সোরায়ার দিকে তাকিয়ে বলল-

"বাড়তি দেনমোহর হিসেবে আমি ওকে একটা লাইব্রেরী বানিয়ে দিতে চাই। যেখানে ওর শখের সকল বই আমি নিজে সাজাবো ওর জন্য। যখনই ওর পছন্দের বই প্রকাশ হবে সেই সকল বইয়ের ঠিকানা যেন ওর নিজস্ব লাইব্রেরী তে হয়।"

সোরায়ার গায়ে কাঁটা দিল মাহিরের ইচ্ছা শুনে। চোখ জোড়া অজান্তেই ছলছল করে উঠলো আবেগে। আশেপাশে মানুষ না থাকলে হয়তো নাচতে শুরু করে দিত মেয়েটা। মিরা হাফ ছেঁড়ে হাসলো, সে জানে সোরায়া বই পড়তে কতটা পছন্দ করে আর মাহির সোরায়ার শখের গুরুত্ব দিচ্ছে দেখে তার ভীষণ শান্তি অনুভব হলো। গম্ভীর পরিবেশটায় মুহূর্তে হাসির রোল পড়ে গেল গুরুজনেরা কথা বলাবলি শুরু করলেন-

"টিচারের সাথে বিয়ে হলে এই হয়.. দেন মোহরেও লাইব্রেরী বানিয়ে দিতে চাইছে।"

-"আরে আরে , এটাই তো ভালো। বিয়ের পর বর চাপ দিয়ে পড়াশোনা করাবে। মেয়েটার পড়ার ক্ষতি হবে না।"

কথাগুলো সোরায়ার কান এড়ালো না। সে সত্যিই ভাবতে লাগলো- ফুল দ্বারা সুসজ্জি বিছানায় মাহির তাকে ইংলিশ গ্রামারের সাবজেক্ট ভার্ব এগ্রিমেন্ট বোঝাচ্ছে। কি মর্মান্তিক কল্পনা! সোরায়া মাথা আনমনে না সূচক ঝাঁকিয়ে এমন অদ্ভুত কল্পনা ভঙ্গ করলো। মাহির সোরায়া কে খেয়াল করছে সম্পূর্ণ সময়টা। সে মেয়েটার এমন কান্ড দেখে মজায় হাসলো। কাজী সাহেব পুনরায় বিয়ের পড়ানো শুরু করলেন। এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ কাজী সাহেব কনের দিকে তাকিয়ে কোমল অথচ স্পষ্ট কণ্ঠে বললেন—

"কনে জান্নাতুল রহমান সোরায়া, আপনি কি আপনার নির্ধারিত দেনমোহরের বিনিময়ে স্নিগ্ধ খান মাহিরকে স্বামী হিসেবে কবুল করতে রাজি থাকলে, বলুন মা, আলহামদুলিল্লাহ কবুল।"

সবার নিঃশ্বাস যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য আটকে গেল। সকলেই সোরায়ার দিকে নজর থামিয়ে রেখেছে অথচ সোরায়া পড়ে আছে গভীর চিন্তায়- যদি সত্যিই মাহির তাকে বিয়ের পর পড়াশোনা করতে বেশী চাপ দেয় তখন সে কি করবে? মাহির সোরায়ার দীর্ঘক্ষন চুপ থাকার কারণ বুঝলো। সে বাঁকা হেঁসে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোরায়ার উদ্দেশ্যে ওকে নিশ্চিন্ত করতে বলল—

"কবুল বলো জানবাচ্চা, কসম আমি পড়ার জন্য একটু ও চাপ দিব না।"

মাহির এই কথা বলতেই সোরায়ার চোখ যেন চকচক করে উঠলো। উপস্থিতি সকলে অবাক মাহিরের কথায়। মিরার কপালে হাত। কাজী সাহেব পুনরায় অনুরোধ করলেন-"বলুন মা, আলহামদুলিল্লাহ কবুল..!"

সোরায়া বেশ উৎসাহিত কণ্ঠে কবুল করলো-

"আলহামদুলিল্লাহ কবুল।"

কাজী সাহেব নিয়ম অনুযায়ী বললেন-

"তিন বার বলতে হবে..."

কাজী সাহেব পুনরায় জিজ্ঞেস করার আগেই সোরায়া নিজ থেকেই বলে উঠলো-

"আলহামদুলিল্লাহ কবুল, আলহামদুলিল্লাহ কবুল।"

সোরায়ার কান্ডে সকলে হেঁসে উঠলো। মাহির নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে রাখলো, তার মাথা নিচু হয়ে এলো লজ্জায়। সোরায়ার হাস্যোজ্জ্বল মুখটা আবার মলিন হলো সবাইকে তার উপর হাসতে দেখে। কিছু ভুল হেয়ে গেল নাকি তার দ্বারা সে বুঝে উঠতে পারছে না। কাজী সাহেব মুচকি হেঁসে বললেন -

"মেয়ে মনে হয় পড়া চোর।"

মাহির এবার আর হাসি ধরে রাখতে পারলো না। সে হেঁসে উঠতেই সোরায়াও তাকে দেখে হেসে ফেললো। কাজী সাহেব মনে মনে বিড়বিড় করলেন-

"আর বিয়ে করছে টিচার কে কারে কালে যে আরো কত কি দেখমু..!"

কাজী সাহেব গলার খাকাড়ি দিয়ে মাহিরের দিকে ঘুরে একই ভ বে বললেন-

"স্নিগ্ধ খান মাহির, আপনি কি নির্ধারিত দেনমোহরের বিনিময়ে জান্নাতুল রহমান সোরায়াকে স্ত্রী হিসেবে কবুল করতে রাজি থাকলে বলুন বাবা, আলহামদুলিল্লাহ কবুল।"

বুকের ঝড়টা যেন হঠাৎ থেমে গেলে তার বউ তাকে স্বীকার করে নিয়েছে। এবার তার পালা। মাহিরের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। সে সোরায়ার উপর নজর রেখে স্পষ্ট গলায় বলল-

"জি, আলহামদুলিল্লাহ কবুল।"

-"দ্বিতীয়বার..!"

-"আলহামদুলিল্লাহ, কবুল।"

-"তৃতীয়বার..!"

-"আলহামদুলিল্লাহ, কবুল।"

কথাটি শেষ হতেই উপস্থিত সবাই একসঙ্গে "আলহামদুলিল্লাহ" বলে উঠলেন। পরিবেশ আনন্দে ভরে গেল। সোরায়া চোখ জোড়া বন্ধ করে নিলো। কোনো এক অজানা কারণে তার চোখে অশ্রু কণা ভীর করেছে। কাজী সাহেব নথিপত্র স্বাক্ষরের জন্য এগিয়ে দিলেন, আর দুই পরিবারের মুখে ফুটে উঠল স্বস্তি ও সুখের উজ্জ্বল হাসি। মাহির সোরায়া পর পর নথিপত্রে স্বাক্ষর করে দিলে কাজী সাহেব তাদেরকে স্বামী স্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করলেন। মাহিরে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে ঝুলন্ত ফুলের মালার দেওয়াল ভেদ করে সোরায়ার ঘোমটা উঠিয়ে নতুন বউয়ের লাজুক রক্তিম মুখটা দেখলো। সোরায়া কিছু তেই নিজের দু চোখ খুলতে চাইছে না। যদি এটা তার অন্যদিনের স্বপ্ন হয় তবে কি হবে তার?! মাহিরের অন্ততর আত্মার আজ কোনো বাঁধা কাজ করলো না। সে নিজের অধিকারে সোরায়ার দুগালে হাত রেখে তার ওষ্ঠযুগল স্পর্শ করালো সোরায়ার কোমল ললাটে। চারপাশের সকলে মুখ লুকিয়ে হাসছে। সোরায়া তৎক্ষণাৎ চোখ খুলে মাহিরের দিকে তাকালো আশ্চর্য হয়ে-

"স্যার, সবাই দেখছে, এখানে কলেজের অনেকে আছে। কি করছেন! ছাড়ুন।"

মাহির হেঁসে সোরায়ার মাথা নিজের মাথা দিয়ে টোকা দিয়ে বলল-

"আজ থেকে আর ছাড়াছাড়ি হবে না। আর এখন থেকে যতবার স্যার বলবে ঠিক ততগুলো বই লাইব্রেরী থেকে সরিয়ে নেব।"

সোরায়া সঙ্গে সঙ্গে মাথা না সূচক নাড়লো। মাহির সোরায়াকে সোজা করে দাড়া করালো বিয়ের পর প্রথম আলিঙ্গনের জন্য। ঠিক তখনি জুঁই সোরায়ার হাতে টেনে তাকে পিছনে সরিয়ে নিল। মাহির সোরায়ার দিকে এগোতে যাবে তখনি মিরা আর রিমি সামনে এসে তার পথ আটকে দাঁড়িয়ে বলল-

"আরে আরে আরে, বউ তো আপনারই। পালিয়ে যাবে নাকি।"

মাহির অসহায় মুখ করে তাদের দিকে তাকালো। মিরা ভাব নিয়ে কোমরে হাত রেখে বলল-

"খালি দেখলে হবে? খরচা আছে। বাকি ৫০ হাজার দিয়ে নিজের বউ বুঝে নিন। নয়তো আপনার আর বউ পাওয়া হবে না। A deal is a deal.."

মাহিরের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো রুদ্র আর রায়ান।মাহিরের মনে সামান্য সাহস এলো। রুদ্র মাহিরের হয়ে বলল-

"বিয়ে সম্পূর্ণ হয়ে গেলে এসব হিসেব করা বেকার।"

মিরা রিমির দিকে ঝুঁকে গিয়ে বলল-

"তোর বর কে সামলা রিমি। আমাদের হোক মারছে।"

রিমি মিরার কথায় রুদ্রকে উদ্দেশ্যে করে অদ্ভুত এক মোহনীয় ভঙ্গিতে বলল-

"আচ্ছা আপনি যেন কি চাইছিলেন আমার কাছে? আলুভর্তা...হুম..ওইটা মনে হচ্ছে না আমি দিতে প্রস..!"

-"ঠিকই তো বলেছে ওরা, মাহির ভাই তুমি বাকি টাকাটা দিয়ে দাও তো। A deal is a deal.."

রিমির কথা শেষ হওয়ার আগে রুদ্র পাল্টি খেয়ে গেল। মাহির আর রায়ান অবাক হয়ে রুদ্রর দিকে দেখলো। রায়ান রুদ্র কে কিছু বলতে যাবে তখনি মিরা মিষ্টি স্বরে বলল-

"কে যেন আমার কাছে একটু মিষ্টি মুখ করতে চেয়েছিল। ভাবছি আমিও ডিল ব্রেক করেই ফে..!"

-"দিয়ে দে মাহির, সত্যিই তো A deal is indeed a deal..তুই আমার বন্ধু, আমার মান সম্মান ডুবাস না। দিয়ে দে।"

মাহির এবার সত্যি অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে রইল, সেকেন্ডের ব্যবধানে তার দুটো পিলার নিজেদের বউয়ের সামনে ঝুঁকে গেল দেখে সে আশাহত। মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে পকেট থেকে টাকার আরেকটি বান্ডিল বের করে মিরা আর রিমির হাত দিয়ে দিল। এরপর মিরা আর রিমি ড্যাং ড্যাং করে গিয়ে দুটো গোলাপ ফুলের মালা আনলো। সোরায়া আর মাহিরকে একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়া করিয়ে মিরা তাদের দিকে মালা দুটো এগিয়ে দিয়ে বলল-

"জড়াজড়ি একটু রয়ে শয়ে পরে করবেন খন। আগে মালাটা তো পরাবেন! আজকালকার ছেলে মেয়েদের সবুরই নেই।"

মিরা কথা বলেই মুখ টিপে হাসলো। বড়রা সেখান থেকে বেড়িয়ৈ গেল। তাদের আর বাচ্চাদের মাঝে কাজ নেই। মাহির মালাটা নিয়ে সোরায়ার গলায় পড়িয়ে দিতে গেলে জুঁই সোরায়াকে আঁকা বাঁকা করে নড়াতে লাগলো-"এতো সহজে পড়িয়ে দিলে মজা থাকবে না জিজু।"

মাহির তবুও সোরায়াকে মাথাটা পড়িয়ে দিতে সক্ষম হলো। সোরায়া মাহির কে ডোজ করার চেষ্টা ও করে নি। এবার সোরায়ার পালা মালা পড়ানোর। সোরায়া স্বাভাবিক ভাবে মাহির কে মালা পড়ানোর চেষ্টা করলো কিন্তু মাহিরের উচ্চতা সোরায়ার তুলনায় বেশী হওয়ায় হোরায়রা চেয়েও পারছিল না। সে কয়েকবার চেষ্টা করলো। রায়ান বুঝলো মাহির এবার নিজের থেকেই ঝুঁকবে ঠিক যেমন সে ঝুঁকে ছিল। তাই সে আগে থেকেই সাবধান করে বলল-

"মাহির...ভাই ভুলেও অতিরিক্ত পিরিতি দেখিয়ে মাথা নিচু করবি না বলে দিচ্ছি।"

মাহির সোরায়ার দিকে তাকিয়ে বুঝলো মেয়েটা মন খারাপ করছে। সে রায়ানের কথা রাখতে নিজের মাথা না ঝুঁকি, সোরায়ার মন রাখতে উল্টো সোরায়াকে হঠাৎ কোলে তুলে নিয়ে বলল-

"আমি মাথা নিচে না করলেও বউকে তো উপরে তুলতেই পারি।"

সোরায়ার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে বলল-

"কি হলো? হা করে কি দেখছো? পড়াও।"

সোরায়া মুচকি হেঁসে মাহিরের গলায় মালা পড়িয়ে দিল। সবাই একসাথে তালি দিয়ে উঠলো। এরপর বর কনের খাওয়ার আয়োজন করা হলো। তাদের সাথে রায়ান মিরা আর রুদ্র রিমির খেতে বসলো। তাদেরও খাওয়া হয়নি। রোকেয়া বেগম এবং রামিলা চৌধুরী তাদের খাবার সার্ভ করলেন। টেবিল ভর্তি খাবার দেখেই সবার পেট মন হয় ভরে গেল। সবাই কেবল কোনো মতো নিজেদের প্লেটের খাবার খাচ্ছে। এর মধ্যে রায়ান মিরাকে আর মাহির সোরায়াকে খাইয়ে দিচ্ছে। মিরা প্রেগন্যান্সির আর অ্যাকসিডেন্টের পর থেকে কবে শেষ হাত দিয়ে খেয়েছে তার জানা নেই। কখনো বেশিরভাগ সময় রায়ান খাইয়ে দেয় আর রায়ান অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকলে রামিলা চৌধুরী বা সোরায়া নিজে খাইয়ে দিতো। প্রায় অভ্যাসগত করাতেই রায়ান তাকে খাইয়ে দিচ্ছে। আর মাহির সোরায়া কে খাইয়ে দিচ্ছে তার হাতের গহনার জন্য। মাহির কে তেমন খেতে না দেখে রোকেয়া বেগম আরো কিছু টুকরো মাংস মাহিরের হাতের প্লেটে তুলে দিতে দিতে বললেন -

"আরে নতুন জামাই বলে কি লজ্জা পাচ্ছো নাকি মাহির? কিছুই তো নিচ্ছো না।"

মাহির সোরায়ার মুখে এক গাল পোলাও তুলে দিয়ে মিষ্টি হেঁসে বলল-

"কই কিছু নিলাম না চাচি? আপনাদের মেয়েকে তো নিচ্ছি নিজের কাছে।"

মাহিরের কথায় সোরায়ার গাল লাল বর্ণ ধারণ করলো। লজ্জায় সে মাহিরের হাতে মৃদু চাপড় দিল। রুদ্র সোরায়ার সাথে মজা নিতে খেতে খেতে বলল-

"নিচ্ছো নাও। ওকে খাওয়াতে খাওয়াতে ফকির না হলেই হয়। যে পরিমাণ খায়..!"

রুদ্রর কথায় সবাই হাসলো। রিমি রুদ্রর কথায় রুদ্র কাঁধে ধাক্কা দিল-"কি অদ্ভুত কথা বার্তা এসব? খালি মেয়েটার পিছনে লাগেন কেন?"

সোরায়া মুখ ফুলিয়ে মাহির কে দেখলো মাহির ও সামান্য হাসতে যাচ্ছিল তখনি সোরায়ার অগ্নি চক্ষু তার নজরে পড়লো। ওমনি তার মুখ থেকে হাসি উধাও হয়ে গেল। মাহির তার হাসি গিলে নিয়ে সোরায়ার মুখে খাব তুলে দিতে নিলে সোরায়া রুদ্র কে খোঁচা মেরে রিমিকে বলল-

"কোন পাগল কুকুরে কামড়ে ছিল তোমায় যে তুমি এমনটা শয়তান বেডাকে বিয়ে করলে রিমি আপু?"

রিমি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রুদ্র রিমির হয়ে উল্টো জবাবে বলল-

"ঠিক যেই কুকুরটাকে তুই কামড়ে ছিলি ওটা। আর ওই কুকুর টাই মাহির ভাইকেও কামড়েছে।"

মাহির রুদ্র কে শাসন করে বলল-

"উফ্ রুদ্র, চুপ করবি? চুপ চাপ খা তো। আমার বউ কে আমি বিয়ে করেছি। আমি সামলে নিবো।"

সোরায়ার মুখের সামনে খাবার ধরে বলল-"তুমি খাও জান।"

সোরায়ার মুখে গর্বের ছাপ দেখা গেল। সে ভাব নিয়ে মাহির হাত থেকে খাবারটা মুখে নিল রুদ্র কে দেখিয়ে দেখিয়ে। সাথে নিজের পা ও উঠিয়ে দিল মাহিরের কোলে। মাহির সোরায়ার এমন আচরণে বাঁকা হাসলো।

মিরা সব শেষে পানি খেয়ে বলল- "আর পারছিনা হাবি। প্লিজ, আর খাব না।"

রায়ান মিরাকে জোর করলো না। টিস্যু দিয়ে মুখটা মুছিয়ে দিয়ে আদেশ মূলক স্বরে বলল-

"ঠিক আছে আর খেতে হবে না। ঘরে গিয়ে ফ্রেস হও। আমি আসছি।"

-"ঘরে যাবো মানে? বাসর ঘরের দরজা ধরবো না!"

মিরার কথা শুনতেই মাহিরের কাশি উঠে গেল। রায়ান মাহির অবস্থা বুঝে মিরার দিকে কঠোর চাহুনিতে তাকিয়ে বলল-

"আমি বাড়তি কিছু শুনতে চাই নি মিরা। সারাদিন যা খুশি করেছ কিচ্ছু বলি নি। এখন যা বলছি চুপচাপ শুনবে। ঘরে গিয়ে ফ্রেস হয়ে বিছানায় যাও।"

রায়ানের রূঢ় আচরণে মিরার কষ্ট পেল হয়তো। লেহেঙ্গা উঠিয়ে জোর পায়ে হেঁটে নিজের ঘরে চলে গেল। রায়ানের রাগ দেখে রিমির আর সাহস হলো না এ বিষয়ে আগে যাওয়ার এখন তো জুঁই ও জেগে নেই সে তো আছেই ঘুমের সাগরে তলিয়ে গেছে। খাওয়া শেষে যে যার যার ঘরে গেল। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা একটু বেশিই দূরত্বে তাই এক রাতের জন্য মাহির আর সোরায়ার বাসর রহমান বাড়িতেই সাজানো হয়েছে।

______

রাত~১.৩০ এর পর~

চলবে..

এরপর কি হতে চলেছে তা নিয়ে আমার আর কিছু বলার নেই। আই মিন 😁 ওই আর কি এহেম এহেম। এই পর্বে ১.৫ হাজার রিয়েক্ট কমপ্লিট করে দিও। আর নিজেদের মনোভাব কমেন্টে বলো পাখিরা। Love you pakhis 🥰❤️

#আত্মার_অঙ্গীকারে_অভিমোহ (বাসর পর্ব) ১৮+ #Soul_bound_obsession

#Oratrika_Rahman_অরাত্রিকা_রহমান

#Part_77 (২য়)

(কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ)

(প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত)

রাত~১.৩০ এর পর~

-"আচ্ছা, তুই কি চাইছিস বল তো? বিয়ে পাগলা হয়ে বিয়েটা সারলি। আর এখন নতুন বউকে ঘরে রেখে আমাদের নিয়ে ছাদের উপর পা ঝুলিয়ে বসে নখ কামড়াচ্ছিস। হয়েছে কি তোর?"

রায়ান বিরক্তি ভাব দেখিয়ে মাহিরের উদ্দেশ্যে এমন উদ্ভট প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলে মাহির নিজের নখ কামড়ানো বন্ধ করে হাত টা মুখ থেকে নামিয়ে নিল। এবার দুই হাত এক করে কেবল মুচড়ে যাচ্ছে। রায়ান মাহিরের অবস্থা দেখে একটা লম্বা নিঃশ্বাস ত্যাগ করে খোলা আকাশের দিকে তাকালো। অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশের নিচে টিমটিমাটি আলোয় রহমান বাড়ির ছাদটা বেশ আলোকিত। আর সেখানেই ছাদের রেলিং এর উপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে রায়ান, রুদ্র আর মাহির।

খাওয়া শেষে মিরা রিমি সোরায়া কে ঘরে দিয়ে নিজেরাও নিজেদের ঘরে চলে গেছে, আর এদিকে ১৫ মিনিট হয়ে গেছে মাহির রায়ান আর রুদ্রকে নিয়ে জোর করে ছাদে তার সাথে বসিয়ে রেখেছে। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় সে নিজে কিছু বলছেও না, অন্যের কোনো কথা শুনছেও না। কেবলই মনের উদ্বিগ্নতায় নিজের নখ কামড়ে যাচ্ছে। রায়ান হঠাৎ অস্থির হয়ে উঠে ছাদের ধার থেকে নেমতে নিল-

"ধুর, বসে থাক তোরা। আমি আমার বউয়ের কাছে গেলাম। একলা ঘরে কি করছে কে জানে। তখন সবার সামনে বোকলাম ওকে তোর জন্য। তোদের সাথে বসে থেকে রাতের বেলার এই মূল্যবান সময় আমি নষ্ট করতে পারবো না।"

মাহির সঙ্গে সঙ্গে রায়ান হাত আঁকড়ে ধরে রায়ান কে টেনে আবার নিজের পাশে বসিয়ে অসহায় গলায় বলল-

"আজকের রাতের মূল্য আমার থেকে তোর কাছে বেশি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। সুতরাং, আপাতত আমাকে সঙ্গ দে।"

রায়ান ছাদ থেকে পড়ে যাওয়ার ভয়ে রেলিং ধরে ওখানেই বসে পড়লো। মাহির আবারো করুন স্বরে বলে উঠলো-

"আমি আমার বউ কে বাসর ঘরে রেখে এখানে বসে আছি। এই স্যাক্রিফাইস এর কি কোনো মূল্য নেই তোর কাছে?"

রায়ান মাহিরের কথায় রাগে তেতে উঠলো-

"ওই শালা, আমি তোকে বলেছি তোর বউকে বাসর ঘরে রেখে এখানে বসে থাকতে‌। তখন থেকে ঠেলছি তোকে তোর তো বাসর করার কোনো ইচ্ছেই দেখছি না।"

মাহির রায়ানের দিকে বাঁকা চাহনিতে তাকালো। রায়ান সেটা খেয়াল করে উল্টো দিকে নজর ঘুরিয়ে নিল। রুদ্র মাহিরের কাঁধে হাত রেখে কৌতুহলে জিজ্ঞেস করলো-

"মাহির ভাই, একটা কথা বলো তো, একটা বছর ধরে বিয়ে বিয়ে করে মাথা খারাপ করার পর আজ বাসর রাতে ঘরে যাচ্ছো না কেন?"

মাহিরের চোখে মুখে অস্থিরতা স্পষ্ট। দীর্ঘশ্বাসের ধারা অব্যাহত রইল তার। মাহির রুদ্রর প্রশ্নের জবাবে প্রশ্নই করলো-

"আমি কি করবো তুই বল। বাসর ঘরে গিয়ে করবো টা কি? কি বলবো ওকে? মাথায় তো কিছু আসছে না। কিভাবে কি হবে ভাবলে আমার কলিজা শুকিয়ে আসছে।"

রুদ্র মাহিরের প্রশ্নের উত্তরে কি বলবে বুঝতে না পেরে সোজাসাপ্টা বলল-

"তুমি নিজের মাথায় কি সব আকাশ কুসুম ভাবছো কে জানে। বিয়ে হয়ে গেছে তোমার সোরার সাথে‌। এখন ও শুধু তোমার স্টুডেন্ট না, বউ হয়ে গেছে তোমার। এসব কি চিন্তা করছো তুমি?"

রায়ানের মুখশ্রীতে বিরক্তি স্পষ্ট। মাহির রুদ্রর দিকে ফিরে তাকে মিনতির স্বরে জিজ্ঞাসা করলো-

"রুদ্র.. ভাই তুই আমাকে কিছু শিখিয়ে দে। কি বলবো আমি ঘরে গিয়ে সোরাকে? বয়সে ছোট হলেও তোর অভিজ্ঞতা বেশি।"

রুদ্র মাহিরের দেওয়া এই সম্মানে নিজের মনের আকাশে উড়তে লাগলো রুদ্র। রায়ান বাঁকা চোখে মাহিরের দিকে তাকিয়ে বলল-

"সিরিয়াসলি? জ্ঞান নেওয়ার জন্য আর কোনো মানুষ পেলো না?!"

রুদ্র খুব অভিজ্ঞ ও জ্ঞানী ভাব নিয়ে মাহির কে উপদেশ দিতে শুরু করলো-

"আচ্ছা শোনো। একটু প্রেমালাপ দিয়ে শুরু করবা। লাইক তুমি ওকে কতটা ভালোবাসো। এমন আর কি।"

মাহির অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো-"যেমন..!?"

-"যেমন.. কিছু আবেগী লাইন বলতে পারো। লাইক- ঘরে ওর সামনে গিয়ে বলবে- আমি তোমাকে ঠিক ততক্ষন পর্যন্ত ভালোবাসবো..!

-"যতক্ষণ না সকাল হবে..!"

রুদ্রর কথা শেষ হওয়ার আগে রায়ান নিজের মতো করে রুদ্রর বলা অর্ধ লাইনের পূর্ণতা দিল। আর তার পর নিজেই তীব্র হাসিতে ফেটে পড়লো‌ মাহির আর রুদ্রর দিকে তাকিয়ে। মাহির রুদ্র বিরক্ত মুখে রায়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। মাহির রায়ান কে ধাক্কা দিয়ে ছাদের রেলিং থেকে ফেলে দিতে চেয়ে বলল-

"শালি তুই যা তো, তোর বউয়ের কাছে যা। মাথায় এমনিতেই প্রেশার হাই হয়ে আছে সে এখন সার্কাজম মারায়।"

রায়ান নিজের ব্যালেন্স ধরে রাখলো। নিজের হাসি থামিয়ে মাহিরের দিকে গম্ভীর ভাব নিয়ে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো-

"ও কে?" (রুদ্রর দিকে আঙুল তাক করে)

মাহির অবাক চোখে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে জবাব দিল-

"কে আবার? রুদ্র..!"

-"রুদ্র বিয়ে করেছে কাকে?"

-"রিমিকে..!"

-"গুড এবার বল, তুই কে?"

-"কি আজব, আমি মাহির।"

-"বিয়ে করেছিস কাকে?"

-"সোরায়া কে। কিন্তু তুই এসব প্রশ্ন করছিস কেন আমাকে?"

-"তোকে বোঝাতে রে বোকা**। রুদ্র রিমি আলাদা, আমি মিরা আলাদা আর তুই সোরা আলাদা। আমাদের সবার বিয়ে করার পরিবেশ পরিস্থিতি ও আলাদা। আর তুই ওর কাছে কি উপদেশ চাইছিস? এসব লাইন টাইন মুখস্থ করে লাভ নেই। আমি তোকে ভালো বুদ্ধি দেই শোন, আগে ঘরে যা। বউকে দেখে এমন নেশা ধরবে, দেখবি মুখ, হাত, পা, শরীর অটোমেটিক ফরফর করে চলবে।"

মাহির রায়ানের কথার সারমর্ম বুঝে রুদ্রর দিকে অনুমোদনের জন্য তাকাতে চাইলে রায়ান মাহিরের ঘাড়ে চেপে ধরে রেলিং থেকে নামিয়ে গম্ভীর গলায় বলল-

"আর এদিক ওদিক না দেখে সোজা ঘরে গিয়ে দরজা লক করবি এখন। তোর জন্য আমিও আমার বউয়ের কাছে যেতে পারছি না বালের মাথা।"

রায়ান ঘাড় কাত করে উপরে রেলিং এ বসে থাকা রুদ্রর দিকে তাকিয়ে শাসনের সুরে বলল-

"তোকে কি দাওয়াত দিতে হবে ওখানে থেকে নামার জন্য? তোর ঘরে বউ নাই? আর এক সেকেন্ড ওখানে বসে থাকলে এক ধাক্কায় নিচে ফেলে দিবো। নাম..!"

রুদ্র রায়ানের ভয়ে সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে নামলো উপর থেকে। রায়ান পুনরায় মাহিরের দিকে তাকালো। মাহির এখনো দ্বিধাগ্রস্ত। রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাহিরের দুই কাঁধে হাত রেখে ঝাঁকিয়ে তাঁকে সাহস দিয়ে বলল-

"আর ভুজুং ভাজুং চিন্তা করিস না। তোর তো সোনায় বাঁধানো কপাল, এক কালে নিজে ডার্ক রোমান্স পড়তি, এখন বউ ও পয়েছিস ডার্ক রোমান্স পড়া। কোথায় এক্সাইটেড থাকবি তা না আধমরা হয়ে আছিস।"

মাহির মনে মনে বিড়বিড় করলো-

"ওটাই তো সমস্যা ভাই, যদি সামলাতে না পারি? যদি বেশি বেশি করে ফেলি? যদি ওর কিছু হয়ে যায়? যতই বুঝুক, বয়স তো কম। একবার ওকে পেয়ে গেলে, ছাড় দেবো এমন উদারতা আমার মধ্যে আছে কিনা সন্দেহ। আর আমি ওকে কষ্ট ও দিতে চাই না।"

বেচারা মনের কথা আর রায়ানের সম্মুখে প্রকাশ করতে পারলো না। রায়ান মাহির কে উৎসাহ দিলো-

"মাহির, মেয়েটা অপেক্ষা করছে হয়তো ঘরে। তোর যাওয়া উচিত এখন। কাম অন..বাক্যালাপ! জেগে উঠ বাঘের বাচ্চা..!"

মাহির রায়ানের হাত নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে দিয়ে তিরিক্ষি মেজাজে বলল-

"ধুর বাল, চুপ করবি তুই? কবুল বলার পর থেকেই জেগেই আছে বাঘের বাচ্চা। এখন বউটা কে একেবারে খেয়ে না নিলেই হয়। আমি কি জ্বালার মধ্যে আছি তুই এখন বুঝবি না!"

রায়ান ভাব নিয়ে বলল-

"এই জ্বালায় বহুবার জ্বলেছি আমি। জ্বলতে জ্বলতে আজ এই পর্যন্ত। এখনো জ্বলছি । So, don't teach father how to make babies.. ok?"

-"হ্যাঁ সেটাই তো, জ্বলতে জ্বলতে এখন আবার এক বাচ্চার বাপও হয়ে যাচ্ছিস!"

রুদ্র রায়ান আর মাহিরের কথা বুঝে উঠলো না। সে হাঁ হয়ে কেবল শুনে যাচ্ছে। তখনই রুদ্রর ফোনে একটা নোটিফিকেশন এলো। সেটা দেখতেই রুদ্র তাড়াহুড়ো করে ফোনটা পকেটে রেখে রায়ান আর মাহিরের পাশ কাটিয়ে ছাদ থেকে নেমে যেতে যেতে বলল-

"আমার ঘুম পেয়েছে। আমি ঘরে গেলাম। গুড নাইট।"

রায়ান অবাক হলো-"হঠাৎ ঘুম পেয়ে গেল?"

রুদ্র হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে মাহিরের উদ্দেশ্যে বলল-

"ওহ, মাহির ভাই...অল দ্যা বেস্ট ফর টু নাইট।"

রুদ্র আর দাঁড়ালো না। রায়ান নিজের নাক ঘষে আড় চোখে মাহিরের দিকে তাকিয়ে বলল-

"আমিও যাই। আমারও কেমন যেন বউ বউ পাচ্ছে। না, আই মিন, ঘুম ঘুম পাচ্ছে।"

মাহির বাঁকা চোখে রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল-

"বুঝেছি ভাই তোদের ঠিক কেমন ঘুম পেয়েছে। যা যা।"

রায়ান লাজুক হেঁসে মাথা চুলকে মাহিরের সাথে কোলাকুলি করে মাহির কে সতর্ক বার্তা দিল-

"যা করবি বুঝে শুনে করিস, সোরা আমার বোনের মতো মাহির। ওর সমস্যা হলে তোর অনেক সমস্যা হবে। সো, একটু সাবধানে।"

কথাটা বলে রায়ান সোজা হয়ে মাহিরের কাঁধে চাপড় দিয়ে নিচে নেমে গেল। মাহির এবার আর একা একা ছাদে বসে থাকার সাহস পেল না। তার মনটা যতই সোরায়াকে সম্পূর্ণ নিজের করে নিতে ব্যাকুল তার দেহের প্রতিক্রিয়া যেন তাকে ঠিক ততটাই ভয় দেখাচ্ছে। মাহির চাইছে না নিজের অধিকারের বোঝা সোরায়ার উপর চাপিয়ে দিতে আবার তা করা থেকে নিজেকে বিরত রাখার ইচ্ছা ও তার নেই। তবুও এমন দ্বিধা দ্বন্দ্বের মাঝে সে নিচে নেমে সোরায়ার ঘরের দিকে গেল। দরজার ঠিক সামনে গিয়ে দাড়াতেই তার গলা শুকিয়ে এলো হঠাৎ। সে দরজায় কড়া নাড়তে কয়েকবার নিজের হাত উঠালো কিন্তু সাহসে কুলোচ্ছে না তার। মাহির নিজের মনকে বুঝ দিল-

"সারা রাত কি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবি গাধা? ধাক্কা দে দরজায়। ঘরের ভেতরের মেয়েটা আর তোর স্টুডেন্ট বা প্রেমিকা নেই, বউ হয় তোর।"

মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে শরীর ঝাকুনি দিয়ে দরজায় হাত রাখল। তখনি তার অনুভব হলো দরজাটা খোলাই শুধু চাপিয়ে রাখা হয়েছে। মাহির সামান্য অবাক হলো- তার মাথায় এক মূহুর্তের জন্য সে চিন্তা করলো-

সোরায়া হয়তো ঘুমিয়ে গেছে যেহেতু তখন বলছিল তার ঘুম পেয়েছে। মাহির স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল তবে তার কপাল কুঁচকে আনমনে বিড়বিড় করলো-

"কি পরিমান কেয়ারলেস! ঘুমাবে ভালো কথা তাই বলে দরজা লক করবে না?"

পর মূহুর্তেই আবার নিজের জিভ কেটে বলল-

"আমি তো বাইরে। বিয়ে করে বর কে বাইরে থেকে রেখে কিভাবেই বা দরজা লক করে ঘুমাবে!? আমার লক্ষ্মী বউটার কত বুদ্ধি। এখন ঘুমিয়ে গিয়ে থাকলে একটা ছোট্ট চুমু খেয়ে নেবো।"

নিজের মতো কথা বলা শেষ হলে মাহির দরজা ঠেলে ঘরের ভেতর প্রবেশ করতে যাবে তখনি পিছন থেকে কেউ একজন মাহিরের কাঁধে হাত রাখলো। ঘটনার আকস্মিকতায় মাহির চমকে মৃদু চিৎকার দিয়ে পিছনে ফিরতেই দেখলো তার মা- ঠিক তার পেছনে দাঁড়ানো। সে অবাক হলো-"আম্মু, তুমি? এখন.. এখানে?"

সীমা খান ছেলের প্রশ্নে কিছুটা মাথা ঝুঁকিয়ে নিলেন। সামান্য দ্বিধাগ্রস্ত চাহুনিতে আশেপাশে নজর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মাহিরের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আমতা আমতা করে জবাব দিলেন-

"তেমন কিছু না। তোকে কিছু বলার ছিল এই আর কি।"

-"আমাকে?" মাহির নিজের দিকে আঙুল তাক করে মায়ের মুখমুখি হয়ে দাঁড়ালো-

"আমাকে কি বলার আছে?"

সীমা খান মাহির দিকে এক পা এগিয়ে মাহিরের দিকে ঝুঁকে বেশ গোপনীয়তা বজায় রেখে নরম কণ্ঠে তাকে সাবধান করতে বললেন-

"মাহির, সোরা কিন্তু এখনো অনেক ছোট। বুঝিসই তো কি বলতে চাইছি। বাচ্চা মেয়ে, একটু বুঝে শুনে যা করার করিস কেমন?"

মায়ের মুখে এমন কথা শুনে মাহিরের লজ্জায় মনে হলো তার পায়ের নিচের জমিন ফাঁকা হয়ে গেলে যদি সে এখন সেটাই বিলিন হয়ে যেতে পারতো হয়তো সেটাই ভালো হতো। মাহির সীমা খানের কথা বুঝে নিজের

বিচক্ষণতা দেখিয়ে সঙ্গে সঙ্গে সামান্য দূরে সরে বুঝদার ভাব ধরে বলল-

"আরে, কি সব বলছো? তোমার কি আমাকে ওমন মনে হয় নাকি? আমি সামলে নেব। I can control...!"

সীমা খান ছেলের আত্মবিশ্বাস দেখে জোরপূর্বক বানোয়াট হেঁসে নিজের মনে বিড়বিড় করলেন-

"কি যে সামাল দিতে পারবি তুই সেটা তো আমার জানা আছে। খাবার সামনে থাকলে ক্ষুধার্ত পেটে কেউ বসে থাকে না।"

তিনি তবু মাহিরের কথায় তার প্রতি বিশ্বাস দেখালেন। সীমা খান আরো কিছু বলতে চেয়েও বলার সাহস করে উঠতে পারলেন না। কিছু টা অস্বস্তি তেই মাহির কে দরজার সামনে রেখে প্রস্থান করলেন। মাহির মায়ের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকলো। বেচারা এবার দরজার দিকে ঘুরে নিজেকে নিয়ন্ত্রনে রাখতে এক প্রকার জিকির করতে করতে বাসর ঘরে প্রবেশ করলো-

"Yes, I can control myself..! I definitely can.."

মাহির নিজের দুচোখ বন্ধ করে হুট করেই বাসর ঘরে ঢুকে তাড়াতাড়ি দরজা লক করে দিল যেন এতো টুকু করেই সে বেঁচে গেছে।

-"স্যার, আপনি এসে গেছেন? এতোক্ষণ কোথায় ছিলেন? দেরি হলো যে।"

পেছন থেকে পরিচিত মেয়েলি কন্ঠ কানে ভেসে আসতেই মাহির সেদিকে ঘুরে দাঁড়ালো। ভেজা চুলে বাঁধা পড়ে থাকা তোয়ালেটা নরম হাতে নিজের চুলের ভাঁজে থেকে মুক্ত করে চুল হতে টপটপ করে পড়তে থাকা অবশিষ্ট জলরাশি গুলো মুছতে মুছতে সোরায়া মাহিরের দিকে তাকিয়ে থাকে প্রশ্ন করলো। মাহির হতবাক। চোখের অবস্থা ছানাবড়া। মাহির নজর সরিয়ে সোরায়া কে সম্পূর্ণ একবার দেখলো-পাতলা লাল জামদানি শাড়িতে আবৃত সাধারণ একটা মেয়ে দেহ। ভেজা চোখ মুখ, মাথা থেকে শুরু করে গলার আর ঘাড়ের কাছে বিন্দু বিন্দু পানি কণা জমে আছে তার। অদ্ভুত রকম চিকচিক করছে সেগুলো যেন সাজানো মুক্তা। ভেজা এলোমেলো চুল ছন্নছাড়া হয়ে লুটিয়ে আছে পিঠ, ঘাড় ও বক্ষ জুড়ে। এখনো সেখান থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। মাহিরের ভেতরকার পুরুষ সত্তা আজ সৌন্দর্যের এক অনন্য রূপ নিজের চোখের সামনে থেকে অবলোকন করছে। মাহিরের চাহুনি ধীরে ধীরে শীতল ও তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠলো। সদ্য ফোটা পদ্ম ফুলের মাঝেও এতোটা স্নিগ্ধতা থাকে কিনা তার জানা নেই। চার পাশের সব কিছু ছেলেটার চোখে ঘোলাটে হয়ে গেল কেবল মধ্যমণি রূপে অবস্থান করছে সোরায়া। ঠিক যেন একটা লাল জলপরী। মাহির কয়েকবার পলক ফেলল এটা তার কল্পনা হতে পারে এমনটা ভেবে। তবে যখনই চোখের পাতা উঠিয়ে সোরায়ার দিকে দেখছে তার চোখে নতুন নতুন সব আকর্ষণ ধরা পড়ছে। মাহির নিজের বুকের বা পাশে হাত চেপে মৃদু আর্তনাদ করলো- "আউচ..?" মাহির দ্বিধান্বিত কণ্ঠে নিজেকে প্রশ্ন করে-"Can I really control...?"

আবার নিজেই নিজের মাথা ডানে বামে নাসূচক নেড়ে উত্তর করলো-"I don't think so..!"

সময়টা থেমে রইল কয়েক মিনিট। মাহিরের হৃদস্পন্দন এখন কেমন গতিতে চলছে তার পরিমাপ করা কঠিন। সোরায়া নিজের ভেজা চুলের গুচ্ছ মুছতে মুছতে মাহিরের দিকে গিয়ে এলো। মাহির নিজের হাত মুষ্টিবদ্ধ করে কেবল মনে মনে বিলাপ পারছে-

"ও বাচ্চা মেয়ে মাহির। কুল ডাউন। ও একটা বাচ্চা মেয়ে।"

মাহির ঠিক খেয়াল করে উঠার আগেই সোরায়া তার একদম সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। মাহিরকে এমন পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সোরায়া মাহিরের মুষ্টিমেয় হাত ধরে ঝাকুনি দিয়ে গলার আওয়াজ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো-

"স্যার...কি হলো? কথা বলছেন না কেন?"

মাহির হকচকিয়ে উঠলো, তার হাতের মুঠো মুক্ত হলো-

"হ্যাঁ হ্যাঁ, কি?"

-"কি আবার কি? কত রাত হয়েছে জানেন? এত দেরি হলো কেন আপনার ঘরে আসতে?"

মাহির সোরায়ার দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটার এতো গুলো প্রশ্ন তার গা স্পর্শ করলো না। মাহির সোরায়ার চুল থেকে টপটপ করে পড়া পানি যে মেয়েটার কলার বোনের খাজে জমা হচ্ছে সেই দৃশ্য দেখে যাচ্ছে যেন কোনো মুভির ক্লাইম্যাক্স পয়েন্ট। মাহির ধীর গতিতে নিজের হাত উঠিয়ে সোরায়ার কলার বোনে জমা হওয়া পানির কণা গুলো নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে মুছে দিয়ে নিজে উল্টো প্রশ্ন করলো-

"এত রাতে শাওয়ার নিয়েছ কেন?"

সোরায়া শরীর মাহিরের এমন স্পর্শে মৃদু ঝাঁকি দিয়ে উঠলো। সে সঙ্গে সঙ্গে এক পা পিছিয়ে গিয়ে হাতের টাওয়াল টা শক্ত করে বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে বলল-

"আপু বলেছে আপনি এলে যেন আপনার সাথে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ি। কিন্তু আমার তো ঘুম পাচ্ছিল আর আপনিও আসছিলেন না। তাই ভাবলাম শাওয়ার নিলে হয়তো ঘুম কেটে যাবে আর রাত টুকু জাগতে পারবো।"

মাহির সোরায়ার দিকে দু পা এগিয়ে এসে মেয়েটার চিবুক ধরে মুখখানি নিজের দিকে উঁচু করে ধরে পুনরায় প্রশ্ন করলো-

"তো.. ঘুম কি কেটেছে?"

সোরায়ার একটু ইতস্তত বোধ করে মাথা উপর নিচ নেড়ে হ্যাঁ বলতেই মাহির আবারো প্রশ্ন করলো-

"রাত টুকু জাগতে পারবে?"

সোরায়া এবারও মাথা নাড়লো। মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোরায়ার গাল স্পর্শ করে তার ভেজা চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল-

"চুলটা শুকিয়ে নাও। ঠান্ডা লেগে যাবে নয়তো। আমি শাওয়ার নিয়ে আসছি।"

সোরায়া আবারো বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়লো। মাহির সোরায়াকে রেখে ওয়াশ রুমে ঢুকে যেতেই সোরায়া নিজের মুখ দুই হাতে ঢেকে বিছানার উপর বসে পড়লো-

"আল্লাহ, আমার এমন লাগছে কেন? উনি ওভাবে কেন প্রশ্ন করলো?"

________

একই সময়ে রায়ান মিরার ঘরের পরিবেশ কিছু টা ভিন্ন। মিরা সোরায়াকে তার ঘরে পৌঁছে দিয়ে নিজের ঘরে এসে ঘরটাকেই সম্পূর্ণ অন্ধকার করে রেখে ছিল কিছু টা সময়। রায়ানের উপর রাগ করে মুখ ফুলিয়ে বসে ছিল বিছানায়। কিন্তু তাতে লাভের লাভ কিছু হলো না, কারণ রায়ান তো আর ঘরেই আসে নি। মিরার রাগ বাড়লো। সে সময় নিয়ে নিজের পড়িহিত ভারী লেহেঙ্গাটা গা থেকে আলাদা করতে করতে রায়ান কে বেশ বকাঝকা করলো মনে মনে। লেহেঙ্গা টা খুলে রেখে একটু ঝাড়া হাত পা হয়ে মিরা ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসলো‌ গয়না গুলো খুলতে। আয়নায় নিজের চেহারাটা দেখে চোখ ছোট ছোট করে নিজেকে ধমকের সুরে বলল-

"এবার ওই অসভ্য লোক রাগ ভাঙাতে এলে যাচ্ছেতাই বলে দিবি। ইচ্ছে মতো মারবিও, বুঝেছিস? বেশি পিরিতি দেখালে এই হয়। সবার সামনে কেমন অর্ডার করলো। তুই কি কারো অর্ডারের ধার ধারিশ? কি সাহস ভাবা যায়!"

মিরা নিজের উদরের উপর হাত রেখে তার ভেতরের ছোট্ট রুহুটাকেও ধমক দিয়ে সাবধান করলো-

"এই যে পাপার প্রিন্সেস, পাপার সাথে আজ মাম্মাম অনেক বড়সড় একটা ফাইট করবো‌, ভুলেও আমার মন ভোলানোর চেষ্টা করবে না পাপার হয়ে। মাথায় রাখবে তুমি আমার ভেতর থাকো, আমার থেকে খাবার খাও। আমি বেশি ইম্পর্ট্যান্ট। তোমার জন্য আমি বেশিক্ষণ তোমার পাপার উপর রাগ ধরে রাখতে পারি না। এটা তোমার মাম্মামের অওরা ড্যামেজ করছে বুঝেছ?"

হঠাৎ করেই ঘরের দরজা খোলার আওয়াজ এলো। মিরার হাত তার পেটের উপর থেকে সরে গেল। চমকিত চাহুনিতে দরজার দিকে তাকাতেই দেখলো রায়ানকে। রায়ানের সাথে চোখাচোখি হতেই সে মুখ ফুলিয়ে রায়ানের থেকে মুখ ঘুরিয়ে আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের গায়ের গহনা খুলতে উদ্যত হলো। লেহেঙ্গার নিচের ভারী অংশটা ফ্লোরে লুটুপুটি খেতে দেখে রায়ান মিরা দিকে খেয়াল করলো- মিরা লেহেঙ্গার উপরের ব্লাউজ আর নিচের অংশে জিন্সের প্যান্ট পরিহিত। রায়ান মৃদু হাসলো মিরার এমন রূপ দেখে। আজকাল একটা ট্রেন্ডিং শব্দ- তথাকথিত ব্যাডি ভাইব পাচ্ছে এখন সে মিরা কে দেখে। রায়ান নিচের ঠোঁট কামড়ে হাসলো আর মনে মনে বিড়বিড় করলো-"How can she always make me loss my control whenever I see her.. it's getting more terribly terrifying day by day..!"

রায়ানের মনের অন্তর্নিহিত ভাব প্রকাশ করার সুযোগ নেই। সে মিরার গরম ফুলকো লুচির মতো মুখটা দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানে এখন মিরার রাগ ভাঙাতে তার রাত পোহাবে। রায়ান ফ্লোর থেকে লেহেঙ্গাটা তুলে পাশের কাউচের উপর রাখলো। তারপর, মিরার হাবভাব পর্যবেক্ষণ করে ঠোঁটে কোণে একটা দুষ্টু হাসি নিয়ে ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে গেল। মিরার আড় চোখের রায়ানের প্রতিটা পদক্ষেপ খেয়াল করছে। রায়ান স্বাভাবিক ভাবে মিরার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে তার কানের দুল খুলতে তাকে সাহায্য করতে তার কানে হাত দিতেই মিরা রায়ানের হাত শক্ত হাতে সরিয়ে দিতে গেল, কিন্তু এতে করে নিজের কানের ঝুমকা তেই টান লাগলো তার। মিরা মৃদু আর্তনাদ করে উঠলো-"আহহ্..!"

রায়ান হকচকিয়ে নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে মিরাকে শান্ত গলায় বলল-

"Ok ok, fine, do it yourself..আমি আর ধরছি না। সাবধানে খুলো। লাগে না যেন।"

মিরার রাগ যেন তিরতির করে বেড়েই যাচ্ছে। সে অগ্নিদগ্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো রায়ানের দিকে। রায়ান যে মিরার রাগকে ভয় পায় তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সে শুকনো ঢোক গিলে মিরার থেকে দূরে সরে গেল। সে গায়ের কোর্ট খুলে পড়নের শার্ট আনবাটন করতে থাকলো‌। মিরা আয়নার দিকে মুখ করতেই আয়নার মাঝে রায়ান কে দেখলো। রায়ান উল্টো দিকে ফিরে তার শার্টটা খুলতেই আয়নার প্রতিবিম্বে তার সুঠাম প্রসস্থ পিঠ ধরা পড়লো। রায়ান শার্টটা খুলে কয়েকবার কাঁধ স্ট্রেচ করতেই পিঠের মাংসপেশীতে একটা প্রজাপতির অবয়ব সৃষ্টি হলো‌ যা মিরার চোখকে বিন্দু মাত্র এড়ালো না। মিরার আয়নার মাঝে রায়ানের দিকে চোখ রেখে শুকনো ঢোক গিলল। তার হৃদস্পন্দনের গতি এই মূহুর্তে স্বাভাবিকের তুলনায় সামান্য বেশি। মিরা নিজের মনোযোগ ঘোরাতে দুচোখের পাতা বন্ধ করে নিল। পর মূহুর্তেই আবারো রাগ দেখিয়ে ড্রেসিং টেবিলের উপর সজোরে আওয়াজ করে রায়ানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিজের বুকে আড়াআড়ি হাত বেঁধে চেঁচিয়ে উঠলো-

"সমস্যা কি? ম্যানারস নেই আপনার?"

রায়ান আচমকা পিছন ফিরে মিরার দিকে অবাক হয়ে তাকালো- "হুয়াট?"

-"এখানে এতো ভাব নিয়ে উলঙ্গ হওয়ার মানে কি? এটা বেডরুম, চেঞ্জ করার জন্য ওয়াশ রুম আছে। নাকি এতো টুকুও জানেন না কোথায় কি করতে হয়?"

মিরার মুখে এতো গুলো অপমানজনক কথা শুনেও রায়ান চুপ থাকলো। সে মাথা নিচু করে নিজের উন্মুক্ত শরীরটা একনজর দেখে পুনরায় মিরার চোখের দিকে তাকালো। মেয়েটার চোখে রাগ সঙ্গে দূর্বলতা উভয়ই পরিলক্ষিত। রায়ান একগাল বাঁকা হাসলো। মিরা রায়ান কে হাসতে দেখে আবারো যা মুখে এলো বলতে লাগলো-

"কি পরিমান নির্লজ্জ, এতো গুলো কথা শুনানোর পরও হাসছে।"

রায়ান মিরার কথা বলার মাঝেই দ্রুত পায়ে মিরার দিকে এগিয়ে এসে মিরার কোমর জড়িয়ে তাকে শূন্যে তুলে ড্রেসিং টেবিলের উপর বসিয়ে দিল। তাড়াহুড়ো তে মিরা কিছু বুঝে উঠার আগেই তার চোখ জোড়া বন্ধ হলো তার ঠোঁট জোড়ায় রায়ানের অবাধ্য আক্রমণে। রায়ান নিজের একহাত মিরার কোমরে অন্যহাতে মিরার ঘাড় শক্ত করে আঁকড়ে ধরে নিজের মাঝে মিরাকে বিলিন করে নিতে চাইলো। মিরার দুহাত শক্ত হলো ড্রেসিং টেবিলের ধারের উপর। রায়ান মিরার কোমরে নিজের হাতের স্পর্শ তীব্র করে মিরাকে নিজের আরো কাছে টানতেই মিরার হাত ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে গিয়ে রায়ানের পেশিবহুল উন্মুক্ত বক্ষে গিয়ে ঠেকলো। মিরা ছটফট করতে শুরু করলে রায়ান কয়েক সেকেন্ডের বিরতি তে মিরার ঠোঁটের উপর মৃদু স্বরে আওড়ালো-

"আ'ম সরি হৃদপাখি, আমার ওভাবে কথা বলা উচিত হয় নি।"

মিরা নিজের চোখ খুলতেই রায়ান পুনরায় একই ভাবে মিরার ঠোঁটের মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে শুরু করলো। মিরা আবারো নিজের চোখ জোড়া বন্ধ করে নিল। কিছুক্ষণ পরেই রায়ান মিরার ঠোঁট জোড়া মুক্ত করে দিয়ে তার গলায় মুখ গুঁজে দিল। দুজনের শ্বাস প্রশ্বাস এতোটাই ভারী হয়ে আছে যে নিঃশ্বাস নিতেও হাপাচ্ছে দুজন। মিরা হঠাৎ করেই খেয়াল করলো আজ রায়ানের আচরণ আগের থেকে ভীষণ অশান্ত ও অধৈর্য। সে কোনো বারেই রায়ানের সাথে এই খেলায় পরে ওঠে না আজ যেন আরো বেশি দূর্বল লাগছে তার। মিরার চোখে অশ্রু কণা জমা হলো। রায়ান স্থির হয়ে রইল মিরার কাঁধে কপাল ঠেকিয়ে। তার নিঃশ্বাসের বেগ এখন তুঙ্গে। কিছু টা সময় ওভাবেই থাকলো দুজন। মিরা আলতোভাবে রায়ানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকলো। রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরার কাঁধে ছোট্ট করে চুমু খেয়ে মিরার কানে কানে বলল-

"আ'ম সরি।"

মিরা একটু সরে গেলে রায়ান মিরার সম্মুখে এসে তার চোখে চোখ রেখে বলল- "বললাম তো সরি, এতো গুলো কথা শুনালে আমায়, আর আমি এতোটা আদর করলাম। এখনো রাগ কমে নি?"

মিরা তার সদ্য লাল হয়ে ওঠা ঠোঁটজোড়ায় ভেংচি কেটে আনমনে বিড়বিড় করলো-

"সরি বলার ওয়ে একটু বেশিই ক্যাসুয়াল হয়ে গেছে।"

রায়ান মিরার ফুলে উঠা ঠোঁটের উপর নিজের নজর স্থির করলো। মিরার গালে হাত রেখে তার ঠোঁটের উপর বুড়ো আঙুল টা স্লাইড করতে করতে এগিয়ে আসতেই মিরা ধাক্কা দিয়ে রায়ানের মনোযোগ নষ্ট করলো-

"আবার কি চাই হ্যাঁ? একটু আগেই কামড়েছেন। জ্বলছে এখন। দূরে থাকুন।"

রায়ান অধৈর্য হয়ে আবার মিরার কাছে এসে দাঁড়িয়ে বলল-

"একটু রাগ কমালে কি হয়? এখন কি তোমার পা কাঁধে তুলে সরি বলবো?"

মিরা সঙ্গে সঙ্গে রায়ানের গালে সামান্য শক্তি প্রয়োগ করে চর বসালে রায়ান নিজের গালে হাত দিয়ে বাচ্চা দের মতো মুখ ফুলিয়ে বলল-

"সারাটা দিন আমার সাথে খ্যাচর খ্যাচর করো। তোমার মুখে দুটো ভালো কথা শুনলেও তো আমার মনে একটু মনে শান্তি লাগে। হ্যান্ডসাম বলে জ্বীন পরীরাও ভর করতে চায় আমার উপর মাঝে মাঝে। কিন্তু তোমার মন গলে না।"

রায়ানের কথায় মিরা আড় চোখে ছেলেটার দিকে তাকালো। রায়ান আরো গলা উঁচু করে বলল-

"আমার সাথে সবাই ভালো ব্যবহার করে। তুমি আমাকে একটুও ভালোবাসো না। তুমি আমাকে একটু ভালো বাসলে আমিও তো তোমাকে একটু ভালোবেসে আদর করতে পারি।"

মিরা রায়ানের মুখে এসব কথা শুনে না চাইতেও হেঁসে ফেলল। মুখ টিপে হাসতে যেন মেয়েটার পেট ফেটে যাওয়ার পর্যায়ে। তার রাগ পালিয়ে দূর দেশে চলে গেল এক নিমিষে। সে তুচ্ছার্থে হেঁসে রায়ানের চোয়াল ধরে একটু উলটে পালটে দেখে মুখ বাঁকিয়ে বলল-

"ইস, হ্যান্ডসাম না ছাই। এতো করে আমাকে চেয়েছেন তাই দয়া মায়া দেখিয়ে বিয়েটা করেছি.. নয় তো আপনার জীবনেও বিয়ে হতো না। নেহাতই ছোট বেলায় কিছু বুঝতাম না তাই আমার মতো সুন্দরী একটা বউ পেয়ে গেছেন। "

রায়ান মিরার হাতটা ধরে ফেলল সঙ্গে সঙ্গে। মিরা হাঁসি থামিয়ে গম্ভীর মুখে রায়ানের চোখে চোখ রাখলো। রায়ান মিরাকে আলতো ভাবে টেনে নিজের উন্মুক্ত বুকে জড়িয়ে ধরে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে শান্ত গলায় বলল-

"থ্যাংক ইউ, আমাকে দয়া মায়া দেখানোর জন্য। ভাগ্যিস তুমি তখন ছোট ছিলে, আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া তুমি তখন কিছু বুঝতে না।"

মিরা মুচকি হেঁসে রায়ানের খোলা পিঠে হাত রাখলো তাকে জড়িয়ে ধরতে। মিরা হাতের চুড়িতে রায়ানের পিঠে আচড়া লাগতেই রায়ান সামান্য আর্তনাদ করে মিরার থেকে একটু সরে দাঁড়ালো। মিরা চিন্তিত হয়ে রায়ানের উদ্দেশ্যে বলল-

"কোথায় লাগলো দেখি.. বেশি লেগেছে?"

রায়ান মাথা না সূচক নাড়িয়ে বলল-

"ঠিক আছি, এসব তাড়াতাড়ি খুলো। বিরক্তি কর..!"

মিরারও খুব বিরক্ত বোধ হলো তার চুরিতে রায়ান ব্যাথা পেয়েছে বলে। সে তাড়াহুড়ো করে হাত থেকে চুরি গুলো খুলতে শুরু করলো।

-"আরে, ধীরে খুলো না। লেগে যাবে।"

রায়ানের সাবধান করাতে মিরা ধীরে সুস্থে চুরি গুলো খুলতে খুলতে ঘাড় কাত করে রায়ান কে বলল-

"আমি এগুলো খুলতে খুলতে আপনি গলার হার টা খুলুন তো। দমবন্ধ লাগছে‌।"

রায়ান মিরা কথায় এগিয়ে গিয়ে হারটা খুলতে উদ্যত হলো। রায়ান হারের ফিতে টুকু ঢিলে করতে গেলে তার চোখ স্থির হলো মিরার ঘাড়ের উপর। কেমন যেন ঘোরের মধ্যে চলে যাচ্ছে সে। মিরা সেটা খেয়াল করে প্রশ্নাত্মক চাহুনিতে রায়ানের দিকে মুখ উঁচু করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

"এমন ভাবে কি দেখছেন?"

রায়ান ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বাস্তবে পদার্পণ করলো। সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাসূচক নাড়লো ছেলেটা। মিরা আর সেদিকে পাত্তা দিল না। রায়ান পুনরায় মিরার ঘাড়ের দিকে করুন চাহুনিতে তাকিয়ে বিড়বিড় করলো-

"কতদিন নিজের করা চিহ্ন দেখি না এখানটায়! মন চাইছে এখনি নিজের ট্যাগ লাগিয়ে দিই। অসহ্যকর যন্ত্রণা যত.. ! একটু আগেই ঠোঁট কামড়েছি, এখন ঘাড়ে কামড়ালে আমাকেই জ্যান্ত খেয়ে ফেলবে। না না বাবা থাক।"

মিরা গয়না গুলো খুলে উঠে দাঁড়ালে রায়ান মুচকি হেসে অসমাপ্ত আলিঙ্গন টুকু সম্পূর্ণ করতে মিরার দিকে এগিয়ে গেলে মিরা রায়ান কে বাঁধা দিল-

"আমার শাওয়ার নিতে হবে। শরীরটা কেমন যেন লাগছে।"

রায়ানের হাস্যোজ্জ্বল মুখটা বিষন্ন হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে পিছু হটে গেল। মিরা রায়ানের মনমরা মুখটা দেখে মুচকি হাসলো। সে ওয়াশ রুমে ঢুকার আগে আবারো জানান দিল-

"আমি শাওয়ার নিতে গেলাম।"

রায়ানের কোনো হেলদোল নেই। মিরা আশা করছিল রায়ান হয়তো প্রতিবারের মতোই তার পিছু নেবে কিন্তু ছেলেটার মনই ভেঙে গেছে। মিরা পুনরায় চেঁচিয়ে বলল-

"আমি শাওয়ার নিতে যাচ্ছি..!"

-"হ্যাঁ তো যাও, আমি কি করবো? আমি কি তোমাকে ধরে রেখেছি?"

রায়ান বিরক্ত হয়ে তৎক্ষণাৎ এমনটা বলে ফেলায় মিরার বেশ অভিমান হলো। মিরা রেগে খটমট করে ওয়াশ রুমের ভেতরে গিয়ে দরজা লক করার আগে রায়ানের উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে বলল-

"আপনাকে কিছু করতে বলি নি। আর এটা ইনফরমেশন ছিল না। ইনভিটেশন ছিল।"

এই বলে সজোরে ওয়াশ রুমের দরজা বন্ধ করে দিল সে‌। রায়ান হতবাক। তার কয়েক সেকেন্ড লাগলো বুঝতে মিরার কথার উদ্দেশ্য। রায়ান বুঝতে পেরে সাথে সাথে ওয়াশ রুমের দরজায় গিয়ে হাত দিয়ে আঘাত করলো-

"হৃদপাখি..প্লিজ দরজা খোলো। খোদার কসম, আমি একটুও বুঝিনি। আস্তো একটা গাধা আমি। বেইবি প্লিজ..! আমার শরীরে আগুন জ্বলছে, আমিও শাওয়ার নেব। দরজা টা খুলো না একটু। ওই...আমার সোনা বউ..প্লিজ দরজাটা একবার খুলো। এই মিরাআআ..! জান বেরিয়ে গেল আমার দরজা টা খুলো না একবার।"

মিরা রায়ানের এমন তৃষ্ণার্ত আর্তনাদ শুনে খুশিতে গদগদ হয়ে শাওয়ার অন করে দিয়ে হাত পা ছুড়ে নাচতে থাকলো। তার অন্তরে যেন এখন শান্তি লাগছে। মিরা দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করলো-

"একবার কেন অর্ধেকবার খোলা গেলে তাও খুলবো না। জ্বলুন এবার। বেয়াদব অসভ্য লোক। আমাকে ধমক দেওয়া তাই না? আগে একটু জ্বলে পুড়ে নিন পরে ভালোবাসবো।"

মিরা আর দরজা খুলার উদারতা দেখালো না। রায়ান ও এক পর্যায়ে অনুনয় করা বন্ধ করে দিল। নিজের উপর অসম্ভব রাগ হলো তার। নিজেই নিজের চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলবে এমন অবস্থা।

__________

অন্যদিকে~

রুদ্র হনহনিয়ে ঘরে প্রবেশ করতেই দেখলো অন্ধকার ঘর কেবল মোমবাতির আলোয় জ্বলজ্বল করছে। একটু অবাক হয়ে সে আশে পাশে তাকাল তবে রিমিকে দেখতে পেল না। রুদ্র এক পা দু পা এগিয়ে গিয়ে রিমিকে ডাকলো-

"রিমি..এটা তোমার সারপ্রাইজ? তোমাকে ছাড়া এই সারপ্রাইজ দিয়ে কি করবো আমি?"

হঠাৎ তখন কেউ রুদ্র কে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো আষ্টেপৃষ্ঠে। রুদ্রর পা থমকে গেল। সে তার কোমর জড়িয়ে ধরা হাত জোড়ার উপর আলতো করে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো-

"কি হয়েছে হুম? আমার সামনে আসছো না কেন?"

রুদ্র ভালো করেই জানে তাকে জড়িয়ে ধরা ব্যক্তি রিমি। রিমি অভিমানী কণ্ঠে বলল -

"এখন ঘরে আসার সময় হলো বুঝি? মেসেজ টা না দিলে তো ঘরেও আসতেন ন। আমার মুড অফ এখন তাই সামনে আসছি না।"

রুদ্র মুচকি হেঁসে পিছন দিকে মাথা কাত করে বলল-

"আমি মুড অন করতে জানি। সামনে এসো।"

রিমি লজ্জায় রুদ্রর পিঠে মাথা ঠেকিয়ে মুখ লুকিয়ে দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বলল-

"উঁহু, আপনি আমাকে দেখবেন না প্লিজ। বেশি বুঝে, কি না কি পড়ে ফেলেছি আপনি একটু কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন আমি চেঞ্জ করে আসছি।"

রিমি ফটাফট কথাগুলো বলে রুদ্র কে বাঁধন মুক্ত করে দৌড়ে পালাতে চাইলো। কিন্তু তা আর নাড়লো না। রিমি পিছন থেকে পালিয়ে ওয়াশ রুমের দিকে যেতে চাইলে রুদ্র তখনি রিমির হাত আঁকড়ে ধরে তাকে থামিয়ে দিল‌-

"আরে আরে, পালাচ্ছো কেন! দেখতে তো দাও কি পড়েছো।"

-"প্লিজ প্লিজ, ভুল হয়ে গেছে। হুজুগে পড়ে ফেলেছি। ছেড়ে দিন না।"

-"অদ্ভুত তো..কি এমন পড়েছ যে দেখতে পারবো না? এখন তো দেখতেই হবে আমার। দেখি সামনে আসো।"

-"না না... রুদ্র প্লিজ!"

রুদ্র রিমির কোনো বাড়োন শুনতে রাজি ছিল না। মনের কৌতুহল যেনো আরো জেকে বসলো তার উপর। রুদ্র রিমির হাত টেনে মেয়েটাকে নিজের সামনে নিয়ে এলো।

রিমির গায়ে ছিল গাঢ় লাল রঙের একটি নাইট ড্রেস। নরম সিল্ক কাপড়ের মসৃণ ছোঁয়ায় পোশাকটা যেন তার দেহের সঙ্গে মানিয়ে গেছে। ঘরের মৃদু আলোয় লাল রঙটা আরও গভীর ও উজ্জ্বল দেখালো রুদ্রর দৃষ্টতে, রুদ্রর হাতের বাঁধন রিমির কব্জির থেকে ছুটলো। রুদ্র স্তব্ধতার শিখরে। তার পুরুষ সত্তা হৃদয়ে ঝংকার তুললো, চক্ষু জোড়া নিজের স্থান ত্যাগ করে তার হাতে চলে আসার উপক্রম। রিমি দুই হাতে নাইট ড্রেসের সামান্য কাপড় খামচে ধরে মাথা লজ্জায় নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তার পা এমনিতেই কাঁপছে মৃদু গতিতে। ঘরটায় মোমবাতির উষ্ণতা বৃদ্ধি পেল। রিমি রুদ্র কে চুপ থাকতে দেখে কৌতূহলী মনে মাথা উঠিয়ে রুদ্রের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলো। সম্পূর্ণ ব্লেংক একটা মুখশ্রী দেখে রিমি আরো ঘাবড়ে গেল। মেয়েটা ভয়ে বোধহয় এবার কেঁদেই ফেলবে। রিমি লজ্জায় নিজের মুখ দুহাতে ঢেকে ছোট ছোট পদক্ষেপে রুদ্রর দিকে এগিয়ে গিয়ে রুদ্রর বুকে মুখ লুকিয়ে নিল যা রুদ্রর সুঠামদেহ ঝাঁকিয়ে তুলতে সক্ষম। রিমি রুদ্রর অস্বাভাবিক দ্রুত হৃদস্পন্দন শুনতে পেল শুধু যে শুনলো তার নয়। সেই তীব্র শব্দ তার হৃদস্পন্দনও অস্বাভাবিক করে তুললো হয়তো। রিমি মিনমিনে গলায় জিজ্ঞেস করলো-

"রুদ্র, আপনার হার্ট বিট এতো ফাস্ট চলছে কেন?"

রুদ্র হঠাৎ নিজের বুকে ভার অনুভব করলো। রিমি কে নিজের বুকে মুখ লুকাতে দেখে সে সামান্য গৌরবময় হাসি হাসলো। রুদ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিমি মাথায় হাত রাখলো। রিমি একটু চমকে মিটিমিটি চোখ খুলে রুদ্রর দিকে তাকালে রুদ্র চট করে রিমির কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে আদুরে গলায় বলল-

"এমন রূপের দর্শন করিয়ে যদি আশা রাখো এই নির্লজ্জ পুরুষ হৃদয় শান্ত থাকবে তাহলে তো এটা ঘোর অপরাধ।"

রিমি আবারো মুখ নিচু করে নিল। রুদ্র রিমির দু গালে হাত রেখে তার চোখে চোখ রাখতে মেয়েটাকে বাধ্য করলো-

"এতো গুলো মাস সংসার করে এতো লজ্জা?! তুমি এতো লজ্জায় ডুবে থাকলে আমি কিভাবে বাঁচবো বলো তো? আমাকে ভালোবেসে কি একটা দিন এই লাজ সরিয়ে রাখা যায় না?"

রিমি জবাব না দিয়ে নিজের চোখ বন্ধ করে নিল। রুদ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিমির গাল থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে শান্ত গলায় বলল-

"তোমার অনুমতি ছাড়া কখনো তোমার উপর জোর খাটাই নি। আজও জোর করবো না।"

রুদ্রর কথায় রিমি বিষন্ন চাহুনিতে তার দিকে তাকালো। রুদ্র রিমির কপালে আবারো চুমু খেয়ে তার পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে রিমি রুদ্র কে পিছন থেকে জাপটে ধরে মৃদু লজ্জা মিশ্রিত কণ্ঠে গাইলো-

"এই হৃদয় চিরে দেখ,

তোমারই ছবি..! বড় ভালোবাসি,

তবু লাজে মরি।।"

রুদ্র তার কাঙ্খিত জবাব পেল। রিমির দিকে ঘুরে সে সঙ্গে সঙ্গে রিমির ওষ্ঠযুগলে কব্জা করলো। রিমি আবেশে চোখ জোড়া বন্ধ করে নিল। আজ প্রথমবার রুদ্র রিমিকে এতোটা অ্যাক্টিভ দেখছে। মাঝের ছোট্ট বিরতির জন্য রিমি রুদ্রর বুকে মৃদু ধাক্কা দিল। রুদ্র রিমির ওষ্ঠযুগল ছেঁড়ে মেয়েটার কানের কাছে মুখে নিয়ে গিয়ে তার ছোট্ট আবদার টুকু রাখলো-

"আমার ছোট্ট একটা আদুরে প্রাণ চাই রিমি। দেবে না আমায়?"

রিমি নিঃশ্বাসের গতি সামলে নিল। রুদ্রর চোখে চোখ রাখে সে হাসি মুখে মাথা উপর নিচ নাড়িয়ে সম্মতি দিল। রুদ্র মুচকি হেঁসে রিমিকে জড়িয়ে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে নিয়ে চললো বিছানার দিকে।

_____

অপর দিকে, শাওয়ার শেষে মিরা আর কোনো কথা না বলে চুপচাপ বিছানার এক দিকে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। বেচারা রায়ান ও এরপর একা একা শাওয়ার নিয়ে বের হলো। তবে মনে এখনই হাল ছেড়ে দেওয়ার ছেলে সে নয় এটা মিরা আর সে নিজেও জানে। যা তার চাই বরাবরই তা আদায় করে নিয়েছে কোনো না কোনো ভাবে। মিরা ঘুমের ভাব ধরে থেকে হালকা চোখ খুলে সবটা খেয়াল করছে। রায়ান ও জানে মিরা এখনো ঘুমায় নি। তার ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসে পরিলক্ষিত হলো। রায়ান বিছানায় উঠতে উঠতে নিজের মনে বিড়বিড় করলো-

"আমাকে জ্বালিয়ে এমনি এমনি নিস্তার আপনি পাবেন না মিসেস।"

রায়ান গিয়ে সোজা মিরাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়লো। মিরা রায়ানের স্পর্শ গায়ে ফোস্কা পড়ার মতো চেঁচিয়ে উঠলো-

"আমার ঘুম পাচ্ছে। গালি শুনার ইচ্ছে না থাকলে, আমার কাছ থেকে দূরে যান বলছি।"

রায় নিজের একরোখামি বজায় রেখে খুশি মনে বলল-

"Go ahead..তুমি শুনালে গালিও শুনে নেব। শুনাও শুনাও..!"

রায়ানের কথা কানে যেতেই মিরার হাঁসি বাঁধ ভাঙলো। যতটা সম্ভব হাসি নিয়ন্ত্রণ করে মুখ টিপে হাসলো সে। এই পরিস্থিতি বুঝতে রায়ানের সময় লাগলো না। সেও ঠোঁটের কোণায় দুষ্টু হাসির রেখা টেনে মিরার কানে কানে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো-

"আমার হৃদপাখি কি হাসছে?"

মিরার অন্তর আত্মা কেঁপে উঠলো। সে বিরোধীতা করে খুব চট জলদি উত্তর দিল-

"কই না তো? আমি কেন হাসবো?"

রায়ান মিরার চুলের ভাঁজে মুখ লুকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হেঁসে মিরার কোমল উদরে হাত বুলিয়ে বলল-

"তাহলে কি আমার প্রিন্সেস হাসছে তার পাপার কথা শুনে?"

মিরা রায়ানের দিকে ঘুরলো। মনে এতোক্ষণ যাবত যেই অভিযোগ ছিল তা রায়ানের মুখের উপর বলল-

"আপনি আমাকে ঘরে চলে আসতে বললেন কেন?"

রায়ান মিরার হাত টা নিয়ে নিজের মুখের উপর রেখে লাজুক ভাব নিয়ে বলল-

"আমি কমু না। আমার শরম করে।"

মিরা বিরক্ত ভঙ্গিতে নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে বিড়বিড় করলো-"ড্রামাকিং.,!"

রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরাকে বুঝিয়ে বলল-

"কত রাত হয়েগেছিল খেয়াল আছে তোমার? মাহির সোরায়ার কথাটা ভেবেছো একবার? ওরা কত ক্লান্ত ছিল। তাছাড়া তুমি নিজের অবস্থা দেখেছো? তোমার মধ্যে যে একজন আছে সেই খেয়াল তো তোমার থাকেই না হৃদপাখি। লেহেঙ্গা পড়ে যে বাইক রাইড করেছ আর ঠিক কতটা স্পিডে চালিয়েছে সেটা আমার বুঝতে বাকি নেই। ওটার জন্য তো এখনো বোকা খাওনি। আমি তো সবার দিকে থেকে যেটা ভালো হবে শুধু সেটাই সাজেস্টে করেছি। তুমি জেদ করতে তাই জোর গলায় বলেছি এটা কি বোকা দেওয়া হলো?"

মিরার রায়ানের এতো জ্ঞানের কথা পছন্দ হলো না। সে সুযোগ বুঝে রায়ানের মুখ বন্ধ করতে নিজের ঠোঁট এগিয়ে রায়ানের ঠোঁটের উপর রাখলো। মিরা কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপ্তিতে নিজের ঠোঁট জোড়া রায়ানের থেকে আলাদা করে নিল। রায়ান মিরার চোখে চোখ রাখতেই মিরার চোখে মুখে দুষ্টুমির ছাপ দেখতে পেল স্পষ্ট। রায়ান মিরাকে সাবধান করে বলল-

"এমন উল্টো পাল্টা গেইম আমার সাথে খেলো না হৃদপাখি। তুমি জানো আমি সামলাতে পারবো না পরে।"

মিরা নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল -

"আমি কোনো গেইম খেলছি না। আমি আমার হাবিকে আদর করছি। আপনার তাতে কোনো সমস্যা হচ্ছে?"

রায়ান নিজের নিচের ঠোঁট কামড়ে মাথা ঝাঁকিয়ে মিরার কথা মেনে নিয়ে ঘোর লাগানো কণ্ঠে বলল-

"আমার কোনো সমস্যা নেই তাতে পাখি। কিন্তু তোমার হাবি যদি এখন তোমাকে বিপরীতে যাবৎ আদর করতে শুরু করে তাহলে তোমার ঠিকই সমস্যা হবে।"

মিরার চোখের আকার বড় বড় হয়ে উঠলো। রায়ান অধৈর্য হয়ে মিরা দিকে অগ্রসর হলো। মিরা রায়ানের কাঁধে হাত রেখে তাঁকে থামাতে চেয়েও ব্যর্থ। রায়ান মূহুর্তের মধ্যে মিরার ঠোঁট জোড়া নিজের আয়ত্তে নিল। এতো অশান্ত ছোঁয়ায় মিরা নিজেকে হারিয়ে ফেলতে শুরু করলো। বুকের ধুকপুকানি বাড়লো। রায়ান মিরার ঠোঁট দুটো মুক্ত করতেই মিরা লজ্জায় রায়ান কে জাড়িয়ে ধরতেই রায়ান ঠোঁট কামড়ে হেঁসে বলল -

"এখন কেন লজ্জা পাচ্ছো? শুরু তো তুমিই করলে।"

মিরা শুধু ঘনঘন নিশ্বাস নিচ্ছে। রায়ান মিরার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল-

"আই নিড টু পাখি..!"

মিরার গালের লাল বর্ণ সম্পূর্ণ চেহারায় ছড়িয়ে পড়লো। সে দ্বিধায় চোখ তুলে বলল-

"সে ইট এগেইন...!"

রায়ান এবার বড্ড অসহায় গলায় বললে উঠলো-

"ইউর হাবি নিডস ইউ হার্ট বার্ড...হি ইজ ডাইং ইনসাইড। হি ফাক** নিডস ইউ..!"

এমন অসহায়ত্ব উপেক্ষা করার ক্ষমতা হয়তো মিরার নেই। সে পুনরায় নিজের ঠোঁটে রায়ানের রাজত্বের আহ্বান করলো তবে সেই রাজত্ব মোটেও ঠোঁট অব্দি সীমাবদ্ধ হলো না বর্ধিত হলো সর্বোচ্চ পরিসরে।

_______

রাত ২টা~

মাহির ফ্রেশ হয়ে এলে সোরায়া আর সে একসঙ্গে নামাজ পড়ে সৃষ্টি কর্তার কাছে তাদের দাম্পত্য জীবনের সুখের জন্য দোয়া ও শুকরিয়া আদায় করেছে। এখন প্রায় ১০ মিনিট যাবত জায়নামাজের উপরেই বসে আছে দুজনে। সোরায়া এমন চুপচাপ থাকতে তেমন অভ্যস্ত নয় বরাবরই খুব চঞ্চল। অথচ এখন চুপচাপ হয়েই বসে আছে। সোরায়া একনজর মাহিরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। মাহির ও সেটা খেয়াল করে সোরায়ার দিকে তাকালে সোরায়া একটু ইতস্তত বোধ করে চোখ নামিয়ে নিল। মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের থেকেই সোরায়ার কোলে জায়গা করে নিজের মাথা রেখে শুয়ে পড়লো। সোরায়া হতভম্ব হয়ে মাহিরের দিকে তাকাতেই মাহির সোরায়ার দিকে চোখ টিপে ইশারা করে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলল-

"কন্গ্রেচুলেশনস ওন কমপ্লিটিং দ্যা জার্নি ফ্রম আমার জানবাচ্চা টু আমার বাচ্চাবউ।"

সোরায়ার দ্বিধা অনেকটা কেটে গেল সাথে সাথে। এতক্ষণ ধরে সে চুপচাপ ছিল শুধু মাহিরের তরফ থেকে একটু ফ্রি সিগন্যালের আশায়। মাহিরের কথার ধাচ ধরে সেও একই ভাবে উৎসাহিত কণ্ঠে বলল-

"কন্গ্রেচুলেশনস ওন কমপ্লিটিং দ্যা জার্নি ফ্রম আমার স্যার টু আমার স্বামী জান।"

মাহির সোরায়ার মুখেও একই কথা শুনে মৃদু হেসে সোরায়ার নাকটা টেনে দিল। সোরায়া মাহিরের হাত সরিয়ে দিয়ে মাহির কে ঠেলে নিজের কোলে থেকেও উঠিয়ে দিল। মাহির প্রশ্ন করলো-

"কি হলো বউজান? কোনো সমস্যা?"

-"সমস্যা তো অবশ্যই। আপনি দেরি করে এলেন বলে আমি আগে আগেই শাওয়ার নিয়ে নিয়েছি। আপনি আমার ঘোমটাও তুলেন নি। এটা কোনো বাসর রাত হলো?"

সোরায়া মুখ ফুলিয়ে নালিশ করলো মাহিরের কাছে। সোরায়া নিজের থেকেই কিছু একটা ভেবে বলল-

"অতীত তো আর পাল্টানো সম্ভব নয়। আমি বরং শাড়ির আঁচল দিয়ে আবার ঘোমটা দিই আপনি তুলবেন কেমন? মাহির মুচকি হেসে সোরায়ার বাচ্চামিতে সায় দিল। সোরায়া শাড়ির আঁচল দিয়ে লম্বা করে একটা ঘোমটা টেনে দিল নিজের মুখের উপর। দুজনের একজনের মুখ থেকেও হাসি সরছে না। সোরায়া ঠিকঠাক হয়ে বসলে মাহিরের তার ঘোমটা উঠালো। সোরায়া মায়াবী ভঙ্গিতে মাহিরের দিকে তাকাতেই মাহির নিজের বুকের বা পাশে হাত রেখে ঠাস করে ফ্লোরে পড়ে যেতে যেতে বলল-

"হায়য়, মাশাআল্লাহ, মারহাবা।"

সোরায়া মাহিরের প্রতিক্রিয়া দেখে খিলখিলিয়ে হেঁসে উঠলো। মাহির সোরায়ার খুশি দেখে ফ্লোর থেকে উঠে সোরায়ার দুগালে হাত রেখে মেয়েটার মুখ কাছে নিয়ে তার কপালে ওষ্ঠ ছুঁইয়ে বলল-

"কি মিষ্টি বাচ্চা বউটা..!"

দুজনেই বাঁধাহীন হেঁসে যাচ্ছে। হঠাৎ করেই মাহিরের খেয়াল হলো আজ সোরায তার বড্ড কাছে। মাহিরের হাসি বেগ কমলো। তার নজর পড়লো সোরায়ার গোলাপ রাঙা ঠোঁটে। কি অসম্ভব চমৎকার লাগছে তার ঠোঁটের কোণে প্রাণবন্ত হাসির রেখা।

চলবে..

পাখিরা অপেক্ষা করো বাকি টুকু ও আসবে এতো বড় পর্ব একসাথে পোস্ট হচ্ছে না কেন জানি। এতো টুকু পড়ে বেস্ট পার্ট কমেন্ট করে জানিও। সবাই শুধু বাকিটুকু দেও বাকিটুকু দেও এমন করো না। যতটুকু পড়েছি সেটুকু নিয়েই বলো। Love you pakhis ❤️ 🥰

#আত্মার_অঙ্গীকারে_অভিমোহ (18+) বাসর #Soul_bound_obsession

#Oratrika_Rahman_অরাত্রিকা_রহমান

#Part_77 (৩য়)

(কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ)

(প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত)

রাত ২টা~

মাহির ফ্রেশ হয়ে এলে সোরায়া আর সে একসঙ্গে নামাজ সৃষ্টি কর্তার কাছে তাদের দাম্পত্য জীবনের সুখের জন্য দোয়া ও শুকরিয়া আদায় করেছে। এখন প্রায় ১০ মিনিট যাবত জায়নামাজের উপরেই বসে আছে দুজনে। সোরায়া এমন চুপচাপ থাকতে তেমন অভ্যস্ত নয় বরাবরই খুব চঞ্চল। অথচ এখন চুপচাপ হয়েই বসে আছে। সোরায়া একনজর মাহিরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। মাহির ও সেটা খেয়াল করে সোরায়ার দিকে তাকালে সোরায়া একটু ইতস্তত বোধ করে চোখ নামিয়ে নিল। মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের থেকেই সোরায়ার কোলে জায়গা করে নিজের মাথা সোরায়ার কোলে রেখে শুয়ে পড়লো। সোরায়া হতভম্ব হয়ে মাহিরের দিকে তাকাতেই মাহির সোরায়ার দিকে চোখ টিপে ইশারা করে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলল-

"কন্গ্রেচুলেশনস ওন কমপ্লিটিং দ্যা জার্নি ফ্রম আমার জানবাচ্চা টু আমার বাচ্চাবউ।"

সোরায়ার দ্বিধা অনেকটা কেটে গেল সাথে সাথে। এতক্ষণ ধরে সে চুপচাপ ছিল শুধু মাহিরের তরফ থেকে একটু ফ্রি সিগন্যালের আশায়। মাহিরের কথার ধাচ ধরে সেও একই ভাবে উৎসাহিত কণ্ঠে বলল-

"কন্গ্রেচুলেশনস ওন কমপ্লিটিং দ্যা জার্নি ফ্রম আমার স্যার টু আমার স্বামী জান।"

মাহির সোরায়ার মুখেও একই কথা শুনে মৃদু হেসে সোরায়ার নাকটা টেনে দিল। সোরায়া মাহিরের হাত সরিয়ে দিয়ে মাহির কে ঠেলে নিজের কোলে থেকেও উঠিয়ে দিল। মাহির প্রশ্ন করলো-

"কি হলো বউজান? কোনো সমস্যা?"

-"সমস্যা তো অবশ্যই। আপনি দেরি করে এলেন বলে আমি আগে আগেই শাওয়ার নিয়ে নিয়েছি। আপনি আমার ঘোমটাও তুলেন নি। এটা কোনো বাসর রাত হলো?"

সোরায়া মুখ ফুলিয়ে নালিশ করলো মাহিরের কাছে। সোরায়া নিজের থেকেই কিছু একটা ভেবে বলল-

"অতীত তো আর পাল্টানো সম্ভব নয়। আমি বরং শাড়ির আঁচল দিয়ে আবার ঘোমটা দিই আপনি তুলবেন কেমন?"

মাহির মুচকি হেসে সোরায়ার বাচ্চামিতে সায় দিল। সোরায়া শাড়ির আঁচল দিয়ে লম্বা করে একটা ঘোমটা টেনে দিল নিজের মুখের উপর। দুজনের একজনের মুখ থেকেও হাসি সরছে না। সোরায়া ঠিকঠাক হয়ে বসলে মাহিরের তার ঘোমটা উঠালো। সোরায়া মায়াবী ভঙ্গিতে মাহিরের দিকে তাকাতেই মাহির নিজের বুকের বা পাশে হাত রেখে ঠাস করে ফ্লোরে পড়ে যেতে যেতে বলল-

"হায়য়, মাশাআল্লাহ, মারহাবা।"

সোরায়া মাহিরের প্রতিক্রিয়া দেখে খিলখিলিয়ে হেঁসে উঠলো। মাহির সোরায়ার খুশি দেখে ফ্লোর থেকে উঠে সোরায়ার দুগালে হাত রেখে মেয়েটার মুখ কাছে নিয়ে তার কপালে ওষ্ঠ ছুঁইয়ে বলল-

"কি মিষ্টি আমার বাচ্চা বউটা..!"

দুজনেই বাঁধাহীন হেঁসে যাচ্ছে। হঠাৎ করেই মাহিরের খেয়াল হলো আজ সোরায়া তার বড্ড কাছে। মাহিরের হাসি বেগ কমলো। তার নজর পড়লো সোরায়ার গোলাপ রাঙা ঠোঁটে। কি অসম্ভব চমৎকার লাগছে তার ঠোঁটের কোণে প্রাণবন্ত হাসির রেখা। মাহিরের দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা সোরায়ার নজর এড়ালো না। ধীরে ধীরে মেয়েটার হাসির গতিও কমে এলো। মাহির সোরায়ার মুখের উপর আসা এক রাশ ছোট্ট চুলের গুচ্ছ আলতো হাতে গুছিয়ে তার কানের কাছে গুঁজে দিল। ঘরটা হঠাৎ করেই গম্ভীর হয়ে উঠলো। সোরায়া নিজের অস্বস্তি কমাতে বানোয়াট উৎসাহ নিয়ে মাহিরের দিকে হাত পেতে বলল-

"আমার গিফট কোথায়? তাড়াতাড়ি দিন।"

মাহিরের মনোযোগ ছিন্ন হলো। সে অবাক হলো-

"তোমার গিফট..?"

প্রশ্নাত্মক ভঙ্গিতে মাহির এ কথা বলতেই সোরায়া ভ্রু কুঁচকে সোজা টানটান হয়ে বসে নিজের কোমরে হাত বেঁধে বলল-

"বাহ রে, নতুন বউয়ের মুখ দেখলেন, কিছু দিতে হবে না বুঝি? কখনো মুভি বা সিরিজ দেখেন নি? বাসর রাতে বউয়ের মুখ দেখে কিছু দিতে হয় তো। আপনি আমার জন্য কিছু আনেন নি?"

মাহির অবুঝ মুখ করে নিজের মাথা নাসূচক ডানে বামে নাড়লো। সোরায়া সঙ্গে সঙ্গে হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে গেল। সে মনখারাপ করে মুখটা নিচু করে বসে রইল। কিন্তু কোনো প্রকার বায়না বা জেদ করে মাহির কে বাজে অনুভব করানোর কোনো উদ্দেশ্য ছিল না তার। তাই মুখটা নিচু রেখেই বুঝদার ভাব নিয়ে মাহিরের উদ্দেশ্যে বলল-

"সমস্যা নেই। আমার একটুও খারাপ লাগছে না। আমি আশাও করছিলাম না কিছু। বিশ্বাস করুন। আপনি মন খারাপ করবেন না প্লিজ।"

মাহির ঠোঁটে ঠোঁট চেপে নিজের হাঁসি নিবারণের চেষ্টা করে ঘাড় কাত করে সোরায়ার মলিন মুখটার দেখলো একবার। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোরায়ার চিবুকে আঁকড়ে ধরে নিজের দিকে তার মুখটা উঁচু করে জিজ্ঞেস করলো-

"আমাকে মনে খারাপ করতে না করে, নিজে মন খারাপ করে এই মিষ্টি মুখটাকে বাংলার পাঁচ করে রাখলে আমার পক্ষে কি খুশি মনে থাকা সম্ভব?"

সোরায়া মাহিরের হাত নিজের কোমল স্পর্শে সরিয়ে দিয়ে নিজের মুখ ঘুরিয়ে নিল-

"কেন সম্ভব না? অবশ্যই সম্ভব। তা নাহলে আপনার ঠিক মনে থাকতো যে আপনার বউকে আপনার কিছু দিতে হবে। আপনি একবার আমার কথা ভাবুন তো, কাল যখন জুঁই আমাকে জিজ্ঞেস করবে আপনি আমাকে বাসর রাতে কি দিয়েছেন আমি কিচ্ছু দেখাতে পারবো না। আমার মানসম্মান কি কিছু থাকবে?"

মাহির সোরায়ার অভিমানী কণ্ঠে করা এমন অভিযোগ শুনে নিজের অজান্তেই হেঁসে ফেলল। মাহির কে তার এমন গুরুত্বপূর্ণ কথায় হাসতে দেখে সোরায়া বেশ বিরক্ত হলো। সে ছোট ছোট চোখ করতেই মাহির নিজের হাসি লুকানোর বৃথা চেষ্টা করলো।

-"ধুর..আমি আপনার সাথে বাসর করবো না। হাসতে থাকুন আপনি। আমি ছোট বলে আমার একটা কথার গুরুত্ব নেই।"

রাগ দেখিয়ে সোরায়া উঠে গেল। মাহিরও হকচকিয়ে উঠলো। সে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে সোরায়ার হাত টেনে এক ঝটকায় তাকে টেনে নিলো নিজের বুকে। হাতের বাঁধন মেয়েটার হাতের কব্জি ছেঁড়ে স্থির হলো তার ধনুকের ন্যয় বাঁকা কোমরে। আকস্মিকতায় সোরায়া দুচোখের পাতা বন্ধ করে মাহিরের পাঞ্জাবি খামচে ধরলো। সোরায়া এখন মাহিরের হৃদস্পন্দন স্পষ্ট শুনছে- এক অদ্ভুত সুর যা অজান্তেই এক মোহে মুড়ে নিচ্ছে। মাহির নিজের পাজামার পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা লম্বা লাল রংয়ের সুসজ্জিত গয়নার বক্স বের করে সোরায়ার চোখের সামনে ধরে থেকে মেয়েটার কানের কাছে ঝুঁকে বলল-

"তোমার স্বামী জান থাকতে তোমার মানসম্মান কখনো কমবে না বউজান। সে কখনো এমনটা হতে দেবে না। নিশ্চিন্তে থাকো‌‌।"

সোরায়ার ধ্যান ভাঙলো। সে তৎক্ষণাৎ নিজের চোখ খুলে তাকাতেই দেখলো তার কাঙ্ক্ষিত গিফট বক্স। সঙ্গে সঙ্গে তার ঠোঁটের কোণে ধরা পড়লো সূক্ষ্ম হাসির রেখা। সোরায়া হাত উঠিয়ে গয়নার বাক্স টা নেচে গেলে মাহির তা সরিয়ে নিল-

"আরে, তাড়া কিসের? আজ তো আমার ও বাসর, তাই না? তাহলে আমরা গিফট কোথায়?"

সোরায়া একটু অবাক হলো-

"বরকেও গিফট দিতে হয় বাসর রাতে? কই আগে শুনিনি তো! আচ্ছা সমস্যা নেই, ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং আছে। কি চাই আপনার বলুন।"

মাহির সহজ সরল ভাষায় বলল-

"এইযে একটু আগে আমার সাথে বাসর করবে না বললে এটা হবে না। আমার সাথে বাসর করতে হবে।"

সোরায়া মাহিরের হাত থেকে গয়নার বাক্স টা ছিনিয়ে নিয়ে তুচ্ছার্থে হেঁসে বলল-

"কি অদ্ভুত কথা! সেই কখন থেকেই তো আপনার সাথেই বাসর করছি। উঠে গেলেই হলো নাকি। ঘরেই তো আছি।"

কথাটা বলে সে ওভাবেই নিজের হাতে গয়নার বাক্স টা খুললো। ভেতরে একটা চকচকে সোনার চেইন আর চেইনের সাথে লাগানো একটা ছোট্ট লকেট হার্ট শেপের। সোরায়ার ঠোঁট প্রশস্ত হলো খুশিতে। মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোরায়ার আনন্দে উচ্ছ্বসিত মুখটা দেখে নিজেও বেশ খুশি হলো।

-"অনুমতি দিলে.. পড়িয়ে দিতে পারি?"

মাহিরের এই ছোট্ট প্রশ্নে সোরায়া দ্রুত তার মাথা উপর নিচ ঝাঁকিয়ে অনুমতি দিল। সোরায়া আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। মাহির সোরায়ার হাত থেকে প্যান্ডেন্টটা নিয়ে তার পিছনে বিয়ে দাঁড়ালো। মাহির সোরায়ার ঘাড়ের কাছে ছড়িয়ে থাকা একগুচ্ছ চুল আলতো হাতে সরিয়ে প্যান্ডেন্টটা পড়িয়ে দিল।

সোরায়া মাথা সামান্য কাত করে আয়নার দিকে তাকাল। গলায় নতুন পড়া প্যান্ডেন্টটা ঠিকঠাক বসেছে কিনা দেখার চেষ্টা করছে সে। মাহিরও তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল। দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য আয়নায় মিলতেই অকারণেই হালকা একটা হাসি ফুটে উঠল দুজনের মুখে। সোরায়া আঙুল দিয়ে প্যান্ডেন্টটা ছুঁয়ে দেখল। শাড়ির আঁচলের আড়ালে থাকায় নকশাটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না। তাই সে আলতো করে আঁচলটা একটু সরিয়ে লকেটটার দিকে মনোযোগ দিল। ছোট্ট হার্ট-আকৃতির প্যান্ডেন্টটা আলোয় ঝিকমিক করে উঠতেই তার চোখে আনন্দের ছাপ ফুটে উঠল।

মাহির চুপচাপ সেই দৃশ্য দেখে যাচ্ছে শান্ত মুখে কিন্তু তার ভেতরের অস্থিরতা নিজের সীমা ছাড়াচ্ছে। তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুত রকম ধুকপুক করছে। কী বলবে, কীভাবে বলবে, কিছুই যেন গুছিয়ে উঠতে পারছে না বেচারা। সোরায়া প্যান্ডেন্টটা হাতে আঁকড়ে ধরে মুগ্ধ গলায় বলল, "কতো প্রিটি লাগছে তাই না?"

মাহির শুধু মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। তার গলায় কথা আটকে যাচ্ছে। উত্তেজনার চেয়ে বেশি ছিল এক ধরনের দায়িত্ববোধ আর নার্ভাসনেস। মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তটা নিখুঁত হওয়া উচিত, অথচ নিজের অস্থির হৃদস্পন্দনই যেন তাকে বারবার বিচলিত করে দিচ্ছে। আয়নায় সোরায়ার হাসিমুখ দেখে সে গভীর একটা শ্বাস নিল, নিজেকে শান্ত করার বৃথা চেষ্টায়। মাহির সোরায়াকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে তার উন্মুক্ত ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে দিলো। সোরায়ার মেয়ে দেহ কেঁপে উঠলো সঙ্গে সঙ্গে-

"সস.. স্যার..!"

-"মাহির...তোমার মাহির..!"

মাহিরের এমন উৎকণ্ঠিত আওয়াজ সোরায়ার মনে তুফান সৃষ্টি করলো। সোরায়া আয়নায় মাহির কে ধীরে ধীরে তার কাছে আত্মসমর্পণ করতে দেখছে। সোরায়া ভাঙ্গা বচনে আওড়ালো-

"মা..মাহির..!"

মাহিরের হৃদয়ের সকল শিকল হয়তো সেই মূহূর্তে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। মাহির আরো দৃঢ়তার সাথে সোরায়া কে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে তার কাঁধে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে ভারী নিঃশ্বাস ত্যাগ করে বলল-

"জান, আমার ভীষণ অশান্ত লাগছে। তোমাকে একটু ছুঁই? প্লিজ..!"

এমন আবদারে জবাবে কি বলতে হয় তা সোরায়ার জানা নেই। এমন একটা সময় তার সকল জ্ঞান তার সঙ্গ ছাড়লো। সবকিছু এতো নতুন অনুভূতি যা মানিয়ে নিতে তার হিমশিম খেতে হচ্ছে। সোরায়া নিজের চোখে পাতা বন্ধ রেখে মাহিরের উদ্দেশ্যে কাপা কাঁপা গলায় বলল-

"নিজেকে সামলান প্লিজ..!"

মাহির সোরায়াকে সঙ্গে সঙ্গে নিজের দিকে ঘুরিয়ে তার কণ্ঠদেশে অসহায়ের মতো ঠাঁই নিল-

"আমি নিজেকে অনেক সামলে রাখছি, জান... বিশ্বাস করো, যদি তা না রাখতাম, তাহলে আমরা এখনো এভাবে দাঁড়িয়ে কথা বলতাম না।"

সোরায়া মাহিরের আওয়াজে এতটা অপারোকতা কখনো অনুভব করে নি। সে সামান্য সরে এসে মাফিরের চোখের দিকে তাকালো। ছেলেটার অশান্ত মনে সাক্ষ্য দিচ্ছে চোখ দুটো বরাবরের মতো। তবে আজ সে নিজেও সেই চোখ জোড়ার স্নিগ্ধতায় বশীভূত হচ্ছে। মনের সকল দ্বিধা দ্বন্দ্বে দেওয়াল গুলো ঠাস ঠাস শব্দ করে ভেঙে পড়ছে বুকের মধ্যিখানে। মাহির সোরায়ার সম্মতির অপেক্ষায় অপেক্ষমান। বলার মতো কিছু খুঁজে পাচ্ছে না সে যার বহিঃপ্রকাশে সোরায়ার নিজে থেকে আত্মসমর্পণ করবে। মাহির কোমল স্পর্শে সোরায়ার উদর নিজের আয়ত্তে নিল। সোরায়া অজান্তেই নিজের চোখ জোড়া বন্ধ করে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরলো। মাহির হঠাৎ সোরায়ার ওষ্ঠযুগলে অতর্কিত হামলা করলো। সোরায়ার শরীর নিজের সাথে বেইমানি করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে হয়তো। মাহিরের আচমকা আচরণে সোরায়া হতভম্ব হয়ে গেল। মুহূর্তের জন্য যেন সময় থমকে দাঁড়াল। তার বুকের ভেতর অস্থিরতা আর বিস্ময় একসাথে ঢেউ তুলল। শাড়ির আঁচল টা কখন নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো তা কারোরই মনোযোগ ধারণ করতে পারলো না। সোরায়ার ছটফটানি বাড়লো। মাহির নিজের থেকে কিছু টা দূরে সরে এলো তার থেকে। দুজনের শ্বাস প্রশ্বাস অসম্ভব পর্যায়ে ভারী। সোরায়া নিজেকে মাহিরের সামনে এতোটা অগোছালো দেখে লজ্জায় কেঁদে ফেলল। মাহির নিজের চোখের সামনে সোরায়া কে এতোটা ভেঙে পড়তে দেখে তাকে সঙ্গে সঙ্গে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে নিল। সোরায়ার কান্নার গতি বাড়লে মাহির চিন্তিত গলায় বারবার তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল-

"সুস, কিচ্ছু হয় নি। চুপ করো জান। আচ্ছা আমি কিছু করবো না। খোদার কসম। প্লিজ আমাকে ভয় পেও না, তোমার অস্বস্তি হয় এমন কোনো কাজ আমি করব না। আমি কথা দিচ্ছি, জান প্লিজ। চুপ করো।"

-"আই.. লাভ ইউ..!"

সোরায়ার কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে একথা টুকুই মাহিরের অস্থিরতা শান্ত করলো। মাহির বুঝলো এখন তার প্রিয়সী তার কাছে কেবল ভালোবাসার নিরাপত্তা টুকু চাইছে। মাহির সোরায়ার মাথায় ছোট্ট করে স্নেহের পরশ এঁকে দিয়ে আশ্বাস ভরা গলায় বলল-

"আই লাভ ইউ মোর দ্যান মাই সেল্ফ। আই লাভ ইউ মোর দ্যান এনিথিং জান।"

সোরায়া নিজের পায়ে পাতায় ভর করে নিজের উচ্চতা বৃদ্ধি করে মাহিরের গালে ছোট্ট একটা চুমু দিল। মাহির নিজেকে শান্ত রাখল। সোরায়া অশ্রু সিক্ত চোখে গাল ফুলিয়ে মাহির কে জিজ্ঞেস করলো-

"আমার কি স্বামীর আদর পাওয়া হবে না?"

মাহিরের হৃদয়ে সদ্য তৈরি করা ধৈর্যের প্রাচীর পুনরায় ভাঙা পড়লো। মাহির এবার বিরক্তি নিয়ে সোরায়ার চোখে চোখ রেখে বলল-

"যে পথে পা বাড়াতে বলছো, সেই পথে পা বাড়ালে মাঝপথে থেকে ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই সোরা। ভেবে বলো..!"

সোরায়া মাথা নিচু করে করে আনমনে বিড়বিড় করলো-

"এক জিনিস কত বার ভাববো। ভয় দেখালে তো ভয় করবেই।"

মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে সঙ্গে সঙ্গে সোরায়া কে কোলে তুলে নিল। হঠাৎ নিজেকে শূন্যে আবিষ্কার করে সোরায়া মাহিরের গলা জড়িয়ে ধরলো। সোরায়া তখনই খে আর করলো তার আঁচল ফ্লোরে লুটুপুটি খাচ্ছে। যা এতোক্ষণ যাবত সে খেয়ালই করে নি। লজ্জায় তার মুখটা টমেটোর রূপ ধারণ করলো। মাহির সোরায়া কে কোলে নিয়ে বিছানার দিকে অগ্রসর হলে সোরায়া মিনমিনিয়ে বলল-

"আঁচল টা ঠিক করতে দিন না। কি করুন হাল হচ্ছে আঁচল টার ফ্লোরে ঘেঁষতে ঘেঁষতে।"

মাহির সোরায়াকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে তার ঠোঁটে ছোট্ট করে একবার চুমু খেয়ে বলল-

"আঁচলে প্রতি এতো মায়া দেখিয়ে লাভ নেই। এবার পুরো শাড়ির করুন অবস্থা হবে। সেটা দেখার জন্য প্রস্তুতি নাও।"

সোরায়ার গলা শুকিয়ে এলো। মেয়েটা নিজের শাড়ির আঁচল টা কোনো মতো টেনে ঠিক ঠাকই করে নিল তার বুকের উপর। গাল বেয়ে পড়া অশ্রু কণা হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে শুকনো ঢোক গিললো সে। মাহির সোরায়ার কাছ থেকে উঠে একটানে নিজের পাঞ্জাবি খুলে ফেলল। কাঙ্ক্ষিত পুরুষ কে এমন এক দৃশ্যে দেখা এক অদ্ভুত সুন্দরতম মূহুর্ত। মাহির ঘরের লাইট নিভিয়ে দিয়ে কেবল লাল ডিম লাইট অন রাখলো‌। সোরায়ার হৃদস্পন্দন থেমে গেলো এক মূহুর্তের জন্য। মাহির পুনরায় তাঁর কাছে ঝুঁকে এলে সোরায়া তৎক্ষণাৎ চোখ বন্ধ করে নিল। প্রনয়সমরাঙ্গনে সোরায়া ভয়ার্ত কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে-

"আআ..আমার ঘুম পাচ্ছে..!"

এই কথার প্রতি উত্তরে মাহির পুনরায় সোরায়ার ওষ্ঠযুগল নিজের দখলে নিল। তার এলোমেলো আঁচল সরাতে সরাতে কয়েক সেকেন্ডের বিরতির মাঝে কানে কানে ফিসফিস করলো-

"আজ রাতে ঘুমের কোনো অধিকার নেই তোমার উপর। আজকের মতো ঘুমের আশা ছেড়ে দাও। স্বামীর আদরে ঘুমের কোনো স্থান নেই। আর রাতের বেলার ঘুম এখন থেকে মাথায়ও আনবে না। এতে তোমারই সুবিধা হবে।"

সোরায়া আর কিছু বলার সুযোগ পেল না। মাহিরের মনে কোনো রকমের দ্বিধা দেখতে পাচ্ছে না এখন সোরায়া। তার মাথা আসছে না‌, নিজের থেকে আবদার করে এবার কোন মুখে তা অস্বীকার করবে সে। তবুও শারীরিক প্রতিক্রিয়ায় নিজের শেষ লাজ টুকু ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করলো সে। তবে এই উন্মাদ প্রেমিকের কাছে আজ কার এই স্ত্রী কায়া অসম্ভব রকমের দূর্বল। মাহির সোরায়ার কম্পিত চোখের পাতায় নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে তার বিপরীতের কোমল দেহ নিজের বক্ষ পৃষ্ঠে মিশিয়ে নিয়ে অধৈর্য স্বরে বলল-

"হাত সরাও জান।"

আদুরে কণ্ঠের কেবল এই তিনটি শব্দে সোরায়ার প্রতিরোধের সমাপ্তি ঘটলো। সকল দ্বিধারা গলে গেল। এতদিন বুকের গভীরে যত না-বলা অনুভূতি জমে ছিল, সেগুলো যেন একে একে মুক্তি খুঁজে পেল। সে ধীরে চোখ বুজল। চারপাশের পৃথিবী যেন দূরে সরে গেল, রয়ে গেল শুধু দুটো হৃদয়ের নীরব সংলাপ। জানালার বাইরে রাত আরও গভীর হচ্ছিল। চাঁদের ম্লান আলো ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এক স্বপ্নিল আবহ তৈরি করেছিল। সেই আলো-ছায়ার মাঝে সোরায়ার মুখে ফুটে উঠল প্রশান্তির এক অপার্থিব আভা। মুহূর্তটা উচ্ছ্বাসের নয়, বরং গভীর বিশ্বাসের। এমন এক অনুভূতি, যেখানে শব্দের প্রয়োজন হয় না; চোখের ভাষাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে সত্য স্বীকারোক্তি।

সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। দুজনের হৃদস্পন্দন, দুজনের নীরবতা আর দুজনের অদৃশ্য বন্ধন মিলে রচনা করছিল এক অনন্য অধ্যায়—যার সৌন্দর্য ছিল আবেগে, শ্রদ্ধায় এবং নিঃশব্দ। অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশে ভোরের আলো ফুটে উঠার আগে মাহির সোরায়ার ছোট্ট ক্লান্ত দেহের বিপরীতে কেবল শান্তি ও তৃপ্তি তে নিমজ্জিত।

চলবে..

কমেন্ট দেখবো শুধু। উল্টো পাল্টা কিছু বুঝে মাথা খারাপ করো না কেমন।😮‍💨🙏 আর মাত্র ৩ পর্ব আসবে হয়তো। Love you pakhis ❤️ 🥰

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন