#শত_ ডানার_ প্রজাপতি
#urme prema (sajiana monir )
পার্ট : ৩৩
ঘুম ভাঙে বেলা দশটায় । বাহিরে মিষ্টি রোদ । ফ্রেশ হয়ে হয়ে নাস্তা সেরে বারান্দায় বসি । শীতের সকালের রোদটা খুব বিশেষ হয় । কুয়াশার পর এই রোদের উষ্ণত্ব স্পর্শ ছুঁয়ে দেয়।মিষ্টি রোদে চোখের পাতায় কেমন যেন নিদ্রা নিদ্রা ভাব ভর করেছে। আমি কোনো রকম চোখ টানা দিয়ে আছি । ইদানীং রাত জেগে জেগে ঘুমের টাইমটেবল সব উলট পালট হয়ে গেছে । এখন রাতজেগে কথা বলাটা রুটিন হয়ে গেছে । কেমন যেন অন্য অনুভূতি কাজ করছে । কিছুটা লজ্জা আর অনেকটা ভালোলাগা । যেন আমি টিনেজার হয়ে গিয়েছি । টিনেজারদের মত নতুন নতুন প্রেমে পড়ার অনুভূতি ,কৌতূহল ,আবেগ সবকিছু মিলিয়ে দিন বেশ ভালো কাটছিলো । আমি আবার অগ্নির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ছি । নয়া নয়া প্রেমের মিষ্টি অনুভূতি বেশ সুন্দর । কেউ ঠিক বলেছে দূরত্ব সম্পর্কের গুরুত্ব বুঝায় । নতুন করে সব শুরু করতে আমাদের মাঝের এই দূরত্বটা দরকার ছিলো । অগ্নি যেন দিন দিন বয়স কমে যাচ্ছে ।উনার হুটহাট পাগলামো গুলো আমাকে আশ্চর্যের শেষ শিখরে পৌছিয়ে দেয় । হুটহাট গিফট পাঠায় । রাত দিন নেই হুট করে বাড়ির সামনে চলে আসে । এই তো কাল রাতেরই কথা অগ্নি হুট করে রাত তিনটার দিকে বাড়ির সামনে এসে হাজির । এতো রাতে কেন এসেছে ? তা জিগ্যেস করতেই উত্তর দেয় । তার নাকি বাড়িতে মন বসছিলোনা । তার নাকি এই মুহূর্তে আমাকে খুব করে দেখতে ইচ্ছে করছিলো । দিন দিন একদম পাগল হয়ে যাচ্ছে । পাগল না হলেই কি এই কনকনে শীতে বাড়ীর সামনে এসে এভাবে দাড়িয়ে থাকে।কত করে বললাম ভিতরে আসতে । কিন্তু না সে আমার কোনো কথাই কানে নিলেন না । উনি নাকি প্রতিজ্ঞা করেছেন আমার মারাত্মক প্রেমিক হবে । বাড়িতে আসলে তো তা আর প্রেমের সম্পর্ক থাকবে না স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক হবে । অগ্নি এই যুগের প্রেমিক হতে চায় না । সে নব্বুই শতকের প্রেমিক হতে চায় । যে প্রেমিক সারাক্ষণ তার প্রেমিকা কে দেখার জন্য ছটফট করবে ।শর্তহীন ভাবে ভালোবাসবে ।
আমি উনার উত্তরে শুধু হেসেছি । বিয়ের পরের প্রেমটা সত্যি খুব সুন্দর হয় । এখানে নির্দ্বিধায় চুটিয়ে প্রেম করা যায় । না থাকে কোনো হারানোর ভয় না থাকে কোনো অনিশ্চয়তা ।
অগ্নির এসব পাগলামো দেখে ভাবি । সত্যি কি আমি উনার এমন পাগলামো ভালোবাসার যোগ্য? আমি কি এতোটাই বিশেষ কিছু ?
অগ্নির এই পাগলামো গুলো তে আমার মন গলতে শুরু করেছে ।
হ্ঠাৎ ই কারো কথার আওয়াজে আমার ভাবনা জগতে কারো টোকা পরে । পিছনে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি উৎস ভাইয়া আর নিশিত একগাল হেসে দাড়িয়ে আছে । আমি মুচকি হেসে তাদের কাছে এগিয়ে যাই । দুজনকে খুব সুন্দর মানিয়েছে । নিউলি মেরিড কাপল । নিশিত লাল শাড়ি পড়েছে নাকে নোস পিন । গাঁয়ে হাল্কা গহনা । এইতো গত শুক্রবার বিয়ে হয়েছে । বড় করে আয়োজন করেনি । উৎস ভাইয়া কড়াকড়ি ভাবে নিষেধ করেছেন । তাছাড়া নিশিত ও এসব লোক দেখানো আয়োজন পছন্দ করে না। সে বরাবারই সাদাসিধা জিনিস পছন্দ । তারপর ও মামা বলেছিলেন চিটাগাং এ বিয়েতে যেতে । কিন্তু মা মানা করেছে । এইতো কিছুদিন আগেই চিটাগাং থেকে এসেছে সবাই।এখন আবার যাওয়াটা ঝামেলা । প্লানিং এর ও একটা ব্যাপার আছে । আমি মুচকি হেসে জিগ্যেস করি ,
- "কেমন আছেন আপনারা ?"
উৎস ভাইয়া মুচকি হেসে উত্তর দেয় ,
- "আলহামদুলিল্লাহ আমরা ভালো আছি । তুমি কেমন আছো ? "
- "জি ভাইয়া আলহামদুলিল্লাহ।আমি কনফিউজড ! "
উৎস ভাইয়া মুচকি হেসে বললেন,
- "তা কেন শুনি ?"
- "এই যে কি বলে ডাকবো আপনাদের ?এখন তো সম্পর্ক দু দিক থেকে । "
- "সম্পর্ক দু দিক থেকে তো কি হয়েছে ? পুরোনো সম্পর্ক কি পাল্টিয়েছে? আগে যা বলে ডাকতে তা বলেই ডেকো । শুধু জটিল বানানোর কি দরকার । "
- "হুম তা ঠিক নতুন করে সম্পর্কের মারপ্যাঁচে পরে ডাকতে গেলে তা অনেক জটিল হবে।
তা বলেন কি করে আসা ? নতুন নতুন বিয়ে হয়েছে কোথায় আমার ননদটাকে নিয়ে বেড়াবেন তা নয় আপনারা এখনো ঢাকাতেই আছেন?
নট ফেয়ার ভাইয়া।"
- "হুম যাবো তো । আগে রিসেপশনটা শেষ হোক তার পর । আর এই রিসেপশনের ইনভাইটেশন দিতেই আসা ।
ফুপির কাছ থেকে শুনলাম তুমি এ বাড়িতেই আছো । তাই ভাবলাম দুজন একসাথে এসেই তোমাকে ইনভার্ট করি।আফটার অল আমাদের স্পেশাল গেস্ট । "
আমি মুচকি হাসি । ভাইয়া আবার বললেন ,
- "আগামী শনিবার রিসেপশন ।অগ্নি আন্টি সবাই আসবে । তোমাকেও আসতেই হবে।"
- "জি ভাইয়া অবশ্যই আসবো । "
- "আমি যাই ফুফা ফুপির সাথে দেখা করে আসি । তোমারা কথা বলো । "
উৎস ভাইয়া চলে যায় । আমি নিশিতের থুতনি তে হাত রেখে বলি,
- "খুব মিষ্টি লাগছে ।"
নিশিত লাজুক হেসে বললো ,
- "ধন্যবাদ ভাবী "
- "দোয়া করি সবসময় এমন হাসি খুশি থাকো । "
দুজন আড্ডা দিচ্ছি । হ্ঠাৎ কথার মাঝে নিশিত আমার হাত জড়িয়ে ধরে বললো ,
- "ভাবী আমি তোমার কাছে সবসময় কৃতজ্ঞ "
আমি প্রশ্নবোধক চোখে তাকিয়ে জিগ্যেস করি ,
- "তা কেন ? "
- "এই যে তোমার জন্যই আজ আমি উনাকে পেয়েছি । ভাবি আমি জানি উনার প্রথম ভালোবাসা তুমি । হয়তো এখনো তোমাকে ভালোবাসে । কিন্তু আমার তা নিয়ে কোনো মন খারাপ নেই ।আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া আমি উনার স্ত্রী । উনার জীবনের অংশ হয়েছি । হয়তো কোনো দিন উনার ভালোবাসার মানুষ হতে পারবো না । কিন্তু এতটুকুতেই খুশি উনার জীবনের অংশ আমি।যদি তুমি উনাকে না ফিরিয়ে দিতে তাহলে হয়তো আমি এমন জীবনসঙ্গী পেতাম না। তাই আমি তোমার কাছে সর্বদা কৃতজ্ঞ । উনার জীবনে সর্বদা মুখ্য নায়িকা তুমিই থাকবে আমি না হয় সাইড নায়কা হয়েই রয়ে গেলাম । "
- "নিশিত তুমি যথেষ্ট বুদ্ধিমতী আর খুবই ভালো মনের একটা মেয়ে।আমি জানি তুমি ঠিক উৎস ভাইয়ার মন জয় করে নিবে।কারো প্রথম প্রেম হওয়াটা খুব সহজ । কিন্তু শেষ ভালোবাসা হওয়া অনেক জটিল । আর শেষ ভালোবাসাটাই জীবনে মুখ্য চরিত্র হয় ।আর উৎস ভাইয়ার জীবনে সেই মুখ্য চরিত্রটাই তুমি । ভাইয়ার জীবনের মুখ্য নাইকা । আমি জানি তুমি ভাইয়ার জীবনে সব অতীত ভুলিয়ে নতুন করে স্মৃতি গড়ে তুলবে । "
- "দোয়া করো ভাবী "
- "অবশ্যই "
___________________________
আজ অনেক দিন পর ভার্সিটি তে যাচ্ছি ।এতো দিন ক্লাস বান্ধ করেছি ইচ্ছে করেই । অগ্নিহীন ভার্সিটি তে এসে কি করবো । তার উপর নিহার কুটনামি দেখার বিন্দু মাত্র ইচ্ছে নেই । আমি অগ্নির স্ত্রী তা জানার পর না জানি নিহার কি অবস্থা । নিশ্চিত নতুন কোনো ঝামেলা পাকাবে ।
আজ একসাপ্তাহের অগ্নির পানিশমেন্ট শেষ । অগ্নি ভার্সিটি তে আসছে । আমিও শেফার সাথে ভার্সিটি তে যাচ্ছি।
মন একদম ফুরফুরে । আজ কতদিন পর ভার্সিটি তে এসেছি । অগ্নির সাথে দেখা হবে । কিন্তু জনাব আছে কই ? আশেপাশে কোথাও তো নেই ! ফোনটাও রিসিভ করছে না । অদ্ভুত লোক !
তানবীর ভাইয়াকে জিগ্যেস করতেই জানতে পারি । অগ্নি কালচারাল ক্লাবে আছে । এই সময় সেখানে কি করছে ?সামনে তো কোনো ফাংশন নেই । তাহলে এসময় সেখানে থাকার কারণ কি ? এসব ভাবতে ভাবতেই ক্লাবের সামনে যাই ।জনশূন্য নীরব পরিবেশ ।ক্লাবের অফিস রুমের দরজাটা ভিড়ানো । আমি এক কদম এক কদম করে সামনের দিকে এগিয়ে যাই । দরজা খুলতেই চোখজোড়া সানা ভরা হয়ে যায়। শরীরে প্রত্যেকটা শিরা উপশিরায় খুব দ্রুত গতিতে রক্ত দৌড়াচ্ছে । মাথায় রক্ত উঠে গেছে । অগ্নিকে নিহা জড়িয়ে ধরে আছে । অগ্নি ছাড়ানোর চেষ্টা করছে । কিন্তু নিহা জড়িয়ে ধরে কান্না করছে।আমি রেগে সামনের দিকে এগিয়ে যাই । সর্বশক্তি নিয়ে নিহাকে ধাক্কা দিয়ে অগ্নি থেকে দুরে সরাই । নিহা নিচে পরে যায় । অগ্নি ভয়ে আমতা আমতা করে বললেন,
- "হুর বিশ্বাস করো আমি কিছু জানিনা। আমিতো ক্লাবে একটা কাজে এসেছি নিহা এখানে এসে এসব করছে। বিশ্বাস করো ,,,
অগ্নি কে আর কিছু বলতে দেই না।রাগী চোখ দেখিয়ে থামিয়ে দেই । নিহার কাছে যেয়ে তাকে উঠিয়ে । হাত মোচড় দিয়ে ধরে দুগালে দুইটা চড় দেই । গাল চেপে ধরে চিৎকার করে বলি,
- "কি ভেবেছিস এতোদিন ছাড় দিয়েছি তাই বলে আমি দুর্বল ? কিছু করতে পারবো না? আমার স্বামীর দিকে নজর দিলে চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলবো শাঁকচুন্নি বদমাইশ মেয়ে ।এই থাপ্পড়ের কথা গুলো যদি মনে থাকে ভবিষ্যৎ এ আর কোন দিন অগ্নির দিকে চোখ দিবিনা । আর যদি দিস কাঁটা চামচ দিয়ে চোখ তুলে ফেলবো বিরিং খেলবো । "
নিহাকে ওয়ার্নিং দিয়ে অগ্নির হাত ধরে টেনে নিয়ে আসি । অগ্নি আমার দিকে হা হয়ে তাকিয়ে আছে । আমি অগ্নিকে নিয়ে সোজা পার্কিং এরিয়াতে চলে আসি । গাড়ি তে বসে বড় বড় নিশ্বাস ফেলছি । রাগে তখনো আমার শরীরে কাঁপছে । ইচ্ছে করছে নিহাকে কুঁচি কুঁচি করে কেটে লবণ লাগিয়ে দেই । অগ্নি পানির বোতল টা খুলে আমার দিকে এগিয়ে দেয় । আমি ঢকঢক করে পানিটা শেষ করি । অগ্নি তখনো অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে । আমি রাগী চোখে তাকাতেই । অগ্নি ভীতু স্বরে বললেন,
- "বিশ্বাস করো আমি কিছু জানি না । প্রমিজ। তোমার কছম । "
- "আমি জানি ! "
- "তাহলে আমার উপর কেন রেগে আছো । "
- "আপনাকে ছুঁবে কেন ঔ শাঁকচুন্নি ? এই যে এখানে এখানে স্পর্শ করেছে তাই না ?
বলেই উড়না দিয়ে অগ্নির শরীর মুছে দিতে লাগলাম । অগ্নি আমার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে । আমি রেগে রেগে গর্জন করে বললাম ,
- "কেন জড়িয়ে ধরলো? বলুন কেন? এগুলো তো আমার জায়গা তাই না ? ও কেন এই যে এখানে মাথা রাখলো ? "
এগুলো বলে রাগে জিদে কান্না করে দিলাম । কিছু কিছু মানুষ আছে রেগে গেলেও কান্না করে।আমিও তাদের মধ্যে একজন । প্রচন্ড রাগে প্রচন্ড রকম কান্না করি। অগ্নি সাথে সাথে আমাকে তার বুকে জড়িয়ে ধরে । আমি ছুটে আসতে চাইলে আরো শক্ত করে জরিয়ে ধরে। আমি অগ্নির বুকের কাছে শার্ট খামচে ধরি । সামনে দুটো বোতাম ছিঁড়ে যায় । বুকে মুখ লুকিয়ে কান্না করতে করতে বলি,
- "আমার সহ্য হয় না আপনার দিকে কোনো মেয়ে তাকালে । রাগ হয় । খুবই রাগ হয় । ইচ্ছে করে তাকে খুন করে ফেলি । ভাল্লাগেনা । কেন এতো সাজগোজ করে হিরো সেজে ঘুরতে হবে ? কেন মেয়েদের দেখাতে হবে ? "
- "আচ্ছা ঠিক আছে আর হিরো সেজে ঘুরবো না।আমি শুধু আমার সুন্দরীর ।
আমার সুন্দরী যেমনটা বলবে তেমন ভাবেই হবে । এবার কান্না বন্ধ করো । "
- "না করবো না ,আমি কান্না করবো! অনেক কান্না করবো । আপনার কি ? "
- "আমার কষ্ট হয়তো "
- "হোক কষ্ট বেশি করে হোক ! "
অগ্নি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে । নিজের সর্বস্র চেষ্টা করছে কান্না থামানোর ।
চলবে...❤️
প্লিজ সবাই সবার মতামত জানাবেন । ভুল ত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখবেন 😊😊😊।