ফন্ট সাইজ:
থিম:
রাজনীতির রক্তচুক্তি

১০ম পর্ব

লেখক: নীলপ্রজাপতি

#রাজনীতির_রক্তচুক্তি

#পর্ব_১০

#কলমে_নীলপ্রজাপতি

রাহি ধীরে বলল,

“তোদের মতো ছেলেরা কখনো বউকে ভালোবাসতে শেখেনি। শুধু নিজের ইচ্ছা মে'টাতে জানিস।”

প্রয়াণ সঙ্গে সঙ্গে তাকাল। চোখে বিরক্তি আর কাঁটার মতো দৃষ্টি।

“কবে আসছিলাম রে লাস্ট তোর কাছে?”

তার গলা তীক্ষ্ণ,

“আসি না আমি তোর কাছে?”

রাহি হেসে ফেলল। একটা কষ্টে ভরা তাচ্ছিল্যের হাসি।

“না আসো না। কারণ বাইরে অন্য মেয়ে আছে সব কিছুর জন্য।”

একটু থামল। তার চোখ সরাসরি প্রয়াণের দিকে তাকিয়ে বলল,

“একটা কাজ করো সংসারটাও না হয় অন্য মেয়েকে এনে করো।”

কথাগুলো এক এক করে ছুড়ে দিল সে,

“তোমার মতো ছেলেকে আমি বলেই সহ্য করেছি,

অন্য কেউ হলে এতদিনে কবেই চলে যেত।”

প্রয়াণের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।

“তাহলে চলে যা।”

কথাটা খুব ঠান্ডা।

রাহি এক সেকেন্ড চুপ রইল। তারপর ধীরে বলল,

“চলে যাওয়াটা এত সহজ হলে আজ এই অবস্থায় দাঁড়াতে হতো না আমায়।”

প্রয়াণ হেসে উঠল। একটা তাচ্ছিল্যের, ফাঁকা হাসি।

“নিজের ইচ্ছায় এসেছিলি এখন আবার নাটক করছিস?”

রাহির চোখে এবার জল চলে এলো।

“হ্যাঁ নিজের ইচ্ছায় এসেছিলাম। আর সেটাই জীবনের

সবচেয়ে বড় ভুল।”

তার ঠোঁট কাঁপছে।

“বাবা-মাকে কাঁদিয়েছি, তাদের কথা শুনিনি।”

চোখ বেয়ে জল নেমে আসছে থামাহীন।

“হয়তো এই জন্যই উপরওয়ালা শাস্তি দিচ্ছেন আমায়।”

রাহি কাঁদতে লাগল। দম বন্ধ হয়ে আসা কান্না। ঘরের

ভেতর সেই শব্দটা ছড়িয়ে পড়ল।

প্রয়াণ মুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে তারপর বিরক্ত হয়ে বলল,

“ভালোই জ্বালা হয়েছে।”

কন্ঠ তাচ্ছিল্যে ভরা।

“বাড়িতে থাকলেও সমস্যা, না থাকলেও সমস্যা।”

রাহির কান্নার শব্দটা এখনো ঘরের ভেতর ঘুরছে।

হঠাৎই আরও একটা শব্দ হলো।

ঠাস!

প্রয়াণ নিজের ফোনটা মেঝেতে আছাড় মারল।

শব্দটা এত জোরে হলো যে রাহি অনিচ্ছা সত্ত্বেও কেঁপে উঠল।

এক সেকেন্ডের জন্য সবকিছু থেমে গেল।

প্রয়াণ বিছানায় বসে পড়ল। দু’হাতে নিজের চুল মুঠো

করে ধরল। তার শ্বাস ভারী। চোখ বন্ধ। রাগে,

বিরক্তিতে, আর অজানা এক চাপা যন্ত্রণায় তার শরীর কাঁপছে।

রাহির গলাটা কাঁপছে। ধীরে বলল,

“জিনিসটা ভেঙে কী লাভ হলো?”

প্রয়াণ কোনো উত্তর দিল না। এক ঝটকায় উঠে

দাঁড়াল। তারপর সোজা দরজার দিকে হাঁটল।

দরজাটা খুলে একবারও পেছনে না তাকিয়ে ঘর থেকে

বেরিয়ে গেল।

রাহি একবার ডাকল,

“প্রয়াণ!”

কণ্ঠে ভাঙা আবেদন।

কিন্তু দরজার ওপাশে পায়ের শব্দটা থামল না।

সে শুনলই না অথবা শুনেও থামল না।

ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পর ছোট ছোট পায়ের শব্দ। রাজন্যা দরজার

ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকল।

মেঝেতে ভাঙা ফোন, মায়ের ভেজা চোখ সবকিছু দেখে

সে থেমে গেল।

তার ছোট্ট মুখটা কুঁচকে উঠল,

“মাম্মা?”

ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। রাহির সামনে এসে দাঁড়িয়ে চিন্তিত গলায় বলল,

“মাম্মা… কান্না কেন?”

রাহির বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।

সে কিছু বলতে পারল না শুধু নিচু হয়ে মেয়েকে শক্ত

করে জড়িয়ে ধরল।

রাজন্যা অবাক হয়ে গেল। তার ছোট্ট হাত দিয়ে মায়ের গাল ছুঁয়ে দিলো।

“মাম্মা… নো কান্না।”

তার নিজের মতো করে সান্ত্বনা দিলো।

তারপর চারদিকে তাকাল। চোখ দুটো কিছু খুঁজছে।

“পাপা…?”

একটু থামল,

“পাপা কোথায়?”

রাহির চোখ থেকে আবার জল গড়িয়ে পড়ল।

সে চোখ বন্ধ করে মেয়েকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার কাছে কোনো উত্তর নেই।

রাজন্যা কিছুই বুঝল না। শুধু অনুভব করল

মা কাঁদছে।

সে মায়ের গলায় মুখ গুঁজে দিল,

“মাম্মা… পাপা আসবে?”

গলায় শিশুসুলভ বিশ্বাস।

রাহির ভেতরে একটা চিন্তা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়লো।

আজ মেয়েটা এত খুশি ছিল তার বাবাকে পেয়ে। আর

রাহির কথাগুলো বলার জন্যই প্রয়াণ চলে গেল।

রাহি,

একদিন এই মেয়েটা নিজের পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে এই প্রয়াণ খানকে বেছে নিয়েছিল। বাবা-মায়ের কথা শোনেনি। বাবা, মা, ভাই পরিবারের সবাইকে কাঁদিয়ে এক কথায় প্রয়াণের হাত ধরে বেরিয়ে এসেছিলো। কারন সে বিশ্বাস করেছিল মানুষটা তাকে ভালোবাসে। প্রয়াণ আছে মানেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

কিন্তু বিয়ের পর সে বুঝল ভালোবাসা আর বাস্তবতা

এক জিনিস না।

এই বাড়িতে আসার পর তার সেই ভুলটা প্রতিদিন নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো হয়েছে।

কথা শুনতে হয়েছে বারবার।

আমিনা খান প্রথম দিন থেকেই তাকে মেনে নিতে পারেননি।

“ছোট বয়সে বিয়ে করে এসেছে।”

কিছুই শেখেনি।”

“এই বাড়ির নিয়ম জানে না।”

প্রয়াণ তো বাড়িতে থাকতই না। তাই তাকে কিছু শুনতে হতো না। শুনতো তো রাহি কে প্রতিদিন।

কত কথা সামনাসামনি শুনেছে, কিছু আবার আড়ালে।

তবুও কিছু বলতে পারতো না। ভেবেছিলো সময়ের সাথে সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে কিন্তু না কিছুই ঠিক হয়নি।

তবে এই বাড়িতে সবাই একরকম ছিল না।

আফসানা খান। এই মানুষটাই ছিল রাহির একমাত্র ভরসা। তার ছোট ছোট যত্নগুলোই রাহিকে টিকিয়ে রেখেছিল।

কখনো কখনো আফসানার কোলে মাথা রেখে

চুপচাপ কেঁদেছে সে। সেই মানুষটা ছাড়া এই বাড়িতে

রাহির নিজের বলতে কেউ ছিল না।

আর প্রয়াণ নামক মানুষটাতো সম্পূর্ণ অচেনা তার কাছে। বিয়ের আগে যে মানুষটা তার একটা চোখের জলও সহ্য করতে পারত না, আজ সেই মানুষটাই তার কান্নার কারণ।

তার কথা, তার আচরণ সবকিছু বদলে গেছে।

কখন যে ভালোবাসার জায়গায় অভ্যাস এসে গেছে,

রাহি নিজেও বুঝতে পারেনি।

সে এখনো চেষ্টা করে সব ঠিক করার। কারন ফিরে যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।

কারন একটা ছোট্ট হাত তাকে আঁকড়ে ধরে আছে।

সে এখন শুধু স্ত্রী না, সে একজন মা।

আর তার বাঁচাটা এখন নিজের থেকেও বেশি নিজের মেয়ের জন্য।

************

আবরাজ খান খুব ভালো করেই জানে, সমাজের সামনে নিজের ইমেজ কীভাবে ধরে রাখতে হয়।

এটা কোনো কঠিন ব্যাপার না। প্রতিটা রাজনীতিবিদ এটা জানে কিন্তু সবাই পারে না।

কেউ সামলে নেয় নিখুঁতভাবে আর কেউ ছোট একটা ভুলেই সব হারিয়ে ফেলে।

আবরাজ জানে রাজনীতিতে জেতার জন্য মানুষের বিশ্বাস ও আবেগ কে ভালো করে কাজে লাগাতে হয়। আবরাজ খুব ঠাণ্ডা মাথায় হিসাবে করে এগোয়।

তার দল - National Development Party (NDP)

ইস্তানবুলের বেশ কয়েকটা এলাকায় ইতিমধ্যেই তারা বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছে।

প্রায় ২-৩টা জোনে NDP -এর নিজের কাউন্সিল

মেম্বার রয়েছে। ওই এলাকাগুলোতে সংগঠন শক্ত।

লোকাল সাপোর্ট পরিষ্কার। সোজা কথায় ওই

ভোটগুলো প্রায় নিশ্চিত। তবে পুরো শহরে তো শুধু ওই

২-৩টা জায়গা না। বাকি এলাকাগুলোতে অন্য

দলগুলোর দখল।

কোথাও পুরনো রাজনৈতিক পরিবার, কোথাও স্থানীয়

প্রভাবশালী নেতা। যারা সহজে জায়গা ছাড়বে না।

তারপর আসে সরফরাজ। লোকটা শুধু একজন সমর্থক না, সে এই রাজনীতিতে মূল খেলোয়াড়।

লোকাল কানেকশন, ভিতরের খবর আর কিছু অঘোষিত প্রভাব সবই আছে তার হাতে।

কিন্তু শুধু সারফরাজের ভরসায় থাকলে আবরাজের চলবে না।

-------

মে মাসের শুরুর দিক। আবহাওয়া না ঠান্ডা না গরম। একটা অদ্ভুত আরামদায়ক অনুভূতি ছড়িয়ে

আছে চারদিকে। বসফরাসের দিক থেকে আসা হাওয়া শহরটাকে আরও শান্ত করে রাখছে।

শহরের এক কোণে বাইরে থেকে দেখতে একটা পুরনো গুদামঘর। ধুলোমাখা দেয়াল, জং ধরা গেট।

কিন্তু ভেতরে ঢুকলেই পুরো অন্য দৃশ্য।

রাজকীয় সাজ। দামী আসবাব, নরম আলো, দেয়ালে

বড় বড় ম্যাপ আর স্ক্রিন।

সেখানে হলরুমে বসে আছে আবরাজ খান আর মিনহাজ। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে ইস্তানবুল শহরের ম্যাপ।

আবরাজ আঙুল দিয়ে একটা জায়গা দেখাল,

“উস্কুদার এলাকায় রাস্তাগুলোর অবস্থা খারাপ।”

তার কণ্ঠ ঠান্ডা।

মিনহাজ মাথা নেড়ে বলল,

“হ্যাঁ, লোকাল লোকরা অনেকদিন ধরেই অভিযোগ করছে।”

আবরাজ চেয়ার থেকে সামান্য এগিয়ে এল।

“ভোট প্রচার করতে আমরা যাবোই সেখানে।”

তার চোখ সরু হয়ে এল। ধীরে মিনহাজের দিকে তাকাল,

“আর ওখানে এমন কোনো কি কিছু ঘটনা আছে,

যেটাকে ব্যবহার করে আমরা কাজটা আরও এগিয়ে নিতে পারি?”

মিনহাজ কিছু না বলে ফোনটা হাতে তুলে নিল।

স্ক্রিনে দ্রুত কিছু স্ক্রল করল। কয়েকটা ফাইল খুলল

কিছু ছবি জুম করে দেখল।

ঘরের ভেতর তখন নিঃশব্দ।

কিছুক্ষণ পর সে মাথা তুলে তাকাল আবরাজের দিকে।

চোখে একটা হিসেবি ঝিলিক।

“আছে, ভাই।”‌‌

মিনহাজ ধীরে বলল,

“উস্কুদার এলাকায় রাস্তাঘাট একদমই ভালো না।

লোকাল লোকজন অনেকদিন ধরেই অভিযোগ করছে

কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।”

আবরাজ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার চোখ ম্যাপের ওপর স্থির। তারপর ধীরে বলল,

“কিন্তু ওখানের পার্টি আলাদা।”

সে আঙুল দিয়ে জায়গাটা ঘিরে দিল।

“সোজাসুজি গিয়ে কাজ করা সম্ভব না।”

তার ঠোঁটে হালকা হিসেবি হাসি ফুটে উঠল।

“কিন্তু কাজ না করেও মানুষকে দেখানো যায় যে আমরা কাজ করছি।”

মিনহাজ তাকিয়ে রইল বুঝতে চেষ্টা করছে।

আবরাজ চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল,

“নিজেদের এরিয়াগুলো, যেগুলো আমাদের কন্ট্রোলে আছে‌ ওগুলোকে নিখুঁত করার প্রস্তুতি কর।”

তার কণ্ঠ ঠান্ডা কিন্তু স্পষ্ট নির্দেশ।

“রাস্তা, লাইট, ড্রেনেজ সব একদম ক্লিয়ার চাই।”

রাশা পাশ থেকে বলল,

“মানে ক্লিন এরিয়া?”

আবরাজ তার দিকে তাকিয়ে হালকা মাথা নাড়ল,

“একদম।”

একটু ঝুঁকে সামনে এল,

“মানুষ নিজের চোখে যা দেখে সেটাই বিশ্বাস করে।”

তার চোখে এখন স্পষ্ট পরিকল্পনা।

“ওদের এলাকায় সমস্যা থাকুক কিন্তু ওরা যেন আমাদের এলাকা দেখে মনে করে আমরা পারি।”

মিনহাজ এবার হালকা হেসে ফেলল,

“তাহলে ভোটটা ওখান থেকেই ঘুরে আসবে।”

আবরাজও হালকা হাসল,

“মানুষ কখনো পুরো শহরের কথা ভাবে না।”

ধীরে বলল,

“সে ভাবে তার নিজের জীবনটা কীভাবে ভালো হবে।”

ঠিক তখনই,

ধড়াম!

জোড়ালো শব্দে বাইরের লোহার গেটটা খুলে গেল।

ঘরের ভেতরের ঠান্ডা, হিসেবি পরিবেশটা এক ঝটকায় ভেঙে পড়ল।

প্রয়াণ ঢুকল। তার চোখ লাল, চোয়াল শক্ত, হাতের

শিরা ফুলে আছে।

মুডটা এমন যেন একটু কিছু হলেই বিস্ফোরণ হবে।

ভেতরে ঢুকেই সামনের সোফায় একটা জোরে লাথি মারল।

ঠাস!

সোফাটা একটু সরে গেল।

ঘরের সবাই এক মুহূর্তের জন্য চুপ করে গেলো।

আবরাজ তাকিয়ে রইল ভাইয়ের দিকে। চোখে দেখেই সে বুঝে গেছে।

মিনহাজ এগিয়ে এল একটু,

“কি হয়েছে ভাই?”

প্রয়াণ প্রথমে কোনো উত্তর দিল না।

সোজা গিয়ে ফ্রিজ খুলল। একটা ঠান্ডা পানির বোতল বের করল। ঢকঢক করে খেতে লাগল।

তারপর বোতলটা একটু জোরে টেবিলে রাখল।

“কিছু না।”

গলা ঠান্ডা কিন্তু ভেতরে আগুন স্পষ্ট।

আবরাজ এবার ধীরে বলল,

“কোথা থেকে আসলি?”

প্রয়াণ একবার তাকাল। চোখে বিরক্তি, অস্থিরতা।

“বাড়ি।”

একটা শব্দ। কিন্তু সেই শব্দের ভেতরেই অনেক কিছু লুকানো।

রাশা চুপচাপ তাকিয়ে রয়েছে। সে প্রথমবার দেখছে

এই ‘প্রয়াণ খান’কে।

আবরাজ এবার ধীরে বলল,

“কিছু হয়েছে বাড়িতে?”

প্রয়াণ হেসে ফেলল। কিন্তু সেই হাসিতে কোনো হালকা ভাব নেই শুধু বিরক্তি।

“কি হয়নি সেটা বলো?”

সে সামনে এগিয়ে এলো চোখে অস্থিরতা স্পষ্ট।

“বাড়িতে থাকলেই ঝামেলা। ম'দ খেয়েছি কেন?

এটা করেছি কেন? ওটা করেছি কেন?”

হাত দিয়ে চুল সরাল। রাগে কণ্ঠটা আরও নিচু হয়ে গেল।

“সব কিছুর উত্তর দিতে পারব না আমি।”

ঘরের ভেতর নীরবতা।

রাশা এতক্ষণ চুপ করে দেখছিল। তার চোখে স্পষ্ট কৌতূহল। ধীরে বলল,

“প্রয়াণ খান যে বিবাহিত এইটা জানার পর অনেকেই কিন্তু অবাক হয়ে গেছে।”

কথাটা বলার সময় তার গলায় হালকা ইঙ্গিত।

যেন সে আরও কিছু বোঝতে চাইছে।

ঠিক তখনই পেছন দিক থেকে আরেকটা কণ্ঠ ভেসে এলো। সাইরা মালিক।

সে দেয়ালের পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। ঠোঁটে হালকা হাসি।

“ইয়েস আমি তো কল্পনাই করতে পারিনি যে তুমি ম্যারিড।”

তার চোখ সরাসরি প্রয়াণের দিকে। একটা আলাদা ধরনের আগ্রহ সেখানে।

প্রয়াণ তাকাল এক সেকেন্ডের জন্য তারপর চোখ সরিয়ে নিল। কোনো উত্তর দিল না। আবরাজ চুপচাপ দেখছে। তার ঠোঁটের কোণে হাসি। সে দেখতে চায় তার ভাই এই পরিস্থিতি সামলায় কি ভাবে। আর সাইরা কতদূর এগোতে পারে। মিনহাজ চুপচাপ তাকিয়ে রয়েছে।

ঘরের বাতাসে একধরনের চাপা উত্তেজনা।

সাইরা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। হিলের শব্দটা মেঝেতে হালকা টকটক করছে। সে থামল ঠিক প্রয়াণের সামনে।

“চুপ করে থাকলে প্রশ্নটা মুছে যায় না তাই না, প্রয়াণ?”

তার গলায় মৃদু চ্যালেঞ্জ।

প্রয়াণ এবার সরাসরি তাকাল। চোখে বিরক্তি স্পষ্ট,

“কি সমস্যা তোমার?”

সাইরা হাসল। একটা আত্মবিশ্বাসী হাসি।

“সমস্যা অনেক।”

সে একটু ঝুঁকল। চোখে চোখ রেখে বলল ,

“তুমি শুনতে রাজি থাকলেই বলব।”

প্রয়াণের চোয়াল শক্ত করে বলল,

“ড্রামা করো না।”

সাইরা থামল না,

“ড্রামা?”

হালকা ভ্রু তুলল,

“আমি তো শুধু জানতে চাইছি, যে মানুষটাকে সবাই এত ফ্রি ভাবে সে হঠাৎ করে ‘ফ্যামিলি ম্যান’ কবে থেকে হলো?”

মিনহাজ চোখ নামিয়ে ফেলল। কিন্তু তার ঠোঁটে চাপা হাসি।

আবরাজ চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে পড়েছে। পুরো দৃশ্যটা উপভোগ করছে।

প্রয়াণ ধীরে এক পা এগিয়ে এলো,

“তোমার জানার দরকার নেই।”

তার গলা নিচু কিন্তু ভেতরে চাপা রাগ।

সাইরা পিছিয়ে গেল না। উওর দিলো,

“আমি তোমার বউ না, যে তুমি বলবে আর আমি চুপ করে থাকব।”

ঘরের ভেতর হালকা “ওহ” টাইপ প্রতিক্রিয়া।

রাশার ঠোঁটেও হালকা হাসি। সে অনেক আগেই বুঝেছে, প্রয়াণের প্রতি সাইরার আগ্রহটা সাধারণ না।

ওটা আকর্ষণ নাকি হিসেব সেটা এখনো পরিষ্কার না।

প্রয়াণের চোখ এক মুহূর্তের জন্য কঠিন হয়ে গেল।

সে ঠান্ডা গলায় বলল,

“আমার বউয়ের সাথে নিজেকে তুলনা করিস না।”

সাইরা ভ্রু তুলল। একটু থেমে বলল,

“তাহলে সে স্পেশাল?”

ঘরের বাতাস যেন থেমে গেল।

প্রয়াণের চোয়াল শক্ত। কিন্তু তার গলা এবার আরও নিচু, আরও ভারী,

“সে আমার বাচ্চার মা।”

কথাটা বলার সময়‌ তার চোখে একটা অদ্ভুত দৃঢ়তা।

“পৃথিবীর সব মেয়ের থেকে সে আলাদা।”

সাইরা হেসে ফেলল। একটা তাচ্ছিল্যের হাসি.

“এই কথাগুলো মনে থাকে না যখন আমার সাথে রা'ত কাটাও?”

ঘরের বাতাস হঠাৎ জমে গেল।

মিনহাজ চোখ তুলে তাকাল। রাশার ঠোঁটের হাসিটাও

মিলিয়ে গেল এবার। আবরাজ এখনো চুপচাপ।

চোখে স্পষ্ট যে সে পুরোটা দেখছে, উপভোগ করছে।

প্রয়াণ এক পা এগিয়ে এল। সে হাত বাড়িয়ে সাইরার গাল চেপে ধরল। তার চোখ একদম ঠান্ডা কিন্তু ভয়ংকর।

“তোর আমার রা'ত কাটানোর সাথে আমার বউয়ের কী সম্পর্ক?”

কথাগুলো ফিসফিস করে বলল কিন্তু কাঁটার মতো।

সাইরা একটুও ভয় পেল না। তার চোখে চোখ রেখে বলল,

“সম্পর্ক আছে… অনেক।”

একটু থেমে বলল,

“তোমার বউ তোমাকে সন্তু'ষ্ট করতে পারে না বলেই তো

তুমি আমার কাছে আসো।”

ঘরের ভেতর যেন নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। প্রয়াণের চোখ

একদম বদলে গেল। সে গালটা ছেড়ে দিল কিন্তু পরের

মুহূর্তেই আরও কাছে ঝুঁকল। তার গলা এবার চাপা

আর ভয়ংকরভাবে ঠান্ডা,

“যাস্ট শাট আপ।”

একটু থেমে বলল,

“রাহির সম্পর্কে আর একটা বাজে কথা বললে আমি তোকে এই মুহূর্তে শেষ করে ফেলব।”

তার চোখ সরাসরি সাইরার চোখে।

ঘরের ভেতর সম্পূর্ণ নীরবতা।

রাশা একদম চুপ। মিনহাজও আর হাসছে না।

আর আবরাজ এবার একটু সোজা হয়ে বসল।

সে নিজেও তার ভাইকে‌ প্রথমবার এমনভাবে দেখলো।

প্রয়াণ এখানে এসেছিল মাথা ঠান্ডা করতে কিন্তু এখন উল্টোটা হচ্ছে। তার ভেতরের রাগটা কমার বদলে আরও বাড়ছে।

হ্যাঁ, সে নিজের মতো চলে। মারামারি করে, ম'দ খায়,

কারও কথা শোনে না। এমনকি রাহিকেও কষ্ট দেয়।

কিন্তু রাহির ব্যাপারে কেউ একটা শব্দও খারাপ বললে,

সে নিজেকে ধরে রাখতে পারে না।

কারণ সে খুব ভালো করেই জানে তার বউটা কেমন।

কতটা সহজ, কতটা চুপচাপ, কতটা সহ্য করে।

বাড়ির কথা, মানুষের আচরণ, তার নিজের অবহেলা

সবকিছু চুপচাপ সহ্য করে গেছে।

আর সেই মেয়েটাকেই কেউ যদি আঙুল তোলে প্রয়াণ সেটা নিতে পারে না।

তার চোখে রাহি শুধু স্ত্রী না। তার জীবনের এক নীরব

সত্য। যেটাকে সে নিজে যতই দূরে ঠেলে রাখুক না কেন,

মনের কোথাও অস্বীকার করতে পারে না।

আর এই সাইরা তার বউকে অপমান করছে, ইচ্ছা করছে মেয়েটাকে এখানেই শেষ করে দিতে।

প্রয়াণ আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। সোজা বেরিয়ে গেল বাইরে। পেছনে কেউ ডাকল কি না সে শুনল না। শুনতে চাইলও না।

বাইরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে লাগতেই একটা অদ্ভুত শূন্যতা এসে বসল ভেতরে।

বুকের ভেতরটা যেন টান মেরে ধরছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। চোখ জ্বলছে, কান্না আসছে কিন্তু সে থামিয়ে দিল।

কারণ সে “প্রয়াণ খান।” এই নামটা যার সাথে দুর্বলতা মানায় না। পুরুষ মানুষ কখনো কাঁদে না।

কমপক্ষে তাকে তো কেউ কাঁদতে দেখেনি কোনোদিন।

সবাই ভাবে তার হৃদয় কঠিন। সে নির্দয় কিন্তু সে-ও তো

মানুষ। তারও কষ্ট হয়। শুধু তাকে শেখানো হয়েছে এই

অনুভূতিগুলো দেখাতে নেই।

খান পরিবারে জন্ম মানেই শক্ত হতে হবে। ভেঙে পড়া যাবে না। দুর্বল হওয়া যাবে না।

এইভাবেই ধীরে ধীরে অজান্তেই তাকে গড়ে তোলা

হয়েছে। প্রয়াণ হাঁটতে হাঁটতে থেমে গেল একটা ছোট্ট

পার্কের সামনে।

শহরের আলো একটু দূরে। এখানে পরিবেশ অদ্ভুত শান্ত।

সে ভেতরে ঢুকল। একটা ফাঁকা বেঞ্চে গিয়ে বসে পড়ল।

দুই কনুই হাঁটুর ওপর রেখে মাথা নিচু করে বসে রইল।

চারপাশে হালকা বাতাস, পাতার শব্দ কিন্তু তার ভেতরে

রাহির কান্নার শব্দ। মেয়ের হাসি মুখ। আর নিজের

বলা কথাগুলো যেগুলো সে ফিরিয়ে নিতে পারে না।

প্রয়াণ চোখ বন্ধ করল। চোখের কোণে জল জমল কিন্তু

সে মুছল না। তবে ঝরতেও দিলো না।

শুধু চোখ বন্ধ করে বসে রইল।

কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে চোখ খুলল সে। দূরে পার্কের আলোটা ঝাপসা লাগছে নাকি তার চোখই ঝাপসা হয়ে আছে। সে নিজেও বুঝতে পারল না।

ঠোঁট সামান্য নড়ল। খুব আস্তে, নিজেকেই শুনিয়ে‌ বলল,

“রাহি… আমার জীবন।”

একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল বুক থেকে।

তার গলা নিচু, ক্লান্ত।

“আমার হৃদয়ে অনুভূতি বলে যদি কিছু থাকে....”

একটু থামল চোখ বন্ধ করল আবার।

“তাহলে সেই অনুভূতির নাম রাহি।”

কথাগুলো বলার পর সে নিজেই হালকা হাসল।

কিন্তু সেই হাসিতে শান্তি নেই শুধু একরাশ ক্লান্তি।

কারণ যাকে সে এতটা নিজের মনে করে সেই

মানুষটাকেই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।

বাতাসটা ধীরে বইছে। গাছের পাতা নড়ছে।

কিন্তু প্রয়াণের ভেতরের অস্থিরতা একটুও কমছে না।

প্রয়াণ বেঞ্চে হেলান দিল। চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকাল। মনে মনে একটাই প্রশ্ন করল,

“যাকে এত ভালোবাসি তাকে ভালো রাখতে পারি না কেন?”

#চলবে

((আর কিছু দৃশ্য বাকি আছে রাহি আর প্রয়াণের সেটা পরের পর্বে থাকবে। এছাড়াও পরের পর্ব গুলোতো রাজনৈতিক দিক থাকবে। একটা বড়ো পর্ব দিলাম। আশাকরি গঠনমূলক মন্তব্য করবেন।

এই গল্পটা নিয়ে অনেক ভাবনা রয়েছে জানিনা শেষ পর্যন্ত কি হবে 🌝।

যারা রাহি আর প্রয়াণের দিকটা দেখতে পছন্দ করে তারা খুশি হবে আজকের পর্ব টা পড়ে।))

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন