#ও_যে_মানেনা_মানা।
#পর্ব_৩
নোট : আমার কল্পিত গল্পটিকে বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে কেউ ভ্রম করবেন না। এই পর্বে গালাগালি আছে। প্রস্তুত হয়ে পড়বেন।
আজকের আবহাওয়ার অনুরূপ ফারিয়ার মাথাটা। চড়া ঠিক তপ্ত বালির মতো। ফোনের ওপাশে আসমা। আফিফের ছোট সে, এরপর ফারজু, তারপর ফারিয়া, তারপর রুমকি।
_“কে ভাংচি দিয়েছে ভাইয়ার নামে? কার সাথে প্রেম ভাইয়ার?”
আসমার প্রশ্নে চিচি করে উঠলো ফারিয়া,“কি জানি! বলল মেয়ের নাম স,ত,ল,ন,জ দিয়ে। বলল তাদের পাঁচ বছরের প্রেম। আপা তুই ভাবতে পারিস আমাদের ভাইয়া পাঁচ বছর ধরে প্রেম করে আর আমরা জানি না? এই আমাদের বলল না কেন? বিয়ে করছে না কেন তবে? আমরা কি তাকে আটকে রেখেছি? আমরা কি অমন জল্লাদ টাইপের বোন?”
আসমা বলে,“না না! এসব বিশ্বাস করিসনা। আগে ভাইয়ার কাছে জানতে হবে।”
_“জেনেছি তো। সকালে কল করেছিলাম। এসব অস্বীকার করে কল কেটে দিয়েছে। আপাতত দোকানে আছে। পরে আবার ধরবো।”
_“তাহলে ভাংচিই দিচ্ছে কেউ। আমাদের ভাইয়া মিথ্যা বলেনা। শোন চাপ নিসনা। আমি এদিকে একটা মেয়ে দেখছি। বাবা মাদ্রাসার শিক্ষক। মেয়ে এমন ভদ্রর ভদ্র যে স্বয়ং ভদ্রতাও তার কাছে এসে কদমবুচি করে। বাবা ছাড়া এই মেয়ের মুখ কেউ দেখেনি কখনো। পরীর মতো সুন্দর। দুধের মতো সাদা। গায়ে মাংস আছে, হ্যাংলা পাতলা নয়। লম্বাও বেশ,তোর ননদটার মতো বাইট্টা নয়।”
ফোনের লাউড স্পিকার অন করে রেখে রান্নাঘরে সালাদ কাটতে ব্যস্ত ছিলো ফারিয়া। তিতলি জগে পানি ভরতে রান্নাঘরে এসেই দরজার এপাশে স্থির হয়ে দাঁড়াল। এসব কথা ওর কানে গেছে তখুনি। নিজের উচ্চতা নিয়ে অন্যের হাসাহাসি,কটুকথা নতুন নয় ওর কাছে। একদম বয়ঃসন্ধি থেকে চলছে এসব। জবাবে এখন চুলোচুলি করা যায় এদের সাথে,তবে তিতলি কেন জানি আগ্রহ পাচ্ছে না এখন। কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে ওদিকে। আজ ভাইয়াও টিভি খুলে বসে আছে দুপুর দুইটায়। খাগড়াছড়িতে সহিংসতা,সংঘর্ষ ও বিক্ষোভ। যুগ্ম ছাত্র জনতারা অবরোধ শিথিলের ঘোষনা দিলেও বহাল আছে ১৪৪ ধারা। মোড়ে মোড়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর টহল। প্রতিবেশী দেশের ইন্ধন আছে বলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সাংবাদিক সাক্ষাৎকার দিয়েছে। আরো আরো দেশীয় সব কেচ্ছা, বরিশালে ডেভিল ব্রিথের ইন্সিডেন্ট খুব ঘটছে আজকাল। কান পেতে ভাতের বদলে সেসব গিলছে ভাইয়া। তার পাতের ভাত ওদিকে ঠাণ্ডা হচ্ছে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। সে বাবুগঞ্জ বসে খাগড়াছড়ির জন্য বেশ উদ্বিগ্ন। গাল দিচ্ছে সন্ত্রাসকে। এদিকে সন্ধ্যার পরে তার দোকানে চাঁদা তুলতে এলে ঠিকই মিনমিনিয়ে দিয়ে দেবে। মসজিদে নামাজে দাঁড়ালে কোনো দলের মাথা এসে যদি বলে,“আমাদের নেতাকে সামনের কাতারে দাঁড়াতে দাও।” তবে ঠিকই পিছিয়ে যাবে কুতে কুতে হেসে।
তিতলিকে এখন এখান থেকে বেরোতে হবে,এমনিতেও সামনে পূজার ছুটি তাই আজ বেশি করে স্টুডেন্ট দুটিকে পড়িয়ে দেয়ার তাগিদ অভিভাবকদের। পানি নিয়ে ও আবার ছুটে গেল নিজের ঘরে। বাটুস বলে সবসময় মজা ওড়ানো বের করে দেবে যদি কখনো সৈয়দ ওয়াহিদুল আফিফকে বাগাতে পারে। চার ননদের নাট বল্টু টাইট করার মতো বুদ্ধি তিতলির ঘটেও আছে। এখন যত পারো মজা ওড়াও।
আজ রাস্তাঘাটে বেজায় ভিড়। কাল থেকে পূজা শুরু। গাড়ির চাপ বেশি তাই তিতলির হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছে। তবুও ঠেলেঠুলে জিরোপয়েন্ট অবধি এসেছে। আজ নিজে থেকে আফিফের দোকানে ঢোকার ইচ্ছে না হলেও আফিফই ওকে দেখতে পেয়ে ডেকে নিল,“এই তিতলি! এই! এই! দাঁড়াও!”
ঠোঁটের দু’পাশে ঝলমলে রোদের ঝলকানি মাখা হাসি নিয়ে তিতলি গদগদ পায়ে এগিয়ে যায়।
_“ডাকলেন?”
আফিফ ব্যস্ত গলায় বলল,
_“বাড়িতে যাচ্ছো? একটা কাজ আছে। করে দেবে?”
ঘর্মাক্ত মুখটা দেখে চোখের তৃষ্ণা কমে না,বরংচ বেড়ে যায় আরো। তিতলি ঢোক গিলে বলে,
_“কি কাজ?”
_“একটু দোকানে ঢুকে বসো। আজ কাস্টমারদের চাপ আছে। আমি একটু ফাঁকা হলে মাছ বাজার গিয়ে দু'টো ইলিশ এনে দেবো। বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ফারিয়াকে বলবে রাঁধতে, তোমরা একটা খাবে,একটা আমাদের বক্স ভরে দেবে। বুয়া নেই আজ দু'দিন,রুমকির রান্নাবান্নার হাত জঘন্য।”
তিতলি কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে অস্ফুটে বলল,“জি আচ্ছা। আর কিছু?”
আফিফ একটা চেয়ার টেনে ওকে বসতে দিয়ে বলল,“একটা আবদার করলে রাখবে?”
_“ভেবে দেখবো!”
_“একবার সরিষা বাটা দিয়ে তুমি ইলিশের একটা আইটেম করেছিলে। এতো মজা ছিল। ওটা পারলে করবে। ফারিয়া ওটা পারেনা।”
তিতলির বুকটা ধকধক করে উঠেছে তা ওর মুখের স্থিরতায় বোঝা যাচ্ছেনা। ছটফটে স্পন্দনে জোরদার ধমক বসিয়ে ও কেবল আস্তে ধীরে বলল,“যদিও আমি একটু ব্যস্ত,তবে আমি চেষ্টা করবো ভাইয়া!”
_“আরে না না! ব্যস্ত হলে আর দরকার নেই।”
_“না না,আমি চেষ্টা করবো তো!”
_“আচ্ছা! তোমার খুশি! বিয়ে হয়ে গেলে কোথায় না কোথায় চলে যাবে তখন দেখা হবে বছরে কখনো সখনো…..!”
তিতলি চোখ নামিয়ে শক্ত হয়ে বসে আছে ওড়না খামচে ধরে। গলার কাছে আচমকা কিছু একটা এসে বিধেছে। সুক্ষ্ম যন্ত্রণা বোধ হচ্ছে। একটু সময় নিয়ে বলল,“ভাবীর কাছে শুনলাম কে একটা পাত্রী পক্ষকে কল করে আপনার নামে ভাংচি দিয়েছে?”
আফিফ ভ্রু কুঁচকে বলে,
_“আর বোলো না! জমিজমা নিয়ে এতো লোকের সাথে ঝামেলা পাকিয়ে রেখেছি যে এই ব্যাপারটাতে আমি মোটেও অবাক হইনি! সবাই পেছনে লেগে আছে।”
তিতলি ওদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিশ্চুপে কতক্ষণ হেসে থেমে থেমে বলল,“তো আপনি বলছেন আপনার কারো সাথে সম্পর্ক আসলেই নেই?”
বিরক্ত মুখ চোখ আফিফের,“ফারিয়ার মতো কথা বোলছো যে! আমার যদি কারো সাথে সম্পর্ক থাকতো তবে আমি অন্য কোথাও সম্বন্ধ খুঁজতাম?”
তিতলির গলা ধীর হয়ে আসে,
_“তবে সেই প্রেমিকাকে বিয়ে করে নিতেন বুঝি? বোনদের বিরুদ্ধে গিয়ে?”
_“আশ্চর্য ওরা বিরুদ্ধে যাবে কেন? ওরাও তো চায় আমি বিয়ে করি!”
_“যদি আপনার প্রেমিকা তাদের অপছন্দ হতো?”
তিতলি গালে হাত চেপে কথা প্যাচাচ্ছে। জানতে চাইছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে।
আফিফ জবাব দেয়ার আগেই তার ব্যস্ততা এসে গিয়েছে। দু'জন কাস্টমারের বিল করে দিয়ে আবার ফাঁকা হলো। আজ দোকানে তিনজন কর্মচারীই এসেছে। ভিড়ভাট্টাও খুব। দু'জন কাস্টমার নামলে তিনজন ঢুকে পড়ছে। তিতলির একঘেয়েমি লাগলে বেছে বেছে একটা উপায় বের করলো। এমনিতে আফিফের সাথে সেধে সেধে খুব বেশি কথা বলার প্রসঙ্গ ওর হাতে নেই। তবে কিনা ছ্যাঁচড়া ভাবে লোকটা। তাই রাজনীতির কথা তোলে,এই একটা ব্যাপারেই আফিফ ভাইয়ের উৎসাহ তুঙ্গে। তিতলিরও নিরামিষী থাকতে ভালো লাগছেনা তাই রাজনীতি টানে।
_“খবর শুনেছেন আফিফ ভাই? জনসেবা পার্টির এক মহিলা সেক্রেটারিকে শ্লাট শেমিং করার পরে ডিবি পার্টির চেয়ারম্যান ফারুক হোসেন ক্ষমা চেয়েছে অনলাইনে। তিনি নাকি অমন কিছু বলেননি। তার আইডি নাকি হ্যাক হয়েছে।”
_“হ্যা দেখলাম খবরটা। এসব পুরনো নির্বাচন পূর্ববর্তী ক্যাচাল। সত্যিও হতে পারে তার কথা,নির্বাচনের আগে কেউ জেনেবুঝে এমন বোকামি নিশ্চয়ই করবে না। আমি শুধু এসব ঘটনা ঘিরে ছাত্রনেত্রীদের প্রতিক্রিয়া দেখছি। শোনো,এদের কত ভালো ভাবতাম জানো? কিন্তু সত্যি হচ্ছে যে লঙ্কায় যাবে যে, সেই হবে রাবণ। মাঝেমাঝে খুব মন খারাপ হয় পড়াশোনা করতে পারিনি বলে, তারপর যখন এদের দেখি। নিজের আর দুঃখ থাকেনা। আর দেশে চলছেই একেক দলের একেকটা ভুলভাল বক্তব্য এবং ক্ষমা চাওয়াচাওয়ির প্রতিযোগিতা। কোনো দল ধর্ম নিয়ে ভুলভাল বক্তব্য দিচ্ছে তো কোনো দলের আছেই বলার মতো একটা প্রসঙ্গ,সেটা হলো নারী। নারী ছাড়া কিছু বোঝে না। নিজেরাই মন্তব্য করে বিতর্ক সৃষ্টি করে বাঁশ খাবে,নিজেরাই আবার স্যরি বলবে। অদ্ভুত উটের পিঠে চলছে বাংলাদেশ!”
তিতলি চোখ নামিয়ে হাসে। ও ক্রমশ টের পেল,এই লোকের সাথে রাজনীতি নামের একটা বোরিং বিষয়ও মজার হয়ে উঠছে। বরং, কখনো এই লোকের সাথে বিয়ে হলে, একটা দু'টো পূর্ণিমার রাত, এই লোকের বুকের ওপর শুয়ে থেকে রাজনীতির আলাপ শুনতে শুনতে কাটিয়ে দিলেও মন্দ লাগবে না। অনেক বেশি আদরের সময় যদি ভাইয়ার আখ্যায়িত এই অশিক্ষিত ছাপোষা লোকটা হঠাৎ বলে ওঠে,‘এই তিতলি ! আয় তোকে দেশের আগামী পাঁচ বছরের অর্থনীতির ব্যাপারে আমার একটা পার্সোনাল জরিপ শোনাই, তবে তিতলি রাগবে না।
কাস্টমার একঝাঁক বেরিয়ে গেছে। এখন দোকান কিছুটা নিড়িবিলি। দু'জন কর্মচারী বাইরে নেমেছে। তিতলি নড়েচড়ে উঠে বলল,“বুয়া নেই কেন বাড়িতে?”
_“তার মেয়ের বিয়ে! ও ভালো কথা মনে করালি। বুয়ার হবু জামাইকে একটা ব্যাটারি চালিত ভ্যান কিনে দিতে বুয়াকে পনেরো হাজার টাকা দেবো। তোর এক মামার সৌদিয়া সাইকেল স্টোর ছিল না? নাম্বারটা থাকলে একটু দিস তো। আমি দেখি দাম কমিয়ে পারা যায় কিনা!”
তিতলি অবাক হয়ে চোখ তোলে,“যৌতুক দেবেন?”
_“যৌতুক নয় ঠিক। উপহার!”
_“ঐ একই তো। আপনার কাছ থেকে এটা আশা করিনা। সবসময় তো আপনিই বলেন এগুলো ঠিক না!”
তিতলির মুখ ফুলেছে বাচ্চাদের মতো। আফিফ দেখে হাসলো,ধীরে বলল,“ছেলে খুবই দুঃস্থ। বদলা দিয়ে খায়। ভাড়ায় ভ্যান চালায়। এই ভ্যানটা দিলে অবস্থার একটু উন্নতি হবে। তাছাড়া মেয়েকে দেখেছিস? কেউ গছতে চায়না। গা জোড়ালি কথা বললে তো হবে না। বুয়া বিধবা। দুনিয়া সবদিক থেকে ঠেকিয়ে রেখেছে তাদের।”
_“তাই বলে যৌতুক সাপোর্ট করতে হবে? কি আজব!”
আফিফ ভ্রু জোড়া কপালের মাঝখানে গুটিয়ে এনে খসখসে গলায় বলল,“দুনিয়া মধ্যবিত্তের লেন্স দিয়ে দেখলে হবে? হবে না তো। দেশ যেমন চলছে,চলবে একটা নির্দিষ্ট সেটেলমেন্টের ওপর ভিত্তি করে। তেমনি ঐ প্রান্তিকদের অবস্থাও তাই। যৌতুক থাকবেই ওখানটায়। তুই,আমি,পারবো দু’টো সমালোচনা করতেই। এই সমাজ কাঠামো ভাঙতে পারবি? ঐ অশিক্ষিত মেয়েটাকে একটা নিরাপদ জায়গায় কাজ পাইয়ে দে তো পারলে! পারবি? না!
দুনিয়া মধ্যবিত্তের লেন্স দিয়ে দেখা বাদ দে, এই দেশ তেমন নয়। মধ্যবিত্ত জীবন খুব খারাপ,খুব ফ্যান্টাসির। মনে হয় যেন দুনিয়া উদ্ধার করে দেয়া যায়,হাংকিপাংকি করে। আদতে প্রকৃত মারা খাই আমরা মধ্যবিত্তরা! ভালো থাকে উচ্চবিত্তরা, যারা যা চায় তাই হয়। আর ভালো থাকে নিম্নবিত্তরা,যারা মানিয়ে নিতে পারে। ঐ যৌতুকের সাথেই। তোর আর আমার মতো গায়ে ফোস্কা পড়েনা।”
তিতলি গালে হাত চেপে দেখছে ওকে,জবাবটা মনে মনেই দিলো,“আমাকে বিয়ে করুন, আমি কেবল আপনার চোখের লেন্স দিয়ে দুনিয়া দেখবো। স্বামী ছাড়া অন্যকিছু দেখার টাইমই রাখবো না। এই দেশ,এই দুনিয়া যায়ে ভার মে! স্বামী দু'টো কামাই করে এনে দেবে,রাধবো,ঘুমাবো। এটুকুই!”
সময় গড়াতে গড়াতে রোদের আলোটা পশ্চিমে একদম নিভু নিভু। আফিফ বিলিং কম্পিউটারে ব্যস্ত তখন। তিতলির ঝিমুনির মতো এসে গিয়েছে,এবার বিরক্ত। তবে ঘোর কাটল আচমকা চেঁচামেচি শুরু হতেই। স্টোরের গ্রোসারি কর্ণারে খুব শোরগোল। দোকানে আপাতত কাস্টমার নেই কোনো। কর্মচারীরাও নামাজে। আফিফ ক্যাশ আটকে বেরুনোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। হকচকিয়ে উঠে তিতলি দাঁড়াল। আফিফ হতভম্ব হয়ে ওদিকে পা বাড়িয়ে দেখলো এক লোক একজন তরুণীর চুলের মুঠি খামচে ধরে আছে। লোকটার কাঁধ চওড়া,গায়ের পাঞ্জাবিটা ধবধবে। বেশভূষায় একটা পলিটিশিয়ানের ছাট পড়ে আছে, এবং মুখটা দেখে আফিফের ধারণা সত্যি হয়। জনসেবা পার্টির নির্বাহী সেক্রেটারির একমাত্র পুত্র ইনি। মহিলাটিকে আফিফ ঠিক চেনে না।
ঘটনার আকস্মিকতায় প্রচণ্ড আহাম্মক বনে ও তিতলিকে দেখলো ঘুরে। মস্তিষ্ক কাজ করতে সময় নিচ্ছে।
_“একদম জানে মেরে ফেলবো খানকির বাচ্চা। নডির ঘরের নডি। বারো মাস আমার সাথে ঘুমায়ে এখন তুমি হাজি হচ্ছো! স্বামীর ঘর করা ছুটায়ে দেবো।”
বিধ্বংসী রাগে ফেটে পড়ছে লোকটা। তিতলি আফিফের পেছনে গুটিয়ে গেছে আতঙ্কে। ওদিকে মেয়েটির সাথে ধস্তাধস্তি তুমুল চলছে লোকটির। নাম শিহাব মজুমদার। নিজের রিয়েল স্টেটের বিজনেস। কালো টাকার পাহাড়ে দাঁড়িয়ে হেন কোনো অকাজ নেই করেনি গোপনে। সরকার পতনের পরে এদের ডানাও বেড়েছে।
মেয়েটি ছটফট করছে,“চুল ছাড়েন! আমি এমনিই অসুস্থ ডিএনসির পর থেকে! এটা পাবলিক প্লেস,আমি কেনাকাটা করছি!”
_“ফোন ধরিসনা কেন তুই?”
_“আমি আপনার সাথে আর সম্পর্ক রাখবো না!”
_“কেন?”
একটু থেমে লোকটা দাঁত খিচিয়ে আরো ভয়ংকর হয়ে উঠলো,“স্বামীর প্রতি দরদ এখন উতলে উঠতেছে মাগীর ঘরের মাগী! তাইনা ? তুই আমার কাগজপাতি দিবি। কখন কোনটা কোনটা সরাইছো! সব দিবি। আমাকে ব্ল্যাকমেইল মারাস তাইনা? তোকে একদম খেয়ে ফেলবো শুয়োর।”
মেয়েটি নীল হয়ে উঠেছে আতঙ্ক আর লজ্জায়। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে প্রকাণ্ড একটা ধাক্কা মেরে কাঁচের দরজা টেনে বেরিয়ে গেল স্টোর থেকে। লোকটার বিক্ষুব্ধ কদম তাকে অনুসরণ করলো সাথে সাথে। এবং মিনিটের মাথায়, গ্রোসারির ঐ কোণটা ঠিক আগের মত ঘুটঘুটে।
কি ঘটেছে বিগত এক মিনিটে সেসব সময় নিয়ে প্রসেস হয় মস্তিষ্কে। হতভম্ব তিতলির দুইচোখে আফিফের সংকোচ ভরা দৃষ্টি মিললো। নিতান্তই অপ্রীতিকর একটি দৃশ্য। তিতলির গা গুলাচ্ছে। বেঁকে উঠে বলল,“ওয়েট! শিহাব মজুমদার বিবাহিত না? ওর বৌ আমার এক ব্যাচ সিনিয়র!”
_“হু! তাই তো জানতাম!”
_“তাহলে এসব করে বেড়ায় কেন?”
আফিফ চোখ নামিয়ে বলে,
_“তা আমি কি জানি? তার ভালো লাগে তাই করে! মেয়েটাও সম্ভবত বিবাহিত। তার ভালো লেগেছে তাই করেছে। এত মাথা ঘামাসনা, চুপ করে বোস,আমি মসজিদ থেকে বেরিয়ে মাছবাজার ঢুকবো। তুই বসে বসে যা মন চায় খা এই যে দোকানের!”
তিতলি ঢোক গেলে। আফিফ ওর অবস্থা দেখে হাসে,“আরে এসব আধুনিক যুগ। মানুষ একটা বিয়ে করতে পারে না,আর এই শুয়োরদের একসাথে তিন চারটা লাগে। এদের যত ঘাটবি তত বমি পাবে। বাদ দে!”
___________
অদ্ভুত ভ্যাপসা সন্ধ্যা। ফারিয়ার মন মেজাজ আরো বেশি খিচে গিয়েছে তিতলির হাতে ইলিশ মাছ দেখে, তাও আবার যেগুলো আফিফ কিনে দিয়েছে। মেয়েটি অতিমাত্রায় তার ভাইয়ের গায়ে পড়া। রাগ ধরে যায় রীতিমতো ফারিয়ায়। নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে হেসেই মারল খোঁচা,“বাবাহ! ইদানিং সহজ রাস্তা রেখে কেবল মেইন রোড হয়ে আসো যে? ভাইয়া তোমাকে পেলো নাকি তুমিই গিয়েছিলে ওখানে?”
তিতলি দাঁতে দাঁত চাপে,জবাবটা বেশ গুছিয়ে দেয়,“স্কুলের রাস্তায় পাগল থাকে তাই ওদিক থেকে আসিনা। আর তোমার ভাইয়াই আমাকে ডাকলো ভাবী। এভাবে রোজ ডাকে, জানো? কি যে আন্তরিক মানুষটা, ডেকে স্টোরে ঢুকিয়ে কোল ড্রিঙ্কস খাওয়ায় রোজ। আমি এতো নিষেধ করি। কে শোনে কার কথা! বেয়াই একটা পেয়েছি আমি,কি মিষ্টি! কি মিষ্টি!”
বলেই তিতলি ঠোঁট চেপে মুখ ওদিকে ফিরিয়ে হাসছে। আফিফ ভাইয়ের খিচখিচে বোনের অন্তরে আগুন জ্বালিয়ে তবেই ও থামবে আজ। গলা খাঁকারি দিয়ে বলতে শুরু করলো আবার,“আচ্ছা সরো তো ভাবী। আফিফ ভাই আবার আমাকে মাছ দু'টো রাঁধতে বলে দিয়েছেন পইপই করে। তিনি আমার হাতের ঐ সরিষা ইলিশটা খুব পছন্দ করেছেন। খুব করে অনুরোধ করেছেন যেন আমিই রাধি! সরো সামনে থেকে!”
ফারিয়া ভ্রু উঁচিয়ে হা করে আছে। মুখ থেকে মনে হচ্ছে রক্ত সরেছে। রাগটা ছিটিয়ে দিতে পারছে না কোনো কারণে। তিতলি ভাবীর হাত থেকে ইলিশের ব্যাগটা থাবা মেরে নিয়ে ওপাশে গিয়ে কতক্ষণ হাসলো খুব। সারাদিন তিতলিকে খুঁচিয়ে যাবে আর তিতলি মোটেও জ্বালা দেবে না তা কি হয়? মোটেই না। তিতলি অত ভালো মেয়ে না।
আকাশে বিদ্যুতের শুকনো ঝলকানি। হাওয়া ছুটছে মৃদু। সন্ধ্যার পর থেকে আবহাওয়ার পাগলামি বেড়েছে খুব। তবে বৃষ্টি পড়বে কিনা সে বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই। হিন্দুপাড়া পেরিয়ে আফিফের বাইক ঢুকেছে কড়ইতলা চিকন গলির ভাঙা রাস্তায়। উঁচু নিচু দুলছে বাইক। আফিফ ছিল অন্যমনস্ক। যেদিন দোকানে কাস্টমারের চাপ থাকে বেশি সেদিন মাথাটাও ধরে থাকে খুব। অথচ ওর মাথা টিপে দেওয়ার ব্যক্তিগত লোক নেই।
_“এই ভাই! এই!”
মঞ্জুর দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ডাকছে সৌভিক। অন্যমনস্ক ভাব কাটিয়ে বাইক থামাতেই বলল আবার,“ক্যারাম খেলে যাও এক দান। না কোরো না। তোমার বাসায় বৌ তো নেই! এতো তাড়াতাড়ি গিয়ে কি করবে?”
আফিফ নেমে দাঁড়িয়ে হাসলো,“শালা কপাল টিপে দিতে পারলে খেলবো।”
_“সুধীরের সেলুনে ঢুকিয়ে ভিআইপি মাসাজটা দেওয়াবো তোমার কপালে। বিল আমার। তবুও আসো।”
ক্যারাম বোর্ডে আলাপ চলে রাজ্যের। দেশের অর্থনীতি, বেকারদের কর্মসংস্থান, পাড়ার কোন যুবকের গলায় মালা পড়বে এইবার, কোন ছাত্রের মার্কস কত, ট্রাম্প বিশ্ব রাজনীতিতে কতটা প্রভাব রাখছে, ঘনঘন চুরি ডাকাতি। আড্ডা গড়িয়ে রাত বাড়ে, মানুষজনের ভিড় কমে গেছে পুরোপুরি। সৌভিক মঞ্জুর ক্যারাম বোর্ডের বিল মিটিয়ে দিয়ে আফিফকে বলল,“চলো হাটি। বাতাস ছুটলেও চাঁদটা দারুণ।”
একটু থেমেই জানতে চাইল,“শুনলাম তোমার কোন মেয়ের সাথে পাঁচ বছরের সম্পর্ক? মেয়েটি কল করে পাত্রীপক্ষের কাছে বলে দিয়েছে সব।”
_“ও! সে খবর তোর কাছেও গেছে? বিবিসি নাকি সবাই?”
_“তবে এটা সত্যি নয়?”
_“আরে না পাগলা! আমি ভালো মেয়ে খুঁজছি কেন তবে প্রেমিকা রেখে?”
_“ভালো মেয়ে? সে আর পাচ্ছো! দুনিয়া এতো খারাপ,এতো খারাপ যে ভালো মেয়ে খুব একটা মেলানো সম্ভবনা এই দিনে।”
রাস্তার একপাশ হয়ে বসলো আফিফ।
_“খুঁজতে থাকি। দেখি মেলাতে পারি কিনা। না পেলে করলাম না বিয়ে!”
ধোঁয়া ছেড়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল আফিফ কথাটা। সৌভিক হেসে বলল,“বাপরে! বিয়েই করবেনা? একটু কম্প্রোমাইজ করা যাবে না?”
_“উহুম।”
খানিকটা জেদী দেখায় আফিফের মুখ। ঘাড় ফিরিয়ে সৌভিকের মুখে চেয়ে ফের বলল,“এক ইঞ্চিও কম্প্রোমাইজ করা যাবে না এই ব্যাপারে। অন্তত আমার ব্যাপারে। আমার সাথে কোনো হেলাখেলা করা যাবে না!”
একটু থেমে বলিষ্ঠ হাত দুটো পেছনে মেঝেতে ঠেকিয়ে উদাস দৃষ্টি চাঁদে রেখে বলতে শুরু করে,“ইন্টারমিডিয়েট লেভেলে, মোটামুটি সম্ভাবনাময় ছাত্র হলেও ঐ সময়ে অত ফেইস ভ্যালু ছিলো না আমার,বেশ হ্যাংলা পাতলা ছিলাম। দেখতে মেয়েদের চোখে নোংরা কালো। অতটা ভাও দিতো না কেউ, আর আমার দুনিয়াটাও ছিল গোটানো। আম্মা আর চারটা বোন। বাবার পেনশনের টাকাগুলো খেতে খেতে সব খেয়ে ফেলার পরে যখন ধাক্কাটা খেলাম, এরপর তো সব ছেড়ে বিদেশ গেলাম মামা-চাচার থেকে টাকা ধার করে। সে কি যে কষ্ট! কুত্তার মতো খেটেছি রাত দিন। রেস্টুরেন্টে পার্মানেন্ট কাজ করেছি, পার্টটাইম জব করেছি। জীবন কি,যৌবন কি,নারী,চাহিদা কি ওসব মাথায় আনিনি। আমার চুল পড়ে যাচ্ছে এখন দেখ! তখন কেবল মাথায় ছিল,আমাকে ঋণ পরিশোধ করে বোনগুলোর বিয়ে দিতে হবে। জানিস মাঝে মাঝে এদেশীয় পরিচিত সহকর্মীরা এসে সাধত,“একা থাকো কেন? এখানে ব্যবস্থা আছে। সময় কাটাও কারো সাথে। দারুণ দারুণ সব মেয়ে।
ওদেশে আবার এসব খুব ইজিলি পাওয়া যায়। কত বিবাহিত লোককেই দেখেছি এসব করতে। তারাই বুদ্ধি দিতো,“আরে কেন সুবিধাটা নিচ্ছো না? কে দেখবে? লাগাও ইচ্ছামতো। কেউ তো দেখছে না।”
ভাবতাম,কেউ দেখবে না। কিন্তু ঐ ওপরে একজন তো দেখবে! আমি কখনো যাইনি কোথাও, ভাবতাম কি লাভ! একটাই তো জীবন। একজন আসবে তার হক মেরে লাভ কি? সে নিশ্চয়ই কত আশা করে বসে আছে,স্বামীটা ভালো হবে।
ঐ সময়টাতে, বয়সের দোষে যখন যখন শয়তান এসে মাথায় ভর করতে চাইতো, আমি দূরের একটা মসজিদে গিয়ে শুয়ে থাকতাম। রোজা রাখতাম।
এই আমি, এখন বিয়ের পর যদি দেখি আমার পাতে কম পড়ছে কোনো কিছু। একদমই মানবো না। আমার সারাজীবনের সংযমের প্রতিদানে আমার সাথে নাইনসাফি করতে এলে আমি খুন করে ফেলবো! সত্যি বলছি! আমাকে পুরোটা ভালোবাসতে হবে, আমাকেই বাসতে হবে। এ ব্যাপারে কোনো কম্প্রোমাইজ চলবে না। এমন মেয়ে খুঁজে পেলে বিয়ে করবো, নয়তো একদমই না।
চলমান…….