ফন্ট সাইজ:
থিম:
ও যে মানে না মানা

৪র্থ পর্ব

লেখক: ইসরাত ইতি

#ও_যে_মানেনা_মানা

#পর্ব_৪

সিনথিয়া শরিফা মেয়েটির নাম। এখানকার স্থানীয়। বাবা পেশায় কৃষক। বিয়ে হয়েছিল এক মালেশিয়ান প্রবাসীর সাথে। সদরে এপার্টমেন্ট ভাড়া করে থাকে। জমিজমা সংক্রান্ত এক সমস্যা নিয়ে বছরখানেক আগে শিহাবের সাথে পরিচয়‌। বছরখানেক আগে যখন সরকার পতনের পরে লুকাছুপা করে থাকা ব্যক্তিবর্গ অঙ্কুরিত বীজের মতো নতুন নতুন গজিয়ে উঠেছিল সদরে। শিহাব মজুমদার সেবার নিজের ক্ষমতা খাটিয়ে সিনথিয়াকে সাহায্য করার পর থেকেই বেড়েছে ঘনিষ্ঠটা। প্রবাসীর স্ত্রী হওয়ার দরুন নিঃসঙ্গতা ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির প্ররোচনায় যা পরবর্তীতে রূপ নিয়েছিল চূড়ান্ত ব্যাভিচারে। টানা একবছর ধরে অবাধ মেলামেশা, ফলশ্রুতিতে অবৈধ সন্তান ধারণ ও জোরপূর্বক অ্যাবর্শনের পরে সিনথিয়ার হুশ ফিরলে সে এই নাপাক জীবন থেকে অব্যাহতি চেয়েছিল। বিপরীতে টলেনি শিহাব মজুমদার। চাচ্ছে সম্পর্ক টেনে নিয়ে যেতে হবে। ওদিকে বিয়ে করতেও নারাজ কারণ তার ঘরে বৌ আছে। মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে দু'দিন ধরে পালিয়ে বেড়াচ্ছে সিনথিয়া। যে পাপ সে করেছে তার শাস্তি দুনিয়াতে শুরু হয়েছে কিনা ভাবছে মুখে কাপড় গুঁজে। পলকা শরীরটা একটু পর পর কাপছে সবেগে। কাউকে বলতেও পারেনি এসব, কেলেঙ্কারির ভয়ে গুটিয়ে আছে।

_“কিরে দরজা খোল?”

_“তুমি যাও দয়া করে। এসব করো না শিহাব।”

_“সম্পর্ক রাখবি না?”

_“না, এইগুলো ঠিক না। এমন কথা ছিল না। আমাকে বিয়েও করতেছো না,আমাকে ছাড়তেও চাচ্ছো না। চাও কি তুমি?”

_“আমি কেবল লাগাতে চাই। হইছে? উত্তর পাইছোস? এখন দরজা খোল।”

সিনথিয়া দরজা খুলছে না। বিগত এক সপ্তাহ ধরে কম উগ্রতা দেখেনি, ভীষণ ভয় ঢুকেছে মনে। প্রাণ টুকু হারিয়ে ফেলার ভয়। ওদিকে দু’দিন ধরে স্বামীর সাথে যোগাযোগ করে উঠে সব বলতে পারছে না। সব শেষ হয়ে ভরা গাঙে ভাসতে হবে তাই। এমন জালে পা জড়িয়ে রেখেছে যে পা ছাড়িয়ে অন্য কোথাও ছোটার সুযোগ আর রইলো না। বেশিক্ষণ আর ধৈর্য রাখতে পারেনি শিহাব। লাথির পরে লাথি মেরে দরজা ভেঙেই তবে ক্ষান্ত হয়েছে। হুরমুরিয়ে ঢুকে ধরেছে সিনথিয়ার চুলের মুঠি।

_“আমার কাগজপত্র কই! দে!”

বিষিয়ে উঠেছে সমস্ত শরীর। দম আটকে আটকে জানতে চাইলো সিনথিয়া,

_“কিসের কাগজপত্র?”

_“কিসের কাগজপত্র? আমার আমলনামা! তোরে লাগাতে এসে রাখছিলাম না তোর কাছে একটা ফাইল? ঐ লাল ফাইলটা। আটকে রেখে আমাকে ব্ল্যাকমেইল করবি সেই বুদ্ধি ছাঁচতেসিস তাইনা? জানে শেষ করে ফেলবো মাগী! শিগগির বের কর। বের কর কইতাছি।”

__________

তখন সন্ধ্যেবেলাটা,বৃষ্টি পড়বে না বলে মনে হলেও এখন বেশ জমিয়ে নামছে। প্রথমে অল্পস্বল্প, তারপর মুষলধারে। রাতও গাঢ় হয়েছে,সেই সাথে আবার শুরু হয়েছে তিতলির ভাইয়া-ভাবীর তিতলির বিবাহ সংশ্লিষ্ট বৈঠক, তর্কাতর্কিও বাড়ছে ধীরে ধীরে। এবারের সম্বন্ধটা ছিল এক সেনাবাহিনীর। সৈনিক পোস্ট। তিতলির ছবি দেখে পছন্দ করেছিল,হাইট নিয়েও সমস্যা নেই তাদের। কিন্তু যেই শুনেছে তিতলি মাস্টার্স পড়ছে অমনি কলজে শুকিয়ে খাঁচা ভরেছে। বঙ্গদেশীয় মধ্যম কাতারের ছেলেদের কাছে উচ্চশিক্ষিত মেয়ে একটি আতঙ্কের নাম,এ জানা কথা।

তিতলির ফিজিক্সের ম্যাম ভীষণ ঠোঁটকাটা কিসিমের মানুষ ছিলেন। সবসময় একটা কথা বলতেন,“ছোট বাচ্চারা যেমন জুজু বুড়ির নাম শুনে ভয় পায়,তেমনি ধ্যাতলা মার্কা কিছু পুরুষ আছে এদেশে,তাদের কাছে জুজু বুড়ি হচ্ছে উচ্চশিক্ষিত নারীগন। নারীশিক্ষার নাম শুনলেই চিমসে যায় আতঙ্কে। কেউ কেউ তো ভয়ে প্রস্রাব করে দেয়। এদের কাছে উপযুক্ত পাত্রী হচ্ছে আন্ডারমেট্রিক। তাও আবার বাচ্চা হবার পরে গুষ্টিশুদ্ধ সবাই মিলে বডি শেমিং করতে করতে বুড়ি বানিয়ে দেয় মেয়েটাকে।”

ফিজিক্সম্যাম অবশ্য ঘোর পুরুষ বিদ্বেষী ছিলেন। তিতলি বেশিদিন তার সাথে মিশলে নিজেও নামকরা পুরুষ বিদ্বেষী হয়ে যেতো। তখন আফিফ ভাইয়ের মতো সন্টুমন্টু টাইপের পুরুষটিকে বোধহয় নজরে পড়ত না।

তবে এই পাত্রপক্ষ খুব সম্ভবত সেরকম ধাঁচের,যেরকমটা ম্যাম বলেছেন। তিতলি এই সম্বন্ধ গুলো হাতছাড়া হয়ে গেলে যতটা খুশি হয়,তার চেয়ে খুশি আর কিছুতে নয়। জীবনের একেকটা ফারা কেটে যায় যেন।

তবে মাহবুব যারপরনাই চিন্তিত বিষয়টি নিয়ে। কেউ কালাজাদু করে তার বোনের বিয়ে আটকে রেখেছে কিনা ভাবছে ইদানিং। হতেও পারে ! নয়তো এমন ভদ্র সভ্য একটি মেয়েকে পছন্দ করতে পাত্রপক্ষের এতো গড়িমসি কেন? মেয়েদের উচ্চতা কখনো বিয়ের অন্তরায় হতে পারে?

ফারিয়া গজগজ করছে মাহবুবের ওপর,“কত ভালো ভালো সম্বন্ধ এক সময়ে আসতো। তখন কি বলতে? বয়স হয়নি,বোন বিয়ে দেবো না এখন। এখন তো বয়স হয়েছে,এখন কেন তবে বিয়ে দিতে পারছো না? কি বোকামিটাই না করলে। আজ ঐ সৌদি প্রবাসীর সাথে বিয়ে হলে একদম সৌদি যেতে পারতো স্বামীর সাথে।”

কি যে প্রচণ্ড রাগটা উঠেছে তিতলির নিজের ভাবীর ওপর, কেবলমাত্র আফিফ ভাইয়ের বোন তাই মাফ করে দিয়ে এপাশে সিরিয়ালে মগ্ন হয়েছে, ঝেড়ে দেয়নি। সিরিয়ালের নাম “কে আপন কে পর।” পুনঃ প্রচার হচ্ছে স্টার জলসায়। আগামাথা কিছু বুঝতে পারছে না তবে খুব সম্ভবত নায়িকা কাজের মেয়ে থেকে হুট করেই বাড়ির বৌ এবং পরবর্তীতে উকিল হয়ে গিয়েছে। নায়িকার নাম জবা সেনগুপ্ত। মনে হয় আলাদিনের চ্যারাগ পেয়েছিল নায়িকা। এমন একটা আলাদিনের চ্যারাগ পেয়ে গেলে তিতলি আগে লম্বা হবে। তারপর ছু মান্তার ছু বলে আফিফের মাথা খারাপ করবে।

মাহবুব ফারিয়ার তর্কাতর্কি মাঝখানে স্থগিত,কারণ আফিফ ভাই চলে এসেছেন। বৃষ্টি গায়ে লাগেনি যদিও, সৌভিক ছাতা হাতে পৌঁছে দিয়ে গিয়েছে। বাইকটা সৌভিকদের তরুন সংঘ ক্লাবে রেখে এসেছেন।

ফারিয়া ভাইকে দেখেই গদগদ হয়ে বলল,“সন্ধ্যাবেলা রুমকির জন্য মাছটা রান্না করে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। তুমি আমাদের সাথে বসো। এখানেই খাও। খেয়ে তারপর যাও। বাসমতি চাল নামিয়ে ভাত রেঁধেছি।”

আফিফ আপত্তি দেখালো না কোনো। বেজায় ক্লান্তও লাগছিল মুখটা। হাত ধুয়ে চেয়ার টেনে বসলো বাধ্য ছেলের মতো। চারপাশে ছড়িয়ে বসেছে তিতলি,ফারিয়া আর মাহবুব। ফারিয়া খাচ্ছেনা, সন্ধ্যা থেকে শরীরটা জুতসই নেই। অবসাদ ঘিরে আছে গোটা দেহে। বমিও পাচ্ছে ভীষণ। কপাল চেপে ধরে বড়ো বড়ো পিস দু'টো ভাইয়ের পাতে তুলে দিলো বড়ো আদরে।

খেতে খেতে আবার উঠলো সেই প্রসঙ্গ,আফিফ বেশ মনক্ষুণ্ণ ভঙ্গিতে বলল,“তিতলিকে না করে দিয়েছে আর্মি পাত্রপক্ষ? আশ্চর্য! ওর বয়স কোথায় বেশি? নিশ্চয়ই তাদের অন্য কোনো কারণ আছে।”

_“হু। মেয়ে মাস্টার্স পড়ছে আর বিয়ের পরেও পড়াতে হবে শুনেই সাফ সাফ না করে দিয়েছে।”

আফিফ খেতে খেতে থামলো। নিজের প্লেটে খাবার খুঁটতে ব্যস্ত থাকা তিতলির দিকে একপলক দৃষ্টি দিয়ে বলল,“চাকরির প্রিপারেশন নিচ্ছো না?”

তিতলি মাথা নাড়ে ওপর নিচে। আফিফ কাঁটা বেছে প্লেটের পাশে রেখে বলে,“লেখাপড়া বেশি জানাটা কারো অযোগ্যতা না, এটা মানতে না পারাটা মানসিক দুর্বলতা। নারী পড়বে কিনা সেটা একান্তই তার ব্যাপার, শ্বশুর বাড়ির মানুষের অনধিকার চর্চা করা এবং তাদের সমর্থনে থাকে যেসব পুরুষ। এমন দুর্বল পুরুষ সংসারের জন্য হুমকি। না করেছে ভালো করেছে।”

খুবই শান্ত সুরে আফিফ কথাগুলো আওড়েছে। ওদিকে রক্ত সরেছে মাহবুবের মুখ থেকে। তিতলি ফ্যাকাশে নয়নে ভাইয়ের মুখটাই দেখলো। আফিফ ভাই ভাইয়ার ওপর জমে থাকা বহু পুরনো ক্রোধটা উগড়ে দিয়েছে ,তা স্পষ্ট। ভাবীকে একসময় পড়তে দেয়নি তিতলির মা, সমর্থনে ছিল মাহবুব। এ তো কোনো নতুন রাগ নয় আফিফ ভাইয়ের। নিতান্তই ধৈর্যশীল মানুষ তাই চুপ করে থেকেছেন আজ অবধি।

তিতলি প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য আঁকুপাঁকু করছিল। প্রসঙ্গ বদলায় ভাবীর কল্যাণে। কথাবার্তার মাঝেই আচমকা মাথাটা ঘুরে কাত হয়ে পড়ে ফারিয়া,ধরে ফেলে মাহবুব।

_“বেশি খারাপ লাগছে?”

_“হ্যাঁ! বলেছিলাম না বিকেল থেকে ভালো লাগছে না! গ্যাস্ট্রিক পেয়ে বসেছে। আন্ধারি লাগছে সব।”

মাহবুব হাত ধুয়ে উঠলো। ফারিয়াকে আগলে, ধরে ধরে নিয়ে রুমে ঢুকলো। বিছানায় আলগোছে শুইয়ে দিয়ে পাশে বসে কপাল টিপে দিতে লাগলো।

আফিফ খেয়ে উঠে নিজের প্লেটটা নিয়ে সিঙ্কে রেখে হাত ধুয়ে ফেলে। বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি তখনো। কমে এলে বেরুবে সেই চিন্তা করেই সোফা ঠেশে বসলো,ভদ্র ছেলেটির মতো। তিতলির বিষন্নতা গাঢ় হয়। আফিফের চোখে মাহবুবের প্রতি যতটুকু চাপা বিতৃষ্ণা ঠিক ততটুকু কি তিতলির প্রতিও? থালাবাটি ধুতে ধুতে ভাবছে সে।

তিতলির হাতে খালি জগ দেখে আফিফ অবাক হয়ে বলে,“কি করবে?”

_“কলের পানি শেষ হয়ে গেছে। টিউবওয়েল থেকে পানি আনতে হবে।”

_“ঐ টিউবওয়েলে? সাক্ষাৎ আপদ একটা। মাহবুব এটাকে ঠিক করছেনা কেন?”

_“বেশ পুরনো তো। রিপেয়ার করলেও হয়না, দু'দিন পরেই জ্যাম হয়ে যায়।”

_“আচ্ছা,তবে তুমি যেয়ো না। দু’মিনিট চাপলেই তো বেহুঁশ হয়ে পড়বে। মাহবুবকে বলো পানি আনতে।”

তিতলি চোখ নামিয়ে জবাব দেয়,“বহুদিন পরে,ভাবীর অসুস্থতার দরুন তাদের মধ্যে একটু মিলমিশ দেখতে পেলাম। ভাইয়া ভাবীর মাথা টিপে দিচ্ছে। থাক ওভাবে।”

আফিফ চুপচাপ চেয়ে আছে তিতলির মুখটাতে,কতক্ষণ ওভাবেই কাটে। এরপর ধীরে ধীরে বলে,

_“দাও। আমি পানি এনে দিয়ে যাচ্ছি।”

_“না না। ভাইয়া দেবে না হয় পরে।”

বোনের ঘরের দরজায় একপলক দৃষ্টি রাখলো আফিফ। গম্ভীর হয়ে বলে,

_“ও থাকুক ফারিয়ার কাছে। টিউবওয়েলের ওখানে লাইট আছে?”

_“লাইন খুলে রাখা, বৃষ্টি পড়ছে তাই!”

_“আচ্ছা মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইট অন করে দাঁড়াও এপাশে। আমি পানি এনে দিয়ে যাচ্ছি। জগেই রাখো নাকি অন্য কোনো বড়ো পাত্র? কলসিতে রাখো পানি নাকি বালতিতে? তবে কলসি অথবা একটা বালতি দাও।”

বলতে বলতেই তিতলির হাত থেকে জগটা টেনে রান্নাঘরে ঢুকে একটা বালতি হাতে তুলে নিয়ে হেলতে দুলতে বাইরে নামলো। তখন বৃষ্টির বড়ো ঝাপটা কমেছে। ক্ষণে ক্ষণে বিদ্যুৎ চমকে দুনিয়া আলোড়িত হচ্ছে। একপাশে ঐ গন্ধরাজ গাছটার পাশে দাঁড়িয়ে তিতলি দেখে চলেছে লোকটাকে। শক্তপোক্ত চাপে টিউবওয়েলের হাতল ওঠানামার সদৃশ তিতলির বুকের উচাটন ঘটে। চুপ করে থাকতে অস্বস্তি বাড়ে,ওর মনে হয় ও যে লোকটার দিকে এভাবে তাকায়,লোকটা তা টের পাচ্ছে। জোর করে বেহায়া নজরটুকু সরানোর প্রচেষ্টা। হঠাৎ আবার প্রকাণ্ড এক বজ্রপাত,এই কাছে কোথাও আবির্ভূত হলে, আতঙ্কিত তিতলি ওভাবেই ছুটে গিয়ে খামচে ধরলো লোকটার বাহুর কাছের শার্টের অংশটা।‌ চোখ বুজে দোয়া ইউনুস পড়ছে কাঁপতে কাঁপতে। মিনিটখানেকের নীরবতা জায়গাজুড়ে, পরপর ওকে সরিয়ে দিয়ে আফিফ ছিটকে সরে গেলো ওপাশে। ওপাশে পুরনো স্যাঁতস্যাঁতে দেয়ালটা, লোকটা কপালের ডানপাশে খেয়েছে বারি,বেশ জোরেশোরেই।

সচতেন হয়েই তিতলি জমে দাঁড়িয়ে আছে। গোলগোল চোখে আশপাশটা দেখে ঢোক গিলল একদফা। ওকে ছ্যাঁচড়া ভাবলো নাকি আবার! কিন্তু তিতলি তো অমন মেয়ে নয়। ছ্যাঁচড়া হবার ইচ্ছে থাকলে তিতলি বহু আগেই এটা হতে পারতো,নয়তো একটা সুমত্ত পুরুষের মাথা বিগড়ে দেয়া এমন কোনো কষ্টসাধ্য ব্যাপার নয়। আফিফ চোখ নামিয়ে কপালটা কিছু মুহূর্ত ঘষে এসে কলের হাতল ধরলো আবার। এদিকে অপমান আর লজ্জায় দলা পাকিয়েছে তিতলি। এভাবে ছিটকা মারার কি হয়েছে? তিতলি কি বিছা পোকা যে এভাবে ছিটকা মেরে সরিয়ে দিতে হবে? তিতলি কি গায়ে পড়ে বিষ কামড় দিতো?

_“কয়টা বাজে তিতলি দেখো তো!”

আফিফ সংকোচে পড়ে আইঢাঁই করছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জোরদার প্রচেষ্টা। তিতলিই সাহায্য করলো,

_“এগারোটা।”

_“যেতে হবে।”

একহাতে জগ, আরেক হাতে বালতি নিয়ে আবার চলে এলো ঘরে। কল চাপতে ভীষণ পরিশ্রম লেগেছে তাই রীতিমতো হাপাচ্ছে। চওড়া ছাতি ওঠানামা করছে মৃদু বেগে। তিতলি আগ বাড়িয়ে একটা ধোওয়া তোয়ালে দিলো হাতে,কপালটা মুছে নিলো আফিফ।

_“দেখো ফারিয়ার মাথাব্যথা কমেছে কিনা।”

_“না কমলে যাবেননা?”

আফিফ হাসে। তিতলি ভাবীর রুমে উঁকি মেরে এসে বলে,

_“না কমেনি। শুনুন একটু দাঁড়াবেন? চুইপিঠা আছে, গরম করে বক্স ভরে দিচ্ছি। নিয়ে যান। সকালে খাবেন।”

_“আচ্ছা তাড়াতাড়ি করো। শোনো পারলে এক কাপ চা দিয়ো!”

তিতলি চা দিলো। চা খেয়ে আফিফ যখন চলে গেল তখন রাত বারোটা করে। দরজা আটকে নিজের ঘরে ঢুকে শুরুতেই তিতলি ঐ তোয়ালেটা হাতে নিয়ে গা জড়ালো যেটা আফিফ ধরেছিল। চাদরের মতো গায়ে পেঁচিয়ে নিজেকে দেখছে আয়নায়। ফ্যাকাশে মুখচোখ,মুখটা দেখে ওর কবিতা মনে পড়ে,“স্নিগ্ধতা হারিয়ে গেছে কবে,সেই কোন বিষন্ন বারে।”

সব ছুঁড়ে ফেলে তিতলি নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়। দিনশেষে এখানে তিতলি আর তিতলির কল্পনার জগত। কল্পনাতে আজ আফিফ তিতলির টকশো হয়। মাঝে রয়েছে এই টক শো’য়ের উপস্থাপিকা। উপস্থাপিকা জানতে চাইছে আফিফের কাছে,“তো সৈয়দ ওয়াহিদুল আফিফ। আপনি তিতলিকে পছন্দ করছেন না কেন? সে তো দেখতে খারাপ নয়।”

আফিফ বড্ডো গম্ভীর গলায় জবাব দিচ্ছে,

_“হ্যা দেখতে খারাপ নয়। ঠিকঠাক। তবে তাকানোর মতোও কিছু হয়নি। সে আমার বোনের মতো।”

_“কিন্তু বোন তো নয়।”

_“হ্যাঁ বোন নয়। কিন্তু রিলেটিভ তো! এভাবে যদি আমি রিলেটিভদের দিকে প্রেমের নজরে তাকাই। তাহলে পুরুষ হিসেবে আমার নৈতিকতা থাকলো কোথায়?”

_“এতো নৈতিকতা দিয়ে কি করবেন? ধুয়ে ধুয়ে পানি খাবেন? পাড়ার একটা মিষ্টি মেয়ে। তাকে অন্য কেউ বিয়ে করে নিয়ে যাবে। আর আপনি বোন বোন করছেন। কি হয় নিজে বিয়ে করে এখানে রেখে দিলে?”

_“দেখুন। আপনি আমাকে জোর করছেন। আপনি নিরপেক্ষ থাকুন।”

_“না জোর করছি না। আপনি এক্ষুনি তিতলির প্রেমে পড়বেন। সে প্রেমে পড়ার মতো একটি মেয়ে।”

_“মামার বাড়ির আবদার নাকি!”

_“জিই। ঐ যে তিতলি শাড়ি পরেছে আপনার জন্য। আপনি তাকান। তাকে দেখে ফিল আনেন। খুব মিষ্টি,খুব মিষ্টি একটা মেয়ে। গোলগাল,পুতুলের মতো,আদুরে, বৌ হবার উপযুক্ত।”

আফিফ ভাই টক শো’য়ের মাঝে ঘামছে,তাকাতে চাইছে না তিতলির মুখে। সে তার নীতি নৈতিকতায় বলীয়ান। বিড়বিড় করে বলছে,“সে আমার বোনের মতো। ছিঃ ছিঃ। সে আমার বোনের মতো।”

তিতলি একপাশের চেয়ারে এতক্ষণ জবুথবু হয়ে বসেছিল, এইবার আর হিতাহিত জ্ঞান রাখতে পারলো না। এদিক ওদিক তাকিয়ে একটা হাতুড়ি নিয়েছে হাতে,চিল্লিয়ে বলছে,“কে আপনার বোনের মতো? আপনার চারটা বোন আছে। আমারও একটা ভাই আছে। আমার আর ভাইয়ের দরকার নেই। খবরদার ভাই বোন পাতাতে আসবেন না আমার সাথে।”

_“তবুও তো,তুমি আমার বোনের মতোই তিতলি।”

_“ওরে কেউ একে চুপ করাও রে!”

তিতলি হাতুড়ি হাতে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে অগ্নিমূর্তি নিয়ে।

_“আমার দিকে অমন নজর দেবেন কিনা বলেন!”

_“অসমম্ভব তিতলি। আমি ভালো ছেলে!”

_“নজর দিলে আপনি খারাপ ছেলে হয়ে যাবেন না।”

_“হবো,কোনো ভদ্রঘরের ছেলে রিলেটিভ কোনো মেয়েকে দেখে কামনা জাগ্রত করতে পারেনা।

_“কামনা নয় তো। একটু কেবল পছন্দ করবেন আমাকে।

_“না। তুমি বোনের মতো।”

_“একটু পছন্দ করেন।”

_না।

_একটুউউ। আপনি চাইলে আমাদের একটা জমজমাট সংসার হবে!

তিতলি উঠে বসলো। কল্পনার টক’শো ক্যানসেল করে হাতে নিলো ডায়রি। তার ভয়াবহ মানসিক সমস্যা হবে কিছুদিনের মধ্যেই,বুঝতে পারছে! মন ঠিক করতে ও ফের বিচরণ করে নিজস্ব ফ্যান্টাসির দুনিয়ায়। মাঝে মাঝে তো একদম ভবিষ্যতে চলে যায়। সেখানে গিয়েও ভবিষ্যতের এক পাতা দু’পাতা দিন লিখে ফেলে।

.

.

“আফিফ ভাই থুক্কু আমার স্বামী এইমাত্র বাড়িতে এসেছেন,আমি সরিষা ইলিশ রেঁধে তার জন্য অপেক্ষা করছি। খেতে খেতে উনি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে সরকারের বিনিয়োগের গড়িমসি নিয়ে আলোচনা তুললেন। যদিও তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে আমাদের সংসারে কোনো কাজ নেই। আমরা একটু পরে গিয়ে বিছানায় গড়াগড়ি করে একে অপরকে আদর করবো। তবুও আফিফ ভাইয়ের থুক্কু আমার স্বামীর যখন সময় নষ্ট করতে ভালোলাগে,বাধ্য বৌ হিসেবে আমার উচিত তার সাথ দেয়া। তিনি যদি এখন অন্তর্বর্তী সরকারের খামতি নিয়ে টকশো দেখতে দেখতে চেঁচিয়ে বলে, ডক্টর ইউনুস একজন অকর্মণ্য বুড়ো ভাম। আমারো উচিত তার কোলে চেপে বসে তাকে সহমত জানানো।

“জি আপনি সঠিক বলেছেন।”

তারপর যদি আলোচনায় ঢুকে যায়,“দেশের মাঠে মাঠে কোনো ছাগল থাকবে না তিতলি। সব পার্লামেন্টে ঢোকার পাঁয়তারা করছে।”

আমি খুশি খুশি গলায় বলবো,“জি জনাব। সঠিক বলেছেন।”

আলোচনা ঘুরেফিরে যাবে আবার,“বাংলাদেশে ভারতবিরোধী স্লোগান দেখে ইন্ডিয়া এবছর পেঁয়াজ দেবেন না। গোস্বা করেছে।”

আমিও অতি চমকিত হয়ে বলব,“তাই নাকি? ইশশশ! তারপর তারপর? ভারত পেঁয়াজ না দিলে আমাদের খুব খারাপ অবস্থা হবে তাইনা?”.

_“তেমন না। তবে পেঁয়াজের কেজি হবে দুইশো। দেশীয় ইবলিশ গুলো এই সুযোগে সিন্ডিকেট শুরু করবে।”

আমি আফিফ ভাইয়ের কোলে চেপে বসে আগামীর পেঁয়াজ মূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে শোক করবো কতক্ষণ।

__________

খবরটা চড়াও হয়েছে সকাল বেলাতেই‌। এক নারীর লাশ পাওয়া গেছে নয়াবাজার ব্রীজের নিচে লোহার সাথে আটকে। খুব সম্ভবত রাতের জোয়ারে ভেসে এসে আটকেছে। মুখটা নষ্ট করা হয়েছে কিছুর সাহায্যে থেঁতলে দিয়ে। প্রাথমিকভাবে লাশটা শনাক্ত করা না গেলেও বলাবলি করা হচ্ছে ভদ্রমহিলা স্থানীয় এক মালেশিয়ান প্রবাসীর স্ত্রী। নাম সিনথিয়া।

এই দুঃসংবাদের সাথে সাথেই ঘুম ভেঙেছে তিতলির। তার ভাবী ইতিমধ্যে পাড়ার মহিলাদের নিয়ে ঘটনাটা ইনভেস্টিগেট করতে বসে পড়েছে। ভাবীর তীক্ষ্ম বুদ্ধি দিয়ে বের করেছে,মেয়েটির অত্যাচারী শাশুড়ি তার এই হাল করেছে। শাশুড়ি ছাড়া কেউ এত নির্মম হতেই পারেনা। ভাবীর অবশ্য শাশুড়ি ফোবিয়া আছে।

পুরো ব্যাপারটা তিতলি তখনো ধরতে পারেনি। ওর চেতনা ফিরেছে আফিফের কলটা পেয়েই। তিতলি এই অবেলায় এই লোকের থেকে কল পেয়ে হতভম্ব। ইলিশ মাছ খেয়ে পাগল হয়ে গেছে নাকি? কলটা রিসিভ করে তিতলি চুপ করে আছে, শ্বাস আটকে। ওপাশে আফিফের ব্যস্ত গলা,

_“বিরক্ত করলাম?”

তিতলি নেচে উঠে মনে মনে বলল,“না না সোনা। এ কেমন অলক্ষুনে কথা বলছেন। বিরক্তি আর আপনি! অমন দিন আসার আগে এই তিতলির মৃত্যু হোক।”

মুখে বলল,“জি না ভাইয়া।”

_“শোনো একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে এতো সকালে কল করলাম,নয়তো বিরক্ত করতাম না।”

_“কেন শুধু গুরুত্বপূর্ণ কথাই বলবেন? আপনি চাইলে অগুরুত্বপূর্ণ কথাও বলবেন। আমি হাসিমুখে সব শুনবো। আপনি বলবেন,‘তিতলি এবার আলুর ফলন ভালো হয়নি।’আমি মজা নিয়েই শুনবো। ওসবও ডায়রিতে লিখবো।”

মনে মনে এসব বললেও তিতলি মুখে বলল,“বলুন।”

_“তুমি ,আমি না বলা পর্যন্ত বাসা থেকে বের হবেনা। একটা ঝামেলার মধ্যে পড়তে চলেছি আমরা দু’জন।”

“আমরা দু’জন!” কথাটা তিতলির মনে ধরেছে। বিড়বিড় করলো,“দারুন তো! জি আমরা দু’জন। হোক ঝামেলা। কিন্তু সেই ঝামেলাতেও কেবল আমরা দু’জন থাকবো!”

_“শুনছো?”

আফিফ ডেকে উঠতেই গা ঝাড়া দিলো তিতলি,

_হু। জি আচ্ছা। বের হবো না। কি ঝামেলা? কি ঝামেলায় পড়েছি আমরা দু’জন?

_“শিহাবের লোকজনকে চেনো? গুজি বাবু, চেইন হৃদয়, মোটা মামুন। এদের মধ্যে কেউ তোমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেই আমাকে জানাবে। একটুও দেরি নয়!”

_“কেন?”

_“আমি থানায় গিয়ে স্বীকারোক্তি দেবো। পুলিশকে।”

_“কেন?”

_“হঠাৎ জন্মালে নাকি? নয়া বাজারে লাশ পাওয়া গেছে খবর পাওনি? সেই ভদ্রমহিলা,আমার দোকানে কাল এসেছিল যে। শিহাব যাকে হুমকি দিয়েছিল আমাদের সামনে। দেখোনি?”

ঝটকা একটা জোরসেই খেয়েছে তিতলি। শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেছে শীতল স্রোত। ওড়না চেপে কপালের ঘাম মুছে বলল,

_“এই ঝামেলায় জড়িয়ে আপনার লাভ? না করলে হয়না? খামোখা একদম! ভাবীরা শুনলে কান্নাকাটি শুরু করে দেবে কিন্তু!

_তোমার কি মাথা গেছে? আমি ওভাবে সম্পৃক্ত হবো না। বোকা নাকি আমি? আমার জীবনের মায়া আছে। দেখি কায়দা করে যদি পারা যায়। ভাবগতিক বুঝতে হবে তো। তোমাকে কি বলেছি সেটা মাথায় রেখো,আমি বলা না পর্যন্ত বেরিয়ো না। বোঝা গেছে?

চলমান……

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন