#ও_যে_মানে_না_মানা
#পর্ব_১০
#ইসরাত_আরা_ইতি
বিয়ে লেগেছে দুই বাড়িতে। সৈয়দ ভিলা আর মাহবুব মুন্সির বাড়িতে। কিন্তু বিয়ের তোরজোর শুরু হয়েছে গোটা পাড়ায়। আফিফ ছেলেপুলে খাটিয়ে পাড়ার সব রাস্তা পরিষ্কার করে প্লাস্টিকের ফুল দিয়ে দু’পাশ সাজিয়ে ফেলেছে। ঐ যে বড়ো রাস্তার শেষমাথা,সেখান থেকেও পথচারীরা দেখে যাচ্ছে,“তিতলি-আফিফের বিয়ে” লেখা পোস্টারটা। যদিও আফিফ ঠিক করেছিল খুব বড়ো কোনো অনুষ্ঠান হবে না, বিয়ের জন্য তুলে রাখা খরচার টাকাটা এতিম খানাতে দিয়ে দেবে। কিন্তু শেষটায় মত বদলেছে খানিকটা। খরচা আরো কিছুটা বাড়িয়ে এতিমখানায় দেওয়ার পাশাপাশি অন্তত পাড়ার সব লোক আর কাছের দূরের আত্মীয় স্বজনদের খাওয়াতে হবে। তাদের এড়িয়ে বিয়ে করা যাবে না। বিপদে আপদে সবাইকে সবসময় কমবেশি পেয়েছে আফিফ। তাই তাদের অতটুকু খুশি রাখতে ছোট মোট অনুষ্ঠান পাতাতে বাপ্পি কেটরিংয়ে শ’সাতেক লোকের বন্দোবস্তের ফর্দ দিয়ে এসেছিল দু'দিন আগে।
নিজের ছেলেপুলে খাটিয়ে পাড়ার বড়ো মাঠে করেছে সবটা আয়োজন। সবটাই একা হাতে করছে আফিফ। দু'জন মামা এবং ভগ্নিপতিরা রয়েছেন সাথে অবশ্য। কিন্তু বিগত দু'দিন ধরে বড়ো ডলাটা যাচ্ছে বরের পিঠেই। গোরু বাজারে যাও,গোরু বাছো, পাত্রীর জন্য নতুন বাজার করো, বিশেষ অতিথিদের বাড়িতে গিয়ে বলো। কনের শপিং গুলো অবশ্য করেছে আফিফের দু'জন মামী। আফিফ কেবল নির্দেশনা দিয়েছে।
_“ভাইয়া ঠান্ডা পানি দেবো?”
রুমকি বেজার মুখে সামনে এসে দাঁড়াতেই আফিফ চোখ তোলে। হাতে তার গোরুর গোস্তের হিসেবটা। আস্ত গোরু না এনে সদর থেকে প্রথমে ত্রিশ কেজি এরপর আরো পঁচিশ কেজি আনা হয়েছে,আরো আনা হবে ত্রিশ কেজি। খাসি দু'টো বাড়ানো হবে। আফিফের মনোযোগ সেই টাকার অংক থেকে সরল। গায়ে একটা সফেদ পাঞ্জাবি ছিল,ঘামে ভিজে শরীরের সাথে লেগে আছে। পুরোপুরি বিধ্বস্ত অবস্থা। বোনকে বলল,
_“এনে দে। খাই। একটু লেবু চিপে দিস সাথে। তোর এমন অবস্থা কেন মুখের?”
_“কি অবস্থা?”
রুমকি পায়ের নখে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে জানতে চায়। আফিফ হিসেবের খাতাটা হাত থেকে সরিয়ে রেখে বলে,“পুরনো জামা পড়ে আছিস। সেজেগুজে থাক! নতুন জামা কিনে দিইনি?”
_“সেজেগুজে থাকার কি আছে?”
বলতে বলতে রুমকি ভাইয়ের দৃষ্টি মাপে একচোট। ধারালো-ঠান্ডা দৃষ্টি দেখে ওর আত্মা ভড়কে যাওয়ার যোগাড় হতেই মৃদু শ্বাস ফেলে বলে,“যাচ্ছি।”
বিয়ে উপলক্ষে বৌয়ের নতুন বাজার সদাইয়ের পাশাপাশি বাড়ির সব সদস্যের জন্য নতুন পোশাক কিনে দেয়া হয়েছে। বোনদের কারো মাঝে কোনো উচ্ছ্বাস নেই,তবুও ভাইয়ের ধমক খাওয়ার ভয়ে কিংবা তার মন রক্ষার্থেই গায়ে জড়িয়ে আছে ওসব। বাচ্চারা মামার কিনে দেওয়া জামা পরে সৈয়দ ভিলার উঠানে ছোটাছুটি করছে।
দুপুরের রোদটা তখন মাথার ওপর তেতে উঠেছে। বাড়ির উঠানে পর্দা ঘেরা জায়গাতে পাড়ার কিছু চাচী,ভাবীরা বসে গীত গাইছেন গায়ে হলুদের। বিয়ের মূল অনুষ্ঠান পাড়ার বড়ো মাঠে হলেও হলুদটা হবে এখানে। আফিফ নিজের বাড়ির উঠানে একটা শামিয়ানা টাঙিয়ে দিয়েছে। হিসেব সামলে তিনতলায় উঠে ঘরের ভেতরে থেকে এক চক্কর ঘুরে আসে ও। এর মাঝে মাহবুবের কল আসে। রিসিভ করে জানতে চায়,“ওদিকে সব ঠিকঠাক?”
_“কাজই নেই তো কোনো। সব বিউটি চাচী একাই করছেন।”
_“আচ্ছা। তুমি তবে ফারিয়াকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাও। ওর শরীরটা ভালো না দেখলাম। টাকা লাগলে আমি দিচ্ছি।”
_“আজ থাক। সে যেতে চায়না। সকালে সেধেছিলাম।”
একটু থেমে থেকে আফিফ প্রশ্নটা করে,“তিতলি কি করে?”
_“বসে আছে মুখ আন্ধার করে। ফোনটা দেবো?”
_“না। আমার কথা বলার দরকার হলে আমি নিজে কল করবো ওর ফোনে। রাখছি। পার্লার থেকে লোক আসবে বিকেলে। রেডি হলে ওকে প্যান্ডেলে নিয়ে এসো। কোনো অসুবিধা হলে জানিয়ো।”
_“মানুষ অনেক কথা বলছে,আমাদের বাড়ি থেকে কেন অনুষ্ঠান হচ্ছে না এটা নিয়ে। প্যান্ডেলটা এখানে টাঙালেই পারতেন ভাইয়া।”
_“বিয়ে বাড়ির ঝক্কি সামাল দেওয়ার মতো শক্তি আমার বোনের গায়ে নেই। আমি যা করেছি ফারিয়ার ভালোর জন্য,যাতে চাপ কম যায় ওর ওপর থেকে। সবটা পাড়ার ছেলেপুলে সামলে নেবে। আমি তো ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট লাগাতেই চেয়েছিলাম,মাঝপথে ভেবে দেখলাম ঐ টাকায় আরো এতিম খাওয়ানো যাবে। পাড়ার ছেলেপুলে,সৌভিক তো সবটা সামলে নিচ্ছেই বিনা বেতনে। মানুষ কত কথাই তো বলছে,একটা একটা করে সব গায়ে লাগালে এই বিয়েটাই তো হতো না!”
কলটা কেটে বোনদের খুঁজতে খুঁজতে গেস্টরুমে উঁকি মেরে দেখলো সবাই ওখানটায় বসে আছে। আফিফের নানী জুলফা পঁচাশি বছরের বৃদ্ধা। পান ছেঁচে মুখে পুরে আলাপ করছিলেন বিয়ের আয়োজন নিয়ে। আফিফকে দেখেই বললেন,“সক্কাল ব্যালা খবর শুনলাম, তোগো এইখানের দফাদার বাড়ির নিজাম মাছ দিতে আইসা কইলো, ঐ এলাকার সবাই জানে তুই আর তিতলি ভাইগা গেছিলি। এইগুলা কেমন কথা?”
_“কানে নিয়ো না। একটা ঘটনা ঘটলে গন্ধ সরতেও মাসখানেক লাগে।”
_“তুই বুঝি বদনামের ডরে বিয়া করতেছিস?”
_“না।”
_“তো? মেয়েটারে তোর এতো পছন্দ হইয়া গেল আচুম্বা? [ হঠাৎ করে ]”
এই প্রশ্নটা ঘুরে ফিরে,বিগত সপ্তাহখানেক ধরে তাকে রোজ করা হচ্ছে। আফিফও রোজকার মতো বেশ ধৈর্য নিয়ে জবাব দেয়,“হঠাৎ করেই দেখলাম পাত্রী উপযুক্ত। অপছন্দ করার তো কিছু নেই। আমার জানা শোনা আছে, ছোট থেকে দেখছি। নম্র ভদ্র। এটা প্লাস পয়েন্ট।”
ফারিয়াও আজ সকালে এ বাড়িতে এসেছে, যাবে ও বাড়িতে হলুদের সময়। ভাইয়ের কথাবার্তা শুনে মুখটা ঘুরিয়ে নেয় অভিমানে। আফিফ ব্যাপারটা লক্ষ্য করে সামান্য হেসে নিজের আলমারি খুলে নগদ কিছু ক্যাশ বের করে আসমাকে বলল,“এটা ছাদে গিয়ে জুলহাসকে দিয়ে আয়। ও মাছ আনিয়েছে। মাছের হিসাব ওর কাছে।”
আসমা মাথা নিচু করে টাকাটা নিয়ে চলে যেতেই জুলফা বললেন আবার,“বাপ রে। নতুন বৌ আনতে তো তোর পাড়াপাড়ির শ্যাষ নাই রে। মনে বুঝি আনন্দ ধরে না?”
_“জি না। ধরছে না।”
_“তো নাচোস না ক্যান?”
_“আমার হয়ে তুমি একটু নাচো! আমার হাতে অনেক কাজ।”
জুলফা গম্ভীয় হয়ে বলে,“মাইয়া সুন্দর,চলে আরকি। ছয়ছোট্টো, গোলগাল। সবই ঠিকঠাক। তয় বুইনেগো অপছন্দ হওয়া সত্ত্বেও তোর এই মাইয়া ঘরে তোলা উচিত হয়নাই।”
নানীর কথার জবাব না দিয়ে আফিফ আবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে ফারিয়াকে দেখে। ধীরপায়ে এগিয়ে এসে ফারিয়ার মাথায় একটা হাত রেখে নরম করে জানতে চায়,“ডাক্তার ডাকবো? শরীর খারাপ?”
_“না। ঠিক আছি।”
মুখটা ওদিকে ঘুরিয়ে রেখেই গমগম করে ওঠে ফারিয়া। আফিফ মাথা থেকে হাতটা সরিয়ে নিয়ে বলে,
_“তো, ঠিক থাকলে ও বাড়িতে গিয়ে মাহবুবকে হেল্প কর। এখানে এভাবে বসে থাকার তো কিছু নেই। যাওয়ার সময় ইলিশ মাছ ভাজা নিয়ে যা বাটি ভরে। শরীর খারাপ নিয়ে তোকে আর প্যান্ডেলে ঢুকে খেতে হবে না দুপুরে।”
নতুন পাজামা পাঞ্জাবি আর তোয়ালে বের করে উঠানে নেমে আসে আফিফ। সৌভিক,দু'জন কাজিন, তিনজন ভাড়াটিয়াসহ ব্যাটাছেলে গুলো ওকে ইচ্ছেমত হলুদ মাখিয়ে পেছনের পুকুরে নিয়ে পানিতে চোবাবে বলে প্রস্তুতি নিচ্ছে, লুঙ্গিতে কাছা মেরে দাঁড়িয়ে আছে ওরা। আফিফ দেখেই বলল,“আসছি আমি। আমারো জীবনে নিজের হলুদে ভাই ব্রাদারদের সাথে আছড়া আছড়ি করার খুব শখ ছিল। আগে একটা কল করে আসছি। দাঁড়া।”
জানালা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল তিতলি। ওর বিষন্ন দু’টি চোখ বাইরের টিউবওয়েলের ওখানটায়। ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে ওখানটায় হলুদ গোসলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ বাড়িতে ভিড় কম। সবাই প্যান্ডেলে আনন্দ করছে। কখনো সাউন্ড বক্সে সানাই বাজছে, কখনো বাজছে সাজান সাজান গানটা। কখনো এসে এনায়েত কাকা ছেলে পুলেদের ওপর চটছেন,“এই গান বাজনা বন্ধ। আফিফ বলেছে,গান বাজনা বন্ধ করে নাচতে।”
এখান থেকে শুনতে পাচ্ছে তিতলি। ঘরের ভেতরেও মাহবুবের গজগজানি চলমান। নিচু গলায় রাগ ঝারছে তিতলির ওপর,“ঢঙের আর শেষ সীমা রইল না। ঢং। বিয়ে করবে না তিনি। বিয়ে করবে না। উনি শরীর ভর্তি অসুখবিসুখ নিয়ে বুড়ি হবে। পারলে আফিফ ভাইয়ের মতো একটা পাত্র যোগাড় করে দেখা, তারপর তোর এইসব দেমাগ দেখাস। পুরো দশ কান্দা আলোড়িত হয়ে গেছে, আফিফের সাথে ভেগেছিস তুই,এই খবরে। এবার একটু নিজের দেমাগে ক্ষান্ত দে! কি হয়েছে ফারিয়ারা অমন বলেছে? তোর গা থেকে চামড়া খুলে তো নিয়ে যায়নি! ওরা অপবাদ দিলো আর তুই তাবিজ টুকানি মেয়ে হয়ে গেলি?”
মাহবুবের মতো চিল্লাচিল্লি করার ইচ্ছাশক্তি নেই তিতলির। নিস্পৃহ গলায় জবাব দেয়,“বিয়ে টা তো হচ্ছে! এখনো এতো কথা শোনাচ্ছো কেন?”
_“তুই মুখটা এমন করে রাখিস কেন? পাড়াপড়শিরা আসছে যাচ্ছে। সবাই কি ভাববে? ন্যূনতম বিবেচনা বোধ নেই তোর?”
_“না নেই। তোমার তো আছে বিবেচনা বোধ। সারাজীবন কত বিবেচনা বোধ দেখালে এই সংসারে। তাতেই হবে।”
জবাব দিয়ে মুখটা ঘুরিয়ে নেয় তিতলি। হাতের মুঠোয় ফোনটা বাজছে, আফিফের কল। যদিও তিতলির সবটা অসহ্য লাগছে,তবুও কলটা রিসিভ করে ক্ষীণ স্বরে বলল,
_“হু।”
_“একটা শাড়িতে নাকি সামান্য ছেঁড়া দেখা গেছে খবর পেলাম? লোক যাচ্ছে,দিয়ে দে। ওটা চেঞ্জ করে আনবে বধূয়া শাড়ি বিতান থেকে।”
_“প্রয়োজন নেই। সামান্য তো। বোঝা যায়না।”
_“লোক যাচ্ছে। দিয়ে দিস শাড়িটা,পাল্টে আনিয়ে দেবো।”
খট করে কেটে দিল ফোনটা। যেন কোনো ব্যাপারেই আর তিতলির বক্তব্য শোনার প্রয়োজন নেই, বুঝিয়ে দিল আবার। তিতলি চুপচাপ হাতের ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকে। বুকের মধ্যে অঙ্কুরিত বিস্ময়ের বীজটা ফুটে আরো খানিকটা বাড়ে। আশ্চর্য ত্যাদোর লোক তো! এর সাথে সংসার কিভাবে করবে ও!
▪️▪️▪️
বিয়ে পড়ানো হবে সন্ধ্যার পরে। বিকেলে গায়ে হলুদ হয়েছে। তিতলিকে হলুদে চুবিয়ে ডলে ডলে গোসল করিয়ে দিয়েছে বাসন্তী কাকী। ওর গায়ে এখন জড়ানো টকটকে কমলা একটা শাড়ি আর মাথায় গামছা। হাতে এখন মেহেদী লাগিয়ে দিচ্ছে পার্লারের আপা। চুপচাপ বসে আছে তিতলি, দৃষ্টি অবশ্য ফারিয়ার মুখেই। যে অদূরে বসে নিজের নানী শ্বাশুড়ির পান ছেঁচে দিচ্ছে। বিয়েতে তিতলির নানী মোর্শেদাও এসেছেন দুপুর নাগাদ। ফারিয়ার সাথে কতক্ষণ পর পর দৃষ্টি মিলছে তিতলির, আবার সরে যাচ্ছে। সারাদিন বেশ কয়েক ঘণ্টা এমন করে লুকোচুরি করে কাটানোর পরে,যখন পার্লার আপা বিদায় নিতেই ঘর ফাঁকা হলো, ফারিয়া উঠে দাঁড়িয়ে তিতলিকে দেখলো নিস্প্রভ চোখে,গলাও নির্বিকার তার,বলল,“কিছু কিছু মানুষের কপাল এতো ভালো হয় তিতলি বুঝলে। এরা যা কিছুর যোগ্য না, সবকিছু এদের পায়ের কাছে এসে পড়ে থাকে। যাকগে, সবটাই আল্লাহর ইচ্ছা। তার ইচ্ছে যদি হয় বাদর মুক্তার মালা পড়বে,তবে পড়ুক।”
তিতলি জবাব হারিয়েছিল ক্ষণিকের জন্য,এমন অপমানে ওর বুকটা এতটাই চুপসে গেছিল যে মিনিটখানেক কিছু ভাবতে পারেনি। নয়তো তিতলি ছেঁড়ে দেওয়ার পাত্রী নয়। ওর জবাব দেওয়ার আগেই ফারিয়া আবার বলল,“উহু,এখন বোলো না,আমরা যখন এতই খারাপ ছিলাম তাহলে ভাইয়াকে ছেড়ে গেলে না কেন? ঐ এক কথা আর বোলো না। তবে শুনে রাখো,এই গল্পে তুমি আর তোমার ভাইয়া বাঁদরই। শুভকামনা তোমার জন্য। আজকে থেকে হয়তো তোমাকে ভাবী ডাকতে হবে। ডাকবোও। ভালো থাকো।”
ফারিয়ার মুখটা লাল হয়েছে। তিতলিরও অমন। ইচ্ছে করছিল গায়ের বেনারসী টেনে টেনে খুলে সব লণ্ডভণ্ড করে দিতে। ও বাঁদর নয়। ও তিতলি। কিন্তু পারেনি, রাগটা দুম করে চোখের পানি হয়ে নেমে গেছে গাল বেয়ে যখন মাহবুবের গলা পেয়েছে বাইরে,“এই তিতলিকে নিয়ে আসো কাকী। ওদিকে কাজী আসছে। আফিফ তাড়া দিচ্ছে।”
এই আজ সকালেই,তিতলি যখন ঐ সংসারে ঢুকবে না বলে জেদ ধরে বসেছিল তখন মাহবুব ওকে গালি দিয়েছিল,“গর্দভের বাচ্চা। রুগুইত্তা মেয়ে কে বিয়ে করতে চায়? আফিফ ভাইয়া চাইতেছে। নিজের ভালো তো পাগলেও বোঝে! গর্দভের বাচ্চা গর্দভ।”
ভাইয়ার গালি শুনে তখন না কাঁদলেও,তিতলি এখন কাঁদলো। এরপর তিতলি চোখের পানি মুছে কতক্ষণ হাঁপিয়ে নিয়ে শক্ত হয়। ও খাঁটো,ও দেখতে অতি সাধারণ চেহারার,গালে ব্রণের দাগ আছে,হাত পায়ের আঙ্গুল সুগঠিত নয়,নিছক সাদামাটা এক মেয়ে। কিন্তু ও বাদর নয়। ও তিতলি। এবং ও অবশ্যই গর্দভ নয়। নিজের ভালো ও অবশ্যই বোঝে। সবাই,যারা তিতলির ভালো করার নামে এই অপমানের বিয়েটা তিতলির গায়ে চাপিয়ে দিলো আজ। সবাইকে মনে রাখবে তিতলি। ভাইয়াকে,আর ঐ সৈয়দ ওয়াহিদুল আফিফকেও।
বৌকে মাগরিবের পরে নিয়ে আসা হয়েছে বিয়ের প্যান্ডেলে। এখানে খাবারের ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বর বৌকে বসিয়ে বিয়ে পড়ানোর জন্য আলাদা একটা হলঘরের মতো জায়গা বানিয়ে পর্দার ব্যবস্থা করা হয়েছে,নিচে আবার ঘাস কার্পেট বিছিয়ে দেয়া। ভীষণ পরিপাটি মহল। বিয়ে পড়ানো শেষ হলেই খেতে বসিয়ে দেবে এমন অবস্থা তখন। এশার নামাজের পরে বৌ যাবে স্বামীর ঘরে। অতিথি আপ্যায়নে গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছে মাহবুবের ভায়রা ভাই দু'জন, আসমা আর ফারজুর বর। আফিফ ততক্ষণে একটা সাদা শেরোয়ানি পরে গিয়ে কাজীকে রিসিভ করতে সেখানটায় দাঁড়িয়েছে। এই শেরোয়ানিটা মাহবুব দিয়েছে। ছিমছাম দোহারা চেহারার সাথে সাদা রংটা খুব মানায়। ফারজুর বর বশির আফিফকে দেখেই বলল,“ছেলেপান গেইট ধরবে না ভাইয়া? আপনি তো একদম বৌকেই নিয়ে এসেছেন বাড়ি থেকে। গেট কিভাবে ধরবে? মানুষ আপনাকে ফাঁকিবাজ বলবে।”
_“সারাদিন সব তদারকি করতে গিয়ে ক্লান্ত আমি। তিতলির বান্ধবীদের ডেকে সৌভিক সমঝোতা করে একটা এমাউন্ট দিয়ে দেবে। টাকা ওর কাছে দেয়া আছে।”
বলতে না বলতেই তিতলিকে নিয়ে ওর সব বান্ধবীরা হাজির প্যান্ডেলে। লাল বেনারসী গায়ে জড়িয়ে লাল টুকটুকে একটা বৌ। কপালের অর্ধেকটা ঢাকা পড়েছে লাল দোপাট্টার আড়ালে। ঠোঁটের লিপস্টিকটাও লাল। মুখে ভারী মেইকআপ নেই, কিন্তু পরিপূর্ণ বৌ সাজ, থুতনিতে কালো এক তিল এঁকে দেয়া হয়েছে সৌন্দর্য বাড়াতে। বেড়েছে বৈকি। আফিফ কথা থামিয়ে চেয়ে আছে চুপ হয়ে। তিতলিও চেয়ে আছে। এরপর তিতলি চোখ নামিয়ে নিতেই আফিফ সংযুক্তাকে বললো,“মুরব্বিরা আসছে। ওকে নিয়ে গিয়ে পর্দার ওপাশে বসো। তোমাদের ব্যবস্থা ওপাশে। আমি ফ্যান ছেড়ে দিচ্ছি। ওখানে লাইন দেয়া হয়নি এখনো।”
অতিথিরা এক এক করে সব চলে আসায় গমগম করছে এপাশের প্যান্ডেল। আফিফ নির্দেশ দিতেই প্রথম দফায় খেতে দেয়া হয়েছে। ওপাশ থেকে তখন খবর এলো ফ্যান অন হচ্ছেনা। নতুন বৌ ঘেমে নেয়ে অস্থির।
আফিফ মুরব্বিদের পাশে বসে কাজীর সাথে আলাপে ব্যস্ত তখন। উঠে দাঁড়িয়ে বলল,“ফ্যান অন হবে না কেন? লাইন পায়নি? সৌভিককে ডাকো,ইলেকট্রেশিয়ান ডাকো!”
সৌভিক গেছে একটা কাজে। এখন ইলেক্ট্রেশিয়ান ডাকা মুশকিল হয়ে যাবে। আফিফ শেরোয়ানির দু হাতা গুটিয়ে নিয়ে জবরুলকে বলল,“একটা টেস্টার নিয়ে আয়। দফাদার কাকার ঘরের মেইন সুইচ অফ করতে বল। এখানকার লাইন ওখান থেকে টানা হয়েছে। আমি দেখছি। স্কচ টেপ আর স্ক্রু ড্রাইভারও লাগবে একটা।”
_“তুমি কারেন্টের লাইন ঠিক করবে?”
_“কেন? আমি তো প্রবাসে এসব করেই কামাই করেছি। এসব করলে আমার মানসম্মান চলে যাবে?”
_“তা না, আজ তো তোমার বিয়ে।”
_“আরে সবই করবো এক এক করে। রিল্যাক্স। গরমটা আসলেই সহ্য করা যাচ্ছে না। ইলেক্ট্রেশিয়ান ডাকার টাইম নেই। ও আসতে আসতে বৌ অজ্ঞান হবে।”
মেয়েদের দল বরের কথাবার্তা শুনে হাসছে। কেউ কেউ তো ভিডিও করতে শুরু করেছে, শেরোয়ানি পরে বর বৈদ্যুতিক লাইন ঠিক করছে,যাতে বৌয়ের গরম না লাগে তাই।
আফিফ যন্ত্রপাতি হাতে পেয়ে এপাশে এলো,সবাই মোবাইলের আলো জ্বেলে আলো দিচ্ছে ওকে। সেই আলোতে আরো একবার তিতলির মুখটা দেখলো আফিফ। সত্যিই ঘেমে লাল হয়ে আছে কিন্তু কোনো উত্তাপ নেই। বসে আছে শক্ত হয়ে। আফিফ বড্ডো ধীরে সংযুক্তাকে বলল,“বাতাস করো ওকে।”
তিতলি চোখ তুলেছে আবার। আফিফ ঠিক ওর পাশে দাঁড়িয়েই লাইন ঠিক করছিল। হঠাৎ বলল,
_“মোহরানা কত বাঁধবো?
_“এটাও ভাইয়ার থেকে জেনে নেন,আমাকে জিজ্ঞেস করছেন কেন?”
তিতলির গলার ধার ঠের পেয়ে আফিফ নিঃশব্দে হাসে। স্ক্রু ড্রাইভারের সহিত সুইচটা খুলতে খুলতে বলে,“তিন লাখ দেবো। তুই চাইলে আরেক লাখ বাড়াবো। চাস?”
তিতলি মুখ ঘুরিয়ে বসে থাকে। জবাব দেয়না। আফিফ সুইচটা ঠিক করে হাত ঝেড়ে বলল,
_“আচ্ছা। মৌনতা সম্মতির লক্ষণ। তবুও ভেবে বল, পরে যেন আমি কথা না শুনি যে আমি মোহরানায় ঠকিয়েছি তোকে। তাহলে খবর আছে!”
_“ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করেন। আমি এসব ব্যাপারে বুঝি কম।”
_“তোর ভাইয়া সব বোঝে?”
_“বোঝার কথা।”
আফিফ মুখ ঘুরিয়ে তাকালো। একটু থেমে থেকে বলল,
_“তাহলে তোকে আমার সাথে বিয়ে দেওয়ার ডিসিশনটাও মাহবুব বুঝে শুনেই নিয়েছে। ওর ওপর রাগ রাখিস না। বিয়েতে জোরজবরদস্তি আমি করছি। আমার ওপর রাগ দেখা। তোর যত রাগ আছে। আমাকে দেখা। আমি জোর করে বিয়ে করছি তোকে। মাহবুবের ওপর খামোখা রাগ জমিয়ে রাখিস না।”
তিতলি কথা বলে না আর। নখ দিয়ে হাতের নখ খুঁটতে ব্যস্ত সে। পাখা চারটা চলতে শুরু করেছে। আফিফের মুখচোখ অস্থির।
_“এই আসমাদের ডাক কেউ এখানে। গরম তো ওদেরও লাগছে। শিগগির ডাক।”
লোকটা একটু জিরোচ্ছে না। কখনো একে ডেকে বলছে,“এই খাবারের দিকটা দেখ।”
কখনো ওকে ডেকে বলছে,“এই ছেলেদের এপাশে আসতে বারণ। এই ঘর মহিলাদের। নতুন বৌ এখানে। আর ফারজুদের ডাক। বাইরে হাঁটাহাঁটি করার দরকার নেই,ফ্যানের কাছে এসে বসুক।”
এরপর খানিকটা স্থির হয়ে তিতলির কাছে জানতে চায়,
_“মাহবুব বেশি গালাগাল করেছে তোকে?”
_“আপনি শুনে কি করবেন?”
_“সত্যিই কিছু করার নেই। তুই আমার বৌ হোসনি এখনো। মাহবুব তার বোনকে কিভাবে বকবে এটা ওর ব্যাপার। তুই আমার বৌ হলে কিছু বলতে পারতাম।”
সৌভিক ততক্ষণে এসে পড়েছে,আফিফকে মহিলাদের প্যান্ডেলে দেখে বলল,“আরে বিয়ের আগে এত কি কথা তোমাদের? কাজী ডাকছে। এসো।”
আফিফ অল্প হেসে বলে,“চেয়ারগুলো টেনে এনে পর্দার ওপাশে সেট কর। সে তো যাবেনা ওপাশে। কিন্তু তারও তো শোনা উচিত কি কথা বলছি আমরা। যদি তাকে ঠকিয়ে দিই?”
আফিফের মশকরায় বাকিরা হাসলেও তিতলি নিস্পৃহ। ওর নখ খোটা চলমান।
তেমনটাই করা হয়েছে। চেয়ারগুলো এনে পর্দার ওপাশে সাজিয়ে রাখা হলো। মুরব্বিরা এসে জায়গা দখল করলো। তবে কাজী সাহেব বিয়ে পড়াতে শুরু করেছে যখন, ওপাশে খাওয়ার প্যান্ডেল থেকে আওয়াজ এলো দই পাচ্ছে না।
আফিফ উঠে দাঁড়াল,“দই পাচ্ছে না মানে। মোজ্জাম্মেল কাকার বারান্দায় সব রাখা। কি আশ্চর্য,শান্তিতে বিয়ে করতেও পারবো না নাকি। সকাল থেকে খেটেই যাচ্ছি খেটেই যাচ্ছি। এখন দই খাদিমদারদের হাতে ধরিয়ে দিতে হবে? আহাম্মক কেটরিং।”
মুরব্বিরা বরের রাগ দেখে হাসছেন। এপাশে মেয়েরাও তাই। তিতলি চুপচাপ শুনছে সব। কবুল বলার সময়ও ও বেশ সংক্ষিপ্ত হয়ে থাকলো। বুকের মধ্যে জমিয়ে রাখা এক সমুদ্র আবেগকে ওভাবে জমাট রেখেই, যখন কাজী আওড়ালো,সাড়ে চার লাখ নগদ উসুলে তোমাকে বিয়ে করতে চাচ্ছেন সৈয়দ ওয়াহিদুল আফিফ। তুমি কি রাজি?” তিতলি খুব ধীরেই বলে দিলো,“কবুল।”
দোয়া চাইতে মোনাজাতের হাত উঠেছে লাইন ধরে। তিতলি কবুল বলার পরে একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছিল,ওর ঘোর কাটলো কাজীর ভারী গলায়। কাজী দোয়া পাঠ করছে,“ইয়া আল্লাহ, পাত্র পাত্রী উভয়েই এতিম। তারা যাতে আজীবন একে অপরের সাহারা হয়ে থাকে সেই রহমতের শামিয়ানা এদের মাথার ওপর আপনি সর্বদা রেখে দিয়েন। আমিন।”
রাতের খাবারের পরে বর বৌ বিদায় হয়েছে ঐ প্যান্ডেল থেকেই। বিদায়ের সময়ে তিতলি ভাইয়ের কাছে ঘেষেনি খুব একটা। সামান্য ক’টা পোলাও খেয়ে উঠে পরার পরে ওর নানী আর নানী শ্বাশুড়ি এসে হাতটা টেনে আফিফের হাতের মুঠির মধ্যে ভরে দিয়েছে যখন এরপর ওভাবেই হেঁটে চলে গেছে শ্বশুর বাড়িতে,স্বামীর ঘরে। যেটা সৈয়দ ভিলার তিনতলায়। আসমা,ফারজু আর রুমকি বিয়ে বাড়িতে থেকে যাওয়া সব নিকটাত্মীয়দের ঘুমানোর ব্যবস্থা করে দিতে একটু আগেভাগেই ফিরেছিল। গোটা ফ্ল্যাটের মেঝেতে অবধি ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিছানা পেতেছে। এরপর এসে ভাইয়ের ঘরটাও সাজিয়ে রেখেছে তাজা ফুল দিয়ে। যতই নিজেদের খারাপ লাগা থাকুক। ভাইয়ার আনন্দ মাটি করতে মন সায় দিচ্ছিল না ওদের কারো। এরপর যে যার রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। ফারিয়া ওই বাড়িতে আর যায়নি,নিজের ঘরে গিয়ে ফ্যান ছেড়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েছে ঘুমের ওষুধ খেয়ে। মাহবুব পাশে গিয়ে শুয়ে হাতটা গায়ে রাখলে আর সরিয়ে দিলো না আজ। বরং ও শান্ত। যতক্ষণ না ঘুমালো, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে খুব কেঁদেছে।
মাহবুব উঠে বসে বলল,“সারাজীবন কতভাবে মাফ চাইলাম। দিলে না। না পারলে একটু সহজ হতে আমাদের সাথে। তোমার নিজের ক্ষতি তুমি নিজেই করে গেলে। অথচ জীবন সবাইকে দ্বিতীয় সুযোগ দেয় ফারিয়া। তুমি নাওনি। আমাদের শেষটা সুন্দর হলে কি ক্ষতি হবে?”
ফারিয়া জবাব দিয়েছে,
_“আমার স্পষ্ট মনে আছে, তুমি আমার শাশুড়ির কথা শুনে আমার চুল ধরে ঘরের মধ্যে ঠেলে দিয়েছিলে একদিন। আর ঐ মেয়েটাও ওখানে দাঁড়িয়ে ছিল। ক্যাবলার মতো ভাবীকে মার খেতে দেখছিল ভাই আর মায়ের হাতে।”
_“তিতলি ছোট ছিল। তাছাড়া ও মাকে ভয় পেতো প্রচণ্ড,তা তুমি জানো ফারিয়া।”
_“আমার চেয়ে মাত্র কয়েক মাসের ছোট ছিল। কচি খুকি ছিল না। যাক গে, আল্লাহ তোমাদের সুখ করতে দিয়েছে,আজীবন সুখ করে যাও। ভাইয়ার কাছে তো রানীর হালেই থাকবে তোমার বোন। দয়া করে আমার ভাইয়ের জীবনটা তছনছ করতে নিষেধ করো তোমার উচ্চশিক্ষিত ফটরফটর বোনকে। আর কিছু চাওয়ার নেই। গা থেকে হাত সরাও তুমি। ঘুমাতে দাও আমাকে।”
▪️▪️▪️
তিতলিকে বরণ করেছে ওর মামী শাশুড়ি এবং নানী শ্বাশুড়ি। আফিফের ঘরের বিছানায় বসিয়ে দিয়ে মিষ্টি আর দুধ খাইয়ে দিয়ে গেছে। তিতলির মামাতো জা এসে কানে কানে বলে গেছে কত কথা,যা নতুন বৌকে বলতে হয়,শেখাতে হয় এ রাতে। তিতলির ওদিকে কোনো মনযোগ নেই। আজ সারাদিনে প্রচুর মাথা ধরে ছিল,তাই একটা ওষুধ খেয়ে ফুল ছেটানো নরম বিছানায় শুয়ে শুয়ে বিশ্রাম নিয়ে নিলো ও। আফিফ ছিলো কেটরিংয়ের হিসেব চুকিয়ে দিতে ব্যস্ত, ড্রয়িং রুমে সৌভিকের সাথে কথা বলছে বেশ অনেকটা সময় ধরে। ঠিক রাত এগারোটায় ঘরে ঢুকে দরজা লাগাতেই তিতলি চোখ খুলে উঠে বসে পায়ের কাছের শাড়ি ঠিক করে নেয় নিজের। দু'জনের চোখাচোখি হলো আবার। তিতলি চোখ নামিয়ে মুখটা গম্ভীর করে ফেলে। এসে গেছে দয়াল বাবা সৈয়দ ওয়াহিদুল আফিফ। দ্য আলফা ম্যান। ধরে বেঁধে বিয়ে করে এখন এসে নিশ্চয়ই তিতলিকে নাটকীয় ভাবে বলবে ‘তোর যত ইচ্ছা সময় নে তিতলি। আমি আমার অধিকার ফলাবো না।’ গা টা তবে জ্বলে যাবে তিতলির আরো,এমন ন্যাকামি দেখলে।
হাস্যকর। অথচ তিতলি এই মানুষটিকেই চেয়েছিল, কিন্তু অন্যভাবে। এখন একে দেখে, পরিস্থিতি অনুভব করলে, কেবল মেজাজই গরম হচ্ছে। এর চারবোনের ওপর জমে থাকা রাগ সবটা এর মাথায় ঢেলে দিতে ইচ্ছা করছে।
আফিফ শেরোয়ানির গলার কাছের দু'টো বোতাম খুলে বিছানার একপাশে বসেছে,বাসর ঘরে তার বলা প্রথম বাক্যটা হলো,“অনেক খাটনি গেছে তাইনা রে?”
তিতলি চোখ নামিয়ে সহজ সুরে জবাব দেয়,
_“তেমন না। আমি তো বসেই ছিলাম সারাদিন। জার্নিও করতে হয়নি। আপনার বেশি গেছে খাটনি!”
_“হু। আর বলিস না, আমি একটু বেশি খুঁতখুঁতে নাকি মানুষ একটু বেশিই ঢিলা সেটাই বুঝতে পারি না। কারো কাজ পছন্দ হয়না,তাই সব নিজে গিয়ে করি। বুঝলাম না আসলে কি সমস্যা!”
_“সমস্যা হচ্ছে, আপনি একটু বেশিই পার্ফেক্ট।”
কথাটা মনে মনে জবাব দিয়ে তিতলি নিজের হাতের মেহেদীর দিকে তাকিয়ে থাকে। রংটা ফুটেছে বেশ। রং ফুটেছে তার মানে স্বামী অনেক ভালোবাসবে। তিতলির বান্ধবীরা তখন এটাই তো বলাবলি করছিল! কি জানি,ঠিক কেমন ভালোবাসাবাসি হয়! তিতলি আগ্রহী জানতে।
হাফ ছাড়ে আফিফ। গায়ের শেরোয়ানি এখন বড্ডো ভারি লাগছে। উঠে শেরোয়ানিটা পাল্টে সুতির পাজামা পাঞ্জাবী পরে মুখ হাত ধুয়ে এসে বসে আবার। আড়চোখে ফের তাকায় তিতলির চোখে। দু'জন খুবই সহজ যেন। তিতলির রাগটাও চাপিয়ে রেখেছে এখন,লোকটাকে দেখে ক্রমে ক্রমে মায়া লেগেছে তাই। আফিফ আবার এসে বসাতে তার গায়ের চন্দনের সুবাস মিশ্রিত পারফিউমের ঘ্রাণে মাদকতা এসে ঠাঁই নিলো তিতলির নীরবতায়। নীরবতার পর্দা কাঁপায় আফিফের গলা,“কি রে! কিছু বল?”
_“কি বলবো?”
বলতে না বলতেই তিতলি টের পায় ওর হাতের ওপর হাত রেখেছে আফিফ। এটা খুবই সহজ পদক্ষেপ হলেও, এইবার লোকটাকে খানিকটা নার্ভাস লাগছে। চোখ নামিয়ে আস্তে বলল,“কাল টাকা দিয়ে দেবো তোর।”
_“আচ্ছা! অসুবিধা নেই।”
হাতটা তিতলির হাতের ওপর থেকে সরে যায় আচমকা, এইবার উঠেছে তিতলির মাথায়,খুব ধীরে,বড্ডো নরম করে রেখে বলে যায় আফিফ,“তোকে সুন্দর লাগছে, মাশাআল্লাহ, সন্ধ্যা থেকে এখন অবধি একইরকম লাগছে। সাজটা সুন্দর হয়েছে। ইয়ে মানে,পড়ালেখা করতে চাইলে কর, চাকরির প্রিপারেশন নে ইচ্ছে করলে। যা ইচ্ছে কর। কিন্তু পাশাপাশি আমার সংসারটাও দেখিস। আমি অনেক বেশি সাপোর্টিভ হাসবেন্ড হয়তো হতে পারবো না, আমাকে বাইরে থাকতে হয় দিনের বেশিরভাগ সময়। কিন্তু তুই আমার টুকটাক ভুল ত্রুটি মানিয়ে নিয়ে ধৈর্য রাখার মত বৌটা হোস ইচ্ছে করলে। আমি স্বভাবত একটু কেমন জানি তিতলি, একটু বিরক্তিকর। তোর মাঝেমাঝে খারাপ লাগতে পারে, লাগলে আমাকে খুলে বলিস। আমার সংসারে ঝগড়াঝাঁটি পছন্দ না। আম্মা-আব্বার, চাচা-চাচীদের, বোন আর বোন জামাইদের ক্যাচাল দেখতে দেখতে ক্লান্ত। এটা একটু বুঝে চলিস। যেকোনো খারাপ লাগা আমাকে বলিস, কিন্তু ঝগড়াঝাঁটি নয়। আমার তর্কাতর্কি পছন্দ নয়।”
তিতলি একদম চুপ হয়ে গেছে। সম্মোহিতের মতো শুনে গেছে লোকটাকে। এরপর হুট করেই আবার পুরনো বিতৃষ্ণা টুকু ফিরে আসায় যখন ওর টনক নড়লো, তখন বড্ডো ক্ষেদ নিয়ে বলে দিলো,“বুঝলাম। কিন্তু আমারো একটা কথা, আমি আপনার বোনদের সাথে মিলে খেতে পারবো না। আমার কাছ থেকে এই আশাও করবেন না। তারা কথায় কথায় আমাকে অসম্মান করে। নিচু করে। বিশ্রী বদনাম করে। আমাকে যদি চুপ দেখতে চান তবে তাদেরও চুপ থাকতে বলে দিবেন। আমাকে বলতে এলে আমিও বলবো। আর হ্যাঁ, তারা আমাকে বলেছে, আমি নাকি আপনাকে তাবিজ করেছি।”
আফিফ নির্নিমেষ দেখে গেল তিতলির ক্ষোভাতুর মুখটা। বলল,
_“এসব আগে কেন বলিসনি? তোকে তো বারবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল,কি হয়েছে!”
একটু থেমে আবার বলল,“তুই চাইলে আমি এখন ওদের ডেকে সালিশ করতে পারবো! যদিও বেশি কড়া হতে পারবো না, কারণ আমার বোনদের আমি ভালোবাসি। কিন্তু তোর দেমাগের যেখানে যেখানে লেগেছে এটুকুতে অন্তত মলম লাগিয়ে দেয়ার মতো কিছু করতে পারবো। বল,ডাকবো?…
ও কথা শুনে তিতলি মুখটা ঘুরিয়ে ফিক করে হেসে ফেললো হঠাৎ। পরপর আবার পুরনো মেজাজে ফিরে বলে,
_“ঠেশ মেরে কথা বলেন কেন?”
_“তোকে নকল করি। তুইও তো এভাবেই বলছিস। নরমাল কথা কথা বলেই দ্যাখ। আমিও বলবো।”
তিতলি পা গুছিয়ে বসে, বিছানার ফুলগুলো পরিষ্কার করে বলে,
_“ওসব বাদ দিন, এই যে খামখেয়ালি করে,জেদ করে এই কাজটা করলেন,আমাকে বিয়ে করলেন। আমিও দেখতে চাই আপনি দুই পক্ষের মাঝে ইনসাফ কিভাবে করেন। আমি আপনাকে ভালোবাসি, তারমানে এই নয় যে সব পিঠ পাতিয়া মানিয়া লইবো।”
আফিফের দৃষ্টির স্থিরতায় তিতলি আরো কিছুক্ষণ বাঁধা পড়ে,ও আরো কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বলে,“আচ্ছা। এটা কি কোনো বণ্ডে সই করে দিতে হবে?”
হাসি পেলেও তিতলি মুখ শক্ত করে বলল,“না।”
দু'জন আবার কিছু সময়ের জন্য চুপ হয়। বাইরে মৃদু বেগে বাতাস ছুটেছে,সারাদিনের গরমের পরে খানিকটা প্রশান্তি। এবারের নিস্তব্ধতা ভাঙে একটা চুমুর শব্দে। আফিফ চুমুটা খেয়েছে তিতলির হাতে, এরপর তিতলির গালে। হঠাৎ, অপ্রত্যাশিত এই চুমুটা তিতলিকে আপ্লুত করলেও ও গুটিয়ে গেল একপাশে। চন্দনের সুবাসটুকু ঘন হয়ে চেপে ধরে মাথা। তিতলি বুজিয়ে থাকে চোখ। ধীরে ধীরে অনুভব করে খসখসে চোয়ালটা ওর গাল ছেঁড়ে দূরত্ব বাড়াচ্ছে। আফিফ যেমন করে কাছে টেনেছিল,তেমন করেই তিতলিকে ছেঁড়ে দিয়ে বলল,
_“তিতলি!”
স্থির হতে সময় নেয় তিতলি,
_“জি বলেন।”
_“কি ভাবছিস! শাড়ি পাল্টে আয়!”
_“ঠিক আছি এভাবেই।”
_“এভাবেই ঘুমাবি?”
_“হ্যাঁ।”
দু পক্ষের সংকোচ ঘুচাতে আফিফ তিতলিকে একটা স্বর্ণের চেইন দিলো পরিয়ে। এরপর হাতটা আবার রাখে তিতলির মাথায়,আমতা আমতা করে,“গিফট । আচ্ছা। নানী জান কিসব কথা যেন শিখিয়ে দিয়েছিল,তখন খেয়াল করিনি, টাকা পয়সার হিসাব নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। এসবে নাকি রহমত বাড়ে। তোকে দোয়া করে দিতে বলল এভাবে। তাই দিচ্ছি। সব নিয়ে ভালো থাক।”
আবেগের দলা পাকিয়েছে কন্ঠনালীতে। তিতলি ঢোক গিলে নিয়ে বলে,
_“আপনি তুই তুকারি বাদ দিন। আগে তো তুমিও বলতেন!”
_“আচ্ছা। সবটা গুলিয়ে ফেলছি। ভালো থাকো।”
_“নানী জান শিখিয়ে দিয়েছে তো আমাকেও, আপনার পা ধরে সালাম করতে। করবো এখন?”
_“নাহ।”
বলেই আফিফ বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে জানতে চাইলো,
_“ঘুম আসে না? না এলে কিছু বল। শুনি।”
তিতলি মুখ ঘুরিয়ে লোকটার নিশ্চিন্ত মুখটাতে দৃষ্টি রেখে বলল,
_“আমার মনে হচ্ছে আমি স্বপ্ন দেখছি। আপনি, এভাবে, আমার পাশে। কিন্তু খুব ভালো হতো যদি নিজে চাইতেন আমাকে। এভাবে বদনামের ভয়ে তড়িঘড়ি করে…! আর কিছু বলার নেই। সবাই বলছে আমি আপনাকে তাবিজ করেছি,এটা সবাই বলবেও আজীবন। কারণ হুট করে বললেন বিয়ে করবো…কখনো বিশেষ চোখে তো চেয়েও দেখেননি! এতটাই তুচ্ছ ছিলাম আমি!”
_“তো দেখিনি এটা আমার পাপ হয়ে গেল? কি করা উচিত ছিল আমার? তোকে চেয়ে চেয়ে দেখা উচিত ছিল,ওড়না সরে গেলে তোর শরীরে তাকানো উচিত ছিল? এভাবে একটা পরনারীর দিকে নজর দেয় সবাই। আমারো ওসব করা উচিত ছিল?”
তিতলি চুপসে যায় মৃদু ধমকে,
_“তা বলিনি। বিশেষ নজর মানে প্রেমের নজর। ছাড়ুন,ওসব আপনি বুঝবেন না।”
_“না। তুই বুঝা আমাকে! প্রেমের নজর আবার কেমন? লুচ্চামি আর ভদ্রতামির মাঝামাঝি অবস্থান?”
বলতে বলতে আরেকটা ধমক দিতেই তিতলি দাঁতে দাঁত চেপে নিলো,“ঝগড়া এবার আপনি করছেন।”
রাগে মুখটা ঘুরিয়ে নিতে চাইলো তিতলি,কাজ হলো না। আফিফ ওকে হ্যাঁচকা টানে বুকে এনে ফেলল অমনি। তিতলিকে একটু প্রস্তুতি নিতে সময়ও দিলো না কোনো। এবং এই রাতে,খুব সাংঘাতিক কোনো বর না হলেও অতি সাধু কোনো বর হয়ে থাকেনি আফিফ। কিছুক্ষণ খুবই রুদ্ধশ্বাস মুহুর্ত কাটে দু'জনের মাঝে, দু'জনের শরীরের মাঝে। তিতলির ঠোঁট ভিজে যায়। কপালের টিকলি হয় এলোমেলো। এলোমেলো হয় তিতলির শাড়ি। পুরো ঘটনায় হতভম্ব হয়ে বোকার মতো কাঁপছিল । ও নিজেকে ছাড়িয়ে নিতেই ভুলে গেছে। ঘোর কাটে আফিফের ধীর সুরে আওড়ানো কথায়,“আমার জানামতে বিশেষ নজরে বৌকে দেখতে হয়। এবং আমি ঠিক, তাইনা রে? আর চমকানোর কিছুই হয়নি। প্রেমটেম যারা না করে তারা বৌকে বিশেষ নজরে দেখার জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকে। এভাবে ধরার জন্যও। “সময় চাই,সময় চাই” বলে নাটক করা তোদের মেয়েদের কাজ। তোদের পেটের প্যাচ ওসব। আমি সহজ মানুষ,বুঝিও সহজ।”
তিতলি চোখ আর তুলতে পারেনা,খাবি খাচ্ছে ডাঙায় পরা পুটি মাছের মতো। ওকে ওভাবে কাঁপতে দেখে হেসে আগলায় আফিফ। কাছে টেনে দু'হাতে দু’গাল আগলে ধরে খুঁটে খুঁটে কিছুক্ষণ তিতলির মুখ দেখে,বলে,“তুই সুন্দর। আসলে দেখা উচিত ছিল, বিশেষ নজরে। লুচ্চামি আর ভদ্রতামির মাঝামাঝি নজর। কি আর করা।”
তিতলি কথা বলেনা। আফিফ অস্ফুটে বলে,“বল কিছু?”
সময় নিয়ে ধাতস্থ হয়,ঘোর থেকে বেড়িয়ে তিতলি কাঁপতে কাঁপতেই জবাব দিলো,“আপনি শোনার জন্য বিয়ে করেননি। জেদ করে ঘরে তুলেছেন। আপনিই বলুন আমিই শুনে যাই বরং…।”
হঠাৎ করেই টিকটিকি ডেকে উঠেছে ওপাশে। তিতলি থেমে গিয়ে শব্দটা অনুসরণ করে টেবিলে রাখা কাচের সোপিচে নজর বুলায়,“ওটার কি হলো!”
আফিফও মাথা তুলল,তবে বুক থেকে তিতলির মাথাটা সরতে দিলো না। আলতো হাতে চেপে ধরে রেখেই বলল,
_“কি জানি। হয়তো আমাদের আলোচনায় ঢুকতে চাইছে। তুই যেহেতু কথাবার্তায় তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছিস না।”
_“ওটা কাঁচে কিভাবে আটকে আছে দেখুন,পড়ছে না। মরা নাকি।”
_“এদের হাত পায়ে ভ্যান ডার ওয়াল ফোর্স থাকে, চামড়ার লোমের ভাঁজে ভাঁজে। এগুলো সব মিলে একটা গ্রিপ তৈরি করে। তাই আঁটকে আছে।”
লোকটার হাত দু'টো ওর চুলের মাঝে বিলি কাটে। তিতলি চুপ করে পড়েই ছিল বুকে। এরপর চোখ তুলে আফিফের ছাচা থুতনিতে দৃষ্টি রেখে বলে,“আপনি তো ম্যালা কিছু জানেন।”
_“ঠিক অতো না,খুব আগ্রহ ছিল এসবে। নিজে নিজেই ইন্টারনেট ঘাটতাম খুব,যখন ক্লাস টেনে পড়তাম।”
তিতলির মনটা হঠাৎ করে ভীষণ শান্ত হয়ে গেলো। ওর মনে হলো ও আরো আরো কিছু বছর এভাবেই পড়ে থাকতে পারবে। এভাবে,এমন করে মিশে। লোকটার দুই হাত তাকে জেদ করেই ধরে রেখে দিলে সেও মিছি মিছি জেদ দেখাবে অনেক,কথা শোনাবে। কিন্তু আলফা ম্যান লোকটা ওসবে ভ্রুক্ষেপ করবে না। তিতলির রাগ জেদে পানি ঢেলে ওকে আয়ত্তে নিতে চাইবে,এভাবে।
এরপর আর কোনো কথা বলল না তিতলি। ক্লান্তিতে, শ্রান্তিতে দু'চোখ মুদে আসছে তার। এবং তিতলি ঘুমিয়ে পড়েছে নির্দ্বিধায়। সে এক গাঢ় নিশ্চিন্ত ঘুম। আফিফ টের পেয়েছে, কিছুক্ষণ কিছু বলেনি। কিছু সময় অপেক্ষা করে ধীরে বলল,“হাত ব্যথা হয়ে গেছে তিতলি।”
_“হু?”
ঘুমে মাতাল মাতাল অবস্থা ওর। আফিফ বলে,“সর….সরো?”
_“হু?”
_“অন্তত শাড়িটা পাল্টে আয়। তোর গরম না লাগলেও আমার লাগছে।”
_“হু?”
_“ছাড়বি না? ছাড়বে না?”
তিতলি না ছেড়ে আরো আষ্টেপৃষ্ঠে ধরেছে লোকটাকে। খুব সহজে ছাড়বে না। শ্বাস ফেলছে ভারী। আফিফ চুপচাপ দীর্ঘসময় ঐ মুখের দিকে চেয়ে থাকে। এরপর বলে,“ঠিক আছে। কাল আমিও ছাড়বো না।”
#চলমান…..