ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগলো চোখে

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে

#পর্বসংখ্যা_৬

#Esrat_Ety

রুদ্ধশ্বাসে দৌড়ে গিয়ে ডিপার্টমেন্টের হেড প্রফেসর তৌফিকুল ইসলামের কক্ষে ঢুকে পরে আলো। তৌফিকুল ইসলাম পানির গ্লাস হাত থেকে নামিয়ে রেখে আলোর দিকে তাকায়।

"আলো? কি হয়েছে? কোনো সমস্যা?"

আলো একটা ঢোক গিলে তার শাড়ির আঁচল দিয়ে কপালে জমে থাকা ঘাম মুছে বলে,"স্যার অতিথি হিসেবে কে কে আসছে?"

_প্রধান অতিথি মাননীয় এমপি মহোদয় কবির আলমগীর, বিশেষ অতিথি জননেতা সামিন ইয়াসার, আইজি সাহেব, বয়েজ কলেজের প্রিন্সিপাল রয়েছে।‌ এছাড়াও আরো অনেকে। কেনো?

আলো হতভম্ব হয়ে তৌফিকুল ইসলামের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। সামিন ইয়াসার আসবে? তার মানে ওই জানোয়ার টাকে হোস্ট করতে হবে আলোর! কি সাংঘাতিক কথা। এর চেয়ে অপমান এবং অসম্মানের ব্যাপার আলোর জন্য কিছু হতে পারে না।

আলো একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে তৌফিকুল ইসলামের দিকে তাকিয়ে বলে,"স্যার। আমি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতে পারবো না।‌দুঃখিত।"

তৌফিকুল ইসলাম অবাক হয়ে যায়। আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,"মানে? আর বিশ মিনিটে অনুষ্ঠান শুরু হতে যাচ্ছে আর তুমি এখন এই কথা বলতে এসেছো? কি হচ্ছে কি এসব আলো?"

_স্যার।

আলো আমতা আমতা করতে থাকে।

তৌফিকুল ইসলাম বলে,"সামিন ইয়াসার কে নিয়ে সমস্যা? কিন্তু আলো ওটা তো তোমার পার্সোনাল প্রবলেম। কলেজের অনুষ্ঠানে কেনো ব্যাঘাত ঘটাতে চাইছো?"

আলো তার উত্তর না দিয়ে বলে,"স্যার সামিন ইয়াসার অতিথি হবার যোগ্য?"

_তার যোগ্যতা সম্পর্কে কতটুকু ধারণা আছে তোমার? তুমি জানো ও কত বড় মাপের একজন জননেতা?

_পুরোটাই ভণ্ডামি।

তৌফিকুল ইসলাম শীতল চোখে তাকায়, তারপর বলে,"যাও গিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করার প্রস্তুতি নাও। গলা ঠিক করো। ভলান্টিয়ারদের ডাকো। ফুলের তোড়া এসেছে?"

আলো চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।

তৌফিকুল ইসলাম ধমক দিয়ে বলে,"কথা শোনো আলো।"

_স্যার আগে কেনো জানানো হয়নি সামিন ইয়াসার আসবে?

তৌফিকুল ইসলাম রেগে গিয়ে বলে,"মানে? প্রিন্সিপাল কাকে অতিথি করবেন সেটা কি তোমাকে জিজ্ঞেস করে নিতে হবে আলো?"

আলো ঘাবড়ে গিয়ে বলে,"না স্যার।"

_যাও আলো। বোকামি করো না। অলরেডি দুজন আসেনি ভলান্টিয়ার। অসুস্থ তারা। এখন তুমি এমন করলে প্রিন্সিপাল দারুন ক্ষেপে যাবে। যাও!

***

"এই চা-টা যে বানায়,মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে তাকে নিজের বাড়িতে পারমানেন্ট চা বানানোর লোক হিসেবে নিয়োগ দেই। একেবারে বেহেস্তী চা।"

প্রিন্সিপাল শওকত হাসান কথাটি বলে চায়ে চুমুক দেয়। সামিন ইয়াসার নিজেও আগ্রহ নিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলে,"তা বেহেস্তী চা কিভাবে বুঝলেন স্যার? বেহেস্তে কি আপনার নিয়মিত যাতায়াত হয়? আমাকেও একদিন সাথে করে নিয়ে যাবেন। ওখানে গিয়ে চা খেয়ে আসবো।"

শওকত হাসান হো হো করে হেসে ওঠে সামিন ইয়াসারের কথায়। সামিন ফোনের দিকে তাকায়। ইশমাম ফোন দিচ্ছে। সে প্রিন্সিপালের কক্ষে থাকা সকলকে উদ্দেশ্য করে বলে,"এক্সকিউজ মি!"

তারপর ফোন নিয়ে বাইরে চলে আসে। তার কাছে এদের সাথে বেহুদা আলাপের থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো ইশমামের সাথে কথা বলা।

ফোনটা রিসিভ করতেই ইশমাম বলে,"ভাইয়া।"

_বল ছোটো।

_আজকের সেমিনার টা ক্যানসেল হয়েছে। হাতে প্রচুর ফ্রি টাইম। ভাবলাম তোমাকে ফোন দেই।

_ফ্রি টাইম তো গার্লফ্রেন্ড-কে ফোন দিয়ে কথা বল, সময়টাকে কাজে লাগা।

ইশমাম হেসে ফেলে ভাইয়ের কথায়। মনে মনে বলে,"আমার প্রেমিকার নাম জানতে পারলে আমাকে তুমি গুলি করে দেবে ভাইয়া।"

মুখে বলে,"কোথায় তুমি?"

_একটা প্রোগ্রামে এসেছি, অতিথি হয়ে।

_ওহহ আচ্ছা। তাহলে তো খুব ব্যস্ত।

_না। সবার আগে তুই। তুই বলতে থাক।

_না ভাইয়া। এখন রাখছি। আবার পরে ফোন দেবো। ঠিকাছে?

সামিন ইয়াসার হেসে বলে,"ঠিকাছে।"

আলো আতংকিত মুখ নিয়ে তৌফিকুল ইসলামের কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসে। মেজাজ মাত্রাতিরিক্ত খারাপ হয়ে আছে। ধীরপায়ে হেটে কলাভবনের দিকে যেতে থাকে। কলেজের গেইট দিয়ে অতিথিদের গাড়ি এক এক করে ঢুকছে। আলো সেদিকে তাকিয়ে দেখতে পায় সামিন ইয়াসারের লাল রঙের গাড়িটা পার্ক করা। তার মানে এসে গিয়েছে অসভ্য লোকটা। বিরক্তিতে আলোর মুখ তেতো হয়ে যায়। হঠাৎ করে তার ফোন বেজে ওঠে। স্ক্রিনে ইশমামের নাম্বার দেখে সে কিছুটা অবাক হয়। এই সময়ে ইশমামের ব্যস্ত থাকার কথা ‌ । সে ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে। ইশমাম বলে,"কি করছেন ম্যাডাম?"

_হাটছি। তুমি?

_আমি ফ্রি টাইমে আমার দুজন প্রিয় মানুষের সাথে কথা বলছি। একজনের সাথে কথা বলা শেষ করে আরেকজনকে ফোন দিলাম।

আলো অবাক হবার ভান করে বলে,"তাই? তা আপনার অন্য প্রিয় মানুষটি কে? যাকে আপনি আমাকে ফোন দেওয়ার আগে ফোন দিয়েছেন? সে কি আমার থেকেও দামী?"

_হুম কিছুটা।

_তোমার মা?

ইশমাম চুপ হয়ে যায়। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলে,"হু।"

আলো বলে,"আজ না সেমিনার ছিলো তোমার?"

_ক্যানসেল। হাতে অফুরন্ত সময় পরে আছে।

আলো হেসে বলে, "দুঃখিত জনাব। আপনার ফ্রি-টাইম টাকে নষ্ট করার জন্য। আমার অনুষ্ঠান এখন শুরু হবে। এখন তবে রাখি?

ইশমাম হেসে ফোন কেটে দেয়। আলো হাত দিয়ে কপালের এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে দ্রুতপায়ে হেটে কলাভবনের বিশালাকার কক্ষটিতে ঢুকে পরে। এদিক ওদিক না তাকিয়ে ভলান্টিয়ারদের কাছে গিয়ে তাদের ফুলের তোড়া এবং অতিথিদের জন্য ব্যাজ আনবার নির্দেশ দিয়ে নিজে মাইক্রোফোনের কাছে গিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। সে একটু একটু ঘামছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। কমলা রঙের একটি জামদানি শাড়ি পরেছে আজ আলো। সাজের মধ্যে হালকা পাউডার লাগিয়েছিলো মুখে আজ। তা ঘামের সাথে গলে গলে নামছে মুখমণ্ডল থেকে। আলো চোখ তুলে একবার অতিথি আসনের দিকে তাকায়। কেউ এখনো এসে আসন গ্রহণ করেনি। নিশ্চয়ই প্রিন্সিপালের কক্ষে বসে জামাই আদর খাচ্ছে সবকটা।

দীর্ঘসময় অতিবাহিত হয়ে যায়। আলো মাইক্রোফোন অন করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে অনুষ্ঠানের আরম্ভ ঘোষণা করে দেয়। খেয়াল করলো তার গলা অস্বাভাবিক কাঁপছে। নিজের প্রতি নিজেই বেশ বিরক্ত হয় আলো। আসুক ঐ লোকটা,তাতে তার কি! ওই লোকটা বাঘ না ভাল্লুক যে তাকে ভয় পেতে হবে। তবে আলো ঠিক ভয় পাচ্ছে না। নিজের মুখে ঐ লোকটার নাম উচ্চারণ করতে হবে ভেবে এখন-ই অপমানিত বোধ করছে সে।

অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গিয়েছে। প্রতিযোগীরা সবাই এসে গিয়েছে। কলাভবনের বিশাল কক্ষ মানুষের পদচারণায় গমগম করছে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রিন্সিপাল শওকত হাসান নিমন্ত্রিত সব অতিথিদের নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে। সবাইকে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে নিয়ে আসছে বিভিন্ন বিভাগের প্রফেসর-রা। আলো তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। নিজেরা উচ্চশিক্ষিত প্রথমশ্রেনীর কর্মকর্তা হয়ে কতগুলো অর্ধশিক্ষিত নেতাশ্রেনীর মানুষকে তেল দেওয়ার চেষ্টা করছে। কি অদ্ভুত শোচনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে এই সমাজ। ক্ষমতা আছে তার মানে দুনিয়া তাকে তোয়াজ করে চলতে বাধ্য!

মাননীয় সংসদ সদস্য মহোদয় নিজের আসন গ্রহণ করে বসেছেন। ঠিক তার পাশের চেয়ারটিতে এসে বসে পরেছে সামিন ইয়াসার মির্জা। শুভ্র পাঞ্জাবি পরনে তার, পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে রেখেছে, ক্লিন শেভ করেছে সে। আলো তার সবথেকে অপছন্দের মানুষটির মুখদর্শন করে চোখ মুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে থাকে। ইয়াসার মির্জার চারজন চামচা তার সাথেই এসেছে। এরা বডিগার্ডের মতো ইয়াসার মির্জাকে ঘিরে থাকে সবসময়। আলো একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তার হাতের কাগজটা একবার দেখে। লেখা আছে বিশিষ্ট সমাজসেবক এবং গণমানুষের নেতা সামিন ইয়াসার মির্জা। আলো লেখাটি পড়ে চোখ বড় বড় করে ফেলে,এখন তাকে ঐই অসভ্য মানুষটাকে "বিশিষ্ট" বলে সম্বোধন করতে হবে নাকি!

সামিন ইয়াসার আসন গ্রহণ করেই এদিকে ওদিকে তাকায়। তার দৃষ্টি কাউকে খুঁজছে। হঠাৎ করে স্টেজের এক কোণে দৃষ্টি যেতেই তার চোখ আটকে যায়। কিছুক্ষণ সে সেদিকেই তাকিয়ে থাকে। তার চিন্তাশক্তি কয়েক মুহূর্তের জন্য লোপ পেয়ে যায়। মাইক্রোফোনে হাত রেখে চোখ মুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে যে তরুণী, এই তরুণী টিকে অন্যরকম লাগছে আজ। শাড়ি পরে আছে বলেই কি এমন লাগছে? সামিন চোখ ফেরাচ্ছে না। কমলা রঙ-টা সামিন ইয়াসারের বরাবর অপছন্দের একটি রঙ। এই রঙের শাড়িতে কোনো শ্যাম-তরুনীকে এতোটা মোহনীয় লাগতে পারে তা সামিনের জানা ছিলো না। স্পিকারের শব্দে সামিনের ঘোর কাটে। মুহুর্তে-ই কপাল কুঁচকে ফেলে সে। ওই অদ্রিতা আলো মেয়েটা তার দিকে তাকাচ্ছে না। সামিন ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে। ইগনোর করে তো আজ বাঁচতে পারবে না। দেখা যাক কতদূর পারে চেষ্টা করে!

আলো মাইক্রোফোনের সামনে মুখ রেখে স্পষ্ট গলায় বলতে শুরু করে,"ইতিমধ্যে আমাদের মধ্যে উপস্থিত হয়ে আসন গ্রহণ করেছেন সম্মানীয় সংসদ সদস্য মহোদয়,আমাদের আজকের অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি। উপস্থিত আছেন বিশেষ অতিথি পুলিশ সুপার মহোদয়,শ্রী চিত্তরঞ্জন সাহা এবং উপস্থিত আছেন বিশিষ্ট সমাজসেবক......."

এই পর্যন্ত বলে আলো কয়েক মূহুর্ত থামে। সামিন ইয়াসার তার দিকে তাকিয়ে আছে। প্রিন্সিপাল শওকত হাসান আলোর দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আলো চোখ মুখ শক্ত করে বলতে শুরু করে,"বিশিষ্ট সমাজসেবক ও গণমানুষের নেতা সামিন ইয়াসার মির্জা। সবাই করতালির মাধ্যমে ওনাদের অভ্যর্থনা জানাই।"

সবাই হাততালি দিতে শুরু করে। সামিন ইয়াসারের মুখে হাসি ফোটে আলো নামের মেয়েটির মুখে তার নামের আগে "বিশিষ্ট" সম্বোধন শুনে।

পেছনে বসে জামিল ফুয়াদের কানে কানে বলে,"ফান্দে পরিয়া বগা কান্দেরে ভাই! না পারছে কিছু বলতে,না পারছে কিছু সহ্য করতে মেয়েটা।"

আলো মাইক্রোফোনে বলতে থাকে,"অতিথিদের ফুল দিয়ে বরণ করবে অত্র কলেজের প্রিন্সিপাল স্যার, মোহাম্মদ শওকত হাসান।"

ভলান্টিয়াররা ফুলের তোড়া নিয়ে এগিয়ে যায় প্রিন্সিপাল স্যারের কাছে। দুজন ভলান্টিয়ার কম বিধায় দুটো তোড়া টেবিলে-ই পরে থাকে। ইসলামের ইতিহাসের প্রফেসর জামান মাহবুব চাপা স্বরে চেঁচিয়ে আলোকে বলে,"নিয়ে যাও।"

আলো অবাক হয়ে বলে,"আমি?"

_হ্যা,তুমি। কুইক।

নিরুপায় হয়ে আলো ফুলের তোড়া দু'টো হাতে তুলে নিয়ে অতিথি আসনের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সামিন ইয়াসার তার দিকে তাকিয়ে আছে । আলো একটি বার-ও তার দিকে না তাকিয়ে ফুলের তোড়া দুটো প্রিন্সিপালের হাতে দিয়ে এসে পুনরায় মাইক্রোফোনের কাছে এসে দাঁড়ায়।

সামিন ইয়াসারের মুখ কাঠিন্যতায় ছেয়ে যায়। এই মেয়েটির অবজ্ঞা সে হজম করে নিতে নারাজ। দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে আছে সে।

আলো তার হাতের কাগজটার দিকে একবার তাকিয়ে বলতে থাকে,"এবারে অতিথিদের ব্যাজ পরিয়ে দেবে প্রথম বর্ষের তিনজন শিক্ষার্থী। নুহা,প্রভা,রাবেয়া। তোমরা অতিথিদের আসনের সামনে এসো।"

তিনজনের মধ্যে থেকে দুজন চলে এসেছে। বাকি একজনকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। প্রিন্সিপাল স্যার রেগে আলোর দিকে তাকায়। প্রফেসর তৌফিকুল ইসলাম বলে," শুরুতেই ঝামেলা।"

আলো আমতা আমতা করে বলে,"আমি কি করবো স্যার? প্রিন্সিপাল স্যার আমাকে কেনো চোখ রাঙাচ্ছে?"

_তোমাকে চোখ দিয়ে যেতে ইশারা করছে বেকুব মেয়ে। যাও, অতিথিদের ব্যাচ পরিয়ে দাও। কুইক।

আলো হতভম্ব হয়ে যায়। বিড়বিড় করে বলে,"ভলান্টিয়ার-রা আছে তো।"

_ভলান্টিয়াররা শাড়ি পরেছে কেউ?

_শাড়ি পরার সাথে ব্যাজ পরানোর কি সম্পর্ক স্যার? আর স্যার, শাড়ি পরা অনেক মেয়ে আছে। অন্য কাউকে ডেকে দেবো?

তৌফিকুল ইসলাম রাগী দৃষ্টিতে তাকায়। আলো একটা ঢোক গিলে বলে,"যাচ্ছি স্যার।"

একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে মনে মনে বলে,"যা আলো। ঐ পিশাচ টাকে ব্যাজ পরিয়ে দিলে মরে যাবি না তুই। পরে না হয় হাত ধুয়ে নিবি।"

"কি হলো যাচ্ছো না কেনো।"

পেছন থেকে প্রফেসরের ধমক শুনে আলো দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায়। ডালা থেকে একটি ব্যাজ তুলে নিয়ে প্রথমে পুলিশ সুপারকে পরিয়ে দেয়। সামিন ইয়াসার আলোকে আড়চোখে দেখছে। তার মুখে পৈশাচিক হাসি। মনে মনে বলে,"এটাকে-ই বলে ক্ষমতা অদ্রিতা আলো।"

আলো পুনরায় আরেকটি ব্যাজ তুলে নিয়ে থমথমে মুখে সামিনের সামনে দাঁড়ায়। তারপর ধীরে ধীরে সামিনের দিকে একবার তাকায়।

পেছনে জামিল এবং অন্যরা চাপা হাসিতে ফেটে পরছে।

আলোর দৃষ্টিতে কি ছিলো সামিন জানে না। সে থমকে গিয়েছে। অপলক দৃষ্টিতে দেখছে একজন শ্যামবতীকে। আলো কপাল কুঁচকে ব্যাজ-টা সামিনকে পরিয়ে দিতে উদ্যত হয়। মনে মনে বলতে থাকে,"ওয়েট! পরাচ্ছি তোকে ব্যাজ !"

সামিন আলোর দিক থেকে চোখ ফেরাচ্ছে না। ক্ষণিকের জন্য সে ভুলে বসে আছে অদ্রিতা আলো নামের মেয়েটি তার শত্রু।

"আহহহ।"

সামিন নিজের আর্তনাদ শুনে নিজেই বেশ অবাক হয়। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা প্রত্যেকে চোখ ছানাবড়া করে তাকিয়ে থাকে সামিনের দিকে। আলো সামিন ইয়াসারের দিকে শীতল চোখে তাকিয়ে আছে। তার দৃষ্টিতে প্রতিশোধ নিতে পারার আনন্দ। সামিন বুকের বা পাশে হাত দিয়ে আলোর দিকে অবাক চোখে তাকায়।

প্রিন্সিপাল দাঁত কিড়মিড় করে বলে,"করলে টা কি! দিলে তো সেইফটি পিন-টা ফুটিয়ে।‌ অদ্ভুত!"

আলো ভয় পাওয়া মুখ করে প্রিন্সিপালকে বলে,"দুঃখিত স্যার। দেখতে পাইনি।"

সামিন আলোর দিকেই তাকিয়ে আছে। আলো যে ইচ্ছাকৃত এটা করেছে তা বুঝতে বাকি নেই আর। যত দিন যাচ্ছে এই মেয়েটার কর্মকান্ড তাকে অবাক নয় হতবাক করে দিচ্ছে। আলোর মুখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে মনে মনে বলে ওঠে,"এটার শোধও আমি তুলবো অদ্রিতা আলো।"

শুভ্র পাঞ্জাবিটার বুকের বা পাশটায় একফোঁটা লাল রক্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রিন্সিপাল ইয়াসারের দিকে তাকিয়ে বলে,"তোমাকে মেডিসিন বা..."

ইয়াসার হাত উঠিয়ে থামিয়ে দেয় প্রিন্সিপালকে, আলোর দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় প্রিন্সিপালকে বলে,"এসবে ইয়াসারের কিচ্ছুটি হয়না। আপনি অনুষ্ঠান কনটিনিউ করুন।"

শওকত হাসান আলোকে ধমক দিয়ে বলে,"দেখছো কি দাঁড়িয়ে! যাও মাইক্রোফোনের কাছে।"

আলো মাথা নাড়িয়ে মাইক্রোফোনের কাছে যায়, মনে মনে বলতে থাকে,"সেইফটি পিন তো খুবই নগণ্য জিনিস। তোর ওই বুকে কুড়াল বসানো উচিত ভণ্ড নেতা।"

"অতিথিদের ফুলের তোড়া এবং ব্যাজ পরানোর মধ্যে দিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শুভারম্ভ হয়েছে। এখন আমি প্রতিযোগীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাচ্ছি। মঞ্চে ডাকতে চাই গ্রুপ "ক" এর প্রতিযোগীদের। গ্রুপ "ক" থেকে এখন এসে নজরুল সঙ্গীত গাইবে মারুফা শাম্মী,প্রথম বর্ষ, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ।"

আলো মাইক্রোফোনের কাছ থেকে সরে গিয়ে একটা চেয়ারে বসে। প্রতিযোগী মঞ্চে উঠে নজরুল সঙ্গীত গাইতে থাকে। অত্যন্ত শ্রুতিমধুর পরিবেশনা। সবাই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছে, শুধুমাত্র সামিন ইয়াসারের দৃষ্টি আলোর দিকে। তার অবচেতন মন বারবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে ওই মেয়েটিকে দেখতে থাকে, যে মেয়েটি বারবার সামিন ইয়াসারকে টেক্কা দিচ্ছে। অঘোষিত নিরব যুদ্ধ করছে সামিন ইয়াসার মির্জার সাথে।

আলোর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে একবার সে নিজের দিকে তাকায়। রক্তের ফোঁটা-টা ফুলের মতো লাগছে। একটা ক্ষুদ্র গোলাপ ফুল।

একের পর এক প্রতিযোগীরা তাদের পারফরম্যান্স দেখিয়ে যাচ্ছে। আলোর অস্থিরতা ক্রমশ বাড়ছে,কখন শেষ হবে এই অনুষ্ঠান ! তার ভীষণ মাথা ব্যথা করছে।

দর্শকদের প্রথম সারিতে বসে জামিল ফুয়াদকে বলে,"সাহস দেখেছেন? এমপি মহোদয়ের সামনে সুকৌশলে ভাইকে যন্ত্রনা দিয়েছে। অবাক হবার কিছু নেই। এই মেয়ে কারাতে জানে। ক্লাস সেভেনে থাকতে একবার এক ছেলে হাত ধরেছিলো জোর করে। বাড়িতে এসে কান্নায় লুটিয়ে পরতেই আতাউর আলম সাথে সাথে মেয়েকে নিয়ে কারাতে ট্রেইনিং সেন্টারে ভর্তি করিয়ে দেয়।"

_সাহস তো দেখার মতো-ই, নয়তো সামিন ইয়াসারের গালে চড় মারে নাকি!

_বাপকে ভীষণ ভালোবাসে। সব কিছু করতে পারে বাবার জন্য।

দু'জনেই কথা থামিয়ে আলোকে দেখতে থাকে।

অনুষ্ঠান প্রায় শেষ হয়েছে। প্রতিযোগীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করছেন অতিথিরা। একটু পরেই মাগরীবের আজান দেবে। সবাই বাড়ি ফেরার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছে। আলো নিজের ব্যাগ উঠিয়ে তৌফিকুল ইসলামের কাছে গিয়ে আমতা আমতা করে বলে,"স্যার এবার তো অনুমতি দিন। কাজ যা বাকি আছে ভলান্টিয়ার-রা দেখে নেবে।"

তৌফিকুল ইসলাম কিছুক্ষণ ভেবে বলে,"আচ্ছা যাও। বাকিটা আমিই সামলে নিচ্ছি।"

***

"ভাই! ভাই দেখিতো কি হয়েছে!"

হাত দিয়ে জামিল সামিন ইয়াসারের পাঞ্জাবি ধরে দেখতে থাকে। রাহাত চেঁচিয়ে ওঠে,"করছে টা কি! ভাই এই মেয়েতো রক্তচোষা বাদুড়। বেয়াদ্দপ মেয়ে।"

সামিন জামিলের হাত সরিয়ে বলে,"গাড়ি স্টার্ট কর। কিচ্ছু হয়নি।"

ফুয়াদ মুচকি মুচকি হাসছে। ইয়াসার গম্ভীর কন্ঠে বলে,"সমস্যা কি? হাসছিস কেনো?"

_রক্তচোষা বাদুড় আসছে। ওই দেখ।

সামিন ইয়াসার মাথা ঘুরিয়ে তাকায়। আলো ধীরপায়ে গেইটের কাছে এগিয়ে আসছে। কলেজের পাশের মসজিদে আজান দিয়ে দিয়েছে। ল্যাম্পোস্টের বাতি গুলো সব জ্বেলে ওঠে এক সাথে। আলো আজান শুনে শাড়ির আঁচল টেনে মাথায় তুলে দেয়। দৃশ্যটি সামিন ইয়াসারের অবচেতন মনকে মুগ্ধ করে। কিন্তু সে বুঝতে পারে না।

রাহাত চাপা স্বরে বলে,"ভাই এখন ধরে কানের নিচে দুটো চড় লাগিয়ে দিন। কেউ দেখবে না।"

সামিন রেগে গিয়ে রাহাতের দিকে তাকায়। ঠান্ডা গলায় বলে,"ওরা এমনিতেই দুর্বল জাতি। গায়ের জোর দেখিয়ে কি হবে? ওকে চড় তো অবশ্যই মারবো। তবে অন্যভাবে।"

সেই অন্যভাবে-টা ঠিক কিভাবে তা জানতে সবাই উৎসুক হয়ে তাকিয়ে থাকে। সামিন কিছু বলে না, এক দৃষ্টে আলোকে দেখে।

আলো সামিন ইয়াসারের গাড়ির কাছে ওদের দলবল দেখতে পেয়ে থমকে যায়। মেইন গেইটের কাছে না গিয়ে সে পকেট গেইটের দিকে যায়।

দলের তিন-চারজন চেঁচিয়ে ওঠে,"ভয় পাইছে ভাই,ভয় পাইছে!"

আলো দাঁড়িয়ে পরে। জামিল চেঁচিয়ে বলে," শিড়ায় শিড়ায় রক্ত, আমরা ইয়াসার ভাইয়ের ভক্ত।"

বাকি ছেলেগুলোও চেঁচিয়ে ওঠে,"শিড়ায় শিড়ায় রক্ত,আমরা ইয়াসার ভাইয়ের ভক্ত।"

আলো এক মুহুর্ত দেরী না করে দৌড়ে পকেট গেইট থেকে বেরিয়ে যায়। একটা রিকশায় উঠে শাড়ির আঁচল টেনে কান চেপে ধরে। সামিন ইয়াসারের দলবল তখনো চেঁচিয়ে যাচ্ছে,"শিড়ায় শিড়ায় রক্ত,আমরা ইয়াসার ভাইয়ের ভক্ত।"

চলমান......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন