#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে
#পর্বসংখ্যা_৭
#Esrat_Ety
"স্যার প্রশ্নপত্র কোথায়? আমরা পরিক্ষা কিভাবে দেবো?"
_প্রশ্নপত্র কি? প্রশ্নপত্র কাকে বলে? সেটা দিয়ে কি করে?
তৌফিকুল ইসলামের এমন কথায় পুরো শ্রেনীকক্ষ আলোড়িত হয়। সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। আলো দাঁড়িয়ে প্রতিবাদের সুরে বলে,"হচ্ছে কি এসব স্যার? আজকে আমাদের ফার্স্ট ইনকোর্স এক্সামের ফার্স্ট ডে। আমাদের প্রশ্নপত্র না দিলে লিখবো কি?"
_আচ্ছা আচ্ছা। প্রশ্ন আমি বলে দিচ্ছি। তোমরা সবাই লেখো। তোমাদের প্রশ্ন হচ্ছে "আমরা কারা?"
আলো বিরক্ত হয়ে যায়। রেগে গিয়ে বলে,"স্যার আমরা ইংলিশ লিটারেচারের স্টুডেন্ট। এসব কি ধরনের প্রশ্ন দিচ্ছেন আমাদেরকে?"
তৌফিকুল ইসলাম রেগে যায়। আলোকে ধমক দিয়ে বলে,"চুপ। যা বলছি তাই করো। লেখো, তোমরা কারা লেখো।"
আলো দাঁত কিড়মিড় করে বলে ,"এর উত্তর আমাদের জানা নেই।"
_ঠিকাছে। আমি বোর্ডে লিখে দিচ্ছি। তোমরা সবাই খাতায় কপি করে ফেলো।
সবাই "জ্বি" বলে মাথা নাড়ায়। আলো হতবাক হয়ে চারপাশে তাকায়। এসব হচ্ছে টা কি আসলে!
তৌফিকুল ইসলাম বোর্ডে লিখতে থাকে,
"প্রশ্ন : আমরা কারা?"
উত্তর: শিরায় শিরায় রক্ত। আমরা ইয়াসার ভাইয়ের ভক্ত।"
আলো হতভম্ব হয়ে উঠে দাঁড়ায়। ক্লাসের সবাই তড়িঘড়ি করে লিখতে থাকে। মুখে বিড়বিড় করতে থাকে,"শিরায় শিরায় রক্ত। আমরা ইয়াসার ভাইয়ের ভক্ত। শিরায় শিরায় রক্ত, আমরা ইয়াসার ভাইয়ের ভক্ত, শিরায় শিরায় রক্ত,আমরা ইয়াসার ভাইয়ের ভক্ত।"
আওয়াজ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। আলো চেঁচিয়ে ওঠে,"চুপ করো তোমরা।"
কেউ সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করে না। বিড়বিড় করতে থাকে,"শিরায় শিরায় রক্ত,আমরা ইয়াসার ভাইয়ের ভক্ত।"
আলো বেঞ্চের উপরে জোরে চাপড় মেরে প্রচন্ড শব্দে চেঁচিয়ে বলে,"চুপ করো তোমরা চুপ করো। দোহাই তোমাদের,চুপ করো!"
হঠাৎ করে আলোর চোখ খুলে যায়। একলাফে উঠে বসে সে হাঁফাতে থাকে। দু'মিনিট সময় নিয়ে সে পরিস্থিতি অনুধাবনের চেষ্টা করে। সে কোথায়? এরকম ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে আছে কেনো ক্লাসরুম। কয়েক মুহূর্ত যেতে-ই ধীরে ধীরে সে টের পায় সে এতক্ষন স্বপ্ন দেখছিলো। হাত দিয়ে ফোন খুঁজতে থাকে সে। বালিশের নিচ থেকে ফোনটা বের করে ফ্লাশ লাইট অন করে। পুরো গা ঘামে ভিজে গিয়েছে। এখনো তার শরীর একটু একটু করে কাঁপছে। এর চেয়ে ভয়ংকর কোনো দুঃস্বপ্ন বোধ হয় সে তার পুরো জীবনে দেখেনি। বিছানা থেকে ধীরে ধীরে নেমে লাইট জ্বেলে দেয়। টেবিলের ওপরে রাখা গ্লাসের ঢাকনা সরিয়ে গ্লাসের পানি ঢকঢক করে পুরোটা পান করে। ওয়াশ রুমে ঢুকে মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে ওড়না দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বের হয়। ধপ করে বিছানার উপর বসে পরে। কিছুক্ষণ থম মেরে থেকে হাত বাড়িয়ে ফোনটা হাতে নেয়। ইশমামের নাম্বারে ফোন দিতেই সাথে সাথে ইশমাম ফোনটা রিসিভ করে বলে,"আমার হঠাৎ করে মনে হচ্ছিলো তুমি ফোন দিবে।"
"ভালো।"
ইশমাম আলোর কন্ঠস্বর শুনে বিচলিত হয়ে বলে,"কি হয়েছে অদ্রিতা ? কন্ঠস্বর এমন লাগছে কেনো?"
_হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছে। তাই।
_দুঃস্বপ্ন দেখেছো নাকি কোনো?
_হুম।
_কি? একজন কুচকুচে কালো দেখতে, টাক মাথার বিসিএস ক্যাডারের সাথে বিয়ে হয়ে গিয়েছে তোমার?
কথাটি বলে ইশমাম হো হো করে হাসতে থাকে। আলো ধীরে ধীরে বলে,"তার চেয়ে বেশি ভয়ংকর।"
_তাই? আচ্ছা বলো তো শুনি! আমিও একটু ভয় পেতে চাই।
আলো ধীরে ধীরে তার দুঃস্বপ্নের কথা ইশমামকে বলে। সবটা শুনে ইশমাম কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকে। তারপর উচ্চস্বরে হাসতে শুরু করে। আলো বিরক্ত হয়ে বলে,"হাসছো কেনো তুমি?"
ইশমাম হাসি থামিয়ে বলে,"তুমি পাগল হয়ে যাচ্ছো অদ্রিতা। ইয়াসার মির্জাকে কেনো মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলছো না? অদ্ভুত। সারাদিন ওই লোকটার কথা ভাবতে হবে?"
_আমি কেনো সারাদিন ওই লোকটার কথা ভাবতে যাবো? ওই লোকটাই তো আমাকে প্রত্যেকটা দিন বিরক্ত করতে চলে আসে!
ইশমাম চুপ হয়ে যায়। তারপর মৃদু স্বরে বলে,"বিরক্ত করতে চলে আসে মানে? আর কিছু করেছিলো উনি?"
আলো থতমত খেয়ে যায়। নিজের কথা ফিরিয়ে নিয়ে বলে,"না মানে সারাদিন বাড়ির সামনের রাস্তায় ওর নামে মিছিল হয়। শহরের আনাচে কানাচে যেখানেই যাই ," শিরায় শিরায় রক্ত, আমরা ইয়াসার ভাইয়ের ভক্ত।"
ইশমাম মৃদু হেসে বলে,"বাদ দাও,এসবে জড়িও না আর। তুমি শুধু লেখাপড়ায় মন দাও।"
_কাল আব্বুর সাথে ক্যাম্পেইন করতে যাবো। একদিনই যাবো।
_না। এসবের দরকার নেই। নিজের বয়স অনুযায়ী কাজ করো অদ্রিতা। সব ব্যাপারে বেশি কৌতুহল তোমার। এসবে কেন জড়াতে হবে?
_অভিজ্ঞতার জন্য। ভবিষ্যতে আমিও রাজনীতিতে নামবো।
হাসতে হাসতে আলো বলে।
_না অদ্রিতা।
ধমকের সুরে বলে ইশমাম।
আলো হাসি থামিয়ে বলে,"মজা করছি। একদিনই যাবো। প্রমিজ। আর কখনো যাবো না। কখনো না।"
***
ইহানের মুখের কাছে ভাতের লোকমা তুলে ধরতেই ইহান মুখ সরিয়ে নেয়। বাবার ফোনে কার্টুন দেখছিলো সে। রিতু একটা ধমক দিতে গিয়েও দেয়না। ইলহামের দিকে একবার তাকিয়ে অসহায়ের মতো ইশিতার দিকে তাকায়। ইশিতা চোখ দিয়ে ইশারা করে রিতুকে প্লেট সরিয়ে ফেলতে বলে। ইলহাম এবং সামিন ইয়াসার খাবার টেবিলে নিজেদের বাড়ির ব্যবসা সংক্রান্ত আলোচনা করছিলো। রিতু প্লেট সরিয়ে রেখে সামিন ইয়াসারের প্লেটে মাংসের টুকরো তুলে দেয়। সামিন বলে,"লাগবে না রিতু।"
রিতু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে,"ভাইয়া আপনার সাথে কিছু কথা ছিলো।"
সামিন তাকায়। ইলহাম বলে,"দেখছো না এখন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করছি?"
সামিন ইলহামকে থামিয়ে দিয়ে বলে,"বলো। কোনো সমস্যা?"
রিতু মাথা নাড়িয়ে নিচু স্বরে বলে,"ভাইয়া ইহানের জন্য একটা টিচার ঠিক করে দিলে ভালো হয়।"
"হুম দেবো। আর কিছু বলবে?"
রিতু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে,"ওর জন্য একজন হুজুর ঠিক করে দিবেন? আরবি শেখাতে চাই। বাড়িতে এসে পড়িয়ে যাবে।"
_আরবি শিক্ষা দিতে চাও মানে? এতটুকু বয়সে এতো চাপ কেনো দিতে হবে?
রিতু ইলহামের কথার জবাব না দিয়ে সামিন ইয়াসারকে বলে,"গত রাতে আমার শাশুড়ি মাকে স্বপ্নে দেখেছি। নাতী কে নিয়ে বসে আছেন। আমাকে হঠাৎ বললেন,আমার নাতীকে আলেম বানাবে।"
তারপর কয়েক মূহুর্ত চুপ করে থেকে বলে,"আলেম না হোক, কোরআন শরীফ পাঠ করাটা শিখে যাক অন্তত!"
ইলহাম এবং সামিন ইয়াসার দু'জনেই রিতুর মুখে মায়ের কথা শুনে তাকায়।
রিতু বলে কাল কিছু এতিম বাচ্চাদের খাওয়াতে চাই ভাইয়া। ব্যবস্থা করে দিলে ভালো হয়।
"সংসারের পুরো দায়িত্ব তোমার হাতে রিতু। ইশিতা নাক গলায় না। তুমি যা ভালো মনে করো।"
ঠান্ডা গলায় বলে ইয়াসার। কিছুক্ষণ পরে আবারো বলে ওঠে,"একজন আরবি টিচার-ও ঠিক করে দেবো। কালকের মধ্যে।"
রিতুর মুখে হাসি ফোটে।
ইশিতা ব্যাগ হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সামিন আর ইলহামকে উদ্দেশ্য করে বলে,"আমি আসছি ভাইয়া। ভার্সিটিতে যাচ্ছি।"
_গাড়ি নিয়ে যা।
_না রিকশা করে যাবো।
ইলহাম ভ্রু কুঁচকে বলে,"নিজেদের গাড়ি থাকতে রিকশা কেনো?"
_গাড়ির ভেতরে দমবন্ধ লাগে। সারাদিন তোমাদের এই বদ্ধ পরিবেশে থাকি। বাইরে গিয়েও পরিবেশ-টা একটু চেইঞ্জ করবো না?
ইশিতা চলে যায়। ইলহাম সামিন ইয়াসারকে বলে,"ইশিতা আর ইশমাম যে যমজ তা ওদের হাবভাব দেখলেই বুঝে ফেলা যায় ভাইয়া।"
সামিন ইয়াসার কিছু বলে না। চুপচাপ খেতে থাকে। ইলহাম বলে,"মা মারা যাওয়ার পরে এই সংসারটা কেমন ছন্নছাড়া হয়ে গিয়েছে। তুমি যদি অনুমতি দাও তাহলে তোমার জন্য মেয়ে দেখতে পারি ভাইয়া। বাবাও চায় তুমি এখন বিয়ে করো।"
সামিন খেতে খেতে বলে,"হু দেখ। তবে আমার জন্য না। ছোটোর জন্য। ওকে বিয়ে করিয়ে দেবো দেশে ফিরিয়ে এনে। সুন্দরী এবং নম্র ভদ্র দেখে একটা মেয়ে দেখবি। রিতুর মতো। এ বাড়িতে কোনো উড়নচন্ডী টাইপ মেয়ে বৌ হয়ে আসবে না। আমার মায়ের প্রতিচ্ছবি হতে হবে, তার মতো করে নিপুণ হাতে সংসার সামলানোর দক্ষতা থাকতে হবে। দেখলে যেনো মনে হয় আমি আমার মা কেই দেখছি।"
***
"তোমাকে এমন ভাবে যত্ন করছে আব্বু মনে হচ্ছে তুমি এই শহরের মেয়র কনফার্ম।"
আতাউর আলম মেয়ের কথায় মুচকি হাসে। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,"এরা আমাকে খুব ভালোবাসে।"
আতাউর আলমের চাচাতো ভাই খোরশেদ পেছন থেকে বলে ওঠে,"এইসব বস্তির লোকদের ভরসা নেই ভাইজান। এরা গিরগিটির চেয়েও দ্রুত রং বদলায়। যেদিকে ঝোঁক বেশি সেদিকে ঝুঁকে থাকতে পছন্দ করে। আপনাকে বুঝতেই দেবে না এরা আপনার বিরোধী। কিন্তু তলে তলে ঠিকই যে টাকা দিয়ে কিনতে পারবে সিলটা তার নামের ওপরেই লাগাবে।"
আলো তার চাচার বিরোধীতা করেই বলে,"মোটেই না। এদের চোখ বলে দিচ্ছে এরা কতটা স্বচ্ছ।"
খোরশেদ বলে,"তুই সেদিনের মেয়ে। তুই কি মানুষ চিনিস?"
_আপনার থেকেও বেশি চিনি চাচ্চু।
খোরশেদ থতমত খায়। এই আলো অনেক চালাক মেয়ে। এর সাথে তর্কে গেলে পয়েন্টে পয়েন্টে ধরা খেতে হয়। প্রসঙ্গ পালটে খোরশেদ বলে,"এই রোদ গরমে তুই কেন আসতে গেলি। এতো বড় মেয়ে, দৃষ্টিকটু লাগছে ব্যাপারটা। আমরা তো সবাই আছি ভাইজানের সাথে "
_বড় সেজন্যই তো এসেছি। ছোটো হলে তো আসতাম না।
খোরশেদ চুপ হয়ে যায়। আলো বলতে থাকে,"কি জানেন তো চাচ্চু? আমার ভালোমানুষ আব্বুর নতুন নতুন কিছু অদৃশ্য শত্রু হয়েছে। তাদেরকে আব্বু ডিটেক্ট করতে পারছে না। বয়সের ভারে আব্বুর দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে গিয়েছে। আমার দৃষ্টি পরিষ্কার। খুব সহজেই ডিটেক্ট করতে পারবো। তাই আব্বুর বডিগার্ড হিসেবে এসেছি।"
আতাউর আলম মেয়ের কথায় হেসে ফেলে। নিজের হাতে মেয়েকে গড়েছেন তিনি। মেয়েটা তার মতোই দুঃসাহসী। কথাবার্তাও তার মতো করেই বলে। শুনলে চমকে যেতে হয়।
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে আতাউর আলম বলে,"এবার রেডিও কলোনির দিকে যেতে চাচ্ছি।"
আতাউর আলমের কর্মীরা সবাই উঠে দাঁড়ায়। আলো উৎকণ্ঠা নিয়ে বলে,"আজ বরং থাকুক বাবা। চাচারা যাক। তুমি তো হাঁটতেই পারছো না।"
_আরে ধূর! এখনি যদি নিজে গিয়ে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের থেকে ভোট চাইতে না পারি তাহলে লোকজন আমাকে কতটুকু ভরসা করবে বলতো?
আলো বলে,"ঠিকাছে। তবে আমিও যাবো তোমার সাথে।"
***
মুখোমুখি দুটো দল। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল থেকে মনোনীত প্রার্থী সামিন ইয়াসার মির্জা, এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর আলম। রেডিও কলোনির মোড়ে এসে দুটো দল মুখোমুখি হয়।
রাস্তা পুরোটা আটকে দাঁড়িয়ে পরেছে তারা। আলো সামিন ইয়াসারকে দেখে কোন এক অজানা কারনে আতাউর আলমের পেছনে দাঁড়ায়। সামিন ইয়াসার তা খেয়াল করেছে। আতাউর আলমের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলে,"অনেকদিন পরে দেখা হলো আপনার সাথে! "
আতাউর আলম তাচ্ছিল্য মাখা হাসি দিয়ে বলে,"দেখে খুশি হওনি নিশ্চয়ই? তাও আবার এভাবে?"
সামিন ইয়াসার শুকনো হাসি হাসে। তার পেছন থেকে জামিল বলে ওঠে,"আমরা আগে এসেছি। কলোনীতে আমরা প্রথমে ঢুকবো।"
_মামার বাড়ির আবদার? এখানে আব্বুর কর্মীরা আগে এসেছে। আমরা আগে ঢুকবো।
আতাউর আলমের পেছন থেকে ক্ষীণ কিন্তু তেজী কন্ঠে বলে আলো। সামিন চোখ সরিয়ে আলোকে দেখে, আতাউর আলমের দিকে তাকিয়ে বলে,"মেয়েকে কেন এসব রাজনীতি শেখাচ্ছেন? পড়াশোনা করতে মন না চাইলে ওকে বিয়ে দিয়ে দিন। রাজনীতি মেয়েদের বিষয় না।"
_আমার মেয়ে কি করবে আর কি করবে না তা আমি আর আমার মেয়ে বুঝবো।
একটু থেমে আতাউর আলম বলে,"আমি বুঝতেই পারিনি তোমার মতো সেদিনের একটা ছেলেকে পার্টি নমিনেশন দেবে।"
_হুম। বারবার বলতেন আমি দিবাস্বপ্ন দেখছি।
_এখনো বলবো তুমি দিবাস্বপ্ন দেখছো। পার্টি নমিনেশন দিয়েছে শুধু,এবার ভোটে জিতে দেখাও।
_দিবাস্বপ্ন আপনি দেখছেন। আপনার মতো দুই টাকার রিপোর্টার, অতীতে দুই একটা সাহসী কাজ করে জনগনকে খুশি করেছেন, সেজন্য ভাববেন না জনগণ আপনাকে শহর দেখভালের দায়িত্ব দেবে।
_দুই টাকার রিপোর্টার মানে? কোন সাহসে আপনি আমার আব্বুকে দুইটাকার রিপোর্টার বলছেন। বেহায়া বেশরম লোক, নির্লজ্জ কোথাকার। ছেলের নারী কেলেঙ্কারির জের ধরে বাপকে সংসদ সদস্যের পদ হারাতে হয়েছে,ভুলে গেছেন সেসব কথা? সরকারের টাকা মেরে কালো টাকার পাহাড় বানিয়ে একজন সৎ লোককে দুই টাকার রিপোর্টার বলছেন?
সামিন চোখ রাঙিয়ে আলোর দিকে তাকায়। আলো বলতে থাকে,"এই কলোনিতে এখন আতাউর আলমের কর্মীরা ঢুকবে। দেখি কে আটকায়।"
জামিল দাঁত খিচিয়ে বলে,"সামিন ইয়াসার মির্জার লোক ঢুকবে। দেখা যাবে কাদের কত দম।"
সামিন জামিলকে থামিয়ে দিয়ে বলে,"ঢুকতে দে ওদের।"
_কিন্তু ভাই...
_কথা কম। ঢুকতে দে।
আলো তাচ্ছিল্যের সাথে বলে ওঠে,"এমনিতেও আপনারা আগে ঢুকলে ঝাটার বারি খেয়ে বের হতেন, অপজিশন পার্টির সামনে মুখ লুকানোর যায়গা পেতেন না তখন।"
আতাউর আলম আলোকে থামিয়ে দিয়ে বলে,"চল আম্মু।"
সামিন ইয়াসারের লোকজন রাস্তা থেকে সরে দাঁড়ায়, স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর আলমের কর্মীরা সবাই কলোনিতে প্রবেশ করে।
যাওয়ার আগে আলো এক মুহুর্তের জন্য সামিন ইয়াসারের দিকে তাকায়। সামিন ইয়াসার তার দিকে শীতল চোখে তাকিয়ে আছে।
"ভাই এই মেয়েটাকে আর নেওয়া যাচ্ছে না। অতিরিক্ত। অসহ্যকর।"
রেগেমেগে বলে জামিল।
সামিন ইয়াসার চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। সে কি ভাবছে?
***
"একটা গল্প বলি শোনো। একবার এক শকুনের বাচ্চা তার শকুন মায়ের কাছে বললো মা আমার মানুষের মাংস খেতে ইচ্ছে করছে। শকুন মা তখন এক বুদ্ধি বের করলো। এক টুকরো গরুর মাংস নিয়ে গিয়ে হিন্দু পাড়ায় ফেলে দিয়ে আসলো এবং এক টুকরো শূকরের মাংস নিয়ে এসে মুসলমানদের মহল্লায় ফেলে দিয়ে আসলো। তারপর চুপ করে নিজের ছানা নিয়ে ঘাপটি মেরে থাকলো। কিছু সময় পরে গরু আর শূকরের মাংসের জের ধরে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গা শুরু হলো। সেই দাঙ্গায় গোটা কয়েক লোক মরে লাশ হয়ে পরে থাকলো। শকুন তখন তার ছানাকে বলে,"যা বাবা। এখন ইচ্ছামতো মানুষের মাংস খা তুই।"
জায়েদ আলী শমশের ভুঁইয়ার দিকে তাকিয়ে বলে,"আপনি কি পরোক্ষভাবে নিজেকে ওই শকুনের সাথে তুলনা করলেন?"
শমসের ভুঁইয়া থতমত খেয়ে বলে,"না বেকুব। আমি আসলে উদাহরণ দিচ্ছি। কিভাবে ইয়াসার মির্জা আর আতাউর আলমের মধ্যে সংঘর্ষ সৃষ্টি করবে তার হিন্ট দিচ্ছি।"
_কিন্তু এটা তো কোনো সাম্প্রদায়িক ইস্যু না। রাজনীতি। মাংস ছড়াছড়ি করে কি হবে।
শমসের ভুঁইয়া প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে মুখে "চ" কারন্ত শব্দ করে বলে,"তুমি এতো মাথামোটা হলে কবে থেকে জায়েদ। এখন কি হাতে কলমে শিখিয়ে দিতে হবে কিভাবে কি করবে?"
জায়েদ আলী আমতা আমতা করে বলে,"না। আমাদের ছেলেদের কাজে লাগিয়ে দিচ্ছি।"
"গুড। এখন যাও। আর ইয়াসারের ডান হাত জামিলের ব্যাপারে কি করলে?"
_সুযোগ পেলেই সরিয়ে দেবো।
***
"ভাই একটা খারাপ খবর আছে।"
সকাল সকাল পার্টি অফিসে এসে জামিলের মুখে কথাটি শুনেই ইয়াসারের কপাল কুঁচকে যায়। জামিলের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় সে। জামিল বলে,"উত্তরের এলাকা গুলো থেকে আতাউরের লোকজন আপনার সব সাইনবোর্ড খুলে ফেলেছে। সব নষ্ট করে ফেলেছে। আমাদের ছেলেরা ক্ষেপে গিয়ে ওদের একটাকে ধরেছে। মারামারি হয়েছে খুব। পুলিশ এসে দুই পক্ষের ছেলেদের ধরে নিয়ে গিয়েছে। "
সামিন ইয়াসার প্রচন্ড রেগে যায়। দাঁত খিচিয়ে বলে,"তোরা কি করছিলি? ঘাস কাটছিলি?"
_ভাই ভোরের আলো ফোটার আগে এই কাজ হয়েছে। লোকজন বলছে সব আতাউরের লোকজনের কাজ। আর মারামারির সময়ে আমি ছিলাম না। বৌয়ের শরীরটা হঠাৎ করে খারাপ হয়ে গিয়েছিলো।
সামিন উঠে দাঁড়িয়ে পাঞ্জাবির হাতা গোটাতে গোটাতে বলে," মারামারি করার পারমিশন দিয়েছে কে ওদের? ইলেকশনের আগে আমায় কেস খাইয়ে ছাড়বে দেখছি। আমি আসছি।"
_ভাই মাথা ঠান্ডা করেন। ছেলেপুলেরা দেখছে সবটা।
_আমি দেখতে চাই জামিল। ওদের থানা থেকে ছাড়িয়ে আনতে হবে। উকিলকে ফোন কর।
_বাইরে বৃষ্টি পরছে ভাই। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন!
_এক্ষুনি যাবো। তুই বাড়ি যা। তোর বৌকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যা।
জামিল কিছু বলে না। সামিন ইয়াসার ক্ষেপে গিয়েছে। তাকে এই মুহূর্তে বাঁধা দিলে সে শুনবে না,তা জামিল জানে।
ইয়াসার রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলে,"সেদিন ভরা জনসভায় আমাকে থাপ্পর মেরে বলেছিলো আমি নাকি কাপুরুষের মতো ওর বাবাকে পেছন থেকে ছুরি মেরেছি। সামনাসামনি লড়ার ক্ষমতা আমার নেই। আর ওর বাবা এখন রাতের অন্ধকারে বিরোধী পার্টির সাইনবোর্ড খুলে ফেলছে। এর শেষ দেখে ছাড়বো আমি।"
***
গায়ের সাথে ভেজা পাঞ্জাবি লেপ্টে আছে। টেবিলের উপর এক কাপ ধোঁয়া ওঠা গরম চা। হাতে গাড়ির চাবি। সামিন চাবিটা দিয়ে টেবিলের ওপর ঠকঠক আওয়াজ করছে। আতাউর আলম সেদিকে একবার তাকিয়ে ওসি সালামের কথায় কান দেয়। ওসি সালাম বলতে থাকে,"আপনাদের দুজনের ছেলেরাই সমানে সমান। নিজেদের ছেলেদের সামলানোর দায়িত্ব আপনাদের। এখনি এতো দায়িত্বহীনের মতো কাজ করলে মেয়র হয়ে কি করবেন?"
সামিন চায়ের কাপ উঠিয়ে চুমুক দেয়। ওসি বলতে থাকে,"এবারের মতো ছেড়ে দিচ্ছি। দুদিন পরে নির্বাচন। ছেলেদের সামলে রাখুন। ফের আমার খপ্পরে পরলে একটাকেও ছাড়বো না।"
আতাউর আলম বলে,"সরকারি দলের ছেলে গুলোর দোষ সব। সব ইয়াসারের পোষা কুকুর। তারা আগে আমার ছেলেদের উপরে হাত তুলেছে।"
_আর আপনি চোরের মতো আমার সাইনবোর্ড, পোস্টার খুলে ফেলেছেন নিজের এলাকা থেকে। এতো ভয় সামিন ইয়াসারকে? ভয়ের চোটে সব শুকিয়ে গিয়েছে তাই না?
_মুখ সামলে কথা বলো। বেয়াদব ছেলে।
_আপনিও মুখ সামলে কথা বলুন।
"আরে আরে কি হচ্ছে কি এসব! এটা থানা। ভুলে গেছেন?"
আতাউর আলম বলে,"না ভুলিনি ওসি সাহেব। আমি আমার ছেলেদের নিয়ে গ্যারান্টি দিচ্ছি। ভবিষ্যতে এমন কিছু হবে না। আপনিও ইয়াসারকে বলে দিন ও যাতে ওর কুকুর গুলোকে সামলে রাখে।"
আতাউর আলম হুমকির মতো করে কথাটি বলে চলে যায়। সামিন ইয়াসার রাগে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রাখে। কিছুক্ষণ বাদে সেও থানা থেকে বের হয়ে গাড়িতে বসে গাড়ি স্টার্ট করে। ঝিরঝির করে বৃষ্টি পরছে বাইরে। থানা থেকে বের হতে হতে রাত হয়ে গিয়েছে। ইমতিয়াজ মির্জা অনেকবার ছেলেকে ফোন দিয়েছে,সামিন ফোনটা রিসিভ না করে রেখে দিয়েছে। এক মনে ড্রাইভিং করছে সে। থানাপাড়া রোড পাড় হয়ে মোড় নিতেই আচমকা দূর থেকে কেউ তার গাড়ি লক্ষ্য করে একটা মাঝারি সাইজের পাথর ছুড়ে মারে। সামিনের গাড়ির সামনের কাঁচে লেগে তাতে ফাটল ধরে যায়। হুট করে ব্রেক কষে সামিন। দাঁত খিচিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে,"বা'স্টা'র্ড!"
গাড়ি থেকে নেমে আশেপাশে তাকায়। বৃষ্টির কারনে রাস্তা শুনশান হয়ে আছে। ল্যাম্পোস্টের বাতি টা পিট পিট করে জ্বলছে । সামিন বিকট শব্দে চেঁচিয়ে ওঠে,"সাহস থাকলে সামনে আয়। একেবারে পুতে দেবো। সামনে আয় বলছি।"
"মাঘের শীত বাঘের গায়,সামিন ইয়াসার মেয়ে মানুষের চড় খায়।"
তিন চারজন কমবয়সী ছেলের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। সবাই একসাথে চেঁচিয়ে কথাটি বলে। সামিন আওয়াজটা কোন দিক থেকে আসছে সেদিকে লক্ষ্য করে ছুটে যায়। কিন্তু সে গিয়ে কাউকে খুঁজে পায়না সেখানে। সামিন চেঁচিয়ে বলে,"মায়ের বুকের দুধ খেয়ে থাকলে এদিকে আয় শু'য়ো'রে'রা।"
এমন সময় সামিনের ফোন বেজে ওঠে। ভেজা হাতে ফোনটা রিসিভ করতে বেশ বেগ পেতে হয়। কোনোমতে ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে রাহাত বলে,"ভাই। জামিল ভাইকে কেউ কু'পি'য়ে'ছে !"
চলমান.....