ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগলো চোখে

৯ম পর্ব

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে

#পর্বসংখ্যা_৯

#Esrat_Ety

স্ত্রীর মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে গালে হাত রেখে ধরা গলায় ডাকতে থাকে আতাউর আলম।

"ও রেহেনা। ওঠো। রেহেনা।"

রেহেনা সাড়া দেয় না। দীর্ঘসময় ধরে সে অচেতন হয়ে পরে আছে। আজান আয়াত মায়ের পায়ের কাছে বসে আছে। ভেতরের ঘর থেকে আতাউর আলমের মা রিনরিনে গলায় চেঁচিয়ে যাচ্ছে,"আতাউর। এতো চিল্লাচিল্লি কে করে? ও আতাউর,তোর পোলাপান এতো চিল্লাচিল্লি ক্যান করে। ওগোরে ধমক দে।"

রনি ছু'ড়ি টা পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে আতাউর আলমকে বলে,"জামিল ভাইয়ের যায়গায় আইসিইউতে যদি আজ ইয়াসার ভাই থাকতো তাহলে এখানে আজ পাঁচটা লা'শ পরে থাকতো।"

আতাউর আলমের কানে সেকথা পৌঁছায় না। সে স্ত্রীর জ্ঞান ফেরাতে ব্যস্ত।

রনি তৌফ নামের ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,"শাওন কই? সামান্য মিষ্টি আনতে এতো দেরি?"

শাওন একটা মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে ঘরে ঢোকে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,"মুসলিম পাড়ায় গিয়ে একটা দোকান খোলা পেলাম। সব শা*লা বন্ধ।"

_হু,তারা তো আর জানে না আমাদের ভাই আজ বিয়ে করবে। তাহলে খোলা থাকতো।

তৌফ নামের ছেলেটা দাঁত বের করে বলে,"ভাই এই আতাউর আলম আর তার বৌ আজ থেকে আমাদের তাঐ-মাঐ।"

রনি পকেট থেকে সিগারেট বের করতে করতে বলে,"হু,আর ওই ফ'ট'কা চালাক মেয়েটা আমাদের ভাবী। আমার তো ভাবতেই রা'গ উঠে যাচ্ছে গায়ে। ভেবেছি ভাই কত মিষ্টি দেখে একটা ভাবী এনে দেবে আমাদের।"

_সুন্দর আছে তো ভাই। খারাপ না। মিষ্টিই তো দেখতে।

তৌফ হাসতে হাসতে বলে।

রনি বলে,"হু, দেখতে মিষ্টি কিন্তু ভয়ানক ঝা'ল। ভাই একে কিভাবে সামলাবে কে জানে।"

সিগারেটে এক টান দিয়ে একটা চেয়ার টেনে নিচু হয়ে ঝুঁকে বসে রনি, আতাউরের চোখে চোখ রেখে বলে,"থানা পুলিশ করবেন না তা জানি তবুও বলছি। থানা পুলিশ করার চিন্তাও করেছেন তো ওখানে আপনার মেয়েকে ইয়াসার ভাই এমন যায়গায় পু*তে দেবে,মেয়ের লা'শ-ও খুঁজে পাবেন না। আর চাচা...সরি...তাঐ, আপনার ছেলে দুটো অনেক ব্রিলিয়ান্ট। ওদের ডাক্তার বানাবেন। ওরা এতো অল্প বয়সে প্রা'ন হারালে এই দেশের অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।"

আতাউর আলম আতঙ্কিত মুখ নিয়ে রনির দিকে তাকায়, ফিসফিসিয়ে বলে,"বলবো না। কাউকে কিছু বলবো না।"

দু'চোখ বেয়ে তরল গড়িয়ে পরে আতাউর আলমের। আজ সে ভয়ানক অসহায়। একজন অসহায় বাবা।

"গুড। এবার তাহলে উঠি তাঐ? ওদিকে ভাই আর ভাবীর বাসর সাজাতে হবে গিয়ে। হাতে মেলা কাজ।"

রনি শার্টের হাতা গুটিয়ে নিয়ে সবাইকে বলে,"চল।"

তারপর আতাউর আলমের দিকে তাকিয়ে বলে,"মাঐ মা-এর জন্য একজন ডাক্তার পাঠিয়ে দিচ্ছি। ইয়াসার ভাইয়ের শাশুড়ি এভাবে অজ্ঞান হয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা পরে আছে,শুনলে ইয়াসার ভাই খুব রেগে যাবে। আসছি তাঐ। আসসালামুয়ালাইকুম।"

রনির পিছু পিছু দলের সবাই দাঁত বের করে ঘর থেকে বের হয়। আতাউর আলম তার স্ত্রীর মাথায় হাত দিয়ে সদর দরজার দিকে দৃষ্টি দিয়ে বসে আছে পাথরের মতো।

***

কাজী-কে ফুয়াদ বিদায় দিয়ে পুনরায় ঘরে ঢুকে সামিনের দিকে তাকিয়ে বলে,"হয়েছে শান্তি?"

সামিন ইয়াসার থমথমে মুখ নিয়ে বসে আছে। আড়চোখে আলোর দিকে তাকিয়ে আলোকে দেখে। মেয়েটাকে কেমন বিধ্বস্ত লাগছে। মেঝের দিকে দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে আছে।

রাহাত এবং আরাফ শুকনো মুখে তাদের নেতাকে দেখছে। তাদের পুরো ব্যাপারটা হজম করতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। ইয়াসার উঠে দাঁড়িয়ে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে,"রাত সাড়ে তিনটা বেজে গিয়েছে। ভিজিটিং আওয়ার্স শেষ। নয়তো জামিলের কাছে যেতাম। ওর কি অবস্থা এখন? ডাক্তার কি বলেছে?"

আরাফ বলে,"সেই একই কথা। বাহাত্তর ঘন্টার আগে কিছু বলা যাচ্ছে না।"

সামিন ইয়াসার চোখ মুখ শক্ত করে আলোর দিকে তাকিয়ে ধমকের সাথে বলে,"এইযে নিষ্পাপ বাপের নিষ্পাপ কন্যা। এদিকে তাকাও।"

আলো তাকায় না। সামিন ধমক দিয়ে বলে,"তাকাও বলছি।"

আলো এবার ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকায়। তার সামনে সাক্ষাৎ একজন পি'শা'চ দাঁড়িয়ে। সামিনের দিকে ঘৃণার দৃষ্টি দিয়ে আলো তাকিয়ে থাকে। সামিন ফিচেল হেসে বলে,"বাড়ির মহিলাদের পাঠিয়ে দিচ্ছি। যেকোনো ধরনের অসুবিধা তাদের সাথে বলবে। তবে কোনো তিড়িং বিড়িং করবে না। কাউকে অসম্মান করে কথা বলবে না। বেয়াদবি করবে না। যদি আমার কানে আসে তাহলে কিন্তু!"

_কি করবি তুই? ক্রি'মি'না'ল একটা!

আলো কান্না মিশ্রিত কন্ঠে কথাটি বলে তেড়ে এসে সামিনকে চ'ড় মারতে চায়। সামিন হাত ধরে ফেলে আলোর। সবাই ওদের দেখছে। সামিন ঠান্ডা গলায় বলে,"এতো শক্তি অপচয় করো না।"

তারপর রাহাতের দিকে তাকিয়ে বলে,"আয় আমার সাথে।"

রাহাত, ইলহাম এবং আরাফ সামিনের পিছু পিছু ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

ফুয়াদ আলোর দিকে তাকিয়ে আছে,আমতা আমতা করে বলে,"আলো। দেখো মেয়ে,তুমি এভাবে কেঁদো না। সামিন কিন্তু খারাপ ছেলে না।"

"তুই এখান থেকে যা কু'ত্তা"

আলো চেঁচিয়ে ওঠে। ফুয়াদ একটা ঢোক গিলে ফেলে। সামিন হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে আসে আবারো। চেঁচিয়ে বলে,"কি হচ্ছে ফুয়াদ? ও তোকে কু'ত্তা বললো?"

ফুয়াদ সামিনকে আটকায়,"বাদ দে। চল এখান থেকে।"

সামিন দাঁত খিচিয়ে আলোর মুখোমুখি দাঁড়ায়, পেশীবহুল শক্তিশালী হাতে আলোর থুতনি ধরে নাড়া দিয়ে বলে,"একেবারে জবান কম চালাবে। এটাই প্রথম,এটাই লাস্ট। মনে থাকে যেন।"

কথাটি বলে সামিন চলে যায়। ফুয়াদ তার পিছু পিছু বেড়িয়ে যায়।

আলো আবারো মেঝেতে বসে পরে। তার চোখদুটো ঝাপসা হয়ে আসছে। চোখের সামনে তার আব্বু,আম্মু,আয়াত,আজান, দাদী এবং ইশমামের ছবি ভেসে উঠছে। ইশমামের কথা মনে পরতেই আলো ডুকরে কেঁদে ওঠে। কিছুক্ষণ পরে সে অনুভব করলো সে শ্বাস নিতে পারছে না। গলা থেকে অনেক কষ্টে ফিসফিসিয়ে একটি শব্দ বের হলো। আর সেটা হলো,"ইশমাম।"

***

লিভিং রুমে বাড়ির সব মেয়েরা দাঁড়িয়ে। সামিনকে গেস্টরুম থেকে বের হতে দেখে ইশিতা দৌড়ে যায়,ভাইয়ের দুই বাহু ধরে ঝাকুনি দিয়ে বলে,"কেনো করলে ভাইয়া? ছিঃ। তুমি আমার বড় ভাইয়া? যাকে আমি এতো ভালোবাসি? এ তোমার কোন রূপ ভাইয়া।"

ইলহাম বিরক্ত হয়ে বলে,"ভ্যাজর ভ্যাজর করিস না। ভাইয়াকে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি দাও কেউ।"

সিতারা দৌড়ে রান্নাঘরে চলে যায়। সামিন ইশিতার দিকে তাকায়। ইশিতা কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,"বাবা চেন্নাই থেকে ফিরলে কি বলবে তুমি? বলো!"

সামিন ম্লান হেসে বলে,"বাবা খুশি হয়ে যাবে। মেয়ে তুলে এনে বিয়ে করা, উঠিয়ে নিয়ে আসা, এসব এবাড়ির ঐতিহ্য। আমি আমার বাড়ির ঐতিহ্য রক্ষা করেছি। ভুলে গেছিস নাকি? শুনিসনি আমার বাপ-চাচারা সবাই তুলে এনে বিয়ে করেছিলো? বাবা মাকে তুলে এনে বিয়ে করেছিলো, আমাদের দাদা ইন্তেখাব মির্জাও তো দাদীকে তুলে এনেছিলো। এ প্রজন্ম থেকে আমি না হয় এই ঐতিহ্য-টা চর্চা করলাম। "

ইশিতা আহত চোখে ভাইয়ের দিকে তাকায়। ইয়াসার ইশিতার দৃষ্টিকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে রিতুর দিকে তাকিয়ে বলে,"রিতু।"

রিতু ভয়ার্ত কন্ঠে বলে,"জ্বি ভাইয়া।"

_তুমি এ বাড়ির কি?

_মেজো বৌ ভাইয়া।

_ঐ ঘরের ভেতরে যে আছে সে তোমার বড় জা। এ বাড়ির বড় বউ। আমার মা জীবিত থাকলে এ বাড়ির বড় বউকে বরন করে নেওয়ার জন্য যা যা করতো সে দায়িত্ব আমি তোমার কাঁধে দিলাম। আশাকরি তুমি তোমার দায়িত্ব খুব সুন্দর ভাবে পালন করবে।

রিতু বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়ায়। ইশিতার মতো প্রতিবাদ জানানোর সাহস, অধিকার,ক্ষমতা কোনটিই যে তার নেই।

_আর,ওকে কিছু খাবার দাও আগে। খেতে না চাইলে আমাকে ডাকবে। কোনো ধরনের বাজে ব্যবহার কিংবা গালাগাল দিলে দেরি না করে আমাকে ডাকবে।

রিতু আবারো মাথা নাড়ায় ভাসুরের কথায়।

ইশিতা ভাইয়ের দিকে একঝলক রাগী দৃষ্টিতে চেয়ে কপাল কুঁচকে দোতলায় চলে যায়। দোতলায় উঠে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে থাকে সে।

ইলহাম হেসে সামিনকে বলে,"ওর বান্ধবী রিদিকে পছন্দ করে রেখেছিলো তোমার জন্য। সেজন্য রাগ হচ্ছে ওর তোমার উপর।"

ইতিমধ্যে হেনা এসে লিভিং রুমে দাঁড়ায়। শরীরটা অসহনীয় যন্ত্রণায় বিষিয়ে উঠেছে তার। ইয়াসারের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলে,"ভাইয়া! এটা কি করলেন আপনি। একটা মেয়ের জীবন এভাবে নষ্ট করে দিলেন। জামিল সুস্থ হবে এতে?"

সামিন নরম গলায় বলে,"ঘরে গিয়ে রেস্ট নাও। এতসব চিন্তা মাথায় নিও না। জামিলের বাচ্চার ক্ষতি হবে।"

সিতারা এসে সামিনের সামনে পানির গ্লাস হাতে দাঁড়ায়। সামিন গ্লাসের দিকে একবার তাকিয়ে হনহন করে নিচতলার বারান্দায় চলে যায়।

রিতু চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ইলহাম ধমক দিয়ে বলে,"ভাইয়া কি বললো শুনতে পাওনি? খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে আছো যে! "

রিতু আমতা আমতা করে বলে,"কি করবো!"

_কি করবে মানে? ওকে সাজাবে। সাজিয়ে ভাইয়ার ঘরে দিয়ে এসো।

রিতু কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলে,"মেয়েটা ভয় পেয়ে আছে‌ । একটু ঠিক হোক।"

ইলহাম চোখ রাঙিয়ে রিতুর দিকে তাকায়। রিতু একটা ঢোক গিলে বলে,"যাচ্ছি।"

***

দরজার নব ঘোরার সাথে সাথে আলো মাথা তুলে তাকায়। তার দৃষ্টি ঘোলাটে। শরীরে বিন্দু পরিমাণ শক্তি অবশিষ্ট নেই। দরজা ঠেলে রিতু এবং বাড়ির দু'জন হেল্পিং হ্যান্ড ( সিতারা এবং ফুলির মা ) ভেতরে ঢোকে। রিতুর হাতে একটা প্যাকেট। সিতারার হাতে একটা প্লেটে কিছু খাবার। ফুলির মা ঘরের এসি অন করে দিয়ে রিতুর দিকে তাকিয়ে বলে,"হেরে কি ডাকবো ভাবী?"

_কি ডাকবে আবার। বড় ভাবী ডাকো।

ফুলির মা আলোর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,"মাশাআল্লাহ। চেহারা সুরত তো খুবই চমৎকার। গায়ের রং টা একটু চাপা। তয় বড় ভাইজানের পাশে খুব মানাইবো।"

আলো নড়েচড়ে বসে। রিতুর দিকে তাকায়। রিতু আলোর সামনে এসে হাতের প্যাকেট-টা আলোর পাশে রেখে নিজেও মেঝেতে বসে পরে আলোর মুখোমুখি।

কিছুক্ষণ আলোর দিকে তাকিয়ে থেকে একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে হাত বাড়িয়ে সিতারার হাত থেকে খাবারের প্লেট টা নেয়।

আলো চোখ নামিয়ে প্লেটের দিকে তাকিয়ে রিতুর মুখের দিকে তাকায়। ফ্রিজে কাস্টার্ড রাখা ছিলো। সেখান থেকে খানিকটা নিয়ে এসেছে আলোর জন্য। এক চামচ উঠিয়ে আলোর মুখের কাছে ধরে বলে,"খেয়ে নিন‌।"

আলো মুখ সরিয়ে নিয়ে কঠিন গলায় বলে,"খাবো না। নিয়ে যান এসব।"

_ভাইয়া রেগে যাবে। খেয়ে নিন।

আলো এক ঝটকায় রিতুর হাত থেকে চামচ ফেলে দিয়ে কাস্টার্ডের বাটি উল্টে ফেলে।

সিতারা এবং ফুলির মা চাপা স্বরে চেঁচিয়ে ওঠে,"মেজো ভাবী,বড় ভাইজানরে ডাকবো?"

রিতু ওদের থামিয়ে দিয়ে বলে,"না।"

তারপর আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,"ঠিকাছে। খেতে হবে না।তাহলে এই শাড়িটা পরে নিন। আপনার ফিগার মনে হলো আমার মতোই। ব্লাউজ আর পেটিকোট ফিট হয়ে যাবে।"

আলো কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,"কেনো পরবো আমি শাড়ি?"

_কারন আপনি নতুন বৌ তাই। এটা আপাতত পরে নিন। এগুলো একেবারেই নতুন,যদিও আমার। কাল আপনার জন্য শপিং করা হবে।

আলো শপিং ব্যাগটা উঠিয়ে দূরে ছুড়ে মেরে রিতুর দিকে তাকায়। কান্না মিশ্রিত কন্ঠে বলে,"আপনি না একটা মেয়ে? আমাকে আপনি বুঝতে পারছেন না?"

_পারছি। আপনাকেও পরিস্থিতি বুঝতে হবে। বোকা বোকা জেদ করে কিছু হবে না। শাড়িটা পরে নিন। আপনাকে ভাইয়ার ঘরে দিয়ে আসবো।

আলো তেজী কন্ঠে বলে ওঠে,"অসম্ভব। আমি ম'রে গেলেও ঐ জা'নো'য়া'রের ঘরে যাবো না। ম'রে গেলেও না।

রিতু আলোর দিকে তাকায়। তারপর ঠান্ডা গলায় বলে,"ম'রে গিয়ে লা'শ হয়ে গেলেও ঐ ঘরে আপনাকে যেতে হবে। এ বাড়ির বৌ হয়েছেন, এ বাড়ির নিয়ম জেনে নিন‌। ম'রে যান অথব বেঁচে থাকুন। স্বামীর শোবার ঘরে আপনাকে যেতেই হবে।

আলো ছলোছলো চোখে তাকিয়ে আছে রিতুর দিকে। রিতু উঠে শপিং ব্যাগটা তুলে নিয়ে এসে একটা গোলাপী রঙের সুতির শাড়ি বের করে। আলোর গলা থেকে ওড়নাটা টেনে নিয়ে নিচে ফেলে দিয়ে বলে,"আমি শাড়িটা পরিয়ে দিচ্ছি। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকুন। আমি চাইনা আপনি মা'র খান। তাই বলছি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকুন।

***

ফজরের আজানের সময় হয়ে এসেছে। আতাউর আলম রেহেনার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আজান আয়াত মায়ের পায়ের তালুতে ম্যাসাজ করে দিচ্ছে। রেহেনা কিছুক্ষণ শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ডুকরে কেঁদে ওঠে। আতাউর আলম স্ত্রীর মাথাটা নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে,"শান্ত হও রেহেনা। সব ঠিক হয়ে যাবে। সব কিছু।"

রেহেনা ফোপাতে থাকে,"কি ঠিক হবে? আমার মা'টা আমার বুকে ফিরবে? আমার প্রানটা বুঝি বেরিয়ে গেলো আলোর আব্বু। আমাকে শক্ত করে ধরো।"

মায়ের কথায় আজান-আয়াত ফুঁপিয়ে ওঠে। রেহেনা মাথা তুলে স্বামীর দিকে তাকায়,হঠাৎ করে স্বামীর বুকে কি/ল ঘু/ষি মারতে মারতে বলতে থাকে,"সবকিছুর জন্য তুমি দায়ী। এতো বার বলেছি রাজনীতি নামের ম'র'ন খেলায় নেমো না,নেমো না। তোমার ক্ষমতার লোভে আমি আমার মেয়েটাকে হারালাম। তুমি দায়ী আলোর বাবা। তুমি আমার মেয়েটাকে এনে দাও।"

রেহেনা হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে দেয়। আতাউর আলম স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকে। আসলেই কি সবকিছুর জন্য সে দায়ী?

****

"ভাই!"

রাহাতের ডাকে সামিন পেছন ফিরে তাকায়। হাতের সিগারেট টা ফেলে দিয়ে পা দিয়ে পি'ষে দেয়। স্বাভাবিক গলায় বলে,"রনি এসেছে?"

_হু ভাই।

_খবর কি ওদিকের?

_আতাউরের স্ত্রী অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। রনি ডাক্তার পাঠিয়ে দিয়েছে।

_গুড, একেবারে আমার ছেলেদের মতো কাজ করেছে। এই রনিকে পুরষ্কার দিতে হবে।

রাহাত মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। আরাফ এবং ফুয়াদ চলে আসে। সামিন ইয়াসার বলে,"তোরা এখন এখানে থেকে যা,নিচতলায় রেস্ট নে। ভোর হয়ে গিয়েছে। কিছুক্ষণ পরে এখান থেকে সোজা হসপিটাল যাবো। ক্যাম্পেইন করতে হবে না আর। নির্বাচনে আমিই জিতবো।"

রাহাত অনেকটা জড়তা নিয়ে বলে,"ভাই বিয়ে তো করে নিলেন এখন কি করবেন?"

_সংসার।

ঠান্ডা গলায় জবাব দেয় সামিন ইয়াসার। ফুয়াদ বলে,"তোকে যত দেখছি তত অবাক হচ্ছি। তুই একটা অমিমাংসিত রহস্য।"

সামিন ফিচেল হাসে। ফুয়াদ বলতে থাকে,"আজ কত বড় একটা অন্যায় করলি তুই জানিস? কোনো ক্ষ/মা নেই এর।"

_তোরাও আমাকে সাহায্য করেছিস। তোদের ও কোনো ক্ষ/মা নেই।

ফুয়াদ চুপ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরে বলে ওঠে,"আমার জীবনের চরম দুর্ভাগ্য তোর মতো বন্ধু পাওয়া।"

সামিন শুকনো হাসি হাসে, তারপর ওদের সবার দিকে তাকিয়ে বলে,"আর আমার জীবনের পরম সৌভাগ্য তোর মতো বন্ধু আর ওদের মতো কিছু ছোট ভাই পাওয়া। এখন পকপক না করে দুঘন্টা রেস্ট নে। শরীরে শক্তি যোগান দে। আমি মেয়র হলে খুশিতে নাচতে হবে তো!"

রাহাত,আরাফ এবং ফুয়াদ চলে যায়। সামিন নিচতলার বারান্দার রেলিং ধরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। তার দৃষ্টি বাইরের বাগানের দিকে। এই বাগানটা সামিনের নিজের হাতে করা,নিজেই সবসময় যত্ন করে বাগানের। ফুলের গন্ধে ছেয়ে গেছে আশপাশ টা। সামিন একটা গভীর নিঃশ্বাস নেয়। পেছন থেকে রিতু নিচু স্বরে ডাকে,"ভাইয়া।"

সামিন বাগানের দিকে দৃষ্টি রেখে বলে,"বলো রিতু। কিছু বলেছে? গালাগাল করেছে তোমাকে?"

_না ভাইয়া।

_খেয়েছে? কি খেতে দিয়েছিলে?

_কাস্টার্ড। খায়নি।

_আচ্ছা না খাক, ঘরে কিছু খাবার রেখে এসো। খিদে পেলে খেয়ে নেবে।

রিতু কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলে,"আপনার ঘরে যেতে চাচ্ছে না।"

সামিন রিতুর দিকে তাকিয়ে বলে,"কে?"

_ওই মেয়েটা......মানে ভাবী।

সামিন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে,"তুমি যাও। ইহান হয়তো এখন উঠে যাবে। ঘরে যাও। আমি দেখছি!"

***

দরজা ঠেলে সামিন ভেতরে ঢোকে। পুরো ঘর অন্ধকার হয়ে আছে।আলো হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়ে ঘরের এক কোনায় বসে আছে। সামিন সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দেয়। আলো মাথা তুলে তাকিয়ে সামিনকে দেখে।

সামিন নরম গলায় বলে,"খাওনি কেনো? সামিন ইয়াসার আর ২৪ ঘন্টা পেরোলেই এই শহরের মেয়র হবে,তার শহরে কেউ অভুক্ত থাকুক তা সামিন ইয়াসার মির্জা চায় না।"

কথাটি বলেই সামিন হাসে। তার সে হাসিতে ছিলো আলোর প্রতি বিদ্রুপ। আলো উঠে দাঁড়ায়। তার পরনে শাড়িটা এলোমেলো হয়ে আছে। রিতু কোনোমতে পরিয়ে দিয়ে গিয়েছে। আলো সরাসরি সামিনের চোখে চোখ রেখে বলে,"তুই একটা জা'নো'য়া'র।‌ পি'শা'চ তুই একটা।"

_গলাবাজি ভালোই করতে পারো তুমি। তোমার বাবার থেকে শিখেছো। আমি তোমার বাবার কান্ডজ্ঞান দেখে অবাক হচ্ছি। নিজের পরিবারের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ অথচ সে চললো জনগনের নিরাপত্তা দিতে। মেয়রের দায়িত্ব শুধু বর্ষাকালে সিটি কর্পোরেশনের অলিতে গলিতে মশার ওষুধ স্প্রে করা অথবা শীতকালে কম্বল বিতরণ করা না। আর তার বোকা বোকা কাজ দেখে আরো অবাক হতে হয়। আমাকে না কু'পি'য়ে নিরপরাধ ছেলেটাকে কু'পি'য়ে'ছে।

_আমার বাবা কিচ্ছু করে নি। আমার বাবা কিচ্ছু করেনি।

চেঁচাতে থাকে আলো। সামিন ম্লান হেসে বলে,"ক্ষমতার লোভ কাউকে জেকে ধরলে সে কতদূর নিচে নামতে পারে তা আমি জানি। শোনো সৎ বাবার সৎ কন্যা। তুমি ঠিকই বলেছ,আমি একটা পি'শা'চ। এই পি'শা'চের আরো পৈশাচিক রূপ দেখতে চাও? জানি চাও না। ভালোয় ভালোয় বলছি ওখানে যে খাবারটা রাখা আছে চুপচাপ খেয়ে নাও,নয়তো সেই রূপটাও দেখাবো।"

আলো চুপ করে সামিনের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সামিন বলে,"চোখ নামাও। মেয়ে মানুষের চোখ সবসময় নিচু হয়ে থাকবে।"

তারপর কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলে,"মাথা মোটা বাবার মাথা মোটা কন্যা। কোন সাহসে তুমি আমার গায়ে হাত তুলেছিলে জানা নেই। তবে তুমি নিজেই সেদিন নিজের জন্য খাল কেটে রেখেছো ‌। প্রত্যেকটা দিন আমাকে অপমান জনক কথা বলে সেই খালে একটু একটু করে পানি দিয়েছো, আজ কুমির তোমার খালে প্রবেশ করেছে।"

_আপনি একটা জা'হি'ল।

নিস্তেজ কন্ঠে বলে আলো।

_খাবার টা খেয়ে নাও।

_খাবো না।

_খেয়ে নাও।

_খাবো না।

_খেয়ে নাও।

_বললাম তো খাবো না।

সামিনের রাগ উঠে যায়। আলোর দিকে এগিয়ে যায় সে। আলো তেজী কন্ঠে বলে,"এদিকে এগোলে কিন্তু!"

_কি করবে তুমি?

সামিনকে কিছুটা অবাক করে দিয়ে আলো সামিনের মুখের উপর থুতু ছুড়ে মারে। ক্ষোভে সামিন হাত উঠায় আলোকে চ*ড় মারবে বলে। তৎক্ষণাৎ আলো নিজের গালে হাত রেখে চোখ বন্ধ করে ফেলে। সামিন থেমে যায়। চ*ড় না মেরে আলোর দিকে তাকিয়ে আছে সে। আলো গালে হাত দিয়ে,চোখ বন্ধ করে রেখেছে।

চলমান........

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন