ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগলো চোখে

১০ম পর্ব

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে

#পর্বসংখ্যা_১০

#Esrat_Ety

নয় ঘন্টা আগে শেষ অনলাইনে এসেছিলো অদ্রিতা। দশমিনিট পরপর ইশমাম ফোন হাতে নিয়ে চেক করে দেখেছে অদ্রিতা অনলাইনে এসেছে কিনা। কিন্তু প্রত্যেকবার ফোন হাতে নিয়ে হতাশ হয়েছে সে। ফোনটা একটা ডিভানের উপরে ছুঁড়ে মেরে ইশমাম বসে থাকে চুপচাপ। আলোর প্রতি প্রচন্ড রাগ হচ্ছে তার। রাতে বাড়িতে এসে একটা বার ফোন দিয়ে জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি সে। নিশ্চয়ই এসেই ঘুমিয়ে গিয়েছে। বড্ড ঘুমকাতুরে মেয়েটা। ইশমামের সারাটা দিন কেটেছে অস্থিরতায়। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ইশমাম সময় দেখে, সন্ধ্যা ছয়টা। তারমানে বাংলাদেশে এখন সময় সকাল পাঁচটা। এতো সকালে অদ্রিতা ঘুম থেকে ওঠার মেয়ে নয়। কি জানি কখন ঘুম ভাঙবে মহারানীর, কি জানি কখন মনে পরবে তার যে তার একটা ফোনের জন্য কেউ অপেক্ষা করে বসে আছে।

***

সামিন আলোর মুখের দিকে দীর্ঘসময় তাকিয়ে থাকে। আলো নিজের গালে কোনো চ*ড়ের অস্তিত্ব টের না পেয়ে ধীরে ধীরে চোখ খুলে তাকায়। তাকিয়ে দেখে পি'শা'চ টা তার দিকে চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে তাকে দেখছে। ঘেন্নায় আলোর গা গুলিয়ে ওঠে। নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে দুই কদম পিছিয়ে দাঁড়ায়। সামিনের চোখে আলোর অস্বস্তি ধরা পরে। সে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,"চার ঘন্টা আগে আমাদের বিয়ে হয়েছে। জোর করে হোক, জুলুম করে হোক, যেভাবেই হোক, বিয়েটা হয়েছে। তুমি আমার স্ত্রী। আমার অধীনস্থ তুমি। বারবার থুতু দেওয়া,চ'ড় মারা আমি বরদাস্ত করবো না। ভদ্র হয়ে থাকতে বলেছি, ভদ্র হয়ে থাকো। তোমার এবং তোমার পরিবারের জন্য সেটাই ভালো হবে।"

কথাটি বলে সামিন ইয়াসার ঘর থেকে হনহনিয়ে বের হয়। তার শরীরের ধাক্কা লেগে দরজার কপাট বিকট শব্দে কাঁপতে থাকে। আলো ধপ করে মেঝেতে বসে পরে। আশ্চর্য ব্যাপার,তার চোখে এখন পানিও আসছে না!

***

"পেশেন্টের অবস্থা খুবই ক্রিটিক্যাল। হাত পায়ের রগ কেটে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিলো। মারাত্মক ভাবে আহত সে। বারবার একই কথা জিজ্ঞেস করবেন না। শুধু আল্লাহকে ডাকুন।"

সামিন ইয়াসার ডাক্তারের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নরম গলায় বলে,"বাঁচবে তো?"

_আশা করা যায়। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা অন্যরকম হলে আমাদের তো কিছু করার নেই।

ডাক্তার চলে যেতেই সবুজ ইয়াসারের দিকে তাকিয়ে বলে,"ভাই! কতটা নি'র্দ'য় হলে কেউ হাত পায়ের রগ কে'টে জা'ন নেওয়ার কথা ভাবতে পারে!"

ইয়াসার চুপ করে থাকে। রনি বলে,"শা'লা পুরোটাই ভণ্ড! আগে তো ক্রা'ই'ম রিপোর্টার ছিলো। ক্রা'ই'ম নিয়ে রিপোর্ট করতে করতে শিখে গিয়েছে সব।"

সামিন একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে,"আতাউর আলমের আপডেট কি?"

_বাড়ি থেকে কেউ বের হয়নি। কেউ বাড়িতে ঢোকেনি।

সামিন আর কিছু না বলে হাঁটতে শুরু করে। রাহাত বলে,"কই যাচ্ছেন ভাই?"

_বাড়িতে। তোরা এখানে থাক। কোনো সমস্যা হলে আমায় ফোন দিবি। ফুয়াদ এবং আরাফ আমার সাথে আয়।

রাহাত এবং রনি মাথা নাড়ায়। ফুয়াদ এবং আরাফ সামিনের সাথে চলে যায়।

তৌফ রাহাতের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে,"ঘরে নতুন বৌ রাইখা অন্য কোথাও মন টিকবে এখন?"

রাহাত চোখ রাঙানি দিয়ে বলে,"ফাজলামির কথা বলিস না। আমাদের মন মেজাজ ঠিক নেই। কাল সারারাত কেউ ঘুমাইনি।"

রনি রাহাতের দিকে তাকিয়ে বলে,"কাল কিছু হয়েছিলো? ভাইয়ের বাসর?"

_কি একটা বিয়ে,তার আবার বাসর। থাপ্রা থাপ্রি আর থুতু ছোড়াছুড়ি হয়েছিল শুধু। এই মেয়ের তেজ কমে এতো সহজে? ভাইয়ের মাথায় কি চলতেছে কে জানে! বিয়ে কোন ধরনের প্রতিশোধ বলতে পারিস? এটা কি স্টার জলসা? হুদাই.... ভাইয়ের মাথায় সমস্যা দেখা দিয়েছে ‌‌। আলো যেদিন ভাইকে চ'ড় মে'রে'ছি'লো সেদিন থেকেই সমস্যা ভাইয়ের মাথায়। ভাই তো আগে এরকম ছিলো না।

তৌফ হাসতে হাসতে বলে,"ভাই আমার মনে হয় ইয়াসার ভাই এই মেয়েটাকে পছন্দ করতো। দেখেন নি? যখনই বলতেন ভাই মেয়েটাকে কিছু করেন, মেয়েটাকে কিছু করেন তখনই ভাই বলতো বাদ দে শুধু নজর রাখ,বাদ দে শুধু নজর রাখ। আর একটু গভীর ভাবে চিন্তা করলেই বুঝতে পারবেন,যে মানুষটা বিয়ে-ই করতে আগ্রহ দেখাতো না সে বিয়ে করে নিলো হুট করে,তাও আবার শত্রুর মেয়েকে। আশ্চর্য না বিষয়টা!"

***

ইশমামের অস্থিরতা বাড়তে থাকে। পনেরো ঘন্টার বেশি হয়ে গিয়েছে অথচ অদ্রিতা তার সাথে কোনো যোগাযোগ করছে না। আচ্ছা,অদ্রিতার ফোনটা নষ্ট হয়ে যায়নি তো! অদ্রিতা তো প্রায়ই বলতো তার ফোনটা কাজ করছে না। কিন্তু সেটা হলেও তো অদ্রিতা কোনো না কোনোভাবে তাকে ইনফর্ম করে দিতো। যত সময় যাচ্ছে, অস্থিরতা বেড়ে চলেছে ইশমামের। বারবার ফোন হাতে নিয়ে চেক করা ছাড়া আর কিছুতেই মন দিতে পারছে না সে।

ফুয়াদ গাড়িতে উঠে ড্রাইভিং সিটে বসে। সামিন তার পাশে বসে। আরাফ পেছনের সিটে। ফুয়াদ গাড়ি স্টার্ট করার আগে সামিনের দিকে একবার তাকায়।

"সত্যিই বাড়িতে যাবি? পার্টি অফিসে যাবি না? মিটিং ডেকেছিলি তো।"

_না। আগামীকাল ভোটকেন্দ্র গুলোতে যাবো সোজা। লোক লাগিয়ে দিয়েছি,তারা সবটা দেখবে।

ফুয়াদ গাড়ি স্টার্ট করে। সামিন সামনের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে বসে আছে। কিছুদূর যাওয়ার পরে ফুয়াদ বলে,"একটা কথা বলতো? তুই তো একটা শিক্ষিত ছেলে। তাও এরকম একটা বোকামি কেনো করলি? এভাবে বিয়ে হয়?"

_হয়েছে তো, ও কবুল বলেছে,আমি কবুল বলেছি। তিন লক্ষ টাকা কাবিন ধরে বিয়ে করেছি। কিছুদিন পরে কাবিনের কপি বের হবে।

ফুয়াদ ড্রাইভ করতে করতে বলে,"সেটা বলিনি আমি। না ও তোকে ভালোবাসে,না তুই ওকে ভালোবাসিস। এই বিয়ের পরিণতি কি হবে?"

সামিন চুপ করে থাকে। ফুয়াদ বলে,"জেদ করে একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করলি। ওর বাবা যদি দোষী হতো তাহলে থানায় যেতি। পুলিশে ধরিয়ে দিতি। তুই কেনো আইন নিজের হাতে তুলে নিলি?"

_ওর বাবাকে অন্য কেউ মেরেছিলো,ও কেনো থানাপুলিশ না করে, অপরাধী শনাক্ত না করে সরাসরি আমায় থাপ্পর মেরেছিলো?

_বাবার প্রতি মেয়ের ইমোশন টা বোঝার চেষ্টা কর। আলো একটু অন্যরকম মেয়ে।

_গাড়ি থামা।

গম্ভীর কন্ঠে বলে সামিন ইয়াসার। ফুয়াদ হুট করে ব্রেক কষে। সামিনের দিকে তাকিয়ে বলে,"আমাকে এই মাঝ রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে যাবি? অন্তত বাড়িতে দিয়ে আয় আমাকে। একটু ঘুমাবো আমি।"

সামিন ম্লান হেসে বলে,"আমার সাথে ভেতরে চল। কেনাকাটা করতে হবে।"

ফুয়াদ মাথা ঘুরিয়ে তাকায়। একটা শপিং মলের সামনে তাদের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। একবার সামিনের দিকে তাকিয়ে বলে,"কি কিনবি? কার জন্য কিনবি?"

_আমার বৌয়ের জন্য। সামিন ইয়াসারের বৌয়ের জন্য।

তাচ্ছিল্যের সাথে বলে সামিন‌। তার মুখে বিদ্রুপের হাসি।

***

মাম্মার বারন স্বত্তেও ইহান বারবার এসে নিচ তলার গেস্টরুমে উঁকি দিচ্ছে। মাম্মা বলেছে বাড়িতে নাকি কেউ এসেছে। সে নাকি ইহানের বড় মা হয়। বড় বাবার বৌ। ইহান খুবই উৎসুক হয়ে আছে তার বড় মাকে দেখবে বলে। কিন্তু মাম্মা বারবার ধমক দিচ্ছে। ঘরের ভেতর যেতেই দিচ্ছে না ইহানকে। চুপচাপ লিভিং রুমে কিছুক্ষণ পায়চারি করে আশেপাশে তাকায় ইহান। রিতু এখন রান্নাঘরে। বাড়ির সবাই দোতলায় আছে,কেউ নিচে নামেনি। ইহান সুযোগ পেয়ে গুটি গুটি পায়ে গেস্টরুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ছোটো ছোটো দুটি হাত দিয়ে গেস্ট রুমের দরজায় ধাক্কা দিয়ে দরজা খোলে।

ঘরে ঢুকে ইহান আশেপাশে তাকায়। কোথাও কাউকে দেখতে না পেয়ে ইহান বের হয়ে যেতে নেয় ঠিক তখনই ইহানের চোখ চলে যায় মেঝের দিকে। কেউ একজন মেঝেতে শুয়ে আছে।

ইহান গুটি গুটি পায়ে আলোর কাছে যায়। প্রচন্ড খিদে এবং ক্লান্তিতে চোখ বুজে, হাত দিয়ে পেট চেপে ধরে মেঝেতে পরে ছিলো আলো। কারো অস্তিত্ব টের পেয়ে আলো হকচকিয়ে উঠে বসে। সে ভেবেছিলো আবার বোধ হয় সামিন ইয়াসার নামের পি'শা'চ টা এসেছে। মাথা ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখে একটা ফুটফুটে বাচ্চা ছেলে তার দিকে তাকিয়ে আছে। আলো ছেলেটির দিকে তাকিয়ে থাকে। ইহান বলে,"তুমি কি বড় মা?"

আলো তার ঘোলাটে দৃষ্টি দিয়ে ইহানকে দেখে। ইহান বলতে থাকে," তুমি বড় বাবার বৌ?"

ঘনঘন নিশ্বাস ফেলতে থাকে আলো। ইহান ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে আলোর দিকে। আদুরে গলায় বলে,"তুমি কি বড় মা? বলো।"

_চলে যাও এখান থেকে।

তেজী কন্ঠে বলে আলো। ইহান ভয় পেয়ে যায় আলোর কন্ঠস্বর শুনে। আলো চেঁচিয়ে ওঠে,"বললাম না চলে যাও এখান থেকে। যাও বলছি! চলে যাও,চলে যাও।"

ইহান "মাম্মা" বলে একটা বিকট চিৎকার দিয়ে ছুটে বেরিয়ে যায় আলোর ঘর থেকে।

***

বেলা দেড়টা নাগাদ ইয়াসারের গাড়ি শান্তিনীড়ের গেইট দিয়ে ঢোকে। গাড়ি থামিয়ে নেমে পরে সে। পোনা এসে দাঁড়ায় পোর্চের সামনে। ইয়াসার গাড়ি থেকে নেমে পোনা চাচাকে বলে,"চাচা রিয়াজকে বলো গাড়ি থেকে প্যাকেট গুলো নামাতে। বাড়ির ভেতরে দিয়ে আসতে বলো।"

তারপর কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করে," বাড়িতে সব ঠিক ঠাক? কোনো ঝামেলা হয়নি তো?"

পোনা মাথা নাড়ায়। মুখে বলে,"কোনো ঝামেলা হয়নি তবে,"

_তবে কি?

_বড় মা ইহান বাবুকে ধমক দিয়েছে। বকেছে।

_বড় মা? কে বড় মা?

পোনা চাচার কথা বুঝতে না পেরে সামিন অবাক হয়ে জানতে চায়। পোনা থতমত খেয়ে বলে,"বড় বৌমা। তোমার বৌ।"

সামিন হতভম্ব হয়ে সদর দরজার দিকে তাকায়। ধমক দিয়েছে মানে। কি দুঃসাহস! সামিন ইয়াসার হন্তদন্ত হয়ে বাড়ির ভেতরে যায়। ভেতরে ঢুকে রিতুকে ডাকতে থাকে। রিতু এসে সামনে দাঁড়ায়।

"আলো ইহানকে বকেছে?

কঠিন গলায় জানতে চায় ইয়াসার। রিতু আমতা আমতা করে বলে,"ভাইয়া জানেনই তো ইহান অচেনা লোক দেখলে তাদের কিভাবে বিরক্ত করে। ভাবীকে কিছু বলবেন না।"

রিয়াজ এসে প্যাকেট গুলো লিভিং রুমে রেখে চলে যায়।

রিতু সেদিকে তাকিয়ে বলে,"এগুলো কি ভাইয়া?"

ইশিতা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে। সামিন বলে,"শাড়ি আছে এখানে। নতুন বৌয়ের জন্য।"

রিতু কিছুক্ষণ সামিনের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,"শুধু শাড়ি?"

_হ্যা, বাইশটা আছে। কম হয়ে গিয়েছে?

রিতু আমতা আমতা করে বলে,"ভাইয়া বাইশ টা শাড়ি দিয়ে কি হবে। আর নতুন বৌয়ের জন্য শুধু শাড়ি কেনা হয় না। শাড়ির সাথে আনুষঙ্গিক অনেক কিছু কিনতে হয়।"

সামিন রিতুর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,"আমি তো জানি না। তুমি বললে শাড়ির কথা। তাই নিয়ে এলাম।"

তারপর আবার চুপ করে থেকে বলে,"ঠিকাছে। যা যা লাগবে তুমি আর ইশিতা গিয়ে নিয়ে এসো বিকেলে।

রিতু মাথা নাড়ায়। ইশিতা কঠিন গলায় বলে,"আমি পারবো না।"

সামিন বোনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে রিতুকে বলে,"ওকে নিয়ে এসো।"

_আসবে না ভাইয়া। অভুক্ত থাকায় অবস্থা কাহিল হয়ে গিয়েছে তবুও জেদ করে কিছু খাচ্ছে না। অনেক চেষ্টা করেছি।"

সামিন রিতুর কথা শুনে গেস্টরুমের দিকে যায়,রিতু নিচু স্বরে বলে,"ভাইয়া প্লিজ গায়ে হাত তুলবেন না।"

"ভাইয়া ভাইয়ার বৌয়ের সাথে কি করবে সেটা তুমি বলে দেবে?"

পেছন থেকে ধমক দেয় ইলহাম। রিতু মুখ অন্ধকার করে দাঁড়িয়ে থাকে। আলো নামের অচেনা মেয়েটির জন্য তার খুব মায়া হচ্ছে। তারা একই রকমের কপাল নিয়ে জন্মেছে যে।

দরজা ঠেলে সামিন ভেতরে ঢুকে দরজা চাপিয়ে দেয়। আলো হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়ে বসে ছিলো মেঝেতে। মাথা তুলে তাকায় সামিনের দিকে। আলোর বিধ্বস্ত মুখটা দেখে হঠাৎ করে সামিনের অদ্ভুত অনুভূতি হয়। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে,"ইহান ছোট মানুষ। ও তো আর আমার মতো পি'শা'চ না। ওকে কেনো ধ'ম'কা'লে। ও একটা পাঁচ বছরের বাচ্চা।"

_এখন না হলেও একদিন ঠিকই আপনার মতো পি'শা'চ হবে ও। ওর শরীরে এই বংশের রক্ত।

সামিন একটা চেয়ার টেনে বসে বলে,"ষোল ঘন্টা না খেয়ে আছো। তারপরও গলায় কি জোর তোমার।"

_হাতেও অনেক জোর। দেখাবো?

ঠান্ডা গলায় বলে আলো। সামিন আলোর কথা শুনে বাঁকা করে হাসে। তারপর বলে,"শুনেছি তুমি কারাতে জানো। জাতীয় পর্যায়ে তৃতীয় হয়েছো। তবে এতেই নিজেকে অনেক কিছু ভেবে বসো না। যাদের সাথে ল'ড়ে'ছো তারা সবাই মেয়ে। দুর্বল প্রজাতি। আমি পুরুষ মানুষ। সিংহ পুরুষ। একটা মোটামুটি ধরনের চড় দিলে এখানে তিনদিন পরে থাকবে। "

আলো সামিনের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। সামিন বলে,"শোনো আত্মবিশ্বাসী বাবার আত্মবিশ্বাসী কন্যা ‌। তোমাকে একটা সুখবর দেই। তোমার মা সুস্থ আছে। অবশ্য তার সুস্থতা তোমার উপর নির্ভর করবে। যদি এখানে বাঁদরামি করেছো তাহলে ওখানে....."

সামিন থেমে আলোর দিকে তাকায়। আলোর চোখে উৎকণ্ঠা। সামিন বলে,"আমার সাথে চলো।"

_কোথাও যাবো না। আমি শুধু আব্বু আম্মুর কাছে যাবো। আমাকে যেতে দিন।

_কেনো যাবে? তুমি এখন আমার স্ত্রী।

_এই বিয়ে আমি মানি না।

তেজী কন্ঠে বলে ওঠে আলো তারপর উঠে দাঁড়ায়। শরীরের দুর্বলতার জন্য ঠিকভাবে দাঁড়িয়ে থাকতেও পারছে না সে। সামিন একবার আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,"চলো।"

_যাবোনা।

দাঁত খিচিয়ে বলতে চায় আলো। সামিন শীতল চোখে আলোর দিকে তাকায়। তারপর আলোর হাত ধরে টানতে টানতে গেস্টরুম থেকে বের করে আনে। আলো নিজের হাতটাকে সামিনের হাত থেকে ছাড়ানোর প্রানপন চেষ্টা করে। কিন্তু সে অপারগ।

***

রেহেনা স্বামীর মাথায় হাত রাখে। চোখ বুজে ইজি চেয়ারে আধশোয়া হয়ে বসে আছে আতাউর আলম। স্ত্রীর হাতের স্পর্শে চোখ খুলে তাকায় সে। রেহেনার মুখের দিকে তাকিয়ে অস্বাভাবিক ঠান্ডা গলায় বলে,"মেয়েটার মন টা এখন কেমন করছে রেহেনা! নিশ্চয়ই গলা কা'টা মুরগির মতো ত'ড়'পা'চ্ছে।"

রেহেনা কান্না আটকে স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আতাউর বলে,"তুমি ঠিক বলেছিলে রেহেনা। আমার মতো মানুষদের জন্য রাজনীতি মানায় না। রাজনীতি মানায় ইয়াসারের মতো জা'নো'য়া'র'দের যারা টাকা দিয়ে কিছু মানুষ রুপী পশু পোষে। আমার যদি আজ ওরকম কিছু পশু থাকতো তাহলে আজ দিনটা অন্যরকম হতো।"

_চলো না, পুলিশের কাছে যাই। একবার ধরিয়ে দিলে কিচ্ছু করতে পারবে না ওরা।

রেহেনা ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে। আতাউর বলে,"তুমি জানো না রেহেনা। ওরা কি করতে পারে! তোমার কোনো ধারণা নেই। ইশতিয়াকের কাহিনী মনে আছে তোমার? মারুফার সাথে কি হয়েছিলো ভুলে গেলে? আমি আমার মেয়েটাকে হারাতে পারবো না।"

_আতাউর আলম ভয় পাচ্ছে? এতো সহজে হার মেনে নিলো আতাউর আলম?

_না। একজন বাবা ভয় পাচ্ছে রেহেনা।

এমন সময় ফোনের রিংটোন বেজে ওঠে। আতাউর আলম চমকে উঠে ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে। ওপাশ থেকে কন্ঠে বিদ্রুপ নিয়ে তার চাচাতো ভাই খোরশেদ বলে ওঠে,"আগামীকাল নির্বাচন আর আজ স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর আলম নির্বাচন বর্জন করছে? খবরটা কি সত্যি?"

আতাউর আলম একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,"সত্যি।"

শব্দটি মুখ থেকে উচ্চারণ করেই ফোন কেটে দেয় সে।

***

সামিন ইয়াসার আলোকে টানতে টানতে এনে লিভিং রুমে দাড় করায়। আলো কিছুটা টলছে। সামিন রিতুর দিকে তাকিয়ে বলে,"ওকে কিছু খাওয়াও।"

_আমি খাবো না। এই বাড়ির কিছু আমি মুখে দেবো না। বললাম তো।

চেঁচিয়ে বলতে থাকে আলো। সামিন আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,"কতক্ষন থাকবে না খেয়ে? আচ্ছা ঠিকাছে। আমিও দেখতে চাই তুমি কতক্ষন না খেয়ে থাকো।"

আলো সামিনের দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। সিতারা এসে রিতুর হাতে একটা গ্লাস দিয়ে বলে,"বড় ভাইজানের মিন্ট লেমন ভাবী!"

রিতু গ্লাসটা সামিনের হাতে তুলে দিতে যাবে তখনি ইলহাম ধমকের সুরে বলে,"তুমি কেনো দিচ্ছো? ভাইয়ার বৌ দেবে। ওর হাতে গ্লাস দাও।"

সামিন আলোর দিকে তাকায়। রিতু আমতা আমতা করতে থাকে। ইশিতা আলোকে দেখে। আলো সবাইকে অবাক করে দিয়ে রিতুর হাত থেকে গ্লাসটা নেয়। তারপর সামিনের চোখের দিকে একবার তাকিয়ে গ্লাসের পানীয় টুকু সামিনের মুখে ছুড়ে মারে।

ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই চমকে ওঠে। আলো গেস্টরুমের দিকে ছুটে যায়। তার দুর্বল শরীর নিয়ে ছুটতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। মনে হচ্ছে এক্ষুনি সে নিচে পরে যাবে!

সামিন ভেজা মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আলোকে দেখে। সবাই তাকে দেখছে। কিছুক্ষণ ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে নিয়ে সে নিজের ঘরে চলে যায়।

***

মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে মুখটা পরিষ্কার করে ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে আসে সামিন। গায়ের পাঞ্জাবিটা একটানে খুলে রকিং চেয়ারের উপরে ছুঁড়ে মেরে বিছানায় এসে বসে। হাত বাড়িয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে সময় দেখে সে। বেলা তিনটা প্রায়। হঠাৎ ইশমামের কথা মনে পরে তার। ইশমামকে তো এসবের কিছুই জানানো হয়নি। এসব জানতে পারলে নিশ্চয়ই খুব রিয়াক্ট করবে। সামিনের ভালো মানুষ ভাই বলে কথা। সামিন আনমনে হাসে, ইশমাম একেবারেই মায়ের মতো হয়েছে ,স্বচ্ছ। ফোনটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ইশমামকে ফোন দেওয়ার মনস্থির করেও ফোন দেয়না। এখন নিশ্চয়ই ঘুমোচ্ছে। শুধু শুধু বিরক্ত করে কি লাভ। এমন সময় ফোনের রিংটোন বেজে ওঠে,"ফোনের স্ক্রিনে যার নাম্বার টা ভেসে উঠেছে তার নাম হলো আতাউর আলম। এখন ফোন ধরলেই "ইয়াসার আমার মেয়েটাকে একটু দেখবো,ইয়াসার আমার মেয়েটাকে ছেড়ে দাও,ইয়াসার আমি তোমার পা ধরবো" এসব বলে বলে কাঁদবে , ইয়াসার তা জানে। সে রিসিভ করে না ফোনটা। তড়পাতে থাকুক, যতক্ষন জামিল আইসিইউতে থাকবে, ততক্ষন আতাউর আলম-ও মেয়ের সাথে কথা বলতে না পারার যন্ত্রনায় তড়পাতে থাকুক।

ফোনটা সুইচ অফ করে রেখে সামিন উঠে দাঁড়িয়ে খালি গায়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করে বলে,"পি'শা'চ সামিন ইয়াসার মির্জা।"

এমন সময় দরজায় টোকা পরে ইয়াসারের। গম্ভীর কন্ঠে জানতে চায়,"কে?"

ফুলির মা চেঁচিয়ে বলে ওঠে,"নতুন ভাবী জ্ঞান হারাইছে ভাইজান।"

চলমান........

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন