ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগলো চোখে

১১তম পর্ব

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে

#পর্বসংখ্যা_১১

#Esrat_Ety

গায়ে একটি নেভি ব্লু রঙের পলো টি-শার্ট চাপিয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে নিচ তলার গেস্টরুমের দিকে যায় ইয়াসার। আলো অ'চে'ত'ন হয়ে মেঝেতে পরে আছে। তাকে ঘিরে বসে আছে রিতু,ইশিতা,হেনা ও ফুলির মা। সামিন কে দেখে রিতু উঠে দাঁড়ায়। আতঙ্কিত মুখ নিয়ে বলে,"ভাইয়া অবস্থা খুব খা'রা'প মনে হচ্ছে। চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে দেই?"

_পানি ছিটানোর থেকেও পানি খাওয়ানোটা জরুরি রিতু। ওকে উঠিয়ে বিছানায় শুইয়ে দাও।

সবাই ধরাধরি করে আলোকে তুলে বিছানায় শুইয়ে দেয়। ইশিতা ভাইয়ের দিকে রাগী দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে আছে। সামিন ইয়াসার তার দিকে তাকিয়ে বলে, "পরীকে ফোন করে ডাক। এসে দেখুক।"

ইশিতা কপাল কুঁচকে বলে,"পরী কি ডাক্তার? ও স্টুডেন্ট। আর পরীকে-ই কেনো ডাকবো? ডাক্তার এলে তোমার অপকর্ম সব ফাঁস হয়ে যাবে সেই ভয়ে?"

_হ্যা তাই!

তেজী কন্ঠে বলে ওঠে ইয়াসার। ইশিতা আহত চোখে ভাইকে কিছুক্ষণ দেখে। তারপর পরী নামের মেয়েটাকে ফোন করে আসতে বলে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলে,"তোমার কি হয়েছে ভাইয়া? কেনো করছো এমন তুমি?"

_বললাম না বংশের ঐতিহ্য চর্চা করছি!

ইশিতা দৃঢ়ভাবে বলে,"জোর করে বিয়ে হয়? এই বিয়েটাই হয়নি। তুমি ওকে ওর পরিবারের হাতে তুলে দাও ভাইয়া। শত্রুতার জের ধরে তুমি মেয়েটার গোটা জীবন টা এভাবে নষ্ট করো না। মনে রেখো তোমারো বোন আছে।"

_আমার বোনের জন্য আমি আছি। ভয় পাচ্ছি না তোর কথায়।

ভাইয়াকে কিছু বলা বৃথা। ইশিতা করুণ দৃষ্টিতে বিছানায় অচেতন হয়ে পরে থাকা আলো নামের মেয়েটিকে দেখে। উজ্জ্বল শ্যামলা বর্ণের মায়াবী মুখটা কিরকম মলিন হয়ে আছে। ভাইয়া কিভাবে পারছে এমনটা করতে। তার কেনো একটুও মায়া হচ্ছে না!

***

রেহেনার হাতের পানির গ্লাস টা হাত থেকে মেঝেতে পরে ভেঙে গিয়ে তীব্র আওয়াজ হয়। কাঁচের টুকরো গুলো গোটা মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। স্ত্রী পুনরায় অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পরেছে ভেবে আতাউর আলম ছুটে আসে। এসে রেহেনার দিকে তাকিয়ে ঘনঘন নিশ্বাস ফেলে । রেহেনা থমথমে মুখ নিয়ে ঠান্ডা গলায় বলে,"আলোর আব্বু, মেয়েটার কি হলো আলোর আব্বু!"

আতাউর আলম এগিয়ে আসে স্ত্রীর কাছে। রেহেনা হাউমাউ করে কেঁদে দিয়ে বলে,"মেয়েটার গায়ে হা'ত তুলছে, নিশ্চয়ই মেয়েটাকে মা'র'ছে খুব।"

মায়ের চি'ৎ'কা'র শুনে আজান আর আয়াত ছুটে এসে দাঁড়ায়। রেহেনার শরীরটা হঠাৎ কেঁপে ওঠে। আতাউর আলম এসে স্ত্রীকে ধরে। রেহেনা অস্ফুট স্বরে বলে,"মেয়েটাকে দেখবো,কথা বলবো মেয়েটার সাথে। তুমি ঐ প'শু টাকে ফোন করে বলো আমরা সবাই মিলে ওর পা'য়ে পরবো। ও শুধু মেয়েটার সাথে একটু কথা বলিয়ে দিক। আতাউর আলম দুচোখ বন্ধ করে একটা নিরব আর্তনাদ করে ওঠে। সে তো সেই কখন থেকে চেষ্টা করে যাচ্ছে আলোর সাথে একটু কথা বলবে বলে। নির্দয়,প'শু, পাষণ্ড ইয়াসারের মন গলেনি।

আজান আয়াত একে অপরের মুখের দিকে তাকায়। ছোটো থেকে বন্ধু মহলে সবাই তাদের ক্ষেপিয়ে এসেছে "লুজার্স টুইন" বলে। জীবনের এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে তাদের এটাই মনে হচ্ছে,তারা আসলেই লুজার্স।

হঠাৎ কলিং বেলের আওয়াজ হয়। আতাউর আলম স্ত্রীকে ছেড়ে দিয়ে গিয়ে দরজা খোলে। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে রনি। হাতে একটা প্যাকেট তার। মুচকি হেসে আতাউর আলমের দিকে প্যাকেট টা বাড়িয়ে দিয়ে বলে,"মাঐ মা-এর ব্লাড প্রেশারের ওষুধ।"

***

ধীর পায়ে গেস্ট রুমে ঢুকে পরী প্রথমে সামিনের দিকে তাকায়। সামিনের দিকে তাকিয়ে একটা ঢোক গিলে সে চোখ নামিয়ে নেয়। শ্রদ্ধা করলেও সামিন ভাইয়াকে সে ভীষণ ভয় পায়, সজ্ঞানে কখনো সামিনের সামনে পরে না সে। পরীর পিছু পিছু ঘরে ঢোকে পোনা। পরী পোনার মেয়ে। দুধে আলতা গায়ের রং নিয়ে জন্মেছিল বলে পোনা খুব শখ করে মেয়েটির নাম রেখেছিলো পরী। পরী আসলেই পরীর মতো দেখতে। ঘরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রত্যেকের মুখের দিকে তাকিয়ে পরী পোনার দিকে তাকায়। পোনা চোখ দিয়ে ইশারা করে পরীকে বিছানার দিকে তাকাতে বলে।

সে বিছানায় শুয়ে থাকা আলোকে একবার দেখে পুনরায় নিজের বাবার দিকে তাকায়। পোনা মৃদু স্বরে বলে,"বড় ভাবী তোর।"

আলোকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কিছুক্ষণ দেখে সে। মায়াবী মুখশ্রী। তাকালে সহজে চোখ ফেরানো যায়না। ধীরপায়ে হেটে গিয়ে বিছানার পাশটাতে বসে। আলোর পালস রেট চেক করে,ব্লাড প্রেশার চেক করে সামিনের মুখের দিকে তাকায়। সামিন তার দিকেই তাকিয়ে আছে।

_শরীর অত্যন্ত দুর্বল ভাইয়া। কিছু খাওয়াতেই হবে। কতক্ষন না খেয়ে ছিলো?

_উনিশ ঘন্টা।

_উনিশ ঘন্টা না খেয়ে দিব্যি থাকা যায়। পানি না খেলে সমস্যা হবার কথা।

_পানিও খায়নি।

পরী আলোর দিকে তাকায়। সে কিছুই বুঝতে পারছে না এখানে কি হচ্ছে। কাউকে জিজ্ঞেস করবে সেই সাহস পরীর নেই। নিচু স্বরে, দৃষ্টি আলোর মুখের দিকে রেখে বলে,"পানি শূন্যতার জন্য হয়েছে। একটা চামচ দিয়ে খানিকটা পানি খাইয়ে দাও ইশিতা আপু।"

তারপর বলে,"এর হাত পায়ে ম্যাসাজ করে দাও। ধীরে ধীরে হুস ফিরে পাবে।"

সামিন পরীর কথা শুনে আলোর মুখের দিকে তাকায়। ঠোঁট বাঁকিয়ে ম্লান হাসে,মনে মনে বলে," বোকা বাবার ফ'ট'কা চালাক মেয়ে! এই রকমের যা তা স্টামিনা নিয়ে এতো তেজ দেখাও তুমি!"

ইশিতা একটা গ্লাস আর একটা চামচ এনে আলোর মাথার কাছে বসে। রিতু এবং সিতারা আলোর হাতে পায়ে ম্যাসাজ করে দিচ্ছে। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়। ফুলির মা হঠাৎ করে বলে ওঠে,"আসতে না আসতেই তোমারে দিয়া নিজের সেবা করাইয়া নিতেছে তোমার বড় জা।"

রিতু মাথা তুলে ভ্রু কুঁচকে ফেলে। ফুলির মা প্রায় ভুলে গিয়েছিলো এই ঘরে ইয়াসার রয়েছে। মনে পরতেই সে থমথমে মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ইয়াসার কিছু বলে না। তার দৃষ্টি আলোর দিকে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে সে আলোকে পর্যবেক্ষণ করছে। গুনে গুনে সাত সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে সে চোখ সরিয়ে নেয়।

ইশিতা আলোর মাথায় হাত রেখে নরম গলায় ডাকে,"আলো।"

আলোর জ্ঞান ফিরেছে কিন্তু চোখ খুলে তাকানোর শক্তি সে পায়না। নারী কন্ঠ কানে যেতেই সে কপাল কুঁচকে ফেলে খানিকটা। ইশিতা সাহস পায়। চা-চামচের এক চামচ পানি অবচেতন আলোকে জোর করে খাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। খড়খড়ে কন্ঠনালীতে দুফোঁটা পানির অস্তিত্ব পেয়ে আলোর অবচেতন মন স্বস্তি পায় ঠিকই কিন্তু তার চোখ দুটো বন্ধ।

রিতু এগিয়ে বসে আলোর গালে হাত রেখে ডাকতে থাকে,"আলো...আলো...!"

দুইবার ডেকে সে থেমে যায় তারপর সামিনের দিকে একবার তাকিয়ে আবারো ডাকতে থাকে,"ভাবী....ভাবী..!"

আলো ধীরে ধীরে চোখ খুলে পিটপিট করে তাকায়। সবকিছু ঝাপসা লাগছে। সবাই জানে সে উনিশ ঘন্টা খায়নি।‌ কিন্তু সবাই জানে না আলো গতো সাতাশ ঘন্টা ধরে কিচ্ছু খায়নি। গতকাল বেলা এগারোটার দিকে কলেজের ক্যান্টিনে একটা সিঙাড়া খেয়েছিলো, এবং ওটাই শেষ খাবার।

আলোকে চোখ মেলে তাকাতে দেখে অদ্ভুত ভাবে, নিজের অজান্তেই ইয়াসার একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। এবং সাথে সাথে সে ভীষণ অবাক হয়ে যায়। আশ্চর্য,সে এমন অদ্ভুত কাজটা কেনো করলো!

রিতু ম্লান হেসে বলে,"ভাবীর জ্ঞান ফিরেছে।"

ইশিতা একবার ইয়াসারের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে রিতুকে বলে," মেজো ভাবী। এক বাটি স্যুপ নিয়ে এসো। আর তোমরা সবাই এখান থেকে যাও। তিন সেকেন্ডের মধ্যে।"

ইয়াসার বোনের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে অকারণ ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে। পরীর দিকে তাকিয়ে বলে,"কি রে তোর ভিজিটের টাকা নিবি না হবু ডাক্তার!"

পরী মুচকি হাসে। অনেকটা সাহস নিয়ে বলে,"বিয়ের মিষ্টিও কিন্তু বাকি আছে ভাইয়া। ওটা আগে খাওয়াবেন।"

***

"আপনি আসলে করতে চাইছেন কি একটু পরিষ্কার করে বলবেন আব্বা? সারাদিন এই প্ল্যান করছেন,সেই প্ল্যান করছেন অথচ কাজের কাজ তো কিছুই হচ্ছে না।"

শমশের ভুঁইয়া নিজের ছেলে সাগর ভুঁইয়ার দিকে তাকায়। ছেলে তার রীতিমতো বাপকে ধ'ম'কা'তে শিখে গিয়েছে।

সাগর জায়েদ আলীর দিকে আঙুল তুলে আবারো বলতে থাকে,"ওনার সাথে একচেটিয়া আলোচনা করে এতদিন পণ্ডশ্রম করে গিয়েছেন শুধু। আপনার বুদ্ধি দেখে আমি অবাক হই আব্বা। কোথায় ইয়াসারকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেবেন তা না করে ওর চ্যা'লা'টাকে মারলেন। ইয়াসারের তো টিকিও নাড়ানো গেলো না। দিব্যি তার দলের লোক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।"

_আতাউর আলম তো সরে দাঁড়িয়েছে।

বাবার কথায় তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে সাগর বলে," ইয়াসারকে মেরে দিলে আতাউরকে সামলানো কোনো ব্যাপার-ই ছিলো না আমাদের কাছে। আর আতাউরকে ফাঁসানোর যে প্ল্যান করেছিলেন,লাভ কি হলো? ইয়াসারের তো কোনো শীত গরম দেখছি না। ও তো এতো সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র না। ও কেনো আতাউরের পিণ্ডি চটকাচ্ছে না? একটা ধুন্ধুমার লেগে গেলেও কিছুটা সুবিধা করা যেতো।"

শমসের ভুঁইয়া ছেলের কথায় চিন্তিত হয়ে পরে। তাইতো,ইয়াসার এতো চুপচাপ বসে আছে কি করে।‌ বিষয় টা বেশ গোলমেলে।

সাগর বাবার দিকে তাকিয়ে ধমকের সুরে বলে,"এইবার যদি কোনো অঘটন ঘটে না আব্বা ! তাহলে আপনি ধরে নিন দলের সভাপতি পদ থেকে আপনাকে সরে দাঁড়াতে হবে।"

***

"এই স্যুপ টা এখন তুমি মুখে দেবে আলো।"

ইশিতার কথা শুনে-ই আলো মুখ সরিয়ে নেয়। ইশিতা একটু কঠিন হবার ভান ধরে আলোর থুতনি ধরে জোর করে এক চামচ স্যুপ খাইয়ে দেয়। আলো বাঁধা দিতে গেলে তার গায়ে খানিকটা পরে যায় স্যুপ। ইশিতা ধমক দিতে চেয়েও দেয়না। মায়াবী মুখশ্রীর দিকে তাকালেই মায়া লাগে তার। সে নরম গলায় আলোর মাথায় হাত রেখে বলে,"তোমার বাবা মাকে দেখতে চাও? তার চান্স কিন্তু এখনো ফিফটি ফিফটি আছে আলো। তুমি যদি এভাবে না খেয়ে মরে পরে থাকো তাহলে তো কোনো লাভ হবে না,তাই না?"

আলোর ঠোঁট কাঁপছে। ইশিতার নমনীয় ব্যবহারে তার মধ্যে জমে থাকা কান্না সব বেরিয়ে আসতে চাইছে । বেশ কয়েক মুহূর্ত চেষ্টা করেও সে আটকাতে পারে না। ঝরঝর করে কেঁদে দিয়ে বলে,"কেনো আপু? একটা সামান্য চ'ড়ের দাম আমাকে নিজের সর্বস্ব খুইয়ে দিতে হলো কেনো?"

ইশিতা কোনো উত্তর দেয়না। সে তো জানে না এর উত্তর। আলো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। কিছুক্ষণ পরে কান্না থামিয়ে কঠিন গলায় বলে ওঠে,"ওই জা'নো'য়া'রটাকে কখনো ক্ষমা করবো না আমি, কোনোদিনও না।"

***

শেষ বারের মতো ফোন টা চেক করে ইশমাম ফোনটাকে দূরে ছুড়ে মেরে হাত দিয়ে দেয়ালে সজোরে ঘুষি মেরে দেয়। তারপর এসে নিজের বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে থাকে কিছুক্ষণ। মাথা কাজ করছে না তার। এতোটা অস্বস্তি বোধ হচ্ছে কেনো! কিছুক্ষণ বিছানায় শুয়ে থেকে আবারো উঠে বসে। অর্গানাইজেশন থেকে বারবার ফোন দেওয়া হচ্ছে। ইশমাম কেনো তার কাজে যাচ্ছে না তাই। ভার্সিটি থেকে ক্লাসমেট-রা ফোন দিচ্ছে। কারো ফোন ধরতে স্বস্তি পাচ্ছেনা সে। কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকার পরে সে উঠে দাঁড়ায়। স্টাডি টেবিলের কাছে গিয়ে ড্রয়ার খুলে তার পাসপোর্ট বের করে কয়েক মুহূর্ত সেদিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর গিয়ে মেঝে থেকে ফোনটা উঠিয়ে নেয়। মেঝেতে পরে গিয়ে ফোনটা সুইচ অফ হয়ে গিয়েছিলো। সে ফোনটা অন করে এ্যাম্বাসিতে ফোন লাগায়।

***

"ক্যাচক্যাচ" শব্দে দরজার নব ঘোরে। রাত প্রায় দশটা বেজে গিয়েছে। সামিন দরজা ঠেলে দুই সেকেন্ড সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে। তার কপাল কুঁচকে থাকলেও চোখে অস্বস্তির ছাপ স্পষ্ট। নিজের ওপর নিজে প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে যায়। এখন এতো অস্বস্তি লাগবে কেনো! এতো কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেও তো অস্বস্তি হয়নি একটুও। একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেলে ঘরের ভেতরে এক পা ফেলে। আড়চোখে পুরো ঘরের দিকে দৃষ্টি দেয়। আলোকে কোথাও দেখতে না পেয়ে আরেক পা ঘরের ভেতরে রাখতেই সে তার ঘাড়ের উপর কোনো ভারী বস্তুর আঘাত অনুভব করে। তৎক্ষণাৎ ডানপাশে তাকাতেই দেখে আলো একটা মোটা বই হাতে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে, প্রচন্ড শক্তি খাটিয়ে সামিনকে আঘাত টা করেছে তাই হাপাচ্ছে সে। আলোর প্রচণ্ড শক্তি খাটিয়ে করা আঘাতেও সামিনকে বিচলিত দেখা যায় না। বরং গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলে,"এক বাটি স্যুপ খেয়ে শক্তি ফিরে পেয়েছো?"

আলো দাঁতে দাঁত চেপে আরেকটা বারি মারতে যাবে তখন সামিন তার হাত দুটো ধরে ফেলে। হাত থেকে বইটা কেড়ে নিয়ে দরজার পাশের আলমারিতে রেখে দেয়। দরজার সিটকিনি তুলে দিয়ে মৃদু হেসে বলে,"তুমি নাকি কারাতে জানো। অথচ এখানে আসার পর থেকে দেখছি চ'ড় মারছো, থুতু ছুড়ে দিচ্ছো, মিন্ট লেমন ছুড়ছো, বই দিয়ে আঘাত করছো। এসব কোন ধরনের বাচ্চামো? মানুষ যখন ঘোর বিপদে পরে তখন তার মস্তিষ্ক কাজ করে না জানি, কিন্তু তোমার তো পুরো মেমোরি ডিলিট হয়ে গিয়েছে। তুমি আদৌও কারাতে জানো তো নাকি তোমার সৎ এবং মহৎ বাবা আতাউর আলম টাকা দিয়ে মেডেল কিনে দিয়েছে।"

_আমার বাবার নাম মুখেও আনবি না কু'ত্তা।

আলো তেতে ওঠে।

সামিন স্বাভাবিক গলায় বলে,"কু'ত্তা বলছো কেনো বারবার? আমি তোমাকে কামড়েছি? আঁচড় কেটেছি তোমার গায়ে?"

আলো অগ্নিদৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সামিন বলে,"বাবার নামে কিছু শুনতেই পারো না দেখছি। অন্ধের মতো বিশ্বাস করো বাবাকে। তোমার ওই গুণধর পিতা কি করেছে জানো? একজনের জান নেওয়ার চেষ্টা করেছে।"

আলো চমকে ওঠে, চেঁচিয়ে বলে," মিথ্যা কথা। সবকিছু মিথ্যা কথা।"

_হ্যা , হ্যা। দুনিয়ার সবকিছু মিথ্যা। তুমি আর তোমার বাবা সত্যবাদী যুধিষ্ঠির। তা সত্যবাদী বাপের সত্যবাদী কন্যা, তোমার নামটা তোমার বাবা শুধু আলো রাখলো কেনো? তোমার নাম রাখা উচিত ছিলো সত্যের আলো।

আলো বিদ্রুপ গাঁয়ে না মেখে, গলায় ঝাঁঝ বজায় রেখে চেঁচিয়ে বলে, " ভয় দেখিয়ে বিয়ে, কতগুলো মানুষকে জিম্মি করে রাখা,তাদের ব্লাকমেইল করা। জোর করে একটা মেয়ের সর্বনাশ করা। তুই তো কাফিরের থেকেও একধাপ উপরে। তোর কোনো ক্ষমা নেই পৃথিবীতে। যেদিন ধরা পরবি না, জান নিয়ে বাঁচতে পারবি না জানোয়ার।"

সামিন আলোর দিকে শীতল চোখে তাকিয়ে আছে। আলো বলতে থাকে,"নিজের ঘরে এনে ভাবছিস স্বামীর অধিকার ফলাবি? তার আগে আমি প্রান ত্যাগ করবো।"

_আমি তো তোমাকে কিছুই বলিনি। তুমি আগ বাড়িয়ে এতো কিছু বলছো কেনো?

_কেনো জোর করে এই রুমে এনেছিস আমায়!

হাঁপাতে থাকে আলো। সামিন মৃদু হেসে বলে,"আমি তো জোর করিনি। শুধু বলেছি তোমার কোন ভাই এখন কি করছে, একজন দোকানে গিয়ে থার্মোমিটার কিনেছে,অন্যজন গেইটের কাছে দাঁড়িয়ে আছে,ব্যস। আর তুমি তাতেই ভয় পেয়ে চলে এলে রিতুর সাথে আমার শোবার ঘরে।"

আলো ছুটে এসে সামিনের কলার ধরে চেঁচিয়ে বলে,"পিশাচ, নমরূদ।"

সামিন আলোর হাত ছাড়িয়ে বলে,"আমার তিনটা পাঞ্জাবির বোতাম ছিড়েছো তুমি। এগুলো কিন্তু তোমাকে দিয়েই ঠিক করানো হবে।"

আলো ফোঁস ফোঁস করতে থাকে। গলা থেকে আর কোনো কথা বের হচ্ছে না তার। সামিন মৃদু স্বরে বলে,"কি? একবাটি স্যুপের শক্তি ফুরর হয়ে গিয়েছে?"

_ফে'রা'উ'ন

আলো হাঁপাতে হাঁপাতে বলে।

সামিন হেসে বলে,"তাই নাকি? তাহলে তো তুমি আছিয়া হলে।"

ডান হাত দিয়ে পকেট থেকে একটা চেক বের করে আলোর হাতের কব্জি শক্ত করে ধরে ফেলে সামিন। চেকটা আলোর হাতের মুঠোয় পুরে গম্ভীর কন্ঠে বলে,"বিয়ের কাবিনের টাকা।"

আলো হাত ছাড়িয়ে চেকটা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে সামিনের দিকে ছুড়ে মারে।

সামিন বলে,"ঠিকাছে। নগদ ক্যাশ দিচ্ছি।"

_তুই মরবি। মরবি তুই খুব শিগগিরই ফে'রা'উ'ন।

_তাই নাকি! তা নীলনদ কোথায়? বাংলাদেশে তো কোন নীলনদ নেই।

আলো অহেতুক তাকিয়ে থাকে সামিনের দিকে। সামিন আলোকে উপেক্ষা করে বিছানা থেকে একটা বালিশ নিয়ে ডিভানে রাখে। পায়ের চটি খুলে ডিভানে উঠে ওদিক ফিরে শুয়ে পরে সে, গম্ভীর কন্ঠে আলোকে বলে,"ঘুমিয়ে পরো। আমি আঁচড়াবো না,কামরাবোও না।"

চলমান........

নোট: আজকের পর্বটি দেরী করে দেওয়ার জন্য দুঃখিত।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন