#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে
#পর্বসংখ্যা_১২
#Esrat_Ety
পাখির কিচিরমিচির নতুন সকালের আহবান জানিয়ে দিয়েছে। জানালার থাই-গ্লাস ভেদ করে কড়া মিষ্টি রোদ এসেছে আলোর গালে আদর দিয়ে যাচ্ছে। মেঝেতে বসে বিছানার উপরে মাথা ঠেকিয়ে,ডান পাশে কাত হয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছিলো আলো। বাম গালে রোদের উষ্ণতা তার দীর্ঘ ক্লান্তিময় ঘুমের ইতি টানে। ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকায় সে। ছোটো বেলা থেকে আলো অচেনা কোনো নতুন পরিবেশে ঘুমাতে পারে না, কিন্তু এই দুই রাত যে মানসিক ধকল আলো সামলেছে তাতে এরকম গভীর ঘুম হওয়া স্বাভাবিক। মাথা এখনো ভারি হয়ে আছে যন্ত্রনায়। হাত দিয়ে কপাল চেপে ধরে এদিকে ওদিকে তাকায় সে। তারপর নিজেকে দেখে,গায়ের শাড়ীটা ঠিকঠাক ভাবেই আছে। বিছানায় এক হাত রেখে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায় সে। এই অচেনা ঘরটিতে সে ছাড়া আর কেউ নেই। ওই পি'শা'চ টা উধাও। ঘরের দরজা খোলা। আলো এই সুযোগে দ্রুত পায়ে বের হয় ঘর থেকে। সে জানে এই কারাগার থেকে তার পালানোর পথ রাখেনি ওই চতুর শিয়াল টা। তবুও একবার চেষ্টা করলে তো ক্ষতি নেই। ঘরের বাইরে এসে সে নিচতলার সিঁড়ি দেখতে পায়। সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত পায়ে নামতে গিয়ে থমকে যায় সে। নিচতলার লিভিং রুমে পি'শা'চ টার দুজন লোক বসে আছে। এদেরকে নিশ্চয়ই ঐ পি'শা'চ টা তার উপর নজরদারি করতে এখানে বসিয়ে রেখেছে। আলো দুমিনিট সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে হতাশ হয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুরে দাঁড়ায়। ঘুরে দাঁড়িয়ে সে রিতুকে দেখে। রিতু আলোর দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে,"পালাচ্ছিলেন নাকি ভাবী!"
আলো প্রায় দৌড়ে রিতুর কাছে যায়। রিতুর দুই বাহু ধরে আকুতির সুরে বলে,"না পালাচ্ছিলাম না। আপনি আমার একটা উপকার করবেন? একটু দয়া করবেন আমায়?"
রিতু চোখ বড় বড় করে ফেলে। সে কি উপকার করতে পারে আলোর। এদিক ওদিক তাকিয়ে নিচু স্বরে বলে,"কি ভাবী?"
_আমাকে আপনার ফোনটা দেবেন? আব্বু আম্মুর সাথে একটু কথা বলবো। দয়া করে ফোনটা দিন। আমি আপনার পায়ে পড়ছি!
রিতু আলোর দুটো হাত মুঠি করে ধরে। এদিক ওদিক তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,"আসুন আমার সাথে।"
***
সরকার দলীয় প্রার্থী সামিন ইয়াসার মির্জা নিজ এলাকা ১৯ নম্বর ওয়ার্ড থেকে ভোটদান সম্পন্ন করে বেরিয়ে এসেছেন। ভোটকেন্দ্রের বাইরে গণমানুষের ভীর। রাহাত এগিয়ে গিয়ে একটা ছাতা ধরে সামিনের মাথার উপরে। সামিন হাত দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বিরক্ত ভঙ্গিতে বলে,"হাজার বার বারণ করেছি,আমার সাথে এসব করবি না। তোরা আমার চাকর?"
রাহাত লজ্জিত ভঙ্গিতে হাসে। তারপর বলে,"না,আপনি আমাদের নেতা।"
সামিন এদিকে ওদিকে তাকিয়ে বলে,"বাকি কেন্দ্রগুলোতে খবর নিয়েছিস? ওদিকের অবস্থা কি?"
এমন সময় রাহাতের ফোন বেজে ওঠে। রাহাত পকেট থেকে ফোনটা বের করে সামিনের দিকে তাকিয়ে বলে,"সবুজের ফোন। ও তো পনেরো নম্বর ওয়ার্ডে আছে, নতুন কুঁড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শমশের ভুঁইয়ার এলাকা।"
সামিন বলে,"জলদি ফোন রিসিভ কর।"
রাহাত সামিনের কথামতোই ফোনটা রিসিভ করে লাউড স্পিকার অন করে দেয় , ওপাশ থেকে চেঁচিয়ে ওঠে সবুজ,"রাহাত আমাদের এজেন্টদের কাজে ব্যাঘাত ঘটানো হচ্ছে। দুই দলের মধ্যে হাতাহাতি হয়েছে একপর্যায়ে।"
_পুলিশ কি করছে? ঘাস খাচ্ছে? সরকারি পার্টির এজেন্টদের সাথে গাইগুই করে। বুকের পাটা দেখ!
_শমশেরের ধামড়া ছেলেটা করছে এসব। কি করবো? ভাইকে বল ওসিকে ফোন দিতে।
সামিন রাহাতের হাত থেকে ফোন নিয়ে বলে,"ওসিকে ফোন করার দরকার নেই। আমি আসছি, তুই শু'য়ো'র গুলোকে চিহ্নিত করে রাখ।"
***
আতাউর আলম ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরতেই আলো কাঁপা কাঁপা গলায় বলে ওঠে,"আব্বু!"
আতাউর আলম দু'চোখ বন্ধ করে একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে। তার মুখে কোনো কথা আসছে না। আলো বলতে থাকে,"কার জ্বর আব্বু?"
_তোর আম্মুর। জ্বর উঠেছে, প্রেশার বেড়ে গিয়েছে।
আলো চুপ করে থাকে। আতাউর আলম বলে,"তোকে মেরেছে আম্মু? খেতে দিয়েছে তোকে?"
আলোর চোখ বেয়ে দুফোঁটা তরল গড়িয়ে পরে। কন্ঠনালীতে জমে থাকা কান্না জোর করে দমিয়ে রেখে কন্ঠ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলে,"ঠিক আছি আব্বু। কেউ আঘাত করেনি। খেতে দিয়েছে আমায়।"
আতাউর আলম আর্তনাদ করে ওঠে,"মা.....আমার মা, তুই তোর অপদার্থ বাবাকে মাফ কর মা। ক্ষমা কর আমায়।"
আলো ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে। আলোকে দেখে রিতুর চোখে পানি এসে যায়। কয়েক মুহূর্ত কেঁদে কান্না থামিয়ে বলে,"আজান আয়াত কোথায়।"
ওপাশ থেকে আজান আয়াতের ভাঙা গলার আওয়াজ শোনা যায়,"এইতো আপু। আমরা এইতো।"
আলো ধরা গলায় বলে,"ভাই দুটোকে সামলে রেখো আব্বু। ওরা আমার কলিজা। পি'শা'চ টা ওদের উপর নজর রাখছে।"
আতাউর আলম কাঁদতে থাকে। আলো বলে,"আমার সুপার হিরো এভাবে কাঁদতে পারে না। তুমি কেঁদো না আব্বু। ইয়াসার আমাকে আর যাই করুক জানে মা'র'বে না। তোমার মেয়ে হয়তো বেঁচে থাকবে!"
_আমি কি পাপ করেছি আম্মু!
আলো চুপ করে থাকে, তারপর বলে,"নির্বাচন বর্জন করেছো আব্বু?"
_দরকার নেই, দরকার নেই। আমার আর কিছুর দরকার নেই।
আলো মুখে হাত চেপে কিছুক্ষণ কেঁদে নেয়। তারপর কন্ঠস্বর স্বাভাবিক রেখে বলে,"রাখছি আব্বু। আম্মুকে দেখবে। এই নাম্বারে আর ফোন করবে না। একজন বিপদে পরে যাবে তাহলে।"
ফোন কেটে আলো ধপ করে মেঝেতে বসে পরে। রিতু নিচু হয়ে বসে নরম গলায় বলে,"ভাবী কাঁদবেন না।"
_ডাকবে না আমায় ভাবী,আমি কারো ভাবী নই, না আমি কারো বৌ। ডাকবে না ভাবী আমায়, ডাকবে না। ডাকবে না।
গলা ছেড়ে চিৎকার করতে থাকে আলো।
***
"কিরে ভাইকে দেখে তোর সব হাওয়া বেরিয়ে গিয়েছে?"
কথাটি বলেই সবুজ সাগরকে কুৎসিত একটা গালি দেয়। সাগর তাতে ভ্রুক্ষেপ না করে ইয়াসারের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে থাকে। ইয়াসার তার দিকে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ পরে নীরবতা ভেঙে সাগর হেসে বলে,"অনেক দিন পর তোর সাথে দেখা ইয়াসার। দেখে খুব ভালো লাগছে। আমি আনন্দিত।"
_কিন্তু আমার ভালো লাগছে না। ইচ্ছে করছে তোর গলাটা চেপে ধরে জা'ন'টা বের করে দিতে।
ঠান্ডা গলায় জবাব দেয় ইয়াসার। সাগর উচ্চশব্দে হাসতে থাকে। হাসি থামিয়ে বলে,"ধীরে নেতা ধীরে। ভোটকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে জনগণের জা'ন নেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। কেউ ভোট দেবে আপনাকে?"
_একসময় তুই আমার অনেক ভালো বন্ধু ছিলি,তাই তোকে বরদাস্ত করে গিয়েছি সাগর। নিজের অওকাদের মধ্যে থাকবি। নয়তো খুব খারাপ হবে।
সাগর দাঁতে দাঁত চেপে শার্টের হাতা ফোল্ড করতে করতে বলে,"কি করবি তুই? কি করবি? শা'লা কাপুরুষ। আতাউরের মতো একটা চামচিকা যার দলের লোক মেরে দেয় সে কি করবে আমাকে?"
_তুই কিভাবে জানলি আতাউর করেছে সব?
সামিনের এমন সরাসরি প্রশ্নে সাগর থতমত খায়। আমতা আমতা করে বলে,"জানি। সব খবর আসে আমার কাছে। আচ্ছা তুই আতাউরের সাথে কি করেছিস বলতো। শা'লা বসে গিয়েছে কেনো? গলায় রামদা ধরেছিলি নাকি?"
সামিন বলে,"বেশি চালাকি করবি না সাগর। এখানে কোনো ঝামেলা করবি না। সত্যিই যদি মায়ের বুকের দুধ খেয়ে থাকিস তাহলে নির্বাচনের ফলাফল পর্যন্ত অপেক্ষা কর। তখন মুখোমুখি হ।"
_আচ্ছা? তাই নাকি? খুব আত্মবিশ্বাস না তোর? তুই তো মেয়েদের হাতে চ'ড় খাস শা'লা। তোকে কে ভোট দেবে?
সামিন দাতে দাত চেপে দাঁড়িয়ে থাকে। এখানে সে মারামারি করতে চায় না। নয়তো আজ সাগরের খুব খারাপ অবস্থা করে ফেলতো।
***
রিতু একটা প্লেটে অল্প ভাত এবং একটু মাংসের তরকারি নিয়ে ইয়াসারের ঘরে ঢোকে। আলো মেঝেতে বসে বিছানায় পিঠ ঠেকিয়ে রেখেছে। তার দৃষ্টি মেঝের দিকে। ঘরে রিতুর অস্তিত্ব টের পেয়ে
তার দিকে তাকায়। আলোর মুখোমুখি হয়ে মেঝেতে বসে রিতু প্লেট টা তার দিকে বাড়িয়ে ধরে।
"নিন ভাবী। ভাত টা খেয়ে নিন। অল্প এনেছি।"
_বললাম না আমাকে ভাবী ডাকবে না!
রিতু ম্লান হেসে বলে," আচ্ছা ডাকবো না। আপনি খেয়ে নিন না প্লিজ। দয়া করে খেয়ে নিন।"
আলো প্লেটে হাত দেয়। কিছুক্ষণ প্লেটের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,"এই খাবার কোথা থেকে আসে জানো? তোমার শশুর বাড়ির পাপের টাকায়।"
রিতু চুপ করে থাকে। এমন সময় ইশিতা ঘরে ঢোকে। সে দরজার বাইরে থেকে আলোর কথা শুনে ফেলেছে। ঘরে ঢুকে আলোকে বলে,"খাবার টা যেভাবে-ই আসুক,ওটা তোমার রিজিকে ছিলো। এখন খেয়ে নাও, কালকের মতো শুরু করো না। ভাইয়া সন্ধ্যায় বাড়িতে আসলে সিনক্রিয়েট হবে। চুপচাপ থাকো,শান্ত থাকো। আমি ভাইয়াকে বোঝাচ্ছি যাতে সে তোমার প্রতি নরম হয়।"
রিতু মাথা তুলে ইশিতাকে বলে,"ভোট দিয়েছো আপা?"
_হ্যা ভাবী। তুমি যাও,মেজো ভাইয়া অপেক্ষা করছে তোমার জন্য।
রিতু উঠে চলে যায়। ইশিতা আলোর কাছে এগিয়ে এসে বিছানায় বসে। আলোর দিকে দৃষ্টি দিয়ে ঠান্ডা গলায় বলে,"খেয়ে নাও। আমি এখানে বসে আছি আলো। খেয়ে খালি প্লেট টা আমার কাছে দাও।"
***
অপজিশন পার্টির সভাপতি শমশের ভুঁইয়া পেয়েছে আটচল্লিশ হাজার তিনশ ছয় ভোট। অপরদিকে সরকারী দলের মনোনীত প্রার্থী সামিন ইয়াসার মির্জা পেয়েছে এক লক্ষ বারো হাজার সাতশো একান্ন ভোট। পঞ্চাশ হাজার ভোটার ভোট প্রদান করেনি। আতাউর আলম নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলে তারাও সরে দাঁড়ায়।
২৪ টি ওয়ার্ডে ১১০ টি কেন্দ্রের ৭৩০ টি বুথের ভোট গণনা সম্পন্ন হয়েছে। ১৯ নাম্বার ওয়ার্ডের সরকারি বয়েজ কলেজের মাঠে উল্লাসে ফেটে পরছে সামিন ইয়াসারের ছেলেরা।
কলেজের বারান্দায় প্রিজাইডিং অফিসাররা সামিন কে অভিনন্দন জানায়। ম্লান হেসে সামিন ধীরপায়ে মাঠে নেমে আসে। তাকে দেখে তার দলের ছেলেরা দৌড়ে গিয়ে তাকে জাপটে ধরে। সামিন ঠান্ডা গলায় বলে,"শান্ত হ সবাই,শান্ত হ!"
রাহাত প্রায় ছুটে আসে। সামিন কে জরিয়ে ধরে চেঁচাতে থাকে,"ভাই আপনি করে দেখিয়েছেন।"
সামিন ম্লান হেসে বলে,"আমরা করে দেখিয়েছি রাহাত।"
আরাফ বলে,"ভাই। ছেলেরা আনন্দ মিছিল বের করতে চাচ্ছে শহরে।"
সামিন ঠান্ডা গলায় বলে,"না।"
আরাফ শুকনো মুখে বলে,"কেনো ভাই?"
_জামিল সুস্থ হোক আগে।
রাহাত একটা শুকনো হাসি দিয়ে আক্ষেপের সুরে সামিনকে বলে,"জামিল ভাই থাকলে এখন উন্মাদের মতো চেচাতো ভাই।"
***
"বিপুল ভোটের ব্যবধানে জিতে এই শহরের নব নির্বাচিত মেয়র, ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রনেতা এবং সুপরিচিত জননেতা সামিন ইয়াসার মির্জা।"
চ্যানেল চব্বিশ ঘন্টায় ব্রেকিং নিউজ। হেডলাইনের দিকে তাকিয়ে আতাউর আলম একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে। তার স্ত্রী রেহেনা বিছানায় শুয়ে স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
লিভিং রুম থেকে শোরগোলের আওয়াজ পেয়ে আলো ধীরে ধীরে সিঁড়ির কাছে এসে দাঁড়ায়। সবাইকে এতো আনন্দিত লাগছে কেনো! দুমিনিট সেভাবে দাঁড়িয়ে থেকে দ্রুত পায়ে ইয়াসারের ঘরে ঢুকে সে টিভি অন করে।
"শহরের নব নির্বাচিত মেয়র সামিন ইয়াসার মির্জা। আজ দীর্ঘ বারো বছর পরে স্থানীয় সরকার পরিচালনা করবে একজন তরুণ নেতা। জনগণ আশাবাদী এই শহরকে তিনি নতুন রূপে গড়ে তুলবেন।"
সংবাদ পাঠিকার মুখে কথাটি শুনে আলো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে কয়েক মূহুর্ত। তারপর চেঁচিয়ে ওঠে,"ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে ঐ পি'শা'চ টা তোদের শহরে। তোরা বুঝলি না বোকার দল!"
রিমোট টিপে টিভি অফ করে মেঝেতে বসে থাকে সে। শরীরটা একটু একটু কাঁপছে। চোখে পানি এসে গিয়েছে। পরাজয়, অসহায়ত্ব এবং লাঞ্ছনার পানি। খানিক বাদে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে, অস্ফুট স্বরে বলে,"কেনো আল্লাহ! ওই শ'য়'তা'নকে কেনো জিতিয়ে দিলে!"
***
রাত প্রায় সাড়ে দশটা বেজে গিয়েছে। নির্বাচনী ঝামেলা সামলে জয়ী মুখ নিয়ে বাড়িতে ফিরে আসে সামিন। সন্ধ্যার পরে, নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকে একটার পর একটা ফোন তুলতে হচ্ছে তার। সবাই তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। সংসদ সদস্য কবীর আলমগীর তাকে নিজে এসে শুভেচ্ছা জানিয়েছে। দলের ছেলেরা তাদের ইয়াসার ভাইয়ের সাথে ছবি তুলে সামাজিক গণমাধ্যমে আপলোড করে সামিনকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। সবাইকে মিষ্টি খাইয়ে,সব সৌজন্যতা শেষ করে হাসপাতালে গিয়ে জামিলকে দেখে এসেছে একবার।
গাড়ি থেকে নামতেই পোনা চাচা দৌড়ে এসে সামিনকে জরিয়ে ধরে অভিনন্দন জানায়। সামিন হেসে ফেলে। তারপর বলে,"বাড়ির কি অবস্থা?"
_সব ঠিকঠাক। শুধু ইলহামের সাথে তর্কাতর্কি হয়েছে বড় বৌমার। ইলহামকে বলেছে চরিত্রহীন।
সামিন বলে,"এসব কি করে হলো?"
_ইলহাম বড় বৌমাকে তোমার জেতার কথা জানাতে গিয়েছিলো। বৌমা রেগে গিয়ে বলে,"দূরে গিয়ে মর, ধর্ষণ মামলার আসামি, চরিত্রহীন কোথাকার!"
সামিন একটা বড় নিশ্বাস ফেলে ঘরের ভেতর চলে যায়।
***
দরজা খোলার আওয়াজ পেয়ে আলো কপাল কুঁচকে ফেলে। তার মনে তীব্র যন্ত্রনা হতে শুরু করে। ভেতরে ঢুকে সামিন আলোর দিকে একবার তাকিয়ে দেখে। আলো মেঝেতে বসে আছে। সামিন দরজার সিটকিনি তুলে দিয়ে আলমারি থেকে একটা ট্রাউজার এবং টি-শার্ট বের করে ওয়াশ-রুমে ঢুকে পাল্টে নেয়। তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে গম্ভীর কন্ঠে বলে,"তোমার তো কোনো লস হলো না। বাপ হয়নি তো কি হয়েছে। তোমার স্বামী তো মেয়র হয়েছে।"
আলো দাঁতে দাঁত চেপে বসে থাকে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে। সামিন আলোর দিকে এগিয়ে গিয়ে আলোর মুখোমুখি হয়ে মেঝেতে বসে। আলোর ইচ্ছে করছে পি'শা'চ'টার গলায় ছুরি বসিয়ে দিতে। সামিন আলোর কপালের দিকে তাকিয়ে বলে,"ভেবেছি আজ আমার অনুপস্থিতিতে তুমি পালানোর চেষ্টা করবে। তা করোনি দেখে আমি খুশি হয়েছি। তুমি বুঝদার মেয়ে আলো।"
আলো মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। সামনের মানুষটাকে দেখলেই যে তার ঘৃণা হয়।
সামিন হাতের তোয়ালেটা আলোর হাতের উপর রেখে বলে,"যাও এটা ঐ চেয়ারের উপর রেখে এসো।"
আলো সামিনের দিকে তাকায়। সামিন কন্ঠে বিদ্রুপ মিশিয়ে বলে,"তোমার স্বামী তোমাকে আদেশ দিচ্ছে।"
কথাটি শুনে ঘৃনায় আলোর গা গুলিয়ে ওঠে। তোয়ালেটা এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে সামিনের দিকে থুতু ছুড়ে মারে। আলোর ছুড়ে দেয়া থুতু সামিনের টি-শার্টের বুকের কাছে লাগে। সামিন কয়েক মুহূর্ত আলোর দিকে তাকিয়ে থেকে উঠে টি-শার্ট টা পাল্টে নেয়। পুনরায় এসে আলোর সামনে বসে বলে,"এতো থুতু কোথা থেকে আসে তোমার? পেটে কৃমি হয়েছে? কৃমির ওষুধ খাওনা কতদিন হয়েছে?"
তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে কন্ঠস্বর গম্ভীর করে বলে,"ওই টি-শার্ট টা কাল সকালে তুমি ধুয়ে দেবে।"
কথাটি বলে সামিন উঠে দাঁড়ায়। আলো হাত দিয়ে শাড়ির আঁচল চেপে ধরে বসে আছে। সামিন একবার ঘুরে তাকিয়ে বলে,"মেঝেতে ঘুমাতে হবে না। পুরো বিছানা তোমাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে ।"
_আমি একটা পি'শা'চ ,জাহিল, ফে'রা'উ'ন , প'শু ,যাকে নিজের স্বামী বলে মানি না তার ঘামের গন্ধ লেপ্টে থাকা বিছানায় শোবো না। বুঝেছিস তুই?
চেঁচিয়ে বলে আলো। সামিন আলোকে কয়েক মুহূর্ত দেখে চেঁচিয়ে ওঠে,"ফুলির মা!"
ফুলির মাকে ডাকতে ডাকতে সামিন দরজার সিটকিনি খুলে দেয়। ফুলির মা নিচ তলা থেকে দৌড়ে গিয়ে সামিনের ঘরের সামনে দাঁড়ায়। সামিন গম্ভীর কন্ঠে বলে,"এই বিছানায় একটা নতুন চাদর বিছিয়ে দাও। যেটার স্টিকার এখনো তোলা হয়নি।"
ফুলির মা মাথা নাড়িয়ে বিছানার চাদর পালটাতে থাকে। মাঝখানে সে একবার আলোকে দেখে আবারও নিজের কাজে মন দেয়। সামিন বলে," সুগন্ধি স্প্রে করে দাও।"
আলো থমথমে মুখ নিয়ে বসে আছে মেঝেতে।
ফুলির মা পুরো ঘরে সুগন্ধি স্প্রে করে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।
সামিন দরজার সিটকিনি লাগিয়ে দিয়ে আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,"এবার আর কোনো পি'শা'চে'র গায়ের গন্ধ নেই। এবার ঘুমাও।"
কথাটি বলে সামিন বালিশ নিয়ে ডিভানের দিকে এগিয়ে যায়।
ফুলির মাকে রিতু পথে আটকায়।
"কি হয়েছে ফুলির মা? ভাইয়া কেনো ডেকেছিলো?"
ফুলির মা মুচকি হেসে বলে,"ঘর সাজাইতে ভাবী। আচ্ছা ভাবী! বাগান থেকে কিছু ফুল তুলে দিয়ে আসবো?"
রিতু একটা ধমক দিয়ে বলে,"ভাইয়ার থেকে বেশি বোঝো তুমি? যাও গিয়ে ঘুমাও।"
আলো আগের মতই মেঝেতে বসে থাকে। ফোনের রিংটোন বেজে ওঠে হঠাৎ। সামিন উঠে বসে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে ইশমামের নাম্বার। তার ঠোঁট প্রশস্ত হয়ে যায় হাসিতে। ফোন নিয়ে বারান্দায় চলে যায় সে। ফোনটা রিসিভ করে বলে,"ছোটো তোকে কতবার ফোন দিয়েছি। খবর শুনেছিস তুই?"
_হ্যা ভাইয়া। নিউজ দেখেছি সামাজিক গণমাধ্যমে । অভিনন্দন তোমাকে।
সামিন কপাল কুঁচকে ফেলে। বলে,"কি ব্যাপার ছোটো! তোর কন্ঠস্বর এমন লাগছে কেনো!"
_ঠান্ডা লেগেছে ভাইয়া।
দু'জনেই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর ইশমাম বলে ওঠে,"ভাইয়া! আমি দেশে ফিরছি। আগামীকাল আমার ফ্লাইট।"
সামিন আনন্দে প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে,"সত্যি নাকি!"
_হু ভাইয়া। ভাইয়া একটা কথা বলবো?
_হ্যা বল।
_আমি যদি তোমার কাছে কোনো আবদার করি তা মেনে নেবে তুমি? তোমার পছন্দ না হলেও।
সামিন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে,"যে ভাইটা কখনো আমার কাছে কোনো আবদার করেনি তার প্রথম আবদার আমি ফিরিয়ে দেবো? কখনোই না। তুই শুধু আয় ছোটো। আর,এখানে তোর জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।"
ইশমাম শুকনো গলায় বলে,"কি ভাইয়া?"
_সেটা এলেই দেখতে পাবি!
চলমান..........