#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে
#পর্বসংখ্যা_১৯
#Esrat_Ety
আলো নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে সরে দাঁড়ায়। সামিন একপলক আলোর নিচু করে রাখা মুখটার দিকে তাকিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। এদিক ওদিক তাকিয়ে বলে,"কোথায়? কোথায় সাপ?"
আলো সামিনের দিকে ফিরে তাকায় না। ওদিকে মুখ ঘুরিয়ে রেখে তর্জনী আঙ্গুল তুলে বারান্দার ডান দিকটা দেখিয়ে নিচু স্বরে বলে,"ওদিকে ছিলো।"
সামিন সাবধানে পা ফেলে এগিয়ে যায়। রেলিং এর কাছে গিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে পোনা চাচাকে ডেকে বলে,"চাচা রিয়াজকে একটু পাঠিয়ে দিন তো।"
নিচ থেকে পোনা চাচা উত্তর দেয়,"তোমার ঘরে বাবা?"
_হ্যা আমার ঘরে। তাড়াতাড়ি।
কথাটি বলে সামিন আলোর দিকে এক পলক তাকিয়ে বারান্দার এমাথা থেকে ওমাথা পায়চারি করতে লাগলো। আলো এখনো আ'ত'ঙ্ক থেকে বের হতে পারছে না। ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিচ্ছে দাঁড়িয়ে।
রিয়াজ এসে দরজায় নক করতেই সামিন গিয়ে দরজা খুলে দেয়।
তারপর বলে,"বারান্দায় একটা সাপ দেখা গিয়েছে।"
রিয়াজ বারান্দার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলে,"কতবার বলেছি হাসনাহেনা গাছটা উ'প্রে ফেলে দেই। ওটার জন্যই এমন হচ্ছে। এই নিয়ে দুইবার। আমার কথা তো বিশ্বাস করেন না স্যার।"
_ওসব কিছু না রিয়াজ। তুমি শেষ কবে কার্বলিক এ'সি'ড স্প্রে করেছিলে বাগানে?
_দুই সপ্তাহ আগে।
_এখন আবার ছড়িয়ে দাও। ফুলির মা কে বলো বারান্দা থেকে এইসব শুকনো পাতা পরিষ্কার করে দিতে।
রিয়াজ কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করে চলে যায়। কোথাও কিছু নেই। ফুলির মা এসে বারান্দা সহ পুরো ঘরটাই পরিষ্কার করে দিয়ে যায়। আলো তখনও চুপচাপ দাঁড়িয়ে।
সামিন হালকা কেশে আলোর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে। আলো চোখ তুলে তাকায়। সামিন বলে,"সাপ তোমার চিৎকার শুনেই মাগো বাবাগো বলে পা'লি'য়ে'ছে। আরাফ ঠিকই বলে, তোমার গলায় একটা অদৃশ্য মাইক রয়েছে। তুমি পলিটিক্স করলে মানাবে। মাইক ছাড়াই ভাষণ দিলে তিন কিলোমিটার দূরে থেকে শোনা যাবে।"
আলো খুব অপমানিত বোধ করলো কথাটায় যেন। তার কন্ঠস্বর নিয়ে এমন কু'ৎ'সি'ত মন্তব্য এর আগে কেউ করেনি। কপাল কুঁচকে ফেলে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এই মাত্র সে এই লোকটার কাছে একটা ভী'তু মেয়ে প্রমানিত হয়েছে।
আলোর নীরবতা দেখে সামিন ঘোর লাগা কন্ঠে বলে ওঠে,"বাহ। এই না হলে নারী। ভয় পেয়ে কাঁচুমাচু মুখ করে রাখবে, মাথা নিচু করে রাখবে, তা না করে কখনো বৈশাখের বিলের নতুন কৈ মাছ কিংবা ঝিলের চিংড়ি মাছের মতো হাত পা ছুড়ে লাফা লাফি করতে থাকো। তোমাকে মানায় না আলো।"
আলো সামিনের দিকে তাকায়। কিছুটা সময় নিয়ে বলে,"আত্মবিশ্বাসী মেয়েদের পুরুষ অপছন্দ করে জানি। কারন শক্তি'শালী, আত্মবিশ্বাসী মেয়েদের পাশে তারা ই'ন'সি'কি'উ'র ফিল করে। এ দেশের পুরুষরা স্বভাব গত কারনে দুর্বল শ্রেনীর মেয়েদের পছন্দ করে এসেছে। কারন টা হলো নরম মাটিতে আ'চ'র কে'টে খুব আনন্দ পাওয়া যায়। পুরুষের পছন্দের তালিকায় এক নম্বরে থাকে বোকা বোকা সুন্দরী মেয়ে, যে কথায় কথায় কুর্নিশ করবে। জেদ দেখাবে না।"
সামিন আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,"খুব কথা জানো তুমি আলো। বয়সের তুলনায় বেশি ভারি ভারি কথা বলো। তা এতো আত্মবিশ্বাসী মেয়ে একটা সাপ দেখে কেনো ভ'য় পাবে? সাপটার দিকে তে'ড়ে যেতে। কারাতে করতে সাপটার সাথে!"
কথাটি বলেই সামিন উচ্চশব্দে হেসে ওঠে। আলো কপাল কুঁচকে রাখে। হাসি থামিয়ে সামিন বলে," আমি ভাবতাম পৃথিবীতে তুমি আমাকে বেশী ঘৃণা করো। এখন দেখছি ঐ সাপটা বেশি দুর্ভাগা।"
আলো একটা গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে বলে,"সাপটাকে ভয় পাই আমি। আর আপনাকে ঘৃণা করি। দু'টো আলাদা ইয়াসার মির্জা।"
আলোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ডিভানের দিকে চলে যায় সামিন। কথাবার্তা যেদিক থেকেই শুরু হোক না কেন শেষ হয় সামিনের প্রতি আলোর ঘৃণার ঘোষণার মাধ্যমে। রোজ রোজ দর্শক বিহীন এই স্টেজে একই সংলাপ শুনতে শুনতে সামিনের কানে পোকা ধরে গেছে। শুধু একটাই কথা,"ঘৃণা করি ইয়াসার মির্জা! পি'শা'চ ইয়াসার মির্জা, ফে'রা'উ'ন ইয়াসার মির্জা। বিরক্তিকর মেয়ে একটা।"
ডিভানে গা এলিয়ে দিতে দিতে সামিন নিজের চিন্তাভাবনা দেখে নিজে বেশ অবাক হয়। মনে মনে বলে ওঠে,"জোরপূর্বক বিয়ে করে তুমি কি আশা করো সামিন! তোমার বৌ তোমাকে মাথায় উঠিয়ে নাচবে? তোমার কাছে এসে বলবে "প্রাননাথ" ? ঘুমের মধ্যে ঐ মেয়েটা তোমাকে বালিশ চা'পা দিয়ে মে'রে ফেলেনা,সেটাই তোমার সৌভাগ্য ইয়াসার মির্জা!"
আলো দাঁড়িয়ে আছে। সামিন এসির পাওয়ার কমিয়ে দিয়ে নিজের গায়ে একটা চাদর টেনে নিয়ে ওদিক ফিরে শুয়ে বলে ওঠে,"ঘুমোও। ঐ বেচারা সাপটা তোমার কাছে ইহজনমে আর আসবে না। মারাত্মক ভয় পেয়েছে আজ সে।"
***
ইংরেজিতে স্পষ্ট করে এ্যালেক্স বলে ওঠে,"কেনো এমন করছো ইশমাম। তোমার ভাইকে বলো সত্যিটা!"
ইশমাম স্ক্রিনে এ্যালেক্সের দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে বলে,"সম্ভব না এ্যালেক্স। একটা বিশ্রী ব্যাপার হয়ে যাবে।"
এ্যালেক্স ইশমামের দিকে তাকিয়ে থাকে। ইশমাম বলে ওঠে,"লাভ কি কিছু হবে এ্যালেক্স? সবটা কি আগের মতো হবে? মাঝখান থেকে আজীবনের জন্য ভাইয়া আর আমার মধ্যে অদৃশ্য একটা দেয়াল তৈরি হবে। এসব করে আমি কি অদ্রিতাকে ফিরে পাবো? এতকিছুর পরে অদ্রিতা মানবে আমাকে? আর ভাইয়া! আমি চাই না ঐ লোকটা সব জেনে আত্মগ্লানিতে ভুগুক। চাই না তার মনে ঝ'ড় তুলতে। ভাইয়ার সাথে আমার সম্পর্কটাকে অস্বাভাবিক করতে চাই না।"
_তোমার অনূভুতি ঠিক আগের মতোই আছে ইশমাম। আমার খুব দুঃখ হচ্ছে তোমার জন্য।
_এমন কথা বলো না এ্যালেক্স। সে এখন আমার ভাবী। কোনো অনূভুতি নেই আমার। এসব ভাবাও অন্যায়। কোনো অনূভুতি নেই।
এ্যালেক্স চুপ করে থাকে। ইশমাম প্রসঙ্গ পালটে বলে,"তোমার কথা বলো এ্যালেক্স। সোফি কি রাজি হয়েছে?"
_আর বলো না । রাজি ঠিকই। কিন্তু দেখাচ্ছে সে রাজি না। এই মেয়ে মানুষ এতো অদ্ভুত কেনো ইশমাম!
ইশমাম এ্যালেক্সের কথায় হেসে বলে,"তুমি ঠিকই বলেছ এ্যালেক্স। পৃথিবীতে সবথেকে অদ্ভুত এই মেয়ে মানুষ!"
***
আজ ইহানের ইচ্ছে হয়েছে বাগানে বসে পড়াশোনা করার। তার ইচ্ছেকে সম্মান জানিয়ে বাগানে একটা টেবিল এবং দুটো চেয়ার পেতে দেওয়া হয়েছে। শান্ত খুবই মনযোগ সহকারে ইহানের হোমওয়ার্ক দেখছে। দোতলার বেলকোনি থেকে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে ইশিতা। ইশিতার কাছে লোকটাকে বাড়াবাড়ি পর্যায়ের ভদ্র মনে হয়। লোকটা নিজেকে যতটা সভ্য,স্পষ্টবাদী, শিক্ষিত জাহির করে আদৌ কি সে ততটা? কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ইশিতা নিচে রান্নাঘরে চলে যায়। একটা প্লেটে কিছু খাবার সাজিয়ে সোজা বাগানে যায়। শান্ত ইহানকে রংধনু সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছে। পেছন থেকে নরম গলায় ইশিতা বলে ওঠে,"আসবো!"
শান্ত মাথা ঘুরিয়ে তাকায়। সে কিছুটা অবাক হয় ইশিতাকে দেখে। ইশিতা বলে,"আপনার জন্য ভাবী পাঠিয়েছে। খেয়ে নিন।"
শান্ত ইশিতার হাতের প্লেটের দিকে একবার তাকিয়ে ইহানের হোমওয়ার্ক খাতা দেখতে দেখতে বলে,"আমি এতটাও গরীব নই। তিন বেলা ভাত খেতে পারছি। এভাবে এতকিছু দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। ভাবীকে বলে দিবেন। এতে আমার অভ্যাস নষ্ট হবে।"
ইশিতা শান্তর দিকে একপলক তাকিয়ে প্লেট টা শান্তর সামনে রেখে বলে,"গিটার কার?"
শান্ত টেবিলের পাশে রাখা গিটারের দিকে তাকিয়ে বলে,"আমার কাছে যেহেতু। তার মানে আমার।"
_আপনি গান জানেন?
_মোটামুটি।
ইশিতা বেশ অবাক হয়। এই লোকটার সাদাসিধে ভাব দেখলে মনেই হয়না এ লেখাপড়া ছাড়া অন্য কিছু জানে। শান্ত ইহানকে লিখতে দিয়ে ইশিতার দিকে না তাকিয়ে বলে,"আপনি নাস্তা নিয়ে এলেন যে। এটা তো আপনার কাজ না।"
_দেখতে এসেছি। আপনি ইহানকে ঠিকঠাক মতো পড়াচ্ছেন কি না। মাস শেষে এতো গুলো টাকা মাইনে দেওয়া হয় আপনাকে। সেগুলো সব জলে যাচ্ছে কি না সেটাই দেখতে এসেছি।
***
ঘুরেফিরে আলো ইমতিয়াজ মির্জার সামনে পরে গেলো। একপলক তার দিকে তাকিয়ে আলো চোখ নামিয়ে নেয়। ইমতিয়াজ মির্জা ভ্রু কুঁচকে আলোকে কয়েক পলক দেখে সিঁড়ির দিকে যায়। হুবহু এই লোকটার চেহারা পেয়েছে এর তিন গুণধর ছেলে। সবগুলো একেবারে বাবার কপি। চারদিকে একই চেহারার কতগুলো পুরুষ মানুষ। যেদিকে তাকাও ইয়াসার মির্জা। রাবনের দশ মাথার মতো, কোনটা রেখে আলো কোনটা ব'ধ করবে ! আলোর জীবন টা দুর্বিষহ হয়ে উঠছে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এদের দেখতে দেখতে।
দ্রুতপায়ে ঘরে ঢুকে বারান্দার দিকে যায় আলো , ইয়াসার কিছু কাগজ উল্টে পাল্টে দেখছিলো। আলোকে দেখে গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে,"মেঝে তো কোনো দোষ করে নি। শুধু শুধু ওকে কেনো শাস্তি দিচ্ছো। ধীরে হাটো।"
আলো দাঁড়িয়ে পরে,ইয়াসারের দিকে তাকিয়ে বলে,"কেনো? মেয়ে বলে? মেয়ে বলে ধীরে হাঁটতে হবে?"
_হ্যা। ওটাই নারীর সৌন্দর্য।
_হাটবো না ধীরে। আমি এমন করেই হাটবো। লাফিয়ে লাফিয়ে। আর এতোই যখন নারীর সৌন্দর্য, নারীর সৌন্দর্য করেন,তাহলে ওরকম একটা দেখে বিয়ে করে নেন। আমাকে মুক্তি দিন। আমি তো যেচে আপনার ঘাড়ে উঠিনি। আমার কাছ থেকে নারীর সৌন্দর্য আশা করতে লজ্জা করে না? আমাকে মুক্তি দিয়ে আপনাদের বাড়ীর মেজো বৌ রিতুর মতো একটা নমুনা বিয়ে করে আনুন। যে আনন্দের সাথে আপনার পায়ের তলায় পি'ষ্ট হতে চাইবে।
সামিন উঠে দাঁড়ায়। আলোর চোখে চোখ রেখে গম্ভীর কন্ঠে বলে,"রিতু পায়ের তলায় পি'ষ্ট হচ্ছে?"
আলো তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। কন্ঠে বিদ্রুপ নিয়ে বলে,"না, আপনার চরিত্রহীন ভাই তাকে মাথায় তুলে রেখেছে। শুধুমাত্র সন্তান জন্ম দিয়েছে বলে দয়া করে থাকতে দিয়েছে এই বাড়িতে।"
সামিন আলোর দিকে তাকিয়ে আছে। আলো বলতে থাকে," আপনি তো আপনি। এসব আপনার চোখে পরবে না। নিজেই যেখানে একটা আস্ত ক্রি'মি'না'ল।"
_বেশি বলে ফেলছো না আলো? কোনো প্রমাণ আছে এসবের? বলো!
_যার সাথে ঘটেছে তাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন। রিতুকে জিজ্ঞেস করুন। তার স্বামীর পরকীয়ার সম্পর্ক আছে।
_আমি মানছি ইলহাম কিছু অন্যায় করেছিলো অতীতে। কিন্তু ওসব এখন অতীত। ও মন দিয়ে সংসার করছে।
_আপনাকে যারা ভোট দিয়েছে তাদের জন্য খুব আফসোস হচ্ছে আমার।
কথাটি বলে আলো চলে যেতে নিলে সামিন পথ আগলে দাড়ায়। আলো ধমকের সুরে বলে,"কী?"
_ইলহামের ব্যাপারে যেটা বললে এইমাত্র সেটা যদি মিথ্যা হয়?
_মিথ্যা কেনো হবে। আমি নিজের কানে স্পষ্ট শুনেছি।
_আচ্ছা। আমি রিতুকে জিজ্ঞেস করবো। যদি মিথ্যা হয় তাহলে কি করবে তুমি?
_তাহলে আর কি,শাস্তি তো আমি পাচ্ছিই নতুন করে আর কি দেবেন? আর যদি সত্যি হয় তাহলে আমি যা বলবো সেটা শুনবেন? বলুন!
সামিন কয়েক মুহূর্ত আলোর দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,"শুনবো।"
এমন সময় হঠাৎ সামিনের ফোনের রিংটোন বেজে ওঠে। ফোনটা হাতে নিয়ে কানে ধরে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর উত্তেজিত কন্ঠে বলে ওঠে,"আসছি আমি।"
***
"কোথায়। তোমার সেই শুভাকাঙ্ক্ষী সব কোথায়? কেউ জিজ্ঞেস করেছে তুমি কেমন আছো? সেদিনের পর থেকে খোজ নিতে এসেছে কেউ?"
আতাউর আলম বিছানায় শুয়ে শূন্যে দৃষ্টি রেখে আছে। রেহেনা চাপা স্বরে চেঁচিয়ে বলতে থাকে,"নির্বাচন করো, নির্বাচন করো বলে খুব উস্কেছিলো তখন। এখন কোথায় তারা?"
আতাউর আলম শোয়া থেকে উঠে বসে।
"তুমি একটা কা'পু'রু'ষ আতাউর আলম।"
স্ত্রীর এহেন কথায় আতাউর আলম আহত হয় কিন্তু প্রতিবাদে কোনো শব্দ বের হয় না তার ভেতর থেকে। ঠিকই তো। সে কা'পু'রু'ষ।
"এখন ? এখন তুই কি জবাব দিবি সামিন ইয়াসার? আমি জানতাম। জানতাম আমি এর মধ্যে একটা ঘা'প'লা অবশ্যই আছে। খালি চোখে যেটা মনে হয় সেটা সবসময় সত্যি নয় সামিন । এখন তুই জবাব দে।"
সামিন ফুয়াদের কথার উত্তর না দিয়ে জামিলের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে,
"তুই কিভাবে বলছিস ওরা আতাউর আলমের লোক নয়?"
_আমি ওদের চিনি ভাই। ওদের প্রত্যেকটাকে আমি চিনি। ওদের আমি আগেও দেখেছি। ওদের কন্ঠস্বর আমার খুব চেনা। ওদের মধ্যে একজনের হাতে অদ্ভুত দেখতে কিছু আংটি ছিলো। আপনার মনে আছে শিমুল তলার সমাবেশে ঝামেলার কথা? ওরা ছিলো সেখানে। ওরা আর যাই হোক আতাউরের লোক না ভাই। ওরা ভুঁইয়ার লোক।
_হেনা বলেছে আমাকে, ওরা নিজের মুখে বলেছে আতাউর আলমকে বিজয়ী দেখতে চায়........
জামিল ক্ষীণ কন্ঠে বলে ওঠে,"আরে ধূর ভাই। আপনি আবার কবে থেকে মেয়ে মানুষের কথায় এতো গুরুত্ব দিতে শুরু করলেন। ও কিছু জানে নাকি আগাগোড়া? ওকে যেটা বলা হয়েছে বিশ্বাস করে নিয়েছে।"
রাহাত দাঁত খিচিয়ে জামিলের বেডের দিকে এগিয়ে যায়,"তুমি উঠলে কেন? যেভাবে পরেছিলে পরে থাকতে! কতবার ভাই বলেছিলো সাবধান হতে , সাবধান হওনি। আজ যদি না নিজে বিপদে পরতে। তাহলে ভাই এতো বড় একটা অঘটন ঘটাতো না।"
জামিল কিছু বুঝতে পারছে না রাহাতের কথা। ফুয়াদ রাহাতকে ধমক দিয়ে বলে,"কথায় কথায় ভাইয়ের কোল টেনে কথা বলা বন্ধ কর। পুরোটা তোর ভাইয়ের বোকামি সেটা বল। আমি বারবার বলেছি রাগের মাথায় কোনো অঘটন ঘটাস না। দেশে আইন আছে। কিন্তু কে শোনে কার কথা।"
জামিল সবার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,"কি হয়েছে? কেউ খুলে বলো। ভাই কি করেছে?"
_তোর ভাই, রাগের মাথায়, নির্বাচনে জেতার জন্য আতাউরের মেয়েকে তুলে এনে বিয়ে করেছে। আমিও ছিলাম সাথে। আমিও সাথ দিয়েছি।
হতভম্ব মুখটা নিয়ে জামিল সামিনের দিকে তাকায়। সামিন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ফুয়াদ চেঁচিয়ে বলতে থাকে,"কেমন লাগছে সামিন ইয়াসার? একটা নিরপরাধ ব্যক্তিকে ভুগিয়েছিস তুই।"
ফুয়াদের দিকে সামিন এক পলক তাকিয়ে হনহন করে কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়। ফুয়াদ পিছু পিছু ছুটে যায়।
হসপিটালের গেইটের কাছে এসে গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে হাত মুঠি করে সজোরে একটা ঘুষি মেরে দেয় সামিন। ফুয়াদ এসে হাত ধরে ফেলে সামিনের। চেঁচিয়ে বলতে থাকে,"এখন এসব বন্ধ কর। যা হবার হয়ে গেছে। সামনে কি করবি সেটা ভাব। শাস্তি শাস্তি খেলা হয়ে গিয়েছে? শান্তি পেয়েছিস? এখন গিয়ে ক্ষমা চা ওদের কাছে। তালাক চাইলে তালাক দিয়ে দিবি। আমি তোকে চিনি সামিন। তুই স্বস্তি পাবি না! আত্মগ্লানিতে ধুকে ধুকে মরবি।"
সামিন ফুয়াদের দিকে তাকায়। ফুয়াদের বলা কথাটা তার কানে বাজছে,"তালাক দিয়ে দে।"
ফুয়াদ বলে,"এখন ভুঁইয়াদের কি করবি বল! সাগরের একটা বোন আছে,ওকে তুলে আনি? ওকে বিয়ে করবি?"
রাগ দেখিয়ে ফুয়াদ বলতে থাকে।
সামিন কয়েক মূহুর্ত চুপ করে থেকে গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট করে। ফুয়াদ পাশের সিটে বসে সিটবেল্ট বাঁধতে বাঁধতে বলে,"কথা বলছিস না কেন? জবাব দে!"
_তালাক দেবো না আমি। আর ভুঁইয়া দের উপযুক্ত শাস্তি ওরা পাবে।
সামনের দিকে দৃষ্টি রেখে ঠান্ডা গলায় বলে সামিন। ফুয়াদ সামিনের দিকে তাকায়। সামিন বলতে থাকে,"বিয়ে করা বৌকে বিনা কারণে কেনো তালাক দেবো।"
_মানে? তুই ওর সাথে সংসার করবি?
_হু। সেজন্যই তো বিয়ে করেছি। বারবার একই কথা জিজ্ঞেস করিস কেন তোরা?
কিছুক্ষণ চুপ থাকে সামিন। তারপর হুট করে বলে ওঠে,"একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেলেছি রে ফুয়াদ।"
_আবার কি?
চেঁচিয়ে ওঠে ফুয়াদ।
_আমি সম্ভবত আমার বৌয়ের প্রেমে পরে গিয়েছি।
ফুয়াদ সামিনের দিকে তাকায়। সামিনের মুখ হাসি হাসি। সে বলতে থাকে,"কাল রাতে টের পেয়েছি। এখন আর তালাক দেওয়া সম্ভব না।"
_তাহলে মাফ চা ওর কাছে,ওর পরিবারের কাছে। ভুলটা স্বীকার করে নে নিজের।
সামিন সে কথার উত্তর না দিয়ে বলে,"খুবই আলাদা ও। কি অদ্ভুত দেখ, সামিন যে ধরনের মেয়েদের পছন্দ করতো না ও সে ধরনের মেয়ে। তবুও কি থেকে কি হয়ে গেলো!"
_শরীরের ওপর জোর চলে সামিন, মনের ওপর চলে না। ভুলে যাস না।
_আমি তো জোর করে বিয়েটাই করেছি শুধু, অন্য কোনো জোর তো দেখাইনি।
_উফফ। তুই আমাকে পাগল বানিয়ে ছাড়বি সামিন।
সামিন বাঁকা হাসি হাসে। ফুয়াদ বলে,"ও আলো সামিন। এ জন্মে ও তোর নিয়ন্ত্রণে আসবে না। রমনীর মন, সহস্র বছর সাধনা করতে হয় পেতে হলে। আর তোর ধৈর্য নেই। তুই সামিন ইয়াসার মির্জা।"
_দেখা যাক.....
ঠান্ডা গলায় জবাব দেয় ইয়াসার।
***
ইশমামকে দেখে আলো কপাল কুঁচকে ফেলে। ইশমাম নিচু স্বরে বলে,"সরি। আমি ভাইয়ার কাছে এসেছিলাম। জানতাম না ভাইয়া ঘরে নেই।"
_তোমার ভাইয়ের ঘরে তোমার ভাইয়ের স্ত্রী থাকে ইশমাম। এভাবে আর কখনো নক না করে ঢুকবে না।
ইশমাম কয়েক পলক আলোর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,"আচ্ছা।"
আলো মুখ ঘুরিয়ে নেয়। ইশমাম চলে যেতে নিলে আলো হঠাৎ বলে ওঠে,"একটা মানুষকে তুমি ভালোবাসতে, তার প্রতি প্রচন্ড রকমের অনূভুতি জন্মানোর পরে হঠাৎ দেখলে পৃথিবীতে সেই মানুষটার কোনো অস্তিত্বই নেই। একজন ভান ধরে থাকা ছদ্মবেশীর সাথে তোমার পরিচয় হয়েছিলো। তখন এর চেয়ে বেশি ঘৃণা করতে তুমি তাকে,যতটা আমি তোমাকে করি।"
মেঝের দিকে দৃষ্টি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইশমাম। আলো বলতে থাকে," নিজের জীবন টা গুছিয়ে নাও তুমি। এক সময়ের অধিকার বোধ থেকে বলছি, তোমার পরিবারের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ো না। দয়া করে হয়ো না।"
আলোর মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু না বলে ইশমাম বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। আলো দরজার দিকে দৃষ্টি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
***
আজান কয়েক মুহূর্ত সামিনের দিকে তাকিয়ে থেকে প্রচন্ড জোরে তার বাবাকে ডাকতে থাকে। আতাউর আলমের শরীরটা ভালো নেই। রেহেনা এসে দরজার কাছে দাড়ায়। সামিন আজানের দিকে তাকিয়ে বলে,"দুলাভাইকে ভেতরে আসতে দেবে না শা'লা?"
আজান দরজা থেকে সরে দাঁড়ায়। সামিন ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলে,"তুমি কোনটা? আজান না আয়াত"
_আজান।
_আয়াত কোথায়?
_ফার্মেসীতে গিয়েছে।
সামিন সোফায় বসে পরে। ভেতরের ঘর থেকে আতাউর আলম বলে ওঠে,"কে এসেছে রেহেনা? কে?"
_আপনার জামাই। ইয়াসার মির্জা।
আতাউর আলম সামিনের কন্ঠ পেয়ে তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে নামে। অসুস্থ শরীর নিয়ে বসার ঘরে এসে সামিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। সামিন উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দেয়। আতাউর আলম সামিনের এমন অদ্ভুত আচরণে বেশ অবাক হয়। তার দিকে তাকিয়ে জানতে চায়,"তুমি কেনো এসেছো!"
সামিন মৃদু হাসে। তারপর জবাব দেয়,"আপনাদের দাওয়াত জানাতে। আমার বাবা ইন্ডিয়া থেকে ফিরেছে। আমার আর আপনার মেয়ের বিয়ের রিসিপশনের আয়োজন করেছি, আগামী পরশু। কার্ড ছাপানো হচ্ছে। সময় মতো পৌঁছে যাবেন। পুরো শহরের সাথে আমার শশুর শাশুড়ির পরিচয় করিয়ে দেবো আমি।"
***
সিতারা দরজা খুলে দিতেই অলস ভঙ্গিতে সামিন ঘরের ভেতরে ঢোকে। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত বারোটা প্রায়। সিতারা নিচু স্বরে বলে,"টেবিলে খাবার দেবো ভাইজান?"
_না।
একশব্দে বলে সিঁড়ির কাছে গিয়ে ফিরে সিতারার দিকে তাকায় সামিন,"তোর বড় ভাবী খেয়েছে?"
সিতারা মাথা নাড়িয়ে বলে,"জ্বি।"
সামিন সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যায়। খুবই সন্তর্পনে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে বিছানার দিকে তাকায় সে। আলো ঘুমিয়ে আছে। দরজা বন্ধ করে বিছানার কাছটাতে এসে বসে পরে। কিছুক্ষণ আলোর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আলোকে দেখে এখন ঠিক একটা গোলাপের মতো লাগছে। যে গোলাপে কাঁ'টা আছে। ছুঁয়ে দিলেই হাতে ফুটে যাবে যার কাঁ'টা।
দীর্ঘসময় পরে মনে মনে বলতে থাকে,"তুমি ঠিক বলেছিলে আলো। আমি কা'পু'রু'ষ। ভুল স্বীকার করার সাহস নেই আমার।"
বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হয়। একটা মশা এসে বসে আলোর গালে। কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করে সামিন একটা আঙ্গুল ছুঁইয়ে দেয় আলোর গালে। হুট করে ঘুম ভেঙে যেতেই আলো লাফিয়ে উঠে বসে। সামিন কিছুটা চ'ম'কা'য়। আলো হতভম্ব ভাব কাটিয়ে তেজী কন্ঠে বলে ওঠে,"আপনি আমার গালে হাত দিচ্ছিলেন কেনো?"
সামিন থতমত খেয়ে বলে,"মশা পরেছিল।"
_হাতি পরে থাকুক। আপনার কি?
চেঁচিয়ে ওঠে আলো। সামিন উঠে দাঁড়ায়। আলো বলতে থাকে,"দেখছেন ঘুমিয়ে আছি আর অমনি সুযোগ নিতে চলে এসেছেন তাই না?"
সামিন কিছু বলে না। সে জানে, রোজকার তর্কাতর্কি শুরু হতে যাচ্ছে,যার শেষ হবে "আমি আপনাকে ঘৃণা করি ইয়াসার মির্জা" কথাটির মাধ্যমে। তাই কথা না বাড়ানোই ভালো।
আলো বিছানা থেকে নামে। সামিনের দিকে তাকিয়ে বলে,"জামিল কথা বলেছে? কি বলেছে সে?"
_ওর সাথে আমার কথা হয়নি।
ঠান্ডা গলায় জবাব দেয় সামিন। আলো বলে ওঠে,"কেনো কথা হয়নি? কেনো কথা বলছেন না? সত্যিটা জানলে মুখে চুন'কালি মাখা হয়ে যাবে সেই ভয়ে?
সামিন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে,"ঘুমাও আলো।"
_কেন? আমাকে ঘুম পাড়ানোর এতো তাড়া কিসের? আমি ঘুমিয়ে গেলে সুযোগ নিতে আসবেন সেজন্য?
সামিন প্রচন্ড বিরক্ত হয় আলোর এমন আচরণে। সে তার বিরক্তি প্রকাশ না করে ঠাট্টার ছলে বলে,"নিজেকে কি ভাবো তুমি? অনেক সুন্দরী? নিজের গায়ের রং দেখেছো? ঐ সামান্য উজ্জ্বলতা টুকু সৃষ্টি কর্তা তোমায় দয়া করে দিয়েছে। ভেবো না আমি সুযোগ নেওয়ার জন্য বসে আছি।"
আলো হা হয়ে তাকিয়ে আছে। কথাটি বলে সামিন মুখ টিপে হাসে।
আলো সামিনকে অবাক করে দিয়ে বলে ওঠে,"নিজে একটু ফরসা বলে নিজেকে কি ভাবেন আপনি? অন্যের গাঁয়ের রং নিয়ে কথা শোনাচ্ছেন। আর আপনি অনেক সুন্দর? নিজের চেহারা কখনো আয়নায় দেখেছেন ? একটা সাদা মুলার মতো লাগে আপনাকে!"
চলমান.......