#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে
#পর্বসংখ্যা_২০
#Esrat_Ety
"ওরা নারী জাত, পুরুষকে ঘা'য়ে'ল করতে কারাতে, মা'র'পি'ট জানতে হয় না, মুখটা একটু "মাসুম মাসুম" করে রাখলেই পুরুষ ঘা'য়ে'ল হয়ে যায়। ভাইয়ের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছে।"
রনির এমন কথায় সবাই তার দিকে তাকায়। সামিন ইয়াসারের পার্টি অফিসে আজ সবাই জমায়েত হয়েছে। মাস শেষে একটা দিন তারা দুস্থদের মাঝে খাবার বিতরণ করে। আজ সেই দিন। সামিন রাহাতের সাথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করছে। এ পাশে বসে বাকিরা সবাই সামিনের সমাচার পাঠ করছে ।
আরাফ কপাল কুঁচকে বলে,"ভাই ঐ মেয়েটার মুখের ভাষা এতো জ'ঘ'ন্য। গালাগাল ছাড়া কথাই বলতে পারে না। ইয়াসার ভাই কিভাবে ওর প্রেমে পরলো বলতো!"
রনি আরাফকে থামিয়ে দিয়ে বলে,"ঐ মেয়েটা না। ভাবী বল। ভাই শুনলে কাঁচা খে/য়ে ফেলবে।"
সবুজ বলে ওঠে,"যাই বল। ভাই যে আলো ভাবীর প্রেমে পরবে তা জানতাম কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি ঐ সিংহ একটা মেয়ের কাছে কাবু হয়ে গিয়েছে এটা মানতে পারছি না।"
_তোর চোখের সামনে সারাদিন চুড়ি পরে, লাল শাড়ি পরে মাথায় ঘোমটা দিয়ে একটা মেয়ে ঘুরঘুর করবে। তোর পুরুষ মনে সু'ড়'সু'ড়ি লাগবে না? তোর প্রেম প্রেম পাবে না?
রনির এই কথাটায় আরাফ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে বলে,"হু। তাও ঠিক। ওরা নারী। ওরা সব পারে। কিছু না করেও। ওই যে নারী দিবসের একটা স্লোগান আছে না? আমরা নারী। আমরা সব পারি। কথাটা এজন্যই বলেছে।
তৌফ হাসতে হাসতে বলে ওঠে,"হু ভাই। আমরা নারী। আমরা পাথরেরও মন গলাতে পারি।"
"তোরা আমার কথা না শুনে নিজেরা কি আলোচনা করছিস?"
সবাই সামিনের দিকে তাকায়। সামিন গম্ভীর কন্ঠে বলতে থাকে,"দলের কাজে মন না বসলে বলবি। একেবারে বের করে দেবো ঘা'ড় ধরে।"
_তেমন কিছু না ভাই।
_সব বুঝিয়ে দিয়েছি। আমার এখন উঠতে হবে। আজ কয়েক যায়গায় বৃক্ষ রোপন কর্মসূচি আছে। সেখানে যেতে হবে। কাল সবাই আসবি পরিবার নিয়ে। মনে থাকে যেন।
দলের সবাই মাথা নাড়ায়। সামিন উঠে দাঁড়াতে গিয়ে বসে পরে। তার দৃষ্টি টেবিলের উপর রাখা একটি ছোটো আয়নার ভিতরে তার নিজের প্রতিবিম্বে নিবদ্ধ। কয়েক পলক সেদিকে তাকিয়ে থেকে ছেলেদের দিকে তাকিয়ে বলে,"আচ্ছা বলতো। আমি দেখতে কেমন!"
সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে থাকে সামিনের কথায়। রাহাত বলে,"সুন্দর। আপনি অনেক সুন্দর। কেনো ভাই?"
সামিন বলতে থাকে,"আমি ফর্সা। সেজন্য কি আমাকে সাদা মুলার মতো লাগে?"
তৌফ দাঁত বের করে বলে,"কি যে কন ভাই। আপনি কত সুন্দর। আপনি পুরো ঋত্মিক রওশানের মতো দেখতে। শুধু আপনার চোখের মনি ঘন কালো আর ঋত্মিকের চোখ বিলাইয়ের মতো। আপনিই বেশি সুন্দর ভাই।"
সামিনের কাছে তৌফের কথাটা মন মতো হয় না। এরা তার ছেলে,এরা তো তার প্রশংসা করবেই। একটা মেয়ে বোঝে কোন পুরুষ সুন্দর। আলো একটা মেয়ে। সে যখন বলেছে তাহলে হয়তবা সত্যিই সামিন কে সাদা মুলার মতোই লাগে।
***
বাড়িতে কেটারিং-এর লোকজন এসেছে। সাজাচ্ছে বাড়িটাকে। আলো তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে সব। সে কিছুই বুঝতে পারছে না। তার ঘরে বিছানার উপরে কিছু শাড়ি রেখে গিয়েছে কেউ। শাড়ি গুলো অনেক দামী,দেখেই বোঝা যাচ্ছে। এসব কি হচ্ছে আসলে, আবার কি নতুন তামাশা করতে চাচ্ছে ইয়াসার মির্জা!
"ভাইয়া তুমি জামিলকে কেনো এপয়েন করেছো সিমেন্টের বিজনেসে? ও এসবের কি বোঝে? ও তো তোমার দলের।"
ইলহাম সামিনের দিকে তাকিয়ে আছে। সামিন কেটারিং-এর এক লোকের সাথে কথা বলছিলো। ইলহামের প্রশ্নে ঘুরে তাকায়। তারপর বলে,"ওকে দলে রাখছি না। ওকে ব্যাবসায় ঢুকিয়ে দেবো আমাদের।"
_ভাইয়া তুমি জামিলের জন্য একটু বেশি বেশি করছো না? ওকে কেনো পারিবারিক ব্যাবসা ধরিয়ে দেবে!
_ওকে কাজ দিচ্ছি শুধু ইলহাম। তোর ভাগের সম্পত্তি দিয়ে দিচ্ছি না। আর হ্যা,ওর জন্য আমার আলাদা দুর্বলতা আছে। বাপ মা ম'রা এতিম ছেলেটা অন্যের লাত্থি উষ্ঠা খেয়ে আমার কাছে,এই পরিবারের কাছে আশ্রয় নিয়েছিলো। বরাবর বিশ্বস্ততা দেখিয়েছে। আমি ওকে স্নেহ করি। তোদের যেমন করি।
ইলহামের কাছে সামিনের কথাটা পছন্দ হয় না। একটা বাইরের ছেলেকে তাদের মতো স্নেহ করবে,এটা ইলহাম মানতে পারবে না।
রিতু কফির মগ এনে সামিনের হাতে দেয়। সামিন ইলহামের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,"আজকাল তুই কোথায় কোথায় যাচ্ছিস আমাকে ইনফর্ম করছিস না। কিছু উড়ো খবর আসছে আমার কাছে। ব্যাপার কি!"
ইলহাম কপাল কুঁচকে রিতুর দিকে তাকিয়ে সামিনকে বলে,"কে দিচ্ছে এসব খবর তোমাকে?"
_কেউ না। যা করবি একটু বুঝে শুনে করবি ইলহাম। ইহানের ফিউচারে প্রভাব ফেলে এমন কিছু আমি বরদাস্ত করবো না।
_ভাইয়া তুমি আমাকে সন্দেহ করছো?
_না,তোকে বোঝাচ্ছি। তোর বড় ভাই আমি। বোঝাতে পারিনা?
কথাটা বলে সামিন কফির মগে চুমুক দিয়ে নিজের ঘরে চলে যায়। ইলহাম রিতুর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চলে যায় সেখান থেকে।
"ওগুলো তোমার। দেখো কোনটা পছন্দ হয়।"
আলোকে বিছানায় রাখা শাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে পেছন থেকে সামিন বলে ওঠে। আলো ঘুরে দাঁড়ায়। সামিন বলতে থাকে,"কাল আমাদের রিসিপশন। তোমার বাবা মা আসবে।"
আলো তর্জনী আঙ্গুল তুলে শাড়ি গুলোর দিকে তাক করে বলে,"এসব পরে সং সাজতে হবে কেন আমাকে? চাচ্ছেন কি আপনি?"
সামিন মনে মনে বলে,"চাচ্ছি তোমাকেই।"
কিন্তু মুখে বলে," আপাতত চাচ্ছি এসব পরে লক্ষী বৌয়ের মতো বসে থাকবে চুপচাপ। সবাই এসে সামিনের বৌকে দেখে যাবে।"
_আপনার ভয় নেই? কাল যদি সবাইকে আমি সত্যিটা বলে দেই?
সামিন কফির মগে এক চুমুক দিয়ে বলে,"বলবে না। তুমি উন্মাদ আমি জানি। তবে এতটাও উন্মাদ নও যে নিজের ভালো বুঝবে না।"
***
হাতের কাগজটা ছিঁড়ে সাগর টুকরো টুকরো করে ছুঁড়ে মারে।
শমশের ভুঁইয়া আহাজারি করে বলে,"মোক্ষম চাল টা চেলেছে ইয়াসার। কোর্ট অর্ডার এসে গিয়েছে। তিন দিনের মধ্যে ঘাটের দখল ছেড়ে দিতে হবে। কতগুলো টাকা লস হয়ে গেলো সাগর।"
_মেয়রের ক্ষমতা দেখিয়েছে ও। ওকে আমিও আমার ক্ষমতা দেখাবো। ও আতাউরের মেয়েকে বিয়ে করেছে কেনো কিছু জানতে পারলেন? এটা কোনো স্বাভাবিক বিয়ে না জানি। আতাউর আলম কখনো ওর সাথে মেয়ের বিয়ে দেবে না, না ঐ মেয়ের সাথে ইয়াসারের প্রেমের সম্পর্ক ছিলো। তাহলে বিয়েটা কিভাবে হলো! এর মাঝে কিন্তু আছে। কারনটা খুজে বের করেন।
ইয়াসার মির্জার সাথে আতাউর আলমের মেয়ে অদ্রিতা আলোর বিয়ে হয়েছে। খবরটা বাতাসের গতিতে ছড়িয়ে গেলো সর্বত্র। আগামীকাল তাদের রিসিপশন। সবাই দুইয়ে দুইয়ে চার মেলানোর চেষ্টা করছে।
পাড়া প্রতিবেশীরা বিভিন্ন বাহানায় বাড়িতে এসে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে খবর বের করার চেষ্টা করছে।
সকাল থেকেই আতাউর আলমের শরীরটা বেশ খারাপ। এমনিতেই মানসিক এবং শারীরিক ভাবে সে দিনকে দিন বেশ ভেঙে পরছে। তার উপর সকাল থেকে পাড়া প্রতিবেশীর উটকো ঝামেলা আর নেওয়া যাচ্ছে না। সবাইকে সত্যিটা সে বলে দিতেই পারে। কিন্তু মেয়েটা যে এখনো ইয়াসারের কাছে!
আরাম কেদারায় হাত পা এলিয়ে শুয়ে শুয়ে ছটফট করছে সে। বুকের ব্যাথাটা বারছে। তার সাথে হুট করে মাথা ব্যথা হচ্ছে খুব। ঘামছে সে। একটা অনিশ্চিত জীবন আদরের মেয়েটার সামনে। অথচ সে বাবা হয়ে কিছু করতে পারছে না। এক সময় নিজের জীবনের পরোয়া না করা আতাউর আলম এখন একটা দুদিনের ছেলের ইশারায় নাচছে। এর থেকে লাঞ্ছনার আর কি হতে পারে!
সন্ধ্যার দিকে শারীরিক অবস্থার অবনতি দেখে একটু হাঁটাহাঁটি করতে নেমেছিলো আতাউর আলম। পাড়ার বড় দোকানটার সামনে কিছু প্রতিবেশী আলো আর ইয়াসারের আলোচনায় মেতে আছে। আতাউর দূর থেকে কথাবার্তা শুনে এড়িয়ে যেতে চাইলো। সে ঘুরে দাড়াতেই পেছন থেকে কেউ তাকে ডাকে।
_আরে আলম ভাই। এদিকে আসুন। যাচ্ছেন কোথায়?
আতাউর আলম তাদের দিকে তাকায়। ব্যারিস্টার ফখরুল তাকে ডাকছে। ধীরপায়ে সে এগিয়ে যায় তাদের কাছে। সবাই তার দিকে খুবই উৎসুক ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে। ফখরুল খুবই আন্তরিকতার সাথে আতাউর আলমকে বসিয়ে শুরুতেই যে প্রশ্নটি করে সেটি হলো,"প্রেম ভালোবাসার সম্পর্ক ছিলো নাকি আলম ভাই? সেজন্যই কি আপনি নির্বাচন বর্জন করেছিলেন?"
আতাউর আলম সবার মুখের দিকে তাকায়। সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে। পাশ থেকে একজন বলে ওঠে,"শুরুতেই সন্দেহ হয়েছিলো। আপনার ভাবী তো বলাবলি করছিলো, এতদিন হয়ে গেলো মেয়েটার খোজ নেই। আচ্ছা আতাউর ভাই, আলো কি নির্বাচনের আগের দিন রাতে পালিয়েছিলো?"
***
"এই ছেলে। কি চাও তুমি।"
কড়া গলায় আলো ইহানকে বলে কথাটি । ইহান ভয় না পেয়ে উল্টো কপাল কুঁচকে বলে,"এটা আমার বড় বাবার ঘর। আমি বড় বাবার কাছে এসেছি।"
আলো মুখ ঘুরিয়ে বসে থাকে। ইহান বলে,"তুমি খুব পঁচা।"
_হ্যা হ্যা,আমিই খারাপ। আর তোমার বাবা চাচারা এবং তুমি খুউউব ভালো।
ইহান ভেংচি কেটে বলে,"ইইইইইইই।"
আলোও হুট করে ইহানকে নকল করে বলে,"ইইইইইইই।"
সামিন ঘরে ঢুকে আলোর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। তারপর বলে,"তুমি একটা বাচ্চার সাথে তর্ক করছো। এভাবে ভেংচি কাটছো! তুমি তো ভারি অদ্ভুত মেয়ে।"
আলো কপাল কুঁচকে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। সামিন ইহানকে কোলে তুলে নিয়ে আদুরে কন্ঠে বলে,"তুমি না গুড বয়? বড়দের ভেংচি কাটতে নেই তোমাকে শেখাইনি?"
ইহান মাথা নাড়ায়। সামিন বলে,"কেনো এসেছিলে?"
_খেলতে। টিচার চলে গিয়েছে।
_কিন্তু এখন তো খেলতে পারবো না। সকালে খেলি? তুমি এখন যাও বাবা। মাম্মা তোমাকে ডাকছে।
ইহান তার বড় বাবার কোল থেকে নেমে চলে যায়। সামিন আলোর দিকে একপলক তাকিয়ে বিছানার উপরে রাখা শাড়িগুলো হাতে তুলে নেয়। সেগুলো আলমারিতে তুলে রেখে বলে,"একটা বাচ্চা তোমার কোনো ক্ষতি করেনি। তার সাথেও তুমি সমানে সমান তর্ক চালিয়ে যাচ্ছো। নির্ঘাত একটা পাগল মেয়ে তুমি অথবা বিয়ের পরদিন থেকে পাগল হয়ে গিয়েছো।"
কথাটি বলে কিছুক্ষণ ঠোঁট টিপে হেসে নেয় সামিন।
তারপর আলমারির দরজা চাপিয়ে ঠাট্টার ছলে বলে,"সারাদিন তো কোনো কাজই করো না। বিছানায় অলস বিড়াল ছানার মতো গুটিসুটি মেরে বসে থাকো। স্বামীর সেবা নাই বা করলে, নিজের জিনিসপত্র তো গুছিয়ে রাখতে পারো। এই শাড়ি গুলো তো তোমার।"
আলো সামিনের দিকে তে'ড়ে আসে,"এসব নাটক বন্ধ করুন ইয়াসার মির্জা। স্বামী স্বামী নাটক আমার সাথে দেখাবেন না।"
_দেখাবো। এখন থেকে তো আরো বেশি দেখাবো।
_বলে তো দিয়েছি। আপনার যা করার আপনি করে নিন। আমি আপনাকে মানবো না।
সামিন কিছুক্ষণ চুপ করে আলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর ঠান্ডা গলায় বলে,"জামিল মুখ খুলেছে।"
আলো উত্তেজিত হয়ে পরে। বলে,"কি বলেছে? আমার বাবা কিছু করেনি। এটাই তো তাই না? বলুন!"
_হু। সেটাই। তোমার বাবা কিছু করেনি।
আলোর মুখে হাসি ফুটে ওঠে, চেঁচিয়ে বলতে থাকে,"দেখেছেন? দেখেছেন তো? এখন কি বলবেন। বলুন ইয়াসার মির্জা । বলুন। যেখানে আমার বাবা কিছু করেই নি সেখানে কিসের শাস্তি পাচ্ছি আমরা। এখন ছেড়ে দিন। দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন। তালাক দিয়ে দিন আমায়।"
সামিন ম্লান হাসে। অস্ফুট স্বরে বলে,"বিয়ে করা বৌকে বিনা কারণে কেনো তালাক দেবো!"
আলো সামিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। সামিন ঠান্ডা গলায়,"এজন্মে তা হবে না আলো।"
_কেনো! এখনো কেনো! সবটা তো জানলেন। তবুও কেন!
_আমি তোমাকে ভালবাসি আলো।
স্পষ্ট এবং দৃঢ় ভাবে শব্দ গুলো উচ্চারণ করে সামিন। সে আলোর চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। কয়েক মুহূর্ত যেতেই স্ব-শব্দে সামিনের গালে আলো এক চ'ড় বসিয়ে দেয়। সামিন মাথা ঘুরিয়ে আলোর দিকে তাকিয়ে থাকে।
আলো দাঁতে দাঁত চেপে,সামিনের কলার ধরে চেঁচিয়ে বলতে থাকে,"এই! এই ইয়াসার মির্জা! আবার কোন নাটক শুরু করেছেন আপনি? উদ্দেশ্য কি আপনার?"
নিজের কলার থেকে আলোর হাত দুটো ছাড়িয়ে দিতে দিতে নরম গলায় বলে,"উদ্দেশ্য তোমার সাথে সংসার করার।"
আলো চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে আছে। সামিন বলতে থাকে,"আমি স্পষ্ট কথা বলি। তাই স্পষ্ট ভাবে বলে দিলাম। তোমাকে আমার ভালো লেগেছে, তোমার প্রতি আমার অনূভুতি জন্মেছে। যেটা দমিয়ে রাখা আমার পক্ষে সম্ভব না। বিয়েটা যেভাবেই করি না কেন, একটা স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়তে চাই তোমার সাথে আমি। আর হ্যা, ভুল করেছি আমি। সামিন ইয়াসার ভুল করেছে। তার ভুল সে স্বীকার করে নিলো। তোমার বাবা মায়ের কাছে ক্ষমা চাইবো, তোমার ভাইদের কাছে ক্ষমা চাইবো। যা করতে বলবে করবো। কিন্তু তোমাকে তালাক দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না।"
_জোর করেই পারবেন সব। কখনো আমি আপনাকে মানবো না। কখনো না।
নিস্তেজ কন্ঠে বলে ওঠে আলো। সামিন কিছুক্ষণ আলোর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,"আমাকে মা'রো, ঘৃ'ণা করো, জেদ দেখাও যা খুশি করো। সবকিছু আমার সীমানার মধ্যে থেকে করবে। আমার থেকে দূরে যাওয়ার কথা ভুলেও ভাববে না।"
ধপ করে বিছানার উপর বসে পরে আলো। কিছুক্ষণ পর ঝরঝর করে কেঁদে দিয়ে বলে,"এর থেকে আপনি আমাকে মে'রে ফেলছেন না কেনো? আমাকে ছেড়ে দিলে আমি আপনার নামে মামলা করবো বলে ভয় পাচ্ছেন? তবে আমাকে মে'রে দিন। সবকিছু ধামাচাপা পরে যাবে। তবু এই জ'ঘ'ন্য খেলাটা বন্ধ করুন!"
কাঁদতে থাকে আলো। সামিন কয়েক মুহূর্ত আলোকে দেখে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
অসময়ে সামিনের নাম্বার দেখে ফুয়াদ মুখে চ কারন্ত শব্দ করে, ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে বিরক্ত ভঙ্গিতে বলে,"তুই, তোর বৌ, তোর রাজনীতি, তোর প্রতিশোধ ছাড়াও আমার আরেকটা জীবন আছে সামিন। বাড়িতে এসেও একটু শান্তিতে থাকতে পারবো না আমি?"
_মানুষ নিজের পায়ে নিজে কু'ড়া'ল মা'রে। আমি ব্যতিক্রম তাই বিয়ে করেছি।
ঠান্ডা গলায় বলে সামিন। ফুয়াদ বলে,"কি হয়েছে ঝেড়ে কাশ!"
_আমি কিছু বুঝতে পারছি না। কি করবো এখন? ভালোবাসার কথা বললাম, কত নরম গলায় বললাম। চ'ড় মেরেছে, এখন কাঁদতে বসে গিয়েছে।
ফুয়াদ সামিনকে বিদ্রুপ করে বলে,
_তো? তুই আমাকে ফোন দিচ্ছিস কেনো? তুই তো ইয়াসার মির্জা। যার কাছে স্ত্রী কেবল বিছানার সৌন্দর্য। সে কেনো স্ত্রীর চ'ড় হজম করে নেবে। ওকেও চ'ড় মার। জোর জবরদস্তি কর। কত বড় সাহস ওর,তোকে ভালোবাসবে না! ইয়াসার মির্জাকে ভালোবাসবে না! ওর হাত পা বেঁধে মা'র। চ'ড় মেরে ওর মুখ থেকে ভালোবাসি কথাটা বের কর।
ফুয়াদ রাগে কাঁপতে থাকে কথাটি বলে। সামিন নিস্তেজ কন্ঠে বলে,"বাজে না বকে কিছু একটা সাজেশন দে ভাই। আমি পুরো এলোমেলো হয়ে আছি।"
_তুই ম'র।
ফুয়াদ ফোন কেটে দেয়। সামিন চুপচাপ নিচতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে। কিছু সময় যেতেই তার কাছে রনির ফোন আসে । সামিন ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে।
ঘরের বাইরে থেকে ইশিতা উঁকি দেয়। আলো হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়ে কাঁদছে। ইশিতা কিছুক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে ঘরের ভেতরে ঢোকে। আলোর পাশে বসে আলোর মাথায় হাত রাখে। কান্না থামিয়ে আলো তাকায়। ইশিতা কোনো কথা বলে না। আলো চোখের পানি মোছে। তারপর ধরা গলায় বলে,"আপনার ভাইকে বলুন আমায় মে'রে ফেলতে। দোহাই আপনার।"
ইশিতা কিছু বলতে যাবে তখনি সামিন হন্তদন্ত হয়ে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে। আলোর দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বলে,"তুমি আমার সাথে চলো আলো। তোমার বাবা একটু অসুস্থ!"
***
ড্রাইভ করতে করতে সামিন আড়চোখে আলোকে দেখে। শাড়ির আঁচল মুখে চেপে ধরে অঝোর ধারায় কাঁদছে আলো। বেশ মায়া হচ্ছে আলোর প্রতি সামিনের,সেই সাথে বুকে সুক্ষ্ম যন্ত্রনা হচ্ছে তার। আলোর এই কান্না তো তার কারনেই। কিছুক্ষণ আলোর দিকে তাকিয়ে থেকে গাড়িটা হঠাৎ থামিয়ে দেয় সে। আলো কেঁদেই যাচ্ছে। সামিন একটা গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে আলোর সিটবেল্ট বেঁধে দেয়। আলোর গায়ে সামিনের হাত লাগতেই এক ঝটকায় সেই হাত সরিয়ে দেয় আলো। সামিন নিচুস্বরে বলে,"সিটবেল্ট না বাঁধলে সমস্যা হতে পারে।"
আবারও গাড়ি চলতে শুরু করে এবং সোজা হসপিটালের সামনে এসে থামে। গাড়ি থেকে নেমে এসে দরজা খুলে আলোর দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। আলো তাকে উপেক্ষা করে নেমে দৌড়ে ভেতরে চলে যায়। সামিন ধীরপায়ে তার পিছু পিছু যায়।
করিডোরে মাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মায়ের গায়ে হুমরি খেয়ে পরে আলো। আজান আয়াত এসে আলোকে ধরে। রেহেনা দীর্ঘদিন পরে মেয়েকে দেখেও তাকে বুকে টেনে নেয়না। মেয়ের মুখের দিকে থাকে শুধু। আলো কান্নাটাকে নিয়ন্ত্রণ করে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,"কিভাবে হলো আম্মু এসব!"
_কারন উপর ওয়ালার ইচ্ছা।
ধরা গলায় জবাব দেয় রেহেনা। খুবই ক্লান্ত এবং বিধ্বস্ত লাগছে তাকে। সামিন ধীরপায়ে হেটে করিডোরে এসে দাঁড়ায়,তার মুখটা খুবই শুকনো দেখাচ্ছে। রেহেনা সামিনের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে তার দিকে এগিয়ে যায়। কন্ঠস্বর স্বাভাবিক রেখে বলে,"এসেছো তুমি। এখানে দাঁড়িয়ে কেনো? লোকটাকে দেখবে না? এসো আমার সাথে। এসো।"
সামিনের হাত ধরে রেহেনা টানতে টানতে আইসিইউর সামনে নিয়ে গিয়ে দাড় করায়। বলে,"দেখো। মন ভরে দেখো তুমি! শান্তি পাচ্ছো না? বলো বাবা!"
সামিন অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে,"আন্টি....."
সামিনকে কিছু বলতে না দিয়ে একটা চ'ড় মারে রেহেনা তাকে। গালে হাত দিয়ে মেঝের দিকে দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে আছে সামিন। রেহেনা বলে ওঠে,"আর কিসে শান্তি হবে তোমার?"
ছুটে গিয়ে আজান আয়াতকে টেনে এনে সামিনের সামনে দাঁড় করায়, তারপর চেঁচিয়ে বলতে থাকে,"ওদের মে'রে ফেললে হবে? নিয়ে যাও। পু'তে ফেলো ওদের।"
তারপর গিয়ে আলোকে টেনে এনে সামিনের দিকে ধাক্কা দিয়ে বলে,"ওকেও মে'রে দাও। তাহলে তো শান্তি অবশ্যই হবে।"
সামিন চোখ তুলে তাকায় না রেহেনার দিকে। রেহেনা চেঁচিয়ে বলতে থাকে,"আমাকে মারো বাবা। অবশ্যই শান্তি পাবে তুমি।"
কথাটি বলে কান্নায় ভেঙে পরে রেহেনা। কিছুক্ষণ পরে মাথা ঘুরে পরে যেতে নিলে ইয়াসার এসে ধরে ফেলে। আজান আয়াতের দিকে তাকিয়ে বলে,"ওনাকে বসিয়ে দাও।"
আজান আয়াত তাদের মাকে ধরে একটা বেঞ্চিতে বসিয়ে দেয়। সামিন ঘুরে আলোর দিকে তাকায়। কান্না থামিয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে। সামিন তার দিকে এগিয়ে যায়। পাশে বসে আলোর দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলে,"আলো...."
_আজ যদি আমার বাবার কিছু হয়, তাহলে জেনে রাখুন ইয়াসার মির্জা। আমার বাবার খুনী হিসেবে আমি আপনাকেই জানবো, আজীবন!"
ঘৃণা মিশ্রিত কন্ঠে কথাটি বলে ওঠে আলো।
চলমান......