ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগলো চোখে

২১তম পর্ব

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে

#পর্বসংখ্যা_২১

#Esrat_Ety

ডাক্তার রাসেল কিছুক্ষণ হা করে তাকিয়ে থাকে সামিনের দিকে। তারপর হাসিহাসি মুখ করে বলে ওঠে,"এই শহরের মেয়র সামিন ইয়াসার! আমাকে চিনতে পেরেছো?"

সামিন রাসেলের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়,"রাসেল। ফার্স্ট বেঞ্চার। রোল নাম্বার ৩!"

রাসেল হেসে ফেলে, অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে সামিনের সাথে কোলাকুলি করে। সামিনের দিকে তাকিয়ে বলে,"তুমি ব্যাক বেঞ্চার হলেও তোমার স্মৃতিশক্তি প্র'খ'র সামিন। এত বছর পরেও মনে রেখেছো আমাকে!"

সামিন মৃদু হাসে। রাসেল আলোর দিকে তাকিয়ে সামিনকে বলে,"ওয়াইফ?"

সামিন মাথা নাড়ায়।

_হু বুঝলাম। রোগী কে হয়? শশুর?

_হ্যা রাসেল।

রাসেল একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলে,"আই সি!

সামিন বলে,"ওনার এখন কি অবস্থা?"

_দেখো সামিন। ওনার আগে থেকেই ডা'য়া'বে'টি'স এবং হার্টের অসুখ ছিলো। অতএব ঝুঁ'কি'টা একটু বেশিই। আর তাছাড়া ওনারা এখানে আনতে অনেকটাই দেরী করে ফেলেছে। এটা মাইল্ড স্ট্রো'ক না, মস্তিষ্কে র'ক্ত'ক্ষ'র'ণ হয়েছে। সা'র্জা'রি ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

সামিন আলোর মুখের দিকে তাকায়। আলো বোকার মতো ডাক্তার রাসেলের দিকে তাকিয়ে আছে। এগিয়ে এসে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,"তাহলে! করছেন না কেনো অ'পা'রে'শ'ন! করুন।"

_ভাবী সার্জারি তো মুখের কথা নয়। আর তাছাড়া....

_এ দেশে হবে না? বলো!

রাসেল সামিনের দিকে তাকায়,

_হবে! কিন্তু অনেক রি'স্কি। অন্যদিকে বেশি দেরী করাও যাবে না। আমাদের কিছু একটা করতে হবে। যদি তোমরা রাজি থাকো।

_আপনি অ'পা'রে'শ'ন করুন।‌ প্লিজ।

আলো হা'ত'জো'ড় করে বলে ওঠে।

_আপনাদের সৌভাগ্য নাকি জানি না তবে আজকেই ডাক্তার আদনান রুহানি এসেছে। যদি ব'ন্ডে সই করে দেন তাহলে আমরা এগোতে পারি!

আলো কেঁ'পে ওঠে কথাটা শুনে। ভীত কন্ঠে বলে,"বন্ডে কেন সই করতে হবে!"

রাসেল নিচু স্বরে বলে,"বললাম না অনেক রি'স্কি! কিছু একটা হয়ে গেলে!"

রেহেনা আ'র্ত'না'দ করে ওঠে। আজান মাকে আগলে নেয়। আলো গলায় জমে থাকা কান্নাটা গিলে ফেলে একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলে,"ঠিকাছে। কোনো অসুবিধা নেই।"

_আর একটা বিষয়। অপারেশনটা খুবই ব্যয়বহুল .....

_তুমি এসব নিয়ে ভেবো না রাসেল.....আমি আছি!

সামিন কথাটি বলার সাথে সাথে আলো চেঁচিয়ে ওঠে,"নাহ!"

সামিন এবং রাসেল তার মুখের দিকে তাকায়। আলো সামিনের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,"প্রয়োজন নেই। একেবারেই প্রয়োজন নেই ইয়াসার মির্জা!"

_শা'ট আ'প আলো। হাজার টাকার বিষয় না এটা।

আলো সামিনের দিকে এগিয়ে যায়,তেজী কন্ঠে বলে ,"আপনি ভাবলেন কি করে আমি আপনার টাকায় আমার আব্বুর অ'পা'রে'শ'ন করাবো!"

রাসেল একবার সামিন একবার আলোর দিকে তাকায়। সামিন আলোকে বলে,"কি করবে তুমি?"

_আমাদের যেটুকু আছে সেটাই যথেষ্ট। আপনার মতো ক্রি'মি'না'লে'র টাকায় আমার আব্বুর জীবন বাঁচলে অমন জীবনের দরকার নেই!

চোখের পানি মুছে রেহেনার দিকে তাকিয়ে বলে,"আমি আব্বুর সেভিংস থেকে টাকা তুলতে চাই আম্মু। নমিনি তো তুমি! কিন্তু মনে হচ্ছে বেশ দেরী হবে তাতে, তুমি আমার বিয়ের জন্য যে গয়না গুলো গ'ড়ে'ছি'লে ওগুলো বিক্রি করতে চাচ্ছি। আজ রাতের মধ্যে!"

সামিন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে আলোর হাত ধরে টানতে টানতে ওয়েটিং রুমের পেছনের দিকটায় নিয়ে যায়। দেয়ালের সাথে ঠে'সে ধরে ধ'ম'কে'র সুরে বলে ওঠে,"বেশি বুঝবে না আলো। তুমি ঠিক নেই। আমাকে সামলাতে দাও সবটা।"

আলো সামিনকে ধাক্কা দিয়ে বলে,"কেনো? কে হন আপনি আমাদের?"

_কেউ না। একজন অ'প'রা'ধী আমি। একজন দোষী। ধরে নাও এই সবটা আমার ভুলের মা'শু'ল।

আলো তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে,"ভুলের মা'শু'ল চাইনা আমি। আপনার অন্যায়ের শা'স্তি ছাড়া আমি কিছুই চাই না! দরকার নেই এসবের! যান এখান থেকে!"

এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে ইশমাম এসে দাড়িয়ে পরে সেখানে। তার পিছনে ইশিতা। ইশমাম আলো আর সামিনের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,"ভাইয়া!"

সামিন ওদের দিকে তাকায়। ইশিতাকে দেখতে পেয়ে বলে,"ইশু এই অর্ধ উ'ন্মা'দ মেয়েটিকে ধরে রাখ। আমার কিছু কাজ আছে। আতাউর আলমের সা'র্জা'রি হবে।"

আলো চেঁচাতে থাকে,"সব যায়গায় নিজের ক্ষমতার জো'র, গায়ের জো'র,অর্থের জো'র দেখাবেন না ইয়াসার মির্জা।"

ইশমাম বলে ওঠে,"অদ্রি........"

তারপর কথাটা ফিরিয়ে নিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,"ভাবী, আপনি শান্ত হোন! এখন মাথা ঠান্ডা রাখার সময়!"

আলো এক পলক ইশমামের দিকে তাকিয়ে ছুটে চলে যায় রেহেনার কাছে। সামিন কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে ডাক্তার রাসেলের কাছে চলে যায়।

***

"ভাবী!"

ইশিতা হুট করে কি মনে করে আলোকে ভাবী ডেকে ফেলে। আলো রেহেনাকে আগলে ধরে বসে ছিলো। মাথা তুলে ইশিতার দিকে তাকায়। আজান আয়াত দূরের একটা বেঞ্চিতে মাথা নিচু করে বসে আছে।

ইশিতা আলোর পাশে বসে রেহেনার দিকে তাকিয়ে বলে,"আন্টির শরীরটা খুব খা'রা'প সম্ভবত। হসপিটালের পাশেই আমার এক ফ্রেন্ডের বাসা। তুমি চাইলে আমি আন্টিকে সেখানে নিয়ে যেতে পারি, আন্টি একটু রেস্ট নিতো। অপারেশন সকাল সাতটায়।"

_দরকার নেই।

নিচু স্বরে কিন্তু দৃঢ় কন্ঠে বলে ওঠে রেহেনা। তারপর আজানের দিকে তাকিয়ে বলে,"তোর দাদীর খোজ নিয়েছিস?"

"হু। পপি খালা এসেছে বাসায়।"

রেহেনা দু'চোখ বন্ধ করে ফেলে। ইশিতা উঠে দাঁড়ায়। তখনি একজন নার্স এসে বলে,"এখানে আলো কে?"

_আমি।

নিস্তেজ কন্ঠে জবাব দেয় আলো‌।

_আপনি একটু আমার সাথে আসুন। ব'ন্ডে সই করতে হবে।

আলো একটা ধাক্কার মতো খায়। কিন্তু নিজেকে দ্রুতই সামলে নিয়ে সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। দুই কদম হেটে সামনে এগোতেই মাথা ঘুরে পরে যেতে নিলে ইশিতা ধরে ফেলে। ইশিতা নরম গলায় বলে,"আমি তোমাকে ধরে রাখছি ভাবী। তুমি চলো।"

ডাক্তার রাসেলের কেবিনে সামিন এবং ইশমাম। দুজনে দুটো চেয়ারে বসে আছে। আলো গিয়ে কেবিনের দরজার কাছে দাড়ায়। ইশমাম আলোকে দেখতে পেয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। আলো গিয়ে চেয়ার টাতে বসে পরে। তার দৃষ্টি ডাক্তার রাসেলের দিকে। রাসেল আলোর দিকে একটা কাগজ এগিয়ে দিয়ে বলে,"এটাতে সই করতে হবে ভাবী।"

কাঁপা কাঁপা হাতে আলো কাগজটা নেয়। কিছুক্ষণ কাগজটার দিকে তাকিয়ে থেকে মুখ তুলে একে একে সবার দিকে তাকায়। ইশিতা আলোর কাঁধে হাত রেখে নরম গলায় বলে,"সব ঠিক হবে। কিছু হবে না তোমার বাবার!"

‌সামিন চুপ করে বসে আছে। আলো ধীরে ধীরে কাগজটায় সই করে ডাক্তার রাসেলের দিকে এগিয়ে দেয়। রাসেল বলে,"এখন তোমরা অপেক্ষা করো। আমরা ডাক্তাররা আগে একটা মিটিং করবো। তোমরা ধৈর্য্য ধরো। আল্লাহ্ কে ডাকো।"

আলো উঠে চলে যায়। সামিন ইশিতার দিকে তাকিয়ে বলে,"কিছু খাওয়া ওদেরকে।"

_কাজ হবে না ভাইয়া। সবাই ক'ঠি'ন পাথরের মূর্তি। যার কারিগর তুমি নিজেই।

সামিন বোনের দিকে তাকিয়ে থাকে। ইশিতা উঠে আলোর পিছু পিছু চলে যায়।

***

"কোথায় যাচ্ছো!"

নরম গলায় বলে সামিন।

আলো আজানের হাত ধরে দাঁড়িয়ে পরে। সামিন এসে আলোর সামনে দাঁড়ায়। আলোর চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,"রাত তিনটার সময় কোথায় যাচ্ছো তুমি?"

আলো অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলে,"টাকা আনতে। আব্বুর অ'পা'রে'শ'নে'র।"

সামিন আলোকে শক্ত করে ধরে নিজের দিকে টেনে নিয়ে রেগে গিয়ে বলে,"বাড়াবাড়ি করছো কিন্তু আলো।"

আলো নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়না সামিনের থেকে। চুপচাপ অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। আলোর নীরবতা সামিনকে আরো রা'গি'য়ে দেয়। কিন্তু মুহুর্তেই নিজেকে শান্ত করে। আলোকে ছেড়ে দিয়ে নরম গলায় বলে,"ঠিকাছে। কিন্তু এই মুহূর্তে তুমি টাকা কোথায় পাবে? না ব্যাংক খোলা না স্বর্নের দোকান। কে দেবে তোমাকে টাকা? আর এই শহরে আমার জানামতে তোমাদের কোনো পরমাত্মীয় নেই যে এই মুহূর্তে তুমি চাইলেই তোমাকে এতগুলো টাকা দিয়ে দেবে।"

আলো সামিনের দিকে তাকায়। সামিন বলে,"আমি টাকার ব্যাবস্থা করছি। তুমি বরং ধার হিসেবে নাও। পরে না হয় শো'ধ করে দিও। তোমার গয়না গুলো আমাকে দিও। তবু এতো রাতে অযথা পণ্ডশ্রম করো না আলো। তোমার মায়ের কাছে যাও।"

_আমি আপনার কাছ থেকে ধারও নেবো না।

সামিন এইবার প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে রে'গে গিয়ে দেয়ালে একটা ঘু'ষি মে'রে দেয়। ইশিতা এসে ভাইয়ের হাত ধরে। ইশমাম এসে দাঁড়ায়। ইশিতা আলোকে একপলক দেখে কিছু কঠিন কথা বলতে যাবে অমনি ইশমাম চোখ দিয়ে ইশারা করে তাকে কিছু বলে নিষেধ করে। নিজেকে সামলে নিয়ে ইশিতা আলোকে বলে,"ঠিকাছে ভাবী। ভাইয়ার থেকে নিতে হবে না। তুমি আমার থেকে ধার নাও‌। তোমার গয়না গুলো আমাকে দিও। প্লিজ!"

আলো ইশিতার দিকে তাকিয়ে থাকে। ইশিতা এসে আলোর গালে একটা হাত রেখে বলে,"আপু বলো তো তুমি আমায়। তাই না? তাহলে আমার এই কথাটা ফেলো না প্লিজ। প্লিজ ভাবী! প্লিজ আলো!"

আলো কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে নিজের গাল থেকে ইশিতার হাত টা ছাড়িয়ে দিয়ে ধীরপায়ে হেটে রেহেনার কাছে চলে যায়।

***

অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে সকাল ছয়টা বেজে গিয়েছে। আর একঘন্টা পরে অ'পা'রে'শ'ন। এর মাঝে কেউ কিছু মুখে দেয়নি। ডাক্তার আদনান রুহানি এবং রাসেল ছাড়াও আরো দুজন ডাক্তার অপারেশন রুমে ঢুকে প্রস্তুতি নিচ্ছে সবকিছুর।

রেহেনা বিধ্বস্ত মুখটা নিয়ে বসে আছে স্বামীর কেবিনের সামনে। আলো এসে মাকে একটু পানি খাইয়ে দেয়। আজান ভোর চারটার দিকে একবার বাড়িতে গিয়েছিলো। সে এইমাত্র এসে মায়ের পাশে বসে পরে। আয়াত বাইরে থেকে কিছু শুকনো খাবার কিনে এনে আলোর পাশে বসে।

সামিন ধীর পায়ে হেঁটে তাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। আলো সামিনকে দেখে উঠে চলে যায়। আজান আয়াতও বোনের পিছু পিছু চলে যায়। রেহেনা বসে আছে। সামিন রেহেনার পাশে বসে। কিছুক্ষণ দু'জনেই চুপচাপ। সামিন রেহেনার দিকে একপলক তাকিয়ে তার হাত দুটো মুঠি করে ধরে। রেহেনা সামিনের দিকে তাকায়। সামিন নরম গলায় বলতে থাকে,"আন্টি। এই পৃথিবীতে আমি সবথেকে বেশি অন্যায় আপনার সাথে করেছি। একজন স্ত্রী এবং একজন মা হয়ে আপনি দ্বিগুণ ভু'গে'ছে'ন। আমি নিজের দোষ স্বীকার করে নিলাম আন্টি,আমি লজ্জিত, অনুতপ্ত..আপনি আমাকে পারলে মাফ..."

সামিনকে আর কিছু বলতে না দিয়ে রেহেনা নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। নিজের মায়ের বয়সী এই মহিলার চোখে সামিন তার প্রতি তী'ব্র ঘৃ'ণা দেখতে পেয়ে আর কথা বলার সাহস পায় না। কয়েক মুহূর্ত বসে থেকে সেও উঠে চলে যায়।

***

আতাউর আলমকে অ'পা'রে'শ'ন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

ওয়েটিং রুমে সবাই অপেক্ষা করছে একটা ভালো খবর শোনার! একজন মেয়ে অপেক্ষা করছে তার বাবার জন্য, দুজন ছেলে অপেক্ষা করছে তার বাবার জন্য, একজন স্ত্রী অপেক্ষা করছে তার স্বামীর জন্য, একজন অ'প'রা'ধী অপেক্ষা করছে একটা স্বস্তির সংবাদের যাতে তাকে আর কোনো দোষের ভাগীদার না হতে হয় তাই।

ইলহামের নাম্বার থেকে অনবরত ফোন আসছে। সামিন প্রথমে ফোনটা রিসিভ করতে চায়নি। পরে রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে ইলহাম বলে,"ভাইয়া! আজকের অনুষ্ঠানের কি হবে কিছু বলছো না যে। এখানে সবকিছু আয়োজন করা হয়ে গিয়েছে!"

সামিন কিছু মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলে,"অনুষ্ঠান হবে। লোকজনকে খাইয়ে, সবটা বুঝিয়ে বলবি। এখানে সা'র্জা'রি চলছে।"

ইমতিয়াজ মির্জা ইলহামের হাত থেকে ফোন নিয়ে সামিনকে বলে,"কি ধরনের রসিকতা শুরু করেছো তুমি! এতো বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এখন বলছো আসতে পারবে না! বর বৌ ছাড়া রিসিপশন হবে?"

_হ্যা হবে। লোকজন যেন পেট ভরে খেয়ে চলে যায়। রিতুকে বলো সবটা দেখতে।

_সামিন তুমি কি শুরু করেছো একটু বলবে। ওখানে কি করছো তুমি!

_এখানে আমার একজন আত্মীয় মৃ'ত্যু'র সাথে পাঞ্জা ল'ড়'ছে। সম্পর্কে তিনি আমার শশুর। এখানে আমার থাকাটা জরুরি বাবা। লোকজনকে তুমি আর ইলহাম ম্যানেজ করো। কোনো সাংবাদিক এলে বলবে যা কথা জানার ইয়াসার মির্জার কাছ থেকে জানতে। রাখছি।

ফোনটা কেটে দিয়ে সামিন আলোর দিকে তাকায়। বেঞ্চির উপরে পা উঠিয়ে হাঁটুতে মাথা রেখে গুটিয়ে বসে আছে। একে একে আতাউর আলমের পরিবারের প্রত্যেকের মুখের দিকে তাকিয়ে সামিন সেখান থেকে চলে যায়। তারপর সোজা তিনতলায় নামে সে। এই হসপিটালেই জামিল এডমিট। তিনশো চার নাম্বার কেবিনের পর্দা সরাতেই দেখে জামিলের মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে হেনা। সামিনকে দেখে হেনা উঠে দাঁড়ায়। সামিন নিচুস্বরে বলে,"উঠতে হবে না। তুমি বসো!"

হেনা বসে পরে। সামিন জামিলের কাছে এগিয়ে যায়। জামিল তার ইয়াসার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। ক্ষীণ কন্ঠে বলে,"সা'র্জা'রি শেষ হয়েছে?"

_না চলছে।

জামিল ম্লান হাসে,"কি অদ্ভুত তাই না ভাই। একসময় এই আতাউর আলমকে দুই বেলা তুলোধুনো করতেন আর এখন!"

সামিন জামিলের বেডের একপাশে বসে। জামিল হেনার দিকে তাকিয়ে বলে,"তুমি একটু বাইরে যাবে হেনা? ভাইয়ের সাথে আমার কথা আছে।"

হেনা উঠে চলে যায়। সামিন জামিলের দিকে তাকিয়ে আছে। জামিল বলতে থাকে,"সেদিন ওদের সামনে আমি আপনাকে লজ্জা দিতে চাইনি ভাই, তাই বলিনি যে আপনি ঘোর অন্যায় করেছেন। আতাউর আলম যদি দোষী থাকতো তবুও তার শা'স্তি তার মেয়ে কেন পাবে? খুব আ'হ'ত হয়েছি ভাই আমি। আপনাকে আমি এই দুনিয়ার কারো সামনে ছোট করতে পারবো না, কিন্তু সত্যিই ভাই আপনি মহা অন্যায় করে ফেলেছেন।"

সামিন জামিলের দিকে তাকিয়ে থাকে তার কথা শুনে।

***

টানা চারঘন্টা অ'পা'রে'শ'নে'র ইতি টেনে ডক্টর রাসেল অপারেশন থিয়েটার থেকে বের হয়। সামিন তার কাছে যাওয়ার আগেই আলো ছুটে যায়। সামিন দাঁড়িয়ে পরে। আলো কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,"কি হয়েছে ডক্টর!"

মুখের উপর থেকে মাস্ক খুলে নিয়ে ডক্টর রাসেল একটা ম্লান হাসি হেসে বলে,"অপারেশন ঠিক ঠাক ভাবে হয়েছে ভাবী।"

আলো শান্ত হতে পারে না। একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলে,"বাঁচবে তো আব্বু!"

_ভাবী দেখুন আগেই বলেছি এটা রিস্কি। আপনার বাবাকে আইসিইউতে শিফট করা হবে। এখনো কিছু বলা যাচ্ছে না।

আলো দুই পা পিছিয়ে গিয়ে একটা বেঞ্চিতে ধপ করে বসে পরে। ইশমাম গিয়ে ডাক্তার রাসেলকে বলে,"ওনার কন্ডিশন কিরকম মানে ধরুন আনুমানিক কখন জ্ঞান ফিরবে বলে আশা করা যায়।"

_জ্ঞান তো এতো তাড়াতাড়ি ফিরবেই না তবে হ্যা ৭০ পার্সেন্ট চান্স আছে আগামী বাহাত্তর ঘন্টার মধ্যে রোগী রেসপন্স করবে বাকি টা তো সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা।

রেহেনা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। কাঁদছে আজান এবং আয়াত। সামিন কিছুক্ষণ তাদের দেখে ইশিতাকে বলে,"ওনাদের বাড়িতে নিয়ে চল ইশু। এখানে ওনার মেয়ে থাকবে সম্ভবত। ওনারা চলে যাক। হসপিটালে থেকে তো কোনো লাভ নেই সবার।"

তারপর আজান আয়াতের দিকে তাকিয়ে ধ'ম'কে'র সুরে বলে,"মেয়েদের মতো ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদছো কেনো? তোমার আপুকে দেখে কিছু শিখতে পারো না? সে সহজে কাঁদে?"

রেহেনা কান্না থামিয়ে ক'ঠি'ন গলায় বলে ওঠে,"আমি আমার স্বামীর কাছে থাকবো। তুমি কে ঠিক করার সবটা?"

সামিন রেহেনার দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলে ওঠে,"আপনার জামাই আমি। আপনার মেয়ের স্বামী। এখন যেটা বলছি সেটা চুপচাপ করুন নয়তো ধরে বেঁ'ধে বাড়িতে রেখে আসবো।"

সবাই চুপ করে শোনে সামিনের কথা। কিছুক্ষণ পরে সামিন বলে ওঠে,"হসপিটালে থেকে আপনি করবেন কি? আপনি নিজে হাই ব্লা'ড প্রে'শা'রে'র রো'গী। এখন যদি একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেলেন ভো'গা'ন্তি তো আপনার ছেলে মেয়েদের হবে। "

ইশিতা রেহেনার পাশে বসে নরম গলায় বলে,"আন্টি দোহাই আপনার। আজান আয়াতকে নিয়ে চলে যান। এখানে থাকার কোনো মানে নেই। আলো তো আছে। ও সবটা দেখবে!"

রেহেনা মাথা তুলে একপলক ইশিতাকে দেখে উঠে দাঁড়ায়। ধীর পায়ে হেঁটে আইসিইউর কাছে গিয়ে আতাউর আলমের নিথর শরীরটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে।

****

পাশে বসে আড়চোখে আলোর দিকে একপলক তাকায় সে। মাথা নিচু করে বসে আছে আলো। সামিনের হাতে টিস্যু পেপারে মোড়ানো একটা স্যান্ডউইচ । কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে অনেকটা সাহস নিয়ে সে স্যান্ডউইচ টা আলোর দিকে এগিয়ে দেয়। নরম গলায় বলে ওঠে,"রাত থেকে কিছু খাওনি। এখন দুপুর দেড়টা বেজে গিয়েছে। এটা অন্তত মুখে দাও।"

আলো একপলক স্যান্ডউইচটার দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিয়ে ঠান্ডা গলায় বলে,"এসব এখন বন্ধ করুন। আমি কথা দিচ্ছি আমি আপনার নামে কোনো মা'ম'লা করবো না, কোনো স্টেপ নেবো না আপনার বিরুদ্ধে। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। আপনি শুধু এখান থেকে চলে যান। আমার আপনাকে দেখলে য'ন্ত্র'না হচ্ছে খুব।"

_এসব কথার সাথে তোমার এটা খাওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই আলো। তুমি এটা খাও।

কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে আলো হাত বাড়িয়ে স্যান্ডউইচ টা নিয়ে নেয়। স্যান্ডউইচটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে একটা কা'ম'ড় বসায় তাতে। সামিন আলোকে দেখে কিছুটা স্বস্তি পায়। পানির বোতলটা এগিয়ে দেয় আলোর দিকে।

আলো নিস্তেজ কন্ঠে বলে ওঠে,"কি কপাল আমার , যে লোকটার জন্য আব্বু আজ মরতে বসেছে আমি তার হাতে খাবার খাচ্ছি।"

কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে সামিন বলে ওঠে,"শুধু খাবার না, তার কিনে দেওয়া শাড়ি তোমার গায়ে। তার কেনা গয়না পরে আছো, তার মায়ের হাতের বালা তোমার হাতে, তার নামের সাথে তোমার নাম জুড়ে গিয়েছে। অদ্রিতা আলো, অভিভাবক: স্বামী , স্বামীর নাম: সামিন ইয়াসার মির্জা।"

সামিনের এমন উত্তরে আলো ম্লান হাসে। সে হাসিতে সামিনের প্রতি ছিলো বিদ্রুপ।

সামিন হঠাৎ করে একটা হাত ধরে ফেলে আলোর। আলো হাত সরিয়ে নেয় না। সামিন আলতো করে সেই হাতটাকে নিজের দুহাতে আগলে নিয়ে নরম গলায় বলে,"একটা মাস নষ্ট করে দিয়েছি তোমার জীবনের। আমাকে আরো একটা মাস সময় দাও। সবটা না পারি,কিছুটা হলেও ঠিক করে দেবো আমি।"

আলো নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয় না। সামিনের চোখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে,"আপনি আমার জীবন থেকে গোটা জীবনটাই নিয়ে নিন ইয়াসার মির্জা। তবুও আপনার প্রতি আমার অনূভুতি বদলাবে না কিংবা এই সম্পর্ককে শ্রদ্ধা আমি করবো না। আপনাকে আমি সহস্র বছর সময় দিলাম। আপনাকে স্বামীর অধিকার খাটানোর অনুমতি দিলাম,আমি নিজেকে সমর্পণ করলাম। কিন্তু আপনি আমাকে পাবেন না, এই ভেতরের আমি টাকে পাবেন না আপনি। আমি আপনাকে ঘৃণা করি।"

কথাটা বলে আলো চোখ বন্ধ করে নেয়। দুই ফোঁটা তরল গড়িয়ে পরে তার দু'চোখ থেকে। সামিন আলোর হাত ছেড়ে দিয়ে আলোর দিকে তাকিয়ে থাকে।

***

অতিথিরা এসে সবাই হতভম্ব হয়ে গিয়েছে। ইতিহাসে এই প্রথম কোনো বিয়ের রিসিপশন হচ্ছে যেখানে বর বৌ নেই। সাংবাদিকরা এসে বিভিন্ন প্রশ্ন করছে। ইলহাম এবং ইমতিয়াজ মির্জা সবাইকে সবটা বুঝিয়ে বলে কোনোভাবে ম্যানেজ করে নিয়েছে বিষয় টা।

অনুষ্ঠানে জুঁই কে দেখে ইলহাম কিছু টা বিরক্ত হয়ে তার দিকে এগিয়ে যায়। এদিক ওদিক তাকিয়ে এগিয়ে গিয়ে ধ'ম'কে'র সুরে বলে,"তুমি এখানে এসেছো কেনো? পাগল হয়ে গিয়েছো নাকি তুমি!"

জুঁই চাপা স্বরে চেঁ'চি'য়ে বলে ওঠে,"ফোন ধরছিলে না কেনো আমার। জবাব দাও। বৌ কি আঁচলে বেঁ'ধে নিয়েছে নাকি!"

ইলহাম প্রচন্ড রে'গে গেলেও নিজেকে শান্ত করে বলে,"দেখো জুঁই , তুমি এভাবে হুট করে চলে আসলে সমস্যা টা তো আমার হবে তাই না? এটা কি তুমি চাও!"

_আমার ফোন লাগাতার কে'টে দেওয়ার আগে এটা মাথায় রাখা উচিত ছিলো।

_আচ্ছা ঠিকাছে। আর কাটবো না। এবার তুমি যাও। ঘর ভর্তি অতিথি। বাড়িতে বাবা আছে, সমস্যা হবে আমার। প্লিজ যাও।

জুঁই বলে,"ঠিকাছে। আগে কিছু টাকা দাও। আমি শপিং এ যাবো।"

ইলহাম জুঁই এর দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে তার পকেট থেকে ওয়ালেট বের করে জুঁই এর হাতে একটা কার্ড দেয়।

জুঁই আহ্লাদী গলায় বলে,"বলো। কাল দেখা করবে সকালে। বলো!"

_কাল হবে না জুঁই,ইহানের মাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাবো।

জুঁই কপাল কুঁচকে বলে,"কি হয়েছে ওর? পে'ট বা'ধি'য়ে'ছে নাকি আবার! দেখো ইলহাম, যদি এমন কিছু হয় তাহলে ওর এ'ব'র'শ'ন করাবে তুমি। মাইন্ড ইট!"

ইলহাম রেগে গিয়ে বলে,"স্টপ জুঁই। এখন যাও। প্লিজ।"

জুঁই চলে যায়। ইলহাম কিছুক্ষণ ওখানে কিছুক্ষণ থেকে ঘুরে দাড়াতেই দেখে রিতু তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখ দুটো ভেজা। ইলহাম কিছু বলার আগেই রিতু চলে যায় সেখান থেকে।

***

বিকেল তিনটার দিকে রেহেনা আজান আয়াতকে নিয়ে আবারো এসেছিলো হসপিটালে। সন্ধ্যার দিকে তাদেরকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে আলো। বলেছে সে একাই থাকতে পারবে।

সামিন এসে পেছন থেকে আলোকে ডেকে ওঠে,"আলো।"

আলো ঘুরে তাকায়। সামিন নরম গলায় বলে,"অনেক রাত হয়েছে। কাল রাত থেকে ঘুমাওনি। বাড়ি চলো, একটু ঘুমিয়ে নেবে। এখানে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। নার্স ঠিক করে রেখেছি আমি। কোনো অসুবিধা হবে না।"

_আমার আব্বুর কাছ থেকে আমাকে কোথাও নিয়ে যেতে পারবেন না।

নিচু স্বরে কিন্তু তেজী কন্ঠে বলে ওঠে আলো।

সামিন আলোর দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর বলে,"ঠিকাছে। থাকো। আমি আশেপাশে আছি। প্রয়োজন হলে ডেকে নিও।"

ইশমাম এসে সামিনের পিছনে দাঁড়িয়ে বলে,"তুমিও তো ঘুমাওনি ভাইয়া। তুমি বাড়িতে যাও। আমি আছি। "

_না, তুই যা। তোদের কষ্ট করার কোনো মানে হয়না ছোট। যা।

জোরাজুরি করে ভাইয়ার সাথে পারা যাবে না। ইশমাম হাল ছেড়ে দিয়ে আলোর দিকে একপলক তাকায়। তারপর চলে যায় সে।

ঘুরেফিরে ওয়েটিং রুমে এসে দেখে আলো বসে আছে চুপচাপ। ঘুমে তার চোখ বুজে আসছে। ওয়েটিং রুমে তারা দুজন এখন ‌। পুরো হসপিটাল নি'স্ত'ব্ধ। সামিন এগিয়ে গিয়ে আলোর পাশে বসে। আলো বসে বসে ঢুলছে। সামিনের উপস্থিতি সে টেরই পায়নি। কয়েক পলক আলোকে দেখে সামিন বলে ওঠে,"ভেতরে কেবিন রয়েছে। অন্তত সেখানে গিয়ে ঘুমাও। "

আলো লাফিয়ে ওঠে। সামিন বলে,"সরি! ভ'য় পেয়ে যাবে বুঝিনি। বলেছি ভেতরে কেবিন আছে সেখানে গিয়ে ঘুমাও। এভাবে বসে বসে তো ঘুমানো যায়না।"

আলো কপাল কুঁ'চ'কে বলে,"চোখটা একটু লেগে গিয়েছিল। ঘুমাইনি। এখানেই ঠিক আছি আমি।"

সামিন কিছুক্ষণ শীতল চোখে আলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে শার্টের হাতা ফোল্ড করতে থাকে। আলো তার দিকে তাকিয়ে আছে। সামিন আলোর চোখের দিকে এক পলক তাকিয়ে আলোকে পাঁজাকোলা করে তুলে নেয়। নিজেকে ছাড়ানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করে আলো ব্যর্থ হয়। সোজা হেটে একটা কেবিনে ঢুকে একটা বেডের ওপর আলোকে বসিয়ে দেয় সামিন‌ । আলো তার দিকে রা'গী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সামিন আলোর চোখের দিকে তাকিয়ে খুবই ঠাণ্ডা ভাবে বলে,"এখন এখানে চুপচাপ শুয়ে না পরলে এক চ'ড় মে'রে সামনের পাটির দাঁত সবগুলো ফেলে দেবো আছিয়া।"

চলমান........

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন