ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগলো চোখে

২২তম পর্ব

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে

#পর্বসংখ্যা_২২

#Esrat_Ety

"তোকে দেবদাস মুভিতে কাস্ট করা যেতে পারে। লুকটা একেবারে পারফেক্ট।"

ফুয়াদ সামিনের দিকে তাকিয়ে কথাটি বলে সামনের দিকে তাকায়। সামিন একমনে ড্রাইভ করছে। ফুয়াদ বলে,"সেদিন রাতে তোর সাথে খুব খা'রা'প ব্যাবহার করেছি। আসলে রাইসার সাথে ঝ'গ'ড়া হয়েছিলো। তুই কি এখনো রে'গে?"

_নাহ।

একশব্দে জবাব দেয় সামিন।

_দুই রাত না ঘুমিয়েই ছিলি?

_না। গতকাল শেষ রাতের দিকে একটু ঘুমিয়েছিলাম। তাও বসে বসে। এখন পুরো শরীর ভেঙে ঘুম আসছে। বাড়িতে গিয়ে একটু ঘুমাবো।

_আলো কি করছে? কাঁ'দ'ছে খুব?

_না প্রথমে খুব কেঁ'দে'ছি'লো। এখন স্বাভাবিক। শুধু আমাকে দেখে ক্ষে'পে যায়।

_তো যাচ্ছিস কেনো সামনে, হেল্প করলে আড়ালে থেকেও তো করা যায়।

_আমার বৌ, আমি সামনে যাবো না?

ফুয়াদ সামিনের দিকে তাকায়। পরপর বলে ওঠে,"আমার দাদী তোর কপালের তিলটা দেখে সবসময় বলতো তুই নাকি বৌ পা'গ'লা হবি। দাদীর কথা মিলে যাচ্ছে।"

সামিন ম্লান হাসে। ফুয়াদের অফিসের সামনে ফুয়াদকে নামিয়ে দিয়ে সোজা শান্তিনীড়ে ছুটে যায় তার গাড়ি। ধীরপায়ে বাড়িতে ঢুকে দেখে কেটারিং সার্ভিসের লোকেরা সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে। ইমতিয়াজ মির্জা লিভিং রুমে ইহানকে কোলে নিয়ে বসে ছিলো,সামিনকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে যায়। গম্ভীর কন্ঠে বলে,"দাঁড়াও।"

সামিন দাঁড়ায় না। একটা হাই তুলে বলে,"ঘুমাবো বাবা। দাঁড়ানোর সময় নেই।"

সিঁড়ি বেয়ে ইশমাম নামে। সামিনকে দেখে বলে,"তুমি এসে গিয়েছো। আমি হসপিটালেই যাচ্ছিলাম ভাইয়া।"

_হ্যা এসেছি। বিকেলের দিকে গিয়ে তোর ভাবীকে নিয়ে আসবো। এখন আমার একটু ঘুম প্রয়োজন। তুই যেতে চাইলে যা,তবে ওরা তোর সাথে যে খুব একটা ভালো ব্যাবহার করবে তার গ্যারান্টি দিতে পারছি না।

ইমতিয়াজ মির্জা বলে ওঠে,"এতো গুলো টাকা দিয়ে তুমি আতাউর আলমের অ'পা'রে'শ'ন করিয়েছো! তুমি!"

_হু। কেনো বাবা,এর থেকে বেশী টাকা আমি প্রত্যেক মাসে এতিম খানা গুলোতে দেই। তোমার কি কোনো অসুবিধা হয়েছে? লোকটা আতাউর আলম বলে?

_না,সেসব পুরনো কথা। তার জে'র ধরে আমি কিছু বলছি না।

_আমি ভুলের মাশুল গুনেছি বাবা।

ঠান্ডা গলায় বলে সামিন।

ইমতিয়াজ মির্জা বিদ্রুপ করে বলে ওঠে,"তোমার মেজো ভাই ভুল করে এক মেয়ের ওরনা ধরে টা'ন দিলো,সেখানে মাশুল গুনলে। এখন তুমি ভুল করে এক মেয়েকে তুলে এনে বিয়ে করে তার মাশুল গুনছো। আর তোমার এই ছোটো ভাই ভুল করে কি করবে? জানতে পারি?"

কথাটি বলে ইমতিয়াজ মির্জা ইশমামের দিকে তাকায়। ইশমাম কিছু না বলে বেড়িয়ে যায় বাড়ি থেকে। সামিন বাবার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে যায়।

***

ঘরে ঢুকে অনেকটা সময় নিয়ে শাওয়ার নিয়ে ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে আসে। ফোনের রিংটোন বেজে যাচ্ছে। তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে।

_কি রে সামিন ইয়াসার। শেষমেশ আতাউর আলমের মেয়েকে!

সাগরের কন্ঠ পেয়ে সামিন ফোন কেটে দিতে যাবে তখনি সাগর বলে ওঠে,"খবরদার ফোন কাটবি না সামিন। আগে বল তুই আমাকে লিজ টা পেতে দিস নি কেনো শা'লা!"

_জামিলের গায়ে হা'ত তুলেছে তোর বাপের লোক। আমার দুর্বল যায়গায় আ'ঘা'ত করতে আসলে আমিও তার ঠিক আসল যায়গায় আ'ঘা'ত করি। তোকে আর তোর বাপকে সিটি কলেজের ছেলেপুলে দিয়ে পি'টি'য়ে মা'রা'র থেকে ভাবলাম প্রানে না মে'রে ধনে মা'রি। কেমন লাগছে এখন?

কথাটি বলে সামিন কু'ৎ'সি'ত একটা গা'লি দেয় সাগরকে। সাগর গা'লি'টা গায়ে না মেখে ঠান্ডা গলায় বলে,"তোর খুব খারাপ অবস্থা করে ছাড়বো সামিন। আমাকে তুই খুব ভালো করে চিনিস। এতো বড় ক্ষ'তি আমি হজম করবো না কিন্তু।"

সামিন একটা বাকা হাসি দিয়ে ফোন কেটে দেয়।

তোয়ালে দিয়ে মাথাটা ভালো করে মুছে তোয়ালেটা দূরে ছু'ড়ে মেরে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। ঘুমে দু'চোখ তলিয়ে আসছে। ফ্লাইওভারের সাইট থেকে ফোন আসছে। সেখানে গিয়ে একটাবার দেখে আসা দরকার। বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে চোখ বুজে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর ফোনটা আবারো হাতে নিয়ে তৌফকে ফোন দেয়। তৌফ ফোনটা রিসিভ করতেই সামিন বলে ওঠে,"তোর ভাবী কি করছে?"

_ভাবী তার মাকে খাইয়ে দিচ্ছে ভাই।

_আর সে খেয়েছে?

_তা জানি না। গিয়ে জিজ্ঞেস করে আসবো?

_জিজ্ঞেস করতে গেলে চ'ড় খাবি। যাস না। ইশমাম যাচ্ছে হসপিটালে। কোনো সমস্যা হলে আমাকে ফোন করবি। আমি এখন ঘুমাবো। বিকেলে আসছি।

_জ্বি আচ্ছা ভাই।

সামিন ফোন কেটে দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে। কিছু সময় যেতেই ঘুমিয়ে যায় সে।

***

"অদ্রিতা!"

ইশমামের কন্ঠ পেয়ে মাথা তুলে তাকায় আলো। ইশমাম আলোর পাশে কিছুটা দূরত্ব নিয়ে বসে। আলো স্বাভাবিক গলায় বলে,"এলে কেনো! ভাই স্পাই হিসেবে পাঠিয়েছে বুঝি! আমি পু'লি'শ ডাকলাম কিনা! মুখ খুললাম কি না। এসব দেখতে পাঠিয়েছে তোমাকে?"

_নাহ, তোমার খেয়াল রাখতে পাঠিয়েছে।

আলো চুপ করে থাকে। ইশমাম বলে,"ভাইয়া প্রচণ্ড অনুতপ্ত।"

_তো? সে অনুতপ্ত,তাই তার বুকে ঝা'প দেবো? ভুলে যাবো সেই বি'ভী'ষি'কা'ময় রাত টা?

ইশমাম চুপ করে আলোকে দেখছে। সেই রাতটা তো তার জীবনেরও সবথেকে বি'ভী'ষি'কা'ময় রাত।

খুবই ক্লান্ত দেখাচ্ছে আলোকে। নরম গলায় ইশমাম বলে,"বিকেলে বাড়িতে চলে যেও প্লিজ। এখানে নার্স রা সবটা দেখবে। তোমার এমন ভোগান্তি আমাদের কারো কাম্য নয়।"

_ভোগান্তি তোমাদের কাছে। ঐ মানুষটা আমার আব্বু, আমার কোনো কষ্ট হচ্ছে না। ভাইয়ের হনুমানগিরি করা শেষ হলে তুমি এখান থেকে যাও। প্লিজ যাও।

***

"তুমি যাবে না?"

_না।

সামিনের মুখের উপর বলে দেয় আলো। সামিন রা'গ'টা নিয়ন্ত্রণ করে বলে,"দু দুজন নার্স ঠিক করা। যেখানে থাকার প্রয়োজন নেই সেখানে নিজেকে কষ্ট দিচ্ছো কেনো? হসপিটাল কি একটা থাকার যায়গা? এখানে কেউ শখ করে থাকে?"

আলো অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সামিন একটা নিঃশ্বাস নিয়ে নরম গলায় বলে,"দেখো! তোমার বাবা ঠিক আছে। রেসপন্স করছে উনি। সম্ভবত খুব শিগগিরই জ্ঞান ফিরবে তার। তুমি বাড়িতে চলো, প্রতিদিন এসে এসে সকাল-সন্ধ্যা দেখবে। এভাবে একটানা হসপিটালে পরে থাকলে তুমি নিজেও অ'সু'স্থ হয়ে পরবে আলো। কোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ থাকতে পারে এতদিন এভাবে? ঘুম নেই, গোসল নেই, খাবার খাচ্ছো না ঠিক ভাবে! "

আলোকে চুপ থাকতে দেখে সামিন আলোর হাত ধরে। খুবই নিচু স্বরে বলে,"মাত্র একমাস নিয়েছি তোমার থেকে। আজ সেই একমাসের প্রথম দিন। চলো বাড়িতে।"

আলোকে কিছু বলতে না দিয়ে সামিন আলোর হাত ধরে বের করে নিয়ে আসে হসপিটাল থেকে। আলো নিশ্চুপ হয়ে থাকে। রাত তখন সাড়ে দশটা। আলোকে গাড়িতে বসিয়ে নিজে ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট করে। একপলক আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,"সিট বেল্ট টা বাধো প্লিজ।"

আলো রোবটের মতো সামিনের বলার সাথে সাথে সিটবেল্ট বেঁধে নেয়। পুরো রাস্তা দু'জনে চুপচাপ। শান্তিনীড়ের গেইট থেকে গাড়ি ঢোকে। গাড়ি থামিয়ে সামিন নেমে দরজা খুলে আলোকে নামতে বলে। আলো নেমে পরে।

লিভিং রুমে ইশিতা এবং পরী বসেছিলো। আজ বিকেলে পরী এসেছে। আলো আর সামিনকে দেখে দু'জনে উঠে দাঁড়ায়। ইশিতা নরম গলায় বলে,"তুমি ঠিক আছো ভাবী?"

আলো মাথা নাড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকে। সামিন আলোর পিছু পিছু যায়।

ঘরে ঢুকে আলো এক মিনিট চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে আলমারির কাছটায় যায়। তারপর একটা আকাশী রঙের সুতির শাড়ি বের করে ওয়াশ-রুমে ঢোকে।

সামিন দরজা বন্ধ করে গায়ের শার্টটা পাল্টে নিয়ে একটা বালিশ এনে ডিভানে রেখে বসে পরে। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়। আলো ওয়াশ রুম থেকে বের হয় না। সামিন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে আলো প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে গোসল করছে।

কিছু সময় যেতেই খট করে ওয়াশ রুমের দরজা খোলার আওয়াজ হয়। ধীর পায়ে আলো বের হয়ে আসে। মাথায় তোয়ালে জড়িয়ে রেখেছে। শাড়ির আঁচল টেনে ডান কাঁধে তুলে রেখেছে। মাথা ঘুরিয়ে আলোর মুখের দিকে তাকাতেই সামিন অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আলোর দিকে। আকাশী কোনো আহামরি সুন্দর রঙ নয়। অথচ এই শ্যামলা বর্ণের মেয়েটিকে কী ভীষণ মানিয়েছে! সামিন খেয়াল করেছে, সামিনের যত অপছন্দের সব রং। এই মেয়েটির গায়ে জরালেই সামিনের চোখে সুন্দর হয়ে ওঠে রং টা।

হঠাৎ করে আলো একটা হা'চি দিতেই সামিনের ঘোর কেটে যায়। আলো বিছানায় বসে মাথা থেকে তোয়ালে টেনে সরিয়ে দেয়। ভেজা চুলগুলো পিঠে ছড়িয়ে পরে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সামিন চোখ সরিয়ে নেয়। আলো নিজের গায়ে একটা চাদর টেনে নিয়ে ওদিকে ফিরে শুয়ে পরে। সামিন মাথা ঘুরিয়ে আবারো আলোর দিকে তাকায়। একবার ভাবলো আলোকে বলবে মাথাটা ভালো করে মুছে নিতে। কিন্তু সে সাহস পেলো না। তর্কাতর্কি শুরু হয়ে যাবে তাহলে, আলো শেষ পর্যায়ে বলবে,"আমি আপনাকে ঘৃ'ণা করি ইয়াসার মির্জা!"

এতো রাতে সেই বাক্যটা শুনতে ইচ্ছে করছে না সামিনের।

***

প্রচন্ড শব্দে "আহ" বলে আ'র্ত'না'দ করে ইশমাম পেটে হাত চেপে ধরে। তিনটা বই হাতে পরী পেছনের দিকে তাকাতে তাকাতে ছুটে আসছিল। যে গতি নিয়ে পরী ছুটছিল,তাতে ধাক্কা লেগে হাতের বই গুলো ইশমামের পেটে লাগে। পেটে হাত চেপে ইশমাম তিন পা পিছিয়ে যায়। মনে হচ্ছে রাতের খাবার সবটা এখনি বেরিয়ে যাবে। নিজেকে ধাতস্থ করে ইশমাম চেঁচিয়ে বলে ওঠে,"চোখ কোথায় নিয়ে ছোটো? আর এভাবে ছুটছিলে কেনো? অদ্ভুত!"

যে ভ'য়ে পরী ছুটছিলো,ইশমামের ধ'ম'ক খেয়ে সেই ভ'য়ে'র কথা পরী ভুলে গিয়েছে। এখন তার ভ'য় একটাই, আগামী পাঁচ মিনিট এই লোকটার থেকে কঠিন কঠিন কিছু কথা শুনতে হবে।

ইশমাম তার দিকে চোখ রা'ঙি'য়ে তাকিয়ে আছে। পরী একটা ঢোক গিলে ফেলে। ইশমাম গম্ভীর কন্ঠে বলে,"ষাঁড় তা'ড়া করেছিলো নাকি তোমায়? অদ্ভুত মেয়ে!"

_আসলে ভ'য় পেয়েছিলাম। তাই ছুটছিলাম।

আমতা আমতা করে জবাব দেয় পরী।

_ভ'য় পেয়েছিলে মানে? কিসের ভ'য়?

_ভুতের।

পরীর মুখে ভুতের কথা শুনে ইশমাম প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে যায়। চাপা স্বরে চেঁচিয়ে বলে,"ডিসগাস্টিং! তুমি একটা মেডিক্যাল স্টুডেন্ট হয়ে এসব কথা বলছো!"

পরী নিচু স্বরে বলে,"লাইব্রেরীর পাশের ঘর থেকে কেমন শব্দ আসছিলো।"

_শব্দ আসতেই পারে। তাই বলে ভুত ভেবে নিলে?

পরী একটা ঢোক গিলে বলে,"ঐ ঘরে কে থাকতো জানেন?"

_কে?

ইশমাম ধমকের সুরে বলে।

_আপনার দুই নাম্বার চাচী!

_দুই নাম্বার চাচী মানে?

_ইসতিয়াক মির্জার দ্বিতীয় স্ত্রী মারুফা। যাকে আপনার চাচা তুলে এনে বিয়ে করেছিলো। অনেক অ'ত্যা'চা'র করতো তাকে। এক পর্যায়ে সে বি'ষ খেয়ে ম'রে গিয়েছিলো। এসব আপনার আমার জন্মেরও আগের কাহিনী।

_তো এতদিনে তো মারুফা চাচীর ভুতও ম'রে ভুত হয়ে গিয়েছে। সেসব কথা এখন বলছো কেনো? কোন ধরনের ফাজলামি এগুলো!

ইশমাম পরীর দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। পরী বলতে থাকে,"সত্যি বলছি। কেমন শব্দ আসছিলো।"

ইশমাম দাঁতে দাঁত চেপে বলে,"চলো আমার সাথে। যদি ভুত না বের করতে পেরেছো তাহলে ঐ ঘরে বন্ধ করে দিয়ে আসবো তোমাকে।"

_না যাবো না‌।

_চলো।

পরী মুখটা একটুখানি করে ইশমামের পিছু পিছু যায়।

ঘরের দরজা খোলা ছিলো। ইশমাম পরীর দিকে তাকিয়ে বলে,"তুমি এখানে দাঁড়াও। আমি ভুত নিয়ে বাইরে আসছি। নড়বে না এখান থেকে।"

ভেতরে ঢুকে লাইটের সুইচ টিপে দিতেই বিছানার ওপরে ইশিতার বিড়াল টাকে লেজ নাড়াতে দেখা যায়। ইশমাম এগিয়ে গিয়ে বিড়ালটাকে কোলে তুলে বেড়িয়ে আসে। পরীর সামনে দাঁড়িয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে,"এই যে তোমার ভুত। স্টু'পি'ড মেয়ে।"

তখনি ইশিতা এসে দাড়িয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে বলে,"কি হয়েছে ইশমাম!"

ইশমাম ইশিতার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে,"যেমন স্টু'পি'ড তোর এই বিড়াল টা,তেমন স্টু'পি'ড তোর এই সখী। দুটোকে আমার সামনে থেকে নিয়ে বিদেয় হ।"

***

রিতুর শরীরটা সকাল থেকেই খুব খারাপ। বেশ কয়েকবার ব'মি হয়েছে। এখন বিছানায় ওদিক ফিরে শুয়ে আছে। ইলহাম কিছুক্ষণ রিতুর দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,"ডাক্তারের কাছে চলো। নাকি ডাক্তার বাড়িতে ডাকবো?"

রিতু ঘুরে ইলহামের দিকে তাকিয়ে বলে,"প্রয়োজন নেই। আমি ঠিক আছি। আপনি অফিসে যান।"

ইলহাম বিছানায় একপাশে বসে পরে, কিছুক্ষণ পরে বলে ওঠে," এই মাসে পি'রি'য়'ড হয়েছিলো তোমার?"

রিতু কিছুক্ষণ নিজের স্বামীর দিকে তাকিয়ে থেকে মাথা নাড়ায়। ইলহাম বলে,"চলো টে'স্ট করাবে। রেডি হও!"

_কেন? এ'ব'র'শ'ন করানোর খুবই তা'ড়া বুঝি?

কাঁপা কাঁপা গলায় বলে ওঠে রিতু। ইলহাম কিছুক্ষণ রিতুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ করে খুব খারাপ লাগছে রিতুর কথাটা শুনে। আগে হলে অনেক ব'কা'ঝ'কা করে দিতো মুখের ওপর কথা বলার অ'প'রা'ধে। আজ পারছে না।

রিতু অ'সু'স্থ শরীর নিয়ে উঠে বসে। নিচু স্বরে বলে,"ইহান কে জন্ম দিয়ে আপনার ভালোবাসা পাইনি, দ্বিতীয় বাচ্চা পৃথিবীতে এলেই আপনি হঠাৎ আমায় ভালোবাসবেন এমনটা আমি ভাবি না। আমি নিয়মিত ও'ষু'ধ খাই। কোনো বাচ্চা আসেনি পেটে। প্রতি মাসেই পি'রি'য়'ড হতে একটু দেরী হয় আমার।"

ইলহাম উঠে দাঁড়ায়। পেছন থেকে রিতু বলে ওঠে,"ঐ মেয়েটার মধ্যে কি এমন ছিলো যেটা আপনার স্ত্রীর মধ্যে আপনি পান নি। আমাকে এক বছর পরে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার আগে এই প্রশ্নের উত্তরটা কি একটু দেবেন?"

ইলহাম কয়েক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে সেখান থেকে চলে যায়।

***

"তুমি রেডি হয়ে নিচে এসো। আমি অপেক্ষা করছি। তোমাকে হসপিটালে পৌঁছে দেবো।"

সামিনের কথা শুনে আলো কপাল কুঁচকে ফেলে। গম্ভীর কন্ঠে বলে,"প্রয়োজন নেই। আমি রিকশা নিয়ে চলে যাবো ‌।"

_রিকশা ভাড়া আছে তোমার কাছে? আমার ধারণা নেই, রিকশাওয়ালা তোমার চেহারা দেখে তোমাকে রিকশায় ওঠাবে না। অতটাও সুন্দরী নও তুমি।

সামিন কথাটি বলে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে ঠোঁট টিপে হাসে। আলো সামিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখ মুখ ফ্যা'কা'শে।

সামিন আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,"নিচে অপেক্ষা করছি। তাড়াতাড়ি এসো। যদি হসপিটালে যেতে চাও তো।"

সামিন চলে যায়। আলো মলিন মুখে খোলা চুল গুলো খোঁপা বেঁধে নিয়ে ডান কাঁধে শাড়ির আঁচল উঠিয়ে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়।

করিডোরে সিঁড়ির কাছে ইহান বল নিয়ে খেলছে। এমাথা থেকে ওমাথা ছোটাছুটি করছে। আলো বের হতেই ইহানের বলটা এসে তার গায়ে লাগে। আলো গম্ভীর কন্ঠে বলে,"এখানে এভাবে বাঁ'দ'রা'মি করছো কেনো ছেলে? সিঁড়ি থেকে পরতে চাও?"

ইহান আলোকে দেখে চোখ মুখ কুঁ'চ'কে সিঁড়ি বেয়ে নামতে থাকে। আলো তার পিছু পিছু নামছে। ইহান আলোকে দেখিয়ে দেখিয়ে ইচ্ছে করে লাফিয়ে লাফিয়ে নামছে। পেছন থেকে আলো গম্ভীর কন্ঠে বলে,"ঠিক ভাবে হাটো। পরে যাবে।"

ইহান বেশি করে লাফাতে থাকে। হুট করে পা পি'ছ'লে দুই ধাপ নিচে পরে যেতেই আলো দ্রুত পায়ে সিঁড়ি ভেঙে নেমে ইহানকে ধরতে গেলে সেও পা পিছলে পরে যায়।

বি'ক'ট একটা শব্দ হয়।

ঘটনার আকস্মিকতায় সামিন উঠে দাঁড়িয়ে যায়। ইহান নিজের যায়গায় দাঁড়িয়ে চোখ বড় বড় করে আলোকে দেখছে। আলো হাত দিয়ে নিজের পা চেপে ধরে চাঁপা স্বরে কো'কি'য়ে যাচ্ছে। য'ন্ত্র'না'য় তার পুরো মুখমণ্ডল নীল রঙ ধারণ করেছে।

লিভিং রুমের থাকা সবাই ছুটে আসে। সামিন এসে নিচু হয়ে ঝুঁকে বসে, উ'ৎ'ক'ণ্ঠা নিয়ে বলে,"কোথায় লেগেছে?"

আলো কোনো উত্তর দিতে পারে না, উত্তর দেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে সে নেই। য'ন্ত্র'না'র তীব্রতা বাড়ছে। ইশমাম দাঁড়িয়ে আছে, সামিনের দিকে তাকিয়ে বলে,"সম্ভবত পায়ে ভাইয়া।"

সামিন আলোর পায়ে হাত দিলে সে উচ্চশব্দে আ'র্ত'না'দ করে ওঠে। পেছন থেকে ফুলির মা বলে,"ভে'ঙে গেছে নাকি ভাইজান!"

সামিন ইশমামের দিকে গাড়ির চাবি এগিয়ে দিয়ে বলে,"গাড়ি স্টার্ট কর। শিগগিরই।"

তারপর আলোর দিকে তাকিয়ে বলে, উঠতে পারবে? নাকি আমি উঠাবো?

আলো দু'চোখ বন্ধ করে নিশ্চুপ হয়ে কেঁ'দে যাচ্ছে। তার কাছে মনে হচ্ছে পায়ের কোনো হা'ড় ভেঙে গিয়েছে।

সামিন আলোর দিকে একপলক তাকিয়ে তাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নেয়। ইশমাম গিয়ে গাড়ি স্টার্ট করে। পোনা চাচা পেছনের সিটের দরজা খুলে দেয়,সামিন আলোকে বসিয়ে নিজেও বসে পরে।

পোর্চের নিচে দাঁড়িয়ে ফুলির মা দাঁত বের করে সিতারাকে বলে,"মানুষ একটা আমাদের বড় ভাইজান। কথায় কথায় ভাবীরে কোলে উঠায়‌। এতো মোহাব্বত আজকালকার পুরুষের মধ্যে থাকে? এই বে'টি যদি একটু বুঝতো। ভাইজানরে পাত্তাই দিতে চায় না। যদি এই বংশের পূর্বপুরুষদের হাতে পরতো তাহলে বুঝতো কত ধানে কত চাল। স্বামীর হাতে মার খেতে খেতে জীবন শেষ হয়ে যেতো!"

***

"অদ্রিতা।"

ইশমাম দরজার কাছে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে ভেতরে ঢোকে। আলোর বেডের পাশে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে একটা চেয়ার টেনে বসে। আলোর ডান পায়ের গোড়ালিতে প্লাস্টার করে দিয়েছে ডাক্তার। খুব বেশি মা'রা'ত্ম'ক না হলেও বেশ কিছুদিন ভোগাবে আলোকে।

ইশমাম নিচু স্বরে বলে,"হাটো কিভাবে তুমি! সিঁড়ি থেকে যখন পরছিলে মনে হচ্ছিলো একটা পিংপং বল গড়িয়ে পরছে।"

আলো কোনো উত্তর না দিয়ে ইশমামের দিকে তাকিয়ে থাকে। ইশমাম ম্লান হেসে বলে,"ভাইয়া তোমার খুব কেয়ার করে। অবশ্য ভাইয়া এমনই। যাদের সে আপন মনে করে তাদের সবার খুব কেয়ার করে। আমি আর ইশু যখন জন্মাই,তখন থেকেই মায়ের শরীর টা হঠাৎ খুব খারাপ হতে শুরু করে। বছরের আটমাস অসুস্থ থাকতো। ভাইয়াই আমাকে আর ইশুকে দেখভাল করতো বলতে গেলে। সেজন্য মায়ের পরে ভাইয়ার সাথে আমার সখ্যতা বেশি।"

_এসব কথা আমাকে বলছো কেনো?

ঠান্ডা গলায় বলে আলো।

ইশমাম আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,"দেখো, ভাইয়া তোমাকে খুব ভালো রাখবে। বোঝাই যাচ্ছে।"

_আমাকে শান্তনা দিচ্ছো?

_নাহ। নিজেকে দিচ্ছি।

আলো ইশমামের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ইশমাম কিছু সময় চুপ থেকে বলে ওঠে,"আমার একটা প্রিয় মানুষ আমার আরেকটা প্রিয় মানুষের কাছে ভালো থাকবে,যত্নে থাকবে,নিরাপদে থাকবে, এটা আমার কাছে অনেক বড় একটা শান্তনা অদ্রিতা।"

আলো ইশমামের কথায় কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে,"বিয়ে করে নাও ইশমাম। একটা ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে করে নাও।"

ইশমাম হেসে ফেলে। আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,"ভাবীগিরি দেখাচ্ছো?"

_তুমিও তো ভাইয়ের হনুমানগিরি করো, ভাইয়ের দালালি করো।

ইশমাম চুপ হয়ে যায়। আলো বলে,"তোমার প্রিয়, আদর্শবান ভাইয়া আমাকে একটা রাতেই গোটা এক জন্মের বি'ভী'ষি'কা দেখিয়ে দিয়েছিলো। এখন আবার আমার সাথে নতুন গেইম খেলার চেষ্টা করছে। গত একটা মাস আমাকে ভয় দেখিয়ে ব'ন্দি'নী করে রেখেছিলো,এখন আবার আমাকে মুগ্ধ করতে আমার কাছ থেকে আরো একটা মাস সময় চাচ্ছে। আমার অনূভুতি নাকি পাল্টে দেবে!..."

আলোর কথা বলার মাঝে সামিন এসে ভেতরে ঢোকে। ইশমাম উঠে দাঁড়ায়। সামিন বলে,"উঠলি কেনো। বস।‌"

ইশমাম নিচু স্বরে বলে,"ভাবীর বাবার এখন কি অবস্থা?"

_সব ঠিক ঠাক। কোনো কম্লিকেসি নেই। এখন শুধু জ্ঞা'ন ফেরার অপেক্ষায়।

ইশমাম ভাইয়ের দিকে একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বলে,"বসো ভাইয়া,আমি আসছি।"

কথাটি বলে ইশমাম চলে যায়। সামিন মাথা ঘুরিয়ে আলোর দিকে তাকায়। তারপর চেয়ারে বসতে বসতে বলে,"হসপিটাল টা পুরো আমার পারিবারিক হসপিটাল হয়ে গিয়েছে। আমার ছোটো ভাই, আমার শশুর,আমার বৌ, সবাই রোগী।"

আলো মাথা ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। সামিন বলে,"কি করছিলে তখন? সিঁড়িতে দৌড় ঝাঁ'প দিচ্ছিলে কেন? ইহানকে তা'ড়া করছিলে মা'রা'র জন্য?"

আলো মাথা ঘুরিয়ে তাকায়,অবাক হওয়া কন্ঠে বলে,"আমি একটা ছোট বাচ্চাকে মা'রা'র জন্য তা'ড়া করবো?"

_তুমি যে ধরনের মেয়ে। করতেই পারো। তোমাকে বিশ্বাস কি?

ঠাণ্ডা গলায় বলে সামিন। আলো কপাল কুঁচকে সামিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। সামিন আলোর চোখে চোখ রেখে বলে,"তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যেতে চাইলে আর সৃষ্টিকর্তা তোমার ঠ্যাং ভে'ঙে দিলো। এই ফে'রা'উ'ন'টার প্রতি সৃষ্টিকর্তার কত মায়া দেখেছো আছিয়া?"

চলমান.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন