#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে
#পর্বসংখ্যা_২৩
#Esrat_Ety
ক্রাচে ভর দিয়ে ধীরপায়ে হেটে কেবিন থেকে বের হয় আলো। একজন নার্স এসে বলে,"ঘুম ভেঙেছে আপনার? আপনাকে ব্যাথা নাশক ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিলো, তার প্রভাবেই ঘুম হচ্ছে এতো।"
আলো ম্লান হেসে বলে,"কেউ এসেছিলো? আমার মা কিংবা ভাইয়েরা?"
_হ্যা,ওনারা তো এতক্ষন এখানেই ছিলো। একটু আগে আপনার বাবার কাছে গেলো।
নার্স একটু থেমে আবার বলতে শুরু করে,"মেয়র সাহেব বার বার এসে আপনাকে দেখে গিয়েছে।"
আলো নার্সের কথায় পাত্তা না দিয়ে কেবিনে ঢুকতে গেলে নার্স বলে ওঠে,"আপনার হাজবেন্ড খুব কেয়ারিং। স্ত্রীর জন্য চোখে মুখে কী ভীষণ উৎকণ্ঠার ছাপ! লাভ ম্যারেজ নাকি?"
আলো দাঁড়িয়ে পরে। নার্স বলতে থাকে,"খুবই ভালো লেগেছে দেখতে ব্যাপারটা। এখানে তো সবাই সবটা নার্সদের উপর ছেড়ে দিয়ে চলে যায়। উনি এতো ব্যস্ত মানুষ হয়েও....."
_আপনার ভালো লেগেছে তাকে?
নার্স কে থামিয়ে দিয়ে আলো প্রশ্নটি করে নার্সের দিকে তাকিয়ে থাকে। নার্স আলোর দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলে,"মানে?"
_মেয়র সামিন ইয়াসার মির্জাকে আপনার ভালো লেগেছে? তাহলে আপনি নিয়ে নিন।
ঠান্ডা গলায় বলে আলো। নার্স হতভম্ব হয়ে আলোর দিকে তাকিয়ে আছে। সামিন এসে নার্সের পেছনে দাঁড়িয়ে বলে ওঠে,"আমার বৌয়ের মাথায় একটু সমস্যা আছে নার্স আপা। কিছু মনে করবেন না।"
নার্স ঘুরে তাকায় সামিনের দিকে। সামিন হাসি দিয়ে বলে,"ওর মাথায় একটু সমস্যা আপা। আপনি যান । আমি দেখছি। অসুবিধা হলে ডাকবো আপনাকে।"
হতভম্ব ভাব নিয়েই নার্স সেখান থেকে চলে যায়। সামিন আলোর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,"আমার দ্বিতীয় বিয়ের প্রয়োজন হলে আমি নিজে এসে তোমার কাছে বলবো। তুমি কেনো আগ বাড়িয়ে নিজের সতীন ঠিক করছো।"
আলো ঘুরে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে নিজের কেবিনে ঢোকে। সামিন আলোর পিছু পিছু ঢুকে একটা চেয়ার টেনে বসে। আলো গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে,"আচ্ছা আপনার আর কোনো কাজ নেই? আপনাকে যারা মেয়র বানিয়েছে তাদের সেবা করুন গিয়ে।"
বেডের পাশে ক্রাচ টাকে রেখে আলো বসে পরে। সাইড-টেবিল থেকে গ্লাসের ঢাকনা উঠিয়ে পানি খেয়ে গ্লাস টা রেখে দিয়ে আবারো ক্রাচ হাতে তুলে নেয়। সামিন বলে,"কোথায় যাবে? ওয়াশ রুমে? নার্স ডাকবো?"
_আব্বুর কাছে যাবো আমি।
কপাল কুঁ'চ'কে জবাব দিয়ে আলো হাঁটতে থাকে। সামিন বলে,"চলো আমি নিয়ে যাচ্ছি।"
আলো কোনো বিরোধীতা করে না। সে জানে সে নিষেধ করলেও সামিন পেছন পেছন আসবে। শুধু শুধু কথা অপচয় করে লাভ নেই।
আইসিইউর সামনে এসে আলো দাঁড়িয়ে পরে। রেহেনা উঠে দাঁড়িয়ে বলে,"তুই আসতে গেলি কেনো মা। তুই বিশ্রাম নিতি!"
আলো বলে,"আব্বুর কি অবস্থা?"
_সব ঠিক আছে। ধৈর্য ধর।
আজান এসে আলোকে ধরে বসিয়ে দেয়। আলো আজানের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,"আয়াত কোথায়?"
_দাদীর কাছে। বাড়িতে।
সামিন দূরে দাঁড়িয়ে আলোকে দেখতে থাকে। খোঁপা আলগা হয়ে গিয়েছে আলোর। কপালের কাছে কিছু চুল এসে বড্ড বিরক্ত করছে মেয়েটিকে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পরে আলোর চোখে চোখ পরতেই সে চোখ সরিয়ে নেয়। আলো শীতল চোখে সামিনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে রেহেনাকে ডাকে,"আম্মু।"
রেহেনা মেয়ের দিকে তাকায়। আলো বলতে থাকে,"গয়না গুলো আনতে বলেছিলাম,এনেছিলে?"
রেহেনা মাথা নাড়ায়।
_ওনাকে দিয়ে দাও।
সামিন আলোর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আলো তার দিকে তাকিয়ে বলে,"ইশিতা আপু চেয়েছিলো গয়না গুলো। আপনার দেওয়া অর্থের সমপরিমাণ গয়না আছে ওখানে। আপুকে দিয়ে দেবেন।"
রেহেনা ব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট বের করে রোবটের মতো সামিনের দিকে এগিয়ে দেয়। সামিন ম্লান হেসে প্যাকেটটা হাতে তুলে নেয়। আলো সামিনের দিকে তাকিয়ে বলে,"আপনার ঋন শো'ধ হয়ে গিয়েছে। এর বিনিময়ে আর কোনো কৃতজ্ঞতা বোধ দেখাতে পারবো না।"
***
"তোর হাতে ওটা কিসের প্যাকেট?"
ফুয়াদ সামিনের হাতের প্যাকেট টার দিকে তাকিয়ে আছে। সামিন বলে,"এটা? এটা তো শশুর বাড়ি থেকে যৌ'তু'ক পেলাম।"
ফুয়াদ হা হয়ে তাকিয়ে থাকে। বলে,"মানে?"
_মানে তোর ভাবীর মা মানে আমার শ্রদ্ধেয় শাশুড়ি এগুলো গড়েছিলেন তার মেয়েকে দেবেন বলে। আমার আত্মসম্মানে পরিপূর্ণ বৌ এগুলো দিয়ে আমার ঋন শো'ধ করেছে।
ফুয়াদ শুকনো হাসি হেসে বলে,"তোর জন্য এমন একটা মেয়েই ঠিক আছে। নরম কোমল টাইপ বৌ পোষাতো না।"
_এ কথা বলছিস কেনো?
_এমনিই। তুই কি যেনো বলতি? স্ত্রী হচ্ছে বি'ছা'না'র সৌন্দর্য, শুধুমাত্র শ'য্যা'স'ঙ্গী । এখন তো দেখছি তুই এই শ'য্যা'স'ঙ্গী ছাড়া একেবারেই অচল। মাত্র ক'দিনেই এই অবস্থা?
সামিন চুপ করে থাকে। ফুয়াদ বলে,"বারবার বলেছি, এমন কিছু করিস না যার জন্য আজীবন তোকে অ'নু'তা'প করতে হয়।"
_ওকে তী'ব্র ভাবে অনুভব করতে শুরু করেছি আমি। আটকে গিয়েছি, ফেরার পথ নেই।
ফুয়াদ সামিনের কাঁধে হাত রেখে বলে,"এটাই সম্ভবত তোর শা'স্তি। ওকে পাওয়ার ব্যাকুলতায় ছ'ট'ফ'ট করবি কিন্তু ও ধরা দেবে না।"
_সত্যিই দেবে না? কখনোই না?
ফুয়াদ সামিনের দিকে তাকায়। সামিন বাচ্চাদের মতো আগ্রহী হয়েছে জানার জন্য।
ফুয়াদ গা ছাড়া ভঙ্গিতে বলে,"কি জানি! নারীর মন,বোঝা বড্ড কঠিন। তবে আমি দুই পার্সেন্ট শিওর ও তোর প্রতি নরম হবে। বাকি আটানব্বই পার্সেন্ট তোর কাজের উপর নির্ভর করছে। দেখ কি হয়!"
_মাত্র দুই পার্সেন্ট?
_অনেক বেশি বলেছি আমি। ভুলে যাস না তুই ওর সাথে কি করেছিস, প্রথমে কোন রূপে আবির্ভূত হয়েছিস ওর মনে। একটা প্রাপ্তবয়স্ক নারীর মন থেকে এসব মুছে ফেলা খুব কঠিন এবং ধৈর্য্যর ব্যাপার সামিন ইয়াসার মির্জা।
_তাহলে দুই পার্সেন্ট কেনো নিশ্চয়তা দিচ্ছিস। একেবারেই দিস না। কোন যুক্তিতে দিলি?
_অবলা জাত কখনো কখনো ঘৃ'ণা করতে করতে পুরুষকে ভালোবেসে ফেলে সেই যুক্তিতে!
***
"হুমায়ূন আহমেদ একটা কথা বলেছিলেন, ধনাঢ্য পরিবারের মেয়েরা গরীব ছেলেদের দেখলে একটা মায়া কাজ করে তাদের মনে, যে মায়া থেকে ভালোবাসা জন্মায়। তবে আমি এই অনূভুতিকে কখনোই ভালোবাসা বলে আখ্যায়িত করবো না,এই অনূভুতির নাম সহানুভূতি। ভালোবাসা নয়।"
ইশিতা কিছুক্ষণ শান্তর মেসেজটার দিকে তাকিয়ে থাকে। উত্তরে কিছু কথা সাজিয়ে লিখেও ফেলে কিন্তু ক্ষন'বাদেই তা মুছে ফেলে অফলাইনে চলে যায়।
দুমিনিট পর শান্তর ফোন আসে তার ফোনে। ইশিতা ফোনটা রিসিভ করবে না করবে না করেও রিসিভ করে কানে ধরে চুপ করে থাকে। শান্ত মৃদু হেসে বলে,"রা'গ করলে?"
_না তো। কেনো রা'গ করবো?
_তোমাকে রা'গি'য়ে দেওয়ার মতো একটা কথা লিখলাম।
_তুমি সহানুভূতি পেতে না চাইলে সাফ সাফ জানিয়ে দেবে। এতো ভনিতা করে কথা বলবে না।
শান্ত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে ওঠে,"চাই। আমি সহানুভূতি পেতে চাই। অভ্যেস খারাপ করে দিয়েছো তুমি। বড্ড লো'ভী হয়ে উঠেছে মন।"
ইশিতার ঠোঁট প্রশ্বস্ত হয়ে যায় হাসিতে। শান্ত বলতে থাকে,"তবে কি জানো , দরিদ্র সুদর্শন পুরুষ, এটা একটা তরুণীর জন্য মারাত্মক বি'প'দ'জ'ন'ক। আজীবন ভুগতে হয় ঠিক সময়ে এরিয়ে না গেলে।"
_এই আমি ফোন রাখলাম।
ইশিতা রা'গ দেখিয়ে ফোন কেটে দিতে গেলে শান্ত বলে ওঠে,"ইশু। আমি এরকম একটা আদরের দুলালীকে ঠিকঠাক ভাবে ট্রিট করতে পারবো তো?"
_আগে জানো সে কতটা চায়।
_কতটা চায়? তুমি যে সানস্ক্রিন লোশন ব্যবহার করো সেটা আমার প্রত্যেক মাসের মেস ভাড়া ইশু।
ইশিতা চুপ করে থেকে বলে,"চাকরি পেলে মেস ছেড়ে দেবে। একটা বাসা নেবে, আমাকে বিয়ে করবে, মোটামুটি দামের একটা সানস্ক্রিন লোশন কিনে দেবে। এতটুকু আত্মবিশ্বাসী হতে পারছো না?"
_আমার আত্মবিশ্বাস আমি আমার বৌকে পুরো একটা স্যালন কিনে দিতে পারবো। কিন্তু সেটা স্বপ্নে।
শান্ত উচ্চশব্দে হাসতে থাকে কথাটি বলে।
ইশিতা চুপ করে থেকে বলে,"কি করছো?"
_সস্তার সিগারেট পো'ড়া'চ্ছি।
দু'পাশের দুজন নিরব থাকে। শান্ত হুট করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে ওঠে,"পারলে এড়িয়ে যাও ইশু। এই সিগারেট টা পু'ড়'তে যতখানি সময় নিচ্ছে, তুমি পু'ড়'তে ততখানি টাইম নেবে না। বাবার রাজকন্যা, ভাইদের আদরের বোন, পারলে এড়িয়ে যাও। বোকামি করো না।"
***
"তুমি যে বলেছিলে জ্ঞান ফিরলে আর কোনো চিন্তার কিছু নেই? তাহলে এখন এসব কি বলছো?"
সামিন রাসেলের দিকে তাকিয়ে থাকে। রাসেল বলে,"আমি বলেছি আশংকা রয়েছে। তবে না হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি।"
সামিন বলে,"অ'পা'রে'শ'ন করা হলো কেন তবে?"
_ওনার জীবনটা বাঁচানোর জন্য। বেঁ'চে গিয়েছে উনি প্রানে। এখন বাকিটা পরে বোঝা যাবে।
সামিন মাথা ঘুরিয়ে আলোর দিকে তাকায়। আইসিইউর সামনে ক্রাচে ভর দিয়ে বাবার মুখটা আরো নিকট থেকে দেখার,বাবাকে ছোঁয়ার প্রতিক্ষায় আছে সে। দরজার কাচে চোখ রেখে ভেতরে তাকিয়ে আছে। ভেতরে রেহেনা।
রাসেল বলতে থাকে,"এ ধরনের কেস আমি যেকটা হাতে পেয়েছি তাদের মধ্যে শতকরা বিশ শতাংশ পেশেন্টের সাথে এমনটা হয়েছে তবে বাকি আশি শতাংশ কিন্তু সুস্থ হয়ে উঠেছে সামিন। অযথা দুশ্চিন্তা করো না।"
সামিন রাসেলের কথার জবাব দেয়না। রাসেল যেমনটা বলছে যদি সত্যিই তেমনটা হতে থাকে তাহলে আলো খুব ভেঙে পরবে।
রেহেনা বের হয়। একটু পরেই ডাক্তারের পারমিশন নিয়ে আলো ভেতরে ঢোকে।
আতাউর আলম কারো অস্তিত্ব টের পেয়ে দু'চোখ মেলে তাকায়। আলো ধীর পায়ে বাবার দিকে এগোতে থাকে। আতাউর চোখ পিটপিট করে মেয়েকে দেখতে থাকে। তার সামনে সালোয়ার কামিজ পরিহিতা , চুলে বিনুনি করা, চ'ঞ্চ'ল,দ'স্যি মেয়েটি নয় বরং দাঁড়িয়ে আছে শাড়ি পরিহিতা, চুলে খোঁপা করা, গলায় হালকা পাতলা গয়না পরে বৌ বৌ সাজের একটি মেয়ে। আতাউর কয়েক মুহূর্ত মুগ্ধ হয়ে নিজের কন্যাকে দেখে। অত্যন্ত মিষ্টি একটা চেহারা মেয়েটির। একেবারে মায়ের মতো দেখতে হয়েছে। ক্লাস টেনে থাকাকালীন নানা জায়গা থেকে অসংখ্য বিয়ের প্রস্তাব আসতো মেয়েটির জন্য, আতাউর আলম কখনো তাদের পাত্তা দিতো না। তার ইচ্ছে ছিলো মেয়েটিকে সে নিজের পায়ে দাড় করিয়ে বিয়ে দেবে। আজ সেই মেয়েটি বৌ বৌ সাজে তার সামনে দাঁড়িয়ে। আলো তার দিকে তাকিয়ে আছে। আতাউর আলম অত্যন্ত ক্ষীণ কন্ঠে বলে ওঠে,"পায়ে কি হয়েছে তোর?"
_হো'চ'ট খেয়েছি।
_কিভাবে?
_তুমি পাশে নেই বলে, বারবার খাচ্ছি আব্বু।
আতাউর আলম ম্লান হাসে। আলো বলে,"তোমাকে বুড়ো বুড়ো লাগছে আব্বু।"
_তোকেও মহিলাদের মতো লাগছে। শাড়ি পরে থাকিস কেনো?
_শুধু শাড়িই কিনে দিয়েছে আমাকে।
_তা কেনো?
_আমার অবস্থান বুঝিয়ে দিতে সম্ভবত। আমি এখন কারো বৌ। এটা বারবার মনে করিয়ে দিতে।
আতাউর আলম মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। আলো বলতে থাকে,"সু'স্থ হয়ে ওঠো আব্বু। সবটা গুছিয়ে নিতে হবে। এলোমেলো হয়ে যাওয়া সবটা গুছিয়ে নিতে আমার মাথার উপরে বাবার শ'ক্ত একটা হাত দরকার। দয়া করে সুস্থ হয়ে ওঠো তুমি।"
***
জ্ঞান ফেরার আজ তিন দিন, আতাউর আলমকে জেনারেল কেবিনে শিফট করে দেওয়া হয়েছে। কাল পরশুর মধ্যে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে তাকে।
রাত অতটা গভীর নয়। বিকেলের দিকে ভাইদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে আলো নিজেও সামিনের সাথে বাড়িতে চলে আসে। তাকে দুদিন আগেই ছাড়পত্র দিয়ে দিয়েছে ডক্টর, কয়েকদিন পরেই তার পায়ের প্লাস্টার খুলে ফেলা হবে। হসপিটালে এখন শুধু রেহেনা আছে।
বিছানায় কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে চোখ বন্ধ করে থাকে। তারপর চোখ মেলে ঘড়ির দিকে তাকায়। সময় রাত ১০ টা বেজে বিয়াল্লিশ মিনিট। বিছানায় শুয়ে কিছুক্ষণ উ'শ'খু'শ করে সে উঠে বসে। আব্বুর জন্য মনটা অস্থির হয়ে উঠেছে।
এখন কিভাবে যাবে সে!
সামিন হাতের ল্যাপটপ সরিয়ে আলোকে কিছু সময় ধরে দেখে। আলো চুপচাপ মাথা নিচু করে বিছানায় বসে আছে।
ল্যাপটপ বন্ধ করে মৃদু স্বরে বলে ওঠে,"হসপিটালে যেতে চাও?"
আলো সামিনের দিকে তাকায়। সামিন বলতে থাকে,"যেতে চাও? তাহলে নিয়ে যাবো।"
আলো মাথা নাড়িয়ে না বলে দেয়। সামিন আবারো ল্যাপটপ হাতে নেয়। আলো বলে ওঠে,"আর তেইশ দিন পরে এমনিতেই চলে যাবো, তার আগে এতো ঘনঘন যাওয়া আসা করার কি দরকার!"
সামিন ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে আলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। কতটা দৃঢ়তার সাথে বলেছে আলো এই কথাটা। কিছু সময় চুপ থেকে সামিন বলে,"শিওর তুমি? আমাকে ছে'ড়ে তেইশ দিন পরে চলে যাবে? এতোটা আত্মবিশ্বাসের সাথে বলছো?"
_হ্যা।
সামিনের চোখে চোখ রেখে বলে আলো।
***
আতাউর আলম আলোর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সামিনের দিকে তাকিয়ে আছে। সে তার সামনে তেজী, প্র'তি'হিংসাপরায়ণ, ভ'য়ং'কর ছেলেটাকে দেখে কিছুটা অবাক হচ্ছে। সামিনের চোখে মুখে আগের হিং'স্র'তা সে দেখতে পাচ্ছে না, ক'দিন আগেও যা দেখে সে কেঁ'পে উঠতো। বরং তার সামনে একজন অস্বাভাবিক বিনয়ী একজন লোককে সে দেখছে। এই পরিবর্তিত রূপ হ'জ'ম করাটা কষ্টকর। আতাউর আলম একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে দু'চোখ বন্ধ করে ফেলে। আলো উৎকণ্ঠা নিয়ে এগিয়ে আসে,"কি হয়েছে আব্বু? শরীর খারাপ লাগছে?"
আতাউর আলম মাথা নাড়ায়। নিজের মেয়েটার পাশে ঐ ছেলেটাকে মেনে নিতে পারছে না সে। বুকের মধ্যে যন্ত্রনা হচ্ছে।
ডাক্তার রাসেল এসে আতাউর আলমকে পরিদর্শন করে। সামিন আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,"আর দুটো দিন চাইলে রাখতে পারতে। এত দ্রুত বাড়িতে......"
_আমার আব্বু। আমি বুঝে নেবো।
গম্ভীর কন্ঠে বলে আলো, তারপর ডাক্তার রাসেলের দিকে তাকিয়ে বলে,"অসুবিধা নেই তো ডক্টর?"
ডাক্তার রাসেল মাথা নাড়ায়। একটা হাসি দিয়ে বলে,"অসুবিধা নেই তবে, খুব সাবধানে।"
আলো মাথা নাড়ায়। সামিন চুপচাপ আলোকে দেখে। বাবার সুস্থ হবার খুশিতে সে ভুলে গিয়েছে তারও পায়ে চো'ট। ক্রাচে ভর করেও লাফিয়ে লাফিয়ে সবটা দেখছে।
বিকেলে আতাউর আলমকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার ব্যাবস্থা করা হয়। হসপিটালের সামনে এ্যা'ম্বু'লে'ন্স দাঁড়িয়ে আছে। ওয়ার্ড বয়রা এসে আতাউর আলমকে ধরে ধরে নামিয়ে নেওয়ার জন্য দাড়িয়ে আছে। আলো বাবার পাশে বসে বাবাকে জরিয়ে ধরে রেখেছে। বাপ বেটিতে চোখ বন্ধ করে আছে। সামিন দূরে দাঁড়িয়ে এই অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্যটি দেখতে থাকে। মেয়েরা সত্যিই বাবা পাগল হয়। হুট করে তার মনেও বাসনা জাগলো তার প্রথম সন্তান যেনো মেয়ে হয়। ওই পাগল মেয়ে অদ্রিতা আলোর মতো একটা মেয়ে।
কথাটা চিন্তা করে সামিন মনে মনে ভীষণ লজ্জা পেয়ে যায়। মনে মনে নিজেকে নিজে বলে,"বৌ থাকবে কি থাকবে না তারই গ্যারান্টি নেই তুই এদিকে বাচ্চার স্বপ্নও দেখছিস সামিন ইয়াসার!"
ধীরপায়ে হেটে আতাউর আলমের পরিবারের সামনে দাঁড়ায় সামিন । সবাই তার দিকে তাকায়। সবার মুখের দিকে একপলক তাকিয়ে খুবই ঠাণ্ডা গলায় আলোকে বলে,"তুমি চাইলে তোমার বাবা মায়ের সাথে যেতে পারো আলো। ক'দিন ওখানে থাকবে ।"
আলো সামিনের কথায় একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। রেহেনা নরম গলায় আলোকে বলে ওঠে,"যাবি মা তুই?"
আজান আয়াত বলতে থাকে,"আপু চলো না। আমাদের সাথে চলো।"
আলো সামিনের দিকে একপলক তাকিয়ে তার মাকে বলে,"না আম্মু। আমি এখন যাবো না। আমি ঠিক বাইশ দিন পরে চলে আসবো তোমাদের কাছে । একেবারের জন্য।"
রেহেনা নিজের মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সামিন আলোকে দেখছে। আলো বলতে থাকে,"বাইশ দিন পর তোমাদের কাছে ফেরার আগে এই লোকটাকে বুঝিয়ে দিয়ে আসবো এই লোকটা জীবনসঙ্গী হিসেবে সম্মানের যোগ্য নয়। এই লোকটা একটা অযোগ্য নেতাই নয় বরং অযোগ্য মানুষ। এর চোখে আঙুল দিয়ে আমি বুঝিয়ে দিতে চাই আম্মু। তোমরা যাও। তোমাদের মেয়েও ফিরবে।"
***
গাড়িতে উঠে একপলক আলোর দিকে তাকিয়ে সামিন গাড়ি স্টার্ট করে। হসপিটালের গেইট পেরিয়ে বাড়ির দিকে ফিরতে থাকে। আলো সিটবেল্ট বাঁধে নি। সামিন বলে,"সিট বেল্ট বাঁধতে চাও না কেনো? একটা অ'ঘ'ট'ন ঘটলে তখন বুঝবে!"
_অ'ঘ'ট'নে'র পাশে বসে অ'ঘ'ট'নে'র ভয় পাইনা আমি।
সামিন হেসে ফেলে,"আমি অ'ঘ'ট'ন? বাহ, কখনো পি'শা'চ, কখনো জা'নো'য়া'র , কখনো ফে'রা'উ'ন, কখনো আবার অ'ঘ'ট'ন!"
আলো চুপ করে থাকে। সামিন বলে,"আমি বলেছি একমাস পরে তোমার যদি আমার প্রতি অনূভুতি না বদলায় তাহলে তুমি চলে যেতে পারো। সে কথা শুনে খুব খুশি হয়েছো তাই না? আচ্ছা যদি আর বাইশ দিন পরেও তোমাকে যেতে না দেই, জোর করে আটকে রেখে দেই? যদি জোর জবরদস্তি করি? তখন?"
আলো সামিনের দিকে তাকায়। সামিন ম্লান হেসে বলে,"ভ'য় পেয়ো না। আমি আমার কথা রাখবো। জোর করবো না তোমাকে।"
আলো সামিনের কথার কোনো জবাব দেয়না। দু'জনে দীর্ঘসময় ধরে চুপচাপ। গাড়ি শান্তনীড়ের গেইট থেকে ভেতরে ঢোকে।
গাড়ি থেকে নেমে আলো ক্রাচে ভর দিয়ে বাড়ির ভেতর ঢোকে। লিভিং রুমে বাড়ির মেয়েরা সবাই দাঁড়িয়ে। একজন অচেনা বৃদ্ধ মহিলা বসে আছে লিভিং রুমের সোফাতে। আলোকে দেখে রিতু এগিয়ে এসে আলোর মাথায় ঘোমটা তুলে দিয়ে নিচু স্বরে বলে,"সম্পর্কে আপনার দাদী শাশুড়ি। আমাদের দাদা শশুরের ছোট বোন ।"
আলো এক পলক মহিলাটিকে দেখে। মাথার চুল ধবধবে সাদা, গাঁয়ের রং টাও বেশ চমৎকার। গায়ে একটা সাদা কালো জামদানি শাড়ি। দেখে বয়স কত তা বোঝার উপায় নেই। হতে পারে সত্তরের ওপরে। ভদ্রমহিলা আলোর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে আছে। আলোর পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখছে। সামিন লিভিং রুমে এসে মহিলাটিকে দেখে হাসি মুখে এগিয়ে যায়। তারপর কুশল বিনিময় করে। ভদ্রমহিলার নাম ইলোরা মির্জা। তিনি মাথা ঘুরিয়ে আবারো আলোকে দেখে। তারপর সামিনের দিকে তাকিয়ে বলে,"ল্যাংড়া বৌ? কিন্তু কেউ তো কিছু বললো না!"
সামিন থমথমে মুখ নিয়ে আলোর দিকে তাকায়। তারপর তার দাদীর দিকে ফিরে বলে,"পায়ে চো'ট পেয়েছে দাদী।"
ইলোরা আবারো আলোর দিকে তাকায়। ঠাট্টার ছলে বলে,"কেনো? বেশি লাফায় নাকি তোর বৌ?"
আলো কপাল কুঁ'চ'কে সিঁড়ির দিকে যায়। এবাড়ির প্রত্যেকটা লোক এক একটা নমুনা। এই নতুন নমুনাটা আবার কোথা থেকে উদয় হলো কে জানে!
আলোকে যেতে দেখে ইলোরা বলে ওঠে,"কেমন মেয়ে! মুরব্বিদের দেখেও সালাম দেয় না!"
সামিন দাদীর হাত চেপে ধরে চুপ করিয়ে দেয়। আলো ধীরে ধীরে উপরে উঠতে থাকে।
ইলোরা সামিনের দিকে তাকিয়ে বলে,"কি? কেমন মেয়ে এটা? বিয়ে করবি না করবি না বলে কেমন মেয়ে বিয়ে করলি!"
তুমি তো জানো সবটা। কিছু মনে করো না দাদী।
নরম গলায় ইলোরাকে বলে সামিন।
***
"ভাবী! আপনার খাবার কি ঘরে পাঠিয়ে দেবো?"
আলো ঘুরে তাকায়। সিতারা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে বলে। ক্রাচ টা হাতে তুলে নিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে,"দরকার নেই। আমি আসছি।"
সিতারা চলে যায়। সামিন ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে আলোর দিকে তাকায়, তারপর বলে ওঠে,"বাড়িতে যিনি এসেছেন তিনি একজন মুরব্বি। রেসপেক্ট ডিজার্ভ করে আলো।"
_রেসপেক্ট আমি মানুষের ব্যাবহার দেখে করি। ওনার কথা বার্তার ধরন দেখে মনে হয়নি তিনি ওসবের যোগ্য।
সামিন বলে,"ঠিকাছে। আর যাই করো ,গালাগাল শুরু করে দিও না অন্তত। দুদিনের জন্য ডাক্তার দেখাতে এসেছে এখানে।"
আলো কিছু না বলে নিচে নেমে আসে। খাবার টেবিলে বসতেই ফুলির মা তার খাবার বেড়ে দেয়। টেবিলে মোটামুটি বাড়ির সবাই খেতে বসেছে। আলো চুপচাপ খেয়ে নিচ্ছে। ইলোরা কিছুক্ষণ আলোকে দেখে রিতুর দিকে তাকিয়ে বলে,"সামিন খেয়েছে?"
রিতু মাথা নাড়ায়। ইলোরা সরাসরি আলোর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে,"স্বামীর আগে আগে খেয়ে নেওয়ার রীতি চালু হয়েছে এই মির্জা বাড়িতে বুঝি!"
আলো সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে খেতে থাকে। এমন সময় সামিন এসে দাঁড়ায় সেখানে। একে একে প্রায় সবাই খাওয়া শেষ করে উঠে যায়। সামিন একটা খালি চেয়ার টেনে বসে পরে। একপলক আলোর দিকে তাকায় সে। ইলোরা আলোকে বলে,"স্বামীর কি লাগবে না লাগবে সেটা দেখো!"
আলো মাথা তুলে একবার সামিন আর একবার ইলোরার দিকে তাকিয়ে প্লেটে হাত ধুয়ে ক্রাচ তুলে উঠে দাঁড়ায়। তারপর চলে যায় সে সেখান থেকে।
ফুলির মা সামিনের খাবার বেড়ে দিয়ে চলে যায়। খাবার টেবিলে আপাতত সামিন এবং ইলোরা। সামিন খেতে শুরু করে। ইলোরা বলে,"যা শুনেছি তাই তো দেখছি সত্যি। তুই এটা কি বিয়ে করেছিস?"
সামিন চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে। ইলোরা ধ'ম'কে'র সুরে বলে,"এখন আমাকে মির্জা বাড়ির ছেলেদের শিখিয়ে দিতে হবে কিভাবে বৌ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়?"
সামিন খাওয়া রেখে ইলোরার দিকে তাকায়। ঠান্ডা গলায় বলে,"আমি কাউকে নিয়ন্ত্রণে আনতে চাই না দাদী।"
_তো এটাকে দিয়ে কি করবি? সংসারে মন নেই, অহংকারী,দেমাগী মেয়ে, তোকে দামই দেয়না।
_বৌ আমার থাকবে কি থাকবে না সেই নিশ্চয়তা নেই আর তুমি বলছো দাম দেওয়ার কথা!
ইলোরা সামিনের দিকে তাকিয়ে থাকে।
সামিন হেসে ফেলে। ইলোরার দিকে তাকিয়ে বলে,"সংসারে মন লাগানোর টিপস দাও তুমি। এক কাজ করো আবার আসার সময় তোমাদের বাড়ির ওখান থেকে তাবিজ নিয়ে এসো আমার বৌয়ের জন্য, সংসারে মন লাগিয়ে দাও আমার বৌয়ের। যাতে আমাকে ছে'ড়ে না চলে যায়।"
কথাটি বলে সামিন হাসতে থাকে।
ইলোরা গম্ভীর কন্ঠে বলে,"ফা'জ'লা'মি করিস না। তাবিজ লাগবে না। এসব তে'জী মেয়েদের শুরুতেই কোমড় ভে'ঙে দিতে হয়। তাহলেই সংসারে মন লেগে যায় এদের। শুরুতেই পায়ে শিকল পরিয়ে দিলে আর পালাতে পারে না।"
সামিন খেতে খেতে বলে,"তা কিভাবে? এই শিকল টা আবার কি?"
_একটা বাচ্চা দিয়ে দে পেটে। দেখবি সংসারে মন না লেগে কই যায় !
কথাটা শুনে বি'ষ'ম খেয়ে যায় সামিন। কাশতে কাশতে হতভম্ব হয়ে ইলোরার দিকে তাকিয়ে থাকে।
চলমান.......