ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগলো চোখে

২৪তম পর্ব

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে

#পর্বসংখ্যা_২৪

#Esrat_Ety

ঘুমন্ত আলোর মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তার গায়ে চাদরটা টেনে দিতে যায় সামিন। হুট করে আলোর ঘুম ভেঙ্গে যায়। সামিনকে দেখে কিছুটা ভয় পেয়ে গিয়ে ধরফরিয়ে উঠে বসে।

সামিন হাত থেকে চাদরটা ফেলে রেখে বলে,"এতো ঘুম পাতলা মানুষ আমি জীবনে দেখিনি। তুমি নাইট গার্ডের চাকরি নিলে পারো।"

আলো চাদরটার দিকে একপলক তাকিয়ে সামিনের দিকে তাকিয়ে বলে,"ওটা দিয়ে কি করতে চাচ্ছিলেন?"

_তোমায় চাদর চা'পা দিয়ে মে'রে ফেলতে চাচ্ছিলাম।

ঠান্ডা গলায় জবাব দেয় সামিন।

আলো শাড়ির আঁচল টে'নে নিজেকে জরিয়ে নিয়ে বলে,"সেটা আপনি করতেই পারেন। আপনার রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্র'তি'হিংসা'প'রা'য়'ণ'তা।"

সামিন শীতল চোখে আলোর দিকে তাকিয়ে আছে। আলো বলে,"কি? এমন ভাবে তাকিয়ে আছেন কেন? এই বংশের ছেলেদের কেচ্ছাকাহিনী আমি কিছু জানিনা ভেবেছেন? অধিকাংশ ছেলেই তো দুই তিনটা করে বিয়ে করেছে, কোনো না কোনো বৌকে মে'রে'ছে।"

_এসব কথা কে বলেছে তোমায়? তারা কি খু'ন করার সময় সাথে থাকতো আমাদের বংশের ছেলেদের?

_যা রটে তার কিছু তো ঘটে।

_যে আমলের কথা বলছো সে আমল ঘুনে ধরেছে। এখন তো হাত না তুললেও তোমরা মেয়েরা স্বামীর নামে বানিয়ে মা'ম'লা ঠুকে দাও, নারী হওয়ার সুবিধা নাও‌।

আলো চুপ করে থাকে। সামিন বলে,"উঠে পরেছো ভালো হয়েছে। দাদী এমনিতেও বেশ কয়েকবার তোমাকে ডেকে গিয়েছে।"

_উনি কেনো ডেকেছে?

_তা তো আমি জানি না। গিয়ে দেখো।

_আমি যাবো না।

_আগামী বিশ দিন তুমি এই বাড়িতে আছো,তো এ বাড়ির বৌয়ের মতো থাকো। বেশি ঘাড় ত্যাড়ামি না করে যাও নয়তো কোলে করে দিয়ে আসবো।

আলো কিছুক্ষণ সামিনের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,"ভালো কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। এবার আমিও আপনাকে একটা কথা মনে করিয়ে দেই ইয়াসার মির্জা, আপনার চেয়ে নেওয়া একমাসের আর বাকি আছে মাত্র বিশ দিন । এবং আপনার প্রতি আমার অনূভুতি একটুও বদলায় নি। একটুও না।"

কথাটি বলে আলো ওয়াশ রুমে ঢোকে। সামিন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সেখান থেকে চলে যায়।

***

"আজ ইহানকে পড়াতে আসলে না কেন?"

_চাকরীর ইন্টারভিউ ছিলো। একটা বিজ্ঞাপন কোম্পানিতে‌। রিতু ভাবীকে তো বলেছি।

ইশিতা চুপ করে থাকে। শান্ত ফোনের ওপাশ থেকে বলে ওঠে,"তোমাকে বলিনি বলে মাইন্ড খেয়েছো?"

_নাহ।

একশব্দে জবাব দেয় ইশিতা। তারপর বলে,"ইন্টারভিউ কেমন ছিলো? টিকবে?"

_বুঝতে পারছি না। মনে তো হচ্ছে টিকে যাবো‌।

ইশিতা চুপ হয়ে শুনতে থাকে শান্তর বিজ্ঞাপন কোম্পানিতে ইন্টারভিউয়ের অভিজ্ঞতা। পেছনে সামিন এসে দাঁড়িয়েছে সে খেয়াল করেনি।

"ইশু"

ভাইয়ার কন্ঠস্বর শুনে চ'ম'কে উঠে হাত থেকে ফোন ফেলে দিয়ে গুটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সে। সামিন বোনের ভী'ত স'ন্ত্র'স্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলে,"প্রবলেম কি? ভ'য় পেলি কেনো এভাবে?"

ইশিতা তোতলাতে তোতলাতে বলে,"হুট করে এলে তো। তাই ভাইয়া। বলো কি বলবে।"

সামিন বলে,"একটা অত্যন্ত জরুরি কথা বলতে এসেছি। তোর বিয়ের ব্যাপারে।"

_আমার বিয়ে?

হা করে ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে ইশিতা। সামিন বলে,"হ্যা।"

ইশিতা চোখ মুখ কুঁচকে বলে,"ইশমামকে রেখে আবার আমাকে নিয়ে পরলে কেনো ভাইয়া? আমি তো কোন ছেলের জন্য স্লি'পিং পি'ল'স খাইনি!"

সামিন গম্ভীর কন্ঠে বলে,"ডাক্তার রাসেল, আমার হাই স্কুলের ক্লাসমেট। সেদিন হসপিটালে তোকে দেখে পছন্দ করেছে। কথায় কথায় আজ বললো। সেও বিয়ের জন্য মেয়ে খুঁজছিলো আর বাবাও তোর বিয়ের কথা বললো। খুব ভালো ছেলে রাসেল। আমাদের গোটা স্কুলে একটা ভদ্র ছেলে থাকলে সেটা ছিলো ও।"

_হসপিটালে ডাক্তারি করা বাদ দিয়ে মেয়ে মানুষ পছন্দ করে বেড়ায় সে ভদ্র? কেনো ভাইয়া আমাকে এই উটকো ঝামেলায় জড়াচ্ছো। বলছি তো বিয়ে করবো না এতো তাড়াতাড়ি। ধূর!

ইশিতা ভাইয়ের ওপর রাগ দেখিয়ে চলে যায় নিজের ঘরে। সামিন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ায়। আলো ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।আলোর পায়ের প্লাস্টার খুলে ফেলা হয়েছে গতকাল।

সামিন দাঁড়িয়ে পরে,"ক্রাচ কোথায় তোমার?"

_ওটার আর প্রয়োজন নেই। খুড়িয়ে খুড়িয়ে বেশ হাঁটতে পারি। ওটা একটা বোঝা।

আলো হাঁটতে থাকে। সামিন আলোর পিছু পিছু আসে। আলো গম্ভীর কন্ঠে বলে,"পিছু পিছু আসছেন কেনো?"

_তুমি আগে আগে যাচ্ছো তাই।

আলো চুপ হয়ে যায়। সামিন বলে,"প্লাস্টার খুলে ফেলার সাথে সাথে নিজের আগের রূপ ধারণ করেছো দেখছি। রয়ে সয়ে হাটো। আবার পরে.........."

সামিন কথাটা বলে শেষ করতে পারে না আলো পুনরায় হোঁ'চ'ট খেয়ে পরে যেতে নেয়। সামিন খ'প করে ধরে ফেলে আলোকে। আলো বড় বড় নিশ্বাস নিচ্ছে। এক মিনিট পর নিজেকে ধাতস্থ করে সামিনের দিকে তাকায়। সামিন তাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় আলো। সামিন বলে,"এইবার পরে গেলে বেশ হতো, বাম পা-টাও ভেঙে হুইল চেয়ারে বসে থাকতে। আগামী ছয় মাসের জন্য যেতে পারতে না কোথাও স্বামীর বাড়ি ছেড়ে। আমার ধরাটা উচিত হয়নি। আসো তোমাকে ধা'ক্কা মে'রে ফেলে দেই।"

আলো এক মিনিট চুপ করে থেকে অতি সাবধানে সিঁড়ি ভাঙতে থাকে। পায়ের গোড়ালিতে এখনো বেশ য'ন্ত্র'না হয় তার। ধীরে ধীরে নেমে লিভিং রুমে দাঁড়ায়। ইলোরা মির্জার ব্যাগ পত্র গুছিয়ে রাখা লিভিং রুমে,আজ সে চলে যাবে। আলো ধীরপায়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলে,"আমাকে ডেকেছিলেন।"

ইলোরা মির্জা আলোর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,"হু। আমি আজ চলে যাচ্ছি। তোমাদের বেশি সময় দিতে পারলাম না।"

আলো মনে মনে বলে,"কে চেয়েছে আপনার সময়? আপনি কে'টে পরুন।"

ইলোরা নিজের পার্স ব্যাগ থেকে একটা স্বর্নের চেইন বের করে। আলো কিছু বুঝতে পারছে না। সামিন গিয়ে আলোর পেছনে দাঁড়ায়। ইলোরা আলোকে চেইনটা পরিয়ে দিতে দিতে বলে,"বৌ দেখা উপহার। যদিও তোমাকে আমার পছন্দ হয়নি খুব একটা। তবুও নাতীর মুখের দিকে তাকিয়ে দিলাম।"

আলো ইলোরার দিকে তাকিয়ে আছে। ইলোরা বাড়ির সবার থেকে বিদায় নিয়ে সামিনের দিকে তাকায়। তারপর বলে,"শি'ক'ল পরানোর বিষয়টা মাথায় রাখিস সামিন। সময় থাকতে শি'ক'ল পরিয়ে দে। ওটাতেই কাজ হবে।"

আলো কিছু না বুঝে একবার সামিন আর একবার ইলোরার দিকে তাকায়। সামিন হেসে ইলোরাকে বলে,"সে দেখা যাবে‌। তুমি চাপ নিও না দাদী‌।"

ইলোরা কে বিদায় জানিয়ে ঘুরে দাড়াতেই দেখে আলো তার দিকে তাকিয়ে আছে। গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে,"কাকে শি'ক'ল পরানোর কথা বলছিলো আপনার দাদী?"

সামিন থতমত খেয়ে যায়,বলে,"সেটা আমার এবং দাদীর কথা তুমি নাক গলাচ্ছো কেন?"

_আপনাদের বংশের মেয়ে গুলোও আপনাদের থেকে কম না কোনো অংশে। কথাবার্তা, চালচলন সব ক্রি'মি'না'ল'দে'র মতো‌।

_ইশিতাও কি সেরকম?

সামিন আলোকে প্রশ্নটা করে সরাসরি আলোর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আলো নরম গলায় বলে,"না। ইশিতা আপু ওরকম না। ঐ একজনই ব্যাতিক্রম।"

_আমার ছোটো ভাই ইশমামও ব্যাতিক্রম। এসব পলিটিক্স, মা'র'পি'ট,গু'ণ্ডা'মি থেকে সবসময় দূরে থাকে। ওর সাথে মিশলে বুঝতে কি চমৎকার একটি ছেলে।

আলো সামিনের দিকে তাকিয়ে থেকে সামিনের কথাটা শোনে। সে আর কোনো কথা বাড়ায় না।

***

দুপুরে সবাই একসাথে খাবার টেবিলে খেতে বসেছে। ইমতিয়াজ মির্জা বাদে টেবিলে বাড়ির সবাই রয়েছে অথচ পুরো ডাইনিং রুম জুড়ে পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছে। কিছুক্ষণ পরপর শুধু চামচের ঠো'কা'ঠু'কি'র শব্দ শোনা যাচ্ছে। কিছু সময় পরে ইলহাম সামিনের সাথে বাড়ির ব্যাবসার আলাপ জুড়ে দেয়। ইশমামকেও সে শুনতে তাগাদা দেয় কিন্তু ইশমাম কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না। রিতু কয়েক লোকমা খেয়ে প্লেট সরিয়ে রাখে। তার একেবারেই খেতে ইচ্ছে করছে না,খুব ব'মি পাচ্ছে। আলো একপলক রিতুকে দেখে না চাইতেও নিচু স্বরে বলে ফেলে,"তোমার কি কোনো সমস্যা হচ্ছে?"

সামিন আলোর দিকে তাকিয়ে রিতুর দিকে তাকায়। ইলহাম তাকিয়ে থাকে রিতুর দিকে। রিতু আলোকে বলে,"না ভাবী,মাথা ঘুরছে শুধু‌।"

কথাটা শেষ করতে পারে না রিতু,ভি'ড়'মি খেয়ে পরে যেতে নিলে আলো খপ করে রিতুকে ধরে।

এমন সময় কলিংবেল বেজে ওঠে। ফুলির মা গিয়ে দরজা খুলে দেয়। পরী হাসি হাসি মুখ করে বলে,"কোথায় বাড়ির সবাই?"

_খাচ্ছে পরী আপা, ডাইনিং রুমে যাও।

পরী হেটে ডাইনিং রুমে গিয়ে দাঁড়ায়। তার হাতে একটা ফাইল। সামিন মাথা ঘুরিয়ে পরীকে দেখে বলে,"ডাক্তার আপা হঠাৎ এলি যে।"

পরী মুচকি হেসে বলে,"আজ মেজো ভাইয়ার কাছে এসেছি। মিষ্টি খেতে।"

ইলহাম অবাক হয়ে বলে,"আমার কাছে? কি হয়েছে?"

_ভাবীর টে'স্টের রিপোর্ট নিয়ে এসেছি। ইহানের ছোটো ভাই-বোন আসতে চলেছে ভাইয়া।

ইলহাম থমথমে মুখ নিয়ে রিতুর দিকে তাকায়। রিতু তার স্বামীর দিকেই তাকিয়ে আছে।

সামিন কিছুক্ষণ পর মৃদু হেসে বলে ওঠে,"ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নাও রিতু।"

ইশিতা এবং ইশমাম ইলহামের দিকে তাকিয়ে বলে,"কংগ্রাচুলেশন ভাইয়া।"

ইলহাম শুকনো একটা হাসি দিয়ে প্লেটে হাত ধুয়ে উঠে পরে। ইশিতা পরীর দিকে তাকিয়ে বলে,"খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? খেতে বস!"

পরী একটা মুচকি হাসি দিয়ে ইশমামের দিকে একপলক তাকিয়ে ইশিতাকে বলে,"না আপু। পরে।"

***

দরজা ভেজিয়ে দিয়ে ইলহাম রিতুর দিকে তাকায়। রিতু বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে আছে। মাথাটা নিচু করে রেখেছে সে। ইলহাম এগিয়ে যায়। গিয়ে বিছানার একপাশে বসে। রিতু মাথা তুলে ইলহামের দিকে তাকিয়ে বলে,"আপনার সন্তান। আপনার যেটা ইচ্ছে হয় করতে পারেন। আমার কোনো মতামত নেই।"

ইলহাম রিতুর দিকে তাকিয়ে বলে,"ওষুধ ঠিক ঠাক মত খাওনি কেনো?"

অনেকটা চ'ড়া গলায় বলে ইলহাম। রিতু ছলোছলো চোখে ইলহামের দিকে তাকিয়ে বলে,"এক বছর পরে যখন তা'লা'ক দিয়ে দেবেন তখন বৌয়ের কাছে আসার কি দরকার ছিলো? বৌয়ের কাছ থেকে যা পান তা তো আপনার ঐ র'ক্ষি'তা'ই আপনাকে দেয়। গাছেরও খাবেন তলারও কুড়াবেন তাই না!"

_শাট আপ রিতু। একেবারে তেজী গলায় কথা বলবে না। মেয়েদের তেজী গলায় কথা আমি পছন্দ করি না জানো তুমি।

_সেটা বৌয়ের বেলায় শুধু, র'ক্ষি'তা'র বেলায় ঠিকই পছন্দ করেন‌ । ওসবই ভালো লাগে আপনার।

ইলহাম চোখ রাঙিয়ে রিতুর দিকে তাকিয়ে আছে,বলে,"গলায় বেশ জোর এসেছে দেখছি। এসব কে শেখাচ্ছে তোমায়? তোমার বড় জা? ঐ বে'য়া'দ'ব মেয়েটা?"

রিতু তার জবাব না দিয়ে বলে,

_আপনার সন্তানকে আপনি চাইলে মে'রে ফেলতে পারেন‌ । আপনি চাইলে ইহানকেও মে'রে ফেলুন। এমনিতেও ওরা আপনার ভালোবাসায় হয়নি। ওরা আপনার ভো'গ এবং আমার অসহায়ত্বের ফসল। ওদের মে'রে দিন‌, তারপর আমাকে তা'লা'ক দিয়ে আপনার র'ক্ষি'তা'কে হালাল বানিয়ে সংসার করতে একটুও অসুবিধে হবে না ইলহাম মির্জা!

রিতুর কন্ঠে কিছু একটা ছিলো। ইলহাম রিতুর দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে শার্ট পাল্টে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।

***

"কিহ! রিতু প্রে'গ'ন্যা'ন্ট!"

চেঁচিয়ে ওঠে জুই। ইলহাম বলে,"হু। আজ রিপোর্ট হাতে এসেছে।"

_এটা ওর চাল ইলহাম। এইসব গ্রামের মেয়েদের আমার ভালো করে জানা আছে, যেই বুঝতে পেরেছে তুমি ওকে ছে'ড়ে দিতে পারো অমনি আরেকটা বাচ্চা নিয়ে ফেলেছে‌। চাল'বাজ মেয়ে কোথাকার!

_শাট আপ জুই। চাল'বাজ বলবে না,রিতু খুবই সহজ সরল একটি মেয়ে।

জুই ইলহামের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর বলে ওঠে,"বৌয়ের নামে আজকাল কিছু বললেই ধ'ম'কে উঠছো দেখছি! ভালোবাসা জন্মে গিয়েছে নাকি?"

ইলহাম কিছু বলে না। জুই ইলহামের কাছে এগিয়ে এসে দাঁতে দাঁত চে'পে বলে,"সাফ সাফ বলো, তুমি আমাকে চাও কি চাওনা।"

_চাই।

একশব্দে বলে ইলহাম। জুই বলে,"ঠিকাছে। তাহলে ওর এ'ব'র'শ'ন করাও। আমি দুইটা বাচ্চা পালতে পারবো না।"

ইলহাম জুঁইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,"আমার বাচ্চা আমি মে'রে ফেলবো? তুমি কি পাগল হয়ে গিয়েছো?"

_তাহলে কি করতে চাও? শোন ইলহাম,হয় আমায় ছে'ড়ে দেবে নয়তো বাচ্চা এ'ব'র'শ'ন করাবে। তোমার কাছে দুটো অপশন। তিনবছর ধরে আমি অপেক্ষা করছি। বলেছিলে ইহান একটু বড় হলে রিতুকে ছেড়ে দেবে। এখন আরেকটা ঝামেলা তৈরি করে বসে আছো,যত্তসব!

ইলহাম চুপচাপ বসে আছে। সে বুঝতে পারছে না সে কি করবে। ম'রে গেলেও সে নিজের বাচ্চা মে'রে ফেলতে পারবে না, এতটা হৃদয়হীন সে নয়, অন্যদিকে জুঁইকে ছেড়ে দিতে হবে। এখন ইলহাম কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না!

***

রিতু কাঁ'দ'ছে। একটু পর পর শরীরটা কাঁপছে তার। আলো দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে। এই মেয়েটা এভাবে কাঁ'দ'ছে কেন! এতো বড় সুসংবাদ পেয়েও কাঁ'দ'ছে কেন মেয়েটা!

সামিন নিজের বিছানায় গা এলিয়ে শুয়েছিলো। আলোকে দেখে দ্রুত উঠে বসে, তারপর বলে,"সরি! আমি উঠছি, তুমি বিশ্রাম নাও।"

আলো তার উত্তর না দিয়ে বলে,"আপনার ভাইয়ের বৌ কাঁদছে। আপনার চরিত্রবান ভাই একটা প্রে'গ'ন্যা'ন্ট মেয়েকে কষ্ট দিতে পর্যন্ত ছাড়ছে না। এখন আপনি কি বলবেন ইয়াসার মির্জা?"

সামিন হা হয়ে আলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর বলে,"রিতু কাঁদছে?"

_হু।

_কেন?

_আপনার ভাই তার এ'ব'র'শ'ন করাবে। তাকে একবছর রেখে তালাক দিয়ে পর'কীয়া প্রেমিকাকে বিয়ে করবে আপনার ভাই।

তেজী কন্ঠে আলো বলতে থাকে। সামিন বিছানা থেকে নেমে দ্রুত পায়ে হেঁটে ইলহামের ঘরের দিকে যায়।

রিতুকে ইশিতা ধরে রেখেছে। হুট করে সামিন ঘরে ঢুকে পরতেই রিতু চোখের পানি মুছতে ব্যাস্ত হয়ে পরে।

সামিন গম্ভীর কন্ঠে বলে,"মেয়েটি কে?"

রিতু চুপ করে থাকে। সামিন ধ'ম'ক দিয়ে বলে,"মেয়েটি কে রিতু!"

_এমপির ভাগ্নি। জুই।

কাঁপা কাঁপা গলায় বলে রিতু।

_আমার সাথে শুরুতেই তোমার বলা উচিত ছিলো রিতু।

আলো সামিনের দিকে তাকিয়ে বলে,"ভাইকে অ'ন্ধে'র মতো বিশ্বাস করা মানুষ কি করতো? রিতুকেই চুপ করিয়ে রাখতেন।"

সামিন আলোর দিকে একপলক তাকিয়ে ফোন বের করে ইলহামকে ফোন লাগায়। ওপাশ থেকে ইলহাম ফোনটা রিসিভ করতেই সামিন বলে ওঠে,"কোথায় তুই?"

ইলহাম আমতা আমতা করে বলে,"একটা কাজে এসেছি ভাইয়া। কেনো?"

_তুই যেখানেই থাকিস আগামী এক ঘন্টার মধ্যে আমার সামনে আসবি ইলহাম।

ইলহাম অবাক হয়ে বলে,"কেনো ভাইয়া?"

সামিন সে প্রশ্নের জবাব না দিয়ে ফোন কেটে দেয়। তারপর রিতুকে বলে,"এখানে বিশ্রাম করবে তুমি। ওদিকে যাই হয়ে যাক বের হবে না।"

***

ইলহাম চিন্তিত ভঙ্গিতে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। গাড়ি শান্তিনীড়ের ভেতরে প্রবেশ করলে গাড়ি থামিয়ে সে নেমে পরে। হেটে লিভিং রুম পেরিয়ে সোজা দোতলার সিঁড়ির দিকে যায়। দোতলার লিভিং রুমে সামিন দাঁড়িয়ে আছে। খানিকটা দূরে আলো এবং ইশিতা দাঁড়িয়ে। তাদের পাশেই ইশমাম।

ইলহাম এগিয়ে গিয়ে বলে,"ভাইয়া কি হয়েছে....."

সামিন কিছু না বলে স্ব-শব্দে ইলহামের গালে এক চ'ড় বসিয়ে দেয়।

সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ইমতিয়াজ মির্জা নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।

ইলহাম হতভম্ব ভাব নিয়ে বলে,"তুমি আমাকে মা'র'লে ভাইয়া?"

_জুইয়ের সাথে কি তোর?

ইলহামের মুখ শুকিয়ে যায় জুঁইয়ের নাম শুনে।

সামিন চেঁচাতে থাকে,"বলছিস না কেনো? জুঁইয়ের সাথে কি?"

_কিছু না ভাইয়া।

_কিছু না?

_না।

সামিন পুনরায় একটা চ'ড় বসিয়ে দেয় ইলহামের গালে। ইলহাম চেঁচিয়ে বলতে থাকে,"তুমি আমাকে সন্দেহ করে আমার গায়ে হাত তুলছো? তাও আমার ছোটো ভাই বোনের সামনে? তোমার বৌয়ের সামনে?"

_হ্যা তুলছি। তুই যা করেছিস তাতে এটাই তোর উপযুক্ত শা'স্তি।

ইলহাম আলোর দিকে একপলক তাকিয়ে ভাইকে বলে,"কে দিচ্ছে তোমায় এসব বুদ্ধি? ওই মেয়েটা তাই না? আসার সাথে সাথে ভাইয়ে ভাইয়ে সম্পর্ক ন'ষ্ট করে দেওয়ার ফ'ন্দি এঁটেছে।"

সামিন ইলহামের কলার ধরে বলে,"ও তোর ভাবী। সম্মান দিয়ে কথা বলবি।"

আলো সামিনের দিকে তাকায়। ইশমামও ভাইকে দেখে।

ইলহাম ভাইয়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ম্লান হাসে। তারপর নিজের কলার থেকে ভাইয়ের হাত ছাড়িয়ে দিতে দিতে বলে,"জুঁইয়ের সাথে আমার সম্পর্ক আছে। এবং আমি তাকে বিয়ে করবো।"

চেঁচিয়ে বলতে থাকে ইলহাম। নিজের ঘর থেকে ইলহামের সব কথা শুনছে রিতু‌‌। তার দু'চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় পানি গড়িয়ে পরছে।

সামিন একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে ইলহামকে ধা'ক্কা দিয়ে বলে,"বের হ এবাড়ি থেকে। এক্ষুনি!"

ইলহাম ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,"ভাইয়া!"

_আর কখনো যেনো আমি তোকে এই বাড়ির ত্রিসীমানায় না দেখি। এক্ষুনি বের হ।

ধা'ক্কা'তে ধা'ক্কা'তে ইলহামকে দোতলার সিঁড়ির কাছে নিয়ে আসে সামিন।

ইলহাম কন্ঠে তেজ নিয়ে বলে,"তুমি কে বের করার আমাকে?"

সামিন গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে,"আমিই সব। তুই বের হ ইলহাম।"

"তুমি আমার বাবাকে মা'র'ছো কেনো বড় বাবা? বাড়ি থেকে কেনো চলে যেতে বলছো?"

ইহান দূরে দাঁড়িয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে সামিনের দিকে। সামিন এগিয়ে গিয়ে ইহানকে কোলে তুলে নেয়। তারপর নরম গলায় বলে,"তুমি তোমার ফুপির কাছে যাও বাবা। এখানে বড়রা কথা বলছে।"

সামিন ইশিতার দিকে তাকাতেই ইশিতা এসে ইহানকে নিয়ে চলে যায়।

সামিন অগ্নি'দৃষ্টি দেয় ইলহামের দিকে। ইলহাম একপলক ইমতিয়াজ মির্জার দিকে তাকায় তারপর সামিনের দিকে তাকিয়ে বলে,"কি ভেবেছো তোমরা? তোমরা ছাড়া আমি অচল? আমার কোনো মুরোদ নেই? থাকবো না এই বাড়িতে আমি। সবসময় তোমার কথা শুনে চলতে হবে ভাইয়া? আমি কাউকে ভ'য় পাই না। থাকবো না এই বাড়িতে।"

ইলহাম হনহন করে সিঁড়ি ভে'ঙে নিচে নামে। সামিন তার যায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। একটু পরে ইলহামের গাড়ি স্টার্ট হবার শব্দ শোনা যায়। সামিন সোজা নিজের ঘরে চলে যায়। ইমতিয়াজ মির্জা তার ঘরে ঢোকে।

***

শান্তিনীড়ের পরিবেশ এখন থমথমে হয়ে আছে। রিতু নিজের ঘরে শুয়ে আছে চুপচাপ। কাঁদতে কাঁদতে শরীরটা তার নি'স্তে'জ হয়ে গিয়েছে। ইহান তার ফুপির কাছে। সামিন নিজের ঘরে ল্যাপটপে কিছু কাজ করছিলো। মেজাজ যথেষ্ট বি'গ'ড়ে রয়েছে তার। এখন অফিসের একাউন্ট্যান্টসকে মেসেজ করে দিচ্ছে ইলহামকে যাতে কেউ কোন টাকা না দেয়। কিছুক্ষণ পরে ল্যাপটপ বন্ধ করে বারান্দার দিকে তাকায় সে। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পরতে শুরু করেছে বাইরে। বারান্দায় আলোর শাড়িটা মেলে দেয়া ছিলো। শুকনো শাড়িটা এভাবে ভিজে যাবে দেখে সামিন এদিক ওদিক তাকায়। ঘরে আলো নেই। ল্যাপটপ সরিয়ে রেখে সে নিজেই উঠে পরে বারান্দায় যায় শাড়িটা তুলে নিতে। শাড়িটা দ্রুত তুলে নিতে গিয়ে হঠাৎ খেয়াল করলো কিছু একটা নিচে পরে গিয়েছে। সামিন নিচে তাকাতেই তার চোখ মুখ ফ্যা'কা'শে হয়ে যায় লজ্জায়। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পরছে,তার ভেতরেও কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে তার। বোকার মতো মেয়েদের জিনিসে হাত দেয়া তার উচিত হয়নি এভাবে। কিন্তু সে কিভাবে জানবে মেয়েরা শাড়ির নিচে তাদের ব্যাক্তিগত পোশাক শুকাতে দেয়। নিচে পরে থাকা বস্তুটার দিক থেকে চোখ সরিয়ে শাড়িটা জায়গা‌মতো রেখে দেয়। যার জিনিস সে এসে নিয়ে যাবে। ভিজুক।

সামিন শাড়িটা দড়িতে রেখে ঘুরে দাঁড়াতেই দেখে বারান্দার দরজার কাছে দাড়িয়ে আলো তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে মুখে ক্ষো'ভ। সামিন একটা ঢোক গিলে ফেলে। তার ৬ষ্ঠ ইন্দ্রীয় বলছে এক্ষুনি যু'দ্ধ লেগে যাবে।

হয়েছেও তাই। খুড়িয়ে খুড়িয়ে আলো এসে তার জিনিসপত্র তুলে নিয়ে সামিনের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে,"অ'স'ভ্য, অ'ভ'দ্র, জ'ঘ'ন্য,ফা'ল'তু লোক। কোন সাহসে আপনি আমার পোশাকে হাত দিয়েছেন। নূন্যতম কমনসেন্স নেই?"

সামিনের লজ্জার সীমা রইলো না। কেন যে সে আগ বাড়িয়ে শাড়িটা তুলতে এলো।

সে আলোকে সরি বলতে যাবে তার আগেই আলো তার দিকে এগিয়ে এসে তার বুকে এলোপাথাড়ি কি'ল ঘু'ষি মে'রে চেঁচাতে থাকে,"অ'স'ভ্য লোক,কোন সাহসে আমার জিনিসে হাত দিয়েছেন। জ'ঘ'ন্য লোক কোথাকার। ফা'ল'তু লোক!"

সামিন আলোর দিকে তাকিয়ে আছে। ভীষণ ক্ষে'পে গিয়েছে মেয়েটা। সে নরম গলায় বলে,"মারছো কেনো আমাকে আলো। আমি বুঝতে পারিনি। দেখছিলাম তোমার শাড়িটা ভিজে যাচ্ছে তাই....."

আলো সামিনের কোনো কথা শোনে না। একটা ধাক্কা দিয়ে সে নিজের পোশাক নিয়ে ঘরের ভেতর চলে যায়। রা'গে তার গা কাঁপছে।

সামিন বোকার মতো এদিক ওদিক তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলে ওঠে,"আমার দোষ টা কোথায়?"

আলো তার পোশাক আলমারিতে তুলে রেখে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। সামিন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,"যুগে যুগে ভদ্রলোকেরাই দোষের ভাগীদার হয়েছে। এটা আবারো প্রমানিত!"

হঠাৎ তার ফোন বেজে ওঠে। ফোনের স্ক্রিনে ফুয়াদের নাম্বার দেখে ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে, ফুয়াদ বলে,"একবার বটতলা আসবি? আড্ডা দিতাম।‌ কি করছিস তুই?"

_বৌয়ের হাতে মা'র খেলাম।

_মানে?

_মানে এতদিন সবকিছু গালাগাল পর্যন্ত ছিলো,আজ গায়ে হাত তুললো। উপকার করতে গিয়ে আজ এত্তোবড় একটা বাঁশ খেয়েছি।

চলমান.......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন