ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগলো চোখে

২৫তম পর্ব

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে

#পর্বসংখ্যা_২৫

#Esrat_Ety

ইলহামকে দেখে দরজা থেকে জুঁই সরে দাঁড়ায়। ইলহাম ক্লান্ত ভঙ্গিতে ভেতরে ঢোকে। তার মাথাটা ভীষণ ধরেছে। সোজা গিয়ে জুঁইয়ের বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পরে সে। জুঁই দরজা বন্ধ করে ইলহামের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে,"গিয়ে আবার ফিরে এলে যে, কি হয়েছে বাড়িতে, তোমার ভাই কেনো ডেকেছিলো?"

_বাড়ি থেকে লা'থি মে'রে বের করতে ডেকেছিল।

নিচু স্বরে বলে ওঠে ইলহাম।

জুই বিছানার একপাশে বসে চাপা স্বরে চেঁচিয়ে বলে ওঠে,"হোয়াট!"

_বের করে দিয়েছে বাড়ি থেকে।

জুঁইয়ের মুখে হাসি ফোটে। সে নিজের খুশি প্রকাশ না করে বলে,"দিক। যেয়ো না আর ও বাড়িতে! তোমার সম্পত্তি তুমি বুঝে নিয়ে ওদের সাথে সম্পর্ক শেষ করে দাও‌।"

ইলহাম চিৎ হয়ে শুয়ে জুঁইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,"সম্পত্তি? কিচ্ছু পাবো না আমি,ভাইয়া সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছে।"

জুই যেন আকাশ থেকে পরলো। হতবাক হয়ে বলে,"মানে টা কি?"

ইলহাম জুঁইয়ের কথার উত্তর না দিয়ে কন্ঠে এক রাশ হতাশা নিয়ে বলে ওঠে,"ইহানের জন্য কষ্ট হচ্ছে খুব। ওর কথা মনে পরছে। রাগের মাথায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছি,এখন যাবো কি যাবো না ভাবছি।"

জুই প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে যায়। সে তার বিরক্তি প্রকাশ না করে বলে,"এখন? তোমাকে বলেছে সম্পত্তি দেবে না আর তুমি মেনে নিলে? অদ্ভুত!"

ইলহাম উঠে বসে, জুঁইয়ের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত ভঙ্গিতে বলে,"আমি আমার ছেলেটার জন্য কষ্ট পাচ্ছি আর তুমি সম্পত্তি নিয়ে পরে আছো? আচ্ছা একটা কথা বলো তো জুঁই আমাকে নাকি আমার সম্পত্তিকে,কোনটাকে তুমি বেশি প্রায়োরিটি দাও?"

জুই থতমত খেয়ে বলে,"অবশ্যই তোমাকে। আমি তো তোমার ভালোর জন্য বলছিলাম।"

_আমাকে যদি প্রায়োরিটি দিতেই তাহলে আমার সন্তানকেও প্রায়োরিটি দিতে, তোমার কন্ঠে সবসময় ইহানের জন্য তুচ্ছ তাচ্ছিল্য দেখি। এসব আমি বরদাস্ত করবো না জুঁই।

জুই নরম সুরে বলে,"তুমি ভুল ভাবছো ইলহাম। আই এ্যাম সরি।"

ইলহাম বলে,"ঠিকাছে, আমার মাথাটা বেশ ব্যাথা করছে। চুল গুলো একটু টেনে দাও মাথার। কপাল টা একটু মাসাজ করে দাও।"

জুই একবার নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে ইলহামের দিকে তাকিয়ে আহ্লাদী গলায় বলে,"আমি এই মাত্র নেইলপলিশ লাগিয়েছি ইলহাম। তোমাকে ওষুধ এনে দেই মাথা ব্যাথার?"

ইলহাম জুঁইয়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে,"কিছু লাগবে না। তুমি আমার সামনে থেকে যাও!"

***

"বড় বাবা"

ইহানের ডাকে সামিন পিছু ফিরে তাকায়। ইহান তার কাছে এগিয়ে আসে। সামিন ইহানকে কোলে তুলে নিয়ে বলে,"কি হয়েছে বাবা?"

_বাবা কখন আসবে বড় বাবা? বাবাকে কেনো বের করে দিলে বাড়ি থেকে?

সামিন কিছুক্ষণ ইহানের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর বলে,"তুমি যখন কোনো দুষ্টুমি করো তখন তোমার টিচার তোমাকে কিছু সময়ের জন্য ক্লাসরুমের বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখে না ?"

ইহান মাথা নাড়ায়। সামিন বলে,"তোমার বাবাও একটু দুষ্টুমি করেছে তাই তাকে একটু খানি শা'স্তি দিয়েছি।"

_বাবা কি দু'ষ্টু'মি করেছে? কারো পেন নিয়ে নিয়েছে? কাউকে খুঁ'চি'য়ে'ছে?

সামিন মাসুম বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে আছে। সে কি উত্তর দেবে? ইশিতা এসে দাঁড়ায় সেখানে। ইহানকে বলে,"চলো আমার ঘরে চলো। আমার কাছে ঘুমোবে আজ।"

_আমি মাম্মার কাছে ঘুমাবো।

সামিন ইহানের গালে হাত রেখে বলে,"মাম্মা অ'সু'স্থ সোনা। তুমি ফুপির সাথে যাও প্লিজ।"

ঘরে ঢুকে একটা দৃশ্য দেখে সামিন থ'ম'কে যায়। আলো জায়নামাজে বসে আছে।

সামিন দাঁড়িয়ে থাকে। সামনে যে দৃশ্যটি সে দেখছে এটা সম্ভবত তার দেখা সবচেয়ে সুন্দর এবং চক্ষুশীতল করা একটা দৃশ্য। মাকেও সে এভাবে জায়নামাজে বসে থাকতে দেখতো। মায়ের চুড়ি পরা হাতে যে মেয়েটি মোনাজাত ধরে আছে, তার হাত দুটো অবিকল সামিনের মায়ের মতো, গোলগাল। মনে হচ্ছে সামিনের মা হোসনে আরা শান্তিই মোনাজাত ধরে বসে আছে। মাথায় তার লম্বা একটা ঘোমটা।

দীর্ঘসময় সামিন আলোকে দেখতে থাকে। নামাজ শেষ হলে আলো জায়নামাজ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে জায়নামাজ ভাঁজ করে ঘুরে দাড়াতেই দেখে সামিন তার দিকে তাকিয়ে আছে।

"এতক্ষণ ধরে কি বলছিলে মোনাজাতে আছিয়া? ফে'রা'উ'নে'র মৃ'ত্যু কামনা করছিলে?"

আলো কয়েক মূহুর্ত সামিনের দিকে তাকিয়ে জায়নামাজ তুলে রাখতে যায়,সামিন হাত বাড়িয়ে আলোর পথ আটকে দেয়। আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,"বলো না কি বলছিলে মোনাজাতে?"

"ভাইয়া আসবো?"

রিতু দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। সামিন রিতুর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নরম গলায় বলে,"এসো।"

রিতু ধীরপায়ে হেটে ভেতরে ঢোকে। সামিন রিতুকে বলে,"ডাক্তার ডাকতে হবে তোমার জন্য?"

রিতু মাথা নাড়ায়। সামিন বলে,"ঠিকাছে। বসো এখানে‌ । বলো কেনো এসেছো?"

রিতু একটা চেয়ারে বসে মাথা নিচু করে রেখেছে। সামিন বলে,"বলো কেনো এসেছো! কি হয়েছে রিতু?"

রিতু কাঁপা কাঁপা গলায় বলে ওঠে,"ওনাকে বাড়িতে আনুন ভাইয়া।"

সামিন রিতুর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে,"না।‌"

রিতু আমতা আমতা করে বলে,"এভাবে তো ভাইয়া কোনো সমাধান হয় না, তাইনা?"

আলো বলে ওঠে,"এই যে মির্জা বাড়ির লক্ষী মেজো বৌমা। তোমাকে আল্লাহ তায়ালা কি দিয়ে গড়েছে একটু বলবে?"

রিতু আলোর দিকে একপলক তাকিয়ে মাথা নিচু করে বলে,"এভাবে কি আমার প্রতি ওনার ভালোবাসা জন্মে যাবে ভাইয়া? আপনি ওনাকে ডেকে আনুন। আমার ওনার প্রতি কোনো অভিযোগ নেই।"

সামিন রিতুর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। রিতু বলতে থাকে,"বাচ্চাটা জন্মালে আমি আপনাদের বাড়ির বংশধরদের আপনাদের হাতে তুলে দিয়ে চলে যাবো। আপনার ভাই স্বামী হিসেবে যেমন হোক না কেনো,সে বাবা হিসেবে অনন্য। তার প্রতি আমার কোনো রা'গ নেই।"

_বাজে না বকে যাও রিতু। তুমি বিশ্রাম নাও।

_ভাইয়া এতোটা বাধ্য থেকেও তার মনে যায়গা করে নিতে পারিনি,তার মানে আমি সত্যিই অযোগ্য। ওনাকে আপনি বাড়িতে ডাকুন। আমিই বাচ্চা জন্মালে চলে যাবো। তারপর উনি ওনার বাচ্চাদের নিয়ে পছন্দের নারীর সাথে সুখে থাকুক।

সামিন রিতুর দিকে তাকিয়ে বলে,"খুব স্বামীর ঘর ছাড়ার কথা বলছো যে, এসব নিজের বড় জায়ের বুদ্ধিতে করছো নাকি? তোমরা বুদ্ধি করে চলে যাচ্ছো সবাই?"

আলো সামিনের দিকে তাকায়। সামিন আলোকে শুনিয়ে শুনিয়ে রিতুকে বলে,"স্বামীর ঘর ছাড়াও কোনো সমাধান না। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক জন্ম জন্মান্তরের সম্পর্ক। স্বামী খা'রা'প হলে তাকে শুধরে নিতে হয়। নয়তো নারী কেনো বলা হয়েছে তোমাদের?"

আলোর ইচ্ছে করছে সামিনকে কঠিন কিছু কথা শুনিয়ে দিতে, কিন্তু সে চুপ থাকে। রিতু সামিনকে বলে,"কিভাবে শোধরাবো ভাইয়া? শোধরানোর হলে তো ইহানের জন্মের পরেই শুধরে যেতো।"

সামিন রিতুর মাথায় হাত রাখে,নরম গলায় বলে,"তুমি এই বাড়িতে আসার পর থেকে আমি জেনেছি আমার একটা বোন না, দুটো বোন। বোনের মতো সবসময় খেয়াল রেখেছো আমার। আমার ওপর ভরসা রাখো। আমি আমার বোনের সংসার এভাবে শেষ হতে দেবো না। ওকে না'কা'নি'চো'বা'নি খাইয়ে তবে এ বাড়িতে আনবো। একটু ভুগতে দাও। তোমার গুরুত্ব বুঝতে দাও। আর ঐ মেয়েরও ব্যাবস্থা করবো আমি। ভরসা করো তো আমায়? করো না?"

রিতু মাথা নাড়ায়। সামিন বলে,"গিয়ে রেস্ট নাও। যাও।"

রিতু চোখের পানি মুছে উঠে দাঁড়ায়। আলো রিতু আর সামিনকে দেখে। রিতুর প্রতি সামিনের অগাধ সহানুভূতিকে সে বিচার করতে পারছে না। কখনো মনে হচ্ছে সামিন হয়তো এমনই, আবার হুট করেই মনে পরে গেলো রিতু তার বংশের বংশোধর জন্ম দিয়েছে, শুধুমাত্র এই একটা কারনেই রিতুর প্রতি এতটা নরম ভাব দেখাচ্ছে সে! নয়তো ঐ লোকটা তো সামিন ইয়াসার, একটা পি'শা'চ।

রিতু চলে যেতেই সামিন ঘুরে আলোর দিকে তাকায়। আলো চোখ সরিয়ে নিয়ে বিছানায় ঘুমানোর প্রস্তুতি নেয়।

বিছানা থেকে একটা বালিশ তুলে নিয়ে ডিভানে রেখে আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,"মশারী টাঙিয়ে নাও। খুব মশা পরছে। আশেপাশে সর্বত্র ডেঙ্গু।"

আলো একপলক সামিনের দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁ'চ'কে বলে ওঠে,"শহরের মেয়র শহরে মশা নিধনের ওষুধ দেওয়ার ব্যাবস্থা না করে গু'ন্ডা'মি করে বেড়ায়, ওমুককে উচিত শিক্ষা দেয়, তমুকের থেকে প্র'তি'শো'ধ তোলে, ওমুকের মেয়েকে তুলে এনে বিয়ে করে, তমুকের জমি দখল করে বেড়ালে শহরে ডেঙ্গুর প্রকোপ তো বাড়বেই।"

সামিন আলোর দিকে তাকিয়ে থাকে কয়েক মূহুর্ত তারপর গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে,"মেয়র তার সব দায়িত্ব পালন করেছে। তারপরও জনগণের সচেতন থাকা জরুরি। মশারী না টাঙিয়ে সবটা মেয়রের ভরসায় ফেলে রাখলে তো চলে না। মেয়র কি বাড়ি বাড়ি গিয়ে জনগণের মশারী টাঙিয়ে দিয়ে আসবে এখন?"

আলো চুপ করে থাকে। সামিন আলমারি থেকে মশারী বের করে সেটা টাঙিয়ে দিতে যায়। আলো সামিনের সামনে দাঁড়িয়ে বলে,"প্রয়োজন নেই। নিয়ে যান এটা এখান থেকে, আমি মশারীর ভেতরে ঘুমাতে পারি না।"

সামিন আলোর কথা না শুনে মশারী টাঙাতে থাকে। আলো সামিনের হাত থেকে মশারী টেনে নিয়ে নেয়, চেঁচিয়ে বলে,"বললাম না প্রয়োজন নেই?"

সামিন আলোর দিকে তাকিয়ে মশারী টেনে নেয়‌ । আলোও তেজ দেখিয়ে নিজের দিকে টানতে থাকে। এক পর্যায়ে সামিন গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে,"শক্তি দেখাচ্ছো? একটা তুলে আ'ছা'ড় মারবো অবাধ্য মেয়ে।"

_এসব যত্নবান স্বামী হবার নাটক করে আপনার প্রতি আমার অনুভূতি বদলাতে চান? আমি রিতুর মতো মেয়ে নই ইয়াসার মির্জা। কাজ হবে না।

সামিন কয়েক মুহূর্ত আলোর দিকে তাকিয়ে থেকে টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা কাঁচি নিয়ে এসে মশারীটাকে টুকরো টুকরো করে কে'টে ফেলে। আলো দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দেখে। তারপর বিছানায় গিয়ে শুয়ে পরে। সামিন উঠে দাঁড়িয়ে গিয়ে ডিভানে উপুড় হয়ে শুয়ে পরে। রাগে তার কপালের দুপাশের রগ দপদপ করছে।

***

মাথাটা ছিঁ'ড়ে যাচ্ছে ইলহামের। জ্বর এসে গিয়েছে। বিকেল থেকে যখন মাথা ব্যথা করছিলো তখনই সে টের পেয়েছে জ্বর আসতে চলেছে। শরীরের সর্বত্র য'ন্ত্র'না করছে। একটু স্বস্তি পাচ্ছেনা সে। ইহানের সাথে কথা বলতে বেশ কয়েকবার ফোন করেছিলো ইশিতার কাছে। ইশিতা ফোন ধরেনি। বাড়ির কেউই ফোন ধরবে না সে জানে। বাধ্য হয়ে পোনা চাচার নাম্বারে ফোন করে জেনে নিয়েছে ইহানের খবর, রিতুর খবরও জানতে চেয়েছিলো। কেনো জানতে চেয়েছিলো তা ইলহাম বুঝতে পারছে না,রিতুর পেটে তার সন্তান শুধুমাত্র সেজন্যই কি?

ইলহাম সেদিনের কথা মনে করতে থাকে। বাবা মা জোর করে একটা গ্রামের সদ্য ক্লাস টেনে পড়ুয়া মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিলো। মা বাবার ধারণা ছিলো সুন্দরী,নামাজী, অল্পবয়সী বৌ পেলে ব'খে যাওয়া ইলহাম শুধরে যাবে। কিন্তু লাভের লাভ কিছু হয়নি বরং একটা প্রানবন্ত ফুটফুটে ফুলে কালসিটে পরেছে তার মতো অ'মা'নু'ষে'র হাতে পরে। বিয়ের প্রথম দিন থেকে মাগনা গৃহপরিচারিকা এবং যৌ'ন'দা'সী হিসেবেই ট্রিট করে এসেছে মেয়েটিকে। কখনো উঁচু গলায় কথা বলে প্রতিবাদ পর্যন্ত করেনি মেয়েটি। পেটে ইলহামের দু- দুটো সন্তান ধরেও ফিরে যেতে হবে খালি হাতে, মাঝখানে স্বামীর ভালোবাসা কি সেটাই কখনো বুঝলো না।

কিছুক্ষণ এসব কথা ভেবে ইলহাম চোখ বন্ধ করে ফেলে। জ্বরের তী'ব্র'তা বাড়ছে। ইলহাম খেয়াল করেছে অসুখ বিসুখ হলেই সে ভীষণ অপরাধ বোধে ভুগতে থাকে। সুস্থ থাকলে অ'মা'নু'ষ হয়ে যায়। ক'ষ্ট দেয় একটা ফুলকে। জ্বরের ঘোরে বিড়বিড় করে বলে ওঠে,"জ্বর থাকুক। আজীবন থাকুক।"

মাথা ঘুরিয়ে সে তার পাশে ঘুমিয়ে থাকা জুঁইকে দেখে। একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে মৃদু স্বরে ডেকে ওঠে,"জুঁই।"

ঘুমের মধ্যে "হু" বলে সাড়া দেয়। ইলহাম বলে,"জ্ব'র টা একটু মেপে দেখবে?"

জুই উঠে বসে, চোখ ডলতে ডলতে উঠে গিয়ে থার্মোমিটার নিয়ে এসে ইলহামের কপালে ধরে। জ্বর একশো দুই।

ইলহাম কিছুক্ষণ জুঁইয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,"আমি বাড়ি যেতে চাই। এক্ষুনি। এই মুহূর্তে।"

***

গাড়ি থামিয়ে ইলহাম নেমে পরে। সে ঠিকমতো দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। মনে হচ্ছে এক্ষুনি পরে যাবে। রিয়াজ গেইট বন্ধ করে ছুটে এসে বলে,"আপনাকে ধরবো ভাইয়া?"

ইলহাম নিষেধ করে। কলিং বেল টিপে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। সিতারা এসে দরজা খুলে দেয়। রাত তিনটার সময় ইলহামকে দেখে সিতারা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। ইলহাম তাকে পাশ কাটিয়ে টলতে টলতে সিঁড়ির দিকে যায়। ফুলির মা এসে সিতারাকে ফিসফিসিয়ে বলে,"নে'শা করছে নাকি!"

_কি জানি!

_তাহলে আজ বড় ভাইজান একে মে'রে'ই ফেলবে।

দরজায় ঠক ঠক আওয়াজ হয়। রিতু ভাবলো ইশিতা হয়তো ইহানকে দিতে এসেছে। অসুস্থ শরীর নিয়ে বিছানা থেকে নেমে গিয়ে দরজার সিটকিনি খুলে দেয়। দরজা খুলে সে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে‌‌। ইলহাম লাল দুটো চোখ নিয়ে রিতুর দিকে তাকিয়ে আছে। কয়েক মুহূর্ত রিতু নিজের স্বামীর দিকে তাকিয়ে থেকে তার কপালে হাত ছোঁ'য়া'য়। ইলহাম তার স্ত্রীকে দেখতে থাকে। খুবই নিচু স্বরে রিতু বলে ওঠে,"আপনার গায়ে তো বেশ জ্ব'র।"

ইলহাম "হু" বলে ধীরপায়ে হেটে বিছানার দিকে যায়। তারপর ধপ করে বিছানায় উ'পু'ড় হয়ে শুয়ে পরে। রিতু এগিয়ে গিয়ে বলে,"ওষুধ খেয়েছেন? গা তো জ্ব'রে পু'ড়ে যাচ্ছে।"

ইলহাম কোনো উত্তর দেয়না। থার্মোমিটার দিয়ে জ্বর মেপে দেখে একশো তিনের একটু উপরে। এক্ষুনি জ্বর নামানো প্রয়োজন। রিতু প্রায় ছুটে ঘর থেকে বের হয়ে দাঁড়িয়ে পরে, সামিনকে ডাকা যাবে না, ভাইয়া যদি ইলহামকে দেখে রেগে যায়! রিতু নিজেই একটা বাটিতে পানি এনে ইলহামের মাথায় জলপট্টি দিতে থাকে। ইলহাম চোখ পিটপিট করে রিতুর দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে ওঠে,"দিও না এসব। প্রয়োজন নেই।"

রিতু ইলহামের কোনো কথার জবাব না দিয়ে চুপচাপ নিজের কাজ করতে থাকে। কিছুক্ষণ পরে রিতু বলে ওঠে,"আপনার প্রেমিকা কেনো করে না এসব?"

_সে তো আর আমাকে বিয়ে করে,আমার বাচ্চা পেটে ধরে আটকে যায়নি তোমার মতো। তোমার মতো বেহায়া নয়।

রিতু ইলহামের দিকে তাকায়। ইলহাম নিচু স্বরে বলে,"ইহান কোথায়?"

রিতু বিছানা থেকে নামতে নামতে বলে,"আপুর ঘরে,আমি নিয়ে আসছি।"

ইলহাম রিতুর হাত টেনে ধরে। রিতু বসে পরে, ইলহামের দিকে তাকাতেই ইলহাম বলে,"দরকার নেই। তুমি দরজা বন্ধ করে এসো। আমি ঘুমাবো।"

ধীরে ধীরে নেমে রিতু দরজা বন্ধ করে ইলহামের পাশে গিয়ে বসে। ইলহাম কাঁপা কাঁপা একটা হাত রিতুর দিকে এগিয়ে দিয়ে তার পেটে হাত রাখে। রিতু চ'ম'কে উঠে তাকায় তার স্বামীর দিকে। ইলহাম নরম গলায় বলে,"আমি এই বাচ্চাটা চাই।"

_জানি। আপনি শুধু আমাকেই চান না।

ঠান্ডা গলায় বলে রিতু। তার কন্ঠে না ছিলো কোনো ক্ষো'ভ,না ছিল কোনো হতাশা।

ইলহাম কিছু না বলে একটা ম্লান হাসি হেসে দেয়। তারপর দু'চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে চুপচাপ।

***

ফ্রেশ হয়ে নিচে নামতেই ফুলির মায়ের কাছে ইলহামের বাড়িতে আসার খবর পেয়ে ক্ষে'পে যায় সামিন। রে'গে'মে'গে দোতলায় চলে গিয়ে দরজা ধাক্কাতে থাকে। কিছুক্ষণ পরে রিতু দরজা খুলে দিয়ে সামিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। সামিন বিছানায় শুয়ে থাকা ইলহামকে একবার দেখে রিতুকে ধ'ম'ক দিয়ে বলে,"কেনো ঢুকতে দিলে ওকে ঘরে? তোমাকে নিষেধ করেছিলাম না?"

পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকতে ঢুকতে বলে,"নে'শা করেছে নাকি বে'য়া'দ'ব টা।"

রিতু সামিনের হাত টেনে ধরে। সামিন রিতুর দিকে তাকায়। রিতু বলে,"ওনার গায়ে খুব জ্ব'র ভাইয়া। সারারাত ছ'ট'ফ'ট করেছে জ্বরে। এই মাত্র ঘুমিয়েছে। দয়া করে কিছু বলবেন না।"

***

দুপুর নাগাদ ইলহামকে হসপিটালে এডমিট করা হয়। জ্বরে অচেতন হয়ে গিয়েছিলো সে। রিতু এবং ইশিতা তার সাথে হসপিটালে আছে।

বিকেলের দিকে টেস্টে ধরা পরে ইলহাম ডেঙ্গু পজিটিভ। তাকে স্পেশাল কেয়ার ইউনিটে শিফট করা হয়। অবস্থা খুবই গু'রু'ত'র।

বাড়িতে এসে সামিন পুরো বাড়িতে অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতা খেয়াল করে। ফুলির মা এবং সিতারাকে ডাকতে থাকে সে। কেউ কোনো সাড়া দেয়না। দোতলা থেকে ইশমাম নেমে আসে। সামিন ইশমামের দিকে তাকিয়ে বলে,"কোথায় যাচ্ছিস?"

_হসপিটালে। আমি গিয়ে ইশিতা আর ভাবীকে পাঠিয়ে দেবো। ভাবীও তো অসুস্থ।

_ফুলির মা আর সিতারা কোথায়?

_ফুলির বাবা অসুস্থ,তাই ফুলির মা চলে গিয়েছে। সিতারা নিজেই অসুস্থ। আমি দু'জনকে ছুটি দিয়েছি।

সামিন চিন্তিত ভঙ্গিতে বলে,"কি একটা মুশকিল হয়ে গেলো! ইহানকে কে সামলাবে! বাড়িতে কোনো মেয়ে মানুষ নেই!"

_কেনো, তোমার বৌ!

ঠান্ডা গলায় বলে ইশমাম। সামিন ম্লান হেসে বলে,"হু, তাহলে তো হতোই।"

ইশমাম বলে,"ইহানকে তোমার থেকে ভালো কেউ সামলাতে পারবে না ভাইয়া। ওকে তুমি দেখো। আমি যাচ্ছি। অসুবিধা হলে ফোন দেবো‌।"

ইশমাম চলে যায়। সামিন ধীরপায়ে হেটে ইমতিয়াজ মির্জার ঘরের কাছে দাঁড়িয়ে পরে। ঘরের ভেতর ইমতিয়াজ মির্জা ইহানকে বই পড়ে শোনাচ্ছে। সামিন তদের বিরক্ত না করে নিজের ঘরে চলে আসে। দরজার নব ঘোরার শব্দ হতেই আলো নড়েচড়ে বসে। সে একটা বই পড়ছিলো। সামিন ঘরে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে আলোর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। আলোর দিকে একটা প্যাকেট এগিয়ে দিয়ে বলে,"এটা নাও।"

আলো কপাল কুঁ'চ'কে প্যাকেটটার দিকে তাকিয়ে বলে,"কি এটা?"

_তোমার জন্য একটা ফোন। বাবা মায়ের সাথে কথা বলবে।

_আর মাত্র উনিশ দিন আছি এই বাড়িতে। উনিশ দিনের জন্য কোনো ফোনের দরকার নেই আমার।

সামিন আলোর দিকে শীতল দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ করে প্রচন্ড রা'গ হচ্ছে আলোর উপরে‌। ঔদ্ধত্যের একটা সীমা থাকে! এই মেয়েটা দিনকে দিন সেটা ক্রস করে ফেলেছে। এত ক্ষমা চাইবার পরেও একটু নরম হবার নাম নেই।

সামিন ফোনটা বিছানার ওপর ফেলে রেখে আলোকে হতবাক করে দিয়ে আলোর হাত ধরে বলে,"চলো।"

আলো বলে,"কোথায়?"

_আগামী উনিশ দিন তো তুমি আমার বৌ? তো আগামী উনিশ দিন তুমি আমার সংসার সামলাবে।

_মানে?

হ'ত'ভ'ম্ব হয়ে যায় আলো। সামিন দাঁতে দাঁত চেপে বলে,"রান্না করবে। চলো রান্না ঘরে।"

আলো অবাক চোখে সামিনকে দেখছে। সামিন আলোকে টানতে টানতে নিচতলার রান্নাঘরে নিয়ে আসে। আলো অবাক চোখে শুধু সামিনকেই দেখছে। সামিন গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে,"ফ্রিজে মাছ,মাংস, সবজি সব আছে। এমন কোনো রন্ধন সামগ্রী নেই যেটা এই রান্নাঘরে পাবে না। তুমি খুজে খুজে বের করে রান্না করবে। ইহানের জন্য সবজি দিয়ে খিচুড়ি, মুরগির মাংস, আমার বাবার জন্য অল্প মশলা পাতি দিয়ে একটা সবজি, তোমার এবং আমার দুজনের জন্য সাদা ভাত এবং যেকোনো একটা মাছ।"

আলো সামিনের দিকেই তাকিয়ে আছে। সামিন আলোর দিকে খানিকটা ঝুকে বলে,"তোমার হাতে সময় সাড়ে তিন ঘন্টা। প্রচুর সময়। কাজে লেগে পরো‌। আর হ্যা, যদি আজ এসব করতে না পারো তাহলে উনিশ দিন পর আমাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভুলে যাও। এমন ভাবে এই বাড়িতে আটকে দেবো কখনো যেতে পারবে না আমাকে ছে'ড়ে।"

সামিনের কন্ঠে কিছু একটা ছিলো। আলো ঘা'ব'ড়ে যায়। সামিন আলোর চোখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চলে যায় নিজের ঘরে।

আলো থম মে'রে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে,একবার চুলা, একবার ফ্রিজের দিকে তাকায়। তার মাথা ঘুরছে।

***

ঘরে ঢুকে দেয়ালে হাত দিয়ে চা'প'ড় মেরে বিছানার উপর গিয়ে বসে পরে সে। ধীরে ধীরে নিজের রা'গ'টা'কে নিয়ন্ত্রণ করে চুপচাপ বসে থাকে। দীর্ঘসময় পরে তার আলোর জন্য খারাপ লাগতে শুরু করে। এমন ব্যাবহার করাটা উচিত হয়নি। মেয়েটার এমনিতেই পায়ে চোট। কিন্তু কেন আলো এখনো এমন করছে ! এতটাই ঘৃন্য নাকি সামিন!

একটু নরম কেনো হচ্ছে না!

ফুয়াদের ফোন আসে। রিসিভ করবে না ভেবে আবার রিসিভ করে। ফুয়াদ ওপাশ থেকে বলে ওঠে,"ইলহামের কি অবস্থা?"

_স্পেশাল কেয়ার ইউনিটে শিফট করা হয়েছে।

_আচ্ছা আমি যাচ্ছি। তুই কি করছিস?

সামিন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে এই মাত্র ঘটে যাওয়া ঘটনা বিস্তারিত বলতে থাকে।

ফুয়াদ সবটা শুনে বলে,"আমি জানতাম। তুই সামিন ইয়াসার মির্জা। তোর ধৈর্য হবে না। নারীর মন পেতে সাধনা করবি তুই? তাহলে তো হলোই। তুই এইমাত্র যেটা করলি তাতে ওর মনে তোর জন্য অনূভুতি পরিবর্তন হওয়া তো দূরে থাক তোর প্রতি রা'গ আরো বাড়িয়ে দিয়েছিস। এখন গিয়ে সরি বলে নিয়ে আয়। যা।"

সামিন ফোন কে'টে কিছুক্ষণ থম মে'রে বসে থাকে। তারপর উঠে নিচে চলে যায়।

আলো বিরস মুখে খুন্তি নে'ড়ে পাতিলে মশলা কষাতে থাকে। মনে মনে যত ধরনের গা'লা'গা'ল রয়েছে সব সামিনকে দিয়েছে সে। মশলা কষানো হয়ে গেলে একটা প্যাকেট হাতে তুলে নেয়।

"কি মেশাচ্ছো ওটা?"

সামিন পেছন থেকে বলে। তার দৃষ্টি আলোর হাতের দিকে। আলো ঘুরে দাঁড়িয়ে সামিনের দিকে তাকায় তারপর তার হাতের প্যাকেটের দিকে তাকায়। সামিন বলে,"কি মেশাচ্ছিলে? বি'ষ জাতীয় কিছু?"

আলো থমথমে মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সামিন আলোর দিকে এগিয়ে এসে বলে,"মানুষ যদি গরু ছাগলের সাথেও বসবাস করে দীর্ঘদিন তাহলে তাদের প্রতি মায়া জন্মে মানুষের। আমার প্রতি তোমার জন্মালো না। এখন বি'ষ খাইয়ে মারতে চাইছো আমাকে? এ যুগের আছিয়া গুলো এতো নিষ্ঠুর কেনো!"

আলো চোখ তুলে সামিনের চোখে চোখ রেখে ঠান্ডা গলায় বলে,"টেস্টিং সল্ট। তরকারির স্বাদ বাড়াতে দিচ্ছিলাম। আমার রান্নার হাত বাজে। খেতে পারতেন না কেউ।"

সামিন আলোর দিকে একপলক তাকিয়ে উচ্চশব্দে গা দুলিয়ে হাসতে থাকে। দীর্ঘ সময় পরে হাসি থামিয়ে বলে,"আই নো ওটা কি। তোমাকে ভ'ড়'কে দিতে মজা করছিলাম। তুমি ঘরে যাও, যাও এক্ষুনি। ফ্রিজে সব রান্না করা আছে। গরম করে নিলেই হয়ে যাবে।"

চলমান......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন