ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগলো চোখে

২৬তম পর্ব

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে

#পর্বসংখ্যা_২৬

#Esrat_Ety

ট্রিটমেন্ট চলছে ইলহামের। রিতু,ইশিতা,সামিন, ইশমাম পালা করে গিয়ে হসপিটালে থেকেছে। অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে।

একসপ্তাহ পরে ইলহাম পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেলে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। সবকিছু আগের মতো স্বাভাবিক। ইলহাম সামিনের মুখোমুখি হয়নি। সামিন ও জুঁইয়ের বিষয়ে ইলহামের সাথে কোনো কথা বলেনি। সে অপেক্ষা করছে ইলহামের সুস্থতার জন্য। এর একটা হেস্তনেস্ত সে অবশ্যই করে ছাড়বে!

একটা গ্লাসে খানিকটা ফলের রস নিয়ে রিতু ঘরে ঢোকে। ইলহাম বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে ছিলো। রিতু বিছানায় একপাশে বসে হাতের গ্লাসটা ইলহামের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,"এটা খেয়ে নিন।"

ইলহাম একপলক রিতুর হাতের গ্লাসটার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলে ওঠে,"আমার থেকে এটা তোমার বেশি প্রয়োজন। তুমি খেয়ে নাও, তারপর আমার জন্য নিয়ে এসো।"

রিতু না'ছো'ড়'বা'ন্দা মেয়ে। সে গ্লাসটা বাড়িয়ে ধরে রেখেছে। ইলহাম হাসি দিয়ে গ্লাসটা নিয়ে অর্ধেকটা খেয়ে গ্লাসটা রিতুর দিকে দিয়ে বলে,"তুমি খেয়ে নাও বাকি টা।"

রিতু মাথা নাড়ায়।

ইলহাম বলে,"কেনো? আমার উচ্ছিষ্ট খেতে তো আগে অসুবিধা হয়নি। এখন খেতে চাইছো না কেনো? খুব আত্মসম্মান হয়েছে? বড় ভাবীর মতো হতে চাইছো?"

রিতু ইলহামের দিকে একপলক তাকিয়ে গ্লাসটা খালি করে রেখে দেয়। তারপর নিচু স্বরে বলে,"প্রায় দশ বারো দিন ধরে আপনি হসপিটালে। এর মাঝে ঐ মেয়েটার সাথে আপনার একদিনও দেখা হয়নি। আগে তো প্রতিদিন দেখা না করে থাকতে পারতেন না। আপনি চাইলে বাড়িতে ডেকে নিন মেয়েটাকে। ভাইয়াকে আমি বুঝিয়ে বলবো।"

ইলহাম হেসে ফেলে। নিচু স্বরে বলে,"তোমার মতো স্ত্রীর স্বপ্নই তো পুরুষরা দেখে। নিজের স্বামীর প'র'কী'য়া'র মতো জ'ঘ'ন্য অ'প'রা'ধ'কে কতটা সাপোর্ট করছো।"

রিতু চুপ করে থাকে। ইলহাম দুর্বল হাতে রিতুকে টে'নে আস্তে আস্তে নিজের কাছে নেয়। রিতু পাথরের মতো হয়ে থাকে। ইলহাম রিতুর নিচু করে রাখা মাথার দিকে তাকিয়ে বলে,"আমাকে ঘৃ'ণা করো, রা'গ দেখাও, কাঁ'দো। এমন পাথরের মতো হয়ে থেকো না। এসব আমাকে ক'ষ্ট দেয় রিতু।"

রিতুর ঠোঁট কাঁ'প'ছে। নিজেকে ধাতস্থ করে বলে ওঠে,"ভাইয়েরা বিয়ে করে যার যার সংসার নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে পরলো, বাবা জমিজমা চাষ করে খায়। মা বাড়িতে অসুস্থ। তাকে সপ্তাহে হাজার হাজার টাকার ওষুধ খাওয়াতে হয়। আমাকে ছেলেরা রাস্তাঘাটে উ'ত্য'ক্ত করতো দেখে বাবা আমাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যাস্ত হয়ে পরলো।হঠাৎ বাড়িতে আপনাদের বাড়ি থেকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হলো। বাবা তো হাতে আকাশের চাঁদ পেয়ে গেলো। এমপি পুত্র, ছেলে দেখতে শুনতে ভালো, বাবাকে মোটা অংকের টাকাও দেওয়া হবে। নিজের ইচ্ছে না থাকলেও বাড়ির পরিস্থিতি দেখে চুপ করে থাকি। বিয়ের ঠিক আগে আগে জানতে পারি ছেলের স্বভাব চরিত্র ভালো না,তার নামে মা'ম'লা আছে। পিছিয়ে যেতেই পারতাম। হঠাৎ মা আরো অসুস্থ হয়ে পরে, বাবা এসে আমার হাত ধরে খুব কাঁদলেন। আমি বাধ্য মেয়ের মতো কবুল বললাম। বিয়ের প্রথম রাত থেকে আমার জীবনের একটা য'ন্ত্র'না'ম'য় অধ্যায় শুরু হলো। স্বামী হিসেবে আমি কখনো স্বামীকে পাইনি। পেয়েছি একজন ধ'র্ষ'ক, একজন প্রভু, একজন অ'ত্যা'চা'রী শা'স'ক'কে। সবটা নিজের নিয়তি মেনে নিজেকে আপনার চাহিদার সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছিলাম। চেষ্টা করেছিলাম আপনার মন পেতে,আমার প্রতি আপনাকে একটু দয়াশীল বানাতে। কিন্তু আমি ব্যার্থ হয়েছি।"

এ পর্যন্ত বলে রিতু থামে। ইলহাম তার দিকে তাকিয়ে আছে। রিতু একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলে,"আমার প্রথম সন্তান ছেলে হওয়ায় আমি ভীষণ খুশি হয়েছি, আমার পেটে যে আছে, আমি চাইবো সেও ছেলেই হোক। কারন, আমার নানী বলতো বাবার কর্মফল কখনো কখনো তার মেয়েরা ভোগ করে। আপনি আমার সাথে যা যা করেছেন তা নিজের মেয়ের সাথে হতে দেখলে আপনি সহ্য করতে পারবেন না ইলহাম মির্জা। তাই আপনার ছেলেই হোক।"

রিতু কথাটি বলে অঝোর ধারায় কাঁ'দ'তে শুরু করে দেয়। ইলহাম রিতুকে চুপচাপ দেখতে থাকে। সে কি করবে? এই মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে? নাকি মেয়েটিকে কাছে টেনে নেবে? কিভাবে কা'ন্না থামাবে মেয়েটির?

কাঁদতে কাঁদতে রিতুর হিচকি উঠে গিয়েছে। কিছুক্ষণ পরে শাড়ির আঁচল দিয়ে নিজের চোখ মুছে নিয়ে উঠে একটা ট্যাবলেট আর এক গ্লাস পানি নিয়ে এসে ইলহামের দিকে দিয়ে বলে,"এটা খাওয়ার সময় হয়েছে।"

ইলহাম রিতুর দিকে তাকিয়ে ট্যাবলেট টা নিয়ে মুখে দিয়ে পানি খেয়ে নেয়‌। তারপর বলে,"এখানে বসো।"

রিতু চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। ইলহাম ধ'ম'ক দিয়ে বলে,"বসো রিতু।"

রিতু ধীরে ধীরে বসে। তারপর কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,"আমার ব্যার্থতা, এতো সুন্দরী হয়েও আপনাকে আমি মুগ্ধ করা তো দূরের কথা নিজের প্রতি আপনার মনে মায়া জন্মাতেই পারিনি। এতো বছর সংসার করার পরেও কত সহজে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন আমাকে তা'ড়ি'য়ে দেবেন। অথচ আমাকে দেখেন, জানি আপনি আমায় ভালোবাসেন না,আপনি একজন অ'ত্যা'চা'রী , তবুও আপনার সাথে তা'লা'ক হবার কথা কল্পনা করলেই বুকটা হু হু করে উঠছে।"

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ভেজা দুটো চোখ তুলে ইলহামের দিকে তাকায় রিতু, কান্নাভেজা কন্ঠে বলে,"ধর্মে তো অনুমতি আছেই, আপনি চাইলে ঐ মেয়েটিকে বিয়ে করে ফেলতে পারেন। আমি আপনাকে অনুমতি দিয়ে দিলাম। তবুও আপনার দোহাই লাগে আমাকে তা'ড়ি'য়ে দেবেন না আপনি। আমি মুখে যতই বলি বাচ্চাটা হলে চলে যাবো, কিন্তু আমি নিজেকে চিনি ইহানের বাবা, আমি পারবো না। আমি পারবো না। এর থেকে আপনি আমাকে মে'রে ফেলেন।"

কাঁদতে কাঁদতে ইলহামের পায়ে পরে যায় রিতু। ইলহাম উঠে রিতুকে ধরে। আজ এই মেয়েটির চোখের কা'ন্না তার করা সমস্ত অ'প'রা'ধে'র পরিমাণ তার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। ইলহাম রিতুকে বুকে টেনে নিয়ে পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বলে,"আচ্ছা ঠিকাছে। এসব পরে দেখা যাবে। আগে তুমি ঠিক হও। যা করছো, তাতে আমার বাচ্চার ক্ষতি হবে। ঠিক হও রিতু।"

রিতু কান্না থামাতে পারছে না। ইলহাম তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। রিতুর কানের কাছে মুখ নিয়ে অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে,"আমার বাচ্চা না, আমাদের বাচ্চার ক্ষতি হবে রিতু।‌ কান্না থামাও। এবার কান্না থামাও।"

***

খেতে খেতে সামিন একপলক ইশমামের দিকে তাকায়। তারপর বলে,"মেসেজে বললি কিছু বলতে চাস। এখন বল‌।"

খাবার টেবিলে তারা পাঁচ জন। সামিন,আলো, ইশমাম, ইশিতা এবং পরী।

ইশমাম সামিনের কথায় মাথা তুলে তাকায় সামিনের দিকে তারপর প্লেটের ভাত নাড়াচাড়া করতে করতে বলে,"অর্গানাইজেশন থেকে ডেকেছে আমাকে‌। তিন মাসের জন্য যেতে হবে ভাইয়া। আমি যেতে চাচ্ছি।"

সামিন খাওয়া রেখে ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আলোও ইশমামকে দেখে। সামিন গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে,"অসম্ভব! তুই গেলে আর আসবি না। তোকে যেতে দেবো না।"

_ভাইয়া তুমি কি জানো তুমি বাচ্চাদের জেদ করছো? আমি এখানে আজীবন থাকার জন্য আসিনি।

_জানি,এসেছিলি প্রেমের টানে,আমাদের জন্য আসিসনি। সেই মেয়েকে তো পেলি না। এখন তুই আমেরিকাতেও যেতে পারবি না। বাড়ির ব্যাবসা দেখবি।

ইশমাম রেগে যায়। কপাল কুঁচকে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। আলো মাথা নিচু করে চুপচাপ খাচ্ছে। সামিন বলতে থাকে,"আচ্ছা ঠিকাছে। যাবি তিনমাসের জন্য। যাওয়ার আগে বিয়ে করতে হবে। করবি? বল রাজী! ফুয়াদের কাজিন খুবই চমৎকার একটি মেয়ে।"

ইশমাম টেবিলে চা'প'ড় দিয়ে বলে,"বিরক্তিকর ভাইয়া। তুমি সবসময় তোমার সব সিদ্ধান্ত আমার উপর চাপিয়ে দিতে পারো না! বলেছি তো বিয়ে করবো না আমি।"

সামিন ভাইয়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে গম্ভীর কন্ঠে বলে,"করবি তুই বিয়ে।‌ আমি আজই ফুয়াদের সাথে কথা বলছি। দেবদাস হয়েছিস তুই? আলতু ফালতু মেয়েদের জন্য ক'ষ্ট পাচ্ছিস।"

আলো ইশমামের দিকে তাকায়। ইশমাম একপলক আলোকে দেখে ভাইকে বলে,"আলতু ফালতু মেয়ে না ভাইয়া। এভাবে বলবে না। অসম্ভব রকমের ভালো একটি মেয়ে।"

আলো দ্রুত হাত ধুয়ে উঠে পরে। এখানে তার খুব অস্বস্তি হচ্ছে,সে চলে যায়।

সামিন বলে,"বেশ মেয়েটা অসম্ভব রকমের ভালো। আমি ওর চেয়ে কয়েকগুণ ভালো মেয়ে এনে দেবো তোকে।"

ইশমাম দাঁতে দাঁত চে'পে পানির গ্লাস আঁ'ক'ড়ে ধরে বসে থাকে। ভাইয়ার সাথে রা'গ'টা সে দেখাতে পারছে না তাই রাগটাকে হজম করার চেষ্টায় আছে সে।

সামিন বলে যাচ্ছে,"বিয়ে করবি। তুই অবশ্যই বিয়ে করবি।"

প্রচন্ড জে'দে হাতের মুঠোয় থাকা গ্লাসটাকে ভে'ঙে ফেলে। সামিন সহ সবাই হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। টপটপ করে র*ক্ত ঝরছে ইশমামের হাত থেকে।

সামিন কিছুক্ষণ পর চেঁচিয়ে ওঠে,"ছোটো!"

ইশিতা উঠে ইশমামের হাত ধরে। পরীর দিকে তাকিয়ে বলে,"শিগগিরই তোর ফার্স্ট এইড বক্স টা নিয়ে আয়।"

পরী উঠে চলে যায়। সামিন প্লেটে হাত ধুয়ে ছুটে আসে ইশমামের কাছে। ইশমাম দাঁতে দাঁত চেপে বলে,"আমি বিয়ে করবো না ভাইয়া।"

সামিন ভীত চোখে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলে,"আচ্ছা। বিয়ে করতে হবে না। শান্ত হ তুই। শান্ত হ।"

***

হাত ড্রেসিং করিয়ে দিতে দিতে পরী একপলক ইশমামের দিকে তাকায়। ইশমাম অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে কপাল কুঁচকে আছে। পরী বেশ অবাক হচ্ছে। এই রামগরুরের ছানাও প্রেম করতো! তাও আবার মজনুর প্রেম! প্রেমিকার বিয়ে হয়ে গিয়েছে বলে আর বিয়েই করবে না বলে শপথ নিয়েছে। অদ্ভুত!

পুরো ব্যাপারটায় পরীর খুব হাসি পাচ্ছে। যে মেয়েটা একে ছেড়ে দিয়েছে সে ভালো কাজই করেছে। এই লোকের সাথে বিয়ে হলে দুইদিন সংসার করতে পারতো কি না সন্দেহ! বেশ করেছে মেয়েটা!

"তুমি হাসছো কেনো?"

ইশমাম পরীর দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। পরী থতমত খেয়ে ইশমামের দিকে তাকায়। ইশমাম গম্ভীর কন্ঠে বলে,"হাসছো কেনো তুমি একা একা?"

_কই না তো।

পরী ইশমামের হাতে ব্যা*ন্ডে*জ করে দিতে দিতে বলে।

_আমি স্পষ্ট দেখলাম তুমি হাসছিলে।

পরী উঠে দাঁড়ায়। ইশমাম বলে,"তোমার মাথায় নির্ঘাত কোন সমস্যা আছে। আজ নিশ্চিত হলাম।"

পরী চুপচাপ তার ফার্স্ট এইড বক্স উঠিয়ে ইশিতার ঘরের দিকে যায়। এই লোকটা কবে যে আমেরিকা যাবে কে জানে। ভয়ংকর একটা লোক!

***

জুঁইয়ের নাম্বার থেকে অনবরত ফোন আসছে। ইলহাম কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে ফোনটা রিসিভ করে। জুই বলতে থাকে,"হ্যা! হ্যালো। আচ্ছা ফোন কেনো ধরো না আমার?"

_আমি অসুস্থ জুঁই। ফোন ধরতে দেরী হতেই পারে ।

_দেরী? বুঝলাম, বৌ কাছে আছে। তো বৌকে যখন ছাড়তেই পারছো না তাহলে আমায় রেখে কি লাভ? ছেড়ে দাও আমাকে। তুমি তোমার ঐ হার হাবাতে বৌ আর বাচ্চাদের নিয়ে থাকো।

ইলহাম কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকে। জুঁই বলতে থাকে,"সরি। রাগ উঠে গিয়েছিলো তাই বললাম। আচ্ছা তোমার ভাইয়ের সাথে সম্পত্তি নিয়ে আলোচনা করেছো?"

ইলহাম মৃদু স্বরে বলে,"আমার সম্পত্তি দিয়ে তোমার কি?"

_আমার কি মানে। কদিন পরে আমি তোমার ওয়াইফ হবো। অবশ্যই আমার কিছু।

_কে বলেছে তুমি আমার ওয়াইফ হবে?

ইলহাম ঠান্ডা গলায় বলে।

জুঁই চেঁচিয়ে ওঠে,"মানে?"

_মানে আমি বিবাহিত। আমার একটা ছেলে আছে। এবং আমার স্ত্রী আবারো সন্তানসম্ভবা।

_ইলহাম তুমি এসব কি বলছো? কতদিনের সম্পর্ক আমাদের!

_ওটা সম্পর্ক নয়। অ'প'রা'ধ। অ'প'রা'ধ বয়ে বেড়ানো ঠিক না।

_ইলহাম!

_আচ্ছা ঠিকাছে। সাফ সাফ কথা বলি চলো। আমার সব একাউন্ট ভাইয়া বন্ধ করে দিয়েছে। নিজের বৌ বাচ্চা নিয়ে আমার তার ঘা'ড়ে উঠে খেতে হবে। এমতাবস্থায় তোমাকে যদিও বিয়ে করি তোমাকেও কিন্তু আমার মতো ভাইয়ার দয়ায় থাকতে হবে। বলো পারবে? আমার ভাইয়াকে তুমি চেনো। তুমি পারবে?

জুঁই চুপ করে থাকে। ইলহাম বাঁকা হাসি হাসে, তারপর বলে,"তুমি হচ্ছো ভেসে আসা মেঘ জুঁই। আমার এখন আ*ত্ম*হ*ত্যা করতে ইচ্ছে করছে এটা ভেবে যে আমি রিতুর মতো একটা মেয়েকে ফেলে রেখে তোমার মতো স্বা*র্থ*প*র মেয়ের মধ্যে শান্তি খুঁজতে গিয়েছিলাম।"

***

সারাদিন শুয়ে বসে থাকতে থাকতে শরীরটা আরো খারাপ হতে শুরু করেছে। ফোনটা দূরে ছু*ড়ে মেরে ইলহাম বিছানা থেকে নামে। একটু হাঁটাহাঁটি করা প্রয়োজন। ঘর থেকে বেড়িয়ে দোতলার লিভিং রুমে ‌এসে সে দাঁড়িয়ে পরে সে। সামিন ইহানকে কোলে নিয়ে দেয়ালের জয়নুল আবেদীনের পেইন্টিং নিয়ে বিশদ আলোচনা করছে ইহানের সাথে।‌ মাথা ঘুরিয়ে ইলহামকে দেখতে পেয়ে সে কপাল কুঁচকে চলে যেতে নেয়। ইলহাম ভাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে পরে। মাথা নিচু করে ভাইয়ের হাত ধরে বলে,"সরি ভাইয়া!"

সামিন ইলহামের দিকে তাকায়, তারপর গম্ভীর কন্ঠে বলে,"আমাকে সরি বলছিস কেনো? আমি তোর বৌ?"

ইলহাম চুপ করে থাকে। সামিন বলতে থাকে,"তুই চব্বিশ টা বিয়ে করলেও আমার কি। আমার কিছুই না। যে মেয়েটির কিছু। তার কাছে গিয়ে মাফ চা।"

কয়েক মূহুর্ত চুপ করে থেকে সামিন বলে ওঠে,"এসব নাটক যদি সম্পত্তি পাওয়ার জন্য হয় তাহলে জেনে রাখ, কিচ্ছু পাবি না তুই। আমি বাবাকে দিয়ে তোর সবকিছু ইহানের নামে করে দিচ্ছি। তুই কিছু পাবি না।"

ইলহাম ভাইয়ের হাত ধরে বলে,"লাগবে না আমার কিছু। আমার শুধু বৌ বাচ্চা লাগবে। আর কিছুই লাগবে না!"

***

"এটা কি?"

হাতের প্যাকেট টা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে থাকে ইশিতা। শান্ত তার দিকে হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে আছে। বলে,"খুলে দেখো।"

ইশিতা প্যাকেটটা খুলে বেশ অবাক হয়ে যায়। তার একটা পোর্ট্রেট বাঁধিয়ে রাখা। ইশিতা চোখ বড় বড় করে বলে,"কে করেছে? তুমি?"

_না,আমার অত সময় কোথায়।

ইশিতা একপলক শান্তর দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে। তারপর বলে,"খুব পছন্দ হয়েছে আমার।"

শান্ত ইশিতার দিকে তাকিয়ে বলে,"মনে হচ্ছে আমি কোনো অষ্টাদশীকে দেখছি। এতো ফা'ল'তু একটা জিনিস দেখেও কেউ এভাবে মুগ্ধ হয়? অদ্ভুত মাথামোটা মেয়ে তুমি। আমার যায়গায় আজ একটা বা*ট*পা*রে*র হাতে পরলে এতদিনে নিজেকে আর খুঁজে পেতে না।"

ইশিতা মুচকি হাসে। তারপর বলে,"ঠিক তা না। আমার একটা চোখ আরেকটা চোখ থেকে একটু ছোট। সেটা তুমি খেয়াল করেছো, অবাক হচ্ছি আসলে।"

শান্ত ইশিতার কাছে এসে বলে,"তাই নাকি! কই দেখি! আমি তো জানতাম না। আমি তো ভুল করে ভুলটা করে ফেলেছি।"

ইশিতা বলে,"হুম। একটা চোখ একটু বড়, আরেকটা একটু ছোট।"

গাড়ির হর্ন বাজার শব্দ হতেই চ'ম'কে ওঠে দুজন। পার্কের বেঞ্চিতে বসেছিল এতক্ষণ। ইশিতা ঘুরে তাকাতেই দেখে সামিনের গাড়ি। লাফ দিয়ে উঠে দাড়ায় সে।

সামিন গাড়ির জানালার কাচ নামিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ইশিতা কিছুক্ষণ পাথরের মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে একটা ঢোক গিলে অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে,"আজকে আমি শে*ষ! তুমি এখান থেকে কে*টে পরো।"

শান্ত ইশিতার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলে,"কেনো? কে*টে পরবো কেন? পরিচিত আমরা,কথা বলতেই পারি!"

_তুমি ভাইয়াকে চেনো? মা*র*তে মা*র*তে মে*রে*ই ফেলবে তোমাকে। তুমি কে'টে পরো। আমি কিছু একটা বুঝিয়ে বলে দেবো। যাও।

শান্ত যায়না। সামিন গাড়ি থেকে নেমে এসে ওদের সামনে দাঁড়ায়। একপলক ইশিতা এবং শান্তর দিকে তাকিয়ে শান্তকে বলে,"তোমাকে ইহানকে পড়ানোর জন্য ঠিক করা হয়েছিলো, ইশিতাকে নয়।"

শান্ত মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ইশিতা আমতা আমতা করে বলে,"ভাইয়া হঠাৎ দেখা হয়ে গেলো তাই..."

_হঠাৎ দেখা? তাও এই পার্কে?

_ভাইয়া....!

_বাড়িতে চল।

সামিন খুবই ঠাণ্ডা গলায় বলে কথাটা।

বাড়িতে এসে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বোনের সাথে চেঁ'চা'মে'চি শুরু করে দেয় সামিন। দোতলার লিভিং রুমে বসে ইশিতা কাঁ'দ'ছে। এমন উঁচু গলায় কখনো ভাইয়া তার সাথে কথা বলেনি,ব'কে'নি। সামিন ইশিতার মুখোমুখি বসে পরে, তারপর তেজী কন্ঠে বলে ওঠে,"বুদ্ধি একেবারেই চলে গিয়েছে তোর? ঐ ছেলেটাকে চিনিস তুই ঠিকভাবে? ওর পরিচয় জানিস ঠিকভাবে? কদিনের পরিচয়ে এতদূর? তুই তো টিনেজার মেয়েদের থেকেও ইমম্যাচিওরড।"

_ভাইয়া,ও খুব ভালো, শিক্ষিত,ভদ্র!

_হ্যা ভদ্র বলেই তো তোকে ঐ সব পার্কে নিয়ে যায়।

_আমি ওকে ওখানে ডেকেছি ভাইয়া।

_খুব পার্ক চিনেছো তুমি। এক চ'ড় মারবো।

চেঁচিয়ে বলে সামিন বোনের দিকে এগিয়ে যায়। ইশিতা কেঁ'পে ওঠে।

_হ্যা মা'রু'ন‌। থামলেন কেনো মা'রু'ন।

পেছন থেকে বলে ওঠে আলো। চেঁচামেচির শব্দে সে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলো। সামিন তার দিকে তাকায়। আলো বলতে থাকে,"মারুন। যেখানে যেখানে জোর খাটাতে পারবেন না তাদের সবাইকে মে'রে দিন। এটা তো সামিন ইয়াসারের রাজ্য। এখানে থাকতে হলে তার জো'র জু'লু'ম মানতে হবে।"

ইশিতা ভেজা চোখ নামিয়ে বসে আছে। সামিন আলোর দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলে,"ভাই বোন কথা বলছি,তুমি ভাষণ না দিয়ে যাও।"

_লজ্জা করে না? এতবড় একটা মেয়ের গায়ে হাত তুলতে যাচ্ছিলেন ভাইয়ের অধিকারে।

_ আমার বোন। আমি যা খুশি করবো। ওরকম পার্কে আমার বোনকে আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। এবাড়ির কোনো মেয়ের আজ পর্যন্ত অমন পার্কে যাওয়ার প্রয়োজন পরেনি। দিনকে দিন বে'য়া'দ'ব হচ্ছে।

ইশিতা কাঁদতে কাঁদতে উঠে চলে যায় নিজের ঘরে। সামিন একপলক আলোর দিকে তাকিয়ে উঠে নিজের ঘরে যায়। আলো তার পিছু পিছু যায়।

_ভাবেন কি আপনি নিজেকে? আপু কত কষ্ট পেয়েছে আপনার আচরণে দেখেছেন?

_পাক। অমন একটা ছেলেকে বোনের পাশে মেনে নেবো?

_খারাপ কি? শিক্ষিত,ভদ্র,দেখতে শুনতে ভালো, আপনার কেনো পছন্দ হচ্ছেনা? কারন আপনাদের বাড়ীর ছেলেদের মতো গু'ন্ডা মা'র'কা'টা'রি নয় বলে?

সামিন আলোর দিকে তাকায়। তারপর বলে,"ছেলেটা এই শহরের স্থানীয় নয়। এইসব মফস্বল থেকে উঠে আসা ভার্সিটির ব্যাচেলর ছেলেরা পরিকল্পনা করে নিজের ভোলাভালা চেহারা দেখিয়ে, গান শুনিয়ে বড়লোকের মেয়ে পটিয়ে নেয়। এসব অহরহ হচ্ছে আশেপাশে। তারপর নিজেদের স্বার্থে তাদের ব্যাবহার করে।"

_আর আপনারা? আপনারা কি করেন ইয়াসার মির্জা? একটা মেয়ের অমতে তাকে তুলে এনে বিয়ে করে ব্যাবহার করেন‌ । হয়ে যান স্যা'ডি'স্ট। ওই ছেলে গুলো আর আপনাদের মধ্যে তো কোনোই পার্থক্য নেই।

সামিন আলোর দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকায়। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,"মুখ সামলে কথা বলো আলো। স্যা'ডি'স্টে'র মানে বোঝো তুমি? একেবারে আজেবাজে কথা বলবে না।"

_বলবো। কারন আপনারা অমনই। রিতুর সাথে তো তাই হয়ে এসেছে।

_আমি স্যা'ডি'স্ট? আমার কোন আচরণে তোমার মনে হয়েছে আমি ওমন? বলো, জবাব দাও।

চেঁচিয়ে ওঠে সামিন।

_আপনিও ওমনই।

সামিন আলোর দিকে তাকিয়ে আছে। তারপর আলোর দিকে এগিয়ে গিয়ে তার হাতের কনুই ধরে টেনে নিজের কাছে নিয়ে এসে দাঁত খিচিয়ে বলে,"এই মাত্র যেটা বললে,সেটা ফিরিয়ে নাও আলো‌। প্রথম এবং শেষ বারের মতো বললাম।"

আলো সামিনের চোখে চোখ রেখে বলে,"নেবো না। আবারো বলবো, এই মির্জা বাড়ির ছেলেরা স্যা*ডি*স্ট।"

ধৈর্য্যর বাঁধ গিয়েছে সামিনের। আলোকে এক ধাক্কায় বিছানায় ফেলে তেজী কন্ঠে বলে,"স্যা*ডি*স্ট আমরা? তাইনা?"

আলো মাথা ঘুরিয়ে তাকায় সামিনের দিকে। সামিন বলে,"ঠিকাছে আমি স্যা*ডি*স্ট। স্যা*ডি*স্ট কাকে বলে আমি তোমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি আলো।"

আলোর দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে সামিন গিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়। আলো নিজেকে গুটিয়ে নেয়। সামিন ঘুরে আলোর দিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত আলোকে দেখে একটা একটা করে শার্টের বোতাম খুলতে থাকে। শার্ট টা খুলে দূরে ছু*ড়ে মেরে আলোর দিকে এগিয়ে যায়। বিছানায় আলোকে চেপে ধরে নিচু স্বরে কিন্তু গলায় তেজ নিয়ে বলে,"এবার বলো! সাহস থাকলে আবার ঐ শব্দটা উচ্চারণ করো আলো!"

আলো অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে,"স্যা*ডি*স্ট। আপনি স্যা*ডি*স্ট।"

সামিন আলোকে দেখছে। মেয়েটা নিজেকে সামিনের থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার কোনো চেষ্টা করছে না। ঠিক একটা জড়বস্তুর মতো পরে আছে, নিস্তেজ হয়ে। হঠাৎ করে তার চোখ বেয়ে দুফোঁটা তরল গড়িয়ে পরে।

সামিনের বুকে সুক্ষ্ম য*ন্ত্র*না হয়। এভাবে সে কখনোই তার স্ত্রীকে পেতে চায় না। আলো একপলক সামিনের দিকে তাকিয়ে বলে,"থেমে গেলেন কেন? আমি তো কোনো বাঁধা দিচ্ছি না। এসবই তো আপনাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তার জন্য যত্নবান স্বামী হবার নাটক করার তো কোনো দরকার ছিলো না। জোর করে নিয়ে নিতেন। আচ্ছা আপনাকে জোর করতে হবে না। আমি নিজেই দিচ্ছি।"

কথাটি বলে আলো কাঁপা কাঁপা হাতে বুকের উপর থেকে নিজের শাড়ির আঁচল সরিয়ে দেয়। সামিন আলোর হাত ধরে ফেলে। আলো সামিনের দিকে তাকিয়ে বলে,"কোনোভাবেই না ইয়াসার মির্জা। না আমার সাথে ভালো স্বামী হবার নাটক করে, না আমাকে জো*র জবরদস্তি করে, কোনো ভাবেই আপনি আমার মন পাবেন না। অভিনন্দন আপনাকে, আপনি একটা মেয়ের শুধুমাত্র শরীরের দ*খ*ল*দা*র হতে চলেছেন, মনের নয়।"

কথাটা বলে কা*ন্না*য় ভে*ঙে পরে আলো। তারপর বলে,"কিচ্ছু ভুলিনি আমি। সেদিনের সেই রাত, আমার ভাইদের গলায় ছু*রি ধরা, আমার বাবা হার্টের রো*গী, কিছুদিন আগেই তার একটা এ*ক্সি*ডে*ন্ট হয়েছিলো, তাকে কষ্ট দেয়া, আমার মায়ের অসুস্থ হয়ে যাওয়া, আমাকে কি*ড*ন্যা*প করা।‌ কিছু ভুলিনি। একটা গোটা রাত আমি ছট'ফট করেছি আ'তং'কে এটা ভেবে যে অচেতন অবস্থায় আমার সাথে উলটো পাল্টা কিছু হয়েছিলো কি না। নিজের স'তী'ত্ব নিয়ে একটা মেয়ের অনূভুতি আপনি বোঝেন? আমি কখনো আপনাকে আমার মন দেবো না, কোনোদিন আপনার প্রতি আমার অনুভূতি বদলাবে না। যা করতে চান করুন।"

একনাগাড়ে কথাগুলো বলে হাঁপাতে থাকে আলো। সামিন বেশ কিছুক্ষণ আলোর দিকে তাকিয়ে থেকে আলোর শাড়ির আঁচল তুলে দেয় তার বু'কে। তারপর তাকে ছেড়ে ধীরে ধীরে উঠে বসে। আলো বিছানায় পরে থাকে চুপচাপ। সামিন উঠে নিজের শার্ট উঠিয়ে পরে নেয়। আলোর দিকে একপলক তাকিয়ে বিছানায় একপাশে বসে পরে সে। পাঁচ মিনিটের মতো চুপচাপ থেকে হঠাৎ বলে ওঠে,"আর মাত্র এক সপ্তাহ আছে। কিন্তু আমি হার মেনে নিলাম আলো। তুমি কাল সকালে ও বাড়িতে চলে যেও। তোমাকে আমি মুক্তি দিলাম‌।"

চলমান.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন