ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগলো চোখে

২৭তম পর্ব

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে

#পর্বসংখ্যা_২৭

#Esrat_Ety

"অদ্রিতা।"

ইশমামের ডাকে আলো দাঁড়িয়ে পরে পেছনে ফিরে তাকায়। ইশমাম তার দিকে এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বলে,"সত্যিই চলে যাচ্ছো?"

আলো কিছু সময় ইশমামের দিকে তাকিয়ে থেকে ম্লান হেসে বলে ওঠে,"ভালো থেকো ইশমাম।"

ইশমাম তার দিকে তাকিয়ে আছে। আলো ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করে। ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসে।

"তুমি চলে যাচ্ছো পঁচা মেয়ে?"

ইহান অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে আলোকে। আলো ম্লান হেসে ইহানের দিকে এগিয়ে যায়। ইহানের মাথায় হাত রেখে নরম গলায় বলে,"হ্যা ভালো ছেলে। আমি চলে যাচ্ছি।"

_আর কখনো আসবে না?

_নাহহ,কখনো না।

দৃঢ়ভাবে বলে ওঠে আলো।

সামিন মাথা তুলে আলোর দিকে তাকায়। নিচতলার লিভিং রুমে বাড়ির সবাই এসে জমায়েত হয়েছে। আলো ঘুরে ঘুরে সবাইকে একপলক দেখে নেয়। রিতু এগিয়ে গিয়ে নরম গলায় বলে,"ভাবী! ভাইয়া অনেক ভালো মানুষ। একটা সুযোগ তো দিন তাকে নিজেকে প্রমাণ করার। অনুরোধ করছি আপনার কাছে।"

আলো শুকনো হাসি হেসে রিতুর সেকথার জবাব না দিয়ে তার হাত দুটো ধরে, রিতুর চোখে চোখ রেখে বলে,"রাগের মাথায় তোমাকে প্রচুর কটু কথা শুনিয়েছি রিতু। মাফ করে দিও। তুমি খুব ভালো একটা মেয়ে রিতু, সবাইকে এতো ভালোবাসা দিও না। একটু ভালো নিজেকেও বাসো। কেমন? তুমি ভালো থেকো। তোমার পেটে যে আছে, সে জন্মালে এই আগন্তুকের আদর দিয়ে দিও।"

রিতু শুকনো মুখে তাকিয়ে আছে আলোর দিকে। আলো ঘুরে ইশিতার দিকে তাকায়। ইশিতা এসে আলোকে জরিয়ে ধরে। আলো বলে,"আমি তোমাকে সত্যিই খুব মিস করবো আপু।"

ভাইয়ের প্রতি অভিমান থাকার পরেও ইশিতা আলোর গাল দুটো ধরে আদুরে গলায় বলে,"আরেকটু কি ভাবা যেতো না ভাবী?"

আলো বলে,"ভাবী না ইশিতা আপু। আমাকে আলো বলো তুমি।"

এমন সময় জামিল এসে শান্তিনীড়ের সদর দরজায় দাঁড়ায়। সামিন ধ'ম'কে'র সুরে বলে,"তোকে এই শরীর নিয়ে আসতে নিষেধ করেছিলাম না?"

জামিল তার ইয়াসার ভাইয়ের কথায় জবাব না দিয়ে আলোর দিকে এগিয়ে আসে। আলো তার দিকে তাকিয়ে আছে। জামিল বলতে থাকে,"ভাবী। সবকিছু তো আমার জন্য হয়েছে। আপনি আপনার জুতা খুলে আমাকে দুইটা দেন। আপনার বাবা মাকেও দিতে বলবেন। কিন্তু আমার ভাইকে ছেড়ে দিয়েন না। ভাই আপনাকে সত্যি খুব ভালোবেসে ফেলেছে ভাবী। সে কষ্ট পাচ্ছে। তাকে একবার সুযোগ দিন ভাবী।"

_জামিল!

চেঁচিয়ে ওঠে সামিন।

আলো জামিলের থেকে চোখ সরিয়ে নেয়। লিভিং রুমে ইমতিয়াজ মির্জা এসে দাঁড়িয়েছে। আলো একবার ইমতিয়াজ মির্জার দিকে তাকিয়ে ইশমাম এবং ইলহামের দিকে তাকায়। তারপর ঘুরে সামিনের দিকে তাকিয়ে বলে,"তালাকের ব্যাপারটা দ্রুত দেখবেন…..."

সামিন আলোর দিকে একপলক তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নেয়। পাশ থেকে ফুয়াদ বলে,"আলো,একটা সুযোগ দাও বোন। সামিন খুব ভালোবাসে তোমাকে।"

আলো অস্ফুট স্বরে বলে,"আপনার সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছি প্রথমদিন ভাইয়া। আমাকে মাফ করে দিয়েন।‌ ভালো থাকবেন।"

জামিল এসে আলোর পথ আগলে দাঁড়ায়,"ভাবী! কথা তো শোনেন আমার। আমি ভাইয়ের অপরাধকে কোন মতেই যাস্টিফাই করছি না ভাবী। সে অবশ্যই অ'প'রা'ধ করেছে। কিন্তু এখন সে সত্যিই আপনাকে ভালোবাসে। একটু কনসিডার করেন ভাবী।"

_আমার পথ ছাড়ুন জামিল ভাই।

ঠান্ডা গলায় বলে আলো।

সামিন জামিলের দিকে তাকিয়ে ধ'ম'কে ওঠে,"পথ ছাড় ওর জামিল। যেতে দে ওকে।"

জামিল শুকনো মুখে সরে দাঁড়ায়। আলো এগিয়ে যেতে থাকে সদর দরজার কাছে। পরী আর পোনা চাচা দাঁড়িয়ে আছে। আলো হেসে পরীর গাল ছুঁয়ে পোনার দিকে তাকিয়ে বলে,"ভালো থাকবেন পোনা চাচা।"

পোনা নরম গলায় বলে,"থেকে যাও বড় বৌমা। সবটা দুর্ঘটনা হলেও তুমি একটা হীরা পেয়েছো মা তাকে এভাবে পায়ে ঠেলে দিও না।"

আলো কিছু না বলে হাঁটতে থাকে। সামিন আলোর পিছু পিছু যায়। পোর্চের নিচে এসে দাড়াতেই দেখে দলের ছেলেরা সবাই দাঁড়িয়ে আছে। সবুজ আলোকে দেখে বলে,"থেকে যান না ভাবী। কি হয় একটু মেনে নিতে?"

সবাই সবুজের কথা শেষ না হতেই বলে ওঠে,"থেকে যান ভাবী। দোহাই আপনার।"

আলো তাদের কিছু না বলে সামিনের দিকে তাকিয়ে বলে,"আপনি আসছেন কেনো? আমি রিকশা নিয়ে চলে যাবো।"

"তুমি আমার বাউন্ডারির মধ্যে আছো আলো। তারমানে তুমি আমার রেসপনসিবিলিটি। তোমাকে রাহাত দিয়ে আসবে আমার গাড়িতে।"

কথাটা বলে গাড়ির চাবি রাহাতের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,"তোর ভাবীকে..........সরি,ওকে ওর বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আয়।"

রাহাত একপলক সামিন এবং আলোর দিকে তাকিয়ে গাড়ির চাবি হাতে নিয়ে গেইটের কাছে চলে যায়। আলো ধীরপায়ে রাহাতের পিছু পিছু যায়। সামিন অপলক দেখতে থাকে সে দৃশ্য। গেইটের কাছে গিয়ে আলো দাঁড়িয়ে পরে। আলো ঘুরে সামিনের দিকে তাকিয়ে আবারো তার দিকে আসতে থাকে। তৌফ খুশি হয়ে বলে,"ভাবী মনে হচ্ছে যাবে না ভাই।"

সামিন তাকিয়ে আছে। আলো এসে সামিনের মুখোমুখি দাঁড়ায়। তারপর তার হাত থেকে সামিনের মায়ের বালা দুটো খুলে সামিনের হাতে দিয়ে বলে,"আপনাদের বাড়ীর বড় বৌয়ের জিনিস। আপনার ভবিষ্যৎ বৌকে দেবেন।"

বালা দুটো দিয়ে দ্রুতপায়ে হেটে গেইটের বাইরে চলে যায়। গাড়িতে উঠে বসতেই রাহাত গাড়ি স্টার্ট করে। কয়েক মূহুর্ত পরে গাড়িটা চোখের আড়াল হয়ে যায়। সামিন একপলক গেইটের দিকে তাকিয়ে নিজের হাতে তার মায়ের বালা দুটোর দিকে তাকায়।

রনি সামিনের দিকে এগিয়ে এসে তাকে অবাক চোখে দেখতে থাকে। সামিন রনির দিকে তাকিয়ে বলে,"কি? কি দেখছিস?"

_এতো সহজে যেতে দিলেন ভাই?

সামিন বাঁকা হাসি হাসে। তারপর আশেপাশে তাকিয়ে সবাইকে দেখতে থাকে। সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে। সামিন হাতের বালা দুটোর দিকে একবার তাকিয়ে রনিকে বলে ওঠে,"বুঝলি রনি, তোর ভাবী কয়েকদিনের জন্য বাপের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছে। ওকে এই কয়টা দিন দেখে রাখিস!"

ফুয়াদ অবাক হয়ে বলে,"মানে?"

সামিন ফুয়াদের দিকে তাকিয়ে বলে,"আমি সামিন ইয়াসার মির্জা। আমার বৌকে আমি ছেড়ে দেবো? ভাবলি কি করে তোরা। ধূর!"

সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে থাকে। সামিন সবাইকে উপেক্ষা করে গা ছাড়া ভঙ্গিতে হেলেদুলে বাড়ির ভেতরে ঢুকে সোজা দোতলার সিঁড়ি বেয়ে নিজের ঘরে চলে যায়।

লিভিং রুমে দাড়িয়ে থাকা সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।

***

ড্রাইভ করতে করতে রাহাত একপলক মাথা ঘুরিয়ে আলোর দিকে তাকায়। আলো মাথা নিচু করে বসে আছে। কিছু সময় পরে রাহাত বলে ওঠে,"ভাবী!"

_আপনাদের ভাইয়ের কীর্তন গাইতে শুরু করবেন না রাহাত। আমি ফেলে এসেছি তাকে, অনেকটা দূরে চলে এসেছি তাকে ফেলে। এখন আর কিছু শুনতে চাচ্ছি না।

রাহাত আলোর দিকে তাকায়। কিছু মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলে ওঠে,"আপনি খুবই নি'ষ্ঠু'র ভাবী।"

_হ্যা। আর আপনারা খুব ভালো। যুবতী মেয়েকে কি'ড'ন্যা'প করে তাকে একটা ক্রি'মি'না'লে'র শ'য্যা'স'ঙ্গী বানিয়ে দেন। আপনারা খুব ভালো রাহাত।

রাহাত আর কোনো কথা বলে না, আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ তো তার নেই। আসলেই তো তারা অ'প'রা'ধ করেছিলো।

তবুও সে অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে,"ভাইয়ের চোখে আপনার জন্য শুধু ভালোবাসা না সম্মান দেখেছি আমরা ভাবী, এত বছর ধরে ভাইকে দেখছি কখনো কোনো মেয়ের জন্য এতটা উতলা হতে ভাইকে দেখিনি ভাবী। আপনাকে অনুরোধ করছি, আপনি ভাইয়ের কাছে ফিরে যান।"

_গাড়ি থামান রাহাত।

ঠান্ডা গলায় বলে আলো। রাহাত আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,"কেনো ভাবী?"

_আমাদের বাড়ি এসে গিয়েছে। আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না?

রাহাত সামনের দিকে তাকিয়ে ব্রেক কষে দেয়। আলো রাহাতের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলে,"আবার যদি কখনো নিজের প্রিয় ভাইয়ের জন্য কোনো মেয়েকে তুলে আনতে যান তাহলে নিজের মা বোনের কথাটা একবার ভেবে নিবেন রাহাত। ভালো থাকবেন।"

আলো কথাটি বলে বাড়ির গেইটের ভেতরে চলে যায়। রাহাত কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে গাড়ি স্টার্ট করে।‌

কলিং বেল টিপে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে আলো। আজান এসে দরজা খুলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে কয়েক মূহুর্ত। তারপর একটা বি'ক'ট চি'ৎ'কা'র দেয়। রেহেনা ছুটে এসে থ'ম'কে দাঁড়িয়ে যায়। আলোর দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। আলো মায়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলে,"এক সপ্তাহ পর ফেরার কথা ছিলো। ইয়াসার মির্জা দয়া করে এক সপ্তাহ আগেই আমাকে ছেড়ে দিয়েছে মা।"

রেহেনা ছুটে এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে। কিছুক্ষণ পরে আলো মাকে ছেড়ে সোজা হেটে আতাউর আলমের ঘরে ঢোকে। আতাউর আলম মেয়েকে দেখতে পেয়ে অপলক তাকিয়ে থাকে মেয়ের দিকে, তার কোনো ভাবান্তর নেই । আলো দৌড়ে গিয়ে বাবার গায়ে ঝাঁ'পি'য়ে পরে। কিছুক্ষণ পরে ভেজা দুটো চোখ তুলে বাবার দিকে তাকিয়ে বলে,"তোমার মেয়ে মুক্তি পেয়েছে আব্বু।"

***

ঘরে ঢুকে বিছানায় চিৎ হয়ে, হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে থাকে সামিন। কিছু সময় শূন্যে তাকিয়ে থেকে উঠে বসে বিছানার ওপর থেকে তার মায়ের হাতের বালা দুটো তুলে নেয়। বেশ মানিয়েছিলো আলোর হাতে বালা দুটো। অহংকারী,তেজী, মাথামোটা, গলাবাজি করা মেয়েটি ফেলে রেখে চলে গেলো নিজের জিনিস। বোকা মেয়েটা জানেই না এভাবে নিজের পরিচয় ফেলে রাখা যায়না।

সামিন উঠে গিয়ে নিজের আলমারি খুলে একটা বক্স বের করে আনে। বক্সে কিছু গয়না ছিলো, যেগুলো আলোর মা আলোর জন্য গড়েছিলো। সামিন বালা দুটো সেই বক্সটাতে তুলে রাখে‌ । এগুলো সব ঐ তে'জী মেয়েটার। আবার যখন সামিন তার বৌকে এ বাড়িতে নিয়ে আসবে, সেদিন ভালোবাসাবাসির রাতে এগুলো নিজের হাতে পরিয়ে দেবে তার বৌকে।

ফুয়াদকে দেখে সামিন ম্লান হেসে বক্সটা তুলে রাখে। ঘরে ঢুকে একটা চেয়ার টেনে বসে পরে ফুয়াদ। সামিনের দিকে তাকিয়ে বলে,"কি চলছে মাথায়? কি করবি?"

_সাধনা।

হাসতে হাসতে বলে সামিন‌।

_তাতে যদি কাজ না হয়?

_তাহলে আবার তুলে আনবো তারপর আবার চলে গেলে আবার সাধনা করবো তাতে কাজ না হলে আবার তুলে আনবো তারপর আবার চলে গেলে আবার সাধনা করবো তাতেও কাজ না হলে আবার তুলে আনবো....

_থাম থাম থাম।

ফুয়াদ চেঁচিয়ে ওঠে।

সামিন উচ্চশব্দে হাসতে হাসতে বলে,"মোটকথা ওর জন্ম হয়েছে আমার কাছে বন্দী হবার জন্য আর আমার জন্ম হয়েছে ওকে তুলে আনবার জন্য।"

_তোর কাহিনী দিয়ে একটা দূরদান্ত ড্রামা সিরিজ বানানো যাবে। লোকজন যেটা দেখে তোকে আর আলোকে গা'লা'গা'ল দেবে। তাদের মাথা খা'রা'প করার জন্য।

সামিন হাসতে থাকে। তারপর হাসি থামিয়ে বলে,"একটু গললো না ঐ আছিয়া। তুই ভাবতে পারিস? কি দিয়ে গড়েছে ওকে?"

***

ভাতের লোকমা তুলে মেয়ের সামনে ধরে মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে রেহেনা। আলো হাত সরিয়ে দিয়ে বলে,"ভালো লাগছে না খেতে আম্মু ,নিয়ে যাও।"

আলোকে খুবই কাহিল দেখাচ্ছে। একটু পর পর পানি খাচ্ছে শুধু।

রেহেনা প্লেট সরিয়ে রেখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,"তুই ঠিক আছিস তো? এমন লাগছে কেনো?"

_ও কিছু না আম্মু। কিছুটা দুর্বল লাগছে শুধু।

আলো উঠে দাঁড়িয়ে বলে,"ঘরে এক কাপ লেবু চা দিয়ে যাবে আম্মু?"

রেহেনা মাথা নাড়ায়। আলো নিজের ঘরে চলে যায়। দীর্ঘ দিন পরে নিজের সেই চির চেনা ঘরটাতে ঢুকে আলো বেশ শান্তি পায়। কিছুক্ষণ ঘুরে পুরো ঘরটাকে দেখে আলো আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। পরনে এখনো ঐ লোকটার দেয়া শাড়ি। আলো একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে তার আলমারি থেকে এক সেট সালোয়ার কামিজ বের করে নিয়ে ওয়াশ রুমে ঢুকে গোসল সেরে নেয়। শরীরটা খুব একটা ভালো লাগছে না। তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বেরিয়ে এসে দেখে রেহেনা চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে আছে। আলো চায়ের কাপ টা উঠিয়ে একটা চুমুক দেয়। রেহেনা আমতা আমতা করে বলে,"তখন তোর বাবার সামনে জিজ্ঞেস করতে পারিনি। তোকে এমন লাগছে কেনো দেখতে?"

_কেমন লাগছে?

আলো তার মায়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে। রেহেনা নিচুস্বরে বলে,"তোর এই মাসে পি'রি'য়'ড হয়েছিলো?"

_হু কেনো?

_না মানে, পেটে বাচ্চা এলো কি-না...

আলো তার মায়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে বলে,"আমাদের মধ্যে এমন কিছুই হয়নি আম্মু‌।"

রেহেনা অবাক হয়ে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আলো নিচু স্বরে বলে,"উনি কিছু করেনি আমার সাথে।"

_বিয়ের দুমাস হয়ে গিয়েছে। কিছুই হয়নি তোর সাথে?

আলো না সূচক মাথা নাড়ায়। রেহেনা বেশ অবাক হয় কথাটি শুনে।

***

"ভাইয়া আসবো।"

_আয়।

ইশমাম ভেতরে ঢুকতেই সামিন উঠে বসে। সে ইশমামের হাতের দিকে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে,"হাতের ব্যাথা সেরেছে? তুই একটা অদ্ভুত মানুষ, তোর ভাবীর মতো। ঐ মেয়েটাও কখন কি করে ফেলে বোঝা মুশকিল। নিজেও জানে না আসলে। কখনো বই ছুড়ে মা'রে,বই দিয়ে বারি মা'রে, মিন্ট লেমন ছুড়ে মা'রে, বাচ্চাদের মতো থুতু দেয়, আমার পাঞ্জাবি টুকরো টুকরো করে কে'টে ফেলে।"

কথাটা বলে সামিন একা একা কিছুক্ষণ হেসে নেয়। ইশমাম ম্লান হেসে তার ভাইয়ের পাশে বসে। তারপর সামিনের দিকে তাকিয়ে বলে,"ঐ অদ্ভুত মেয়েটাকে পেয়ে গেলে খুশি হবে খুব?"

সামিন হাসি থামিয়ে মাথা নিচু করে বলে,"সব কিছু পেয়ে গিয়েছি,এমন অনূভুতি হবে।"

ইশমাম চুপ করে তার ভাইয়াকে দেখে। তারপর বলে,"আমি চলে যাচ্ছি ভাইয়া।"

_সবাই চলে যাচ্ছিস। যাবিই তো, আমি সবাইকে জোর জবরদস্তি করি। খা'রা'প মানুষ।

ইশমাম ভাইকে দেখে। সামিনের কন্ঠে এক রাশ হতাশা। চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে আছে সে। ইশমাম পাশে বসে তার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে ।

***

মোট ষোলো হাজার তিনশ ছয় টাকা। পঞ্চম বারের মতো টাকা গুলো গুনে নেয় আলো। বরাবর সে টাকা পয়সা গুনতে অদক্ষ।

টাকা গুলো মুঠির মধ্যে নিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। এই টাকা গুলো সে টিউশনি করিয়ে জমিয়েছিলো একটা নতুন ফোন কিনবে বলে। ইউনিভার্সিটিতে পা দেওয়ার সাথে সাথে আতাউর আলমের থেকে হাতখরচা নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল আলো। সে বরাবর আত্মনির্ভরশীল মেয়ে হতে চেয়েছিলো। পেরেওছিলো। মাঝখান থেকে একটা ঝড় এসে সবটা ওলটপালট করে দিলো,সবটা!

তবে আলো নিশ্চিত,অতি দ্রুত সবটা গুছিয়ে নিতে পারবে সে। সেই আত্মবিশ্বাস আলোর আছে।

সকাল থেকে আলোর মধ্যে একটা ব্যাস্ত ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাবার সবকিছু গুছিয়ে দিয়ে নিজে কোথাও যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে। আতাউর আলম মোটামুটি সুস্থ হয়ে উঠেছে। তবে কিছুটা অস্বাভাবিক লাগে তাকে, আগের মতো নেই কিছুই। কেমন অদ্ভুত অদ্ভুত আচরণ করেন। অবশ্য কত বড় একটা অপারেশন হয়েছে,এমন আচরণ করা স্বাভাবিক।

"যাচ্ছিস কোথাও?"

আলো গলায় ওড়না দিয়ে ঘুরে তাকায় রেহেনার দিকে। রেহেনা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে তাকে দেখেছে।

কলেজ ব্যাগ টা কাঁধে উঠিয়ে ক্যাবিনেট থেকে স্লিপার বের করতে করতে বলে,"হু। ইউনিভার্সিটি যাচ্ছি।"

_কলেজ যাচ্ছিস?

_ওমা,অবাক হচ্ছো কেন? আমি যে স্টুডেন্ট এটা ভুলে গেলে?

রেহেনা মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। আলো বলতে থাকে,"পড়াশোনা টা চালিয়ে যেতে চাই। সাথে টুকটাক কাজ করবো‌। আব্বুর অবস্থা দেখে যা বুঝলাম, আমি ছাড়া এই সংসারের গতি নেই।"

রেহেনা কোনো কথা বলে না। আলো চলে যায়। ও ঘর থেকে আতাউর আলম ডাকছে। রেহেনার কানে সে ডাক পৌঁছায় না। কপালে তার চিন্তার রেখা। সবটা কি আদৌও আগের মতো করা সম্ভব? একজন মা হিসেবে তার কি করা উচিৎ? মেয়ের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দেয়া? নাকি সমাজের বাঁকা কথা যাতে শুনতে না হয় সেজন্য মেয়েকে সবটা মানিয়ে নিতে বলা? কোনটা?

***

"কি বুড়ি? তুমি সকাল সকাল চলে এলে?"

গম্ভীর কন্ঠে কথাটি বলে সামিন ঢোকে তার পার্টি অফিসের সামনের টং-য়ের দোকানটায়।

_তোর দাদা আমাকে ছেড়ে থাকতে পারে না। কি আর করি বল!

সামিন মৃদু হেসে একটা বেঞ্চিতে বসে পরে। তার সামনে রয়েছে প্রায় সত্তর বছর বয়সী দুজন বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধা। সামিন মজার ছলে বলতে থাকে,"দু'জনেই প্রত্যেক মাসে বয়স্ক ভাতা পাচ্ছো তবুও তোমাদের টাকার লোভ গেলো না। এই দোকানের কি দরকার? এতো টাকা নিয়ে যেতে পারবে কবরে? কাউকে যে দিয়ে যাবে সে উপায় তো নেই,তারা তো তোমাদের খোজ নেয় না।"

মনা বিবি হেসে বলে,"তোকে দিয়ে যাবো সব।"

_আমার তোমাদের ওসব খুচরা পয়সার দরকার নেই। আমার অনেক টাকা!

_জানি তোর অনেক টাকা, তা তুই এই দোকানে চা খেতে আসিস কেনো? ঐ যে ঐ সাহেবদের ইটের দালানে যা।

শাহজাহান মিয়া সামিনের দিকে এক কাপ চা বানিয়ে দেয়। কাপে চুমুক দিয়ে সামিন এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। লোকজন তাকে অবাক হয়ে দেখে। একজন মেয়র এভাবে টিনের ছাপড়া দেওয়া দোকানের বেঞ্চিতে বসে চা খেতে খেতে গল্প করছে এটা বেশ অবাক করা একটা দৃশ্য। এসব দৃশ্য নির্বাচনের আগে আগে দেখা যায়, পরে নয়।

মনা বিবি নিচু স্বরে বলে,"তোর বৌ কেমন আছে?"

_বৌ চলে গেছে।

_ভেগে গিয়েছে নাকি? কার সাথে?

_ভেগে যায়নি, চোখের সামনে থেকে গুটি গুটি পায়ে হেঁটে বাপের বাড়ি চলে গিয়েছে ‌।

_রাগ করে? কি করেছিস?

_অনেক কিছু তোমরা বুঝবে না।

_তোর মতো মানিকের ওপর রাগ করে চলে যায়? কেমন মেয়ে মানুষ?

_অদ্ভুত মেয়ে মানুষ দাদী। অদ্ভুত মেয়ে মানুষ।

সামিন চায়ের বিল মিটিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। এলোমেলো ভাবে হেটে অফিসের গেইট দিয়ে ঢোকে। আজ একটা মানববন্ধন আছে প্রেসক্লাবের সামনে। তার আগে দলের ছেলেদের নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করা জরুরি। অফিসে ঢুকে দেখে সবাই অলস ভঙ্গিতে বসে আছে, কেউ কেউ মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যাস্ত।

সামিন নিজের চেয়ারটাতে গা এলিয়ে দিয়ে বসতে বসতে বলে,"কিছু মাছি এনে মা'র'তে পারতি। এভাবে চুপচাপ বসে থাকলে ভালো লাগে না।"

তৌফ উঠে দাঁড়ায়। সামিন তার দিকে না তাকিয়ে একটা কাগজ দেখতে দেখতে বলে,"আপডেট বল।"

তৌফ চিন্তিত ভঙ্গিতে বলে,"কোনটার?"

_তোর ভাবীর, আমার বৌয়ের।

_ভাবী চারঘন্টা আগে নিউ মার্কেটের বনি টেলিকম থেকে একটা নতুন মোবাইল ফোন কিনেছে এবং সাথে একটা সিমকার্ড। সেখান থেকে বের হয়ে তাদের কলেজের সামনে পার্কের একটা বেঞ্চিতে বসে একটা বান্ধবীর সাথে কিছুক্ষণ গল্প করেছে, তারপর তাদের বাড়ির সামনের একটা ডিসপেনসারির দোকান থেকে আপনার শ্বশুরের জন্য কিছু ওষুধ নিয়েছে। এবং সবশেষে একটু আগে বাড়িতে ঢুকেছে। ওহহ হ্যা ভালো কথা, বাড়িতে ঢোকার আগে কুকুর দেখে ভ'য় পেয়ে দৌড়াতে গিয়ে একবার উষ্ঠা খেয়ে পরে গিয়েছিলো।

সবাই উচ্চস্বরে হেসে ওঠে তৌফের শেষের কথাটা শুনে। সামিন ক'ট'ম'ট দৃষ্টি দিয়ে তাকায় সবার দিকে। সবাই চুপ হয়ে যায়। তৌফ বলতে থাকে,

_তার পরনে ছিলো একটা লাল রঙের সালোয়ার কামিজ, মুখটা ছিলো শুকনো। দেখে মনে হয়েছে সকালে নাস্তা করেনি।

সামিন তৌফের কথায় তার দিকে তাকিয়ে বলে,"বাহ! তুই তো একেবারে ফাটিয়ে দিয়েছিস! এবার আমার বৌয়ের নাম্বার টা এনে দে।"

তৌফ তৎক্ষণাৎ তার ফোনটা বের করে সামিনের দিকে এগিয়ে দিয়ে দাঁতের পাটি মেলে বলে,"কাঁচা কাজ করি না ভাই!"

***

দুমিনিট বইয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে বইটা বিছানার উপরে ছুঁড়ে মারে আলো। সবকিছু তার কাছে নতুন মনে হচ্ছে। কোথা থেকে শুরু করবে ভেবে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। এই ইয়ারের ফার্স্ট ইনকোর্স এক্সাম টাই দিতে পারলো না সে। মার্কস টা না পেলে মুশকিল। কিছুক্ষণ বইয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পরে। মাথাটা বেশ ব্যাথা করছে। এখন এমনিতেও পড়া হতো না। তার চেয়ে একটু ঘুমিয়ে নিলে ভালো হয়। বসার ঘর থেকে পাশের বাড়ির দু'জন ভদ্রমহিলার গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। ইনিয়ে বিনিয়ে আলোর ব্যাপারেই আলোর মায়ের কাছে বলছে তারা। জানতে চাচ্ছে আলো কদিনের জন্য এসেছে। বিরক্তিতে আলো কপাল কুঁচকে ফেলে। ইচ্ছে করছে ভদ্রভাষায় কিছু কটু কথা শুনিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিতে। কিন্তু আলো দাঁতে দাঁত চেপে বসে থাকে। একেবারে ডি'ভো'র্স পেপারে সাইন করে সবাইকে মাইকিং করে জানিয়ে দেবে সে। এখন কিছুদিনের অপেক্ষা।

ঘুম পাচ্ছে খুব। প্রায় ঘুমিয়েও গিয়েছিলো। হঠাৎ ফোনের রিংটোন বেজে ওঠে। আলো বেশ অবাক হয়। তাকে কে ফোন দেবে! কেউ তো তার নতুন নাম্বার জানেই না। রং নাম্বার ভেবে প্রথম বার ফোন টা রিসিভ করে না সে। দ্বিতীয়বারের সময় ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে বলে,"হ্যালো কে বলছেন?"

সামিনের হৃদস্পন্দন বেড়ে গিয়েছে তার কাঙ্ক্ষিত নারীকন্ঠটি শুনে।কন্ঠে সেই চিরাচরিত তেজ। এমন ভাবে হ্যালো বলছে পুরো শহর শুনতে পেয়েছে বোধ হয়। কিছু মুহূর্ত সময় নিয়ে সে বলে ওঠে,"হ্যালো...."

আলোর হাত কেঁ'পে ওঠে। ফোনটা কানের সাথে চেপে ধরে কিছুটা সময় সে নেয়। তারপর বলে,"কে বলছেন?"

_আমি তোমার ফে'রা'উ'ন আছিয়া।

আলো নিশ্চুপ হয়ে যায়। সামিন বলতে থাকে,"কেমন আছো?"

_আপনি আমার নাম্বার পেয়েছেন কিভাবে?

সামিন হেসে ফেলে। হাসি থামিয়ে বলে,"কেনো বাচ্চাদের মতো প্রশ্ন করছো আলো? তোমার ফোন নাম্বার পাওয়া কোনো ব্যাপার আমার কাছে?"

_কি চাই আপনার? আবার কি?

_আপাতত কিছুক্ষণ কথা বলতে চাই।

_ইয়াসার মির্জা।

_হ্যা বলো আছিয়া।

আলো একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলে,"আপনার লোকজন আমাকে ফলো করে, আপনি মাঝরাতে ফোন দিয়ে বিরক্ত করেন, এর মানে টা কি? আপনি কি ভুলে গিয়েছেন সবটা শেষ হয়ে গিয়েছে?

সামিন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বাঁকা হেসে বলে,"শেষ হয়নি আছিয়া। সবটা শুরু হতে যাচ্ছে।"

_মানে?

_মানে অপেক্ষা করো, ধীরে ধীরে বুঝতে পারবে‌। তোমার মতো মাথামোটা মেয়ের ধীরে ধীরে বোঝাই ভালো!

_চরিত্রের দিক থেকে আপনি শুধু ক্রি'মি'না'ল না। একটা নির্লজ্জ মানুষও আপনি জানেন?

_হুম জানি। আমি নির্লজ্জ, আর তুমি ত্যা'ড়া। একজন ত্যা'ড়া মানুষকে কাবু করতে একটা একজন নির্লজ্জ মানুষ দরকার পৃথিবীতে। আমরা একেবারে পারফেক্ট কম্বিনেশন আছিয়া।

চলমান.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন