ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগলো চোখে

৩৩তম পর্ব

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে

#পর্বসংখ্যা_৩৩ (বোনাস পর্ব)

#Esrat_Ety

"বাতাসে নির্বাচন নির্বাচন গন্ধ পাচ্ছি।"

চোখ বন্ধ করে একটা প্রশান্তির গভীর নিঃশ্বাস ফেলে সাগর বলে।

শমশের ভুঁইয়া ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সাগর চোখ মেলে তাকিয়ে বলে,"বিষয়টা পুরোটা মাথার উপর দিয়ে গেলো আব্বা।"

_বিষয়টা যাই হোক না কেনো। লাভ তো আমাদেরই হচ্ছে। এরকম অনাকাঙ্খিত সুযোগ হাতে চলে আসলো।

_কিন্তু হ/জম করতে বেশ কষ্ট হচ্ছে আমার। মানে আপনি ভাবতে পারেন? সিংহ তার সাধের রাজত্ব স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়েছে।

শমশের ভুঁইয়ার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে,"সিংহ রাজত্ব ছেড়েছে শুধু, তার উপাধি না। ওকে আন্ডারস্টিমেট করিস না বাপ। অতীতে বহুবার ওকে আন্ডারস্টিমেট করে কো/প খেয়েছি।"

বাবার কথায় সাগর মাথা নাড়ে, তারপর বলে,"ঠিক বলেছো। ওর মতিগতি বোঝা মুশকিল। নজরে নজরে রাখতে হবে ওকে।"

***

"ভাইয়া "

দরজার বাইরে রিতু দাঁড়িয়ে আছে। সামিন দোতলার বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। রিতুর কথায় মাথা ঘুরিয়ে তাকায়।

" ভাইয়া আত্মীয় স্বজনরা বাড়িতে খাবার দিতে চাচ্ছে। তাদের কি বলবো? "

_এসব কেনো?

_নিয়ম নাকি! ভুলে গেলেন?

_নিয়ম?

সামিন অন্যমনষ্ক হয়ে প্রশ্ন করে। তারপর উত্তরের অপেক্ষা না করেই রিতুকে বলে,"যা মন চায় করো।"

রিতু দাঁড়িয়ে থেকে কয়েক মূহুর্ত পরে বলে," এ/তি/ম/খানায় খাওয়ানোর ব্যাবস্থা করা হচ্ছে। কিন্তু আমি চাচ্ছি বাড়িতেও মিসকিন ডেকে খাইয়ে দিতে। আপনার কাছ থেকে অনুমতি চাচ্ছি। "

_অনুমতির কি আছে রিতু। তুমি যেটা ভালো মনে করো‌। জামিলকে টাকা দিয়ে সব বুঝিয়ে দাও।

তারপর কিছুক্ষণ পরে চুপ করে থেকে বলে,"তুমি এই অবস্থায় দৌড়াদৌড়ি করো না। খাওয়া দাওয়া ঠিকমতো করো। ইহানকে খাওয়াও। ইশিতাকে খাওয়াও। তোমরা না খেয়ে থাকলে বাবা ফিরে আসবে না।"

_আর আপনি? আপনি খাবেন না? গতকাল রাত থেকে কিছু খান নি।

_খাবো। এক গ্লাস পানি পাঠিয়ে দাও কাউকে দিয়ে।

রিতু চলে যাওয়ার আগে নিচু স্বরে বলে,"ভাবী আমার কাছে কিছু টাকা দিয়ে গিয়েছে। কোথায় রাখবো ভাইয়া?"

_বিছানার ওপর রেখে যাও।

***

রেহেনা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বারবার ভেতরে উঁকি দিচ্ছে। আলো খেয়াল করেছে কিন্তু কিছু বলছে না। হিয়া মাথা ঘুরিয়ে রেহেনার দিকে তাকিয়ে বলে,"আন্টি আসুন না। ভেতরে আসুন।"

রেহেনা ভেতরে ঢোকে। আলো তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,"কিছু বলতে চাইলে বলতে পারো।"

রেহেনা আমতা আমতা করে বলে," ও বাড়িতে ভাত-তরকারি দেওয়া টা উচিত নয় কি? "

_কোন বাড়িতে?

_ম/রা বাড়িতে!

আলো মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর বলে, "কেনো? তুমি কি সত্যি সত্যি বেয়াই বাড়ি ভাবছো ও বাড়িকে?"

রেহেনা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে,"পাড়া প্রতিবেশীরা বাঁকা কথা শুনিয়ে যাচ্ছে।‌"

_কোন জন্মে পাড়া প্রতিবেশীর কথা আমি গায়ে লাগিয়েছি? এখন ভাত-তরকারি রেধে পাঠাবে। কাল ঐ সামিন ইয়াসার এসে তোমার কাছে জামাই আদর খেতে চাইবে। খাওয়াবে তুমি?

"আলো এভাবে কথা বলিস না। লোকটার বাবা মা/রা গিয়েছে। এখন অন্তত চুপ কর। শুনতে ইচ্ছা করছে না আর।"

হিয়া চেঁচিয়ে বলে ওঠে। আলো চুপ হয়ে যায়। রেহেনা বলতে থাকে,"তোর বাবাও বলছিলো। তোর মত থাকলে পাঠাবো। এক সমাজে চলতে গেলে শ/ত্রু/র বাড়িতেও তো মানুষ এসব দেয় সামাজিকতার খাতিরে।"

_হ্যা তোমরা এখন মেয়ের কি/ড/ন্যা/পা/র আর ছেলেদের গলায় চা/কু ধরা লোকের ম/র/মে ম/রি/য়া হয়ে উঠেছো। যাও পাঠিয়ে দাও। আমাকে বলছো কেনো? পাড়া প্রতিবেশীর থেকে অনুমতি নাও‌।

রেহেনা কিছুক্ষণ মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে চলে যায়। হিয়া আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,"তোকে কি দিয়ে বানিয়েছে আল্লাহ?"

_আমার সেদিন রে/ই/প হতে পারতো হিয়া।

_হয়নি তো তাই না? তোকে বিয়ে করেছে। রোজ কত শত প/লি/টি/শি/য়া/ন/রা মেয়েদের রে/প করে বনে জঙ্গলে ফেলে দিয়ে যায়। কেউ খবর রাখে না, এমন কিছু তো তোর সাথে হয়নি। তোকে বিয়ে করেছে। শেষমেশ ভুল বুঝতে পেরে তোর জন্য নিজের ক্যারিয়ারের ব/লি চড়িয়েছে।

_তোরা যে দৃষ্টিকোণ থেকেই অ/ন্যা/য়টাকে দেখবি না কেনো হিয়া ওটা অ/ন্যা/য়ই থেকে যাবে। একটা ঘোর অ/ন্যা/য়।

_হ্যা। অ/ন্যা/য় অ/ন্যা/য়ই থাকবে, কিন্তু একজন অ/প/রাধী যে সারাজীবন অ/প/রাধীই থাকবে তোকে এমন কথা মাথার দিব্যি দিয়ে কে বলেছে? জবাব দে আমাকে।

_না সে হজ্ব করে হাজী হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আমি তার কাছে যাবো না। কি করবি এখন আমাকে তোরা? মে/রে ফেলবি? মে/রে ফেল।

হিয়া চুপ করে আলোর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আলো বলে,"তোদের কাছে সে ফে/রেস্তা সম মানুষ কিন্তু আমার কাছে সে একটা অপ/রাধীই থাকবে। অপ/রাধীকে ক্ষমা করা যায়, তার প্রতি সহমর্মিতা দেখানো যায় কিন্তু সংসার করা যায় না হিয়া। আমি কোনো সমঝোতার সংসার চাইনা হিয়া, আমি চাই একটা ভালোবাসার সংসার। ওনাকে আমি কখনো ভালোবাসতে পারবোনা রে। বুঝবি না তোরা। আমাকে কেউ বুঝবি না।"

***

"শরীর খা/রা/প?"

ফুয়াদ ঘরের ভেতর ঢুকে সামিনের বিছানায় বসে। সামিন আধশোয়া হয়ে ছিলো। মৃদু স্বরে বলে," মাথা ব্যা/থা। মে/ডিসিন নিয়েছি। "

_ইশিতার জন্য ডাক্তার ডাকা হয়েছে। অবস্থা খা/রা/প করে ফেলেছে নিজের।

_পরী আছে। দেখবে।

_ইশমামের সাথে কথা হয়েছে?

_হুম। বিকেলে হয়েছে। ভেঙে পরেছে খুব। ওকে সামলানোর কেউ নেই ওখানে।

_আর তোকে?

ফুয়াদ সামিনের দিকে তাকিয়ে বলে। তারপর বলতে থাকে,"তোকে সামলানোর কেউ আছে? তুই নিজেকে দেখেছিস?"

_তুই আছিস। জামিল আছে। আর কাকে লাগবে আমার?

সামিন ঠান্ডা গলায় জবাব দেয়।

কিছুক্ষণ দুজনে চুপচাপ। তারপর সামিন বলতে থাকে,"বাবা সবসময় আফসোস করতেন। তার মৃ/ত্যু/শ/য্যায় ইশমাম পাশে থাকবে না। আজ দেখ ভাগ্যের কি নি/র্ম/ম পরিহাস। তার একটি সন্তানও থাকতে পারলো না। সবকিছু ঘেটে দেই আমি ফুয়াদ। তুই ঠিক বলিস, আমি বড্ড অযোগ্য। "

ফুয়াদ তার বন্ধুর কাঁধে হাত রাখে। সামিন দ্রুত নিজেকে সামলে নেয়। ফুয়াদ প্রসঙ্গ পালটে বলে,"আতাউর আলমের বাড়ি থেকে ভাত-তরকারি পাঠানো হয়েছে। "

সামিন চুপ করে থাকে। ফুয়াদ বলে, " হঠাৎ কি হয়েছিলো ? কেনো এতো বড় সিদ্ধান্ত নিলি? "

_ও আমাকে বললো ওর লাইফে আমার অস্তিত্ব টের পেলে ও সুই/সা/ইড করবে। এতো বড় একটা কথা বললো। তুই ঘৃ/ণার পরিমাণ দেখেছিস? কতটা ক্ষত দিয়েছি আমি ওকে। কিচ্ছু সারাতে তো পারবো না। ভাবলাম একটু স্বস্তি দেই ওকে। ও মনে করে আতাউর আলম ভোটে দাঁড়ালে জিতে যেতো। তাই আমি সেই ব্যাবস্থা করে দিলাম। এতো টুকু স্বস্তি তো আছিয়াকে দেওয়ার ক্ষমতা এই ফে/রা/উ/ন রাখে। ও স্বস্তি পাক।

***

ডেলিভারি বয় এসে নিচে দাঁড়িয়ে আছে। আলো আর শেফালী হাতে হাতে আচারের বৈয়ম গুলো নামিয়ে নিচ্ছে। সানজিদা,বিউটি,হিয়া, শ্রাবনী মশলা প্রক্রিয়াজাত করছে।

ডেলিভারি বয়কে দোকানের লিস্টগুলো বুঝিয়ে দিয়ে আলো ওড়নায় হাত মুছতে মুছতে ছাদে যায়। ছাদে গিয়ে একটা বড় নিশ্বাস নিয়ে বলে,"আজকের মতো কাজ শেষ। শেফালী আপু আর বিউটি আপু। তোমরা যাও। তোমাদের তো কাজ রয়েছে আরো। বাকি কাজ আমরা হাতে হাতে করতে পারবো। "

_সত্যি বলছো? যাবো আলো ?

আলো হেসে বলে," হু যাও। "

শেফালী আর বিউটি চলে যায়। আলো বসে যায় বাকিদের সাথে মশলা প্রক্রিয়াজাত করতে। কিছুক্ষণ পরে নিচে চেঁ/চা/মে/চি/র শব্দ শোনা যায়। সবাই সবার মুখের দিকে তাকায়। আলো উঠে গায়ে ওড়না জরিয়ে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে বাড়ির আঙিনায় চলে আসে। আশেপাশের বাড়ির বেশকিছু লোকজন দাঁড়িয়ে আছে। আলোর বাবা মাও আছে।

আলোকে দেখে ব্যাবসায়ী জালালউদ্দিন বলে ওঠে,"এই যে এসে গিয়েছে আসল লোক।"

আলো বলে,"কি হয়েছে আংকেল?"

_কি হয়েছে? তোমার জন্য তো এই পাড়ায় শান্তিপূর্ণ ভাবে কেউ থাকতে পারবে না দেখছি।

_কি করেছি আমি?

_কি করেছো? আজকাল হি/জ/ড়া/দের সাথে চলাফেরা করো। তোমার ঐসব পোষা হি/জ/ড়া রা কি করে জানো? মহল্লার দোকানে দোকানে চাঁ/দা/বা/জি করে। ভদ্রলোকদের হয়রানি করে বেড়ায়। এইতো গতকাল আর্কিটেক্ট সাহেবের তিন মাসের নাতীর মুখ দেখবে বলে বাড়িতে ঢুকেছিলো। উল্টো করে ঝু/লি/য়েছিলো শিশুটাকে। আরো কত ধরনের অ/ত্যা/চার ওরা করে তুমি জানো?

আলো একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলে,"শেফালী আর বিউটি আপু কি কিছু করেছে? করেনি তো তাইনা?"

_ওরা করেনি কিন্তু তোমার আশকারা পেয়েই তো ওর স্বজাতিরা মহল্লায় ঢুকে এমন করছে।

_স্বজাতি মানে? আমরা সবাই একই জাতি। সবাই মানুষ। শেফালী আর বিউটি আপু যদি কিছু করে থাকে তাহলে আমাকে বলুন। বাকিদের তো আর আমি লিড করিনি। থানায় ক/ম্প্লে/ইন করুন।

জালাল উদ্দিনের পাশ থেকে তার স্ত্রী বলে,"বাদ দাও তো। এই মেয়েকে তুমি চেনো না? কোনো মুরব্বি জ্ঞান নেই এই মেয়ের। এর সাথে কি কথা বলছো তুমি?"

তারপর আতাউর আলমের দিকে তাকিয়ে বলে,"শুনুন ভাই। আপনি সজ্জন ব্যক্তি তাই আপনাকে বলছি। একটু রয়ে সয়ে চলাফেরা করতে বলুন মেয়েকে। আর পারলে একটু ভদ্রতাও শেখাবেন!"

***

" আংকেল আমার কিছু করার নেই। আমি আমার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছি। "

_সামিন। দেখো। ঐদিন সন্ধ্যার পর থেকে তোমার প্রতি আমি যথেষ্ট বিরক্ত ছিলাম। এখন আমি যথেষ্ট ম/র্মা/হত। তাই তোমাকে ধমকাচ্ছি না। কিন্তু তুমি তোমার সিদ্ধান্ত বদলে নাও। বারবার বলছি।

_না আংকেল। আমি গুটিয়ে নিয়েছি সবকিছু থেকে।

_সামিন তুমি কি ভুলে গিয়েছো নমিনেশন পাওয়ার জন্য তুমি কি কি করেছিলে? ভুলে গিয়েছো তুমি? কতটা পরিশ্রম করে তুমি এই পর্যায়ে এসেছো, কোনো টাকা পয়সা ইনভেস্ট না করে, কোনো অ/বৈ/ধ উপায় অবলম্বন না করে। ভুলে গেলে সব?

_কিচ্ছু করার নেই আংকেল।

_চাইছো টা কি সামিন তুমি?

_পুনঃনির্বাচন আংকেল।

কথাটি বলে কবির আলমগীরের মুখের ওপর ফোন কেটে দেয় সামিন। তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। হঠাৎ ফোনের রিংটোন বেজে উঠতেই সামিন ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে, ওপাশ থেকে রনি বলে,"ভাই মহল্লার কিছু লোকজনের সাথে ভাবী হা/ঙ্গা/মা করছে। "

_ওকে ওর মতো ছেড়ে দে রনি। ও সামলে নিতে পারবে। বিরক্ত করিস না ওকে।

***

"আমি নির্বাচনে দাড়াবো? আবার?"

আতাউর আলম হতভম্ব হয়ে যায়। আলো বাবার দিকে তাকিয়ে তেজী কন্ঠে বলে,"হ্যা। দাঁড়াবে।"

আতাউর আলম উঠে দাঁড়ায়। আ/তং/কিত মুখ নিয়ে বলে,"অসম্ভব। আমি আবার ঐ ম/র/ন খেলায় নামতে চাইনা। একেবারেই না। তুই বাদ দে।"

_কেন বাদ দেবো? বাদ দেবো না আব্বু। আবার নির্বাচন হবে। তুমি দাড়াবে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে। ভোট হবে। তুমি জিতবে। আর কেউ তোমাকে দ/মিয়ে রাখতে পারবে না আব্বু।

আতাউর আলম মেয়ের মাথায় হাত রেখে নরম গলায় বলে,"এতো জে/দ বড় খারাপ জিনিস মা। এতো জেদ করিস না। আমি আগের বার ভুল করেছিলাম। আমার মতো লোকের রাজনীতি মানায় না মা। আমার মতো ছাপোষা লোক যার কোনো লোকবল নেই,অর্থ নেই, তার রাজনীতি মানায় না।

_কিন্তু তোমার দেশ সেবা করার মতো একটা উদার মন আছে আব্বু। ওটাই যথেষ্ট আব্বু। সবটা যখন অগোছালো হয়েই গিয়েছে আর একবার এই খেলাটা আমি খেলে দেখতে চাই। তুমি একটা সুযোগ পেয়েছো আব্বু। তুমি দাড়াবে। তুমি অবশ্যই নির্বাচনে দাড়াবে। এবং ঐ ইয়াসার মির্জাকে তুমি জিতে দেখিয়ে দেবে। অবশ্যই দেখিয়ে দেবে।

***

ত্রিশ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে আছে সে। যে কোচিং সেন্টারে‌ আলো পড়ায় সেখানের হেড ম্যাম এখনো এসে পৌঁছায়নি। চাবি তার কাছে। কোচিং সেন্টার টা গলির মেইন রোডের ধারে। আলো পোর্চের নিচে কপাল কুঁ'চ'কে দাঁড়িয়ে আছে। আজ পি/রি/য়/ড হয়েছে তাই মেজাজ টা একটু বেশিই বি/গ/ড়ে গিয়েছে। মাথা ঘুরিয়ে এদিক ওদিক তাকাতেই আলোর চোখ মুখ ভ/য়ে শুকনো হয়ে যায়। কিছু ক্ষ্যা/পা কুকুর এদিকে ছুটে আসছে। আলো ডানপাশে একটা বাইক রাখা ছিলো, সে ভয় পেয়ে বাইকের পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। আলোর দুর্ভাগ্য, কুকুর গুলো তার সামনে এসেই দাঁড়িয়ে আছে। আলোকে দেখছে সবকটা। এমনিতেই এই মাসে সব কুকুর ক্ষ্যা/পা হয়ে যায়। তার উপর এইগুলো কেমন ভ/য়ং/কর মুর্তি ধারন করেছে। জিভ বের করে আছে। আজ আলোর বারোটা বেজে গেলেও যেতে পারে। সে ঢোক গিলে এদিক ওদিক অসহায়ের মতো তাকাচ্ছে।

মেইনরোডের অপজিটে চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আলোকে দীর্ঘসময় ধরে লক্ষ্য করছিলো সামিন। সামিনের চোখে মুখে সং/কোচ। সে জানতো না আলো এখানে পরায়। তাহলে সে আসতো না কখনোই। তার ফোনের রিংটোন বেজে যাচ্ছে। ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ইশিতা উদাসী গলায় বলে,"ভাইয়া। তাড়াতাড়ি এসে নিয়ে যাও আমাকে। "

_আসছি।

শুকনো গলায় বলে সামিন ফোন কেটে দেয়। কোনো উপায় না দেখে আলোর দিকে এগিয়ে যায় সামিন।

কুকুরের ভ/য়ে দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো আলোর। ছুটতেও পারছিলো না সে। অসহায়ের মতো ডান দিকে তাকাতেই সে থ/মকে যায়। নেভি ব্লু রঙের শার্ট গায়ে, অগোছালো চেহারায়, ক্লান্ত ভঙ্গিতে সামিন তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আলো দাঁড়িয়ে থাকে সামিনের দিকে তাকিয়ে। লোকটাকে দেখে মনে হচ্ছে বাবার মৃ/ত্যু/র পরে আর শেভ করেনি। ফরসা মুখে খোচা খোচা দাড়ি। বাহুবলীর মতো শরীরটাকে রো/গা লাগছে বেশ।

সামিন আলোর একেবারে কাছে গিয়ে নিচু স্বরে বলে,"আমার বাইক।"

আলো অবাক হয়ে বাইক টার দিকে তাকায়। সে এতক্ষন সামিনের বাইকে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে ছিলো। মুখ ভর্তি সং/কোচ নিয়ে সে সরে দাঁড়ায়। সামিন বাইকে উঠতে যাবে তখন আলো নিচু স্বরে বলে ওঠে,"কুকুর গুলোকে তাড়িয়ে দিয়ে যান।"

সামিন দাঁড়িয়ে পরে। আলোর নিচু করে রাখা মুখটার দিকে একপলক তাকিয়ে নিচু হয়ে একটা ইটের টুকরো তুলে নিয়ে দূরে ছু/ড়ে মারে। কুকুর গুলো দৌড়ে সেদিকে যায়।

সামিন বলতে না চেয়েও বলে ওঠে,"আমার কাছে হেল্প চাইতে তোমার আত্মসম্মান অসম্মানিত হলো না?"

_আপনার যায়গায় একজন পথচারী হলেও আমি হেল্প চাইতাম।

নিচু গলায় বলে আলো। সামিন কিছু না বলে আবারও বাইকে উঠতে যাবে। তখন আলো বলে ওঠে,"আমার বাবা আবারও নির্বাচনে দাড়াবে।"

_ভালো।

একশব্দে জবাব দেয় সামিন। আলো বলতে থাকে,"এই বার সে জিতে দেখাবে নির্বাচনে। "

_আচ্ছা ঠিকাছে।

সামিনের ঠান্ডা জবাব কোনো এক অদ্ভুত কারনে আলো মেনে নিতে পারছে না। সে সামিনকে উ/ত্তে/জিত করতে বলে ওঠে,"‌আপনার দয়া ছাড়াও মাথা উঁচু করে বাচা যায়। সেটা এবার আমি দেখিয়ে দেবো।"

সামিন আলোর দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলে ওঠে," আমি পদত্যাগ করেছি। তার জন্য আবার নির্বাচন হবে। এটাও কিন্তু একপ্রকার দয়া আলো। দয়াটুকু নিতে তোমার আত্মসম্মানে বাঁ/ধলো না!"

আলো শীতল চোখে সামিনের দিকে তাকায়। তারপর ক্ষে/পে গিয়ে বলে,"না। কারন আপনি গতবার অ/বৈধ ভাবে ভোটে জিতেছেন। আপনার পদত্যাগ করা উচিত। এটা দয়া নয়।"

সামিন তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। সে হাসি আলোকে পী/ড়া দেয়। সে দাঁত খি/চিয়ে বলে,"খুব আত্মবিশ্বাস আপনার নিজের প্রতি তাই না? খুব আত্মবিশ্বাস? তাহলে একটা বা/জি ধরবেন আমার সাথে?"

_কি বা/জি?

_আপনি আবার ভোটে দাঁড়াবেন।

সামিন আলোর দিকে সরু চোখে তাকায়। তারপর বলে,"আমার যদি ভোটে দাঁড়ানোর থাকতো তাহলে আমি পদত্যাগ করলাম কেন? "

আলোর মাথায় জে/দ চেপে গিয়েছে। গম্ভীর কন্ঠে বলে,"আপনার অহংকার আমি ভাঙতে চাই। আপনি পদত্যাগ করেছেন। এবং পুনরায় আপনি নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছেন। তবে এইবার কোনো দল থেকে টিকিট নিয়ে নয়। আমার বাবার মতো একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে। বলুন রাজী? আছে দম? অনেক তো দলের নাম ভা/ঙিয়ে খেলেন। এখন নিজের ক্ষমতা দেখান পারলে।

সামিন আলোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে,"বাচ্চামো করো না। "

কথাটি বলে সামিন আবারো বাইকে উঠতে যাবে অমনি আলো বলে ওঠে," ঠিক জানতাম। আপনার ক্ষ/মতা আসলে ঐ দল। নিজের কিছু নেই। ভয় পাচ্ছে ইয়াসার মির্জা। "

সামিন দাঁড়িয়ে পরে। আলোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে," আচ্ছা ধরলাম বা/জি। তো মনে করো যদি তোমার বাবা জিতে যায় তাহলে কি হবে? "

_তাহলে আপনি আমার আব্বুর পায়ে নাক খ/ত দেবেন।

সামিন চুপ করে আলোকে দেখে। তারপর বলে,"তাই? আর যদি আমি জিতি? আমি যেটা বলবো সেটা শুনতে পারবে? "

আলো চুপ করে থাকে। সামিন বলে," দম তো তোমার নিজের নেই আলো। তাই আমার দম নিয়ে প্রশ্ন করো না। বাড়িতে গিয়ে ঠান্ডা মাথায় ঘুমাও। তোমার বাবার জন্য অগ্রীম শুভকামনা।"

আলো দাঁতে দাঁত চে/পে বলে ওঠে,"আমি রাজি।"

সামিন তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে, তারপর বলে, "তাই? ভেবে দেখো আলো। বেশি কনফিডেন্স ভালো না।"

_আমি রাজি। কি চান আপনি? আমাকেই তো চাইবেন তাই না? ঠিকাছে। আমি রাজি আপনার শর্তে। কারন আমি জানি আপনি জিততে পারবেনই না।

সামিন আলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। আলো দাঁতে দাঁত চেপে বলে,"এই আলো ভ/য় পাওয়ার মেয়ে না সামিন ইয়াসার। আমি রাজি। বাবা জিতলে আপনি আমাদের কথা শুনবেন আর আপনি জিতলে আমি আপনার কথা শুনবো। চ্যা/লে/ঞ্জ এ্যাক্সেপ্টেড।

সামিন আলোর দিকে তাকিয়ে বলে," নিজের কথায় নিজে জরিয়ে যাবে আলো, পরে আমাকে দো/ষ দিও না।"

আলো চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। সামিন বাইকে উঠে বাইক স্টার্ট করে চলে যায়।

আলো হাত মুষ্টি/বদ্ধ করে রেখেছে। গা এখনো জে/দে কাঁ/পছে। যা হয় হোক। ঐ লোকটাকে ওর ক্ষমতা দেখিয়ে ছাড়বে আলো। ওর দলের জন্য লোকজন ওকে ভোট দেয় এটা হা/ড়ে হা/ড়ে টের পাবে এইবার নির্বাচনে হেরে ঐ সামিন ইয়াসার মির্জা।

***

কোচিং সেন্টারের হেডম্যাম রিকশা থামিয়ে আলোর সামনে দাঁড়ায়। অ/প/রাধী গলায় বলে,"সরি এক ঘন্টা দাড় করিয়ে রাখলাম তোমায়। সরি আলো।"

আলো ম্যামের দিকে তাকিয়ে শুকনো গলায় বলে," আপনার কি হয়েছে? আপনি এভাবে কাঁপ/ছেন কেন?"

_আর বলো না, গলির ওই মাথায় মেইনরোডে এক ভয়াবহ এ/ক্সি/ডে/ন্ট হয়েছে। একটা নীল রঙের আর ওয়ান ফাইভ কে একটা বালুভর্তি ট্রাক রাস্তায় পি/ষে দিয়ে গিয়েছে। লোকটার মাথা থেঁতলে গিয়েছে। আমি দূর থেকে দেখেছি লোকের ভীর। র/ক্তের ব/ন্যা বয়ে গিয়েছে। সদর হস/পিটালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। লোকটা মনে হয় না বাঁ/চবে আলো।

একনাগাড়ে বলে ওঠে হেড ম্যাম। আলো কেঁ/পে ওঠে। নীল রঙের আর ওয়ান ফাইভে তো সামিন গিয়েছে এই মাত্র। আলো এদিক ওদিক তাকিয়ে বড় বড় নি/শ্বাস নিতে থাকে। হেড ম্যাম বলে ওঠে,"তোমার কি হয়েছে আবার আলো? "

আলো একটা ঢোক গিলে নিয়ে বলে,"ম্যাম আজকে আমাকে ছুটি দিন। সরি।"

আলো কথাটি বলে মেইন রোডে নামে। একটা রিকশা থামিয়ে উঠে পরে বলে,"সদর হস/পিটাল চলুন।"

আলো বুঝতে পারছে না তার এতো অ/স্থির লাগছে কেনো। ফোনে বারবার ইশিতাকে ফোন দিচ্ছে আলো। ইশিতা ফোনটা ধরছে না ‌।

আলোর অ/স্থিরতা বেড়ে যাচ্ছে। হসপিটালের সামনে রিকশা থামিয়ে কোনোমতে ভাড়া মিটিয়ে সোজা ইমা/র্জেন্সি ইউনিটে চলে যায় আলো। প্রচুর লোকজন সেখানে। সরাসরি ইউনিটে ঢুকতেই একজন নার্স এসে তাকে থামায়,"আরে আরে। কোথায় যাচ্ছেন?"

আলো এদিক ওদিক তাকিয়ে হাঁ/পাতে হাঁ/পাতে বলে,"এই মাত্র ঝিলবাড়ির এ/ক্সি/ডেন্ট স্পট থেকে একজনকে নিয়ে আসা হয়েছে। "

_আর ওয়ান ফাইভের আরোহী? অবস্থা খুবই খা/রাপ তার।

আলো আ/তংকিত মুখ নিয়ে তাকিয়ে থাকে নার্সের দিকে। নার্স বলে,"বাঁ/চবে কি না বলা যাচ্ছে না। "

আলো কেঁ/পে ওঠে। নার্স আলোকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে বলে,"তার পরিবার থেকে এখনো কেউ আসেনি। আপনি কে? ভি/ক্টিম কি হয় আপনার?"

আলো বিধ্বস্ত চেহারা নিয়ে নার্সের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে,"স্বামী।"

চলমান.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন