#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে
#পর্বসংখ্যা_৩৪
#Esrat_Ety
নার্সটি আলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। কয়েক মূহুর্ত পরে বলে ওঠে,"আপনি ভি/ক/টি/মের ওয়াইফ?"
আলো চ/ম/কে ওঠে! অবচেতন মনে এইমাত্র সে সামিনকে নিজের স্বামী বললো?
তার পুরো মুখ অ/স্ব/স্তি/তে ছেয়ে যায়। পেছন থেকে হঠাৎ একজন ডাক্তার বলে ওঠে," কী হয়েছে লিপি?"
_স্যার এ/ক্সি/ডে/ন্টের ভি/ক/টি/মের ওয়াইফ বলছে।
ডাক্তার মুখের মাস্ক খুলে বলে আলোর দিকে তাকায়। আলো কাঁ/পা কাঁ/পা গলায় বলে,"ওনার এখন কি অবস্থা?"
ডাক্তার কিছু বলতে যাবে তখন একজন ওয়ার্ডবয় এসে বললো,"স্যার সুমন বলে লোকটার ওয়াইফ এসেছে।"
ডাক্তার ওয়ার্ডবয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,"সুমন কে?"
_স্যার ঝিলবাড়ি এ/ক্সি/ডে/ন্টের ভিকটিম। মানিব্যাগে আইডি কার্ড ছিলো। কিছুক্ষণ আগে যাকে আনা হলো।
ডাক্তার মাথা ঘুরিয়ে আলোর দিকে তাকিয়ে বলে," আপনি কে তবে?"
আলো এদিক ওদিক তাকিয়ে একটা ঢোক গি/লে নিয়ে বলে,"ভুল হয়ে গিয়েছে। দুঃখিত।"
কথাটি বলে ঘুরে করিডোরের উল্টো পথে হাঁটতে থাকে আলো। ক্লা/ন্ত ভঙ্গিতে অন্যমনষ্ক হয়ে হাঁটছে। হুট করে এক মহিলার সাথে ধা/ক্কা খে/য়ে নিচে পরে যায় আলো। মহিলা চেঁচিয়ে ওঠে,"কানা নাকি? চোখ কোথায় নিয়ে হাটো?"
আলো কোনো জবাব না দিয়ে আবারো উঠে হাঁটতে থাকে। তার নিজের প্রতি নিজেরই বেশ অবাক লাগছে । হচ্ছেটা কি আসলে! ফোনের ভাইব্রেশনের শব্দ হতেই ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে। ওপাশ থেকে ইশিতা শুকনো গলায় বলে,"ফোন দিয়েছিলে ভাবী? ভাইয়ার সাথে বাইকে ছিলাম। দেখতে পাইনি।"
_হ্যা, ওই আর কি তোমার শরীরের খোজ নিতে। কেমন আছো তুমি? রিতু কেমন আছে?
_ভালো আছি আমরা।
ইশিতার কথা শুনে আলোর বেশ খারাপ লাগে। অনেক ভেঙে পরেছে মেয়েটা। কিছুক্ষণ কথা বলে ফোন কেটে দেয়। ইশিতার একটা ব্যাপার আলোর বেশ ভালো লাগে। তারা যখন কথা বলে তখন ইশিতা কখনোই সামিনের প্রসঙ্গ টে/নে আনে না।
***
"মানে? নিজে পদ/ত্যাগ করলে। এখন যখন পুনঃনির্বাচন হবে এখন আবার ভোটে দাঁড়াবে? স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে? কেন? দল তোমার কি ক্ষতি করেছে সামিন? ইমতিয়াজ ভাইয়ের মৃ/ত্যু/র শো/ক কাটিয়ে উঠতে পারোনি জানি, তাই বলে এমন উ/ন্মাদের মতো কেন আচরণ করছো? "
কবির আলমগীর ধ/ম/কের সুরে বলে কথা গুলো। সামিন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে,"একজনের আবদার পূরণ করতে।"
"হোয়াট! তুমি এসব কি বলছো? তোমাকে কি পাবনা শিফট করতে হবে? রাজনীতি ছেলে খে/লা? এমনিতেই তোমার হঠাৎ পদ/ত্যাগে পার্টি গ/রম হয়ে আছে। সবাই আমাকে চা/প দিচ্ছে তোমাকে বের করে দিতে। আমি সবাইকে মানিয়ে যাচ্ছি। তুমি আর আমাকে
ভু/গিও না সামিন। পদ/ত্যাগ পত্র ফেরত নাও। এখনো সময় আছে। "
_না আংকেল। আপনি খন্দকারকে দিয়ে দিন নমিনেশন। আমি স্বতন্ত্র লড়তে চাই।
কবির আলমগীর দাঁতে দাঁত চেপে বলে,"লাভ কি হবে ? দল থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে কি করতে পারবে তুমি? পদ/ত্যাগ যখন করেই ফেলেছো আর ল/ড়ো না। এইবার আতাউর আলম, শমশের ভুঁইয়া, খন্দকার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রিপন মজুমদার। এদের সাথে টেক্কা দিয়ে গো হারা হারবে তুমি। তামাশা কেনো চাইছো? "
_হা/রতেই চাচ্ছি আংকেল।
_কেন?
_একজনের মুখে হাসি ফোটাতে। সে অনেকদিন হয় হাসে না।
_সামিন... তোমার আন্টি তোমার জন্য টেনশন করছে।
_আসবো, আন্টিকে দেখা দিয়ে যাবো ভোটের আগে। রাখছি।
ফোন কেটে দিয়ে সামিন দীর্ঘসময় চুপ করে বসে থাকে। ইশমাম অনবরত ফোন দিয়ে যাচ্ছে। এখন একটুও ইচ্ছে করছে না তার কথা বলতে। ফোনটা দূরে সরিয়ে রেখে বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পরে।
***
"মানে? ইয়াসার আবার কেন ভোটে লড়বে? ও তো নিজেই পদত্যাগ করেছে।"
আলো শাড়িগুলো ভাজ করে আলমারিতে তুলে রেখে আতাউর আলমের দিকে তাকায়। তারপর বলে," যোগ্যতা প্রমাণ করতে। তুমি বাচ্চাদের মতো কিছুক্ষণ পর পর আমাকে প্রশ্ন করবে না। যাও।"
আতাউর আলম মেয়ের ঘরে ঢোকে। নরম গলায় বলে," মা। তুই ঠিক আছিস তো? এমন কেনো করছিস? ও তো ওর ভুলটা স্বীকার করেছে। এখন এসব বাদ দে। "
আলো বাবার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চলে যায়। রেহেনা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে স্বামীর দিকে তাকিয়ে আছে। বিড়বিড় করে বলে, "এই মেয়ে দেখবে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনবে একদিন। মেয়ে মানুষের এতো জে/দ ভালো? যথেষ্ট কি হয়নি? রা/গ তো আমাদের ও ছিলো। ও এখন ওর বাবা মায়ের থেকেও বেশি বুঝতে শুরু করেছে। ফল ভালো হবে না,দেখো।"
আলোর নাম্বার থেকে ফোন দেখে সামিন কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে স্ক্রিনের দিকে। তারপর ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরতেই আলো বলে ওঠে,"রুলস নাম্বার এক...."
সামিন আলোকে থামিয়ে দিয়ে বলে,"রুলস নাম্বার এক, আমি কোনো ক্যাম্পেইন করিনি আলো। কারো কাছে যাইনি। কাউকে টাকা দেইনি। প্রচারনার জন্য শুধু পোস্টার লাগানো হয়েছে।"
আলো চুপ করে থাকে, সামিন বলতে থাকে,"রুলস নাম্বার দুই। আমার দলের ছেলেরা আমাকে কোন সাহায্য করছে না। এবং,
রুলস নাম্বার তিন, আমি আগামী পরশু পর্যন্ত বাড়ি থেকে বের হচ্ছি না।"
আলো এখনো নিশ্চুপ। সামিন বলতে থাকে,"সবকিছু মনে আছে আমার আলো। তুমি নিশ্চিন্তে তোমার কাজ করো।"
কথাটা বলে সামিন ফোন কেটে দেয়। স্ক্রিনে আলোর ছবিটার দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে,"কি অবুঝ তুমি আছিয়া। "
সামিনের দলের ছেলেরা সবাই কপাল কুঁ/চ/কে আছে। সামিন ম্লান হেসে বলে, " তোদের একটা সুখবর দিই। আমি দ্বিতীয় বিবাহ করতে যাচ্ছি। তোরা আমার জন্য মেয়ে দেখবি। "
দলের সবাই সামিনের এমন র/সিকতায় সাড়া দেয় না। রাহাত
বি/রক্ত ভঙ্গিতে বলে, " ভাই। সবকিছুর কিন্তু একটা লিমিট থাকে!"
সামিন শুকনো হাসি হেসে বলে,"তোরা তোদের ভাবীর উপর শুধু শুধু রা/গ করছিস। ও ওর যায়গায় ঠিক।"
_হ্যা। সে তার যায়গায় ঠিক, আপনিও আপনার যায়গায় ঠিক। এখন আমরাও আমাদের যায়গায় ঠিক থাকবো। জিন্দেগীতেও ওই মেয়েকে আমরা আপনার জীবনে আসতে দেবো না ভাই। ঐ মেয়ে আপনার মতো কাউকে ডিজার্ভই করে না। ওর জন্য হিট/লার বেস্ট।
আরাফ চেঁচিয়ে বলে ওঠে। সামিন তার দিকে তাকিয়ে বলে,"শান্ত হ। তো বিপি হাই হচ্ছে। ওই মেয়ে আমার জীবনে আসবেও না। আমি নির্বাচনে হারবো। তোরা চা/প নিস না।"
জামিল অসহায়ের মতো একবার সামিন, একবার দলের ছেলেদের দিকে তাকায়। সামিন জামিলের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে," তোকে কাজ দিতাম না। কিন্তু তোর ভাবীর দেওয়া রুলস মোতাবেক আমার দলের ছেলেরা আমার কোনো সাহায্য করতে পারবে না। তাই তোকে বলা, থানারোডের এ/তি/ম/খা/নায় চারটা খাসি পাঠানোর ব্যাবস্থা কর। আজ মাসুদের জন্মদিন। ওকে প্রমিজ করা, বিরিয়ানি খাওয়াবো । "
***
"আংকেল আমি ফুয়াদ। আপনি হয়তোবা চেনেন।"
আতাউর আলম ফুয়াদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মাথা নাড়ায়। ফুয়াদ বলতে থাকে," আলোর সাথে আমার একটু দরকার ছিলো। কাইন্ডলি একটু ডেকে দেবেন?"
আতাউর আলম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অস্ফুট স্বরে বলে,"বসো তুমি। দিচ্ছি।"
পর্দা সরিয়ে বসার ঘরে ঢুকে আলো অবাক হয়ে যায়। ফুয়াদ উঠিয়ে দাঁড়িয়ে বলে, "তোমার সাথে কথা বলতে এসেছি আলো।"
***
"তুই চিন্তা করিস না ছোট। কিছু হয়নি। কাল সব ঠিক হয়ে যাবে। "
ইশমাম কিছু মুহূর্ত চুপ থেকে বলে, " তুমি অবুঝ শিশুদের মতো করছো ভাইয়া। "
_জানি না কিসের মতো করছি তবে করা উচিত নয়কি? ও স্বস্তি পাচ্ছে।
ইশমাম ক্ষে/পে যায়। চেঁচিয়ে বলে ওঠে, "ভাইয়া তুমি ভুলে যেও না আমরাও তোমার লাইফে আছি। আমাদেরও ইম্পর্ট্যান্স দাও। তুমি ছাড়া কেউ নেই আমাদের।"
সামিন ম্লান হেসে বলে,"আগামীকালের পর থেকে সবটা নিজের হাতে শে/ষ করবো। তুই টেনশন করিস না।"
***
"আত্মগড়িমা আর আত্মসম্মান দুটোই আলাদা জিনিস আলো। তুমি গুলিয়ে ফেলছো।"
_আপনি কি এসব বলার জন্য এসেছেন ফুয়াদ ভাই? চা খাবেন না? বন্ধুর শশুরবাড়িতে এসেছেন। আগামীকালের পর থেকে তো আর সেই অধিকারে আসতে পারবেন না।
ফুয়াদ আলোর সেকথার জবাব না দিয়ে বলে," সামিন তোমার জন্য উপযুক্ত কি না জানি না, কিন্তু তুমি সামিনের জন্য উপযুক্ত নও আলো, এইমাত্র বুঝতে পারলাম। সামিনকে প্র/তি/হিংসা পরায়ণ বলো না? আসল প্র/তি/হিংসা পরায়ণ তুমি। সামিনের চরিত্রে কিছু ত্রু/টি ছিলো, ও শুধরে নিয়েছে সেসব। কিন্তু তোমার চরিত্রে যেসব ত্রু/টি রয়েছে আলো, তুমি শোধরাতে পারবে না। কারন নিজের ত্রুটি বুজতে পারার মতো বোধশক্তি তোমাকে আল্লাহ দেয়ইনি। নিজের প্র/তি/শোধের ষোলো আনাই উশুল করে ছারলে আমার বন্ধুর থেকে। তাতেও তোমার মন ভরলো না, ওকে কথার মা/র/প্যাঁ/চে ফেলে ভো/গাচ্ছো এখন। তিনদিন হলো নিজেকে বাড়িতে ব/ন্দি করে রেখেছে শুধু তোমার ফা/ল/তু আবদার রাখতে।"
আলো চুপচাপ ফুয়াদের কথা শোনে। ফুয়াদের কথার জবাব সে দেয় না। ফুয়াদ বলতে থাকে," এনি ওয়ে, যা যা চাইছো সব হবে। আমিও তৈরি। যেমন দাঁড়িয়ে থেকে তোমাদের বিয়েটা দিয়েছিলাম। তেমন দাঁড়িয়ে থেকে ডি/ভো/র্স করিয়ে দেবো। আমার বন্ধুর জন্য একটা খা/রা/প মেয়ে এনে দেবো। তোমার মতো ভালো মেয়ের প্রয়োজন নেই আমার বন্ধুর লাইফে।"
কথাটা বলে ফুয়াদ উঠে চলে যায়। আলো চুপচাপ বসেই থাকে।
***
পদ/ত্যাগ করে সামিনের পুনরায় ভোটে দাঁড়ানোর থেকেও গোটা শহরের কাছে সবথেকে চাঞ্চল্যকর বিষয় হচ্ছে জামাই শশুর উভয় উভয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী। এমন ঘটনা বিরল। সবাই কৌতুহলী পুরো ব্যাপারটায়।
ভোটের দিন সকাল থেকেই শহরে টান টান উ/ত্তে/জনা বিরাজ করছে।
মার্কেটের বিভিন্ন স্থানে ছয় প্রার্থীর পোস্টার লাগানো।
আতাউর আলম ভোটকেন্দ্র থেকে ফিরেই অ/সু/স্থ হয়ে পরেছে কিছুটা। অপা/রেশনের পরে এতোটা চাপ এই প্রথম নিয়ে ফেলেছে। তাই অস্থির লাগছে বেশ। আলো আতাউর আলমের সাথে গিয়ে ভোট দিয়ে এইমাত্র ফিরলো। তার মুখে কোনো ভাবান্তর নেই। চুপচাপ অপেক্ষা করে আছে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার, অপেক্ষা করছে ফলাফলের।
"আব্বা ইয়াসার মনে হয় আমাদের সাথে কানামাছি খেলা খেলছে। নিজে পদত্যাগ পত্র জমা দিয়ে আবার নিজেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ল/ড়/ছে। ও কি পাগল হয়ে গিয়েছে আব্বা?"
সৈকত কথাটি বলে তার বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। শমশের ভুঁইয়া বলে," বুঝতে পারছি না। তবে এইবার ওর জেতার চান্স নেই সেটা লিখে নে। মানুষ নিজের পায়ে নিজে কু/ড়া/ল বসায়। এই পা/গল তো বুল/ডোজার বসিয়ে দিলো। "
সাগর বলে ওঠে," সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারছি না। ওর কনফিডেন্স দেখ। দল ছেড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে লড়ছে।"
শমশের ভুঁইয়া অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে,"চিন্তা করিস না। এইবার আমরাই জিতবো।"
বরাবরের মতো নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে জানিয়েছে জনগণ। লোকাল সাংবাদিকেরা তার উপরে একটি ডকুমেন্টরি তৈরি করে লোকাল নিউজ চ্যানেল গুলোতে দেখাচ্ছে।
শান্তিনীড়ের নিচতলার লিভিং রুমের মেঝেতে সবাই আসন পেতে বসে টিভির দিকে তাকিয়ে আছে। একটু পর ফলাফল প্রকাশ হবে। সবার মধ্যে টান টান উ/ত্তে/জ/না। সামিন ভাবলেশহীন ভাবে বসে আছে চুপচাপ, যেন ফলাফল নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। সে আগেই জানতো ফলাফল কি হবে।
টিভিতে কিছুক্ষণ পর ফলাফলের চার্ট প্রকাশ করা হয়। নব্বই হাজার ভোট পেয়ে সামিন প্রথম বারের মতো কোনো দলীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই দ্বিতীয় বারের মতো প্রথম স্থানে রয়েছে। এরপর দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে সরকারি দলের মনোনীত প্রার্থী ইউনুস খন্দকার, সে পেয়েছে পঞ্চাশ হাজার ভোট, এবং তৃতীয় স্থানে রয়েছে আতাউর আলম, পেয়েছে আটচল্লিশ হাজার ভোট। চতুর্থ স্থানে শমশের ভুঁইয়া ছত্রিশ হাজার এবং পঞ্চম স্থানে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রিপন মজুমদার পয়ত্রিশ হাজার ভোট পেয়েছে।
লিভিং রুমে থাকা ছেলেরা কিছুক্ষণ নিজেদের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে বিকট চিৎকার দিয়ে ওঠে। সামিন টিভির স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে। সংবাদ পাঠকের মুখ থেকে আবারো তার জয়ের খবর শুনছে সে। নিজের জয়ে নিজেই কিছুটা অবাক সামিন। কিন্তু যেখানে তার খুশি হবার কথা সেখানে সে খুশি হতে পারছে না। কোনো এক অজানা উৎ/কণ্ঠা ভীর করেছে তার মনে। ওদিকে আলো কি করছে? মেনে নিতে পেরেছে তো এই হার? যে ভ/য়ং/কর সেন/সিটিভ একটা মেয়ে কিছু উল্টো পাল্টা করে না বসে আবার।
সবুজ সামিনের দিকে তাকিয়ে বলে," যান ভাই। এখন আবার ভাবীকে তুলে আনেন। খুব বা/জি ধরেছিলো , এখন বুঝুক। "
সামিন কিছুক্ষণ সবুজের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর উঠে দাঁড়ায়। দলের ছেলেরাও সামিনের সাথে সাথে উঠে দাঁড়ায়।
সামিন সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে," তোরা কোথায় যাচ্ছিস? "
_আপনার সাথে ভাই।
_প্রয়োজন নেই। আমি একা যাবো।
***
টিভির স্ক্রিনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে আলো। আতাউর আলম স্বাভাবিক। সবসময় ঠান্ডা মাথার লোক সে। এমন পরিস্থিতির জন্য সে মানসিকভাবে তৈরিই ছিলো যখন শুনেছে ইয়াসার আবারো ভোটে দাঁড়াবে। একজন জিতে যাওয়া লোক পুনরায় জিতবে এটাই তো স্বাভাবিক। মেয়ের জেদের কাছে হার মেনে দাঁড়িয়েছিল ইলেকশনে। তাই তার কোনো ভাবান্তর হয়নি। এই পরিস্থিতিতে নিজের অসম্মান নয় বরং আলোর কথা ভাবছে সে। তার মেয়েকে সে চেনে। এতো কিছু সহজে গ্রহণ করার মেয়ে আলো নয়।
কিন্তু আলো কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। কিছুক্ষণ টিভির দিকে তাকিয়ে থেকে উঠে দাঁড়ায়। আতাউর আলমের ওষুধ এনে দেয় তাকে। আতাউর আলম ওষুধ নিয়ে মৃদু স্বরে বলে," নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে মা। আমার কোনো আক্ষেপ নেই। মাথা ঠান্ডা কর। "
আলো বাবার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে ওঠে," মাথা
গ/র/ম হয়নি আমার আব্বু। "
তারপর ধীরপায়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে নিজের ঘরে চলে যায়।
কলিং বেলের শব্দ হয়। রেহেনা গিয়ে দরজা খুলে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। সামিন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে ওঠে,"আসতে পারি?"
রেহেনা এদিক ওদিক তাকিয়ে দরজা থেকে সরে দাঁড়ায়। দ্রুতপায়ে হেটে সামিন আলোর ঘরের দিকে যায়। আলোর ঘরের দরজার বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়ে পরে। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। সামিন উচ্চশব্দে চেঁচিয়ে ওঠে,"আলো দরজা খুলে দাও।"
কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে সামিন দরজায় ধাক্কা দিতে যাবে অমনি খট করে দরজা খোলার আওয়াজ হয়।
সামিন আলোকে কয়েক পলক দেখে ঘরে ঢুকে দরজার সিটকিনি তুলে দেয়।
আলো নি/স্তেজ কন্ঠে বলে,"অভিনন্দন!"
সামিন ঘুরে আলোর দিকে তাকায়।
আলো একটু থেমে আবারও বলে,"অভিনন্দন আপনাকে জেতার জন্য, ইলেকশন এবং বা/জি দুটোই।"
সামিন আলোর দিকে তাকিয়ে আছে। আলো নিচু স্বরে বলতে থাকে,"বসার ঘরে গিয়ে বসুন। ব্যাগ গোছানো হয়ে গিয়েছে। আমি শাড়িটা পাল্টে আসছি।"
_কোথায় যাবে তুমি?
আলো মাথা তুলে সামিনের দিকে তাকায়। তারপর বলে,"আপনার সাথে। সংসার করতে। বা/জিতে জিতেছেন আপনি।"
সামিন ম্লান হাসে। তারপর নিচু স্বরে বলে,"কোথাও যেতে হবে না তোমাকে আলো। "
আলো সামিনের দিকে দীর্ঘক্ষণ উদাস দুটি চোখ নিয়ে তাকিয়ে থেকে তে/জী কন্ঠে বলে ওঠে," আপনার দয়া দেখাতে হবে না। আমি ভীতু মেয়ে নই , আমি যাবো, আমি আমার কথা রাখবো। করবো আমি সংসার আপনার সাথে। "
কথাটি বলে আলো আলমারির কাছটায় যেতে নেয়, মুহুর্তেই হাতে সামিনের হাতের স্পর্শ পেয়ে ঘুরে তাকায়। ততক্ষণে সামিন আলোকে নিজের কাছে টেনে নিয়েছে। আলো সামিনের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। সামিন ম্লান হেসে আলোর কপাল থেকে অগোছালো চুল কানে গুজে দিয়ে বিড়বিড় করে বলে,
"অবুঝ আছিয়া। আমার ভালোবাসাকে বরাবরের মতো ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছো তুমি। দয়া আমি তোমাকে করিনি। কখনোই করিনি। এটাও দয়া না। যেটুকু আমি তোমাকে দিলাম তার নাম ভালোবাসা। "
আলো চুপ করে সামিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। সামিন আলোর মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে থাকে, "তোমাকে কখন ভালোবেসে ফেলেছি তা আমি জানি না। কিন্তু যখন তুমি সা/পের ভ/য়ে আমাকে এসে আ/ক/রে ধরলে। তখন থেকে বুঝতে পেরেছি আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। তখন থেকে প্রতিটা মূহুর্ত আমি যা তোমাকে দিয়েছি সেটা আমার ভালোবাসা। বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড উলটে গেলেও ঐ অনুভূতি ভালোবাসাই থাকবে, তুমি যতই ভুল ব্যাখ্যা দাও না কেন। তোমার মতো ক্ষুদ্র আছিয়ার অপব্যাখ্যায় আমার ভালোবাসা বদলে যাবে না।"
আলো নিশ্চুপ। সামিন বলতে থাকে, " তুমি আমার না পাওয়া একটা প্রশান্তি। তোমায় আমি আমার মনে আটকে রাখবো, কাগজে কলমে না পারি। যা যা আবদার করেছো, পূরন করেছি। বা/জিতে জিতেছি। শর্ত হিসেবে তুমি আমার কথা শুনবে। আর আমার কথা হচ্ছে, তুমি ভালো থাকো। তোমাকে ভালোবাসার উপহার স্বরূপ দু এক দিনে ডি/ভো/র্স লেটার সাইন করে পাঠিয়ে দেবো। সাইন করে বাঁধিয়ে ঐ দেয়ালে টাঙ্গিয়ে রাখবে। আমি চাই তুমি আমার ভালোবাসা প্রতিদিন দেখো। "
আলো কিছু বলতে যাবে, সামিন আলোর মুখ চেপে ধরে, তারপর বলে,"চুপ। আমি এতো এতো তোমার হৃদয় প্রশান্ত করা কথা বলে যাচ্ছি। তোমার কান কি শান্তি পাচ্ছে না? বলো? কেন এখন আমাকে য/ন্ত্র/না দিতে কথা বলতে চাইছো। কিচ্ছু শুনতে চাই না আমি তোমার থেকে, আমি পারবো না, আমার ক্ষমতা নেই। উল্টোপাল্টা কথা বলে আর আমাকে য/ন্ত্র/না দিও না আছিয়া।"
কয়েক মূহুর্ত পরে আলোর মুখ থেকে সামিন হাত সরিয়ে নিয়ে আলোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর আলোর গালে আলতো করে হাত বুলিয়ে তার কপালে লম্বা সময় ধরে একটা চু/মু খায়। আলো চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।
সামিন আবারো আলোর চোখে চোখ রেখে মৃদু স্বরে বলতে থাকে, " সব কিছু অনেক বেশি সুন্দর হতে পারতো আছিয়া, অনেক বেশি রঙিন। কিন্তু তুমি ব/র্ণা/ন্ধ। রঙের গুরুত্ব তুমি বুঝতেই চাচ্ছো না। তোমার নারী স্বত্তার অনূভুতিকে সম্মান জানাতে আমি আমার জীবনের সবথেকে বড় ত্যা/গ স্বীকার করলাম। নয়তো সামিনের জিনিস সামিন ইহ/জনমে ছাড়ে না। "
কথাটা বলে সামিন আলোকে ছেড়ে দেয়। আলো চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে সামিনের দিকে তাকিয়ে। সামিন আলোর ঘরের দরজা খুলে চলে যায়। দীর্ঘসময় আলো নিজের স্থানে দাঁড়িয়ে থেকে বিছানায় ধপ করে বসে পরে।
চলমান......