#পর্ব_০৯
#হাওয়ায়_সুরগান
#Sharmin_Shaajh_Nur
ড্রেসিং টেবিলের সামনে নিঃশব্দে বসে আছে মায়া। বধূবেশে তার শরীরে জড়ানো লাল-সোনার ঝলমলে লেহেঙ্গা, গায়ে গয়নার ভার—সব কিছু মিলিয়ে যেন এক রাজকন্যার অবয়ব। তার দৃষ্টি থমকে আছে আয়নার প্রতিবিম্বে যেখানে সে নিজেকে দেখছে কিন্তু ঠিক চিনে উঠতে পারছে না যেন। এতদিন যাকে আয়নায় দেখেছে আজ সেই মুখটাই যেন নতুন—অচেনা, তারপরও নিজের। পার্লারের মেয়েরা কিছুক্ষণ আগেই সাজসজ্জা শেষ করেছে। চোখে গাঢ় কাজল, ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক, মুখে হালকা প্রসাধনী। মাথার উপরে ঘোমটা আঁচলের মতো নামিয়ে রাখা আর তার নিচে চোখে-মুখে একরাশ অনিশ্চয়তা।
আজ তার আর আরহানের বিয়ে। বাড়ি ভর্তি লোকজন, আলো, রঙিন সাজসজ্জা, হাসি-আনন্দ আর কথার গুঞ্জনে ভরে উঠেছে চারদিক। কিন্তু এই কোলাহলের মাঝেও মায়ার মনটা যেন নিঃস্তব্ধ। বুকের ভিতর হালকা কাঁপুনি। মনটা এক অজানা দ্বিধায় টালমাটাল।
রাতের ঘড়ি তখন নয়টা ছুঁইছুঁই। হয়তো আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই বরযাত্রীরা এসে পড়বে। তবুও মায়ার কেমন ঘুম ঘুম লাগছে। হাত পা ব্যথা করছে। করবে নাই বা কেন,? পুরো এক রাত আর অর্ধেক দিন গাড়িতে বসে বসে কেটেছে তাও নির্ঘুম। এটাই তার জন্য আরহানের দেওয়া শা*স্তি ছিল। এক কথায় পালিয়ে যাওয়ার মজা যেন বুঝিয়ে দিয়েছে আরহান নামক পুরুষটি। এইতো অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবেই বছর দুয়েক আগে শুধু কালেমা পরে বিয়ে হয়েছিল তাদের। যে বিষয়ে জানা নেই কারোর। ঘটনা যেমনি ছিল অপ্রত্যাশিত তেমনি যেন ছিল জোরপূর্বক।
বাবা অর্থাৎ মাহমুদ সাহেব হঠাৎ অসুস্থ হওয়ায়া পরিবারে নির্ভরযোগ্য সন্তান হিসেবে জমি-ফ্যাক্টরি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো নিয়ে আরহানের সঙ্গে যেতে হয় একটি অচেনা শহরে। ব্যস্ততা, অজানা মানুষ আর অপরিচিত পরিবেশে ভরা এক নতুন জায়গা। সে সময় আরহানের বাবাও বাহিরে গিয়েছিল যার জন্য আরহান কে তার বাবার জায়গায় আর মায়াকে তার বাবার জায়গায় যেতে হয় বিজনেস পার্টনার হিসেবে। বাবাদের প্রতিনিধি হয়ে।
সেই শহরে রাতেরবেলায় হঠাৎ নামে তীব্র ঝড়-বৃষ্টি। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন, রাস্তা জনশূন্য, বাতাসে অজানা আতঙ্ক। আর সেই রাতেই ঘটে অপ্রত্যাশিত এক ঘটনা—অচেনা কিছু মানুষের হঠাৎ হস্তক্ষেপ, তাদের কুৎসিত সন্দেহ আর চাপের মুখে পড়ে একরকম বাধ্য হয়েই বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হতে হয় আরহান আর মায়াকে।
তারা কেউই প্রস্তুত ছিল না এর জন্য। মুখে কিছু না বললেও চোখে-মুখে ছিল হাজারো প্রশ্ন, দ্বিধা আর এক অনুচ্চারিত আতঙ্ক। নিয়তি যেন এমনই ছিল তাদের জন্য। অচেনা শহর, অচেনা রাত আর অচেনা পরিস্থিতির ভেতরেই গেঁথে দিল এক আজীবনের বন্ধন। যা শুধু তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে হয়েছিল।
ভাবতে ভাবতে কখন যে মায়ার টুলে বসেই চোখ লেগে এসেছে জানে না সে। মায়ানের কন্ঠস্বরে হুস হলো তার। বিরক্তমুখে প্রশ্ন করল,
__এত চ্যাঁচাচ্ছিস কেন বাঁদর"?
মায়ান চোখের চশমা ঠেলে কুটিল হাসল। দাঁত বের করে বলল,
__দুলাভাই এসেছে নিচে চল"।
__কিসের দুলাভাই? কোন জন্মের দুলাভাই"?
ওমনি মায়ান মায়ার কপালে উল্টো হাত রাখল। চমকানো নাটকীয় সুরে বলল,
__একি আপু? তোমার কি জ্বর এসছে? এরমধ্যেই দুলাভাই কে ভুলে গেলে? মনে নেই, আমার এই জন্মের দুলাভাই মি. আরহাম সাইফ চৌধুরী"।
মায়া বিরক্তভরা সরু চোখে তাকাল। এরমধ্যেই সুরভী আসল রুমে। তার হাতে একটি মিষ্টির প্লেট। প্রিয় বান্ধবীর বিয়েতে সেও বেশ জাঁকজমকভাবে সেজে উঠেছে। সে এগিয়ে আসতে আসতে হতাশ গলায় বলল,
__তোর একটা ননদ তো দূর একটা দেবরও কেন নেই রে মায়া? আমার হকটাই নষ্ট। ছে"।
__ঠিক। আমার একটা বিয়াইন সাহেবাও হলো না হু"।
সুরভী কথার উত্তরে মায়ান গাল ফুলে বলল কথাটা। সুরভী হেসে ফেলল। মায়া চোখমুখ কুঁচকে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। সুরভী ওর কাছে যেয়ে দাঁড়িয়ে আয়নার দিকে নজর রেখে বলল,
__ওমন মুখ বাঁকাস না। মেকআপ নষ্ট হবে নাহলে"।
__তোদের কপাল ভালো, এইমূহুর্তে আমি কিছু বলার মুডে নাই"।
সঙ্গে সঙ্গে মায়ান বলল,
__কোন মুখে বলবে? পালিয়ে যেয়েও আবার ফেরত আসতে হয়েছে তোমাকে। আহারে বেচারি বেহেনজি মেরা"।
সুরভী হো হো করে হেসে উঠল। মায়া অগ্নি চোখে তাকাল দুজনের দিকে। সুরভী এবার হাসা থামিয়ে প্লেট থেকে কাঁটা চামচের সাহায্যে একটা মিষ্টি কেটে মায়ার মুখের সামনে ধরল।
__নে হা কর। অনেকক্ষণ নিশ্চয়ই খাওয়া হয় নি। এরপর কিন্তু আর সুযোগ নেই"।
__এ আমি মিষ্টি খাই না জানিস না? সরা সামনে থেকে"।
__আরে আপু খাও খাও। একদিনে মোটা হয়ে যাবে না। তাছাড়া এখন আর অন্যকিছু খাওয়ার সুযোগ নেই"।
টিটকারী করে বলল মায়ান। ঠিক নিচে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের খুনসুটি চলতেই থাকল।
*°•.
বিয়ের সমস্ত আয়োজন করা হয়েছে মায়াদের বাড়িটাতেই। বাসার নিচে বিশাল ফাঁকা মাঠ মতো জায়গা থাকায় সেন্টার বুক করার কথা ভাবেননি মাহমুদ সাহেব। একমাত্র মেয়ের বিয়ে—বিদায় নিজের বাড়ি থেকেই দিবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন তিনি। আর সে কারণেই যেন পুরো বাড়িটাকে সাজিয়ে তোলা হয়েছে এক স্বপ্নপুরীর মতো।
খোলা আকাশের নিচে সাজানো হয়েছে মেহমানদের বসার দারুণ আয়োজন। সাদা ও লাল কাপড়ে ঢাকা চেয়ারগুলোকে ঘিরে ফ্লোরাল পাথ রাখা হয়েছে যেন প্রতিটি অতিথি নিজেকে কোনো রাজকীয় বাগানে বসে আছেন বলে ভাবেন। এক পাশে ফুলে মোড়া একটা গোল চত্বরে বর-কনের জন্য তৈরি হয়েছে আলাদা একটা স্টেজ—লাল গোলাপ আর সাদা গাঁদার ফুলে সাজানো। তার সামনে এক ঝরনা মতোন ঝুলে থাকা ফুলের ব্যাকড্রপ, যেটা যেন কোনো রাজকুমারী আর রাজপুত্রের স্বপ্নের গল্পের দৃশ্য তুলে ধরে।
সন্ধ্যার পর আলো জ্বলে উঠলে সেই দৃশ্য যেন আরও জাদুময় হয়ে ওঠে। চারদিকে লাইটিং, রঙিন পর্দা আর ফেয়ারি লাইটের মায়াবী ঝলক পুরো পরিবেশটা এক স্বপ্নিল বাস্তবতা এনে দেয়। মাঝখানে রাখা হয়েছে সোনালি ফ্রেমের বসার টুল। এক টুলে অস্থির হয়ে বসে রয়েছে আরহান। দেখে মনে হচ্ছে সে কোনো বিষয়ে ভীষণ চিন্তিত। ঝটপট করছে ভেতর ভেতর। বারংবার হাতের ঘড়ি দেখছে সে।
হঠাৎ ই আশপাশ কোলাহল তার মনোযোগ ঘুরিয়ে দিল। কনে এসেছে। লাল গাড় লেহেঙ্গায় লম্বা ঘুমটা টেনে কমল হয়ে হেঁটে আসছে রমনী। বধূ। আরহানের দৃষ্টি যেন সেখানেই থমকে গেল। সময়ের মধ্যে মায়া কে এনে বসিয়ে দেওয়া হলো অপর পাশে। ফুলের পর্দার ওপারে। কাজী ডাকা হলো, উকিল বলা হলো। দু বছর আগে যা হয়েছিল তা সঠিক প্রমাণ করে আজ সমস্ত নিয়ম কানুন মেনে বিয়ে হলো তাদের। আবদ্ধ হলো স্বামী স্ত্রীর বন্ধনে।
মায়া নিজের সিগনেচার টুকু করতেই সবাইকে অবাক করে দিয়ে হঠাৎ জোরে কেঁদে দিল। হাউমাউ করে কাঁদছে সবাই কে তাক লাগিয়ে দিয়ে। না দুঃখে নয়, সে কাঁদছে তার বিয়ে হয়ে গেল বলে। শেষমেষ আরহানের সঙ্গেই বিয়েটা করতে হলো তার। কাঁদছে আর নাক টেনে টেনে বলছে,
__এ্যাঁ হে আমার বিয়ে হয়ে গেল"।
তার বাচ্চামি কথা শুনে হাসতে লাগল সবাই। আরহান নিজেও মুচকি হাসল। সুরভী আর মায়ান আরহান কে ফুলের পর্দা সরিয়ে মায়ার মুখ দেখতে বললে, সে এগিয়ে দুহাতে সে পর্দা সরিয়ে দিল। মায়া এখনো কাঁদছে ঘুমটার আড়ালে। আরহান মুখে অমায়িক হাসি ফুটিয়ে তার ঘোমটা উঠিয়ে দিল। ফিসফিস করে বলল,
__ন্যাকা কান্না বন্ধ করুন ম্যাডাম attitude এর দোকান। আপনার সব attitude তো এই কান্নাতেই চলে যাচ্ছে। এটা তুলে রাখুন, পরবর্তীতে কাজে দিবে বোধহয়"।
চলবে....
[সর্বোচ্চ রেসপন্স করবেন দয়া করে। যতজন পড়বেন কষ্ট একটা ডট দিয়ে হলেও কিংবা ইমোজি হলেও কমেন্ট করবেন প্লিজ]