#পর্ব_১০
#হাওয়ায়_সুরগান
#Sharmin_Shaajh_Nur
__ন্যাকা কান্না বন্ধ করুন ম্যাডাম attitude এর দোকান। আপনার সব attitude তো এই কান্নাতেই চলে যাচ্ছে। এটা তুলে রাখুন, পরবর্তীতে কাজে দিবে বোধহয়"।
কথাটুকু কানে যেতেই মাথা তুলে তাকায় মায়া। ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস নিচ্ছে সঙ্গে এমন ভাবে তাকিয়েছে যেন এখনি আরহান কে কিছু করতে পারলে তার শান্তি লাগত। তবুও নিজেকে সামলে হঠাৎ ই ঠোঁটে শয়তানি হাসি টেনে ধীরস্থির কন্ঠে বলল,
__আমি ন্যাকা? আপনি বরং রেডি থাকুন তাহলে। ন্যাকামি কত প্রকার আর কি কি সব দেখিয়ে দিব আপনাকে"।
আরহান হাসল। টিপকোনি করে বলল,
__আমি তো পুরো রেডি হয়েই আছি সব দেখার জন্য, ওয়াইফি...(টেনে টেনে)। আপনি যা যা দেখাতে চান সে'সব.. দেখব তবে আমার বাড়িতে।
একটু থেমে, আপনার নিজের ঘরে"।
মায়া তিক্ষ্ণ চোখে শুধু দেখল আরহান কে, কিছু বলল না আর। সময় অতিবাহিত হলো..
বিয়ের পর্বও মিটে গেল। অতিথিরা একে একে বিদায় নিচ্ছেন। আয়োজনে থাকা আত্মীয়রা ব্যস্ত সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ায়। চারপাশের গুঞ্জন একটু একটু করে স্তিমিত হয়ে আসছে।
ঘড়িতে তখন রাত সাড়ে এগারোটা। ঘরের বাতাসেও ক্লান্তির ঘ্রাণ। মায়া ড্রয়িং রুমে বসে আছে, একটু স্থির, একটু গুম। মুখে আর চোখে বিয়ের সাজের ছাপ রয়ে গেছে কিন্তু তাতে যেন এখন একরাশ অবসন্নতা মেশানো। পাশে চুপচাপ বসে আছে আরহান। মায়ান তাদের থেকে দূর, এক কোনায় থম মেরে গালে হাত দিয়ে বসে আছে আর তার পাশেই একই ভঙ্গিতে বসে আছে সুরভী। সবকিছু শেষে এখন যে বিদায়ের পালা। আরহানের মা বাবা কথা বলছেন মায়ার মা বাবার সাথে। হয়তো বিদায়ের বিষয়ে, হয়তো মেয়ে কে ভালো রাখার বিষয়। বিদায় বেলায় কত কথাই না বলার থাকে।
সময় সত্যই ক্ষনিয়ে এসেছে, মেয়ে তার বাবার বাড়িতে মেহমান হয়েছে। এক পলকে বদলে গেছে সময়, পরিচয়, পরিস্থিতি। সবই যেন সময়ের খেলা।
নববধূ কে নিয়ে বরযাত্রী পারি জমায় তাদের ঠিকানায়—
*°•
__হা! অবশেষে আমার পুত্রবধূকে নিয়ে পৌঁছেই গেলাম মঞ্জিলে"।
অতি উৎসাহী হয়ে বললেন মি. চৌধুরী। তার আনন্দে হাসলেন সবাই। নববধূর পা পরতেই পুরো বাড়ি ব্যস্ত হয়ে পরলো তাকে স্বাগত জানানোয়। মায়া এই প্রথম আসল এবাড়ি। এবাড়ির বউ হয়েই প্রথম কদম রাখল। চোখ ঘুরিয়ে দেখতে লাগল পুরো বাড়ি। যৌথ পরিবার নয় তবুও বাড়িটি বিশাল। দুতলা আধুনিক ডুপ্লেক্স বাড়ি। মায়া শুনেছিল, বাড়িটি অতি শখ করে বানিয়েছিলেন তার দাদা শশুর। শখের বাড়ি, বেশ সুন্দরই বলা চলে। মায়ার মনে ধরল বাড়িটি। তাকে আর আরহান কে একসঙ্গে নিয়ে ড্রয়িং রুমে বসানো হলো। পারিবারিক ভাবে কিছু রীতি কথপোকথন চলতে থাকল। মায়া সেসব চুপচাপ শুনে গেল আজ নম্র ভদ্র মেয়ে হয়ে। এরমধ্যেই আরহানের ফোনকল আসায় সে চলে যায় সেখান থেকে।
—
শেষমেষ মায়া কে নিয়ে যাওয়া হলো সাজানো একটি ঘরে। বিয়ের রাতের জন্য প্রস্তুত সে ঘরটিও—লাল পর্দা, ফুলে মোড়া বিছানা, মৃদু আলোয় মোহময় পরিবেশ। কিন্তু মায়া যেন আর কোনো রোমান্টিক অনুভূতি ছুঁতে পারছে না। ভেতরে কেমন এক অনুভূতি, কেমন এক কাঁপন। অজানা সবকিছু কেমন ভেতর নাড়িয়ে তুলছে। এ কি সব মেয়েরই হয়? জানে না মায়া।
মায়া কে নিয়ে কিছু মেয়েরা বিছানায় সুন্দর মতো বসিয়ে দিল। বেশ কিছুক্ষণ হাসি ঠাট্টা করে চলে গেল তারা। ফুলে মোড়া বিছানায় বসে মায়া, মাথা নিচু, দু’হাত মুঠো করে ধরে রেখেছে আঁচলের কোণা। গায়ের ভারী লেহেঙ্গা, ওড়না আর গয়নার ওজন যেন এখন হঠাৎ করেই দ্বিগুণ লাগছে। তার বুকের ভিতর কেমন ঢিপঢিপ করছে, যেন কেউ ধুকধুক করিয়ে তুলছে প্রতি মুহূর্ত। হয়তো এখুনি আরহান এসে পরবে। তার হাসবেন্ড, চিরজীবন সঙ্গী।
বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও যখন আরহান আসল না ঘরে তখন যেন মায়ার ধৈর্য্য ভেঙে গেল সব। সে বিরক্ত হয়ে বিছানা থেকে উঠে মেঝেতে দাঁড়িয়ে গেল। মৃদু আলোয় পুরো ঘরটা দেখে নিল এক পলক। এরপর ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিজের সাজসজ্জা দেখে মুখে ;চ' উচ্চারণ করে গলার গহনা গুলোয় হাত লাগাল। খুলতে যাবে ঠিক সেই সময় কি একটা ভেবে খুলল না। যেমন ছিল সেভাবেই সরে গেল সেখান থেকে। বিরবির করে বলল,
__এ্যাঁ, কি নিয়ম এখন হাসবেন্ড নামক মানুষটি কখন আসবে তার পারমিশন নিয়ে সাজসজ্জা তুলতে হবে। অসহ্যকর জাস্ট"।
বিরবির করতে করতেই ফোন নিয়ে সোফায় গিয়ে বসে পরল। পায়ের উপর পা তুলে ফোন টিপতে লাগল আরামছে।
ঘড়ির কাঁটা শুধু ঘুরেই গেল, মায়াও ক্লান্তিতে ঘুমিয়েও পরল অথচ আরহানের কোনো খবর নেই। ঐযে ফোন নিয়ে উঠে গেল তারপর যেন লাপাত্তাই হয়েছে মানুষটা।
°
ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত দেড়টা। বাইরে জোছনার আলো ঝুলে আছে জানালার পর্দায়। ফুলের ঘ্রাণে ভারি হয়ে আছে ঘরের বাতাস। গভীর ঘুমে তলিয়ে যাওয়া মায়ার হঠাৎ ই ঘুম ভেঙ্গে যায়। হয়তো নতুন জায়গা পরিবেশ বলেই এমনটা। সে হঠাৎ জাগনা পাওয়ায় এদিক ওদিক তাকালো শুরুতে। মূহূর্তে তার ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেল।
__এই মানুষটার এখনো কোনো খবর নেই? ওয়াহ! কি মানুষ। ঘরে নতুন বউ রেখে তিনি লাপাত্তা"।
নিজে নিজে গজগজ করতে করতে উঠে দাঁড়ালো মায়া। আরো কিছু বিরবির করতে করতে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। উদ্দেশ্যে, বাহিরে গিয়ে দেখতে তিনি আদেও বাড়িতে আছে কি না। মায়া দরজার কাছে যেতেই হঠাৎ দরজার খোলা হ্যান্ডলে হাত।
মায়া চমকে তাকালো। আরহান ঢুকছে ঘরে। এক হাতে ফোন, আরেক হাতে তার কোট, মুখে হালকা ক্লান্তির ছাপ। মায়াকে দেখে একটু থেমে গিয়ে হাসল তবে সেটা ঠোঁটের কোণে সামান্যই। মায়া হঠাৎ আরহান কে দেখে রুক্ষ গলায় বলল,
__এই আসার সময় হলো"?
আরহান প্রথমে দরজা থেকে সরে ভেতরে আসল। হাতের কোট, ফোন বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে হাতের ঘড়ি খুলতে খুলতে মায়া কে সোজা প্রশ্ন করল,
__এখনো ঘুমাও নি কেন? আর এসব সাজসজ্জায় এখনো আছো তুমি। বাহ"!
আরহানের কথায় মায়ার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো। কেমন সন্দেহ নিয়ে তাকাল সে আরহানের দিকে। আরহানের কোনো ধ্যান নেই এদিকে। মায়া আস্তে করে তার দিকে এগিয়ে পিছন থেকেই খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল। আরহান ঘড়ি খুলে ফোন কোটের মতো এটাও ছুঁড়ল বিছানায়। হঠাৎ কি মনে হতেই পিছন ঘুরতেই মায়ার তিক্ষ্ণ দৃষ্টির সম্মুখীন হলো। একটু অপ্রস্তুত হলো বোধহয়। কিছু বলার জন্য মুখ খুলবে তার আগেই মায়া প্রশ্ন করল,
__আপনার পাঞ্জাবিতে এটা কিসের দাগ? দেখে মনে হচ্ছে রক্তের দাগ। কোথায় থেকে আসল এটা"?
চলবে...?
[সর্বোচ্চ রেসপন্স আশা করছি]