#বিষাক্ত_ভালবাসা
#পর্ব_৬
#ইশিকা_ইসলাম_ইশা
একটি ছোট্ট আশ্রমে ছোট্ট কিছু বাচ্চাদের পড়াচ্ছে মাহি। বাচ্চাগুলো শান্ত ভাবে পড়লেও নিজেকে শান্ত রাখতে পারছে না মাহি।শরির গুলিয়ে আসছে।মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো।পড়ে যেতে নিয়ে কেউ ঝরের বেগে এসে জরিয়ে ধরে।কোন পুরুষের ছোঁয়াই পিট পিট করে তাকায় মাহি অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষ টিকে দেখে আশ্চর্য হয়ে যায়।
ঝটপট নিজেকে ছাড়িয়ে নিতেই।কবির একটানে জরিয়ে ধরে।
কোথায় ছিলে তুমি ??কত খুঁজেছি তোমায়??হন্য হয়ে খুঁজেছি।এই মেয়ে তোর সাহস কিভাবে হয় আমাকে ছেড়ে আসার??
মাহি নিজেকে ছাড়িয়ে থাপ্পর বসিয়ে দেয়।রেগে বলে,
এটা কোন ধরনের অসভ্যতা?কে আপনি?
মাহির দিকে অপলকে তাকিয়ে রইল কবির।মেয়েটার মায়াবী মুখে ভয়ের ছাপ বিদ্যমান।তা আড়াল করতে রাগী লুকে তাকিয়ে আছে। মৃদু হাসল কবির তার ভীতু পাখিটা সাহসী হয়ে উঠছে। নিজেকে শক্ত খোলসে আনার চেষ্টায় আছে। কতটুকু সফল হয়েছে তা বলা যাচ্ছে না।
মাহিইইইইইইইইইই.....
চমকে উঠে মাহি। ভীতু চোখে সামনের ব্যাক্তটির দিকে তাকাই।ওনি এই আশ্রমের ম্যানেজার। মহিলাটি দেখতে লম্বা ,চরা,মোটা আর প্রচুর রাগী।মাহি মাথা নিচু করে নেই।
তোমার সাহস দেখে আমি অবাক!! তুমি কি করে ওনার গায়ে হাত তুলেছো।এখানে থাকার ইচ্ছা নেই বুঝি।
সরি !!!ম্যাম !!আসলে ওনি ওভাবে!!!!
কিভাবে?স্যার তো তোমাকে পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়েছে আর তুমি কিনা তাকেই থাপ্পর মারলে!! নিজের গায়ে যে কলঙ্ক নিয়ে ঘুরছ !!তার কাছে কি তোমাকে বাঁচাতে গিয়ে ছুঁয়ে অপরাধ করে ফেলেছে???
মাহির চোখ টলমল করছে পানিতে।নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে।কবির মাহির টলমলে চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে আছো কেন??সরি বলো??
ম্যামের কথায় ঘৃনার দৃষ্টিতে তাকিয়ে সরি কথাটা উচ্চারন করে মাহি।এই ঘৃনার দৃষ্টি সহ্য হল না কবিরের।বুকে তীরের মতো বিধলো যেন।মাহি কবিরকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়।
স্যার ওর কথায় কিছু মনে করবেন না। এইটুকু বয়সে অনেক কিছুই ঘটে গেছে তার সাথে।তাই এমন আচরন করে ফেলেছে।নয়তো মেয়েটা অনেক ভালো।
কবির মহিলাটির কথা শুনে কিছু না বলে এগিয়ে যায়।মহিলাটি ভয়ে ভয়ে তার পিছু নেই।এই চ্যারেটির টাকা যে আশ্রমের খুব দরকার।
,
,
,
মাহি নিজেকে শক্ত রেখেছে। কাঁদবে না সে। সে নিজেকে দুর্বল প্রমান করতে চাই না। হঠাৎ খিল লাগানোর শব্দে পিছে তাকাই মাহি।কবিরকে দেখে ভয় পেলেও প্রকাশ করে না।
কি সমস্যা?কি চাই?
তোমাকে.......
মাহি আশ্চর্য হয়ে তাকায়,
পরক্ষনেই রেগে দাঁত কিটমিট করে বলে।
ভোগ তো করেছেন আবার কি চাই??
কবির রেগে গিয়ে ও রাগে না।শান্ত গলায় বলে,
তোমাকে চাই মানে তোমাকেই চাই!!! কিন্তু আগে আমার কথা শুনো প্লিজ......
মাহি কাবিরের এগুনো দেখে হাতের কাছের কেচি ধরে বলে।
এই একদম আমার কাছে আসবেন না।আমি কিন্তু আপনাকে আঘাত করে দিব।ছুবেন না আমায়।
মাহি আমার কথাটা একবার শুনো!!!
মাহির চিৎকারে আশ্রমের সবাই চলে আসে।মাহি কবিরকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে দরজা খুলে দেয়।মহিলাটিকে দেখে ভয়ে জরিয়ে ধরে।এদিকে ধাক্কা দেওয়াতে কবির পরে গিয়ে ভাংগা চেয়ারে লেগে হাত কেটে যায়।
এদিকে মাহি প্যানিক এট্যাক আর অতিরিক্ত স্রএস্টস ঙ্গান হারিয়ে ফেলে।
কবির ছুটে আসে। তাড়াতাড়ি কোলে তুলে রুমে শুয়ে দেয়।ডক্টরকে কল করে আসতে বলে।কবির ওর রক্তাক্ত হাত দিয়েই মাহির দুহাত জরিয়ে ধরে বলে,
এই মাহি সরি...চোখ খুলো প্লিজ.....
বাকিসবাই অবাক হয়ে আছে।কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছে না।মহিলাটি আথাৎ হানিফা বেগম বলে,
কিছু হয়নি ওর।
কবির রেগে বলে,
কিছু হয়নি মানে???ও চোখ খুলছে না আর আপনি বলছেন কিছুই হয়নি।
কবিরের রেগে যাওয়াতে হানিফা আমতা আমতা করে বলে,
এইই সময়ে হয় এমন.....
কবির আশ্চর্য হয়ে বলে,
এই সময়ে মানে????
হানিফা বেগম বলে,
আসলে ও ২ মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
মাথায় যেন বাজ পড়লো কবিরের।মানে মাহি প্রেগনেন্ট।কবিরের হাত আপনাআপনি চলে গেল মাহির পেটে।এখানে ওর বাচ্চা আছে।ওর আপন বাচ্চা।ভাবতেই খুশিতে চোখ জলজল করে উঠলো কবিরের।
স্যার বলেছিলাম কি??আপনার হয়তো ওকে পছন্দ হয়েছে! কিন্তু ও প্রেগনেন্ট।
আসলে ওকে রেপড করা হয়েছে।কার না কার বাচ্চা।ও নিজেও জানে না কে ওকে রেপড করেছে।আমাদের এখানে অনেক সুন্দর মেয়ে আছে পছ.........
আগে কিছু বলতেই পারল না.....কবির পাশে থাকা জগ তুলে আছার মারে। রাগে চোখ লাল হয়ে গেছে,প্রচুর রেগে বলে,
চুপ একদম চুপ......
মাহি আমার ওয়াইফ। খবরদার ওর নামে উল্টাপাল্টা কিছু বললে জ্যান্ত কবর দিব।আর কি বললেন কার না কার বাচ্চা......
খবরদার আমার বাচ্চার দিকে আঙুল তুলেছেন তো।ওর পেটে আমার বাচ্চা।আমার...…....
কবির চৌধুরীর অংশ ও........
হানিফা বেগম চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে আছে, শুকানো একটা ঢোক গিলে একপাশে চুপ করেই রইল সে।
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার আসে চেক করে বলে,
কে হয় তোমার??
কবির সোজা সাপটা জবাব দেয়
ওয়াইফ......
শুনে কিছুটা অবাক হয় ডক্টর সাহেবা।তোমার বৌ অনেক ছোট।এই বয়সে বাচ্চা না নিলেও হতো।শরির অতি মাত্রায় দূবল।এই রকম চললে বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। মনে হয় অতিরিক্ত টেনশন করে।এতো টেনশন করলে বাচ্চার সাথে নিজের জীবন ও রিস্কে থাকবে।
শরির ও দূবল।আমি কিছু টেস্ট আর ওষুধ লিখে দিচ্ছি।টেস্ট করিয়ে আমার সাথে দেখা করবেন।আর এই ওষুধ গুলো টাইম টু টাইম দিবেন।
ডাক্তারের সাথে বেরিয়ে যায় হানিফা বেগম।
কবির একধ্যানে মাহির দিকে তাকিয়ে রইল।
,
,
,
,
মাহির ঙ্গান ফিরে পাশে দেখে হানিফা বেগম বসে আছে।ওনি স্বভাবসুলভ ধমক দিয়ে বলে।এখনি এতো ঙ্গান হারানোর কি আছে বাপু।কোই আমরা তো ৪টা ছেলে মেয়ে জন্ম দিয়েছে এমন তো হয়নি।এই নাও খাবার খেয়ে আমাকে উদ্ধার কর।
মাহি ধীর কন্ঠে বলে,
ওওওনি কি চলে গেছে......
ওনি কে??
মানে ঐ যে আজ.......
ওনার তো আর কোন কাজ নেই তোমার জন্য বসে রইবে।
ওনি কি জানে আমি অন্তঃসত্ত্বা???
না।ওনি জেনে কি করবে।
সস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মাহি।নিজের পেটে হাত রাখে সে।
এদিকে আড়ালে দাঁড়িয়ে মাহির কথাগুলো শুনে কবির।
,
,
,
,
এই মেয়ে একদম আমার কথার অবাধ্য হবে না বলে দিলাম।তোমাকে টেস্ট করানোর জন্য যেতেই হবে। তাছাড়া এই টাকা তো আশ্রমের অংশ।তোমাদের জন্য বরাদ্দ.......
কোন মতে মাহিকে রাজি করিয়ে টেস্ট গুলো করিয়ে আনে হানিফা বেগম।কবির তখন আশেপাশেই ছিল।সে মাহিকে উত্তেজিত করতে চাই না।কবির এসব করছে জানলে সে কিছুতেই টেষ্ট করাবে না।
,
,
,
,
গাড়িতে বসে আছে কবির। সিসিটিভি তে মাহিকে দেখছে।মাহি ঘুমিয়ে যেতেই কবির মাহির রুমে প্রবেশ করে। সিঙ্গেল একটা বেডে গুটিয়ে ঘুমিয়ে আছে মাহি।কবির মাথার কাছে বসে হাত বুলিয়ে দেয়।পায়ের তলায় তেল দিয়ে হালকা মালিশ করে দেয়।
দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে মুচকি হাসে হানিফা বেগম।
সারা রাত মাহির পাশে বসে থাকে।হুট করে যদি মাহির কিছু লাগে।যদি শরীর খারাপ করে।এরপর ভোরের দিকে বের হয়ে যায় কবির।
এভাবে কেটে যায় দুদিন। রিপোর্টে পেয়ে সস্তির নিঃশ্বাস ফেলে কবির। রিপোর্টে সব ভালো। কিন্তু মাহির শরির দুর্বল খেতে হবে আর ওষুধ গুলোও খেতে হবে।বেশি টেনশন করা যাবে না।আরাম করতে হবে।
এদিকে মাহিও সস্তির সাথে থাকছে।কবির আসছে না দেখে। কিন্তু সে তো আর জানে না।কবির তার সামনে না থাকলেও তার সাথেই আছে।সবক্ষণ তাকে চোখে চোখে রাখছে।
মাহি গোসল করে রুমে এসে ভেজা চুল গুলো শুকাচ্ছে।সদ্য গোসল করা রমনীর দিকে তাকিয়ে আছে কবির।সে কখনো মাহিকে সেভাবে খেয়াল ই করেনি। উজ্জল শ্যামলা বর্ণের অসম্ভব সুন্দর একটা মায়াবী পুতুল বলা যায় মাহিকে।লম্বা চুল গুলো উড়ে এসে তার মুখে পড়ছে। হঠাৎ কারেন্ট চলে যাওয়াই বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে কপালে।গরম পড়েছে অনেক।বাধ্য হয়ে চুল গুলো খোপা করে দেয়।
এতেই মেজাজ বিগড়ে যায় কবিরের ।ভেজা চুল বেঁধে রাখলে ঠান্ডা লেগে যাবে।বড় কথা হল মাথা ব্যাথাও তো করতে পারে।কাউকে কল করে কি যেন বলতেই কারেন্ট চলে আসে।এদিকে মাহিও সস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাপরে যা গরম।
আবার এতো তাড়াতাড়ি কারেন্ট চলে আসায় অবাক ও হয়।এখানে কারেন্ট গেলে ঘন্টাখানেক পরেই আসে।
কয়েক মিনিট এ কারেন্ট আসায় অবাক ই হয়েছে।
মাহি নিজের অবাকত্ব কে বেশি প্রশয় না দিয়ে বাচ্চাদের পড়ানোর জন্য এগিয়ে যায়।
কিন্তু বাচ্চাদের বিল্ডিং এ মেরামত চলছে দেখে একদফা অবাক হয়ে তাকাই। যতটুকু জানে এ আশ্রম টার ফান্ড অনেক কম।
মিসেস হানিফা বেগমকে দেখে এগিয়ে গিয়ে বলে,
ম্যাম এসব কি হচ্ছে???
দেখছোই তো কি হচ্ছে।এই বিল্ডিং টা মেরামত করে রং করবে।বাচ্চাদের ভাংগাচোরা চকির বদলে নতুন চকির ব্যাবস্থা করা হয়েছে।এখন বাচ্চাদের আর নিচে ঘুমাতে হবে না।
আজ তো পড়ানো নাই তুমি যাও রেস্ট করো।
ম্যাম আপনি অনুমতি দিলে আমি একটু বাইরে যেতে পারি।
কোথায় যাবে?
একটু কাজ আছে।
ঠিক আছে যাও।
অনুমতি পেয়ে মাহি বেরিয়ে পড়ে।২ টা মাস হয়ে গেল সে দাদু নামক ব্যাক্তি টিকে দেখেনি।হাজার হোক বাবা মার পর সেই ইং একজন আপন বলে ছিল।
মাহি বোরকা পড়ে নেকাপ পড়ে নেয়। কিছুদূর হেঁটে বাসের জন্য অপেক্ষা করতেই বাস চলে আসে।
মাহি বাসে উঠে পড়ে।এতো গরম তার উপর এই মানুষের ভিরে অসস্তি লাগছে খুব।তার উপর একটা লোক কিভাবে যেন চেয়ে আছে তার দিকে।মাহি সিটে হেলান দিয়ে মাথা এলিয়ে দেয়। ইদানিং শরির বড্ড অচল হয়ে গেছে।ধপ করে পাশের সিটে কেউ একজন বসতেই পাশে তাকাই মাহি।মাস্ক পরিহিত একটা লোক।তার পাশের ঐ লোকটা কোথায় গেল।যাই হোক ওমন অশিল্ল লোকের থেকে তো ভালো গায়ে ঘিসছে না।অসস্তি ও কম লাগছে।দুরুত্ব রেখে সিটে হেলান দেয় মাহি।নিকাপ টা একটু সরিয়ে জানালার দিকে মুখ করে বসে।সিটে আরো একটু হেলে চোখ বন্ধ করে পেটে হাত রেখে বলে ,
এই দুনিয়াই তোমার আম্মু বড্ড অসহায়।তুমি ছাড়া হয়তো তোমার আম্মুর আর কেউ নেই। এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে তোমাকে এনে কোন ভুল করছি না তো!!
কবির মাহির ধীরে বলা কথাও কান পেতে শুনল।একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করেই রইল।পাশে বসা ব্যাক্তিটি আর কেউ নয় কবির।মাহিকে একা ছেড়ে কোন রিস্ক নিতে চায় না সে।তাই সাথেই এসেছে।তবে অচেনা বেশে।
চলবে,