ফন্ট সাইজ:
থিম:
বিষাক্ত ভালবাসা

৭ম পর্ব

লেখক: আনিকা ইসলাম ইশা

#বিষাক্ত_ভালবাসা

#পর্ব_৭

#ইশিকা_ইসলাম_ইশা

নিজের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে মাহি।একবার দাদুর দেখা পাবার আশায়। এই সময়ে দাদু নামাজ পড়তে বের হয় । কিন্তু নামাজের সময় পার হয়ে গেছে দাদুকে বেরুতে না দেখে হাতের রং উঠা ঘড়ির দিকে তাকায়।এখন না গেলে বাস আর পাবে না মাহি।তাছাড়া ট্যাকসি তে যাবার টাকাও নেই তার কাছে।এই গরমে বোরকা নেকাপ পড়ে অস্থির লাগছে মাহির।বাড়ির সামনের রাস্তা থেকে হেঁটে খানিকটা পথ যেয়ে নেকাপ টা খুলে মাহি।ব্যাগ থেকে পানির বোতল নিয়ে মুখে পানি দেয়। একটু পানি খেয়ে ব্যাগে রেখে হাঁটতে থাকে।

দূর থেকে মাহিকে দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কবির।

মাহি কিছুদূর হাটতেই একটা রিসকা এসে থামে তার সামনে।

ফোকলা হেসে লোকটি বলে,

আম্মা যাইবেন নাকি।

না চাচা আপনি যান......

আম্মা চলেন না....সকাল থাইকা একটাও লোক উঠে নাই।খাওনের টাকা নাই।

মাহি ব্যাগ হাতরে দেখে তার কাছে ৭০টাকা আছে।বাসে ৫০টাকা নিলে আর থাকবে ২০ টাকা।মাহি ২০টাকা লোকটাকে দিয়ে বলে,

চাচা আমার কাছে এর চেয়ে বেশি নেই।এটা নিয়ে আপনি কিছু খেয়েন।

আম্মা আপনে অনেক ভালা।আসেন আপনাকে নামিয়ে দিই।দেইখা মনে হোতাছে আপনি অনেক আইলা গেছেন।

না চাচা আমি ঠিক আছি।আপনি গিয়ে কিছু খেয়ে আসেন।

না আম্মা আপনি কোই রাখবেন কন?আপনারে নামাইয়া আমি খামু......

মাহি লোকটাকে অনেক বার বললেও লোকটার সাথে পেরে উঠে না।তাই রিসকায় উঠে বসে। এমনিতেও শরির খারাপ করছে।

বাস স্টান্ডে এসে রিসকা থামে।লোকটার থেকে বিদায় নিয়ে বাসে উঠে বসে মাহি।বার বার আল্লাহকে ডাকছে শরির খারাপ করছে।বাকি পথ যেতে পারবে তো?প্রচুর গরমে বোরকার ভেতরে জামা ঘামে ভিজে গেছে।শরির গুলিয়ে উঠছে। আর না পেরে বমি করে দিল মাহি। পাশের ব্যাক্তিটির গায়ে।ভয়ে ভয়ে তার দিকে তাকায় মাহি এতো সেই ব্যাক্তিটাই আসার সময় যে ছিল।মাহি আবারো বমি করে দেয়।এতে বাসের সবাই বিরক্ত হয়।নানান কথা বলতে থাকে।

পাশের ব্যাক্তিটি মাহির দিকে তাকিয়ে বলে,

কি হয়েছে শরির খারাপ করছে??বল ড্যামিট কি কষ্ট হচ্ছে?

মাহি বাসের সবার কথায় ভয়ে পাশের মানুষটার দিকে তাকাই।সবাই যেখানে তাকে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়ার কথা বলছে লোকটি তাকে জিজ্ঞাসা করছে সে কেমন আছে ?

কিন্তু আশেপাশে মানুষের কথায় চরম রেগে যায়।

চুপ কেউ আর একটা কথা বললে এখনি বাস থেকে ফেলে দিব।এমন রাগান্বিত স্বরে বলা হুমকিতে সবাই চুপ হয়ে যায়।সবাই চুপ হলেও মাহি চুপ থাকল না।এই রাগের স্বরের সাথে পূর্ব পরিচিত সে।

কে আপনি??

কবির মাহির দিকে চেয়ে পানি হাতে ধরিয়ে দেয়।মুখের মাস্ক টা খুলতেই অবাক হয়ে তাকাই মাহি।

আপনি???

কবির রেগে বলে,

আমি না তো কে?? ভূত......পানি খাও.....

বলে কবির উঠে ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বলে।বাস থামতেই কবির নেমে আবারো পাঁচ মিনিট পরে উঠে আসে।মাহি অবাক হয়েই রয়েছে তখন থেকে। আশেপাশে সবাই ফিসফিস করছে।

কবিরকে অন্য টিশার্ট পরে আসতে দেখে আরো অবাক হয় মাহি।কবির মাহির দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়।

চলো........

মাহি একেতো অবাক। কিন্তু চলো বলায় মুখ ফিরিয়ে নেয়।

কবির ওর পাশে বসে বলে,

কোন সিনক্রিয়েট ছাড়া আমার সাথে যাবে নাকি তুলে নিয়ে যাবে।

দেখুন আপনি.......

পরে দেখব.....বলেই মাহিকে হাত ধরে উঠিয়ে নেয়।

ছাড়ুন... বাঁচাও......

চুপ.....

বাঁচাও বাঁচাও আবার কি!!!! স্বামীর কাছে কিসের বাঁচাও......

আপনি........

কবিরের চোখ রাঙানি দেখে ভয়ে আর কিছু বলল না।তার মধ্যে তার শরির যেন চলছে না একদমই।

বাস থেকে নেমে দেখে পাশেই কার দাড় করানো আছে।

কবির মাহির নেকাপ টা খুলে দেয়। ভিতরে বসিয়ে এসি অন করে দেয়।মাহি দূবল চোখে সবটা দেখছে। কিছু বলার শক্তি ও পাচ্ছে না।কবির রুমাল ভিজিয়ে মাহির মুখ মুছিয়ে দেয়।কুলি করতে বলে। একটা জুসের বোতল তার দিকে এগিয়ে দেয়।

খেয়ে নাও বেটার লাগবে।

মাহি খাবে না বললে রেগে বলে.......

খাবে নাকি খাওয়াবো......

মাহি একটু খেয়ে নেয়।দূবল মাহিকে জরিয়ে ধরে গারি চালাতে ইশারা করে ড্রাইভার কে।মাহি নিজেকে ছাড়াতে চাইলেও পারে না।

বিন্দু মাত্র শক্তি নাই তবুও ছাড়াতেই হবে।শুয়ে থাকো।মাহি শুয়েই ঘুমিয়ে পড়ে।কবির মাহির মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ নিচে কালি পড়েছে। চোখ মুখে স্পষ্ট টায়াডনেস মাহির কপালে চুমু দিয়ে ভালোভাবে জরিয়ে ধরে।

মাহির ঘুম ভাংতেই নিজেকে পরিচিত রুমটায় দেখে।হানিফা বেগম পাশেই বসে আছে।

এখন কেমন লাগছে???

ভালো......

আমি এখানে কিভাবে......

স্যার নিয়ে এসেছে.....

মাহির সব মনে পড়তেই চোখ মুখ শক্ত করে উঠে।তখনই রুমে প্রবেশ করে মেঘ।মেঘকে দেখে একদফা অবাক হয়ে তাকাই মাহি......

মেঘ মাহির পাশে বসে,

কেমন আছিস?

তুমি এখানে??

এতটা রাগ মাহি একবারও কল করিস নি।নিজের ফোন নাম্বার ও চেন্জ করেছিস!!!!

রাগ!!!রাগ কেন করব??

মাফ করে দে মাহি......।আম সরি।আমি তোর প্রতি অন্যায় করেছি।বলে মাথা নিচু করে ফেলে....

তুমি কিভাবে জানো আমি এখানে????

রাস্তায় তোকে আর কবিরকে একসাথে কবিরের গাড়িতে উঠতে দেখেছি।কবির তোর সাথে রুড ব্যাবহার করছিল।আমি আসার আগেই তোকে গাড়িতে তুলে।তাই ওর গাড়ির পিছু করতে করতে এখানে এসেছি।

মাফ করে দে মাহি....এই যন্তনা নিয়ে আমি আর পারছি না মাহি.....প্লিজ মাহি ফিরে চল না।আমরা নতুন ভাবে আবারো শুরু করব।বলে মাহির হাত ধরতেই মাহি হাত ছাড়িয়ে নে্য়।

দয়া করে চলে যান.......

আমি কাউকে চায় না আমার জীবনে.......

এভাবে কেন বলছিস মাহি!!আমি মানছি আমি ভুল করেছি ....

তুমি কোন ভুল করোনি ।আমার ভাগ্য তো এমনই আমি মেনে নিয়েছি।

ওদের ভুলের শাস্তি আমরা কেন‌ পাব মাহি?

ওদের ভুল মানে??

মাহিকে মেঘ সব বলতেই মাহি চরম অবাক হয়ে তাকাই।

নীলাপু কিভাবে এমনটা করতে পারে.......

ওর করা অন্যায়ের শাস্তি আমি কেন পেলাম......

বলেই ডুকরে কেদে উঠে মাহি।মাহিকে আগলে নেয় মেঘ।

হানিফা সব শুনে সেও স্তব্ধ। একটুকু একটা মেয়ের জীবনে কত কিছুই না হয়ে গেল।হানিফার রাগ হলো প্রচুর নীলার ওপর।এভাবে কাদিস না মাহি তোর বাচ্চাটার ক্ষতি হবে।

বাচ্চা.......

মেঘ অবাক হয়ে বলে বাচ্চা .....

মাহি নিজের পেটে হাত রাখে........আবারো ডুকরে কেঁদে ওঠে।

তুই প্রেগনেন্ট???

হ্যা মাহি প্রেগনেন্ট.......

পিছে তাকিয়ে কবিরকে দেখে অবাক হয় মাহি,মেঘ।

মেঘ মাহির হাত ধরতেই কবির এক ঝটকায় ওর হাত সরিয়ে নিয়ে বলে।

দূরে থাক মেঘ।আমার বউ বাচ্চা থেকে।

মেঘ হেসে উঠে,

ডিভোস দিয়ে বউ বলছিস কোন মুখে।

কে বলেছে আমি ডিভোস দিয়েছি??

শুধু সাইন করিয়েছি।ওকে ভয় দেখানোর জন্য। কষ্ট দেওয়ার জন্য। তাছাড়া দুই দু বার বিয়ে করা বৌকে ডিভোস ও তো দুই দু বারি দেওয়া উচিত।

দুবার মানে????

মানে....

Mahi wasn't reped.......এটা বলব না।তবে

ওকে তুলে নিয়ে গিয়ে একটি কাগজে সই করিয়েছিলাম।সেটা রেজিস্ট্রি পেপার ছিল।

মাহির মনে পড়তেই সে চমকে তাকাই।মনের কোনে কি যেন হালকা হয়ে যায়। হয়তো সন্তান অবৈধ না এটা ভেবে!

মেঘ:তুই যা করেছিস তার জন্য আমি তোকে ছাড়ব না.......

কবির:ছাড়বি কি না।সেটা তোর ব্যাপার।আমার বৌ আর সন্তান থেকে দূরে থাকবি।সেটা না হলে আমি তোকে ছাড়ব না।

ধমকাচ্ছিস......

সেটাই মনে কর।আমি অনেক খুশি জানিস।আমার সন্তান এই পৃথিবীতে আসবে।

কোন সন্তান??

মাহির কথায় অবাক হয়ে তাকাই মেঘ.... কিন্তু কবির অবাক হয় না।

একদম নিজের সন্তান বলে দাবি করবেন না।কি গ্যারেন্টি এটা আপনার সন্তান।এই সন্তান আমার কাছে একটা রেপিস্টের সন্তান আর আমি তো ফষ্টিনষ্টি করে বেড়াই হতেও পা..............

কিছু বলার আগেই কবির ভয়ানক কান্ড করে বসে.....

সবার সামনেই মাহির মুখ আটকে দেয়। হানিফা বেগম মাথা নিচু করে বেরিয়ে যায়।মেঘ রেগে বেরিয়ে যায়।

মাহিকে ছেড়ে ওর মুখের দিকে তাকায় কবির।মেয়েটা শকড হয়ে আছে।হেসে ওর কপালে ঠোট ছোঁয়াই।চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে পানি।মাহি অবাক হয়। কাঁদছে কবির।

কবির মাহির মুখটা সামনে এনে বলে,

আমি মানছি আমি যা করেছি তা ঠিক করিনি। কিন্তু বিশ্বাস কর,তাতে আমার বিন্দুমাত্র আফসোস নাই। আমার করা অন্যায়ের শাস্তি আমার সন্তানকে দিও না।তোমার যা শাস্তি দেওয়ার আমাকে দাও।আমি টু শব্দ ও করব না।তুমি যা বলবে তাই করব।

যা বলব করবেন??

বলে। দেখ!!

আমাকে ডিভোস দিয়ে দেন।আমি পারব না আপনার সাথে থাকতে।আমি জানি আপনি আমাকে জোর করে আপনার সাথে থাকতে বাধ্য করবেন।আমি পারব না থাকতে।

কবির বিচলিত হয় না।খুব শান্ত ভাবে বলে,

দিব......

অবাক হয়ে তাকাই মাহি,

কবির যে মেনে যাবে ভাবতেই পারেনি।

তবে একটা শর্ত আছে

শতর্ত.....

আমি জানি তুমি আমাকে ভালোবাসো না।ভালোবাসতে পারবেও না।এতে তোমার দোষ নাই।তবে শর্ত এটা যে,

আমার সন্তান এই পৃথিবীতে আসার পর তুমি আমাকে দিয়ে দেবে ,মা হিসেবে কোন অধিকার দেখাতে পারবে না......।

এরপর তুমি তোমার জীবন মেঘের সাথে শুরু করতে পারো।

ও আমার ও সন্তান।

হ্যা।আমি অস্বীকার করছি না।আমার বেঁচে থাকার জন্য আমার সন্তান আমার চাই।আমি চাই না আমার সন্তান তোমাকে ঘৃনা করুক।তাছাড়া তোমাদের ও তো ভবিষ্যতে..........

আর কিছু বলতে পারল না কবির।গলা ধরে এসেছে তার।উঠে বাইরে যেতেই নজরে পড়ে মেঘ কে।একপলক তার দিকে তাকিয়ে চলে যায়।সে আর মাহির ওপর জোর করতে চায় না। ইচ্ছে করলেই সে মাহিকে জোর করে নিজের সাথে রাখতে পারে। কিন্তু যাকে সে এতটা ভালোবাসে তাকে সে আর কষ্ট দিতে চাই না।মেঘ ওর ভালবাসা ও যদি মেঘের সাথে সুখী হয় তবে তাই হবে।

,

,

,

,

অনেক দিন পর দাদু কে দেখে মাহি চোখে পানি ছলছল করছে......

হুইল চেয়ারে বসা লোকটির ও চোখ ছলছল করে ওঠে।হাত বাড়িয়ে মাহিকে কাছে ডাকে। মাহি ধীর পায়ে দাদুর কাছে বসতেই কেঁদে জরিয়ে ধরে আদরের নাতিকে।আমাকে মাফ করে দে মাহি.....

মাহি চুপচাপ উঠে দাড়াই।কোন কথা না বলে হেঁটে চলে আসতেই আটকে দেয় মেঘ.....

মেঘ:কোথায় যাচ্ছিস??

সন্তান এর পিতা বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।ছাড়ো.....

সন্তান মানে??তুই এই সন্তান রাখবি না।ওর মতো রেপিস্ট এর সন্তান তোর গভে কিছুতেই থাকতে দিব না।চল আজ ই তোর এবরেশন করাবো।বলে মাহির হাত টান দিতেই মাহি টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যেতে লাগলোও নিজেকে সামলিয়ে এক ঝাটকায় হাত সরিয়ে নেয়।

খবরদার আমার বাচ্চার ব্যাপারে একটাও বাজে কথা বলবেন না।

মেঘ অবাক হয়ে বলে,

মাহি তুই ঐ......

কবির অন্যায় করেছে।পাপ করেছে।তার শাস্তি আমি নিষ্পাপ শিশুকে দিব ভাবলে কি করে।আমার সন্তান নিয়ে একটা বাজে কথা বললে আমি ছেড়ে কথা বলব না।

বলে রেগে হনহন করে বেরিয়ে যায় মাহি। মেঘ মাহির এমন রৌদ্র রূপ দেখে অবাক হয়েছে। এতকিছু হলেও মাহিকে এতটা রাগতে দেখে নি মেঘ।আসলে মা রা এমন ই হয়।সন্তানের জন্য সব রুপ ধারণ করতে পারে।সহজ সরল মেয়েটাকে এভাবে রাগতে দেখে অবাক হয়েছে সবাই ই।

চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন