#প্রেম_শৃঙ্খলে_রুদ্ধ_রূপসী
পর্ব - ১৮(এলার্ট)
লেখিকা: সালসাবিল সারা
(কপি করা নিষেধ)
__________________
“বিশ্বাস করতে পারছি না আমার ভাসুর গম্ভীর লোকটা আমার আদুরে বোনকে বিয়ে করেছে। উনি তোমাকে গতকালই বিয়ের প্রস্তাব দিল আর তুমি গতকালই উনাকে বিয়ে করেছো? তোমাদের মাঝে কিছু থাকলে অন্তত আমাকে জানানো কি উচিত মনে করোনি তুমি? আমি তোমার এতটা পর?”
প্রশ্নের ঝড় তুলে হাবিবা বোনের দিকে। গতরাতে বাড়ি ফিরে যখন জেনেছিল তার ভাসুর আরন বেঞ্জামিন নিজের বড় বোনকে বিয়ে করেছে সকলের অবর্তমানে তখন হাবিবা কিছুতেই বিষয়টা মেনে নিতে পারছিল না। বোন এমন একটা পদক্ষেপ নিলো আর সেটা জানেনা হাবিবা! অসম্ভব! বোন কখনো তার থেকে কিছু লুকায়নি। আর না কখনো বেঞ্জামিন আর নুসাইবার ভেতরকার কোনো কানেকশন দেখেছিল! কিন্তু সবচেয়ে অবাক হলো যখন জেনেছে, নুসাইবা আর বেঞ্জামিন একে অপরকে বিয়ে করেছে পছন্দ করেই!
রাত থেকেই অন্তর ফেটে যাচ্ছিল হাবিবার বোনের এমন শুভ দিনে অনুপস্থিত থেকে,তার চেয়ে বড় বোন তার থেকে সত্যিটা লুকিয়েছে।
নুসাইবা বোনের প্রশ্নে কিছু বলে না। সে চুপচাপ রয়। গতরাতে লোকটার দেওয়া গভীর স্পর্শ,অবাধ্য সব ছোঁয়া এখনো গা শিউরে দেওয়ার মতো। সারাটা রাত সেই পালোয়ান মানব তার বুকের উপরে ঘুমিয়েছে। ব্লাউজ অব্দি ঠিক করতে দেয়নি। জীবনে এমন পরিস্থিতিতে প্রথম থাকায় রাতভর ঘুম হয়নি তেমন নুসাইবার। সকালে যখন ঘুম ভাঙলো,তখন গায়ে ব্লাউজ ঠিক ছিল। সাথে গায়ের উপর ছিল না সেই লম্পট রাগী লোকটা। তখন গিয়ে মেয়েটার ঘুম এসেছিল কিছুটা। তারপর ঘুম ভাঙ্গলে হাবিবাকে তার পাশেই পায়। মেয়েটার এক এক প্রশ্ন শুধু শুনেই গেলো নুসাইবা কিছু উত্তর দিতে পারল না।
হাবিবা বোনের অন্যমনস্ক অবস্থা দেখে বুঝতে পারে না কি কাহিনী। এইদিকে বোনের গলার দাগ,ঠোঁটের পাশের ভালোবাসার চিহ্ন স্পষ্ট জানান দিচ্ছে বেঞ্জামিন তাকে কতটা চায়! হাবিবা বোনের হাতে হাত রাখে। নম্র সুরে আওড়ায়,
“আপু? কিছু বলছো না কেনো?”
“হুঁ?”
নুসাইবা চোখের পলক ফেলে। বোনের দিকে তাকালে মেয়েটার সুশ্রী চেহারাতে ডায়মন্ডের নাকফুল জ্বলজ্বল করছে। গায়ে লাল রঙের জামদানি শাড়ি। ভ্রু কিঞ্চিৎ বাঁকানো। বোনের জন্যে চিন্তায় নিশ্চয়!
হাবিবা মেয়েটার চিবুকে হাত রাখে আফসোসের করে বলে উঠে,
“আপু তুমি খুশি আছো?”
ভারী চোখের পাতা তুলে নুসাইবা। তার ভেতরটা দুমড়ে আছে। বোনকে সত্য বলাটাও অত্যন্ত খারাপ দেখাবে। শয়তান লোকটা জানলে কোনো বড় ক্ষতি করতে পারে। সেইসব ভেবে এইবার ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে নুসাইবা আওড়ায়,
“হুম। তোর কেমন লাগছে এইখানে?”
“ভালো। সবাই অনেক ভালো। বিশেষ করে ইয়ামিন। উনি তো আমার জন্যে একদম পাগলের মতো করে। ব্লেস্ড আমি।”
হাবিবা হেসে জানায়।
নুসাইবা বোনের এই কথায় বেশ আরাম পায়। দুনিয়ায় আপন মানুষদের খুশির চেয়ে শান্তি আর কিসে আছে?
“খুব দোয়া করি তোর জন্যে।”
নুসাইবা আবারো তার বোনকে আদর করে।
“তুমি তো বেঞ্জামিন ভাইয়ের আদরেই আছো,দেখে বুঝছি আপু।”
হাবিবা বোনের সাথে টিটকারী করে। বোনের গলার চিহ্ন,গলার লাল তিল কি গভীর রক্তিম হয়ে আছে! এগুলো কিসের নিদর্শন সে জানে। বোনের সাথে যা রাগ ছিল, সবটা চুইয়ে পড়েছে বহুদূর। বেঞ্জামিন একজন জেন্টেলম্যান উনি নিশ্চয় সব ভেবে চিন্তে করেছেন। তাও আফসোস রয়ে গেলো,বড়বোন কেনো তাকে জানায়নি! নুসাইবা কিছু বিলার পূর্বে হাবিবা ফের বোনকে বলে উঠে,
“ভাইয়ার সাথে তোমার একটা সম্পর্ক ছিল,এটা আমাকে বলতে পারতে। আমি কেনো জানি রাগটা কমাতে পারছি না।”
তার কথায় নুসাইবা শাড়ির আঁচল গায়ের সাথে আরও লেপ্টে নেয়। পড়লে বিপদ। বোন যা বুঝছে সেইসব বেঞ্জামিনের জন্যে কি ছিল মেয়েটা জানেনা। কিন্তু নুসাইবার জন্যে কালকের রাতটা সবচেয়ে কষ্টের রাত ছিল,অভিমানের রাত ছিল।
“আমি…আমি কিছুই জানতাম..”
বলতে বলতে সে থেমে যায়। দরজার হাতল ঘুরিয়ে তখন প্রবেশ করে বেঞ্জামিন। পড়নে কালো রঙের পোলো টিশার্ট আর সাদা ট্রাউজার। হাতে আইপ্যাড। হাবিবা তাকে দেখে উঠে পড়ে। নুসাইবার হাত ছেড়ে দিয়ে যেতে নিলে বুঝে,হাতে টান পড়েছে। হাবিবা পেছন ফিরে।
তার বোন হাত ধরে রইলো,কিন্তু দৃষ্টি বেঞ্জামিনের পানে।
কক্ষের নীরবতা ভেঙে বেঞ্জামিন কর্কশ কণ্ঠে গম্ভীর হয়ে বলে উঠে,
“ব্রেকফাস্ট কেনো করোনি, সাইবা!”
তার সেই কন্ঠে হাবিবা কেঁপে উঠে। আর নুসাইবা! মেয়েটার যেনো জান উড়ে যাবে। হাবিবা দ্রুত নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয়। ফিসফিস করে বলে,
“আপু! পরে দেখা হচ্ছে।”
হাবিবা লম্বা কদমে সেই কক্ষ ত্যাগ করে।
নুসাইবা সুদর্শন সেই পাষাণ লোকটার দিকে আর ফিরে না। কোলে রাখা হাতের উপর দৃষ্টি দেয়।
অদূরে থাকা অযত্নের খাবারের ট্রে ইতিমধ্যে বেঞ্জামিন ঠেলে নিয়ে আসে তার বেডের পাশে।
“খাওনি কেনো,রূপসী?”
“আমার নাম নুসাইবা।”
মেয়েটা পাশে মুখ ফিরিয়ে বলে।
বেঞ্জামিন তার সামনেই বসে। বধূর মুখে অভিমান। চুলগুলো লম্বা হয়ে দুলছে মুখের দুইপাশে। শাড়ির আঁচল দিয়ে নিজেকে ঢেকে রাখার চেষ্টায়। গতরাতের পড়ানো অলংকারে একজন পারফেক্ট বউ লাগছে তার প্রাণনাশীকে। বেঞ্জামিন আঙুল দিয়ে অতি দ্রুত তার শাড়ির আঁচল সরিয়ে ফেলে। নুসাইবা কিংকর্তব্যবিমূঢ়! সে হিচকি তুলে একটু সরতে চায়। আঁচল দিয়ে শরীরটা ঢাকতে চায়। কিন্তু তার সামনে থাকা সেই লম্পট হাত দুইটি আটকে নেয়। দৃষ্টি অত্যন্ত নিভু নিভু,যেনো এখনি সেই দৃষ্টি দিয়ে স্বাদ নিচ্ছে সে মেয়েটার কায়ার।
“তোমার গলার এইযে চিহ্ন,বুকের এই বার্থ মার্কে,সেটার আশপাশে আমার ব্যাড টাচ বলছে তুমি আমার ওয়াইফ। অর্থাৎ নুসাইবা ছাড়াও তুমি আমার জন্যে অনেককিছু। যে নামে ইচ্ছা আমি সেই নামে ডাকব।”
নুসাইবা লজ্জায়,ভীতিতে মুখ নিচে নামিয়ে ফেলে। বেঞ্জামিন তার আরও নিকটে আসে। উত্তপ্ত সেই পাতলা কোমরে হাত গলিয়ে মেয়েটাকে তার কোলে বসায়,
“লম্পটের বউ এমন লজ্জাশীল!”
কথাটা বলে বেঞ্জামিন কিছুটা অধর বাঁকিয়ে হাসে। নুসাইবা না দেখলেও অনুভব করে লোকটার গায়ের দুলানো। সে দুইহাতে শাড়ি খিঁচে নেয়। আঁচল বিহীন লোকটার কোলে বসে আছে,এত লজ্জা মেয়েটা কোথায় লুকাবে?
“ছাড়ুন আমায়!”
নুসাইবা কিছু নড়ে। সে চোখে অল্প ক্রোধ নিয়ে তাকালে বেঞ্জামিনের হাসিমুখ দেখে যেনো অন্তর জ্বলে উঠে। লোকটা গাঢ় খয়েরি চোখের মণি,ফর্সা চোয়াল মন কাড়ার মতো।শয়তান লোকটার চোখে এত মায়া বা কিসের?
“ব্রেকফাস্ট না করার শাস্তি চাও?”
বেঞ্জামিন তার গলায় নাক ঘষে।
“দূরে সরুন.... দূরত্বে বসুন..”
নুসাইবা নিজের গলা সরাতে চাইলে বেঞ্জামিন তার গলা চেপে ধরে। রেগে লোকটার নাক মুখ ইতোমধ্যে রক্তিম। নুসাইবা এই দিনের আলোয় স্পষ্ট দেখে লোকটার ফুলে যাওয়া কপালের সেই রগ। ভয়ানক রেগে ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ল সে মেয়েটার ঠোঁটের উপর,
“দুনিয়ায় আগুন লাগাবো যদি আমার থেকে তোমার এক ইঞ্চি দূরত্ব তুমি বানাও। সবার আগে মারব তোমার বাবা মাকে। এরপর গায়েব করবো তোমার বোনকে। ইয়ামিনের সাথে অজানা জায়গায় পাঠিয়ে দিব,দুনিয়ায় থাকবে হাবিবা। কিন্তু তার নাগাল পাবে না। আমাদের মাঝে দুরত্ব আসলে শুধু তোমারই ক্ষতি। আমার সবদিকেই লাভ,কারণ আমি তোমাকে আমার খাঁচায় বন্দী করেছি আজীবনের জন্যেই!”
নুসাইবা ঠোঁট চেপে কান্না করে। চোখটা অত্যন্ত জ্বলে তার। লোকটা এমন হিংস্র! তাহলে কি বিয়েটা জলদি মেনে নেওয়ায় তার একমাত্র ভাগ্য?
বেঞ্জামিন তাকে ছেড়ে দেয়। উঠে দাঁড়ায়। পকেটে হাত রেখে বলে,
“ব্রেকফাস্ট করো। মেডিসিন নিতে হবে। জ্বর আসছে আবার।”
“খাবো না আমি! আপনি একটা পাপী,একটা অমানুষ। আমি ধ্বংস হয়ে যাব,তারপরও…”
মেয়েটার গলা ধরে আসে। বেঞ্জামিনের সেই রক্তচক্ষু দেখে তার প্রাণ উড়ে যাওয়ার অপেক্ষায়। লোকটা কিছুই বলেনি কেবল তাকিয়েছে ভয়ানকভাবে। এতেই মেয়েটার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। আর সে কিনা তার সাথে তর্ক করছে? যদি এখন শুট করে দেয়?
“পাপী,অমানুষ হলেও আমি তোমার হাজব্যান্ড। ইটস এ বিটার ট্রুথ,তাই না রূপসী?”
বেঞ্জামিন হাঁটু গেড়ে বসে। হাতের উল্টোপিঠে মেয়েটার চোখের পানি মুছে দেয়। বধূর ঠোঁটের কিনারায় কেটে যাওয়া ক্ষতে রাগ নিয়ে চুমু দেয় বেঞ্জামিন। নুসাইবা লোকটার বাহু চেপে ধরে। নখ দেবে যায় সেথায়। বেঞ্জামিন সরে আসে।
ট্রে থেকে ফ্রুট জুস নিয়ে তার মুখের সামনে নিলে নুসাইবার পেটে গুড়গুড় শব্দ করে। দেওয়ালে টাঙানো ডিজিটাল ঘড়ি জানান দিচ্ছে দুপুর একটা। মেয়েটা খিদের জ্বালায়,তৃষ্ণায় গ্লাস হাতে নিতে চাইলে বেঞ্জামিন সরিয়ে ফেলে,
“লিপ্স টু লিপ্স ট্রান্সফার করি এমন চাচ্ছো?”
কথাটা শোনামাত্র মেয়েটার শরীর হিম হয়ে আসে।ভেতরটা আওড়ায়,
“বেহায়া।”
অতঃপর লোকটার হাতেই নাস্তা শেষ করে। কয়েকবার করে ফোনকল আসলে বেঞ্জামিন ঔষুধের লিস্ট থেকে ঔষুধ বের করে মেয়েটার হাতে দিয়ে ফোন নিয়ে ব্যালকনিতে চলে যায়। বাংলাদেশে একটা বিশাল অস্ত্র কারখানার প্রজেক্ট করছে,বিয়ে উপলক্ষে এটাই সে তার ডিলারদের গিফট দিচ্ছে।
নুসাইবা রুম থেকেই দেখছে লোকটার অবয়ব। ম্যাস্কুলিন লোকটার দেহের সাথে টিশার্ট আটকে রইলো। বাহুর ট্যাটু ঢেকে আছে শার্টের হাতায়। রাশিয়ান ভাষায় কথা বলায় মেয়েটা ভাষা বুঝলো না। তাওয়াল হাতে নিয়ে ভাবতে লাগলো কি পড়বে সে! বেঞ্জামিনকে কিছু যে জিজ্ঞাসা করবে সেটার ইচ্ছেও নেই। কিন্তু দুপুরের সময় পার হচ্ছে এখনো সে রুম থেকে বাহির হয়নি,বাকিরা কি ভাববে? মেয়েটা ধীরে বেঞ্জামিনের পিছে গিয়ে দাঁড়ায়। শুনতে পাচ্ছে লোকটার গম্ভীর সুর,যেটা গতরাতে কিংবা এখনের কিছু অংশের সাথে একেবারে অমিল। লোকটা নিতান্তই বহুরূপী!
নুসাইবার গায়ের সুবাস পেয়েই বেঞ্জামিন পিছু ফিরে। ফোন কেটে আলগোছে মেয়েটার হাত টেনে তার সাথে মিশিয়ে নেয়,
“কিছু লাগবে?”
নুসাইবা নড়চড় করে। মিনমিন কন্ঠে জিজ্ঞাসা করে,
“শাওয়ার নিয়ে কি পড়বো?”
“নাথিং।”
বেঞ্জামিন তার ঘাড়ে হাত গলিয়ে বলে। আঁখিতে নেশা। নুসাইবার কানে যেনো ধোঁয়া ছাড়ে লোকটার সেই কথায়। পরক্ষণে নিজেকে সে লোকটার সুবিশাল বুকের সাথে লেপ্টানো অবস্থায় পায়। আড়াআড়ি কোলে তুলেছে সে মেয়েটাকে।
“নামান আমাকে। আমি গোসল করবো!”
“হুঁ। ওয়াশরুমে যাচ্ছি। আমিও করবো।”
বেঞ্জামিন সোজা তাকিয়ে জবাব দেয়। নুসাইবা এই লম্পটের সামনে অসহায়। একদম অসহায়। ঝর্ণার নিচে দাঁড়িয়ে সে আবারো গতরাতের মতো কেবল নিচের অংশ গায়ে নিয়ে। উপরেরটা লোকটা টেনে খুলেছে। বক্ষদেশের ভারীভাব তখনো চিনচিন করছিল,আর সেখানেই আবারো লোকটার স্পর্শ। অবাধ্য সেই স্পর্শে যতই নুসাইবা কিঞ্চিৎ আর্তনাদ করলো ততবারই বেঞ্জামিন মেয়েটার সত্তায় আরও জোরালো ছুঁয়ে বলছে,
“সো বিউটিফুল,সো টেম্পটিং,মাই হার্ট!”
কোনোভাবে নুসাইবা লোকটার স্পর্শ নিয়েই গোসলটা শেষ করে। লোকটা এমন উন্মাদ হচ্ছে তার জন্যে, নুসাইবা ভাবুক। বুকটা টালমাটাল। কোনোভাবে কি বেঞ্জামিন নুসাইবার প্রতি আকৃষ্ট? আকৃষ্ট না হলে কি হার্ট বলবে?
নুসাইবার মাথায় কাজ করে না। সে তাওয়াল জড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। বেঞ্জামিন মাত্রই ট্রাউজার পড়ে বেরিয়েছে। চোখে ভাসছে লোকটার সাদা পিঠে লম্বাটে নখের আঁচড়। নুসাইবার নখের।
বেঞ্জামিন ফের আসে। তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ড্রেসিং রুমের দিকে। ওয়াশরুমের পথ দিয়েও যাওয়া যায়। আবার রুমের ভেতরের একটা দরজা দিয়েও। নুসাইবার দৃষ্টি জ্বলজ্বল করে উঠে। মেয়েদের সকল সামগ্রীর ছড়াছড়ি সেকশন অনুযায়ী। বেঞ্জামিন তার সেকশন থেকে শার্ট নিয়ে পড়া অবস্থায় বলে,
“যেটা ইচ্ছা পড়ো। শুধু আমার সামনে কিছু পড়বে না। বুঝেছো?”
“নির্লজ্জ!”
মেয়েটা ফিসফিস করে বললেও তার হাত কেঁপে উঠে। শুধু হাত না,লোকটার একেকটা কথায় পুরো শরীর তার ঝলসে যায়।
পরপর অনুভব করে তার তোয়ালের ভাঁজের মাঝে লোকটার হাতের স্পর্শ। উন্মুক্ত উদরে ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেয়ে নুসাইবা মিররে তাকায়। লোকটার বলিষ্ঠ গায়ের সাথে সে একদমই ছোটখাটো। বেঞ্জামিন পুরো তৈরি আর মেয়েটা কেবল তোয়ালেতে জড়িয়ে। ইস! লজ্জায় গাল জ্বলছে। লোকটার ঘাড় অত্যন্ত নিচে নামায়। চোয়ালের পাশে চুমু দিয়ে আওড়ায়,
“আমি বেরোচ্ছি। ইয়ামিনদের প্রোগ্রাম রাতে। একসাথে যাবো।রেডি থেকো।”
নুসাইবা জবাব দেয়নি। আয়নায় তাকিয়ে লোকটার যাওয়া দেখলো। এতক্ষণ পর সে প্রাণভরে শ্বাস নেয়। বেঞ্জামিনের ব্যবহার,যত্ন দেখে মেয়েটা ভাবুক। লোকটা রাগী,অহংকারী কাল বিয়ের রাত অব্দি লেগেছিল। অথচ গতকাল বিয়ের পর থেকেই লোকটা তার সাথে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কথা বলেছে। বিশেষ করে জোর করে মেয়েটাকে আদর করা,মেয়েটার সত্তার জন্যে উন্মাদ হয়ে থাকা,কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করে সেই উন্মাদনা নিজেকে সামলেছে, নুসাইবাকে জোর করে সত্তা ধ্বংস করেনি।
মেয়েটা আয়নার সামনে দুইহাতে ভর দিয়ে দাঁড়ায়। ভাবুক মন বলছে,
“ঐ রাগী লোকটা যেহুতু তোকে জোর করে বিয়ে করেছে এরমানে লোকটার জীবনে তোর মাধুর্য বেশি। নাহয়,সেই অহংকারী লোক কখনো সবকিছুর ধার বাদ দিয়ে তোকে নিজের করতো না।”
নুসাইবা শ্বাস নেয় দৃঢ়। লোকটাকে সে সুযোগ দিবে কি? সুযোগ না দিয়েই তো লাভ নেই। ভয়ানক ঐ টাকাওয়ালা শয়তান তার অবাধ্য হলে সব ভেঙেচুড়ে নুসাইবাকেই ভস্ম করবে। ভেজা চুলগুলো শুকানোর জন্য হেয়ার ড্রায়ার নেয় সে হাতে। মেশিন চালু করে চুল শুকাতে নিলে ভেতরটা বলে উঠে,
“কঠোর লোকটাকে পছন্দ করা শিখ নুসাইবা… জলদি শিখ!”
চারিদিকে আত্মীয় স্বজন। হাবিবা আর নুসাইবা লিভিংরুমে বসে সবার মাঝে। হাবিবা নতুন বউরূপে ঘোমটা দিয়ে। মহিলারা হাবিবার মুখ দেখছে,উপহার দিচ্ছে। সারাটা দুপুর এইসব চললো। নুসাইবা এমনি কালো জামদানি পড়ে মাথায় ঘোমটা দেওয়া। পুতুল স্পষ্ট বলেছে,
“আমার বড় ছেলের অনুষ্ঠানের পর আমার বড় বৌমার এই রীতি করবেন।”
কি অমায়িক এক মহিলা। নুসাইবা অবাক হয়ে দেখে। বড়লোক হলেও উনি মানুষটা একদম মাটির মানুষ। সোফায় যে বসেছে নুসাইবা কতবার করে এসে গালে হাত বুলিয়েছে উনি দুই বোনের।
হাবিবার জন্যে বিকেলেই বিউটিশিয়ান এসেছে বাসায়। ইয়ামিন ঠিক করেছে সব। কথা ছিল সেই বিউটিশিয়ান হাবিবাকে সাজিয়ে ফের নুসাইবাকে সাজাবে। কিন্তু নুসাইবা বাঁধ সাধে। তার অত্যন্ত শরীর খারাপ লাগছে। জ্বর বাড়ছে নাকি সেটা বুঝেনি। পুতুল বা হাবিবাকে জানায়নি। কেবল চুপটি করে রুমে এসে বসে রয়। বাহিরের আবহাওয়া অত্যন্ত নীরব। যেনো বড় কোনো তুফান আসার আশঙ্কা। মেয়েটা বিছানায় হেলান দিয়ে বসে থাকে। রেডি যে হবে সেটার একটুও ইচ্ছা নেই। তবে কাল বিয়েতে যেহুতু যায়নি,তাই আজ না গেলে বিষয়টা মোটেও ভালো দেখাবে না।
সে বিকেলের ঔষুধ খেতে ভুলেছিল। তাই সেই ডোজ নিয়ে ক্লজেট হাতড়ে একটা মেরুন রঙের শাড়ি বের করে। সাথে কিছু গোল্ডের জুয়েলারী নেয়। জুতা জোড়া হিল চুজ করে। বেঞ্জামিনের পাশে তার হিল পড়াটাই বেটার। নাহয় তো একদম ছোট্ট দেখায়।
সে কোনোভাবে দক্ষ হাতে শাড়ি পড়ে। মুখে পাওডার দিয়ে গাঢ় মেরুন লিপস্টিক দেয়। সোনার সেই গহনায় মুড়লেই তার সাজ পরিপূর্ণ হয় ষোলআনা। হিল পড়ার জন্যে সে টুলে বসে ঝুঁকলেই বেঞ্জামিন আসে রুমে। হিল পড়ছে দেখে ভ্রু কুঁচকে আসে বেঞ্জামিনের। কাছে এসে মেয়েটার পা তুলে নেয়।
নুসাইবা হচকিয়ে উঠে। পা সরিয়ে বলে,
“কি করছেন?”
“দেখি!”
বেঞ্জামিন তার পা টেনে নেয় ফের। পায়ের সেই ডোরাকাটা ক্ষত এখনো আছে। লোকটা মেয়েটার পায়ের পাতায় হাত বুলিয়ে দেয়। গম্ভীর কণ্ঠে আওড়ায়,
“ফ্ল্যাট পড়ো।”
“নাহ। ফ্ল্যাট পড়লে আপনার পাশে ছোট দেখাবে অনেক।”
মেয়েটা বিরোধ করে।
“সো হোয়াট? তোমার কমফোর্ট সবার আগে। বসো। আমি এনে দিচ্ছি।”
বেঞ্জামিন কথাটা বলে উঠে দাঁড়ায়। সু রেগ থেকে গোল্ডেন ফ্ল্যাট জুতা এনে তার সামনে রাখে। শার্টের হাতা দিয়ে মেয়েটার পা মুছে দিয়ে জুতাটা পরিয়ে দেয়।
নুসাইবার চোখ জ্বলজ্বল করে। সে ঠোঁট খিঁচে নেয়।
পরপর শুনতে পায় লোকটার ভয়ানক এক হুমকি,
“ফারদার আমার অবাধ্য যদি হও সাইবা, আই সয়্যার তোমার দুনিয়ার আলো দেখাটাই বন্ধ করে দিবো।”
নুসাইবার বুকে হরতাল উঠে। বেঞ্জামিনের সত্তার দিকে নজর দিলে লোকটার ভয়ানক দৃষ্টি তার রূহকে ঝলসে দেয়। মানবের রূপ আসলেই বুঝা দায়! বেঞ্জামিন তার আঙুলে আঙুল ঠেকায়। কপালে কপাল স্পর্শ করে শুধায়,
“বুঝেছ কি বলেছি?”
“শুধু হুমকি দিচ্ছেন কেন?”
"যেটা দিতে চাচ্ছি সেটাতে সময় লাগবে তোমার।"
বেঞ্জামিন নেশালো দৃষ্টিতে তাকায়। সেই হিমশীতল দৃষ্টি দেখে মেয়েটা এইবার আর অবাধ্যকতা দেখানোর সুযোগ পায়নি মেয়েটা। হুমকিতে নীরব রইলো। শরীরটাও ভালো লাগছে না।
বিশাল আয়োজনের মাঝে মানুষের ঝড়। বেশিরভাগ আত্মীয়রা জানে গতকাল বেঞ্জামিন আর নুসাইবা বিয়ে করেছে। তার দিকের আত্মীয়রা কয়েকজন অভিনন্দন জানায় নুসাইবাকে। মেয়েটা হেসে কেবল মাথা নাড়ায়। বেঞ্জামিন এসেছে পর্যন্ত তার সাথেই থেকেছে। কিন্তু প্রেস এসে তাদের প্রশ্ন করতে নিলে বেঞ্জামিন ঢালের মতো তার সামনে দাঁড়িয়ে যায়। মিডিয়াকে স্পষ্ট করে বলে,
“নো ওয়ান ইজ অ্যালাউড টু টেক পিকচার্স অফ মাই ওয়াইফ।”
ব্যস সবাই দূরেই সরে। অতঃপর বেঞ্জামিন তাকে সেইফ জায়গায় বসিয়ে নিজেই যায় বক্তব্য দিতে।
চারিদিকে নানান আয়োজন চলছেই। লাবিবা গতরাতে বিয়ের সংবাদটা পেয়ে অবাক হয়নি। সে আগে থেকে জানত এমন কিছু একটা হবে। এখন সে নুসাইবাকে একা দেখতে পেয়ে সেদিকে এগোতে চায়। কিন্তু এরপূর্বে একটা বুলেট এসে তার পায়ে লাগে। সাথে তার আর্তনাদ আর গলগল করা বেরিয়ে আসার রক্তে পুরো ক্লাব কেঁপে উঠে।
নুসাইবা দেখেই চিৎকার দেয়। লাবিবা হাত উঠিয়ে তাকে ধরতে চায়। নুসাইবা এগিয়ে আসতে গিয়ে বুঝলো তার শরীর দুলছে। সাথে আরও কয়েকটা ফায়ারিং এর শব্দ। আর পুরো ক্লাবে মানুষের ছড়াছড়ি। দেখা গেলো কিছু সিকিউরিটি যারা দায়িত্বে ছিল তারাই এই হামলায় জড়িত। নুসাইবা কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। সকলে দৌড়াদৌড়ি করছে।লাবিবাকে তার বাবা টেনে নিয়ে যাচ্ছে দ্রুত। আর কোনো পরিচিত মুখ দেখলো না সে। মা,বাবা হাবিবা তারা ঠিক আছে তো! বেঞ্জামিন…লোকটা কোথায়?
এলেক্স কোত্থেকে উড়ে এসে তার সামনে দাঁড়িয়ে গেলো মুহূর্তে,
“ম্যাডাম আমার পিছে আসুন।”
অন্যপাশ থেকে ইথেন এসে কভার করে তাদের,
“বাকিরা সেফ কিন্তু..বস…বসের গুলি লেগেছে।”
“আহহহ শিট, লেটস মুভ…ম্যাডাম প্লিজ ভয় পাবেন না। একটু জলদি হাঁটুন।”
এলেক্স শুট করা অবস্থায় বলে।
নুসাইবা হতভম্ব। তার শরীরটা ছেড়ে দিবে এমন অবস্থা। লোকটার বউ এখন সে,সেই কারণেই হয়তো মেয়েটার রুহ থরথর করছে। গতরাতে লোকটা তার উন্মুক্ত বুকেই তো ঘুমিয়েছে,তাকে বিয়ে করার জন্যে কত পাগলামি না করলো! ঝাপসা হয়ে আসে তার চোখ জোড়া। বিড়বিড় করে আওড়ায়,
“বেঞ্জ..বেঞ্জামিন!”
নুসাইবা কিছু বলতে যাবে তার আগেই অস্বচ্ছ দৃষ্টিতে দেখলো ভিড়ের মাঝেই সেই কঠোর লোকটা এগিয়ে আসছে। সফেদ কোটের হাতের দিকে লাল রঙে ছেয়ে গেলো।কিন্তু দুইজনের দৃষ্টি মিললে নুসাইবা ইথেনকে সরিয়ে দিয়ে বেঞ্জামিনের দিকেই এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। অথচ তার পা,কোমর সব ভেঙে আসার উপক্রম।
বেঞ্জামিনই দ্রুত কদমে মেয়েটার কাছে আসে। তার গালে বেসামাল স্পর্শ করে বলে,
“আর ইউ ফাইন,জান!”
“আপনার…আপনার গুলি…”
মেয়েটা কেঁপে কেঁপে উঠে। যেনো ব্যথাটা সেই পেয়েছে! কিন্তু বেঞ্জামিন কিছু বলার আগেই অত্যধিক ফায়ারিংয়ের জন্যে মিরোরের শোপিজ সজোরে ভেঙে যায়। নুসাইবার গায়ে সেটা পড়ার আগেই বেঞ্জামিন তাকে বুকের ভেতর আগলে নেয়। ফলস্বরূপ সেই বিশাল মিরোর বেঞ্জামিনের পিঠেই পড়ে। লোকটা একটা শব্দও করলো না। অথচ নুসাইবা চমকে উঠে,আর্তনাদ করে। লোকটার বুকের ভেতর থাকা অবস্থায় বুঝলো মেয়েটাকে বাঁচাতে বেঞ্জামিন নিজেরই ক্ষতি করেছে!
নুসাইবার মাথা দুলে। সে লোকটার বুকের শার্ট খিঁচে ধরে।বেঞ্জামিন সটান দাঁড়ায়। ওভাবেই তার বউকে কোলে তুলে নেয়। এলেক্স আর ইথেন তাদের কভার দিচ্ছে। নুসাইবার চোখ বটে আসে,জ্ঞান হারাচ্ছে সে... কিন্তু রমণী ফিচেল শুনতে পায় বেঞ্জামিনের দুর্ধর্ষ কন্ঠস্বর,
“আমার রূপসী যাদের জন্যে ভয়ে জ্ঞান হারাচ্ছে,আমি তাদের সজ্ঞানে তাদের চোখ উপড়ে নিবো।”
চলবে……
কপি করা নিষেধ। কেমন হয়েছে সবাই জানাবে কিন্তু। রিচেক করিনি তাই ভুল হলে বানান জানাবে।