#আশিক_আল_জিন
#পর্ব_১৯
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া
রাজ্য জুড়ে রক্তের গন্ধ আর পোড়া ধোঁয়া ভাসছে। ভ্যাম্পায়ারদের মৃতদেহ পড়ে আছে রাজপ্রাসাদের প্রাচীর ঘিরে। ভাঙা দেয়াল, ছাই হয়ে যাওয়া কিছু অট্টালিকা আর আহত জিন যোদ্ধাদের হাহাকার সব মিলিয়ে যেন মৃত্যুর শহর হয়ে উঠেছিল জিন রাজ্য। এখন ধীরে ধীরে সব স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। আকাশে দাঁড়িয়ে আছে দু’টি অদম্য ছায়া–দুলফিকার আর নুসাইর। তারা দু’জনের শরীর মৃদু ক্ষতবিক্ষত, তবুও তাদের চোখে আছে বিজয়ের দীপ্তি। দুলফিকারের নিঃশ্বাস এখনও ঝড়ের মতো চলছে, চোখের নীল শিখা আস্তে আস্তে নিভে আসছে।
রাজা মালিক আল জিন সিংহাসনের সিঁড়ি থেকে নিচে নেমে এলেন। তার চোখে বিস্ময়, দ্বন্দ্ব, আর এক অদ্ভুত যন্ত্রণা। যে ছেলেকে মুহূর্ত আগেই ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করেছিলেন, সেই ছেলের হাতেই আজ রক্ষা পেয়েছে রাজ্য। চারদিকে জিন পরিষদের গম্ভীর গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। কেউ কেউ অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে আছে দুলফিকারের দিকে, কেউ আবার নিঃশব্দে মাথা নত করছে।
দুলফিকার ধীরে ধীরে মাটিতে নামলো। বুক চওড়া করে দাঁড়ালো, কিন্তু তার চোখে একটুও নতি নেই। নুসাইর এসে পাশে দাঁড়ালো, কাঁধে হাত রাখলো ভাইয়ের। রাজা মালিক সামনে এসে দাঁড়ালেন। এক মুহূর্ত চুপ করে থাকলেন, তারপর কণ্ঠ ভারী করে বললেন,
“আজ যদি তুমি না থাকতে, এই রাজ্য ধ্বংস হয়ে যেতো। তবুও মনে রেখো, দুলফিকার… আমি যে রায় দিয়েছি, তা চিরন্তন। তা বদলাতে পারবোনা আমি। “
দুলফিকারের ঠোঁটে হালকা তিক্ত হাসি ফুটলো।
“আমি আপনার রাজ্যকে রক্ষা করেছি রাজ্যের জন্য, আপনার জন্য নয়। আমি আমার দায়িত্ব ভুলিনি, যদিও আপনি আমাকে ভুলে গেছেন।”
মুহূর্তের জন্য রাজসভা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। রাণী নূর আল জোহরার চোখে অশ্রু ঝলমল করছে, কিন্তু তিনি কোনো কথা বললেন না। শুধু চোখের ভেতর গভীর এক শূন্যতা ভাসছে। ঠিক তখনই দূর থেকে এক যোদ্ধা দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,
“মহারাজ! ভ্যাম্পায়াররা শুধু আক্রমণ করতেই আসেনি। তারা বার্তা দিয়ে গেছে… ‘ভ্যালেরিনা ফিরে এসেছে’ এবং শীঘ্রই ভ্যালেরিনা জিন রাজ্যের ওপর আক্রমণ করতে আসবে।
এই কথা শুনেই পুরো রাজসভা যেন কেঁপে উঠলো। সবাই আতঙ্কিত দৃষ্টিতে একে অপরের দিকে তাকাতে লাগলো। ভ্যালেরিনা! জিন রাজ্যের কাছে নামটাই যেন অভিশাপ।
রাজা মালিকের চোখ লাল হয়ে উঠলো, কণ্ঠ গর্জন করলো,
“ভ্যালেরিনা? সে কীভাবে ফিরে আসতে পারে? এ তো অসম্ভব!”
কিন্তু দুলফিকারের বুক হঠাৎ কেঁপে উঠলো। আরিবা কেন এমন করবে? তার সাথে জিন রাজ্যের কী শত্রুতা! দুলফিকারের মুঠি শক্ত হয়ে গেলো।
“না। সে আমার আরিবা। ও কেন জিন রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে! আমি কথা বলবো তার সাথে। কথা বলবো। “
রাজসভায় আবারো গুঞ্জন উঠলো। রাজা ভাবনায় ডুবলেন। মেলিসা মৃত্যুর আগে বলেছিল – ভ্যালেরিনা মেলিসার কন্যা সে একদিন জিন রাজ্যের সর্বনাশ করবে। সত্যি কি তাই হবে? শুকনো ঢোক গিললেন মালিক আল জিন। ভ্যালেরিনার নাম শুনতেই পুরনো স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছে সব। এদিকে নুসাইর ধীরে ধীরে দুলফিকারের দিকে তাকালো, কণ্ঠ নিচু কিন্তু দৃঢ় করে বলল,
“ভাই… আরিবা যদি সত্যি জিন রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে তখন তুমি কি করবে? ভালোবাসা না-কি দায়িত্ব – কোনটা বেছে নিবে তুমি? আমিই বা কী করবো দুলফিকার? আমার পক্ষে আরিবার বিরুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব না। জানি আমার মুখে ওর নামও সহ্য হয় না তোমার। কিন্তু এটাই সত্যি যে আরিবার সামনে আমরা কিছু করতে পারবোনা। কিন্তু আমাদের বাবা-মা, প্রজাদের কী হবে? “
দুলফিকার চুপ করে গেল। এমন ভয়ংকর দিন এলে সত্যি সত্যি দুলফিকার কী করবে? বাবা-মা না-কি প্রেমিকা!
রাজসভা এখন উত্তপ্ত, রাজার ভেতরে অস্থিরতা, পরিষদে আতঙ্ক, আর রাজ্যজুড়ে যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন। এর মাঝেই এক নতুন অশনি সংকেত নেমে এলো– ভ্যালেরিনা ফিরে এসেছে।
কালো ঝড়ের মতো রাজপ্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে এলো দুলফিকার । আকাশ ছিঁড়ে উড়ে চললো অদৃশ্য ডানায় ভর করে। রাতের আকাশে পূর্ণচাঁদ ভাসছে। উদ্দেশ্য আরিবার কাছে যাওয়া। এমনিতেই গতকালের পর আরিবার সাথে দেখা না হওয়াতে দুলফিকারের বুকটা কেমন খালি খালি লাগছে। তার ওপর ভ্যাম্পায়ারদের ঘোষণার সত্যতা কতটুকু সে বিষয়ও নিশ্চিত হতে হবে।
এসব ভাবতে ভাবতে দুলফিকার হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। পরমুহূর্তে সরাসরি আরিবার কক্ষের মাঝখানে উপস্থিত হলো সে। আরিবা দাঁড়িয়ে আছে জানালার পাশে। দুলফিকারের উপস্থিতি বুঝতে পেরে পেছন ফিরে তাকাল আরিবা। কিন্তু সে আর আগের মতো নেই। তার চারপাশে হালকা লাল আভা, চোখে অদ্ভুত দীপ্তি, চুলগুলো আরও ঘন আর লম্বা হয়ে পিঠ বেয়ে নেমে এসেছে। বুকের ভেতর থেকে নির্গত হচ্ছে এক অচেনা শক্তির তরঙ্গ। কিন্তু দুলফিকারের চোখে সে এখনো সেই আরিবা – নরম, সরল, যার জন্য পৃথিবীর সবকিছু ছেড়ে আসতে পারে সে। দুলফিকার ধীরপায়ে এগিয়ে গেলো জানালার পাশে। আরিবা আবারও দৃষ্টি সরিয়ে, জানালার বাইরে তাকালো। দুলফিকার পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো আরিবাকে। কিন্তু আরিবা দুলফিকারের হাত নিজের থেকে সরিয়ে ফেলল।
“ রাগ করেছো, প্রেমিকা?”
দুলফিকারের সহজসরল প্রশ্নে মৃদু হেসে পেছনে ফিরে তাকাল আরিবা।
“ না। “
“ তবে?”
দুলফিকারের মন অজানা আশংকায় অস্থির হয়ে উঠছে। মনে হচ্ছে আরিবা ওর সামনে থেকেও অনেক দূরে আছে।
“ দুলফিকার তুমি যদি কখনো জানতে পারো তোমার বাবা-মার খুনি তোমার, ভালোবাসার মানুষের বাবা– তখন তুমি কী করবে?”
একপা পিছিয়ে গেলো দুলফিকার। প্রথমত আরিবার কণ্ঠে এমন অদ্ভুত দৃঢ়তা, যা প্রমাণ করে দিচ্ছে আরিবার সেই কোমলতা হারিয়ে গেছে। আর দ্বিতীয়ত আরিবা যে কথাটা দুলফিকারকে বোঝানোর জন্য বলেছে সেটাও বুঝতে পেরেছে। কিন্তু নিজের বাবার বিরুদ্ধে এমন কথা বিশ্বাস করতে পারলো না দুলফিকার। লম্বা নিঃশ্বাস ছাড়ল সে।
“ হয়তো আমার ভালোবাসার মানুষের বাবা তেমন কোনো কাজই করেনি। হয়তো কারো ষড়যন্ত্র অথবা ভুল বোঝাবুঝি? “
তাচ্ছিল্যের সুরে বলল আরিবা,
“ বিশ্বাস করা ভালো তবে অন্ধবিশ্বাস নয়। চোখ বন্ধ করো, সবকিছু নিজেই দেখতে পাবে। “
দুলফিকার আরিবার কথামতো তাই করলো। বুকের ভেতর অদ্ভুত যন্ত্রণা অনুভব করছে সে। দুলফিকার চোখ বন্ধ করতেই আরিবার চোখগুলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। আর দুলফিকারের মস্তিষ্ক সেদিনের সেই দৃশ্য দেখতে পেলো– যেদিন মালিক আল জিন তার দলবল নিয়ে মেলিসা, আযান এবং তার সন্তানকে মেরেছিলো। আর কীভাবে বেঁচে গিয়েছিল, সবকিছুই দেখলো দুলফিকার। মালিক আল জিনের এমন অপকর্মে দুলফিকারের শরীর যেন অবশ হয়ে এলো। চোখ মেলে তাকাল সে, আরিবা চুপচাপ ওর দিকে তাকিয়ে আছে। দুলফিকার মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। আরিবার চোখ ছলছল করছে। নিজের পরিবারের সাথে হওয়া অন্যায়ের দৃশ্যগুলো দেখলেই কলিজা জ্বলে ওঠে ওর। দুলফিকার নিজেকে সামলাতে লাগলো। আরিবা হয়তো তার বাবার বিরুদ্ধে সত্যি যুদ্ধে লিপ্ত হবে। তখন কী হবে? দুলফিকার না পারবে আরিবার বিরুদ্ধে কিছু করতে আর না পারবে বাবাকে মৃত্যুর কোলে ঢ'লে পড়তে দেখতে। কিন্তু সত্যি তো এটাই – দুলফিকারের পিতা একজন খুনি এবং জঘন্য অপরাধকারী। তাকে তো তার অপকর্মের শাস্তি পেতেই হবে।
আরিবাও ইতিমধ্যে মেঝেতে বসে পড়েছে। নিঃশব্দে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে সে। তার চোখের জল যেন প্রকৃতিতে বৃষ্টি হয়ে পড়ছে। বাইরে তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়েছে। দুলফিকার বেশ কিছুক্ষণ নিজের সাথে বোঝাপড়া শেষে আগের ন্যায় শক্তিশালী চিত্তে ফিরে এলো। আরিবার পাশে গিয়ে বসে, হাতে হাত রাখলো দুলফিকার।
“ অন্যায় যে-ই করুক না কেন, সেটাই অন্যায়ই হয়। আমি লজ্জিত, আমার বাবার কৃতকর্মের জন্য। সে তোমার আসামি, তুমি তাকে শাস্তি দিতে পারো। আমি তোমার পথে বাঁধা দেবোনা। “
কথাগুলো বলেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল দুলফিকার। জীবন তাকে কখনো এমন কঠিন পরিস্থিতিতে এনে দাঁড় করাবে কখনো ভাবেনি সে। আরিবা ম্লান হাসলো। তার বুকে প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে, অথচ দুলফিকারকে ঘৃণা করতে পারছে না সে। জিন রাজার রক্ত বইছে যার শরীরে তাকে কীভাবে ভালোবাসবে আরিবা? এটা কি তার বাবা-মায়ের প্রতি অবিচার করা হবে না? কিন্তু…. কিন্তু দুলফিকারের প্রতি আরিবার হৃদয়ের অন্তস্তলে যে তীব্র অনুভূতি তা কিছুতেই দমিয়ে রাখতে পারছেনা আরিবা। দুলফিকার আরিবাকে বুকে জড়িয়ে নিয়েছে অথচ আরিবা চাইলেও নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারছে না। কীভাবে পারবে? শুধুমাত্র তার জন্য নিজের রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়েছে দুলফিকার। এখন যদি আরিবাই তার থেকে মুখ ফুরিয়ে নেয় তাহলে কী করবে সে? আরিবার অসহায় লাগছে খুব। দুলফিকারের বুকে মুখ গুঁজেই সেই অসহায়ত্ব প্রকাশ করতে লাগলো সে। সারারাত ওভাবেই মেঝেতে বসে রইলো দু'জন।
পরেরদিন সকালে ঘুম ভাঙার পর নিজেকে আরিবার বিছানায় আবিষ্কার করলো দুলফিকার। কিন্তু আরিবাকে বিছানায় দেখতে না পেয়ে শোয়া থেকে উঠে বসলো সে। পুরো বাড়িতে খুঁজেও মেয়েটিকে না পেয়ে দুলফিকার সরাসরি রুস্তমের ঘরে গেলো। রুস্তম জানালো – সকাল সকাল রোদ্দুর এসেছিলো। দুলফিকারের ঘুম যেন না ভাঙে সেজন্য আরিবা রোদ্দুরের সাথে বসার ঘরে বসে কথা বলেছিলো। আলোচনার একপর্যায়ে রোদ্দুর রেগে গিয়েছিল, কারণটা ছিলো আরিবার ঘরে দুলফিকারের থাকা নিয়ে। পরে আরিবা রোদ্দুরের সাথে ভ্যাম্পায়ার রাজ্যে চলে গেলো।
চলবে
প্রোমো কোড ব্যবহার করে " আশিকা জিন " ই-বুকটি মাত্র ২৩ টাকায় কিনতে পারবেন , বইটই এপস থেকে।
লিংক- https://link.boitoi.com.bd/toYcp
এলার্ট- ই-বুকটি অতিরিক্ত রোমান্টিক / ইরোটিক রোমান্সে ভরপুর।
আগের পর্ব https://www.facebook.com/100085130931546/posts/743930161788008/
পরবর্তী পর্ব https://www.facebook.com/100085130931546/posts/746893031491721/