#আশিক_আল_জিন
#পর্ব_২১
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া
যুদ্ধের ক্ষণ গুনছে জিন রাজ্য।
রাত পোহালেই ভ্যাম্পায়ার রাজ্যের সমগ্র বাহিনী, সাথে রাজপুত্র রোদ্দুর আর ভ্যালেরিনা, ঝাঁপিয়ে পড়বে জিনদের ওপর। এই ভয়াল সংবাদ ছড়িয়ে পড়েছে পাতাল থেকে আসমান, নাগরাজ্য থেকে শুরু করে সুদূর পরী রাজ্য পর্যন্ত।
পরী রাণী ইরান, যিনি এত বছর ধরে নাতনির খোঁজে দিন কাটিয়েছেন, খবর পেয়ে ভেতরে ভেতরে আনন্দে ভরে উঠলেন।তার নাতনি আরিবা এখনো বেঁচে আছে! কিন্তু সেই আনন্দের সাথে মিশে গেল গভীর আতঙ্কও। কারণ তিনি জানেন, ভ্যালেরিনার শক্তি সীমাহীন, আর সে শক্তি যদি ভুল হাতে পড়ে, তবে সমগ্র দুনিয়ার জন্য ভয়ঙ্কর বিপদ নেমে আসবে। আরিবা এখন ভ্যাম্পায়ারদের হাতে, আর তার ক্ষমতাই তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
রাণী ইরান খুব ভালো করেই বুঝতে পারছেন ভিরনের চক্রান্ত। কিন্তু তিনি অসহায়। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়, বয়সের ভারে দেহ নুইয়ে গেছে অনেক আগেই। একমাত্র মেয়েকে হারানোর বেদনা আর স্বামীর মৃত্যুর আঘাত তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ভীষণ দুর্বল করে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি শয্যাশায়ী, তাই সরাসরি আরিবার সামনে গিয়ে উপস্থিত হওয়ার মতো শক্তি তার আর নেই।
তবুও ইরানের হৃদয়ে ভালোবাসা ও ভয় মিলেমিশে জ্বলে উঠলো। তিনি জানেন, যদি আরিবাকে নিজের কাছে টেনে নিতে পারেন, যদি তাকে সত্যিটা বুঝিয়ে পরী রাজ্যে ফিরিয়ে আনা যায়, তাহলে আগামীকালের যুদ্ধ হয়তো একেবারেই অন্য রূপ নেবে। নাহলে শুধু জিন রাজ্যের ধ্বংস নয়, ভ্যাম্পায়ারদের কুটিল রাজ্যও শক্তি আর ছলনায় জয়ী হয়ে উঠবে। তাই শেষ শক্তিটুকু জড়ো করে রাণী ইরান আরিবার কাছে দূত পাঠালেন। মনের ভেতর প্রার্থনা জ্বলে উঠলো–
“হে সৃষ্টিকর্তা … আমার নাতনিকে অন্ধকারের হাত থেকে রক্ষা করো।”
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে আরিবা।
রাতের আকাশ ঘন কালো, দূরে লালচে মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। শীতল হাওয়া চুল এলোমেলো করে দিলেও সে টের পাচ্ছে না কিছু। চোখদুটো নিস্তেজ, ঠোঁট শক্ত করে চেপে রাখা। যাবতীয় চিন্তাভাবনা যেন লোপ পেয়েছে তার ভেতর থেকে। এখন আর বাবা-মা নেই তার মাথায়, নেই দুলফিকারও।সবকিছু হারিয়ে গিয়েছে এক অদৃশ্য অন্ধকারে। শুধু একটাই ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে মনের গভীরে,
“কীভাবে জিন রাজ্যকে ধ্বংস করা যায়।”
তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত আগুন জ্বলছে।
হাতদুটো জানালার কাঠ চেপে ধরতেই ওর শক্তি দপদপ করে উঠলো । ঠিক এমন সময় “ঠকঠক!”
দরজায় আঘাতের শব্দ ভেসে এলো। আরিবা চমকে তাকালেও চোখে কোনো কোমলতা নেই।
দৃষ্টি তীক্ষ্ণ, ঠান্ডা। কপাল কুঁচকে সে ধীরে ধীরে দরজার দিকে ঘুরলো।
“ কে?”
গম্ভীর কণ্ঠে শুধালো সে। সালমা বললেন,
“ আমি! দরজা খোলো আরিবা। “
আরিবা হাতের ইশারায় দরজা খুলে দিলো। সে আগের মতোই জানালার পাশে দাঁড়িয়ে, দৃষ্টি তার বাইরে। সালমার হাতে খাবারের বাটি। আরিবার এমন ভাবলেশহীন আচরণে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সালমা। রুস্তম আরিবার কথা ভাবতে ভাবতে আজকের বেশিরভাগ সময় অসুস্থ থাকেন। অথচ আরিবার সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। ওর মন ও মস্তিষ্কে কেবল নিজের জন্মদাতা মা-বাবা এবং ভাইয়ের খুনের বদলা ঘুরপাক খেতে থাকে।
“ কিছু তো খেলে না, রাতে। অল্পকিছু খাও?”
“ আমার খিদে নেই। জানোই তো আমার আজকাল খিদে লাগে না। আলো-আঁধারির মাঝেই আমার খিদে মিটে যায়। “
আরিবার মানুষের মতো খিদে পায় না এখন। সূর্যের আলো আর রাতের আধার দুটোতেই ওর শক্তি মেলে। তবে মাঝে মধ্যে তা-ও অভ্যস্তবশত কিছু খাবার খেতে হয় তাকে। সালমা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।
“ ঠিক আছে। গত কয়েকদিন কি ভ্যাম্পায়ার রাজ্যে ছিলে? “
“ হ্যাঁ। “
“ দুলফিকারের সাথে কি মনোমালিন্য হয়েছে? “
আরিবা মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ না। “
সালমা কী বলবেন বুঝতে পারছে না। সেদিনের পর থেকে দুলফিকার এখানে আসেনি। আর আসবে কেন? আরিবা তো কিছুক্ষণ আগেই এলো এখানে। সালমার দুলফিকারের জন্য বড্ড মায়া হয়। রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে কোথায় কোথায় যে ঘুরছে ছেলেটা!
“ আচ্ছা। আরিবা একজনের অন্যায়ের জন্য সবাইকে শাস্তি দিও না। তোমার দোষী কেবল জিন রাজা, জিন রাজ্য নয়। “
আরিবা কিছু বললো না। সালমার মন অস্থির হয়ে আছে। এই মেয়েকে সালমা চেনে না। সম্পূর্ণ অচেনা এক মেয়ে, সে। আগের আরিবা কতটা নরম মনের ছিলো, আর এখনকার আরিবা? মায়াদয়াহীন এক প্রাণী। যার শরীরে মন থাকলেও হয়তো অনুভূতি ভোঁতা হয়ে গেছে।
দু'জনার কথোপকথনের মধ্যে হুট করেই দুলফিকার এসে উপস্থিত হলো সেখানে। সালমার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। আরিবার কোনো নড়নচড়ন হলোনা ঠিকই কিন্তু বুকটা কেমন দ্রিম দ্রিম শব্দ করে উঠলো।
“ কখন এলে তুমি? “
আরিবার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো সে। সালমা ধীরপায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। দুজনের কথা বলা দরকার, একান্তে। সালমার প্রস্থানের পর দুলফিকার দরজা আঁটকে দিলো। আরিবার এমন মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকায় মেজাজ বিগড়ে গেলো দুলফিকারের। এমনিতেই এতগুলো দিন আরিবা ওই রোদ্দুরের আশেপাশে ছিলো বলে দুলফিকারের রাগের শেষ নেই। কিন্তু কার ওপর রাগ দেখাবে সে? আরিবা তো দুলফিকারকে পাত্তাই দেয়না এখন। এতগুলো দিন যে যোগাযোগহীন ছিলো তাতেও আরিবার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
“ কী হলো? কথা বলছো না কেন?”
দুলফিকার আরিবার কাঁধে হাত রেখে,কিছুটা উঁচু স্বরে জিজ্ঞেস করলো। মুহুর্তেই আরিবা বিদ্যুৎতের বেগে দুলফিকারের থেকে দূরে সরে দাঁড়াল। চমকাল দুলফিকার।
“ তোমার সাথে কথা বলতে বাধ্য নই আমি। “
“ আরিবা!”
দুলফিকারের বিস্ময় কাটে না। এইতো সেদিন ভ্যাম্পায়ার রাজ্যের বাইরে তারা জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টুকু কাটিয়েছিল, অথচ আজ! আজ আরিবার আচরণ একেবারে বদলে গেছে। আর দুলফিকার সেটাই মানতে নারাজ। আজ অবধি দুলফিকার আরিবার সামনে নিজের রাগ, জেদ সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। কিন্তু আরিবার এই অবহেলা সে সহ্য করতে পারছে না। আরিবার এই আচরণ যে অস্বাভাবিক সেটাও বুঝতে পারছে না দুলফিকার। রাজা ভিরণ সুকৌশলে আরিবাকে সেই বিশেষ তরল খাইয়ে দিয়েছিল সেদিন। আর তাতেই আরিবার মাঝে এই পরিবর্তন। ভিরন আর রোদ্দুরের ভয় ছিলো কোনোমতে যদি যুদ্ধের সময় আরিবা দুলফিকারের প্রতি দূর্বল হয়ে পড়ে তখন সবকিছু ভেস্তে যাবে। আর তারজন্য এতকিছু করা।
“ আগামীকাল যুদ্ধ দুলফিকার…. “
আরিবা কথা শেষ করার আগেই দুলফিকার তার হিংস্র রাগ প্রকাশ করে ফেলল। আরিবার চুলের মুঠি শক্ত করে ধরে, অন্য হাতে ওর কোমর চেপে ধরে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে ফেলল তাকে। আরিবার চোখের দিকে পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দুলফিকার। আরিবাও চুপচাপ তাকিয়ে আছে কেবল।
“ আগামীকাল কী হবে আমি জানি না আরিবা। কিন্তু এই মুহুর্তে হয় তুমি আমাকে ধ্বংস করো নয়তো, এই অবহেলা বন্ধ করো। “
আরিবার বুকের ভেতর অদ্ভুত যন্ত্রণা অনুভব হচ্ছে। তবে সে কিছুই প্রকাশ করতে পারছে না। আর না তো দুলফিকারের থেকে দূরে সরতে পারছে। দুলফিকার ওর চুলগুলো এমনভাবে ধরে আছে যে মাথাটা পেছনে এলিয়ে গেছে।
“ আমি অবহেলা করছি না, দুলফিকার। “
“ তুমি করছো, আরিবা। “
“ না। “
দুলফিকার আরো শক্ত করে কোমরে চাপ দিলো আরিবার। জামার ওপর থেকেই নখের অস্তিত্ব টের পাচ্ছে মেয়েটা। দুলফিকার হিসহিসিয়ে বলল এবার,
“ তাহলে কি রোদ্দুরের স্পর্শ পেয়েছ তুমি? কোথায় ছুঁয়েছে ও? কোথায় ছুঁয়েছে, বলো?”
আরিবাকে আকস্মিক পেছনে ফিরিয়ে, একহাতে গলা চেপে ধরলো দুলফিকার। এতটাই জোরে যে আরিবার চোখ ছলছল করছে। দুলফিকারের চোখেও পানি, টুপটাপ ফোঁটা আকারে পড়ছে।
“ দু…ল…ফি…কার আ…মার লাগছে… “
ভাঙা ভাঙা গলায় কথাগুলো কোনোমতে বলল আরিবা। বিষয়টা বুঝতে পেরে দুলফিকার হাতের চাপ কমিয়ে ফেলল। আরিবাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে ফুঁপিয়ে
কেঁদে উঠলো সে।
“ দয়া করো প্রেমিকা। আমি তোমাকে ছাড়া বড্ড অসহায়। “
আরিবা কিছু বলতে পারছে না। বুকে কী ভীষণ যন্ত্রণা! মনে হচ্ছে দম বন্ধ হয়ে যাবে ওর। দুলফিকারের এমন রূপ দেখে সে সহ্য করতে পারছে না। কী হচ্ছে! কিছু বুঝতে পারছে না।
“ শান্ত হও। এরকম করো না। আমার অস্থির লাগছে ভীষণ। “
আরিবা একমুহূর্তের জন্য যেন নিজের ভেতর ফিরে এলো। দুলফিকারের বুকে চুমু খেলো সে। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল দুলফিকার। কিছুক্ষণ আগে নুসাইরের সাথে কথা হয়েছিল দুলফিকারের। নুসাইর সবকিছু জানার পর কিছু বলার মতো খুঁজে পায়নি। নিজের বাবা যে এতটা খারাপ হতে পারে দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি নুসাইর। তবে যাইহোক মালিক আল জিন ওর বাবা, তেমনি দুলফিকারেরও বাবা। তাই আসন্ন পরিস্থিতি আচঁ করতে পেরে দুজনেই ভয়ে পাচ্ছে। কিন্তু আরিবা তো ভুল নয়। খুনিকে তো শাস্তি দিতেই হবে। কিন্তু রাজার মৃত্যুর পর যেন জিন রাজ্যের কোনো ক্ষতি না হয় সেদিকে পূর্ণ নজরদারি করছে সে।
দু'জন দু'জনার বাহুতে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওরা। আকস্মিক ঘরের একজন মাঝবয়েসী পরী উপস্থিত হলো। আরিবা চমকাল। দুলফিকারের বুকে মুখ গুঁজেই, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাণীটিকে দেখলো সে। দুলফিকার ফিসফিস করে বলল,
“ তোমার মায়ের বাড়ির পক্ষের লোকজন এর, পরী। কথা বলো। “
আরিবা ভালো করেই পরীদের বিষয় জানে। আজকে সকালবেলা ভিরন ওকে সবকিছু বলেছে। পরীরা যেকোনোভাবে জিন রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই বন্ধ করতে চাইবে। এসব ভেবে আরিবা মাথা তুলে, দাঁড়াল।
“ মহামান্য আরিবা আপনাকে রাণী পরী স্মরণ করেছেন। আপনার সাথে গুরুত্বপূর্ণ দরকার আছে উনার। আপনি যদি আমার সঙ্গে যেতেন, তাহলে আমি ধন্য হতাম। “
আরিবা ফিচেল হেসে বলল,
“ মাফ করবেন। আমি অচেনা কোনো প্রাণীদের সাথে কথা বলতে চাই না। “
প্রহরী বিল্লা মাথা নিচু করে বললেন,
“ ক্ষমা করবেন মহামান্য আরিবা, আমরা আপনার জন্য অচেনা নই। আপনি পরী রাজ্যের অংশ। আপনার মা পরী রাজ্যের রাজকন্যা ছিলেন। “
আরিবা গর্জন করে উঠলো এবার। দুলফিকার ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিয়ে গেছে।
“ আমি সবকিছুই জানি। তবুও আমি যাবো না। আপনি আসতে পারেন। “
দুলফিকার আরিবার পেছনে এসে দাঁড়াল। প্রহরী কুর্ণিস করার ভঙ্গিতে অদৃশ্য হয়ে গেলো। আরিবা রীতিমতো ফুঁসছে। দুলফিকার আরিবার সোনালী চুলগুলো আলতো করে ঘাড় থেকে সরিয়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“ শান্ত হও প্রেমিকা। এভাবে একপক্ষের কথা শুনে সবকিছু বিচার করা ঠিক না। “
আরিবা আচমকাই কোনো কথা না বলে দুলফিকারের দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে, শক্তভাবে জাপটে ধরলো। দুলফিকারও কোনো কথা না বলে এই মুহুর্তটুকু তার প্রেমিকার সাথে কাটাবে বলে চুপচাপ রইলো।
চলবে….
[ “ কী করবো প্রেমিকা? আমার তো একটু-আধটু আদরে পোষায় না৷ “
~ দুলফিকার
#আশিকা_জিন
প্রোমো কোড ব্যবহার করে " আশিকা জিন " ই-বুকটি মাত্র ২৩ টাকায় কিনতে পারবেন , বইটই এপস থেকে।
লিংক- https://link.boitoi.com.bd/toYcp
এলার্ট- ই-বুকটি অতিরিক্ত রোমান্টিক / ইরোটিক রোমান্সে ভরপুর। ]
আগের পর্ব https://www.facebook.com/100085130931546/posts/746893031491721/
পরের অংশ https://www.facebook.com/100085130931546/posts/748654591315565/