#তুমি_আসবে_বলে_বসন্ত_এসেছে '৯'
#জেরিন_আক্তার_নিপা
ইলহাম এখানে আসার আগেই জানত, একবার এলে সন্ধ্যার আগে যেতে পারবে না। তাকে পেয়ে ছোট দাদী এত সহজে ছেড়ে দিবে না। হলোও এমন। নাতিকে দেখে গোলাপ জানের খুশির সীমা রইল না।
-ওরে আমার ভাই রে, কত বছর তোরে দেখি না। তুই দেখি মাইয়াগো মতো ফর্সা হয়ে গেছস। এত সুন্দর পোলার বউ পামু কই?
ইলহামকে দেখে বড় চাচা খুশি হলেও মেজো চাচা, ছোট চাচা কেউই কথা বলেনি। চাচীরা অবশ্য তার আপ্যায়নে কমতি রাখছে না।
-ফুপু আসে না দাদী?
-আসে তো।
-ফুপুকে অনেকদিন দেখি না।
-ফুপুর বাড়ি যা একদিন। তুই গেলে তোর ফুপু অনেক খুশি হবে।
-হাতের কিছু কাজ শেষ করেই যাব।
-যাইস ভাই। তুই বিদেশে থেকে আইসা আমারে দেখতে আসছোস। কিন্তু ওই বড় নাদান দেশে থেকেও আমারে দেখতে আসে না।
গোলাপ জান তাওয়াফের কথা বলছে। বড় নাতির কথা বলতে গিয়ে গোলাপ জানের গলায় বিষাদ ধরা দিল। ইলহাম দাদীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,
-আজকে গিয়েই আমি ভাইকে তোমাকে দেখতে আসতে বলব।
পেখমে ব্যাগপত্র রুমে রেখে এসেছে। অন্য সোফায় বসতে বসতে বলল,
-গোলাপ জান এবার নাতিকে পেয়ে আমাদের ভুলে যাবে। নাতিদের প্রতি যে এই বুড়ীর কত টান!
-এই নাতিরাই শেষ বয়সে আমারে দেখব। তোরা তো পরের বাড়ি চলে যাবি।
-পরের বাড়ি যেতে দিও না। তাহলেই বাড়িতে থেকে তোমার সেবাযত্ন করতে পারব।
-তোরে আমি এই বছরই বিয়ে দিমু।
এজন্যই দাদীকে মাঝে মাঝে অসহ্য লাগে পেখমের। বুড়ী এবাড়িতে তার থাকা খাওয়া দেখতে পারে না। পেখম উঠে দাঁড়াল। রাগ দেখিয়ে বলে চলে গেল,
-তোমার কথায় কচু হবে বুড়ী। তোমার ছেলে তোমার কথা না, আমার কথা শুনবে। আমি রাজি না হলে বিয়ে তো দূর বাড়িতে সম্বন্ধও আসতে দিবে না।
ইলহাম দাদী নাতনির ঝগড়া দেখে হাসছে। পেখমের তেজ দেখিয়ে চলে যাওয়া দেখে দাদী বলল,
-দেখছোস কেমন চটাং চটাং কথা কয়! এই মাইয়া অনেক বাইড়া গেছে। এরে সত্যিই এইবার বিয়ে দিতে হবে।
ইলহাম মুখে হাসি নিয়েই বলল,
-ও তো এখনও ছোট দাদী। তোমার বড় নাতিই তো এখনও বিয়ে করেনি। ভাইয়ের জন্যও পাত্রী টাত্রী দেখো।
পেখম দাদীর গোষ্ঠী উদ্ধার করতে করতে দোতলার বারান্দা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। ঘরে বসে আজান পেখমের শব্দ পেয়ে ডাকল,
-পেখম বুড়ী নাকি?
পেখম আজান ভাইয়ের ঘরেই আসছিল। এই বাড়িতে কেউ যদি তাকে বুঝে সেটা হলো আজান ভাই। পেখম ঘরে ঢুকেই দাদীর বদনাম গাইতে লাগল,
-বুড়ীটা এমন কেন আজান ভাই? আমার সুখ দেখতে পারে না। আমার বয়স কত হয়েছে? তুমি বাকি আছো ইরিন আপু বাকি আছে। ওই বাড়ির দামড়া এক ছেলে, ইলহাম ভাই আকৃতি আপু। তোমাদের বিয়ের পরে না আমার সিরিয়াল আসবে। কিন্তু বুড়ী আমাকে সবার আগে বিয়ে দিতে চায়।
আজান মনোযোগ সহকারে বোনের সব অভিযোগ শুনল। মনে মনে ভাবল, এই মেয়ে এত অবুঝ কেন?
-দাদী কি সত্যি সত্যিই তোর বিয়ে দিবে পাগল! তুই খেপিস দেখেই দাদী তোকে আরও খেপাতে বিয়ের কথা তুলে। তুই যেদিন থেকে খেপবি না সেদিন থেকে দাদী আর তোর বিয়ের কথা বলবে না।
পেখম ঠোঁট বাঁকিয়ে ভাবছে, আজান ভাইয়ের কথায় লজিক আছে। এক মিনিটেই তার মন ভালো হয়ে গেল।
-ঠিকই বলেছ। আমি আর খেপব না। তুমি এখন কী করছো?
-কিছুই না।
-তাহলে নিচে চলো। ইলহাম ভাই এসেছে।
আজান তার হুইলচেয়ারের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
-আমাকে টেনে নিচে না নিয়ে ইলহাম ভাইকে উপরে আসতে বল।
'ঠিক আছে' বলেই পেখম বেরিয়ে গেল। আজান হুইলচেয়ারটার দিকে তাকিয়ে নিশ্চুপ বসে রইল। তার এই কমতি কি তার পরিবারের চোখে পড়ে না? সবাই তাকে নিজেদের মতো কেন ভাবতে চায়? সে চাইলেও ওদের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে না। তার জীবন দু'চাকার এই হুইলচেয়ারে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে।
***
কলেজ থেকে ফিরে দৃষ্টি পেখমকে কল করল। কলেজে যাবে বলেও ওই হারামি যায়নি। বোরিং বোরিং সব ক্লাসগুলো তাকে একা করতে হয়েছে। পেখম কল তুললে দৃষ্টি বলল,
-মিথ্যুকের বাচ্চা তুই যাবি না তাহলে আমাকে মিথ্যা বলে পাঠিয়েছিস কেন?
পেখম হেয়ালি সুরে বলল,
-যেতে তো চেয়েছিলাম। কিন্তু বাসায় এসে আর ইচ্ছে করেনি।
-তুই জানিস আজকে আমি ক্লাসে কতটা এতিম ফিল করেছি!
-ঢং করিস না। তোর বান্ধবীর অভাব আছে নাকি? আমাকে রেখেই তো দেখি ওদের সাথে ক্যান্টিনে খেতে যাও।
পেখমকে ছাড়া এই একদিনই আলিয়াদের সাথে খেতে গিয়েছিল। সেই খোঁটা আজ পর্যন্ত শুনতে হয়।
-আমি তোকে ভীষণ মিস করছি। বাড়িটাও পুরো ফাঁকা লাগছে।
-কালই কলেজে দেখা হবে। ততক্ষণ আরও একটু মিস করতে থাক।
কথা শেষ করে পেখম ব্যাগ থেকে কাপড়গুলো নামিয়ে রাখছে। গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে এক এক করে ড্রেস নামাতে গিয়ে লাল রঙের একটা ছোট্ট বক্স দেখতে পেলো। এটা কার জিনিস তার কাছে চলে এসেছে? অন্য কারো হবে হয়তো। ভুল করে কেউ তার ব্যাগে রেখে দিয়েছে। জিনিস যারই হোক পেখম না দেখে থাকতে পারবে না এর ভেতর কী আছে। বক্সটা হাতে নিল পেখম। লম্বা বক্স দেখে মনে হলো ভেতরে চেইন টেইন কিছু থাকবে। বক্সটা খুলে পেখমের মুখ হা হয়ে গেল। বড় বড় চোখে তাকিয়ে জিনিসটা দেখতে লাগল। ম্যাপেল পাতার ডিজাইনের ছোট্ট একটা লকেট সহ চেইন। সাথে ছোট একটা কাগজ। আপনাতেই পেখমের কপালে ভাঁজ পড়ল। মুখ দিয়ে উচ্চারণ করল,
-চিরকুট!
আগ্রহ, কৌতূহল ধরে রাখতে না পেরে পেখম দ্রুত হাতে কাগজটা খুলে পড়তে লাগল।
"যার ব্যাগ থেকে পাওয়া গেছে উপহারটা তার জন্যই।"
এই একটা লাইন পড়ে পেখম হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। কার হ্যান্ড রাইটিং এটাও তো বুঝতে পারছে না। কার মাথায় এরকম শয়তানি বুদ্ধি থাকতে পারে? জিনিসটা পেয়ে সে যে মনে করবে এটা অন্য কারো, ভুলে তার কাছে চলে এসেছে এই কথা কীভাবে জানল!
-কোন নাম, সম্মোধন কিচ্ছু নেই। রোমান্টিক কোন কথাবার্তাও লিখেনি। কে দিয়েছে এটা নাহয় না-ই জানলাম। কিন্তু কেন দিয়েছে এটা তো জানাতেই পারত।
পেখম চেইনটা চোখের সামনে ধরে মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল। ম্যাপেল পাতা!
-ইলহাম ভাই! ইলহাম এটা আমার জন্য এনেছে? তাহলে আমার হাতে না দিয়ে ব্যাগে কেন রেখে দিয়েছে? ব্যাগে রেখেছে ভালো কথা চিরকুট লেখার মানে কী?
পেখম সাথে সাথে দৌড়ে নিচে গেল। দাদীকে জিজ্ঞেস করল,
-ইলহাম ভাই কোথায় দাদী?
-ইলহাম তো চলে গেছে।
-চলে গেছে! কখন, না মানে কেন? ইলহাম ভাইয়ের তো বিকালে যাওয়ার কথা ছিল।
-হাসপাতালে নাকি যাবে। কী বলে গেছে আমার এখন মনে নাই।
ডাক্তারি পাস করে এসেছে। হসপিটালে জয়েনিং দিবে এটাই স্বাভাবিক। ওই কাজেই হয়তো গেছে।
পেখম আবার রুমে ছুটে এলো। বিছানার উপর থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে ইলহাম ভাইয়ের নম্বরে কল করল। ইলহাম গাড়িতে ছিল। কল রিসিভ করে বলল,
-ড্রাইভ করছি। কী বলবি বল।
-বক্সটা তুমি রেখেছ, না? তুমি আমার জন্য গিফট এনেছ তাহলে কেন এমন নাটক করলে?
-কিসের বক্স? কোন গিফটের কথা বলছিস তুই?
-তুমি এখনও মজা করছো তাই না। আমি তোমার গিফট পেয়ে গেছি।
ইলহাম ভেবে পাচ্ছে না এই মেয়ে কোন গিফটের কথা বলছে।
-পাগল বোন আমার নিজের সাথে আমার মাথাও খারাপ করিস না।
পেখমের এবার সন্দেহ হচ্ছে। ইলহাম ভাই না হলে আর কে রাখবে?
-সত্যিই তুমি আমার জন্য কোন গিফট আনোনি।
-না রে বোন আমার। ভেবেছিলাম এইচএসসি পাস করলে তোকে দামী একটা মোবাইল ফোন গিফট করব।
ফোন গিফট পাওয়ার কথা শুনেও পেখম খুশি হতে পারল না। ওটা সময় হলে পাওয়া যাবে। কিন্তু এখন যেটা পেয়েছে এটার মালিককে কিকরে খুঁজে বের করবে? কল কেটে পেখম ভীষণ মনোযোগ দিয়ে চিরকুটের লেখাটা দেখছে। দূর, চিনতে পারছে না। চেইনটা কিসের?
-গোল্ড! মাঝে ওই পাথরটা কি ডায়মন্ড? ওরে বাবা!
যদিও পেখম গোল্ড ডায়মন্ড কিছুই পরে না। তাই এসব সম্পর্কে তার বেশি ধারণাও নেই। কিন্তু জিনিসটা যে দামী এটা যেকেউ বুঝতে পারবে। পেখম এতক্ষণ কৌতূহলী ছিল। এবার তার মনে টেনশন ঢুকে গেছে।
-এত দামী গিফট আমাকে কেউ কেন দিবে?
পেখম চেইনটা গলায় পরার সাহস করল না। মা'র চোখে পড়লে লক্ষ কোটি প্রশ্ন করবে। কে দিয়েছে, কেন দিয়েছে। আর পেখমও পরিচয়হীন কোন মানুষের দেওয়া গিফট কেন একসেপ্ট করবে? জিনিসটা সে আলমারির ভেতর লুকিয়ে রাখল যেন সহজে মাতাজির চোখে না পড়ে। তার বাকি দিনটা অনুমান করার উপর কেটে গেল। মানুষটা কে হতে পারে?
***
পরের দিন কলেজ যাওয়ার পথে ওই বাড়ি থেকে দৃষ্টিকেও পিক করে নিল। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পেখম দৃষ্টিকে ঘটনাটা বলছে। এটা যে তার নিজের সাথে ঘটেছে তা অবশ্য বলল না। দৃষ্টির পেট, ঠোঁট দু'টোই পাতলা। কোন কথা এর পেটে থাকে না।
-ধর তোকে কেউ অনেক দামী একটা জিনিস গিফট করেছে। কিন্তু মানুষটা তোর সামনে আসেনি।
-সহজ কথায় পরিচয় লুকিয়ে গিফট করেছে এই তো?
-হুম। এখন বল এর মানে কী হতে পারে?
-মানে খুব সিম্পল। যে গিফট করেছে সে তোকে ভালোবাসে।
-আমাকে কেন ভালোবাসবে পাগল! গিফট কি আমাকে দিয়েছে?
-তাহলে কাকে দিয়েছে?
-দিয়েছে একজনকে। সে-ও আমার ফ্রেন্ড।
দৃষ্টি বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল,
-আমি ছাড়াও আজকাল তোর নতুন অনেক ফ্রেন্ড হয়েছে দেখা যাচ্ছে!
-আরে ফেসবুক ফ্রেন্ড। মোটামুটি ক্লোজ বলা যায়। ওর অনেক কিছুই আমার সাথে শেয়ার করে।
-বুঝলাম।
-হুম। এখন যে গিফট করেছে তাকে খুঁজে বের করার উপায় কী?
-আমি তো কোন উপায় দেখছি না। যদি সে নিজে থেকে দেখা দিতে না চায় তাহলে ওই ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।
পেখম ভাবনায় পড়ে গেল। কীভাবে ওই ব্যক্তিকে খুঁজে বের করবে সে?
চলবে