ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি আসবে বলে বসন্ত এসেছে

১৫তম পর্ব

লেখক: জেরিন আক্তার নিপা

#তুমি_আসবে_বলে_বসন্ত_এসেছে '১৫'

#জেরিন_আক্তার_নিপা

মেয়ের সাড়াশব্দ না পেয়ে আমেনা গলা উঁচিয়ে ডাকছে।

-প্রিয়া কে এসেছে? না করেছি দরজা খুলিস না। এই মেয়ে যদি আমার কথার কোন দাম দিত! কথা বলছিস না কেন? কে এসেছে?

প্রিয়া ভেতরের দিকে তাকিয়ে কান্না গিলে পরিষ্কার ঝরঝরে গলায় বলল,

-ভাইয়া এসেছে মা।

-কে, তাওয়াফ!

আমেনার চোখমুখ খুশিতে ঝলমল করে উঠল। তাওয়াফ এখনও ভেতরে ঢুকছে না। প্রিয়া বলল,

-ভেতরে আসুন ভাইয়া।

তাওয়াফ এক চুলও নড়ল না। কাঠকাঠ মুখে জানতে চাইল,

-ওই লোক কতদিন ধরে বিরক্ত করছে?

প্রিয়া জানে তাওয়াফ ভাইয়া এখন তার উপর রাগ করবে। আগে কেন জানায়নি। তবে সে ছোট ছোট বিষয় গুলোও ভাইয়াকে জানিয়ে ঝামেলা বাড়াতে চায় না।

আমেনার হাঁটুতে ব্যথা। দু'দিন ধরে একেবারেই হাঁটতে পারছে না। তারপরও কোনভাবে বাইরে চলে এল। তাওয়াফ এখনও বাইরে দাঁড়িয়ে আছে দেখে মেয়েকে বকাবকি শুরু করল।

-তোর কেমন আক্কেল রে প্রিয়া। ছেলেটাকে এখনও বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিস! ভেতরে আসো বাবা। এই মেয়ের মাথায় গোবর ছাড়া কিছু নেই।

প্রিয়ার থেকে উত্তর পায়নি তাওয়াফ। তাই খালাম্মার কাছেই এগিয়ে গেল। সরাসরি জানতে চাইল,

-ওই লোক কেন এসেছিল? প্লিজ খালাম্মা, আমার থেকে কিছু লুকাবেন না।

আমেনা ফ্যালফ্যাল চোখে ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তাওয়াফের মাঝে সে নিজের ছেলেকে দেখতে পায়। একইরকম রাগ, জেদ টগবগে রক্ত। ধরে আসা গলায় আমেনা বলল,

-ওই বুড়ো খাটাশ আমার মেয়েকে বিয়ে করতে চায় বাবা। অনেকদিন ধরেই জ্বালাচ্ছে। ভেবেছে, দুইটা মেয়ে মানুষের ঘর। আমাদের আগেপিছে কেউ নেই।

খালাম্মা কথা শেষ করার আগেই তাওয়াফ পায়ের কাছে থাকা একটা মোড়া লাথি মেরে দূরে ফেলে দিল। প্রিয়া ভয় পেয়ে আঁতকে উঠেছে। তাওয়াফের চোখ জোড়া ক্রোধের আগুনে দাউদাউ করে জ্বলতে লাগল। গলার রগ ফোলে উঠেছে। দাঁতে দাঁত পিষে চাপা কন্ঠে জানতে চাইল।

-আপনি আমাকে আগে কেন জানাননি খালাম্মা? আমি থাকতেও একটা দুশ্চরিত্র লোক প্রতিনিয়ত আমার বোনকে বিরক্ত করে গেছে। অথচ আমি এব্যাপারে কিছুই জানতাম না। এই ব্যর্থতা তো আমারই। আপনারা না বললেও আমার জানা উচিত ছিল।

প্রিয়ার চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। আমেনা মেয়েকে বলেছিলেন তাওয়াফকে জানাতে। প্রিয়াই বলেছে, এসব ছোটখাটো বিষয় ভাইয়াকে জানাতে হবে না মা।

তাওয়াফ নিজের উপর রেগে আছে। অস্থির ভঙ্গিমায় ঘরজুড়ে পায়চারি শুরু করল। তার দায়িত্ব সে সঠিক ভাবে পালন করতে পারেনি। বন্ধুকে দেওয়া কথা রাখতে পারেনি। খালাম্মার ছেলে, প্রিয়ার ভাই হয়ে উঠতে পারেনি সে। তাওয়াফের রাগ, অস্থিরতা দেখে প্রিয়া বলল,

-আমি আপনাকে জানতাম ভাইয়..

-কবে প্রিয়া? কবে জানাতে? এর থেকেও বড় কিছু হয়ে গেলে তখন জানাতে?

তাওয়াফের চিৎকারে প্রিয়া ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেছে। আমেনাও শূন্য দৃষ্টিতে ছেলেটাকে দেখছে। তাওয়াফ নিজেকে শান্ত করতে সময় নিল। বেশ কয়েকবার বড় বড় করে দম নিল। শীতল চোখে প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

-তোমার আর খালাম্মার ব্যাগ গুছিয়ে নাও।

তাওয়াফের এই কথা প্রিয়া, আমেনা কেউই বুঝতে পারেনি। ব্যাগ গুছিয়ে কোথায় যাবে তারা? তাওয়াফ ভাই কি তাদের নতুন কোন বাসায় নিয়ে যাবে? প্রিয়া জিজ্ঞেস করল,

-এই বাসা কি ছেড়ে দিব?

-তুমি কি এখানে আরও থাকতে চাও?

প্রিয়া মাথা নেড়ে 'না' বলল।

-তাহলে যেমনটা বলেছি করো।

আমেনা জিজ্ঞেস করল,

-এখান থেকে কোথায় যাব বাবা?

-যেখানে আমি থাকি।

তাওয়াফের সোজা উত্তর। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে সে। আমেনা হতবাক চোখে তাওয়াফের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সে বলল,

-এটা হয় না বাবা।

-কেন হয় না? আপনি প্রিয়া আমার পরিবার। আপনাদের আমি আর একা ছাড়তে পারব না। অনেক আগেই যা করা উচিত ছিল তা এখন করব। আপনারা দু'জন আমাদের বাড়িতে আমার সাথে থাকবেন।

তাওয়াফ এক কথার মানুষ। সে একবার যা বলে ফেলে শেষ পর্যন্ত সেটাই হয়। তার এই একরোখা জেদের কাছে বাড়ির মানুষদেরও হার মানতে হয়। নূর জাহান একটা কথা সবসময়ই বলেন।

-একেবারে দাদাটার মতো হয়েছিস। তার কিছুই ছাড়িস নি। আল্লাহ না করুক, বিয়েরও দাদার মতো দুইটা করিস না।

তাওয়াফ সকালে বেরিয়েছে। এখনও ফিরেনি। নূর জাহান খুব বেশি সময় নাতিকে না দেখে থাকতে পারেন না৷ এই নাতি চোখের সামনে থাকা তার চোখের শান্তি। ছেলের বউকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন,

-তোমার ছেলের আজ দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। কোথায় গেছে সে?

রানি একটু দূরেই কাজ করছে। মানুষের কথা শোনার জন্য এই মেয়ে সবসময় কান উঁচিয়ে রাখে। তাই তাহমিনা বললেন,

-ওর যেন কী কাজে গেছে আম্মা।

-আমার নাতিকে আমি অফিস আদালত করাই না। তারপরও এত কিসের কাজ ওর? সকাল থেকে মুখটাও দেখতে পারলাম না।

-ছেলে মানুষের কত কাজ থাকে আম্মা।

কলিংবেল বাজার শব্দ শুনে তাহমিনা বললেন,

-ওই যে, আপনার নাতি মনে হয় চলে এসেছে।

তাহমিনা রানিকে দরজা খুলে দিতে বলল। রানি কাজ ফেলে তাড়াহুড়োয় উঠে গেল। দরজা খুলতে দেরি হলে আবার বড় ভাইজানের মাথা গরম হয়ে যাবে। ছোট ভাইজানকে রানি ভয় পায় না। কিন্তু বড় ভাইজানকে যমের মতো ভয় পায়। বড়ো ভাইজান ছোট ভাইজানের মতো ভালো মানুষ না। আস্ত একটা খাটাশ। রানি দরজা খুলে দিয়ে বড় ভাইজানকে একা দেখল না। ভাইজানের সাথে আরও দুইজন মেয়ে মানুষ। এটা দেখেই রানি তাহমিনাকে ডাকতে লাগল,

-আম্মা। ও আম্মা। দেখেন আইসা ভাইজান কী কাম সাইরা আইছে।

প্রিয়া এখানে আসতে চাচ্ছিল না। তাওয়াফ ভাই তাদের দেখাশোনা, ভরণপোষণ চালায় এটা সে মেনে নিয়েছে। কিন্তু তাই বলে তারা তাওয়াফ ভাইদের বাড়ি এসে থাকবে এমনটা কোনদিন ভাবেনি। এবাড়ির মানুষ তাদের লোভী বা সুযোগ সন্ধানী ভাবতে পারে। রানি দরজার সামনে থেকে সরছে না। তাওয়াফ ধমক দিয়ে বলল,

-ভেতরে ঢুকতে দিবি না? সরে দাঁড়া।

রানি কলের পুতুলের মতো সরে দাঁড়িয়ে জায়গা করে দিল। আম্মা এখনও আসছে না কেন? আম্মার ছেলে তো বিয়ে করে বাড়িতে বউ নিয়ে এসেছে।

তাওয়াফ নিজে ভেতরে পা রাখার আগে আমেনার হাত ধরে নরম গলায় বলল,

-ভেতরে আসুন খালাম্মা।

ভাইজান শুধু বউই আনেনি। বউয়ের মাকেও নিয়ে এসেছে। এই কাজ ভাইজান কীভাবে করতে পারল!

রানি আবার গলা উঁচিয়ে ডাকল,

-ও আম্মা, এদিকে আইয়া দেইখ্যা গেলেন না!

রানির ডাকাডাকিতে বিরক্ত হয়ে তাহমিনা দেখতে এসেছিল। কী এমন হয়েছে। ষাঁড়ের মতো কেন চেঁচাচ্ছে? তাওয়াফের সাথে মানুষ দু'জনকে দেখে তাহমিনার চিনতে এক সেকেন্ড সময়ও লাগল না। তিনি চোখেমুখে উচ্ছসিত খুশি নিয়ে ছুটে এলেন।

-কাদেরকে নিয়ে এসেছিস তুই তাওয়াফ! তোরা আসছিস আমাকে আগে কেন জানাস নি? আপা, কতদিন পর দেখছি আপনাকে!

রানি চোখ মুখের অদ্ভুত ভঙ্গি করে তাকিয়ে দেখছে। বিড়বিড় করে বলল,

-আম্মা দেহি ছেলের বউ, শাশুড়িরে দেইখা খুশি হইছে!

আমেনার হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে বুঝতে পেরে তাহমিনাও এক হাতে তাকে ধরল। প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে স্নেহের কন্ঠে বলল,

-দাঁড়িয়ে আছো কেন মা? ভেতরে এসো।

রানি কিছুই বুঝতে পারছে না। এবাড়িতে কী হচ্ছে এসব? এই মেয়ে, মহিলা দু'জন কে? আত্মীয়? আত্মীয় হলে আগে কখনও কেন দেখেনি?

নূর জাহান ওদের দেখে নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারলেন না। তিনি ওদের জন্য ঘর ঠিক করতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। তাওয়াফ দাদীকে জানাল,

-খালাম্মার হাঁটুতে সমস্যা। সিঁড়ি উঠতে পারে না। নিচেই ঘর ঠিক করো।

মানুষগুলো তাদের এতবেশী গুরুত্ব দিচ্ছে দেখেও প্রিয়ার ভালো লাগছে না। আমেনা অবশ্য নিজের কথা ভাবছে না। মেয়ের সুরক্ষাই তার কাছে মূখ্য বিষয়। তাওয়াফ খালাম্মাকে ড্রয়িংরুমে সোফায় বসিয়ে রানিকে আদেশ করল,

-আমার রুমের পাশে খালি রুমটা এক্ষুনি তৈরি করে দিয়ে আয়। নতুন চাদর, নতুন বালিশ কভার। পর্দা গুলোও নামিয়ে ফেল।

-জি ভাইজান।

-রুমে যেন একটু ধুলাবালুও না থাকে।

-জি ভাইজান।

রানি তাওয়াফের আদেশ মতো কাজগুলো করে ফিরে আসা পর্যন্ত এখানে বসেই নূর জাহান আমেনার সাথে কথা বলছেন। প্রিয়াকে চুপচাপ দেখে তাওয়াফ জিজ্ঞেস করল,

-এখানে থাকতে আপত্তি আছে?

প্রিয়া বড় করে দম ফেলে বলল,

-আপত্তি থাকলেও কি আপনি শুনবেন?

-আমাকে ভাই মানো তো? নাকি শুধু মুখেই ডাকো!

প্রিয়া ক্ষীণ হাসল। তবে এই হাসির মাধ্যমে দুঃখ প্রকাশ পেলো।

-ভাই মানি বলেই ডাকি। যখন মানতাম না তখন কি ডেকেছি?

রানির কাজের হাত ভীষণ চালু। বড় ভাইজানের কথামতো সে সব কাজ করে এসেছে। তাওয়াফ নিজে খালাম্মা, প্রিয়াকে রুমে দিয়ে এলো। বাইরে এসে মা দাদীকে জানাল,

-এখন থেকে খালাম্মা প্রিয়া আমাদের সাথেই থাকবে দাদী। পুরুষ ছাড়া মেয়ে মানুষের জীবন যাপন কঠিন হয়ে যায়। আমার চোখের সামনে থাকলেই ওদেরকে আমি রক্ষা করতে পারব।

নূর জাহান, তাহমিনা এতে কারোরই আপত্তি নেই। বাকিদেরও হবে না। তৌকির মির্জা অনেক আগেই দু'জনকে বাড়িতে এনে রাখার কথা বলেছিলেন। এই মানুষটার ছেলের জন্যই তাদের ছেলে আজ চোখের সামনে আছে। এই মানুষ গুলোর ঋণ তাদের পুরো পরিবার মিলেও শোধ করতে পারবে না।

চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন